Search

Sunday, December 26, 2010

ইউনূস, আমলনামা!

ড. ইউনূসকে নিয়ে এখন কোন লেখা খানিকটা জটিলতার পর্যায়ে চলে যায়। অনেকের আবেগের গোপন জায়গাটি হচ্ছে, বেচারা আমাদের জন্য নোবেল পুরস্কার এনে দিয়েছেন। কথা সত্য। এই অভাগা দেশটিকে এই গ্রহে কে চেনে? চেনে হাভাতের দেশ হিসাবে, চেনে চোর-চোট্টার দেশ হিসাবে; সেখানে একজন ইউনূসের আমাদের একটা নোবেল এনে দেয়াটা তো চাট্টিখানি কথা না।

৭০০ কোটি টাকা স্থানান্তর করায় ড. ইউনূসকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে হইচই হওয়ার পর হৃদয়বান মানুষের পাল্লা ড. ইউনূসের প্রতি ভারী। আহা বেচারা, আহা-আহা। জনপ্রিয় এই গানটি থেকে খানিকটা ধার করে বলি, "...এক-টু সহানুভূতি-ই-ই কি ইউনূস-স-স, পেতে পারে না...ও বন্ধু, আ-আ-আ"?
এমনিতে পূর্বেও ইউনূস সাহেবকে নিয়ে দেশে বিপুল হইচই হয়েছে কিন্তু কেউ গা করেননি কারণ এই বিপুল মানুষদের মধ্যে কোন সাদা চামড়ার মানুষ ছিলেন না, আফসোস। আমাদের তো আবার সাদা চামড়া ব্যতীত নড়াচড়া করতে ইচ্ছা করে না, কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
ওয়েল, এই সব হৃদয়বান মানুষদের বলি, একটা খুন করলেও ড. ইউনূস একজন নোবেল লরিয়েট বলে কি আমাদের বলতে হবে তিনি দায়ে পড়ে খুন করেছেন বা তাঁর করা গুলিটা সফট-নোজের ছিল? নোবেল পেলেই কি তাঁর অপরাধ লঘু হয়ে যাবে?

আজকের আমার এই লেখার বিষয় এটা না কোন মিডিয়া লিখেছে। টাকা নিয়ে তিনি কেমন জাগলিং খেলেছেন সেটাও না।
আমি এক লেখায় [১] জানতে চেয়েছিলাম:

প্রসটিটিউশন-ড্রাগস-আর্মস ব্যতীত কোন ব্যবসা আছে যেখানে ২৪ পার্সেন্ট সুদ দিয়ে এবং ক্রমশ পুঁজি শূন্য করেও বহাল তবিয়তে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, আমি সেই ব্যবসার নাম জানতে চাই। এই প্রশ্নটা ছিল ব্র্যাক ব্যাংক নিয়ে। আর গ্রামীন ব্যাংক তো কয়েক পা এগিয়ে।
"...প্রকৃতপক্ষে গ্রামীন ব্যাংকের সুদ হচ্ছে ৩৮ শতাংশ..."। (সূত্র: খোন্দকার ইব্রাহিম খালিদ, সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক)
এখন আমি জানতে চাই ৩৮ শতাংশ সুদ দিয়েও কোন ব্যবসায় লাভ করা যায়? এটা যদি মেথরগিরিও হয় আমি সানন্দে মেথর হব, আমার লেখালেখির কসম।
এটা আমি ইউনূস সাহেবের কাছে জানতে চাই। তিনি আমাকে এই ভাগ্য বদলাবার দিকনির্দেশনা দিলে আমি এখুনি লেখালেখি ছেড়ে পুরোদস্তুর মেথর হয়ে যাব। ব্যবস্থাটা আজ রাতে হলে আজ রাতেই মেথরগিরি করতে বের হব। সয়্যার অন মাই ব...। 

ইউনূস সাহেবের যে কেবল সুদের হার ৩৮ শতাংশ এমনই না, এখানে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়টি হচ্ছে, গ্রামীন ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পর থেকেই প্রতি সপ্তাহে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হয়।

আপনাকে ছাগল কেনার জন্য ঋণ দিল। পরের সপ্তাহ থেকেই কিন্তু আপনাকে কিস্তি দিতে হবে। ছাগল কেনার পরদিনই কিন্তু ছাগল ডিম পেড়েছে। সেই ডিম বিক্রি করে আপনি কিস্তি দেবেন। বাই-এনি-চান্স, ছাগল ডিম না-দিলে কিন্তু কিস্তি মাফ নেই। তখন আপনার বিচি বিক্রি করে হলেও কিস্তি দিতে হবে। নইলে গ্রামীন ব্যাংকের লোকজনেরা গরু-ছাগল জোর করে নিয়ে আসবে। এরা কৃষকের বাচ্চা মেয়েটার পা থেকে নুপুর পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে! 
(লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস/ শুভ'র ব্লগিং পৃ নং: ২০)

ন্যানো ক্রেডিটের [২] আওতায় কিছু কাজ করার সুবাদে এই নিয়ে খানিকটা ধারণা হয়েছে আমার। আমি এখান থেকে বিচিত্র বিষয় শিখছি। 'ন্যানো ক্রেডিট' দেয়া হয়েছে এমন অনেককে নিয়ে লেখা হয়ে উঠেনি কিন্তু যাদেরকে এই ঋণ দেয়া হয়েছে তাদের অধিকাংশের পক্ষেই ঠিক পরের সপ্তাহ থেকে কিস্তি দেয়া সম্ভব ছিল না ।

এখানে সরল উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করি। যেমন ধরা যাক, এই মহিলার কথা [৩]। ইনি যদি কিস্তি পরিশোধ করেনও তবুও তাঁর পক্ষে মাস শেষ হওয়া ব্যতীত টাকা দেয়া সম্ভব না। তাহলে? এখন আমি যদি খুব চাপাচাপি করি তাহলে যেটা হবে কিস্তি শোধ করার জন্য চড়া সুদে অন্য কারও কাছ থেকে তিনি টাকা নেবেন। যেটা ইউনূস সাহেব এবং তার শিষ্য, অন্য ব্যাংকের বেলায় হচ্ছে।

ইউনূস সাহেবের ঋণ নিয়ে যে ভদ্রমহিলা হাস-মুরগি-ছাগল কিনবেন সেই হাস-মুরগি পরের দিন থেকেই ডিম্ব প্রসব করবে আর ছাগল প্রসব করবে ছাগশিশু। ব্যস, ওই ছাগশিশু ঘন্টায়-ঘন্টায় বাড়বে। বাড়তে হবে, ছাড়াছাড়ি নাই কারণ সপ্তাহ শেষ হওয়ার পূর্বেই এটাকে বাজারে বিক্রি করে টাকা ক্যাশ করতে হবে এবং গ্রামীন ব্যাংকের কিস্তি শোধ দিতে হবে।

কী 'সোন্দর' সিস্টেম! এই গরীব মানুষরা কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে এমন তালগোল পাকায় যে ওই ব্যাংকের অত্যাচার এড়াতে অন্য একটা এনজিও থেকে ঋণ নেয়। এভাবে বেশ-ক'টা এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার পর রাতারাতি টিন-খড়ের ভাড়াবাড়ি ছেড়ে উধাও হয়ে যায়! ছোট-ছোট বাচ্চারাও অভ্যস্থ হয়ে পড়ে একদা রাতে মাথায় করে গাট্টি নিয়ে হাঁটতে হবে...!  

আচ্ছা, কুতর্কে যেতে চাচ্ছি না, যেে তাঁকে নোবেল দিতে গিয়ে কোন কূটচাল চালা হয়েছিল। ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে তিনি নাকি দেশময় শান্তি নিয়ে এসেছেন। শান্তি প্রসঙ্গে পরে আসি। এই যে ক্ষুদ্রঋণের ভাবনা এটা কিন্তু একেবারে মৌলিক কোন ভাবনা না। তাঁর পূর্বেও অনেকে এই ভাবনা ভেবেছেন, এটা নিয়ে কাজ করেছেন। এটা সত্য, ইউনূস এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন মাত্র।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইউনূসের গ্রামীন ব্যাংক এতো জনপ্রিয় হয়েছিল কেন? কারণ একটাই, বাইরে সুদের হার আরও অসহনীয় ছিল! এলাকার এক সূফিকে চিনি যে এক লাখ টাকায় দশ হাজার টাকা সুদ নেয়, মাসে। তা-ও আবারও দেওয়ার সময়ই কেটে রাখে প্রথম মাসে সুদ। অর্থাৎ যে এক লক্ষ টাকা সুদ নেবে সে পাবে নব্বই হাজার টাকা!

তো, এদের ভাষায় গ্রামীন ব্যাংক নাকি ৮০ লক্ষ মানুষকে ঋণ দিয়ে এদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। যাদের অধিকাংশই নারী!

এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, উপকৃত হয়েছে ৮০ লক্ষ পরিবার! নিম্নবিত্তদের আবার বাচ্চাকাচ্চা বেশি, এরা আবার মায়ায় বুড়াবুড়িকেও ফেলে দিতে পারে না, মানে একেকটা পরিবারে কমপক্ষে গড়ে ৬ জন ধরলেও প্রায় ৫ কোটি মানুষ। ওয়াল্লা, একা ইউনূস সাহেবই পাঁচ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে ফেলেছেন! ইয়া রব, ব্র্যাক এবং তাঁর শিষ্য অন্য ব্যাংকগুলো ধরলে দেখা যাবে আমি ব্যতীত সবাই এদের দ্বারা উপকৃত হয়েছেন।

ব্র্যাক থেকে একটা ঋণ আমিও নিয়েছিলুম বটে সেটার ফয়সালা আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছিল; এর গল্প অন্য কোন দিন। এখন দেখছি, সবাই 'চিনিহারাম' কেবল আমিই নিমকহারাম-লবনহারাম'! বেচারা আমি!
এখন এক দফা এক দাবী, ইউনূস সাহেবকে দেশের প্রেসিডেন্ট বানিয়ে আবেদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী এবং সমমনাদেরকে যত দ্রুত সম্ভব মন্ত্রী বানানো হোক। আমি ভাবতেই পারছি না এঁরা না থাকলে দেশের কী হাল হতো!

ইউনূস সাহেব, বেচারা, সবাইকে জুতা পরাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন! আমি ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা নামের লেখায় লিখেছিলাম [৪], আমি বড়ো আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছি ইউনূস আমাদের বাচ্চাদের জন্য এমন জুতা নিয়ে আসবেন যে জুতা পায়ে দিলে ক্ষিধা লাগবে না।

তিনি এডিডাসকে নিয়ে যখন সামাজিক জুতা নিয়ে আসবেন এই জুতায় নিশ্চয়ই চমক একটা থাকবে, থাকবেই। কারণ তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন:

"...আমাদের লক্ষ্য হলো, যারা জুতো পরে না তাদের জুতো পরার সুযোগ দেওয়া। ...গরিব মানুষ যদি সস্তা দামে আরো ভালো জিনিস পায় তাহলে ত সেটাকে স্বাগত জানানো দরকার..."।
বটে রে! ইউনূস সাহেবের কী ধারণা আছে, আমাদের দেশে জুতার দাম কত? একটা স্পঞ্জ স্যান্ডেল বিশ টাকায় পাওয়া যায়। আপুনি (!) ইউনূস সাহেব কি বিশ টাকার কম দামে সামাজিক জুতা দেবেন নাকি কেবল এই আইডিয়াটা আমাদেরকে খাওয়াবেন, আ মীন 'গরিবা জুতা' খাওয়াবেন?

