Sunday, January 3, 2010

শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামানের শপথ বনাম আমার শপথ

ওয়াল্লা, আমি ব্যতীত এই দেশের সবাই দেখি শপথ করে বসে আছেন! আমি বাদ থাকি কেন?

তাঁদের দেখাদেখি আমিও শপথ করিলাম, "আজ হইতে প্রথম আলোর বিপক্ষে আর লিখিব না। লিখিলে...।"

জনাব আনিসুজ্জামান শপথ করেছেন, তিনি তার বাসার কাজের ছেলেকে (বুদ্ধিজীবীরা আবার খানিকটা অন্য রকম করে বলেন, কাজে সাহায্যকারী, বা আমার নাতির সঙ্গে খেলাধুলা করে দিন কাটে ইত্যাদি) নেকাপড়া(!) শেখাবেন।
এই নিয়ে প্রথম আলো বাকবাকুম করে করে এই রিপোর্টটা ছাপিয়েছে কারণ জনাব আনিসুজ্জামান তাদের শপথ কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই কান্ডটা করছেন। আনিসুজ্জামানের হঠাৎ মনে পড়ল তিনি একজন শিক্ষাবিদ, তাঁর কাজ হচ্ছে শিক্ষার আলো ছড়ানো! ভাগ্যিস, প্রথম আলোর শপথের কারণে মনে পড়ল নইলে ইহকালে আনিসুজ্জামানের এটা মনে পড়ার কোন সম্ভাবনা ছিল না।

প্রথম আলো লিখেছে, "...এমনই এক সময়ে শুরু হয় প্রথম আলোর শপথের কার্যক্রম। সমাজের বিশিষ্টজনেরা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শপথ গ্রহন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও শপথ নেন যে তাঁর বাড়ির কাজের ছেলেটিকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন..."।

আমার দৃষ্টিতে প্রথম আলোর রিপোর্টটার সঙ্গে এই ছবিটা একটা অসাধারণ ছবি! কেন বলছি। কারণ এমন একটা ছবি উঠানো চাট্টিখানি কথা না। যথারীতি প্রথম আলো এই ছবিটায়ও ফটো-সাংবাদিকের নাম দেয়ার ক্লেশ স্বীকার করেনি।

ফটো সাংবাদিকের নাম নাই বিধায় বুঝে উঠতে পারছি না ছবিটা কে উঠিয়েছেন? এটা কি এই রিপোর্টের প্রতিবেদক তৌহিদা শিরোপা তুলেছেন, নাকি মতিউর রহমান নিজেই! মতিউর রহমান নিজে ছবিটা উঠিয়ে থাকলে তার প্রতি গভীর ভালবাসা ব্যক্ত করি। কেন, বলছি।
ছবিটার কী টাইমিং, কী ফ্রেমিং! স্কুলের ব্যাগ কাঁধে এই শিশুটি যখন আনিসুজ্জামানের কাছ থেকে পড়া বুঝে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই জানালার পর্দা বাতাসে সরে গিয়েছিল, ফাঁক দিয়ে এটা
মতিউর রহমানের চোখে পড়ে, মতিউর রহমান ফট করে এই ছবিটি তুলে ফেলেন, ধাম করে পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন!
আর এটা পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাঠকআমি শপথ করলুম!
আপনারা বলবেন, কাকতালীয়। বলতে পারেন কিন্তু এমন কাকতালীয় আমাদের বেলায় ঘটে না কেন? কেন-কেন-কেন? এটা একটা গবেষণার বিষয়!

এটাও কি কাকতালীয় না? এই ছেলেটির কথা প্রথম আলো লিখেছে, "...গণিত বেশি ভালো লাগে। গত পরীক্ষায় গণিতে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছি।"
 

কী টাইমিং, প্রথম আলো শপথ অনুষ্ঠান চালু করল। এরিমধ্যে আনিসুজ্জান প্রথম আলোর শপথের সঙ্গে সুর বা গলা মিলিয়ে শপথ নিলেন। তারপর তাঁর কাজের ছেলেকে গুলশানের অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে ( অটো প্রমোশন!) ভর্তিও করালেন। সে আবার পরীক্ষাও দিল। গণিতে বেশি নম্বরও পেল। নিয়মিত আনিসুজ্জামানের কাছ থেকে পড়াও বুঝে নিতে থাকল।
আর বাতাসে জানালার পর্দাও উড়ল। আনিসুজ্জান স্যারের বাসার সামনেই মতিউর রহমান সাহেবের গাড়ির টায়ার পাংচার হলো। জানালা দিয়ে মতিউর রহমান দেখেও ফেললেন (তিনি তখন জেনারেলদের সঙ্গে মিটিং-এ সেনানিবাসে যাচ্ছিলেন)? জেনারেলদের সঙ্গে মিটিং বাতিল করে ক্যামেরা বার করলেন...।
এত্তো এত্তো কাকতালীয় যে কোথায় রাখি!

