Search

Friday, June 26, 2015

নিতান্তই গৃহপালিত...!

একজন ‘কায়কাউসের ছেলে’ নামে একটা জিনিস প্রসব করেছিল। কে পুরীষ প্রসব করবে কে করীষ এটা যার যার অভিরূচি! এই নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল না কিন্তু তবুও তখন লিখেছিলাম [১], কেন?
কেবল একটা উদাহরণ এখানে দেই- অহেতুক রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে ভঙ্গিতে লেখা হয়েছে এই লেখার পেছনের মানুষটাকে আমার মনে হয়েছিল ইতরবিশেষ! আর এই ইতরকে প্রথম আলো ‘জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার’-এর নামে যেভাবে জন্তু থেকে মানুষের ভুবনে নিয়ে এসেছিল এটাকে আমার কাছে মনে হয়েছিল স্রেফ ইতরামি।
আচ্ছা, এই ইতর যেভাবে রবীন্দ্রনাথের নাম ব্যবহার করেছে সেই নামের স্থলে প্রথম আলোর সর্দারদের কারও নাম বসিয়ে দিলে কেমন হয়?

আসলে প্রথম আলোর যে শ্লোগান “...চোখ খুলে দেয় প্রথম আলো”, আমার ধারণা ছিল প্রথম আলো এটা রূপক অর্থে ব্যবহার করে। ওরে, আমি কী জানি ছাই এটা বলে সত্যি-সত্যি আমাদের চোখ খুলে ফেলার কথা বলা হচ্ছে। চোখ উপড়ে ফেলে আমরা অন্ধ- তখন প্রথম আলো আমাদেরকে হাতে ধরে ধরে শেখাবে এটা, এটা একটা ‘করীষের ছেলে’!

ওরে কত রঙ্গ রে! এরপর আমরা প্রথম আলোর বিজ্ঞপ্তি থেকে জানলাম, “সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা প্রথমা প্রকাশন ঘোষিত এ বছরের ‘জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার ১৪২১’ বাতিল করা হয়েছে। ... পুরস্কারের শর্ত ছিল, পাণ্ডুলিপিটি প্রথমা থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে।... বই প্রকাশের আগেই পাণ্ডুলিপিটির উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকাশিত হয়ে যাওয়ায় এ পুরস্কার বাতিল করা হয়েছে বলে প্রথমা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। শিগগিরই ‘জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার ১৪২২’-এর জন্য নতুন করে পাণ্ডুলিপি আহ্বান করা হবে।...”।
(প্রথম আলো ১৬ জুন ২০১৫)

শর্ত ছিল? কী আজব শর্ত রে, বাবা! আমার তো ক্যামেরুনের বাফুট প্রদেশের রাজাটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এই রাজার ১০০ বউ ৫০০ বাচ্চা! মজার ব্যাপার হচ্ছে রাজা হওয়ার আগে তার ছিল মাত্র ২ বউ। ওই দেশের নিয়ম হচ্ছে রাজা হতে হলে আগের রাজার সবগুলো বউ-বাচ্চাকে নিজের বউ-বাচ্চা বলে স্বীকার করে নিতে হয়।
শর্ত বলে কথা!
তো, কী আর করা দ্য কাউ- গৃহপালিত সাহিত্যিকগণ কলম দিয়ে যখন পশ্চাদদেশই চুলকাবেন তাহলে সানন্দে মেনে নিন এই শর্ত।

এমনিতে কাউকে পুরস্কার দিয়ে সেটা ফিরিয়ে নেওয়ার এই ভঙ্গিটা অদ্ভুতুড়ে নাকি কুতকুতে সে প্রসঙ্গ নাহয় থাকুক তবে...। ‘পুরস্কারের শর্ত ছিল, পাণ্ডুলিপিটি প্রথমা থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে’। তা শর্ত ভঙ্গ হয়েছে? বেশ তো, শর্ত ভঙ্গ করায় প্রথমা থেকে প্রকাশিত হবে না এটা বলাটাই যে সমীচীন ছিল।
প্রথম আলো বিভিন্ন পেশার লোকজশনকে পোষে এটা আমরা জানতাম কিন্তু সাহিত্যিক পোষার শখ যে এমন তীব্র এটা আমাদের জানা ছিল না।