আমার স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, ইউনূস গরীবদের নিয়ে ন্যাকামোটা না-করলে তাঁকে নিয়ে বা তার বিপক্ষে আমি একটা বাক্য দূরের কথা একটা শব্দও ব্যয় করব না। কারণ তখন সেটা হবে শব্দের অপচয়! স্রেফ তিনি গরীবদের নিয়ে আহা-উহু করাটা বন্ধ করবেন, ব্যস, তাঁর কাছে আর কিচ্ছু চাই না। 
তার লোভে চকচক করা চোখে স্পষ্ট করে বলবেন, আমি ব্যবসা করতে এসেছি, ব্যবসা করব, কারও কোন সমস্যা? না, তখন আমরাও বলব, কোন সমস্যা নাই।
ইউনূস নামের মানুষটা কিন্তু সেই পথ মাড়াচ্ছেন না তিনি ২০১০ পর্যন্ত এক পয়সা কর দেননি [৫], এমনকি আগামীতেও গ্রামীন ব্যাংকের জন্য করমুক্তি চেয়েছেন। কারণ তিনি নাকি গরীবদের জন্য সব বিলিয়ে (!) দিচ্ছেন। 

গ্রামীন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তিনি এটার প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই কারণে গ্রামীন ব্যাংক থেকে বেতন-ভাতা নেন। কত নেন এটা অবশ্য আমাদের জানা নেই। আচ্ছা, তিনি কি আমৃত্যু এটা থেকে বেতন-ভাতা নেবেন?

যে মানুষটা গরীবের জন্য করে-করে, বলে-বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন তাঁর কি লজ্জা করে না এই গরীবদের ব্যাংক থেকে বেতন-ভাতা নিতে? এই টাকা থেকে কেনা খাবার তাঁর মুখে রোচে কেমন করে, পেটুক পেটটা এই খাবার ধরে রাখে কেমন করে? ওয়াক, বমি আসে না বলছেন, আপনি ইউনূস।
এমন না তাঁর দিন আনি দিন খাই টাইপের অবস্থা। ভাল কথা, আপনি ক-দিন পরপর হিল্লি-দিল্লি বক্তৃতা দিয়ে বৈদেশিদের কাছ থেকে যে ইউরো-ডলার আয় করেন তা কি দান করে দেন?

এটা আমার নিজস্ব মত। আমি মনে করি, ড. ইউনূস নামের এই মানুষটার মধ্যে গোলমাল লুকিয়ে আছে, এঁর পেটভরা ঝামেলা! সততার খোলসে অসৎ একজন মানুষ। এমন মানুষ নোবেল পেলেই তাঁকে নিয়ে কোলে করে ঘুরতে হবে এমনটা অন্তত আমি মনে করি না।
আমার স্পষ্ট বক্তব্য, মুখে গরীব-গরীব করলে ঋণ দিতে হবে বিনা সুদে (আমাদের এই কুৎসিত সময়ে [৬] বিনা সুদেই একজনের দারিদ্র হটানো অসম্ভব সেখানে ৩৭ পার্সেন্ট সুদ!) নইলে ভানবাজি, লম্বা-লম্বা বাতচিত বন্ধ। আপনি ইউনূস হোন বা ফজলে আবেদ, ঠোঁট একেবারে সেলাই করে রাখুন। খবরদার, ভুলেও দারিদ্র বিমোচন, এই সব বা...ছাল উচ্চারণ করবেন না। বললে আমরাও:

সাদাকে সাদা বলিব, কালো না
ইউনূস-আবেদকে সুদখোর বলিব, ভাল না...।

*লেখাটা যখন শুরু করেছিলাম এরিমধ্যে এক কান্ড হয়েছে। আমাদের ইশকুল, তিন [৭] এটা যেখানে অবস্থিত এই বিল্ডিংটা রেলওয়ের হলেও মূলত উদীচীর অফিস।

যখন এই স্কুলটা শুরু করি তখন কোন জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না বলে উদীচীর লোকজনকে ধরাধরি করে এই জায়গাটা নিতে হয়েছিল। এরা আমাদেরকে বিনে ভাড়ায় স্কুল চালাবার জন্য বিল্ডিংটা দিয়েছিলেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কিন্তু...।
আজ দেখছি এই বিল্ডিং-এর গায়ে এই পোস্টার সাঁটানো। ছোট-ছোট বাচ্চারা বানান করে-করে পড়ছে।
অনুমান করি, এমন হাজার-হাজার পোস্টার ছাপিয়ে দিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, বিনে পয়সায়। কেমন করে এই সব দানবরা সমস্ত কিছু গ্রাস করে ফেলে তার নমুনা দেখে আমি শিউরে উঠি।

সহায়ক সূত্র:
১. পদক...: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html
২. ন্যানো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/39dkbhh 
৩. আনোয়ারা বেগম: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_9184.html  
৪. ওই আসে মহাপুরুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_04.html 
৫. মামা বাড়ির আবদার: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_12.html 
৬. কুৎসিত সময়: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_06.html
৭. আমাদের ইশকুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3      

Thursday, December 23, 2010

একজন আনোয়ারা বেগম...

এই মানুষটার নাম আনোয়ারা বেগম। এই মহিলাকে দেখতাম একটা এনামেল ফ্যাক্টরিতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে। দূর থেকে দেখে কেবল মনে হতো, যাক, মহিলা মানুষ একটা কাজ-টাজ করে খাচ্ছে, ভালই তো। এমনিতে হাসিখুশি একজন মানুষ! কখনও কারও প্রতি অভিযোগ জানাতে দেখিনি। এই মানুষটার এই হাসি-হাসি মুখের পেছনের বেদনাটুকু টের পেতে অনেক সময় লাগল।

একটা ফার্মেসির মালিকের কাছ থেকে যেটা জানা গেল, যে কারখানায় তিনি কাজ করেন এখানে বেতন হলো এক হাজার টাকা। একজনের কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা সুদে নিয়েছেন। প্রতি মাসে সুদ দিতে হয় পাঁচ শ টাকা। সাড়ে তিন হাজার টাকায় পাঁচ শ! ইউনূস সাহেবরা কেন এতো সফল এটা এখন বুঝতে পারি।
আমি অবাক হই, এই এক হাজার টাকা থেকে পাঁচ শ টাকা দিয়ে দিলে ইনার চলে কেমন করে? ইনি নাকি সন্ধ্যায় পিঠা বিক্রি করে কায়ক্লেশে জীবন-যাপন করেন।

আমি আনোয়ারা বেগমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আপনি এতো চড়া সুদে টাকা ধার নিয়েছিলেন কেন? নিমিষেই মানুষটার মুখের হাসি উধাও হয়। মাথার যন্ত্রণার জন্য পুরো টাকাটাই গেছে চিকিৎসার পেছনে। এর জন্য আমরাই দায়ী। একটা উপজেলা হাসপাতালে কী চিকিৎসা হয়! ছাতাফাতা ঘোড়ার ডিম! বিশেষজ্ঞ কোন ডাক্তার দূরের কথা প্রয়োজনীয় ডাক্তারেরই বালাই নাই। না আছে এক্স রে মেশিন, না আছে প্যাথলজি- আছে কেবল কিছু মানুষদের সীমাহীন লোভ এবং তাঁদের চেলা চামুন্ডাদের লকলকে জীব।

যাগ গে, এর বেশি জেনে আমার কাজ নেই। আমার এখন যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, ন্যানো ক্রেডিটের [১] আওতায় সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে এই মানুষটাকে সুদখোরের হাত থেকে রক্ষা করা। একজন মানুষকে হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম যিনি এই টাকাটা আনোয়ারা বেগমকে ধার দেবেন। আনোয়ারা বেগম তাঁর সাধ্যমত মাসে মাসে টাকাটা পরিশোধ করবেন।

সহায়ক সূত্র:
১. ন্যানো ক্রেডিট:
http://tinyurl.com/39dkbhh 

Wednesday, December 22, 2010

ঘরের ছাওয়াল ঘরে ফিরে গেছে

নামহীন। অজ্ঞাত। হাত-পা ছড়িয়ে থাকা একে যখন আমি পাই [১], এই মানুষটাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল 'অজ্ঞাত' নামেই। হাসপাতালের মেমোতে নামের জায়গায় লেখা ছিল, অজ্ঞাত।
কী কান্ড! আজ যখন এ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাচ্ছে অজ্ঞাতের জায়গায় লেখা আছে 'ফরিদ'। বাহ, কী অনায়াসেই না একজন অজ্ঞাত থেকে ফরিদ হয়ে যায়!
ফরিদ যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিল একে যতবার দেখতে গেছি ততবারই হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে থাকা এই ভদ্রমহিলাকে আমি অনুরোধ করে এসেছিলাম, ফরিদের প্রতি খেয়াল রাখার জন্য। হাসপাতাল থেকে ফরিদকে যখন নিয়ে আসছিলাম তখন এই মানুষটা ফরিদের জন্য অহেতুক চোখের জল ফেলছিলেন। তাঁর নাকি মায়া পড়ে গেছে। হায় মায়া!
কালই হাসপাতালের লোকজন চাচ্ছিল ফরিদকে ছেড়ে দিতে কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমার মনে হচ্ছিল এর অন্তত আরও একটা দিন পর্যবেক্ষণে থাকা প্রয়োজন। আপাতত ফরিদের চিকিৎসা করার কিছু নেই কিন্তু অনুমান করি, তার এই ঘোর কাটতে বেশ কিছু দিন সময় লাগবে। এখনও এর চোখের দৃষ্টি ভাবলেশহীন! বাসায় কারা কারা আছে জানতে চাইলে ফরিদের কাছ থেকে জানা যায়, বাবা নেই, মা আছেন, তিন ভাই চার বোন।
এর বাড়ি নেত্রকোনা এখন থাকে টঙ্গি, যাচ্ছিল সিলেট। রাস্তায় মুড়ি খাওয়ার পর থেকেই অজ্ঞান। সেই জ্ঞান ফিরেছে ঝাড়া ৪৮ ঘন্টা পর! এর যে শরীর সিলেটে পাঠানোর প্রশ্নই উঠে না, একে টঙ্গি ফিরে যেতে বলি। যে ট্রেনে একে তুলে দিচ্ছি সেই ট্রেনে পরিচিত একজন যাচ্ছেন বলে সাথে যাওয়ার হ্যাপা থাকছে না বলে আমার চেপে রাখা শ্বাসটা ফেলতে খানিকটা সুবিধা হয়।
ট্রেনে ফরিদকে তুলে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। যাক বাবা, বাঁচা গেল। অবশ্যই এটা মনে মনে বলি, লোকজন শুনে ফেললে সর্বনাশ! কে চায় তার মুখোশ আলগা করতে!
হাসপাতালের লোকজনরা পারলে কালই একে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়। ফরিদের জন্য এদের সঙ্গে আমার দুবার কথা কাটাকাটি হয়েছে। বেচারা ফরিদ, নিজের পক্ষে লোকজন টানতে পারেনি, আসলে এই সব আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে! এর বাইরেও আমার নির্বুদ্ধিতা নিয়ে জনে জনে জবাবদিহি করতে হয়েছে। ভাল লাগছে না এই প্রসঙ্গ নিয়ে বিশদ কথা বলতে।

ফরিদকে আমার ফোন নাম্বার দিয়ে বলে দিয়েছিলাম, পৌঁছে আমাকে যেন একটা ফোন করে জানিয়ে দেয়। দুপুরে যখন ফোনটা এলো, 'আমি বাড়িত পৌছা গেছি'। নিমিষেই আমার চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে যায়...

সহায়ক লিংক:
১. ফরিদ...: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_20.html 

Tuesday, December 21, 2010

মুক্তিযোদ্ধাদের খিচুড়িও যখন একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য!

