Friday, May 15, 2009

কষ্ট, মনন-দারিদ্রতা এবং ছফা পুরান

আহমদ ছফা নামের মানুষটা পাগল ছিলেন কিনা জানি না কিন্তু পাগল বানাবার কারখানা ছিলেন এটা আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি। কলমের শপথ, তিনি তাঁর পাগলামির অনেকখানি আমার মধ্যে সংক্রমিত করতে পেরেছেন। ভয়াবহ আকারে পেরেছেন! এই কান্ডটা ঘটেছে তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' পড়ে!

আমি কোথাও লিখেছিলাম, 'প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সন্তানদের জন্য রয়েছে আমার প্রগাঢ় মমতা'। ছফার সম্মানে, তাঁর তীব্র আলো ছটায় ঝলসে, আজ আমি আমার এই কথাটা কেবল ফিরিয়েই নিচ্ছি না, আমার এই ভাবনাটাকে ধৃষ্টতাপূর্ণ মনে করছি।

আহমদ ছফার সঙ্গে কারও তুলনা হয়? ছফা একটা শিশু আপেল গাছের জন্য কলকাতা থেকে রাতারাতি উড়ে চলে এসেছিলেন। প্লেনের ফিরতি টিকেটের জন্য বাংলাদেশ বিমানের অফিসে কেবল মারামারি করতে বাকি রেখেছিলেন। আমি নিশ্চিত, তাঁকে ফেরার টিকেট না দিলে অফিসারের নাকে গদাম করে ঘুসিও বসিয়ে দিতেন!

এটা মিথ্যা না, একদা আমারও ছিল প্রকৃতি এবং তার সন্তানদের জন্য খানিকটা ভালবাসা। নিজস্ব কষ্ট, জাগতিক জটিলতায়, কোথায় উবে গেল সেইসব ভালবাসা। চকচকে চোখ অথচ সবই কেমন ধুসর।
একদা গাছ কিনতাম পাগলের মত। মানুষে ঠাসাঠাসি রেলের বগিতে দু-পা ফেলার জায়গা নেই অথচ আমি ঠিকই দু-হাতে গাছভর্তি ব্যাগ নিয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘন্টার পর ঘন্টা। গাছগুলো দৃষ্টিনন্দন ছিল বটে কিন্তু অকাজের। কাঠের গাছ লাগালে আজ লাখ-লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারতাম।

আমার লাগানো গাছগুলো কয়টা মরে গেল, কোনটায় পানি দেয়া হলো না তার খোঁজ কে রাখে। ভাবখানা এমন, বাঁচতে পারলে বাঁচো, নইলে মরে যাও, বাপ, আমার কী দায় পড়েছে।

তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' বইটা পড়ে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। একজন মানুষের পক্ষে কেমন করে
সম্ভব প্রকৃতি-তার সন্তানদের প্রতি এমন অতীন্দ্রিয় ভালবাসা লালন করা।
অনেকদিন পর আমি আমার লাগানো গাছগুলোর পাশে এসে দাঁড়ালাম। প্রত্যেকটা গাছের গোড়ার মাটি পাথরের মত শক্ত। আমার বুক ভেঙ্গে আসছিল, আহারে, বেচারা, শ্বাস নিতে পারছে না। আমার কী কাতর, কী হাহাকার করা ভঙ্গি।
দারুচিনি গাছটায় কেমন লালচে পাতা মেলেছে। কমলা গাছে ছোট-ছোট কমলা ধরেছে, গাছটা ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। কমলা গাছটার ফুলের কী তীব্র গন্ধ! আমি গাছটাকে বললাম, যাও, আজ থেকে তোমার নাম দিলাম ছফাবৃক্ষ

বিকেলে একজন একমুঠো ফুল এনে আমার কাছে মেলে ধরে বললেন, দেখেন কী ঘ্রাণ! আমি নিমিষেই চিনে ফেললাম, এটা কমলা গাছটার-ছফাবৃক্ষের ফুল। ভ্রুণ-হত্যার মত আমি ওই খুনি মানুষটা দিকে তীব্র আক্রেশে তাকিয়ে রইলাম। কসম আমার লেখালেখির, মানুষটা কাছে আমি বিভিন্ন ভাবে ঋণী না হলে তাকে স্রেফ খুন করে ফেলতাম।