সহায়ক সূত্র:
১. কুতুয়া রে: http://www.ali-mahmed.com/2015/01/blog-post_27.html

Thursday, June 25, 2015

সৈয়দ মহসীন আলী, মন্ত্রীমহোদয়, করকমলেষু।

আমাদের মন্ত্রীমহোদয় একে-ওকে এন্তার কথা বলেন আমাদের জানার উপায় নেই কিন্তু সাংবাদিক মহোদয়কে 'চরিত্রহীন, লম্পট' বলেছিলেন, সাংবাদিক মহোদয়গণ চটে গেলেন।

ফাঁকতালে আমরাও জেনে গেলুম।



হালে সংসদভবনে মন্ত্রীমহোদয় গান গাইলেন। এমনিতে এই সরকারী ভবনটার তো ভাড়া-টাড়ার বালাই নেই! সরকারীভবনে বিদ্যুতবিল দেওয়া লাগে না, ক্যান্টিন ফ্রি- খরচ তেমন আর কীই-বা! তো, এখানে কেউ গান গাইলে সমস্যা কোথায়?
এমনিতে আমি বিভিন্ন সময় লিখে থাকি, প্রত্যেক জায়গার একটা নিজস্ব ভাষা আছে। গুরুগম্ভীর কোনও আলোচনায় কেউ টেবিলে উঠে ‘ধুম মাচা দে’ গেয়ে উঠলে ভাল দেখায় না ...। এখন আর এটা লেখার যো রইল না, বুঝলেন? কেবল ভালই দেখায় না, অতি উত্তম দেখায়। কেন বলছি।
স্পিকার মহোদয়কে দেখলাম সমাজকল্যাণমন্ত্রী অন্য মন্ত্রীদেরকে ভাই বলায় এই ‘ভাই’ শব্দটা এক্সপাঞ্জ করেছেন অথচ গান এক্সপাঞ্জ করেননি কারণ এটা এক্সপাঞ্জ করার মত বিষয় না। আমাদের দূর্ভাগ্য, সংসদসদস্যদের মধ্যে কোনও নৃত্যশিল্পী নেই!

অল্প দিন পূর্বে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নাকি এক সভায় বলছিলেন তাঁর ‘সিগারেট খাওয়া’ প্রসঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘তাঁর পোয়া’ পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে কিন্তু মুখ খুলেনি বলে তিনিসহ প্রচুর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে যান। পরে সেই পোয়াটাকে পাকবাহিনী মেরে ফেলে। এই বেদনায় সেই যে তিনি সিগারেট খাওয়া ধরলেন আজও স্টিম ইঞ্জিনের মত ভকভক করে ধোঁয়া ছাড়ছেন যত্রতত্র।
এখন আজেবাজে নিউজপোর্টালে এই ভুবনটা ভরে গেছে। তাই এমনই এক পোর্টাল থেকে আগত এই খবরটা নিয়ে গা করার কিছু ছিল না। এরিমধ্যে কেউ-কেউ বিস্তর আঁক কষে দেখিয়ে দিলেন যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল তখন আমাদের সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলীর বয়স ছিল তেইশ বছর! অতএব...।

এদিকে এই তথ্যে আবার অনেক স্থানে কান্নার রোল পড়ে গেল। আহা-আহা, মানুষটা বুকে পাথর বেঁধে সিগারেটের উপরই বেঁচে আছেন। একজন তো এমন একটা লেখা লিখলেন তিনি মন্ত্রী মহোদয়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে পূর্বে যেসমস্ত লেখাগুলো লিখেছেন তা লিখে ভারী অন্যায় করেছেন ভবিষ্যতে আর এমন অন্যায় করবেন না। ওই ভদ্রলোকের লেখা পড়ে মনে হচ্ছিল পারলে তিনি উড়োজাহাজের চাকার নীচে হাত রেখে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে খানিকটা আরাম পাবেন।
পরে অবশ্য মন্ত্রীমহোদয়ের বিষয়টা ‘কিলিয়ার’ হলো! তিনি তাঁর পোয়া বলতে সহযোদ্ধার কথা বলেছেন। যে সহযোদ্ধাকে তিনি বড়ো ‘ছেনেহ’ করতেন।

যাই হোক, মন্ত্রীমহোদয়ের প্রসঙ্গ থাকুক। এবার অন্য প্রসঙ্গ-‘একালের কলম মুক্তিযোদ্ধাদের’ সঙ্গে আমার খানিকটা দ্বিমত আছে। আমার বক্তব্য ১৯৭১ এবং ২০১৫ এক না- যেটা আমি এক লেখায় লিখেছি, '১৯৭১ সাল এবং ২০১৪ এক না' [১]।
আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, এই দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা কী অবলীলায়ই-না অন্যের জমি অন্যায় ভাবে নিজ দখলে রাখেন।
এখন এই নিরেট সত্যটা কি আমরা চেপে যাব? কোনও মুক্তিযোদ্ধা অন্যায়-অপরাধ করলে সেটা কি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ বলে গণ্য হবে না? আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ফ্যাক্ট, ফ্যাক্টের সঙ্গে ফ্যান্টাসি মেশাব কেন আমরা?