অনেক আগে একটা লেখা লিখেছিলাম, 'মুক্তিযুদ্ধের আবেগও একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য' [১], ওই লেখাটার মূল সুর অনেকে ধরতে পারেননি। বিশেষ করে নব্য মুক্তিযোদ্ধাদের আহত হওয়ার কথা। নব্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সমস্যার অন্ত নেই- 'ম' শব্দটা পর্যন্ত এরা নিজেদের পকেটে ভরে রেখেছেন।

যাই হোক, ক-দিন আগে টিভি অন করতেই চ্যানেল আইয়ের রান্নার অনুষ্ঠান। যথারীতি এই গ্রহের দুর্ধর্ষ রান্না বিশারদ কেকা ফেরদৌসি রান্না করে দেখাচ্ছিলেন। ইনি কবি নজরুলের কোন এক বার্ষিকীতে 'শাহী কাজী মাটন' রেসিপি নামিয়ে ফেলেন। ইনি 'স্বাস্থ্য সচেতন রান্না'-এর বই লিখে Gourmand world cook book-এ নাম লেখান। স্বাস্থ্য সচেতন? এটা অবশ্য এই ভদ্রমহিলাকে দেখলেই আঁচ করা যায়!
আগেও দেখেছি এই ভদ্রমহিলা হর্সমাউথ, অনবরত বকে যান; কাউকে বলার সুযোগ দেন না।
এতে অবশ্য কোন সমস্যা দেখি না কারণ এই পারিবারিক চ্যানেলে এক ভাই হাস্কি ভয়েসে গাঁক গাঁক করবেন। বোনের রান্নার অনুষ্ঠান লন্ডন প্যারিসে নিয়ে গিয়ে দেখানো হবে এ নিয়ে আমরা বলার কে! মার মুক্তিযুদ্ধের নাটক দেখানো হবে, যেটায় থাকবে আরোপিত কিছু সংলাপ। কৃষকের ছোট্ট মেয়ে বলছে, 'বাজান আসার সময় বাজার থিক্যা ইন্দুর মারার বিষ নিয়া আইসো। পাকিস্তানি আইলে জান দিমু কিন্তু ইজ্জত দিমু না'।
কোথাও কোন সমস্যা নেই কিন্তু যখন দেখলাম কেকা ফেরদৌসি বলছেন, আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, আমার স্বামীও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তখন আমি খানিকটা নড়েচড়ে বসি, ঘটনা কী!
ঘটনা কি তা আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হয়।

কেকা ফেরদৌসি এদিন খিচুড়ি রান্না করছিলেন। খিচুড়ি ভাল জিনিস, বর্ষা নেই বলে শীতে খিচুড়ি খাওয়া যাবে না এমন কোন দিব্যি কেউ দেয়নি। তবে এই খিচুড়িটা খানিকটা অন্য রকম, খিচুড়ির সঙ্গে এখানে ব্যবসা মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানটা হচ্ছে 'সজীব খিচুড়ি' নিয়ে। সজীব নামের একটা কোম্পানির 'সজীব রেডি মিক্স ঝটপট রান্না'।
হর্স মাউথের চিঁহি হি রব থেমে নেই! কেকা ফেরদৌসি এবার গোপন তাসটা বের করলেন। তিনি বলে যাচ্ছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা খিচুড়ি খেতেন, মুক্তিযোদ্ধারা কেমন করে খিচুড়ি খেতেন, কি কি ধরনের খিচুড়ি খেতেন। পাতলা, না ঘন? এই নিয়ে অনবরত বকে যাচ্ছেন। পাশাপাশি চলছে সজীব খিচুড়ি নিয়ে খুন্তি নাড়াচাড়া। যথারীতি কেকা ফেরদৌসির মুখ নাড়ানাড়ি।

এখন আমি অপেক্ষায় আছি। মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সাগর সাহেবরা অচিরেই আরও নতুন নতুন খেলা আবিষ্কার করবেন। কে জানে একদিন দেখব ফাইভ স্টার কোন এক হোটেলে (এটা এঁদের জন্য কোন বিষয় না [২], মতিউর রহমান চৌধুরীরা এমন অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য যে মুখিয়ে থাকেন) লালমুখো বাঁদরদের সম্মানে কাঠের ডামি বন্দুক হাতে কোন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এনে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা দেখাবেন। 'লালুয়ারা' শিষ বাজিয়ে বলবে, "ওয়াও, হোয়াড আ মাক্টিডুড্ডা"!

সহায়ক সূত্র:
১. পণ্য...: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_07.html
২. পুরস্কার...: http://202.79.16.19/index.php?option=com_content&task=view&id=14782&Itemid=39               

Monday, December 20, 2010

মাস্টার শিশু এবং মিস্টার পশু!

আমি আগেও কোথাও লিখেছিলাম, আমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, পাশাপাশি, একটা শিশু এবং একটা পশু; এদের মধ্যে মারামারি লেগেই আছে, হরদম। কখন কে জেতে এটা আগাম বলা মুশকিল'।
এরা যে কেবল লুকিয়ে থাকে, সবিরাম মারামারি চালিয়ে যায় এমন না; পাশাপাশি বসবাস করলেও একজনের আছে অন্যজনের প্রতি সীমাহীন ঘৃণা! যুদ্ধটা অসম। মাস্টার শিশুর হাতে গুলতি, মিস্টার পশুর আছে মারণাস্ত্র লেজার গান। তবুও মাস্টার শিশুর লড়াই চালিয়ে যেতে অনীহা নেই।

এই মানুষটাকে সকালে স্টেশনে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যাই এই আশায় কেউ-না-কেউ এর সমস্যাটা দেখবে নিশ্চয়ই। আহা, আমার ভেতরের মিস্টার পশু তার অস্ত্রটা ঠিক তাক করে রেখেছে যে!
আমি যখন ফিরে আসছি তখনও এই মানুষটাকে দেখি একই ভঙ্গিতে, নিশ্চল। আজকাল তেমন অবাক হই না তবুও একটা ধাক্কার মত খেলাম, একটা মানুষ পড়ে আছে শত-শত মানুষ এখান দিয়ে যাচ্ছে, এই নিয়ে কারও কোন বিকার নেই। স্টেশন কর্তৃপক্ষ এমনকি মিডিয়ার লোকজনেরও। এটা কি পত্রিকায় আসার মত কোন খবর না? এই মানুষটার জন্য অপেক্ষায় আছে এমন কোন মানুষ এই গ্রহে নাই? আমাদের দেশে একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া কত্তো সোজা। মরে গেলে অজ্ঞাত হিসাবে [১] মাটি চাপা দিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে গেল।
আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করেও কোন সুরাহা হলো না, এ কখন থেকে এখানে পড়ে আছে এটাও কেউ জানে না। এদের ঠোঁট উল্টানো সাফ জবাব, 'নেশা-টেশা কইরা পইড়া আছে'। কিন্তু কাছ থেকে দেখে আমার মনে হলো সমস্যা অন্যত্র। এর শরীরের বেশ কিছু স্থানে চামড়া ছড়ে গেছে, রক্ত জমাট বেঁধে আছে। অনুমান করি, কেউ কিছু খাইয়ে টাকা-পয়সা সব লুটে নিয়েছে।

মনে মনে আমি নিজের উপর অনেকখানি বিরক্ত, কী যন্ত্রণা! আমার যে এখন হাবিজাবি দুনিয়ার কাজ, একে নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কোথায়? লম্বা লম্বা পা ফেলে এখান থেকে চলে গেলে বেশ হয়। অন্যরা যেমন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে, দেখা শেষ হলে সটকে পড়ছে এমনটা করলে আমাকে আটকায় কোন শালা!
ওদিকে তুমুল মারপিট। মাস্টার শিশুটা কি কি করেছে, কোন প্যাচ খেলেছে আমি জানি না কিন্তু মিস্টার পশু উবু হয়ে মাটি পড়ে আছে। অবশ্য এটা ক্ষণিকের জন্য। মিস্টার পশু অবিলম্বে উঠে দাঁড়াবে এতে কোন সন্দেহ নেই। দাঁড়াবার আগেই কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। আমি একজনের সঙ্গে কথা বললে ওই মানুষটা ভাল একটা বুদ্ধি দেন, 'অন্য কেউ হাত দেবে না। এটা জিআরপি কেস। এক কাজ করেন, একজন জিআরপিকে সঙ্গে নিয়ে যান। ও দেখুক, সমস্যাটা কি'।

হাঁটতে হাঁটতে জিআরপি নামের মানুষটাকে আমি পটাতে থাকি, 'একটু দেখেন না কি করা যায়। এমন অবস্থা তো আপনার আমারও হতে পারে, পারে না? আপনার এই পোশাক খুলে ফেললে আপনাকে কে চিনবে। ধরেন, আপনি নোয়াখালি স্টেশনে পড়ে আছেন জিআরপি অফিসের সাথেই...হতে পারে না এমন'? জিআরপি মানুষটা মাথা ঝাঁকান, 'আলবত, হতে পারে'।
হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা মানুষটাকে তিনি দেখে নিশ্চিত হন, একে কেউ কিছু খাইয়ে দিয়েছে। দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো আবশ্যক। 
এরিমধ্যে তিনি দুঃখের কাহিনীও বলেন। 'দেখেন, আমরা কাজ কিভাবে করব। এই যে হাসপাতালে পাঠাব, পাঠাতে যে খরচ এটা তো আর সরকার দেবে না। আপনিই বলেন'।
আমি হড়বড় করে বলি, 'আপনি হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন। যা খরচ লাগে... আমি এর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি'।

যাই হোক, এই ব্যবস্থা করে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। পরে এই খোঁজও পাই একটা ভ্যান দিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এই সময়টা পশুদের, পশুরাজত্ব। আমিও তো এই সময়ের একটা অংশ। আমার ভেতরের পশুটা বসে থাকবে বুঝি! হাসপাতালে গিয়ে আর খোঁজ নেয়া হয় না। এদিকে সারাটা দিনের কাজে-অকাজে আমার সূর্যটা উধাও।
অনেকে সূর্য ডুবলে বোতল-টোতল নিয়ে বসে যান, আবোল-তাবোল বকেন। আমিও বোতল টাইপের একটা জিনিস নিয়ে বসে যাই। চোখের সামনে নয় ইঞ্চি মনিটর- আবোল তাবোল লিখে যাই। এই সময়ে কেউ ফোন করলে পারতপক্ষে আমি ধরি না, এমনকি খেতে ডাকলেও আমি বিরক্ত হই। ছাতাফাতা লেখালেখি নামের আমার হাবিজাবি কর্মকান্ডের সুর কেটে যায় যে!
আজও একই রুটিন। কিন্তু মাস্টার শিশু কি চাল দেয় আমি জানি না, বিস্মিত আমি নিজেকে আবিষ্কার করি হাসপাতালে। মানুষটার এখনও জ্ঞান ফেরেনি। হাসপাতালের চিকিৎসা চলছে। অন্যভাবে খোঁজ নিয়ে যেটা জেনেছি, যথার্থ ওষুধপত্রও দেয়া হয়েছে। পুরোপুরি জ্ঞান ফিরতে সম্ভবত দু-দিন লাগবে। আপাতত আমার কিছু করার নাই।

দায়িত্বে থাকা লোকজনকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছে, এ সুস্থ হলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যে কারণ এর বাড়িতে ফেরার সময় টাকা-পয়সার প্রয়োজন হবে।
এটা বোঝার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হওয়ার  প্রয়োজন নেই, এই মানুষটার নিশ্চয়ই একটা ছাদ আছে, সেই ছাদের নীচে পরিবার নামের কিছু লোকজন এর অপেক্ষায় আছেন। কে জানে, হয়তো এই মানুষটাই ওই পরিবার নামের বেশ কিছু লোকজনের একমাত্র ভরসাস্থল। বিস্তারিত মানুষটার জ্ঞান ফিরলে, সুস্থ হলে জানা যাবে।

এই যে ফোন নাম্বার দেয়া হলো আমার সঙ্গে পরে যোগাযোগ করার জন্য, এর মানে হচ্ছে বাড়তি ঝামেলা। ফোন করলে আমাকে এই নিয়ে..। আসলে হাসপাতালে ফোন নাম্বার আমি দেইনি। এটা মাস্টার শিশুর কাজ। এই হারামজাদা বড়ো বিরক্ত করে। রাস্কেলটাকে খুঁজছি, পেলে এক থাপ্পড়ে এর কানপট্টি ফাটিয়ে ফেলব। শ্লা, বড়ো যন্ত্রণা করে...।

সহায়ক সূত্র:
১. অজ্ঞাত...: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_22.html        

Saturday, December 18, 2010

পার্থক্য কেবল একটা হ্রস্ব উ-কারের

গরু এবং গুরুর মধ্যে পার্থক্য কি এর উত্তর দেয়াটা আমার পক্ষে অনেকখানি কঠিন। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা হতো গরু এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য কি তাহলে ধার করা কথা চট করে বলতে পারতাম, মানুষ তার অর্জিত জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারে, গরু পারে না।
এমনিতে গরু এবং গুরুর মধ্যে পাথর্ক্য কেবল একটা হ্রস্ব উ-কারের। কিন্তু গুরু যখন গরু হতে আগ্রহ প্রকাশ করে তখন মনটা বিষণ্ণতায় ছেয়ে যায়।

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA
মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের এটা অসাধারণ একটা গান, পৃথিবী। এই ব্যান্ডের মূল চালিকাশক্তি গৌতম চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৯ সালে মারা যান। এমনিতে এই ব্যান্ডের নাম নেয়া হয়েছিল জীবনানন্দ দাসের 'মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্না প্রান্তরে', এখান থেকে। অবশ্য প্রথমে এই ব্যান্ডের নাম ছিল সপ্তর্ষি পরে তীরন্দাজ ...একেবারে শেষে মহীনের ঘোড়াগুলি।


মহীনের ঘোড়াগুলির 'পৃথিবী' গানটা জেমস গেয়েছেন বলিউডের হিন্দি একটা মুভিতে। অবিকল একই সুরে। হাওয়ায় যেমন মেঘ ভেসে আসে তেমনি কাটা কাটা এমন কথাও ভেসে আসে, প্রীতম এই গানটার জন্য অনুমতি নিয়েছিলেন। হাওয়ায় যেমন মেঘ ভেসে যায় তেমনি এর পক্ষে কঠিন প্রমাণের অভাবে এই বক্তব্যও উড়ে যায়।
গৌতম মরে গেছেন, তাঁর লোকজনরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে; কে এই অনুমতি দিয়েছে সেটা আলোচনার বিষয়। তাছাড়া এই গানের জন্য যথার্থ টাকা, স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে কিনা সেটাও পরিষ্কার জানা নেই। কোন একটা সৃষ্টির জন্য কেবল টাকা শোধ করাটাই জরুরি না, তারচেয়েও জরুরি হচ্ছে সম্মান-স্বীকৃতি দেয়া। প্রমাণ-অপ্রমাণ আপাতত থাকুক এটা এই লেখার মূল উপজীব্য না। বোম্বাইয়াদের উপর তেমন দাবীর জোর নাই কিন্তু আমাদের জেমস?

