Friday, June 5, 2009

রিপোটিং এবং ফিকশন!

'মা-মা, অ মা, দেখো তোমায় কেমন ছুঁয়ে দিচ্ছি'।
হাসিখুশি মা-টার
মনটা আজ কী কারণে যেন ভারী বিষণ্ন। অন্য সময় খোকার এই চক্রাকারে ঘুরপাক খাওয়া এবং ছুঁয়ে দেয়ার খেলাটা কী উপভোগ্যই না মনে হত। কিন্তু আজ মোটেও ভাল লাগছে না, বিরক্ত লাগছে।

মা-র বুকটা কেমন ভার হয়ে আছে। আহ, খোকাটা এমন অবুঝ হয়েছে কেন! খোকারই বা কি দোষ, কীই বা বয়স ওর, ক-দিনইবা হলো এই পৃথিবীর মুখ দেখেছে! মা কঠিন কিছু কথা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন। প্রাণপণ চেষ্টায় গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বললেন, 'বাবু, যাও, অন্যদের সাথে গিয়ে খেলা করো'।
খোকা চক্রাকারে ঘুরপাক থামিয়ে ঝলমলে মুখে বলল, 'উহুঁ, আমার যে তোমার সাথে খেলতেই ভাল লাগে, তুমি যে আমার লক্ষী মামইন্যা'। খোকা এবার তার স্বরচিত ছড়া ক্রমাগত সুর করে বলতে থাকল, 'মামইন্না-মামইন্না, পিঁড়ি থেকে নামইন্না'।

খোকা আজকাল বড়ো ছড়াকার হয়েছে। তার এইসব স্বরচিত ছড়ার কোন আগামাথা নাই। অন্য সময় হলে মা হাঁ করে খোকার এইসব ছড়া শোনেন। আজ মোটেও এসব টানছে না। মা রাগ-রাগ গলায় বললেন, 'বাবু, তোমাকে একবার একটা কথা বললে কানে যায় না, বললাম না অন্যদের সঙ্গে গিয়ে খেলা করো। আর শোনো, ঘসাঘসি করবে না, বিরক্ত লাগছে'।
খোকার এতক্ষণে হুঁশ হলো। মার বিবর্ণ মুখটা ভাল করে লক্ষ করল। আহা-আহা, মার কীসের কষ্ট! ইশ, কি করলে মার কষ্ট কমে এটা জানলে বেশ হতো কিন্তু খোকা তো এটা জানেই না ছাই! কথা ঘুরাবার জন্য বলল, 'মা, দৈত্যরা তো আমাদের ধরতে পারলে মেরে খেয়ে ফেলবে, না'?
মা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, 'হুঁ'।
খোকা শিউরে উঠে বলল, 'ইশ, দৈত্যরা কী নিষ্ঠুর, না মা?
মা বললেন, 'হুঁ-ম'।
'মা, আমাকে ধরলে পারলেও খেয়ে ফেলবে'?
মা হাহাকার করে উঠলেন, 'বালাই ষাট, তোকে খাওয়ার আগে যেন আমাকে খায়। খোকা, আর কক্ষণও এমন কথা মুখেও আনবি না। এইটুকুন ছেলে, কীসব কথা! খোকা, বুকে থুতু দে'। 
'আচ্ছা মা, আমাদের তো দৈত্যরা ধরবে না, না? আমাদের এই জায়গাটা তো পবিত্র, তাই না? আমরা এখানে থাকলে দৈত্যরা নাকি আমাদেরকে খেতেই পারবে না'?
মা খোকার চোখে চোখ রেখে বললেন, 'হুঁ'।
'আমাদেরকে খেলে নাকি দৈত্যরা নিজেরাই মরে যাবে? সত্যি নাকি, মা'?
'হা, সত্যি'।

খোকা এবার লাফিয়ে উঠল, 'কী মজা-কী মজা। দৈত্যরা আমাদের খেতে পারবে না-পারবে না'। খোকা এবার কথা ঘুরাবার জন্য বলল, 'মা, তোমার কি মন খারাপ'?
মা বললেন, হুঁ-উ।
'বেশি খারাপ'?
'হুঁ',
'তোমায় একটা ছড়া বলি'?
'না। যাও গিয়ে খেলা করো গিয়ে'।



খোকা চলে যাচ্ছে। দেখো দেখি ছেলেটার কান্ড, পাগলুটা কেমন বারবার ফিরে তাকাচ্ছে, এই বুঝি মা পিছু ডাকল। খোকাটা একদম একটা পাগলু হয়েছে! খোকা একসময় চোখের আড়াল হয়ে গেল। মা খোকাকে এটা বলতে পারেননি, তাদের মাথার উপর বিপদ, ভয়াবহ বিপদ। ইশ, খোকা যদি বুঝত বড়দের কত সমস্যা, সমস্যার কূলকিনারা নাই রে!
এখানে থাকলে দৈত্য নামের মানুষরা তাদের খেতে পারবে না এটা সত্য কিন্তু খেতে পারবে না বলেই তাদের সবাইকে মেরে ফেলার জন্য বুদ্ধি করা হচ্ছে। কালই শুনছিলেন, দৈত্যরা বিচিত্র ভাষায় কথা বলছিল, শলা করছিল: সবাইকে মেরে ফেল, সব্বাইকে। ওষুধ ছড়িয়ে দাও। সবাইকে মেরে ফেল, একজনও যেন না বাঁচতে পারে।