সালটা সম্ভবত ২০০৬ হবে। ব্লগস্ফিয়ারে তখন মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে লিখি। মুক্তিযুদ্ধে একজনের কথা লিখতে গিয়ে সব লিখলাম কেবল এই জায়গাটা চেপে গেলাম, পাকবাহিনীর ভয়ে তিনি বাথরুমে লুকিয়েছিলেন। কিন্তু অরূপ কামাল ঠিকই চেপে যাওয়া অংশটা তুলে দিলেন। সেই দিনই এটা শিখলাম সত্যকে সত্যের মতই থাকতে দিতে হয়, এটাই সত্যের জোর- প্রকারান্তরে সত্যকে গোপন করাটাও এক প্রকারের অন্যায়। সত্যের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করলে সত্যের জোরটা নড়বড়ে হয়ে যায়।

* আজ পত্রিকা থেকে জানলাম (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ জুন ২০১৫, পৃ: ১১), "...সর্বশেষ ১০ জুন জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা বলে সম্বোধন না করায় মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন...।" 

সহায়ক সূত্র:
১. ১৯৭১ সাল এবং ২০১৪ এক না: http://www.ali-mahmed.com/2014/03/blog-post_7.html 

Thursday, June 18, 2015

লাখের বাতি- লাখ টাকার প্রিন্স!

আগেকার সময়ে লোকজন লাখপতি হলে নাকি লাখের বাতি জ্বালাতো। এখন তো আর সেই দিন নাই রে, বাপু। এখন লাখপতি হলে লোকজন প্রিন্স হয়ে যায়। বাংলাদেশের ব্যাংকে নাকি প্রিন্স মুসার লাখ টাকা আছে! আজকাল ছিনতাইয়ের যে ভয় লোকজন ভয়ে অন্তর্বাসের ভাঁজে ‘ট্যাকাটুকা’ রাখে। মুসা সেই ঝুঁকি নেননি, তিনি ব্যাংকে রেখেছেন। মুসার বুদ্ধির আমি তারিফ করি।

এই মুসার কথা আমি জেনেছিলাম, সালটা ঠিক মনে নেই। তখন সবেধন নীলমনি ইলেকট্রনিক মিডিয়া বলতে বিটিভি। বিটিভিতে মুসার একটা সাক্ষাৎকারের মত নিচ্ছিল। ফাঁকে ফাঁকে মুসার এটা-সেটা দেখাতে দেখাতে তার জুতার কালেকশন দেখানো শুরু করল। তখন তো আর লেখালেখি করি না যে লিখে রাগ কমাবো। সাদাকালো ফিলিপস ২০ ইঞ্চি টিভির স্ত্রিণে টিস্যু ছুড়ে মেরেছিলাম মনে আছে। টিস্যুর সঙ্গে ‘থুক’ ছিল এটা এখানে উল্লেখ করাটা জরুরি না। শক্ত কিছুই হয়তো ছুড়তাম কিন্তু টিভিটা আমার ছিল না, ছিল আমার বাপের। সাহস হয়নি!

যাই হোক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ক্ষেপে চটে গেলেন। চটে গিয়ে চটি নিয়ে এলেন। হুবহু মনে নেই অনেকটা এমন; গুছিয়ে যেটা বলছিলেন যেটা হচ্ছে, ‘বিটিভি কি আমার ছেঁড়া চটিটা দেখাবে টাকা যা লাগে দেব’।
সেই প্রথম মুসা স্যারের সঙ্গে আমার ‘চিনপরিচয়’। এরপর ‘চিত্রবাংলা’ নামের আউলা-ঝাউলা টাইপের একটা পত্রিকায় মুসা মহোদয়ের বিশদ কাহিনী এই আছে-সেই আছে পড়লাম। সেখানে এটাও পড়েছিলাম প্রিন্সেস ডায়না নাকি মুসার জন্য পাগল ছিলেন। পাগল না হয়ে উপায় আছে যা একখান ‘পিগার’ রে মাইরি! তখন মুসাকে নিয়ে লিখেছিলাম [১]।
মুসা একটা আবদার করেছিলেন তার পরিবারকে ‘সেভেন স্টার ফ্যামেলি’ আখ্যা দেওয়া হোক [২]।