জেমসের তো জানার কথা এই গানটার পুরো কৃতিত্ব মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের। আমার জানামতে জেমস কোন অনুষ্ঠানে এই অবদানের কথা ফলাও করে তুলে ধরা দূরের কথা স্বীকৃতি দেয়ার ক্লেশও স্বীকার করেননি! অথচ গুরু জেমস এই গানটি আমাদের দেশে স্টেজ শোতে গাওয়ার জন্য আলাদা টাকা দাবী করেন। বোম্বাইয়ারা না জানুক গুরু জেমসের তো না-জানার কথা না এই গানের কথা, সুর সমস্ত কিছুই মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের। গুরুর চিন্তার এই সংকোচ কেন? কি হতো তিনি এই গানের দিকপালকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে।

এখন লোকজন কি বলে? 'পৃথিবী' গানটা শুনে ফট করে বলে বসে, আরে, এটা অমুক হিন্দি গানের নকল না? কী অন্যায়‍! হিন্দির আগ্রাসন এখন এতোটাই প্রবল আমাদের ভাবনা-টাবনা সব কিছু ছেয়ে ফেলছে। শাহরুখ খানরা আমাদের শিখিয়ে যান [১] বদলে দেন আমাদের মিডিয়ার ভাষাও। সেখানে কোন বাংলা গান থেকে ধার হিন্দি গান হবে এটা মেনে নেয়ার জন্য আমাদের দুর্বল মস্তিষ্ক প্রস্তুত না। বাংলায় কথা বলা একজন হিসাবে জেমসের উচিত ছিল কোথাও সুযোগ পেলেই এটা ফলাও করে বলা। আমার এই লেখার মূল সুর জেমসের এই গানটা গাওয়া নিয়ে আপত্তি না; জেমস আমাদেরকে এটা জানাননি, জানাবার তেমন চেষ্টা করেননি এটা নিয়ে।

গলায় গামছা ঝুলিয়ে দেশ উদ্ধারে অতি ব্যস্ততার কারণে জেমস বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করার প্রয়োজন বোধ করেননি নাকি চোখ বন্ধ ছিল বলে গুরু এবং গরুর পার্থক্যটা আলাদা করার সুযোগ হয়নি? আহা, পার্থক্যটা যে কেবল একটা হ্রস্ব উ-কারের!

সহায়ক সূত্র:
১. শাহরুখ: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_11.html

Thursday, December 16, 2010

আমার এক অন্য রকম বিজয় দিবস।

এবারের বিজয় দিবসটা আমার জন্য অনেক অনেকখানি অন্য রকম! গতবার [১] যখন 'আখাউড়া মুক্ত দিবস' নিয়ে অনুষ্ঠানটা করি তখন খানিকটা মন খারাপ ছিল কারণ তিনটা স্কুলের [২] মধ্যে একটা স্কুল বাদ পড়েছিল। এবার আগে থেকেই মন স্থির করে রেখেছিলাম বিজয় দিবস উপলক্ষে ওই স্কুলটাকেও এখানে নিয়ে আসা হবে।
এর মধ্যে একজন দিলেন আবার আরেক পোকা মাথায় ঢুকিয়ে, বাচ্চাদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকদেরও নিয়ে আসার জন্য। এই প্রস্তাবটা আমার মনে ধরল। এটা একটা চমৎকার কাজ হবে কারণ আমি নিশ্চিত এই বাচ্চারা যেমন এমন অনুষ্ঠানে পূর্বে কখনও যায়নি তেমনি এদের অভিভাবকরাও।

সকাল ১০টায় যথা সময়ে শুরু হয়ে গেল অনুষ্ঠান। ঠিক সময়ে চলে এসেছেন প্রধান অতিথি নৌ কমান্ডো ফজলুল হক ভূঁইয়া [৩]। আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এই কারণে তিনি অন্য আমন্ত্রণ ফেলে এখানে চলে এসেছেন, এই অনুষ্ঠানে।

এবারও আঁকার বিষয় ছিল বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিস্তম্ভের ছবিটা। আমি বারবার এটা বলে যেটা এদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি সেটা হচ্ছে, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর একজন এখানে। এরা যেন গর্বের সঙ্গে এটা বলতে পারে। আজ যোগ দিয়েছে এদের সঙ্গে এদের কিছু অভিভাবক। অবশ্য অভিভাবকের উপস্থিতি বাচ্চাদের তুলনায় অনেক কম। এতে আমি খুব একটা অবাক হইনি কারণ এই সব খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে অনেক কিছুই অর্থহীন মনে হয়।

কিন্তু আমি এটাও নিশ্চিত, যারা আসেননি তাঁরা খানিকটা আফসোস করবেন। কেন?

হা হা হা, বাচ্চাদের বিভিন্ন পুরস্কারের পাশাপাশি
অভিবাবকদের জন্যও বেশ কিছু উপহার ছিল, তাছাড়া বাচ্চাদের পাশাপাশি অভিভাবকদের উল্লাসেরও কমতি ছিল না। অনুষ্ঠানে দেখলাম এরা বাচ্চাদের চেয়ে কম উপভোগ করেননি। বুকে হাত দিয়ে বলি, সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি আমি নিজে।
যাই হোক, পরবর্তীতে এটা আশা করতে দোষ কি অভিভাবকদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়বে...।
সহায়ক সূত্র:
১. মুক্ত দিবস...: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_06.html
২. আমাদের ইশকুল...: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_07.html
৩. নৌ কমান্ডো...: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_22.html     

Tuesday, December 14, 2010

নিধন: আনোয়ার পাশা, রাশীদুল হাসান

একসাথে আজীবন থাকতে চেয়েছিলেন। দু'জনই পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় একসাথেই চলেও এসেছিলেন। একজন চাকুরি নিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে, অপরজন ইংরাজি বিভাগে। তাঁরা হলেন অধ্যাপক আনোয়ার পাশা এবং অধ্যাপক রাশীদুল পাশা।
যুদ্ধের সময় রাশীদুল হাসান নিজের বাসা ছেড়ে বন্ধু আনোয়ার পাশার বাসায় চলে আসেন। দু'বন্ধু এক সাথে থাকলে বুকে আশা থাকে, সাহস থাকে।

১৪ ডিসেম্বর। সকাল সাতটায় আনোয়ার পাশার ঘুম ভেঙ্গেছে। গড়িমসি করে বিছানা ছেড়েছেন আরও পরে। তারপর দু'বন্ধু মিলে ন'টার দিকে নাস্তা করেছেন, রেডিও শুনেছেন। নটার খানিক পরে আনোয়ার পাশার স্ত্রী পেছনের বারান্দা দিয়ে দেখলেন একটি লাল গাড়ি এসে থামল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার চত্ত্বরে। কয়েকজন রাজাকার নামল।
আনোয়ার পাশা এরই মধ্যে স্ত্রীর সাথে দু'একটা খুচরো সাংসারিক আলাপ সেরেছেন। রাশীদুল হাসানের সাথে গল্পে বসার আগে হাসতে হাসতে স্ত্রীকে বললেন, 'কাসুটা উঠুক, তারপর তোমার জন্য ভাল করে বাজার-টাজার করে দেব'।
রাশীদুল হাসানের স্ত্রী তখন সংসারের অন্যান্য কাজে ব্যস্ত।

কিছুক্ষণ পর দরজায় শব্দ। দরজা খুললেন আনোয়ার পাশার ছোট ভাই। তারা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে। আনোয়ার পাশা এবং রাশীদুল হাসান তখন ড্রইংরুমে। একজন আনোয়ার পাশাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, 'আপনার নাম আনোয়ার পাশা'?
'হ্যাঁ'।
'আপনি বাইরে আসুন'।
এমন সময় তাদের চোখ পড়ল রাশীদুল হাসানের দিকে। তারা জিজ্ঞেস করল, 'আপনার নাম'?
'রাশীদুল হাসান'।
'আপনিও চলুন'।
সেই সময় রাশীদুল হাসানের স্ত্রী এসে দরজার মুখে দাঁড়ালেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি পাথর হয়ে গেলেন। আনোয়ার পাশা এবং রাশীদুল হাসান তাকিয়ে আছেন। চোখ ভেজা। ...একসময় আলবদরদের সঙ্গে পা বাড়ালেন। আনোয়ার পাশার স্ত্রী জানালা দিয়ে শুধু দেখলেন তাঁদের গায়ের চাদরে তাঁদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
(সেই শেষ যাওয়া। এই দু-জন মানুষ একসাথে আজীবন থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একসাথে মৃত্যুও চেয়েছিলেন কিনা এটা কখনও জানা হবে না...।)

*১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত।
ঋণ: বিচিত্রা, ১৯৭৩/ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অষ্টম খন্ড 

সহায়ক সূত্র:
১. নিধন: http://tinyurl.com/37urdrg 

Sunday, December 12, 2010

তথাকথিত পাগলের ডাক্তার

এই স্বাস্থ্য পত্রিকাটি দেখে আমি যারপর নাই মুগ্ধ! দেখেই মুগ্ধ, আপাতত পড়তে চাচ্ছি না। সমস্যা অন্যখানে, মুগ্ধতা চুইয়ে দেশে অকাল বন্য হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে আপাতত পড়ার আগ্রহ দমিয়ে রেখেছি।
এদের বক্তব্য হচ্ছে, এটা নাকি বাংলা ভাষায় প্রথম মানসিক স্বাস্থ্য পত্রিকা! ভাল! এই বিষয়ে যারা দ্বিতীয় তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছেন তারা আমার চেয়ে ভাল বলতে পারবেন।
পত্রিকার প্রচ্ছদে যে রোগীর ছবি ছাপা হয়েছে তিনি কি দন্ত রোগী নাকি মৃগীরোগী? চর্মরোগী বা আলঝেইমারসের রোগীও হতে পারেন। ওনার কি এনজিওগ্রাম করা হবে নাকি আনপ্ল্যান্ড প্রেগনেন্সির কোন চক্কর আছে? এই পত্রিকার সম্পাদক 'পরফেসর' ফিরোজ সাহেব এটা ভাল বলতে পারবেন কোন রোগে আক্রান্ত এই রোগীর মুখাবয়ব এখানে?