আর ছবিটা দেখে আপনারা ভাবছেন বুঝি খুব সোজা! আরে না, সামনে গেলুম আর দুম করে উঠিয়ে ফেললুম, এতো সোজা না। আনিসুজ্জামান এবং তাঁর কাজের ছেলে দু-জনের একজনও টের পায়নি, পেলে কী আর এরা উঠাতে দিত? ছবিটায় পেছনের জানালাটা দেখছেন না? অনুমান করি, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ওই জানালায় উঠে এই দুর্দান্ত ছবিটা উঠানো হয়েছে। অবশ্য চিন্তায় আছি, আনিসুজ্জামানের বাসাটা এক তলা হলে সমস্যা নাই কিন্তু বহুতল হলে তো সর্বনাশ! প্রাণ হাতে নিয়ে পানির পাইপ বেয়ে উঠতে মতিউর রহমানকে কি কষ্টই না করতে হয়েছে, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। রাখে আল্লা মারে কে- আল্লা বাঁচিয়েছেন!

যাক, তবুও ভাল আনিসুজ্জামান এই শপথের কল্যাণে বিস্মৃত হওয়া তাঁর শিক্ষক পেশার কথা আবারও মনে করতে পেরেছেন।
শপথ বলে কথা!
এদের শপথের ডাকে হাতি পর্যন্ত ছুটে এসেছিল, আনিসুজ্জামান কোন ছার!


শুনিতে পাই, হাতি নাকি শপথ করিয়াছে, সে আর কলাগাছ খাইবে না, বাঘ মানুষ মারিবে না। ইহারা টিপসহির স্থলে 'পা-ছহি' দিয়াছে, শপথ ভঙ্গ করিলে পশু আইনের দন্ন্ডিত হইবে।
ভাল কিন্তু এই যে হাতি এবং বাঘের শপথের কারণে যে কলাগাছ এবং মানুষ উদ্বৃত্ত হবে এদের গতি কি? প্রকৃতিক ভারসাম্য এলোমেলো হয়ে গেলে এর দায় কার উপর বর্তাবে?

এই প্রশ্নটা মতিউর রহমানের কাছে করার উপায় কি? এদের মেইল করলে এর উত্তর পাওয়া নিয়ে অনেকখানি জটিলতা আছে। প্রায় বছর ছুঁই ছুঁই, এদের একটা ভুল ধরিয়ে দিয়ে একটা মেইল করে এখনও এর উত্তরের অপেক্ষায় আছি। আমার ধারণা, এরা মেইলে প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করে। কবুতরের পায়ে বেঁধে পাঠায়, কবুতরমেইল। হয়তো রাস্তায় কেউ ওই কবুতরটা ধরে খেয়ে ফেলেছে। এ জন্য অবশ্যই মতিউর রহমানকে দায়ি করা চলে না। কবুতরটার জন্য আমি চোখের জল ফেলি, বেচারা!

আফসোস, সংগ্রামের মত পত্রিকাগুলো আল মাহমুদের কলম কিনে নেয়, প্রথম আলোর মত পত্রিকা আনিসুজ্জামানকে। ভঙ্গিটা খানিকটা অন্য রকম, চতুর এই যা তফাৎ!

*পাদটীকা: একজন আমার এই সাইটে এসে দুম করে একটা মন্তব্য করেছিলেন, ভাইজান, আপনি কি সুশীল? আমি এর উত্তরে বলেছিলাম, নারে ভাই, আমি সুশীল না, শীল, (অভিধানে শীলের অর্থ খুঁজে লাভ নাই এটা আঞ্চলিক শব্দ। ভদ্রস্থ ভাষায় ক্ষৌরিক ওরফে নাপিত) নিম্নবর্ণের শীল সম্প্রদায়ের মানুষ। একজন শীল টাইপের মানুষের কাছে বেশি আশা করাটা দুরাশা।
তাই আমি শপথ ভঙ্গ করিলে ইহাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নাই। আনিসুজ্জামানের মত সুশীলরা শপথ নিয়া কস্তাকস্তি করুন আমার কি!

**ছবি-সূত্র: প্রথম আলো