হালে মুসার সাহেবের একটা ভিডিও দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেই ভিডিওটার শুরু হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তারপরই বলা হচ্ছে দেশ স্বাধীন হলো, মুসা মিয়া দেশের হাল ধরলেন বৈদেশে লোক পাঠিয়ে [৩]।
থাকুক সেসব পুরনো কথা। নতুন কথা হচ্ছে ফেসবুকে একটা ইভেন্ট খোলা হয়েছে মুসা লোকজনের সঙ্গে দেখা করবেন। দেখা করবেন ৭ আগস্ট অথচ এখন পর্যন্ত ২৩৪০১ জন দেখা করার জন্য অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। আমি যখন লেখাটা লিখছি এই সংখ্যাটা আরও বেড়েছে বলেই অনুমান করি। আগস্ট মাস আসতে আসতে সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বঙ্গাল বলে কথা! মুসার অনুরক্ত লোকজনেরা মুসাকে ১ টাকা করে দিয়ে আসলেও মুসা অনায়াসে ‘ক্রোড়পতি’ বনে যাবেন। তখন মুসাকে আমরা ‘কুটিপতি’ বলে সম্বোধন করব। ‘মুসা বান গিয়া ক্রোড়পতি’...।

সহায়ক সূত্র:
১. যাত্রার প্রিন্স: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_2395.html
২. সেভেন স্টার ভাঁড়: http://www.ali-mahmed.com/2011/01/blog-post_08.html
৩. একজন নুলা মুসা এবং আমাদের মিডিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2014/12/blog-post_19.html

Wednesday, June 17, 2015

পতাকা, তোমায় দিলাম মুক্তি!

আলবদর সম্পর্কে দৈনিক সংগ্রাম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ এ লিখেছিল, “আলবদর একটি নাম। একটি বিস্ময়! আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা! যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী আলবদর সেখানেই। যেখানেই দুস্কৃতিকারী, আলবদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুস্কৃতিকারীদের কাছে আলবদর সাক্ষাৎ আজরাইল!”

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ জানান, “আলবদররা যখন পালিয়ে যায় তাদের হেডকোয়ার্টার থেকে পাওয়া যায় বস্তা বোঝাই মানুষের চোখ- এই চোখগুলো যে বাঙ্গালীদের এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই”।
( দৈনিক পূর্বদেশ, ১৯ জানুযারী, ১৯৭২)

এই আলবদরপ্রধান মুজাহিদ। দেশ স্বাধীন হলো। কেউ বুকে হাত দিয়ে বলুক, কেউ কী কল্পনাও করতে পেরেছিল, এই বদরপ্রধানের গাড়িতে পতপত করে এই স্বাধীন দেশের পতাকা উড়বে? আমার কাছে তো মনে হয় এটাই এক অলীক, এটাই এক বিস্ময়- যেটা আজগুবি কোনও মুভিতেও অবাস্তব মনে হবে। অথচ এটাই বাস্তব।
হায় পতাকা, হায়!

যাও পতাকা, আজ তোমায় দিলাম মুক্তি...। 

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশের সেরা সন্তানদের খুন হওয়ার পেছনে আল বদরের নাম সরাসরি জড়িয়ে আছে। কয়টার কথা বলা যাবে এখানে?
১.  নিধন: শহীদুল্লাহ কায়সার: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post.html
২. নিধন:অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_03.html
৩. নিধন: ডাক্তার আলীম: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_02.html
৪. নিধন: ড. আবুল খায়ের: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_06.html
৬. আনোয়ার পাশা, রাশীদুল হাসান: http://tinyurl.com/pech3ad