আমি ছুটে গিয়ে কমলা গাছটার কাছে দাঁড়ালাম, বিড়বিড় করে বললাম, ছফাবৃক্ষ, তোমার কাছে আমি নতজানু হয়ে ক্ষমা চাই। তোমার শেকড় মাটিতে, ছফারও। ছফা নামের মানুষটাকে বলো, মনে কষ্ট পুষে না রাখতে।

আমার ওই পোস্টটা দ্বৈতসত্তা-জিনতত্ত্ব, আমার সৃষ্ট জামি চরিত্রটি যখন মৃতপ্রায় কাকের বাচ্চাটাকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে চোখের জলে ভাসতে থাকে। ওইটা তো অন্য কেউ না, আমার ভেতরের শিশুটা। খুনি জামিও কেউ না, আমার ভেতরের পশুটা। ভেতরের শিশু এবং পশুটার হরদম মারামারি লেগেই আছে, ফাঁক পেলেই একজন অন্যজনকে ছাড়িয়ে যায়।

তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' বইটা পড়ে আমার বুকের ভেতর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসছিল, কেন এই মানুষটা নোবেল পাবেন না? কেন, পাবেন না, কেন! কেবল এই একটা বই-ই যথেষ্ঠ ছিল নোবেল কমিটির লোকজনদের প্রভাবিত করার জন্য।
আর্নস্ট হেমিংওয়েকে ১৯৫৪ সালে যখন নোবেল দেয়া হয় তখন নোবেল কমিটি সাহিত্যে তার অবদান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, 'His vigorous art and the influence of his style on the literary art of our times as manifested in his book "The Old Man and the Sea"...'

"The Old Man and the Sea" তাদের অসম্ভব প্রভাবিত করেছিল এটা সহজেই অনুমেয়। আমাদেরকেও প্রভাবিত করে, আমাকেও। যখন মনে হয় হাল ছেড়ে দেই তখন বুড়ো সান্তিয়াগো কোত্থেকে অজানা সাহস নিয়ে আসে।

আমি নোবেল কমিটির প্রতি করুণা বোধ করি, এদের 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' পড়ার সৌভাগ্য হয়নি! কতিপয় বই নামের গ্রন্থ আছে যার কোন অনুবাদ চলে না। 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' এমন একটা গ্রন্থ। এমনিতেও অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক- এ্যাদুত্তোর এ্যাদিতর।

আমাদের দেশটা দরিদ্র। তারচেয়ে দরিদ্র আমরা মননে। তাই ছফার মত মানুষকে অবহেলায় সমাহিত করা হয়। এতে ছফার কিছুই যায় আসে না। তিনি হয়তো তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলতেন, আমি বুদ্ধিজীবীদের ইয়েতে মুতিও না। কিন্তু দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র হয়ে গেল আমরা, শূণ্যমনন! পাতক থেকে মহাপাতক!

আমাদের সমস্ত দান, অদানে-অব্রাক্ষণে। এরশাদের মত কবির কবিতা (যা দিয়ে আমি আমার বাচ্চার গু-ও পরিষ্কার করব না) পৃথিবীর অনেকগুলো ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। ছফার 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' কয়টা ভাষায় অনূদিত হয়েছিল? কেবল বাংলা ভাষায়!
তবে আমি এটাও দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি, 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' অনুবাদ হলেও লাভ হতো না। অন্য ভাষার লোকজন এর দশ ভাগও বুঝত কিনা এতে আমার ঘোর সন্দেহ। ওই যে বললাম, 'এ্যাদুত্তোর এ্যাদিতর'।