ওহো, বলতে ভুলে গেছি এই স্বাস্থ্য পত্রিকাটির সম্পাদক হচ্ছেন অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ। পত্রিকাটির তথ্য মতে, বাংলাদেশ সরকার নাকি এই 'পরফেসর' সাহেবকে এই পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে অনুমোদন দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার যে 'মনোজগত' নামের এমন একটা পত্রিকা চালায় আবার সরকার সেই পত্রিকার সম্পাদককে মনোয়নও দেয় এটাই কী আর আমি জানতাম ছাই! বয়স বাড়ছে, মেঘে মেঘে বেলা বয়ে যায়। বুকের গহীন থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসে, কত অজানা রে...। পরফেসর ফিরোজ সাহেবদের মত কর্মবীরদের কথা না-জেনে মরে যাওয়াটা কোন কাজের কাজ না। 
এই সংখ্যায় প্রচ্ছদ রচনার নামে একটি লেখা লিখেছেন একজন। তিনি হচ্ছেন, মানসিক রোগ শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় পথিকৃৎ বাংলাদেশের বিশিষ্ট মনোশিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, মনোসাহিত্যিক ও মনোচিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ। আবার তিনি এই পত্রিকার সম্পাদকও! নিজের সম্পাদিত পত্রিকায় নিজেই লিখছেন, টাইটেলের ভারে সোজা হয়ে আপ্রাণ চেষ্টায় ঢোলটা পেটাতে পেটাতে ফাটিয়েও ফেলছেন, ভদ্রলোকের কত্তো-কত্তো কাজ!
এই কর্মবীরের জন্য গোটা জাতি গর্ভিত! (আমার লিখতে গিয়ে বানান ভুল হয় সেজন্য আগেভাগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। প্রবল আশা, অন্তত ৩ টাকা দামের কলমবাজ মনে করে মার্জনা করবেন।)

 'মনোজগত সেন্টার' নামের এই বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা কেন্দ্রও কি সরকার চালান? বেশ-বেশ! ভাল কথা, 'পরফেসর' ফিরোজ সাহেব কি মনোজগত সেন্টারে সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারী? তা ডাক্তার সাহেবের ফি ৮০০ টাকা কেন? সরকারী চিকিৎসালয়ের ফি এত হবে কেন?
ওয়াল্লা, এখানে লেখা আছে দেখছি, 'পরফেসর' ফিরোজ সাহেব "তথাকথিত পাগল"-এর চিকিৎসা করেন? তথাকথিত পাগল? এটা কী জিনিস আবার? আর 'পরফেসর' ফিরোজ সাহেব কি তথাকথিত পাগলের ডাক্তার? নিজেই পাগলের চিকিৎসা করেন, নাকি নিজেই...?   

Saturday, December 11, 2010

'বাত্তামিজ' শাহরুখ, শালা না, বলো চুতিয়া

ছবি ঋণ: ফিরোজ চৌধুরী/ কালের কন্ঠ
আজ শাহরুখ খান অনুষ্ঠান করে গেলেন। বৈশাখী টিভির সাংবাদিক মহোদয়গণ যখন ধারা বর্ণনা দিচ্ছিলেন তখন তাদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছিল, এদের অজান্তেই খানিকটা 'পিসাব' বেরিয়ে গেছে।

কিছু সুশীল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলার চেষ্টা করছিলেন সংস্কৃতি, সংস্কৃতি বিনিময় ইত্যাদি। চু-ভাইরা এটা কবে বুঝবে দাদারা কেবল নেবে, দেবে না।

অন্তর শোবিজের চেয়ারম্যান স্বপন চৌধুরী স্টেজে নিয়ে এসেছিলেন স্ত্রীকে, কোন এক ফাঁকে শালীকে স্টেজে নিয়ে এসেছিলেন কিনা এটা বলতে পারি না।
স্বপন সাহেবের কাছ থেকিই আমরা জানলাম, অন্তর শোবিজের অন্তর নামটা তার ছেলের নাম। ছেলে এবং এই প্রতিষ্ঠান তারা একই সঙ্গে প্রসব (!) করেছিলেন।

দেবাশীষ বিশ্বাস যেটা উপহার দিলেন, কারও পক্ষে ইয়াবা সেবন করেও এমন জিনিস প্রসব করা সুকঠিন। তিনি আমাদেরকে জানালেন, পৃথিবীতে সাতটা ধর্ম। আজ আরেকটা ধর্ম যোগ হলো। সেটা হলো, শাহরুখইজম!
দেবাশীষকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেখা গেছে পা তুলে অসভ্যের মত বসার ভঙ্গি করতে। কিছু দর্শক অনুষ্ঠান প্রযোজককে আপত্তি জানিয়ে দেবাশীষের এই প্রিয় ভঙ্গি বদলাতে সহায়তা করতেন। এমন উম্মাদ, বেয়াদবকে আদব শেখাবার গোপন ইচ্ছা ওই সব সহৃদয় দর্শকের মত অন্তত আমার নাই।

শাহরুখ বেচারাকে দোষ দেই না, এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা শাহরুখ খানকে বলে দেয়ার তকলীফ করেননি যে আমরা এখনও ভারতের কালচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। হিন্দির আগ্রাসন কাকে বলে তা আজ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে সচক্ষে দেখলাম।
শাহরুখ খান বাংলায় গালি শিখতে চেয়েছেন। ভাগ্যিস, চু...পোলা শিখেননি, শাহরুখ 'শালা' শিখেছেন, বলাটাও রপ্ত করেছেন। আমি আরেকটা গালি শিখিয়ে দিতে চাই। আর্মি স্টেডিয়ামে যে হাজার-হাজার মানুষ চল্লিশ হাজার টাকা পর্যন্ত টিকেট কেটে এসেছিলেন তাদের জন্য কেবল একটা কথাই বলা চলে, চু-তি-য়া...।

*শাহরুখ খানকে নিয়ে দেখলাম কিছু মানুষের অন্য রকম আগ্রহ হচ্ছে। তাঁদের আশা, তিনি আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় কিছু দিয়ে যাবেন। বটে! জনসমক্ষে সিগারেট হাতে নিয়ে শাহরুখ ভালই শেখালেন। শেখো বঙ্গাল, শেখো। সযতনে বাঁশ দিয়ে গেলেন এখন আমাদের কাজ হচ্ছে বাঁশটা যত্ন করে রাখা এবং প্রয়োজনে এতে ভিউ মিরর লাগানো [১]

**বৈশাখী টিভিতে সংস্কৃতি বিনিময় নিয়ে লম্বা লম্বা কথা শুনছিলাম এদের মধ্যে একজনকে দেখলাম এর কেডসের তলা দেখা যাচ্ছে। এ তো এখনও ভদ্র সমাজে বসার ভঙ্গিটাই রপ্ত করতে পারেনি! এর হাতে যদি থাকে আমাদের সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব... ভয়ে আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি।
এখানে এক প্রসঙ্গে আমি লিখেছিলাম, দাদারা কেবল নিতেই জানেন, দিতে জানেন না। ছোট্ট কিছু উদাহরণ: ভারত ১০০ কোটি ডলারের ঋণ দিচ্ছে। ঋণ দিবি, সুদ নিবি, সমস্যা কোথায়? না, দাদাদের আবদার, ১০০ কোটি ডলারের মধ্যে ৮৫ ভাগ টাকার পণ্য কিনতে হবে দাদাদের কাছ থেকে এবং বাকী ১৫ ভাগে টাকার পণ্য তাদের পরামর্শ অনুযায়ী।
এমনিতে বাংলাদেশের বাজারে ভারত দুই হাজার ৮৬টি পণ্য রপ্তানি করতে পারে, পাশাপাশি বাংলাদেশ রপ্তানি করতে পারে কেবল মাত্র ১৬৮টি পণ্য!
এই হচ্ছে বাস্তবতা!

***শাহরুখ কেমন করে আমাদেরকে কৃষ্টি-সংস্কৃতি শিখিয়ে গেলেন তার নমুনা হচ্ছে দেশ-মা-মা, ম্যা-ম্যা করে গলার গামছা ভিজিয়ে ফেলা প্রথম আলো শিরোনামে লিখেছে, "...মউজ মাস্তিতে মাতিয়ে দিলেন শাহরুখ"। 'মইজ-মাস্তি'? হা হা হা, কেমন করে একটি জাতীয় দৈনিকের ভাষা পরিবর্তন হয়ে যায়! আমি অপেক্ষায় আছি কালে কালে এই পত্রিকাটির নাম হবে 'পাহেলি রোশনি'। পাকিরা নাই [২], তাতে কী, দাদারা আছে না...। আগামিতে মতি ভাইয়া কলাম লিখবেন, মেরি মায় বাপ...।

ওয়েল-ওয়েল-ওয়েল, এখন জায়গার সমস্যা হয় না কিন্তু আমাদের সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলীর মৃত্যুর খবর প্রথম পাতায় ছাপতে ইয়ে ফেটে যায়, না?
এমনিতেও আমাদের দেশে হিন্দির আগ্রাসন দেখে আমি আশা করছি, আগামীতে হিন্দি হবে আমাদের দ্বিতীয় ভাষা...।

সহায়ক সূত্র:
১: বাঁশ...: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_09.html
২. মতি ভাইয়ার দরখাস্ত: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_18.html  

Friday, December 10, 2010

অ্যাসাঞ্জ, একটি চাবুকের নাম

ছবি ঋণ: গুগল
অ্যাসাঞ্জ। একটি নাম। একটি চাবুকের নাম! যে চাবুক দিয়ে শুয়োরের পালকে বাগে রাখা যায়। অনেকে বলবেন মানুষটা নৈতিকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছেন। নৈতিকতা? যেখানে 'ন'-ও নেই সেখানে নৈতিকতা আসছে কোত্থেকে?

এই গ্রহে যত অমানবিকতা, কদর্যতা, নিষ্ঠুরতা ঘটেছে তার পেছনে কোন-না-কোন প্রকারে আমেরিকা নামের শুয়োরটার গায়ের বোটকা গন্ধ আছে। থাকবে, থাকবেই। জারজদের পিতার হদিস নেই কিন্তু পিতৃভূমি রক্ষার নামে কয় লক্ষ মানুষ নামের সংখ্যা হারিয়ে যাবে এর হিসাব রাখতে এদের বয়েই গেছে। এরা তেলের সঙ্গে রক্ত মিশিয়ে নতুন একটা জ্বালানী [১] আবিষ্কার করবে আর আমরা সভ্য-সভ্য একটা ভাব ধরে এদের কাছ থেকে সভ্যতা শেখব [২]। এরা আমাদের দেশে সেমিনার করে সভ্যতা শেখাবে। আমরা সেমিনারে এদের লম্বা-লম্বা লেকচার শুনব আর এরা সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে। ছয় হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি!

এক আফগানিস্তানেই এক বছরে বিনস্ট হয়েছে ৩ লাখ ঘরবাড়ি। ইরাক যুদ্ধে মারা গেছে প্রায় এক লক্ষ মানুষ! এরা মুখে নাৎসিদের নিয়ে ঘৃণা ছড়াবে কিন্তু বাস্তবে এর চিত্র অন্য রকম। ১৯৫৪ সালে আইখম্যানের অন্যতম সহকারী অটো ভন বোলশেভিককে কেবল আমেরিকায় ঢুকতেই দেয়া হয়নি জামাই আদরে রাখা হয়োছিল।
৪০ দশকে আমেরিকা গুয়েতেমালায় মানসিক রোগী এবং কয়েদীদের উপর ভয়াবহ এক গবেষণা চালিয়ে গেছে। শত-শত মানুষের শরীরে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে সিফিলিস, গনোরিয়ার জীবাণু ছড়িয়ে দেয়া হয়। এমন কত ঘটনা ঘটে গেছে এর কটার খবর আমরা জানি? 