*আর যারা এটা পূর্বে দেখেননি তাদের জন্য মওদুদির ছেলের ভিডিওটা এখানে দিয়ে রাখছি। যেখানে সে স্পষ্ট করে বলেছে আল বদর, আল শামস ১৯৭১ সালে কেমন নৃশংসতা চালিয়েছিল! ভিডিও ১ [*]:
এখানে সাক্ষাৎকারে মওদুদীর ছেলে হায়দার ফারুক মওদুদি বলছেন, "...আমরা নয় ভাই-বোন। কিন্তু আমার বাবা (মওদুদি) কখনই চাননি আমরা কেউ জামাতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হই। একজন ড্রাগ ডিলার যেমন তার ড্রাগের প্যাকেট বাড়ির বাইরে রেখে আসে তেমনি আমার বাপও জামাতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের যোগসূত্র বাসায় ভেতরে আসতে দিতেন না।..." ...ভিডিও ২ [*]:
জামাতে ইসলামীর জনক মওদুদীর ছেলের সাক্ষাৎকার থেকে আমরা আরও জানতে পারি, "...এবং কেমন করে আইএসআই এর সহায়তায় এই দেশে আল-বদর আল-শামস সৃষ্টি করা হয়েছিল। ওরা কেমন হিংস্র ছিল! খুররম মুরাদের প্ররোচনায় একেক লাইনে ১৫জন করে বাঙালিকে দাঁড় করিয়ে কেমন করে পাখির মত গুলি করে মারা হয়েছিল! লিংক: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_5646.html
... 
(ভাল কথা, মুজাহিদের গাড়িতে পতাকা উড়ছে এমন ছবি কারও কাছে থাকলে দয়া করে কি শেয়ার করবেন। এখন খুঁজে পাচ্ছি না, ছবিটা প্রয়োজন। )

Saturday, June 13, 2015

পিঁপড়া সমাচার।


আজকের অতিথি-লেখক, Adil Abir ।
এমনিতে তিনি নিজেকে অজ্ঞান পার্টির সদস্য বলে দাবী করে থাকেন। লোকজনকে অজ্ঞান-করা বিষয়ে তিনি সিদ্ধহস্ত কিনা জানা নেই (অজ্ঞান করার পর অপারেশন টেবিল থেকে তাঁর হাত ফসকে কেউ পালিয়েছে এমনটা শোনা যায়নি) কিন্তু বিচিত্র বিষয় নিয়ে লেখার জন্য তিনি সিদ্ধহস্ত। তিনি জানাচ্ছেন:

▪ সবচেয়ে বড় সাইজের ant হল : Elephant.
▪ সবচেয়ে মেধাবী ant কে বলা হয়: Brilliant
▪ যে ant সুন্দর পোষাক পরে থাকে : Elegant
▪ টাকা পয়সার হিসাব রাখে যে ant : Accountant
▪ Ant ইন আ রিলেশনশিপ উইথ Tics : Antics
▪ Ant কে সুস্থ করার জন্য যে ওষুধ : Antibiotic
▪ যে ant এর বয়স ১০০ বছরের বেশী : Antique
▪ Ant এর টুকরা : Remnant
▪ জমাট বাধা ant : Coagulant
▪ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে যে ant: Sergeant
▪ দেশের ভিতর বিদেশী ant : Immigrant
▪ মা হতে চলেছে যে ant : Pregnant
▪ Ant এর বাচ্চা: Infant
▪ বিরক্তিকর ant: Irritant
▪ জঙ্গি ant: Militant
▪ জোড়া বেধে চলে যে ant: Concomitant
▪ সাহায্যকারী ant : Assistant
▪ সন্তান জন্ম দানে অক্ষম যে ant: Impotant
▪ খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে ant: Important
▪ সেনাবাহিনীতে চাকরী করে যে ant: Lieutenant
▪ Ant -এর খাবার বিক্রি হয় যেখানে: Restaurant
▪ যে Ant -এ খেলে আমাদের body সুরক্ষিত থাকে: Antibody
▪ অহংকারী পিঁপড়া: Arrogant
▪ প্রভা বিচ্ছুরন করে যে ant : Radiant
▪ বিবর্তিত ant: Mutant
▪ উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত ant: Exuberant
▪ পক্ষাঘাতে অচল যে ant: Stagnant
▪ সুগন্ধি বিলায় যে ant: Deodorant
▪ ক্যান্সার হয় কামড়ালে যে ant: Malignant
▪ যে মহাদেশে ant টিকা নিতে যায়: Antarctica
▪ সর্বদা হাজির রয় যে ant: Constant
▪ এক্ষুনি চাই টাইপ গোয়ার যে ant: Instant
▪ বিকারহীন যে ant: Relaxant
▪ বিশাল ব্যবসায়ীর ঘরে থাকে যে ant: Merchant
▪ যে সিটি ant -দের তীর্থস্থান: Atlanta
▪ রাসায়নিক বিক্রিয়া বিরোধী ant: Antagonist

* ছবি সূত্র: কলাম্বিয়ান ভাস্কর Rafael Gómezbarros একটি প্রদর্শনী হয় লন্ডনের সাচি গ্যালারিতে । ছবিটি ওখানে তোলা হয়েছিল ২০০৭-এ ।

Wednesday, June 10, 2015

মোদি এবং গদি!

