Monday, November 22, 2010

মৃত্যু-ব্যবসা-তাচ্ছিল্য-অপরাধ

ক-দিন আগের কথা।
গোল হয়ে যেখানে লোকজন দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে সচরাচর ওখানে আমি ফাঁকা মাথা গলাই না। কারণ কিছু বিষয়ে আমার কৌতুহল বাড়াবাড়ি রকম কম। বাংলাদেশে ওয়ান, টু, থ্রি  বললেই বিশ-ত্রিশজন লোক জমে যায়। কিন্তু এখানে আগ্রহ হলো এই কারণে, রেল-স্টেশনের মাটিতে একজন মানুষ লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। প্রথমে আমি ধারণা করেছিলাম, হয়ত কোন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে।

খানিক পর বুঝতে পারলাম মানুষটা মৃত। মৃত মানুষ আমার কাছ থেকে খুব একট দেখা হয়নি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত অবশ্য আমি বলার চেষ্টা করি না:
"আমার একটুও ভাল লাগে না
তবু শবানুগমনে
মাঝে মাঝে আমাকে যেতেই হয়-
নেহাত মুখরক্ষার জন্যে।"

পারতপক্ষে আমি যাই না, গেলেও সেসব ক্ষেত্রে চেনা মানুষগুলো নামের লাশগুলো কেমন অচেনা মনে হতো। হয়তো নাকে তুলো গুঁজে দেয়ার কারণে বা আরও অন্যান্য কারণ থাকতে পারে কিন্তু এখন যে মানুষটাকে দেখছি এঁকে দেখে মনে হচ্ছে, মানুষটা অনেককাল পর প্রশান্তির ঘুম ঘুমিয়েছেন। যেন ঘুমাতে পেরে বেঁচে গেছেন! জানি না, এটা হয়তো আমার দেখার ভুল কিন্তু তখন তেমনটাই মনে হয়েছিল।
এই সব অহেতুক ভাবনা একপাশে সরিয়ে কাজের ভাবনা আসে, এই লাশ নামের মানুষটা প্ল্যাটফরমে এভাবে পড়ে আছে কেন? আমার অন্য রকম আগ্রহ দেখে দু-জন মানুষ এগিয়ে আসে।
আমি বলি, ঘটনা কি? আপনারা কারা?

দু-জনের মধ্যে একজনের চোখে দেখি আবার সুরমা টাইপের কিছু একটা দেয়া, এ বলে, আমরা এই লাশ দাফনাইবার দায়িত্বে আছি।
আমি অনুমান করি, এরা ডোম। আমি আবারও বলি, দাফনাইবেন কিন্তু এর পরিবার -পরিজন কই?
সুরমা চোখের ডোম, পরিবার-পরিজন কই এইটা কেমনে কমু, কারও খোঁজ নাই? বেনামে দাফন হইব।
আমি এবার অবাক হই, মানে! আপনাকে কি স্টেশন কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিয়েছে?
মানুষটা অবজ্ঞার হাসি হাসে, হে-হে, হেরার এই ময়লা ঘাঁটাঘাঁটি করার সময় নাই।
আমি বলি, বেশ। বেনামে যে দাফন হবে, তা এই মানুষটার কাছে কোন ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি?
এবার অন্য ডোমটা কিছু কাগজ এগিয়ে দেয়। কাগজে কিছু ফোন নাম্বার। আমি ফোন নাম্বারগুলোতে একের পর এক ফোন করতে থাকি। কোন হদিস বের করা গেল না। অন্য পাশ থেকে এই নাম্বারগুলো থেকে যেটা বলা হলো, এই মানুষটা তাদের এখানে বিভিন্ন সময় শ্রমিকের কাজ করেছেন কিন্তু মানুষটার বাড়ি কোথায় স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারলেন না! নামটা পর্যন্ত না!
আমি ডোমদের কাছে জানতে চাই, তা এখন আপনারা কি করছেন?
সুরমা চোখের ডোম, লাশ দাফনে খরচ আছে না! টেকা দিব কেডা? পাবলিক থিক্যা টেকা তুলতে হইব।
এ আমাকে একটা হিসাব দেয়, এদের দুজনের খরচসহ সব মিলিয়ে ১২০০ টাকা লাগবে।

আমি একজনকে বললাম, আচ্ছা, এভাবে একটা লাশ ফেলে দু-পাঁচ টাকা উঠানো কেমন কুৎসিত দেখায়। এরা তো ১২০০ টাকা না-উঠা পর্যন্ত ছাড়বে না। তাছাড়া স্টেশনে আসা শিশুরাও এটা দেখছে। দাফনে ঠিক যে টাকা খরচ হবে এটা দিলে এবং এদের দুজনের ন্যূনতম মজুরি দেয়া হলে কেউ কি এর দায়িত্ব নেবে?
কেউ দায়িত্ব নেয়া দূরের কথা। উত্তরটা আমাকে হতভম্ব করল, লাভ নাই। আপনার দেয়াটা টাকাটাই মার যাবে। আর এটাই নিয়ম। বেওয়ারিশ লাশের এভাবেই দাফন হয়।