যেমন কলম্বাস ১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর আমেরিকা আবিষ্কার করেন। তাকে বীর পুজা করা হয়। এই শুয়োর ওখানকার আদিবাসিদের নিয়ে তার লগ-বুকে লেখেন, 'আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এরা দাস হিসাবে চমৎকার হবে...'।
কলম্বাসকে নিয়ে আমেরিকার এক শিক্ষক বিল বিগলো গুছিয়ে বলেন, 'কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারক নন, বরং স্রেফ একজন লুটেরা ছিলেন'।
কলম্বাস নামের এই শুয়োর অসংখ্য উত্তরসূরি রেখে যান। বিচিত্র এই দেশটা, ততোধিক বিচিত্র এর জনগণ! একটা মিথ্যার কারণে ক্লিনটনের গদি যায়-যায় অথচ বুশ নামের এক উম্মাদের কিছুই হয় না।

তো, কালে কালে এই শুয়োরটার গায়ের বোটকা গন্ধ আরও তীব্র হয়। এটা আমরা বিস্মৃত হই। শুয়োরদের উল্লাসে যোগ দেন টনির [৩] মত কিছু পোষা সারমেয়। আমরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে এদের দেখানো তামাশা দেখি। আমেরিকা অ্যাপাচি হেলিকপ্টার [৪] থেকে গুলি করে রক্তমাংসের মানুষ মারবে, শিশুদের আহত করবে এই খেলায় অ্যাসাঞ্জ বাধা দেবেন এটা কোন দেশের সভ্যতা!
আসলে অ্যাসাঞ্জের [৫] মত মানুষরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, ওখানে নৈতিকতার কথা বলা বৃথা। জঙ্গলে চলে জঙ্গলের আইন সেখানে নৈতিকতার কথা বলা এও এক অশ্লীলতা...। অ্যাসাঞ্জ নিজ থেকেই ধরা দিয়ে অসম্ভব বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। নইলে হয়তো কোন গুপ্ত ঘাতক তাঁকে মেরেই ফেলত। কোন সভ্য দেশে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হচ্ছে সরকারের কাস্টডিতে থাকা। অবশ্য আমাদের দেশের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য না কারণ এখানে জেলখানায় ঢুকে ফট করে কাউকে মেরে ফেলা যায় [৬], বছরের পর বছর ধরেও এই খুনের কোন বিচার হয় না! এই দেশে সবই সম্ভব, সব সম্ভবের দেশ! এখানে সমস্ত খুনের বিচার চাওয়া [৭], না-চাওয়া সমান। 

সহায়ক সূত্র
১. রক্ত+তেল=...: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_25.html
২. সভ্যতা: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_493.html
৩. কুকুরের জন্য হাড়: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_9265.html 
৪. ভিডিও গেম: http://www.collateralmurder.com/
৫. অ্যাসাঞ্জ, উইকিলিকস: http://wikileaks.ch/
৬. খুন: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_03.html
৭. সমস্ত খুনের বিচার...: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_19.html   

Wednesday, December 8, 2010

আজ তোমার গায়ে হলুদ, মেয়ে

শাহানা বেগমকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিলেন অন্য একজন মানুষ। অনুরোধটাও ছিল ওই মানুষটারই।

শাহানা বেগমের মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়েতে আর্থিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিয়েতে সহায়তা দেয়ার মত কোন সুযোগ আপাতত আমার নাই এটা প্রথমেই জানিয়ে দেই। কেউ নিরাশ হলে আমার কীই-বা করার আছে?

কিন্তু শাহানা বেগমের জীবন-যুদ্ধের গল্প শুনে মনটা বিষণ্ন হয়। স্বামীর মৃত্যু হয়েছে অনেক কটা বছর। বাজারে তিনি সব্জী বিক্রি করেন। তাঁর দুই মেয়ে, বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোটটা কলেজে পড়ত। সব্জী-টব্জী বিক্রি করে করে, মেয়েটাকে অনেক দূরের কলেজে ভর্তি করিয়ে পড়াশোনা করিয়েছেন। এখন ভাল একটা ছেলে পেয়েছেন, বিয়ের ঝামেলাটা চুকিয়ে ফেলতে চান।
আলাপে জানা গেল এই ছেলে প্রায় অশিক্ষিত। একজন অশিক্ষিত ছেলের কাছে কেন মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন এটা জানতে চাইলে তিনি বিমর্ষ হয়ে জানালেন, তাঁর মত দরিদ্র মানুষের কাছে শিক্ষিত ছেলে তো আর আসবে না, উপায় কী! আশেপাশের সবাই এটাই সমীচীন মনে করছে এই ছেলেটার কাছে বিয়ে দিতে। ছেলের বংশ ভাল, ট্রাক্টর চালায় ইত্যাদি।

এই প্রসঙ্গে যখন কথা হচ্ছে তখন আমার সঙ্গের মানুষটা রাগে চিড়বিড় করে বললেন, না-না-না, এটা হতে পারে না। অশিক্ষিত একটা ছেলের কাছে আপনার মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্যই কি আপনি এতো কষ্ট করে মেয়েকে কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন!
আমি চোখ দিয়ে ইশারা করে মানুষটাকে থামতে বললাম। জীবনটা সিনামা না। এখানে রক্ত চাই-রক্ত চাই টাইপের সংলাপ আউড়ানো চলে না। মেয়েটার এই বিয়ে থামিয়ে দেয়া চাট্টিখানি কথা না। এখানে এমন ছেলে খুঁজে পাওয়া যাবে না যে উঁচু স্বরে হাততালি দেয়ার মত সংলাপ বলবে, এই বিয়ে না-হলে এই মেয়েকে আমি বিয়ে করব।

যাই হোক, কথা প্রসঙ্গে এটাও জানা গেল শাহানা বেগম সব্জী ব্যবসা করার জন্য এক হাজার টাকা সুদে নিয়েছেন। এবার আমি খানিকটা নড়েচড়ে বসি। কারণ ন্যানো ক্রেডিটের [১] আওতায় এই টাকাটা দেয়া সম্ভব। একজন এই টাকাটা আমাকে দিয়েছিলেন এই শর্তে যেন কাউকে এই টাকাটা ব্যবসার জন্য দেয়া হয় এবং একজনকে দিলে ভাল হয়।
শাহানা বেগম আনন্দের শেষ নাই কিন্তু আমার মনে ঘোর সন্দেহ। আমি বলেই ফেললাম, আপনি এই টাকাটা আবার বিয়েতে খরচ করে ফেলবেন না তো?
শাহানা বেগম 'আইতাছি' বলে উধাও হলেন। ফিরে এলেন সুদখোর মানুষটা নিয়ে। সুদখোর মানুষটা টাকা বুঝে নিয়ে গেলেন। ঈশ্বর, এই মানুষটাকে তো আমি নিয়মিত মসজিদে যেতে দেখি!

আমার কাজ থেকে অকাজ বেশি। শাহানা বেগমের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। পূ্র্বেও উল্লেখ করেছি অহেতুক হাঁটাহাঁটির বাজে অভ্যাস আছে আমার।
আজ হাঁটতে গিয়ে শাহানা বেগমকে পেয়ে যাই। আরও দু্-একজন মহিলার সঙ্গে সব্জী বিক্রি করতে। আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। কেন? এমন তো আমার জানা নেই তিনি সব্জী বিক্রি করেন, তাহলে কেন? কিছু কিছু দৃশ্য আছে দেখতে ভাল লাগে, মনটা অন্য রকম হয়!
ফিরে এসে শাহানা বেগমকে যিনি আমার কাছে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তাঁর কাছে জানা গেল, আজ শাহানা বেগমের মেয়ের গায়ে হলুদ। অথচ এই মাটা সব ফেলে ঠিকই দোকানের পশরা সাজিয়ে বসেছেন।

বিয়ের আয়োজনের কি অবস্থা এটা জানতে চাইলে তিনি জানালেন, আত্মীয়-স্বজনরা সবাই কিছু কিছু করে সহায়তা করে অনেকটা এগিয়ে ফেলেছেন। লেপ-তোষক-বালিশে এসে এখন এই মহিলা আটকে আছেন। সব মিলিয়ে ২২০০ টাকার মামলা। পরের অংশটুকু শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। আহারে-আহারে, এই মাটা জগদ্দল পাথর বুকে নিয়ে ক্রেতার সঙ্গে কথা বলছেন, ঠিক ঠিক পয়সা গুণে নিচ্ছেন! মেয়েটা হয়তো গাল ফুলিয়ে বসে আছে, আম্মাটা যে কি, আজও বাজারে যেতে হবে কেন!

আমি খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি হয়তো কিন্তু মস্তিষ্ক কাজ করছে ঝড়ের গতিতে। অতি দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে এমন কাউকে যিনি এই টাকার সহায়তা দিতে পারবেন। অবশ্য না-পাওয়া নিয়ে আমার অস্থিরতা নাই। কাউকে-না-কাউকে পাওয়া যাবে এতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই...।

সহায়ক লিংক:
১. ন্যানো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/39dkbhh 

Tuesday, December 7, 2010

স্বপ্নের বীজ!

পূর্বের লেখায় উল্লেখ করেছিলাম [১] তাড়াহুড়োয় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। একটা স্কুলের বাচ্চাদের এই অনুষ্ঠানে আনা সম্ভব হয়নি। আমার মনে হয়েছিল দমে না-গিয়ে দুইটা স্কুল নিয়েই অনুষ্ঠানটা করে ফেলি। প্রধান অতিথির সঙ্গেও তখনও যোগাযোগ হয়নি। তিনি কি এতো স্বল্প সময়ে থাকার জন্য রাজি হবেন? মানুষটাকে ভয়ে ভয়ে দাবী নিয়ে বলি। মানুষটা সহৃদয়। আগের একটা অনুষ্ঠানেও [২] হাতে অল্প সময় নিয়ে বলেছিলাম। তখনও না করেননি, এখনও না!
আঁকার বিষয়বস্তু খানিকটা কঠিন ছিল এদের জন্য। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিস্থলের ছবি। কিন্তু...। আমার ইচ্ছা ছিল আঁকার জায়গাটা হবে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিস্থলে। ঠিক ওখানে বসে আমাদের ইশকুলের [৩] বাচ্চারা সমাধিস্থল দেখে দেখে আঁকার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। নিরুপায় হয়ে রেলস্টেশনের স্কুলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ছবি ঋণ: দুলার ঘোষ
ছবি ঋণ: দুলাল ঘোষ
ছবি ঋণ: দুলাল ঘোষ
দুই স্কুল মিলিয়ে পঞ্চাশের উপর বাচ্চারা প্রথম এমন কোন একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করল। এই প্রথম আঁকার চেষ্টা করল। সব বীজ থেকে যেমন বৃক্ষ হয় না তেমনি সব বীজই নষ্ট হয়ে যায় এটাও ঠিক না। এখানের বাচ্চারা কেউ-না-কেউ অদেখা স্বপ্ন লালন করবে। এই স্বপ্ন তাকে কেমন করে চালিত করবে এটা সময়ই ঠিক করে দেবে।

সহায়ক লিংক:
১. আখাউড়া মুক্ত দিবস: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_06.html
২. দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা, স্যালুট ম্যান: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_4596.html

৩. আমাদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_07.html

Monday, December 6, 2010

আখাউড়া মুক্ত দিবস, ৬ ডিসেম্বর

৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালে আজকের এই দিনটাতে আখাউড়া মুক্ত হয়েছিল। হঠাৎ করেই মাথায় এসেছিল, আমরা যে যেখানে আছি সেখান থেকেই যদি প্রত্যেকে ওই জায়গার মুক্ত দিবস পালন করি তাহলে লাভ যেটা হবে, এই প্রজন্ম অন্তত জানতে পারবে। এই ভাবনা থেকেই আখাউড়া মুক্ত দিবসের উদযাপন করার ভাবনাটা মাথায় আসে। আগেও অবশ্য এই দিবসটা বিক্ষিপ্ত আকারে পালন করা হয়েছে।
তো, আমি কয়েকজনের সঙ্গে এই দিনটাকে উদযাপন করার জন্য কথাও বলেছিলাম। বিস্তারিত আলোচনায় যাই না কিন্তু কোথাও থেকে আশার কথা শুনতে পাইনি।

হা হা হা। তাই বলে আমি বসে থাকব বুঝি! গতকালই মাত্র ঠিক করি, আমাদের ইশকুলের বাচ্চাদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করে ফেলি না কেন? গতকাল রবিবার, রবিবার স্কুলগুলো বন্ধ থাকে তাছাড়া এই স্বল্প সময়ে এই আয়োজন করাটা প্রায় অসম্ভব। ইশকুল: এক [১] এবং ইশকুল: তিন [২]-এর বাচ্চাদের একত্র করা যাবে কিন্তু ইশকুল: দুই-এর [৩] দূরত্বের কারণে ওই স্কুলের বাচ্চাদের এখানে আনা যাবে না। দেখা যাক...।

আখাউড়ার মুক্ত দিবস নিয়ে নৌ কমান্ডো ফজলুল হক ভূইয়ার [৪] সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু তিনি তখন আখাউড়ার ছিলেন না বলে তেমন কোন তথ্য দিতে পারেন নি। কিন্তু যে তথ্য দিয়েছেন এটা জেনে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আলী আহসান মুজাহিদ কেমন ছলনা করে ৩০ জন নৌ-কমান্ডোকে ১৯৭১ সালে হত্যা করিয়ে ছিলেন তার বর্ণনা দিলেন তিনি। পরে এই নিয়ে অন্য লেখা লিখব...।    


...

আখাউড়া মুক্ত-দিবস
১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন এস এ ভূইয়া, পরে মেজর জেনারেল হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি 'মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস' নামে তথ্যবহুল একটি বই লেখেন। ১৯৭১ সালে দুর্ধর্ষ যুদ্ধ করেও এই যোদ্ধা তাঁর যথার্থ সম্মান পাননি যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই এই লেখায় [৫]
আখাউড়া নিয়ে তাঁর লেখায় আমরা জানতে পারি:
"...নভেম্বরের ২০ তারিখের পরে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে গেল...।
... নভেম্বরের এই সময়টাতে আমরা আখাউড়ায় শক্র সৈন্যের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হই।
...এ সময় 'এস' ফোর্সের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল শফিউল্লাহর অধীনে ছিল পুরো দুই ব্যাটিলিয়ন পদাতিক সৈন্য। এ ছাড়াও ছিল কয়েকটি কোম্পানী যাকে আমরা 'সেকটর ট্রুপস' বলতাম।
...২৭ নভেম্বর কর্নেল শফিউল্লাহ মেজর মঈনকে মেরাসানী, নিরানসানী, সিঙ্গারবিল রেলওয়ে স্টেশনে, সিঙ্গারবিল ঘাটি, রাজাপুর, আজমপুর ইত্যাদি এলাকা দখল করার নির্দেশ দেন।
...কর্নেল শফিউল্লাহ মেজর মঈনকে ৩০শে নভেম্বর এবং ১লা ডিসেম্বর তারিখ রাতে এইসব এলাকা আক্রমণ চালাবার আদেশ দিয়েছিলেন।

মেজর মঈন  দ্বি-ধারা আক্রমণ চালালেন।
...এই অভিযানে আমাদের পক্ষ থেকে অংশ নিয়েছিল মুক্তিফৌজের প্রায় এক ব্যাটালিয়ন। শক্রপক্ষের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক ব্যাটালিয়নের বেশী। এই যুদ্ধে শক্রসেনারা আর্টিলারী, মর্টার, মেশিনগান ইত্যাদি ছোটবড় সব অস্ত্রশস্ত্রই ব্যবহার করে।
...আখাউড়ার এই যুদ্ধে হতোদ্যম পাকিস্তানী সেনারা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। এবং তাদের প্রচুর লোকসান স্বীকার করতে হয়। একজন শক্রসেনা জীবিত অবস্থায় বন্দী হয় এবং ২০ জন নিহত। এ ছাড়ার মুক্তিফৌজের হস্তগত হয় হানাদার বাহিনীর প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, রেশন, পোশাক-পরিচ্ছদ, ডিফেন্স স্টোর।
...পর্যুদস্ত শত্রবাহিনী সাময়িকভাবে পিছু হটলেও ২রা ডিসেম্বরের সকালে আমাদের বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং সারাদিন ধরে খন্ডযুদ্ধ চলতে থাকে। শত্রবাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে আমাদের বাহিনী পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়।
...প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির পর আমাদের বাহিনী সিঙ্গারবিলে গিয়ে জমায়েত হয়। এই যুদ্ধে শত্রু বাহিনীরও অসম্ভব ক্ষতি হয়। মুক্তিফৌজের নায়েক সুবেদার আশরাফ আলী শক্রর হাতে শাহাদাৎ বরণ করেন।
...৩রা ডিসেম্বর আমাদের বাহিনী নিজেদেরকে পুর্নগঠিত করে পাক বাহিনীর উপর পুনরায় আক্রমণ চালায়। ...এই আক্রমণে শক্রপক্ষের এগারজন সৈন্য নিহত হয়। 
...ডিসেম্বরের ৩/ ৪ তারিখে আমাদের বাহিনী পুর্নদখলকৃত এলাকাকে সুরক্ষিত করে।
...আমাদের সেক্টরে ৪ঠা ডিসেম্বরের যুদ্ধে মুক্তিফৌজের যে বীর সৈন্যরা শাহাদত বরণ করেন তারা হচ্ছেন, লেঃ বদিউজ্জামান, সিপাহী রুহূল আমিন, সিপাহী ছিদ্দিকুর রহমান।

...ডিসেম্বরের ৫ তারিখে পাকিস্তান বাহিনী আমাদের বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। কিন্তু আমাদের তীব্র আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। আখাউড়ায় তুমুল লড়াই চলে। এই লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনী ও সংযুক্ত মিত্রবাহিনী অপরিসীম বীরত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে। অবশেষে ৫ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী আখাউড়া দখল করে। ৪/ ৫ ডিসেম্বরের যুদ্ধে এই এলাকায় শক্রবাহিনীর প্রায় ১৬০ জন সৈন্য মারা যায়।
...বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে আখাউড়ার লড়াইয়ের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এখানকার যুদ্ধে উভয় পক্ষই সর্বাধিক সংখ্যক আর্টিলারী ব্যবহার করে। ...।"

(বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, সশস্ত্র সংগ্রাম, ১০ খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩২৯-৩৩৩)

সহায়ক সূত্র:
১. আমাদের ইশকুল, একhttp://tinyurl.com/3xpuov5 
২. আমাদের ইশকুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3
৩. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
৪. নৌ-কমান্ডো ফজলুল হক ভূইয়া: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_18.html
৫. পদকের পদাবলি...: http://events.amardesh.com/articles/8/1/aaaaa-aaaaaa-aaa-aaaaaa-aaaaaaaaaaa/Page1.html 

Saturday, December 4, 2010

ডিয়ার ইউনূস, এক চিলতে মাটির বড়ো প্রয়োজন

অন্য কারও কথা জানি না, ড. ইউনূসকে নিয়ে যে তোলপাড় চলছে এটা আমার ভাল লাগছে না, অন্য রকম এক কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্টের উৎস জানা নেই এমনও না!

ড. ইউনূস যে ভাবেই হোক আমাদের জন্য আন্তর্জাতিক একটা সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। শুনতে খারাপ শোনায় কিন্তু এই গ্রহে কে চেনে বাংলাদেশকে? যাও চেনে, আমাদের রাজনীতিবিদদের কারণে মুখ দেখাবার যো নেই।

ড. ইউনূস সম্মানটা নিয়ে এসেছিলেন বটে যদিও এতে আমার ঘোর আপত্তি ছিল, এখনও আছে, অপাত্রে দান! আমার আনন্দের শেষ থাকত না যদি 'আইসিডিডিআরবি'-কে এই সম্মানটা দেয়া হতো। বছরে-পর-বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ-লক্ষ শিশুর প্রাণ রক্ষা করল সেই প্রতিষ্ঠানকে না-দিয়ে দেয়া হলো কিনা এক মহা সুদখোরকে। এই দেশে একজন মেথরও ট্যাক্স দেবে, দেবেন না কেবল ড. ইউনূস [৫]
যে মানুষটার প্রতিষ্ঠান ৩০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট সুদ নেয় আবার সেই প্রতিষ্ঠান দারিদ্র বিমোচনের কথা বলে এটার চেয়ে বড়ো রসিকতা এই গ্রহে আর কী হতে পারে! মাত্র ২৪ পার্সেন্ট সুদ পরিশোধ করে প্রস্টিটিউশন-আর্মস-ড্রাগস ব্যতীত কোন বৈধ ব্যবসা করা যায় এই নিয়ে 'লাশ-বানিজ্য-পদক' [১] লেখায় আমার প্রশ্ন ছিল। সেখানে ৩০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট সুদ দিয়ে ব্যবসা? আউট অভ কোশ্চেন!

আমি প্রায়ই বেদনা নিয়ে লিখতাম, আমরা বড়ো দুর্ভাগা এই দেশে এমন মানুষের বড়ো অভাব যাকে আমরা অনুকরণীয় ভাবতে পারি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ড. ইউনূস আমার আদর্শ, আমি এই কাতারে তাঁকে ফেলতে পারলাম না যেখানে তিনি আমাদের জন্য এমন একটা সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছেন। অন্তত আমি পারিনি, রাতকে দিন ভাবতে পারি না। কারও আমার মতে আসার আবশ্যকতা নাই কিন্তু আমি মনে করি লক্ষ-লক্ষ মানুষের অভিশাপ ড.ইউনূসকে তাড়া করবে। আমি জনে-জনে এটা জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু গ্রামীন ব্যাংকের সুদের হার কত এটা কেউ জানাতে পারেননি। এমনকি গ্রামীন ব্যাংকের অনেক শাখায়ও গিয়েছি, কেউ ঝেড়ে কাশেননি! কেন? কারণ এদের স্বচ্ছতার বড়ো অভাব! এদের সুদের সঠিক হারটা আমি আজও জানি না।

আজ ড. ইউনূসকে নিয়ে যে আন্তর্জাতিক সমালোচনার ঝড় উঠেছে গোটা এই কর্মকান্ডে আমি বড়ো বিমর্ষ বোধ করছি। কী অভাগা একটা দেশ, আমার দাঁড়াবার জন্য এক চিলতে জায়গাও থাকল না! এই গ্রহের অন্য লোকজনের সামনে বুক চিতিয়ে, চোখে চোখ রেখে দাঁড়াবার মত সুযোগ থাকল না। এই কষ্ট কাকে বলি, কোথায় বলি!
এটা সত্য ড. ইউনূস আমার অপছন্দের একজন মানুষ, বিভিন্ন কারণে [২]। কিন্তু এই মানুষটা অভাগা এই দেশটার কী যে অপূরণীয় ক্ষতি করলেন এটা তিনি কল্পনাও করতে পারবেন না। একজন গুন্টার গ্রাস [৭] এবং ইউনূসের মধ্যে পার্থক্যটা সহজেই অনুমেয়। কারণ এই অভাগা দেশটার অনেকগুলো গুন্টার গ্রাস নাই।
তাঁকে নিয়ে ঠিক এই সময়টাতেই [৩] [৪] উল্লাস করার জন্য লিখেছি এমন না। আমার স্পষ্ট মনে আছে তাঁকে নিয়ে প্রথম লেখাটা লিখি ২০০৬ সালের প্রথম দিকে, 'লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস' [৫], দেশ যখন ভাসছে উচ্ছ্বাসে। তখন কঠিন একটা সময়, এমন সময়ে ড. ইউনূসকে নিয়ে লিখবে, ঘাড়ে কার কয়টা মাথা? লেখাটা যখন একটা ওয়েব সাইটে লিখি ওখানে লেখাটা লিখে তোপের মুখে পড়েছিলাম। অনেকে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, চোখ ধাঁধানো এই আলোর পেছনের অন্ধকারকে উপেক্ষা করাটা সমীচীন হবে না কারণ এই আলোর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ মানুষের দীর্ঘশ্বাস!

আসলে সত্য এবং সত্যের পেছনে মিথ্যার মধ্যে অনেক তফাত। ছোট্ট একটা নমুনা দেই। আনুমানিক ৫০ কোটি টাকা খরচ করে সাইফুর রহমান সাহেব বাইপাস রেল বসালেন সিলেটের দিকে। তৎকালীন সবাই এটা বলে বলে মুখের ফেনায় প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললেন, তাদের সঙ্গে পত্র-পত্রিকাও সুর মেলাল, এতে করে নাকি ১ ঘন্টা সময় সাশ্রয় হবে। আমি ঘড়ি ধরে দেখেছিলাম, ১ ঘন্টা না, সব মিলিয়ে আট থেকে দশ মিনিট সময় নষ্ট হতো। ৫০ কোটি টাকা জলে ফেলে সাইফুর রহমান, ব্যা হুদা ঘটা করে উদ্বোধনও করে দিয়ে গেলেন। আজমপুর নামের ছোট্ট একটা রেল স্টেশন অথচ দুই মন্ত্রীর জন্য বিশাল দুই স্তম্ভ বানানো হলো। সাইফুর রহমান সাহেব ইহলোকে নাই, ব্যা হুদাও দলে নাই, ছোট্ট এই স্টেশনটাতে যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা নাই কিন্তু এই ঢাউস আকারের স্তম্ভ ২টা আছে, পাশাপাশি। দেশব্যাপি সংঘাত কিন্তু স্তম্ভদের মধ্যে কোন সংঘাত নাই!
১ ঘন্টা সময়ের অপচয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে এ-ই!