গদি জিনিসটা বড়োই বিচিত্র! কী অবলীলায়ই না বদলে ফেলে মানুষকে, কালে-কালে নরাধম হয়ে উঠে অধম থেকে উত্তম। আবার শিশু হয়ে যায় পশু, পশু হয় শিশু। আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আমাদের দেশে যে জয়জয়কার এ কেবল তিন উল্লাস না, তেত্রিশ উল্লাস অথচ এই মানুষটারই হাতে লেগে আছে গুজরাট দাঙ্গায় বড়ো অবহেলায় ভেসে যাওয়া কতশত গ্যালন রক্ত! যথারীতি সেই রক্ত পশুর না, মানুষের! রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না। আর আমরা কী ভুলে গেছি মোদির হামবড়া সেইসব কথা [১]!

এমনিতে অবশ্য আমরা বড়ো বিস্মৃতপরায়ণ জাতি- গোল্ডফিসের ন্যায় অতি দ্রুত ভুলে যাওয়ার রোগ আছে আমাদের—গোল্ডফিস জাতি! কেবল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই প্রোটোকল তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন না- আমাদের মিডিয়া তো হাত না পায়ের নাটবল্টু খুলে লিখছে, এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকাটা জরুরি কিন্তু এই জন্য হাত-পার জয়েন্ট খুলে ফেলার প্রয়োজন পড়ে না।

সুপার পাওয়ার-প্রচন্ড ক্ষমতাধর একজন বুদ্ধিমান মানুষ, যার দৃষ্টি বহু দূরে সে দুবলাপাতলা মানুষদের সঙ্গে খিটিমিটি এড়িয়ে চলবে এটাই স্বাভাবিক। তবুও...। ছিটমহল সমস্যার সমাধানের জন্য এই মানুষটা লম্বা এক সেলামের হকদার। কেবল এই একটা কারণে যদি রক্তের দাগটা ফিকে হয়। আর বাকীসব...? এক হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ তো আর ভারত মাগনা দেবে না। ত্রিপুরায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সময় আমাদের তিতাস নদী, রাস্তাঘাট লন্ডভন্ড হয়েছিল [২] এটা আমাদের চেয়ে বেশী কে জানে।

যাই হোক, নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে, তার অজানা কর্মকান্ড নিয়ে লিখেছেন প্রথিতযশা সাংবাদিক, আরাফাতুল ইসলাম।
“ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইটার, ফেসবুকে বেশ তৎপর। তিনি কোন দেশ সফরে যাওয়ার আগেই সেদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বিভিন্ন পোস্ট ট্রেন্ড করতে শুরু করেন। আর এজন্য শুধু জনতার উপর ঠিক ভরসা করেন না তিনি। মাঝে মাঝে বড় অংকের অর্থও খরচ করেন।

কয়েক মাস আগে জার্মানি সফর করেছিলেন মোদি। সেসময় ফেসবুকে তাঁর পাতা থেকে করা জার্মানি সফর সংক্রান্ত পোস্টটি মোটামুটি জার্মানির সকল ফেসবুক ব্যবহারকারী দেখেছেন। পোস্টটি বিপুল অর্থ খরচ করে স্পন্সর করা হয়েছিল মোদীর পাতা থেকে। টুইটারে তখন তাঁকে ঘিরে একটি ‘হ্যাশট্যাগ’-ও স্পন্সর করা হয়েছিল ভারতের জনগণের করের টাকা খরচ করে।

জার্মানিতে কিছুটা কেলেঙ্কারির মুখেও পড়েছিলেন তিনি। দেখা যেতো, মোদি যে শহরেই যান, সেই শহরেই কিছু মানুষ তাঁকে ঘিরে জটলা তৈরি করে এবং তাঁর পক্ষে স্লোগান দেয়। জার্মান গোয়েন্দারা সেসব জটলায় বেশ কিছু কমন ফেস আবিষ্কার করেছিল। সহজেই বোধগম্য, সেসবও ছিল খানিকটা তৈরি করা। দেখানো যে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়।

এমনকি জার্মান চ্যান্সেলরও এসব দেখে বিরক্ত হয়েছেন বলে আমাকে জানিয়েছিলেন সেই সফর কভার করা এক সাংবাদিক। মোদীর আনুষ্ঠানিক টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলা ভাষায় করা টুইটও নতুন কিছু নয়। বিশ্বের আরো অনেক ভাষায় এই অ্যাকাউন্ট থেকে টুইট করা হয়েছে। উদ্দেশ্য সেসব ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা। বাঙালি সহজ-সরল জাতি। তাই বাংলা টুইটে তারা যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। আমাদের মিডিয়াও কোন রকম ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ছাড়া সেসব প্রকাশ করে মোদীকে সহায়তা করছেন। তাই বাংলাদেশে এখন টপ ট্রেন্ড ‪#‎ModiInBangladesh‬।

বিষয়টি মন্দ কিছু নয়। তবে আমি ঠিক মুগ্ধ হতে পারছি না, মোদীর এসব কৌশল জানি বলে। আসলে, মোদি দেখাতে চান তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেটা শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বে। এজন্য তাঁর অনলাইন টিম নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তাতে অবশ্য মাঝেমাঝে বাগড়া দেয় ভারতের জনগণই। ‪#‎ModiInsultsIndia‬ সেরকম এক বাগড়ার ফসল।“ -আরাফাতুল ইসলাম। 

সহায়ক সূত্র:
১. ঘোর কলিকাল: http://www.ali-mahmed.com/2014/05/blog-post_16.html
১. তিতাস একটি...এর নাম: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_23.html

Monday, June 8, 2015

‘পায়ে লাগু ওস্তাদজি’।

৫/৬ বছর আগের কথা। স্যার ফজলে আবেদের প্রতিষ্ঠানের [১] খপ্পরে পড়ে তাদের সাজানো মামলার তদবিরে গেছি ভৈরব। ট্রেন অনেক লেট- ভৈরব স্টেশনে আটকা পড়েছি। অসহ্য এক সময়। ওখানেই পাই কাঞ্চন মিয়াকে, যিনি চোখে দেখতে পান না। গান-টান কিচ্ছু না কেবল দোতারা বাজাচ্ছেন, অমানুষের মত [২]!

দিন যায়, মাস, বছর কিন্তু এখনও আমার কানে আটকে আছে তাঁর বাজানো সেই সুর। সেদিনই পণ করেছিলাম একটা দোতারা জোগাড় করে কাঞ্চন মিয়ার মত বাজাব। প্রয়োজনে কেবল লেখালেখিই না সব গোল্লায় যাক, ‘কুছ পারোয়া নেহি’। জাগতিক এবং বিভিন্ন জটিলতায় সেই দোতারা আর জোগাড় হয় না। অবশেষে সেই দোতারার একটা গতি হলো। একজন রাজমিস্ত্রি একটা এন্টিক দোতারা উপহার নিয়ে আসলেন আমার জন্য। এটা নাকি তার কোন-এক পির সাহেবের ছিল।

যাই হোক, দেখিয়ে দেওয়ার কেউ নেই কিন্তু আমি নিজে নিজেই অবিরাম সাধনা চালিয়ে যাচ্ছি সেই সুরটা তোলার চেষ্টায়। অদ্যাবদি সুরের কোনও গতি হয়নি ফাঁকতালে লাভের অলাভ যা হয়েছে; আমার আশেপাশের লোকজন যে কেবল তিতিবিরক্ত হচ্ছেন এমনই না পারলে এরা চোখ দিয়ে আমাকে এবং বেচারা ‘নান্নিসি জান’ দোতারাটাকেও ভস্ম করে দেন। ভাগ্যিস, এটা কেবল সাধু-টাধুদের এখতিয়ারে নইলে একগাদা ছাইয়ের মাঝে কোনটা দোতারা আর কোনটা আমি সেটা বের করার জন্য আমাদের দেশের চৌকশ গোয়েন্দারের আবশ্যকতা দেখা দিত (যেহেতু এরা কাজের চেয়ে অকাজটাই ভাল পারেন)।

ওস্তাদ কাঞ্চন মিয়া, ‘পায়ে লাগু ওস্তাদজি’- কদমবুসি করি, আপনাকে...।

সহায়ক সূত্র:
১. লাশ-বানিজ্য-পদক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html
২. পথগাতক, আমি বড়ো একা হয়া গেছি...: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_24.html

Saturday, May 30, 2015

শ্রদ্ধাস্পদেষু শামসুল হক।

আমি এক লেখায় লিখেছিলাম, “সৈয়দ শামসুল হকের চিবিয়ে চিবিয়ে বলার ভঙ্গি রপ্ত করাটা চাট্টিখানি কথা না! তাই তাঁর এই বলার ভঙ্গির আমি ফিদা!...”
ফিদা কেবল এই কারণেই না। এমনিতে আমাদের এই সৈয়দ সাহেব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপাধি বিলি করে বেড়ান কখনও ‘ভাষাকন্যা’ তো কখনও ‘দেশরত্ম’। আফসোস, অথচ এই ভদ্রলোককে কোনও প্রকারের উপাধি দেওয়ার সুযোগ আমাদের নাই। কী অভাগা আমরা এই প্রজন্ম!