হুমায়ুন আজাদের বলেছিলেন, "রবীন্দ্রনাথের পর সম্ভবত এরশাদের লেখাই বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার কবিতা নামের এইসব আবর্জনার প্রশংসা শুরু করলেন কতিপয় দালাল- কবি...।"
এই দালাল কবিদের লেখা দিয়ে ভরে থাকে আমাদের সাহিত্য পাতাগুলো। এরা কী লম্বা লম্বা বাতচিতই না করেন দেশ নিয়ে দেশের মানুষ নিয়ে! এই আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা ওইসব এরশাদের কবিতা নিয়ে কী আহা-উহু না করেছেন। তাদের কীসব অতিশয়োক্তি প্রকাশ, লজ্জায় মাথা কাটা যায়। বেশ্যা তাঁর দেহ বিক্রি করেন ক্ষিধার জ্বালায়, অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী তার বুদ্ধি বিক্রি করেন লোভের জ্বালায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বেশ্যার তেমন পার্থক্য নাই।

এই দেশে একটা ডকুমেন্টরি বানালেও দেখবেন, কত ভাবে দেশকে ছোট করা যায় তার প্রাণান্তকর চেষ্টা। যেন বন্যা, মাদ্রাসা, অভাব এসব ব্যতীত আর দেখাবার কিছু নেই।
প্রবাসে এক বাঙ্গালি মহিলা জুতা কেনবার জন্য এ দোকান-ও দোকান ছুটে বেড়াচ্ছিলেন, ঠিক পছন্দসই জুতাটা চোখে লাগছিল না। তার এই অস্থিরতা দেখে একজন সেলস-গার্ল বলল, 'তোমার সমস্যাটা কী, জুতা নিয়ে তুমি
এত চুজি কেন? তোমাদের দেশের মহিলারা তো জুতাই পায়ে দেয় না'!
আমার ওই সেলস-গার্লকে চাবকাতে ইচ্ছা করে না, এই দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের পশ্চাদদেশে গদাম করে লাথি মারতে সুতীব্র ইচ্ছা জাগে। কারণ, এরা পৃথিবীর কাছে আমাদের দেশটাকে এভাবেই তুলে ধরেন- খালি পায়ের মহিলারা, অপুষ্ট শরীরে ততোধিক অপুষ্ট দু-চারটা শিশুসহ। টাকা কামাবার ধান্দায় এরা পারলে মাকেও বিক্রি করে দেবেন, অবলীলায়।

যেন আমাদের অহংকার করার কোন কোন ঘটনাই নাই। যেন আমাদের ছফা নেই!
আবার এরাই ঘটা করে বলেন, আমাদের দেশে ভাল লেখা কোথায়? তো, পাশের দেশ ভারত থেকে আমদানী করো। ভারতের দেবতা-দাদা-লেখকরা যখন এদেশে এসে দেশউদ্ধার করতেন তখন আমাদের দেশের প্রায় সমস্ত লেখক তাঁদের সামনে মাখনের মত গলে যেতেন; একা ছফাই দাঁড়াতেন মহীরুহ হয়ে। তাঁর সামনে তাসের মত উড়ে যেত মেরুদন্ডহীন বুদ্ধিজীবীরা। অবশ্য আমাদের দেশের এইসব মস্তিষ্ক-পায়ু একাকার হয়ে যাওয়া মানুষদের কাছ থেকে খুব একটা আশা করাটাও বোকামি বৈকি। এমনিতেও এইসব বুদ্ধিজীবী নামের প্রাণীদের বুদ্ধির খেলা দেখলে মনে হয়, অতিদর্পে হতা লঙ্কা! হায় বুদ্ধিজীবী, বেড়ো নাকো ঝড়ে পড়ে যাবে।

*ছবিঋণ:
খান ব্রাদার্সের প্রকাশিত আট খণ্ডে পূর্ণাঙ্গ আহমদ ছফা রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড থেকে নেয়া।

3 comments:

Sadiq Alam said...

Sofa bhai amakeo bhaloi influence koriteche. Kaal rate shesh korlam boita. kintu bikale ja korechi, ja likhechi shobtai ei boier influence e.

Eikhane.

।আলী মাহমেদ। said...
This comment has been removed by the author.
।আলী মাহমেদ। said...

ছবিগুলো দেখলাম। সোন্দর!