আমার মনে পড়ে গেল পূর্বের একটা ঘটনা। আমার সিনিয়র একজন, বন্ধু মানুষ। সব মিলিয়ে চমৎকার রুচিশীল একজন মানুষ। বিদেশে থেকে এসেছেন অনেকটা সময়। এদের সন্তানাদি নাই এই কারণেও মানুষটার প্রতি আমার আলাদা মমতা ছিল। বানিয়ে বানিয়ে অনেক আশার কথা শোনাতাম। কখনও কখনও বানিয়ে নিজেকেও জড়িয়ে ফেলতাম, এই দেখেন না আমার নিজেরও এই সমস্যা ছিল...ইত্যাদি ইত্যাদি।
মানুষটা হাতে স্বর্নের বাড়াবাড়ি রকম মোটা একটা ব্রেসলেট পরতেন। একদিন আমি তাকে বললাম, আপনার পোশাক-আশাক সবই ভাল লাগে কিন্তু এই মোটা ব্রেসলেটটা চোখে লাগে। উত্তরে সবাই যা বলে তিনিও তাই বলতে পারতেন, আমার তো ভাল লাগে, তাই পরি। তাহলে কথা এখানেই শেষ হয়ে যেত।

কিন্তু তার উত্তরটা আমার ভাবনায় জট পাকিয়ে দিল। তিনি বললেন, আমি এটা পরি এই জন্যে যেন অজ্ঞাত জায়গায় মৃত্যু হলে আমার মৃত্যু পর এই ব্রেসলেট দিয়ে আমার মৃত্যু পরবর্তী খরচ চলবে।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম, মিয়া, তোমার দাফন হবে হয়তো কিন্তু কব্জী ব্যতীত কারণ কব্জী কেটে ব্রেসলেটটা যে হাপিস করে দেবে এতে কোন সন্দেহ নাই।  আমি বলব-না-বলব-না করেও বললাম, আপনার মৃত্যুর পর আপনার লাশ পাওয়া যাবে এটাই বা আপনি নিশ্চিত হলেন কেমন করে?
মানুষটা আমার উপর প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়েছিলেন এটা পরে জানতে পারি কারণ তিনি বিভিন্ন জনের কাছে আমার বিস্তর দুর্নাম করেছিলেন।

আমি একদা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, মানুষটা আর ব্রেসলেট পরছেন না। আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু ঘটনার পেছনের ঘটনা জেনে আমার মনটা বিষণ্ন হলো। এই মানুষটাকে এক মসজিদের হুজুর নিষেধ করেছেন বলে তিনি এটা এখন আর পরছেন না। হুজুর নামের এই মানুষটার দৌড় আমার জানা আছে। অশিক্ষিত একজন মানুষ। মাদ্রাসায় কেবল দু-পাতা আরবি পড়েছেন, ব্যস। পেপার পড়েন না, রেডিও শোনেন না। এই মানুষটাকে আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আচ্ছা, বাচ্চারা তো নিষ্পাপ-ফেরেশতা। তো, অন্য ধর্মের দুধের শিশু মারা গেলে তার কি গতি হবে? সে তো কোন পাপ করেনি তাহলে কেন সে বেহেশতে যাবে না'?
তিনি অনেক ভেবে টেবে বললেন, 'হ, বেহেশতে যাইব তবে ওইখানে চাকর হইব'।
আমার বন্ধুসম সেই সিনিয়র মানুষটাকে আর বলা হয়ে উঠেনি, একজন অশিক্ষিত মানুষের কথা আপনাকে বড়ই আমোদিত করল অথচ অন্তত আপনি আমার যুক্তিটাও শুনতে চাইলেন না!

যেমন আমি কায়মনে চাই। মৃত্যুর পর আমার শব নিয়ে কি করা হবে এই নিয়ে আমার কাতরতা নাই বরং এরচেয়ে আমি কাতর যে কারণে আমার মৃত্যুটা আমি যেখানে জন্মেছি, নড়বড়ে পড়ো বাড়ি নামের আমার বাসাটায়, সেখানেই যেন হয়। আমার ধারণা, এতে আমার মৃত্যুযন্ত্রণা কম হবে। এটাই আমার সুতীব্র ইচ্ছা।
বাস্তবে ফিরে আসতে হয়। আমি প্রিন্ট মিডিয়ার কারও কারও কাছে সহায়তা চাইলাম কিন্তু এদের এরচেয়ে অনেক জরুরি কাজ রয়ে গেছে। ভাবখানা এমন, বয়েই গেছে এই সামান্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে। অথচ এদের কাজই এটা, প্রয়োজনীয় সমস্ত ধরনের সুবিধা এদের হাতের নাগালে। আফসোস, এদের এখন তথ্যের পেছনে ছুটতে হয় না, তথ্য এদের পেছনে ছোটে।

একটা মানুষ আর ফিরে আসবে না এই নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যথা নাই! কে নিশ্চিত করে বলতে পারবে এই মানুষটার কেউ-ই নাই। অন্তত জড়িয়ে ধরে রাখার মত কেউ ছিল না! কে মাথার দিব্যি দিয়ে বলতে পারবে, এই মানুষটা কাজ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাঁর কিশোরী মেয়েটি গলা ধরে ঝুলে বলেনি: বাজান, ফির‌্যা আসার সময় আমার লিগ্যা লাল রেশমি চুড়ি নিয়া আইবা কিন্তুক।
মানুষটির পরিবার, এই কিশোরিটি কখনও জানবেই না- মৃত্যুর আগ অবধি বাবার অপেক্ষায় থাকবে। বাজান, এমুন করল ক্যান? মানুডা আর আসল না, রেশমি চুড়িও নিয়া আইলো না...কেন-কেন-কেন?  
কী অভাগা একটা দেশ! কত শস্তা একটা প্রাণ! কী তাচ্ছিল্য একটা মানুষের শেকড় খোঁজার চেষ্টায়...।

*আমার লেখার প্রয়োজনে আমি চাচ্ছি, লাশ নামের এই মানুষটার ছবি এখানে থাক। তবে এই লেখার একেবারে নীচে ছবিটা রাখছি। শবের ছবি দেখতে যাদের সমস্যা আছে তাঁরা দয়া করে এখান থেকেই বিদায় নিন।


.
..
...
....
.....
......
.......

   

No comments: