Saturday, January 2, 2010

কালের সেরা সুদখোর, আপনাদের জন্যও অভিনন্দন!




গতকাল ছিল বছরের প্রথম দিন। বছরের শুরুতে এই দেশের সেরা সন্তানদের আমাদের প্রতি (আমজনতা, ব্লগের ভাষায় 'ম্যাংগো পিপল') শুভেচ্ছা জানানোর একটা রেওয়াজ চালু আছে।

এটা দোষের কিছু না। এতে আমাদের আপত্তি করার কিছু নাই, আনন্দিত, গর্বিত হওয়ারই কথা। বড় মানুষদের বাতচিত শুনে এদের মত বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখা।
প্রথম আলোর মাধ্যমে বা মোটা দাগে প্রথম আলোর ইচ্ছানুসারে এবার আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, বাণী দিয়েছেন, এই দেশের দুই জন ব্যক্তি। অবশ্যই এঁরা কেউই সাধারণ নন। সাধারণ হলে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় দূরের কথা কোনো পাতাতেই স্থান পেতেন না।

একজন হচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং
অন্যজন জনাব ফজলে হাসান আবেদ। একজন পূর্বেই নোবেল পেয়েছেন অন্যজন হালে নাইট উপাধি পেলেন। দু-জনই আমাদের দেশের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছেন। কালচে সবুজ পাসপোর্টটার প্রতি বৈদেশিদের দৃষ্টি খানিকটা নরোম করে এনেছেন। এইজন্য আমি টুপি খুলে সম্মান জানাই।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, " ২০১০ সাল হোক দিনবদলের বছর...আমাদের দেশের তরুণ, তরুণীদের গতি আরবি ঘোড়ার গতি..."।
জনাব ফজলে হাসান আবেদ বলেছেন, "বাংলাদেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধিই প্রত্যাশা...বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে..."।

আমি এক লেখায় বলেছিলাম, "৩৮ বছর নাকি ৩৮০ বছর চলে গেছে তাতে কী? সুদখোরকে সুদখোর বলব, রাজাকারকে রাজাকার, ঘুষখোরকে ঘুষখোর। এদের কে চুমো দিল নাকি কোলে বসিয়ে রাখল তাতে কী আসে যায়! অন্যায় করলে আমি কেবল রাজাকারের বিচারই চাইব না, ঘুষখোর-সুদখোরের বিচারও।"

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীন ব্যাংকের অত্যাচার ভুলে যাই কেমন করে? আমার কানে নোবেল পুরষ্কারের মেডেলের ঠোকাঠুকির শব্দ এবং সেই কিশোরীর নুপুরের [১] শব্দের মধ্যে কোন ফারাক নাই। কিস্তির টাকা দিতে না পেরে কতশত মানুষ আত্মহত্যা করেছে তার সবগুলোর হিসাব কি আমরা জানি? দয়া করে মিডিয়া যা জানিয়েছে কেবল তাই জানি। মিডিয়া তো আবার এদের পাঞ্জাবি, ফতুয়ার পকেটে 'সুসু' করে!


আচ্ছা, আমাদের সরকার বাহাদুররা কি আদৌ হিসাব করে দেখেছেন গ্রামীন ব্যাংকের সুদের হার কত? এমন চড়া সুদ আর কোথায় নেয়া হয় দয়া করে একটু বলবেন?
ফজলে হাসান আবেদের স্যারের ব্র্যাক ব্যাংক গ্রামীন ব্যাংকের তুলনায় খানিকটা সহনীয়। তারপরও এদের সুদের হার কত, জানেন? প্রায় চব্বিশ পার্সেন্ট! ভাবা যায়?
চব্বিশ পার্সেন্ট সুদ দিয়ে বাংলাদেশে লাভজনক কোন সৎ ব্যবসা করা যায় আমি জানি না, ড্রাগস-নারি-শিশু পাচারের ব্যবসা হলে অবশ্য অন্য কথা। জানালে সেই ব্যবসাটা আমি করতে চাই। স্যার আবেদ, বলেন না, প্লিজ।