এক্ষণ মার বুকে কেমন চাপ চাপ ব্যথা। দৃষ্টি কেমন অস্বচ্ছ হয়ে আসছে। এটা কী চোখের ভুল, পানির রঙ কী বদলে গেছে খানিকটা? এমন হচ্ছে কেন, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে কেন? শ্বাস নিতে পারছে না। মনে হচ্ছে কলজেটা মুখে চলে এসেছে! মা নিমিষেই বুঝে ফেললেন, বোঝার আর বাকি রইল না। তাদেরকে মেরে ফেলা হচ্ছে। চারদিক থেকে অন্যরা ভুসভুস করে ভেসে উঠছে, পেট উল্টে যাচ্ছে। কেউ কেউ মুখ হাঁ করে আটকে রাখা দম ফেলার চেষ্টা করছে, আপ্রাণ চেষ্টায় নীচে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছে, লাভ হচ্ছে না।

অভিজ্ঞ মা-টা এটা বিলক্ষণ জানেন বিষ পানিতে সমান ভাবে মিশতে প্রচুর সময় লাগে আর কিছু ফাঁকা জায়গা থাকে যেখানে যেতে পারলে বাঁচার সম্ভাবনা বেড়ে যায় কিন্তু মা-টা এসব নিয়ে ভাবছেন না। কেবল পাগলের মতো তার সন্তানকে খোঁজার চেষ্টা করছেন। কোথায় পাবেন তার সন্তানকে? চারদিকে আর্তনাদ, হাহাকার। মা বুঝতে পারছেন ক্রমশ তার সময় ফুরিয়ে আসছে।
তার মাথা খারাপের মতো হয়ে গেল, একই শব্দ বারবার আউড়ে যাচ্ছেন: খোকা-খোকা, অ খোকা, অ আমার পাগলু, ফিরে আয়-ফিরে আয় সোনা, তোর মাথার দিব্যি আর কক্ষণও তোকে যেতে বলব না, কক্ষণও না। একবার আয়- কেবল একবার আয়- আয় বাপ, একটি বারের জন্য আয়...!

*এটা একটা পুরনো লেখা কিন্তু আমার অসম্ভব পছন্দের। এই ফিকশন-লেখার উৎস যে রিপোর্ট বা খবরটা সেটা হচ্ছে, 'ঢাকা ওয়াসার পয়োপরিশোধন কেন্দ্রের লেগুনের সব মাছ বিষ প্রয়োগে মেরে ফেলা হয়। ভেসে ওঠে কয়েক টন মৃত মাছ'।

এই খবরটা যখন আমি পড়ি তখন আমার চশমার কাঁচ ঝাপসা, বুক ভেঙ্গে আসছিল। গলায় কী যেন দলা পাকাচ্ছিল। কেন? এর উত্তর আমার কাছে নাই। আমরা কী মাছ খাই না? খাই। আমি কী মাছ খাই না? খাই। তাহলে? আমি জানি না-আমি জানি না!
বুঝলাম উপায় ছিল না কিন্তু এভাবে মেরে ফেলাটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার কেবল মনে হচ্ছিল জ্ঞানে-বুদ্ধিতে উন্নত জাতি প্রায় একই ভঙ্গিতে আমাদের মত অনুন্নত জাতিকে নির্বিকার ভঙ্গিতে মেরে ফেলে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোই যদি ঠিক করে এই গ্রহ থেকে বাংলাদেশের নামটা মুছে ফেলবে, সম্ভব। এই মাছের মতই এরা মেরেছে ইরাকিদের, ফিলিস্তানিদের...।

**অন্যত্র এই লেখাটাই পড়ে আমার এক সুহৃদ চটে লাল, কী চটাচটি! তিনি মুখে আলাদা কাঠিন্য এনে বলেছিলেন, হুম, মাছ। শোকগাথা, হুম। মাছের জন্য এলিজি, হুম। তোমার মধ্যে সমস্যা আছে, ভয়াবহ সমস্যা।
এ আমি বিলক্ষণ জানি আমি সমস্যার 
চলমান ট্রাক কিন্তু আমার এই কষ্টটার মধ্যে কোন খাদ নেই। আমি দুঃখ লুকিয়ে বলেছিলাম, কেমন?

তখন তিনি বিস্তর উদাহরণ দিলেন, আমি কখন কার সঙ্গে পোকার ন্যায় আচরণ করেছি। কার মৃত্যুসংবাদ শুনে বলেছি, অ- আচ্ছা! তিনি সদুপদেশও দিলেন, ভাল মানসিক রোগের ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। সোজা বাংলায় পাগল...!
আসলে জানি না, জানি না আমি। এই তীব্র কষ্ট-খারাপলাগার উৎস কোন নিতল থেকে উঠে আসে? এটা আমার জানা নাই- জানা থাকলে ভাল হত। আমি নিজেকেই নিজে চিনি না। মস্তিষ্ক আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে, আমি না! এ তো আমি আর আমার মস্তিষ্কের মধ্যেকার বাতচিত। আহা, এখানে মস্তিষ্কের ডাক্তারের কী কাজ, ছাই!
তবুও এই বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছিলাম। কী কারণে জানি না তিনি আমাকে খুব পছন্দ করতেন। একদা তিনি আমাকে এই বলে খারিজ করে দিলেন খুব বেশিদিন আপনার চিকিৎসা করলে আমি নিজেই আপনার মত হয়ে যাব। আমার 'ফ্রিডম' বইয়ে এর অনেকটাই চলে এসেছিল। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ, এখানে এই আলোচনার খুব একটা গুরুত্ব নেই। 

2 comments:

অর্ণব আর্ক said...

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোই যদি ঠিক করে এই গ্রহ থেকে বাংলাদেশের নামটা মুছে ফেলবে, সম্ভব। এই মাছের মতই এরা মেরেছে ইরাকিদের, ফিলিস্তানিদের...।

আলী মাহমেদ-ali mahmed said...

হুঁ...। @অর্ণব আর্ক