তো, এখন গ্রামীন ব্যাংক যে ব্যাখ্যা দিয়েছে অন্যদের কথা জানি না আমার কাছে বড়ো খেলো মনে হয়েছে। আর তাদের এই সব বাতচিত, "...আমরা নোবেল পাওয়া ব্যাংক...", এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীন ব্যাংকের হেন-তেন এই সব বলা বালখিল্য আচরণ মনে হচ্ছে।

আমার বড়ো সাধ, দেশটায় একটু দাঁড়াব। এক চিলতে মাটির বড়ো প্রয়োজন...।

সহায়ক লিংক
১. লাশ-বানিজ্য-পদক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html
২. ওই আসে মহাপুরুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_04.html
৩. প্রথম আলো: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post.html
৪. ডেইলি স্টার: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_04.html
৫. লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_3333.html
৬. মামা বাড়ির আবদার: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_12.html
৭. গুন্টার গ্রাস: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_6914.html         

ইউনূস—ডেইলি স্টার, ঠাকুর ঘর, কলা, পিৎসা...

ঠাকুর ঘরে...কলা খাই না, এই সব এখন আর চলে না। যুগটা আধুনিক, বাতচিতও আধুনিক। এখন হবে, বাবুর ঘরে...পিৎসা খাই না।

'চোর কে দাড়ি মে তিনকা'- এটার আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়াবে, 'চোরের দাড়িতে শলাকা'। সহজটা মিলিয়ে করলে দাঁড়াবে 'চোরের মার বড়ো গলা'। 

ইউনূস সাহেবকে নিয়ে যে অভিযোগটা উত্থাপন করা হয়েছে এটা গতকাল প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার পত্রিকায় ছাপা হয়নি, আজ ছাপা হয়েছে। গতকাল কেন ছাপা হয়নি এই নিয়ে আমার এই লেখায় যা [১] লিখেছিলাম, এখন দেখছি এই মত পরিবর্তন করা আবশ্যক। কারণ ডেইলি স্টার এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে:
"'The Daily Star' is publishing this story a day late. For that, we owe an explanation to our readers. The news was extremely important in that it dealt with an institution and a person who brought the highest honour and accolade for Bangladesh. We seriously read the story that was released by a news agency. This newspaper wanted to verify the allegations and get an explanation from the organisation that stands accused. Moreover, this newspaper wanted to read the documents available and be sure about what has been levelled against the person and the organisation. What we have found is interesting. The allegations have been made and reported, not the answers."  [২]

ভাল-ভাল! এদের ব্যাখ্যা জেনে আমি পুরা থ! ইউনূস সাহেব নবেল লরিয়েট বলে তাঁর বিরুদ্ধে কারও কোন অভিযোগ থাকবে না! এই অভিযোগ বিষয়ে যেটা বলা চলে, এখানে এটা মূখ্য আলোচ্য বিষয় না ইউনূস সাহেব আদৌ অপরাধ করেছেন, কি করেননি।
বিষয়টা হচ্ছে, তাঁর বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে যেসব চিঠি চালাচালি করা হয়েছে তাঁর সংযুক্তিও দেয়া হয়েছে। ইউনূস সাহেব কালো, না ভালো এটা না বললেও আন্তর্জাতিক এই খবরটা পত্রিকায় আসবে এটাই সাধারণ পাঠকের প্রত্যাশা।
ডেইলি স্টার-প্রথম আলো-পিৎজা হাট-আক্কু চৌধুরী-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবগুলোই একই কারখানা থেকে বের হয়! ৮০০ পয়সা দিয়ে প্রথম আলো এই কারণে কেনা হয় না কেবল মতিউর রহমানের বাকোয়াজপনা শোনার জন্য।

আর ইউনূস সাহেব ঈশ্বর না যে তাঁর বিরুদ্ধে কোন কথা চলে না! ইউনূস কোন ছার, এই গ্রহে ঈশ্বরের বিরুদ্ধেও মামলা করা যায়! সেই মামলা কোর্ট গ্রহণও করেন। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সমনও জারী হয় কিন্তু ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয় না বলে (ঈশ্বরের কোন আবাসিক ঠিকানা নাই বিধায়) আলোচ্য মামলা অচল হয়ে পড়ে। ঘটনাটা রুমানিয়ার। পাভেল মির্চা নামের একজন ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন।
অনেকের কাছে এমন মামলা হাস্যকর-উদ্ভট মনে হতে পারে কিন্তু এখানেই হচ্ছে শেখাটুকু। কারও অভিযোগ ন্যায় কি অন্যায় সেটা পরের কথা কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার অধিকারটুকু কেড়ে নেয়ার অধিকার কারও নাই।

কেন যথাসময়ে এরা খবরটা ছাপায়নি প্রথম আলো অবশ্য এই নিয়ে কোন ব্যাখ্যায় যায়নি কিন্তু ডেইলি স্টার ব্যাখ্যা দিতে গিয়েই সব পন্ড করেছে। এরা সম্ভবত বিস্মৃত হয়েছে, এদের কাজ নিশ্চিত সূত্র উল্লেখ করে সংবাদ পরিবেশন করা, ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ করে দেয়া না। কারণ পত্রিকাওয়ালাদের কাজ জজগিরি করা না! আবার এটাও না, কারও ব্যক্তিগত বিষয়ে লম্বা নাক গলিয়ে দেয়া। 
ডেইলি স্টারের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এমন, এরা জনে-জনে, কানে-কানে ফিসফিস করে বলছে, ইয়ে বুঝলেন, এটা কাউকে বলবেন না যেন..., বুঝলেন...। 
ডেইলি স্টার কোন মানুষ হলে বলতাম, কাছে আসেন, এক কানে ফুঁ দেই, দেখবেন অন্য কান দিয়ে কেমন চমৎকার বুদ্বুদ বেরিয়ে আসছে...।

সহায়ক লিংক:
১. ল্যাজটা...: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post.html
২. ডেইলি স্টার: http://www.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=164574    

Thursday, December 2, 2010

প্রথম আলো, ল্যাজটা কায়দা করে লুকিয়ে রাখতে হয়

ব্যক্তি বিশেষকে এটা বলা চলে, আপনাকে নগ্ন দেখতে ভাল লাগে না। লিখতে কষ্ট হয়, তবুও বয়স্ক কাউকে নিয়ে লিখতেই হয়, 'একজন বয়স্ক মানুষকে অন্তত নগ্ন দেখতে ভাল লাগে না' [১]
কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠানের বেলায় এই বক্তব্যটা ঠিক মিশ খায় না। অবশ্য এটাও ঠিক, প্রতিষ্ঠানটা কে চালাচ্ছেন এটাও দেখার বিষয়। প্রতিষ্ঠান ছাই- একজন মতিউর রহমান কি চান এটাই আলোচ্য বিষয়। নইলে মতিউর রহমানের এই ধৃষ্টতা হতো না এটা বলার!
এটিএন বাংলায় মতিউর রহমান সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বেশ-বেশ! এটা আবার তিনি তার পত্রিকায় ঘটা করে ক্রোড় পত্র হিসাবে ছাপিয়েছেনও! মুন্নী সাহা অনুষ্ঠানটা শুরু করেছেন যেসব কথা বলে এটা তার গুরু মতিউর রহমানেরই শিক্ষার ফসল। যথা গুরুর তথা ছাত্র, কেবল বেচারা আনিসুল হককে নির্লজ্জ বলা কেন? সমস্যা কি এই পত্রিকার সর্বত্র আনিসুল হককে দেখলে, দাঁতসহ!
তবুও আমি মুন্নী সাহাকে টুপি খুলে সম্মান জানাই মতিউর রহমানকে কিছু তিক্ততার সম্মুখীন, বাস্তবতায় দাঁড় করাবার জন্য!

তো, এই সাক্ষাৎকারে মতিউর রহমানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "...মানুষের ডাকনাম আপনি ছেঁটে দিচ্ছেন- এ প্রসঙ্গে আপনার মত কি"?
মতিউর রহমান বলছেন, "একটি ডাকনাম মা-বাবা দেন তাঁর পরিবারের ভেতর ব্যবহার করার জন্য। সেই ডাকনামটি বাইরে সবার মধ্যে প্রচার করা আমাদের কাছে পছন্দনীয় নয়।...আমরা মনে করি, এই ডাকনাম ছেঁটে ফেলার মাধ্যমে একটি মানদন্ড নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে...।" (প্রথম আলো, ২১ নভেম্বর, ২০১০)
মতিউর রহমান কায়দা করে আমাদের-আমরা শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন, বাস্তবে হবে আমি। মতিউর রহমানের এই বক্তব্য আমার কাছে স্রেফ ধৃষ্টতা মনে হচ্ছে। কারও নাম নিয়ে জাগলিং করার অধিকার মতিউর রহমান নামের মানুষটাকে কে দিয়েছে? গোটা দেশের লোকজনকে আপনি আপনার পত্রিকার কর্মচারী ভাবছেন বুঝি? নাকি গোটা দেশের লোকজন আপনাকে তাদের নামের আকিকা দেয়ার সোল এজেন্সি দিয়েছে? আপনার পত্রিকার সার্কুলেশনই কি ফাজলামির দোকান খুলতে প্ররোচিত করে, নাকি? এরা এখনই হাঁটেন পা ফাঁক করে, পত্রিকার সার্কুলেশন ৩০/ ৩৫ লাখ হলে তখন কি করবেন? পাঠককে বাথরুমে পত্রিকা পড়া নিষিদ্ধ করে দেবেন নাকি নেংটি পড়ে পত্রিকা পড়তে বাধ্য করবেন?

যাগ গে, মতিউর রহমানকে একপাশে সরিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কথা বলা যাক। করপোরেট নামের যে ধারালো ছুঁরি দিয়ে দেশটাকে ফালা ফালা করা হয় সেই করপোরেট ছুঁরি লুকানো থাকে মতিউর রহমান, ইউনূস সাহেবদের কোমরে। এঁদের ভঙ্গিটা যে প্রায় অবিকল এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই- এই নিয়ে যে লেখাটা লেখা হয়েছিল, 'রতনে রতন চেনে' [২]
ইউনূস সাহেবের বিরুদ্ধে যে কঠিন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে তা অন্যান্য পত্রিকায় মিডিয়ায় আসলেও প্রথম আলোয় একটি শব্দও ছাপা হয়নি। কেন? এটা মতিউর রহমান ভাল বলতে পারবেন। কাক কাকের মাংস খায় না- একজন ছুঁরিবাজ আরেকজন ছুঁরিবাজের ছুঁরির ঝনঝনানি শুনতে চান না।

ইউনূস সাহেবের প্রতি যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে এর পেছনে কতটুকু সত্যতা আছে সেটা পরের বিষয় কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কঠিন এই অভিযোগটা এসেছে যা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় জোর আলোচিত হচ্ছে। তা প্রথম আলোতে না-আসার পেছনে যে যুক্তিই থাকুক আমার কাছে কেবল মনে হচ্ছে, এদের ধারণা পাঠকের মাথায় কেবল সাবানের ফেনা। আসলে সাবানের ফেনা এদের মাথায় কারণ এরা তো নিজের ল্যাজটা কেমন করে লুকিয়ে রাখতে হয় এটাই এখনও ভাল করে রপ্ত করেনি।

(প্রথম আলোকে নিয়ে লেখা [৩], এখন আমার কাছে মনে হয় স্রেফ শব্দের অপচয়! আফসোস, জেনেশুনে হয়েছি একজন অপচয়কারী...!)

সহায়ক লিংক:
১. বয়স্ক মানুষদের নগ্নতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_09.html
২. ইউনূস সাহেব...: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_28.html
৩. প্রথম আলো: http://tinyurl.com/3yadh4k
WhatsApp