অনেকে বলবেন, তাহলে লক্ষ-লক্ষ মানুষ নিচ্ছে কেন? এই মানুষগুলো আদৌ বুঝে-শুনে নিচ্ছেন কি না এতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে! এইসব ব্যাংকের হিসাব এমন জটিল বুঝে উঠা দায়। হিসাবটা বোঝার জন্য দিনের পর দিন আমি এদের পেছনে ঘুরেছি তারপরও আমার পক্ষে বুঝে উঠাটা ছিল প্রায় অসম্ভব।

আনুমানিক একটা হিসাব এমন, দশ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মাসে চল্লিশ হাজার টাকা কিস্তি, ছত্রিশ মাসে পরিশোধযোগ্য। বোঝানো হবে মাসে এগারো হাজার টাকা সুদ, যে নেয় তার আনন্দের শেষ নাই। বাহ, এতো কম!
ধরা যাক, পয়ত্রিশটা কিস্তি দেয়ার পর ব্যাংকের টাকা অবশিষ্ট আছে চল্লিশ হাজার টাকা (প্রতি কিস্তি দেয়ার পরপরই কিন্তু মূল টাকা দশ লক্ষ থেকে পুঁজি ক্রমশ কমছে, এটা আমরা মাথায় রাখি না), সেই চল্লিশ হাজার টাকার জন্যও কিন্তু এগারো হাজার টাকা সুদ। অর্থাৎ দশ লক্ষ টাকার জন্যও এগারো হাজার টাকা, চল্লিশ হাজারের জন্যও এগারো হাজার!
ব্যাংকের লোকজন মুখে বলবে ফ্ল্যাট রেট পনেরো পার্সেন্ট কিন্তু অবশেষে দাঁড়ায় চব্বিশ পার্সেন্ট। এই হিসাবগুলো সাধারণ ব্যবসায়িরা করে দেখেন বলে আমার মনে হয় না, করলেও নিরুপায় হয়েই তারা নেন। কারণ অন্য কোন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক স্থাবর সম্পত্তি ব্যতীত ঋণ দেয় না।

তদুপরি লোকজন এদের কাছ থেকে ঋণ নেন, কেন? যেমন বাংলাদেশের অনেক অভাগা মানুষ যে টাকা খরচ করে বিদেশে মরুভূমিতে বছরের পর বছর পড়ে থাকেন, ফিরে আসার পর দেখা যায় যে টাকা খরচ করে গিয়েছিলেন সেই টাকাই নিয়ে আসতে পেরেছেন। তাহলে লাভ কী? কেন ছুটছেন দেশ ছেড়ে, ভাগ্য ফেরাবার আসায়? ছেলে বিদেশ ফেরত, বিয়ে-শাদীতে সুবিধা হয়; কেউ বেকার বলল না এটাও একটা কারণ হতে পারে।
বাস্তবে লাভ যা হয়, জমির কাছ থেকে, দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রতিশোধ। অজান্তেই তার অভ্যাসে পরিবর্তন (বৈদেশি চাল, ঠাটবাট)- দুশো টাকার 'রেডবুল' তার কাছে নস্যি! জমির কাছে সে আর ফিরে যেতে পরে না, একদিন আবিষ্কার করে রেশনের দোকানে তার হাত ছড়ানো। অবিকল ভিক্ষুকের ভঙ্গি!

এই সুদখোরদ্বয়, এঁরা আমাদের জন্য বিরল সম্মান নিয়ে এসেছেন এটা সত্য। খোদা না খাস্তা, জনাব গোলাম আজমও [২] যদি এঁদের কাছাকাছি কোনো একটা সম্মান নিয়ে আসতে পারেন তাহলে গোলাম আজমকেও [৩] আমরা মাথায় তুলে রাখব, অনায়াসে তাঁর অতীত ভুলে যাব। ইনশাল্লাহ...


সহায়ক সূত্র:
১. নূপুর...: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_3333.html
২. গোলাম আজম, ১: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_29.html
৩. গোলাম আজম, ২: http://www.ali-mahmed.com/2007/07/blog-post_3179.html

*ছবি-ঋণ: গুগল