সৈয়দ সাহেবের জন্য কোনো প্রকারের উপাধি আসলে নস্যি। কারণ ইনি এক বিরল প্রতিভা! অন্য গ্রহের কথা জানি না অন্তত এই গ্রহে তিনি ব্যতীত এমন প্রতিভার জন্ম হয়েছে এমনটা অন্তত আমি বিশ্বাস করি না। তিনি যে ভঙ্গির উপর ভর দিয়ে ক্যালিগ্রাম বা কবিতা-চিত্র লিখেছিলেন ১৯৯৩ সালে, সেই ভঙ্গির কবিতাই ১৯১৮ সালে লিখেছিলেন Guillaume Apollinaire নামের এক ভাবচোর [১]!

ওহে Guillaume Apollinaire, ব্যাটা ফিরিঙ্গি, পাজি, নচ্ছার সৈয়দ সাহেবের ভাব চুরি করে কিনা কবিতা ফেঁদে বসল! অথচ সৈয়দ সাহেব তখনও এই ভুবনে পদার্পণ করেননি, জন্মও হয়নি বিধায় এর প্রতিবাদ জানাবার সুযোগ তাঁর ছিল না। কিন্তু আমরা এই প্রজন্ম এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি Guillaume Apollinaire-এর কালো হাত ভেঙ্গে দাও, দিতে হবে।

সৈয়দ হকদের মত বিরল প্রতিভা যে কেবল দু-হাতে লেখালেখি করেন এমনই না তেলের খনিতে [২] দু-হাতে সাঁতারও কাটেন। বাংলাদেশের সমুদ্রজয়ে অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার জন্য না কেবল প্রস্তুতির জন্য নাগরিক কমিটির পক্ষে ৫০১ জনের যে পরামর্শক মহোদয়গণ উপস্থিত ছিলেন, এদের মধ্যে আমাদের সৈয়দ সাহেবও একজন!

সহায়ক সূত্র:
১. প্রতিভাবান: http://www.ali-mahmed.com/2011/08/blog-post_18.html
২. তেলের খনি: http://www.ali-mahmed.com/2012/04/blog-post.html

Thursday, May 28, 2015

পশুর জন্য কেবল জঙ্গলের আইন!

('বাংলার বান কি মুন' এবং শিশুদের এই লেখাটা থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ।)
এর নাম রাজু। একে নিয়ে বেশ কিছু লেখা আছে আমার। শেষ লেখাটা লিখেছিলাম, দুপেয়ে পশু [১]। ওই লেখাটায় লিখেছিলাম, এক পশু রাজুর দুই হাতই ভেঙ্গে দিয়েছিল। প্রয়োজনের সময় রাজুর নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব বিধায় তার হাতের হাড় জোড়া নিয়েছিল বাঁকা হয়ে। কপাল, কিছুই করার নেই! আমার মত যে নপুংশক, যেপর্যন্ত না শিশুদের জন্য আশ্রম করতে পারবে সেপর্যন্ত সে তাকিয়ে তাকিয়ে এই সব দৃশ্য দেখবে, একের-পর-এক।
এর ঘুমাবার ভঙ্গি বড়ো বিচিত্র। স্কুলে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। কী ঘুম!
আমার নিজস্ব জটিলতার কারণে স্কুলে নিয়মিত যাওয়া হচ্ছিল না। স্কুলে পড়ায় যে মাস্টার, আলী আজ্জম অপু আমাকে ফোন করেই বলে, স্কুলে আসেন, তাড়াতাড়ি।
আমি খানিকটা বিরক্তি চেপে বলি, কেন কী হয়েছে?
তার তাড়া, আসেন, তাড়াতাড়ি।
আমি স্কুলে গিয়ে দেখি রাজুর গালে বিভৎস দাগ। অনেকটা শুকিয়ে গেছে তারপরও নমুনা দেখে আমি হতভম্ব। আমি রাজুর কাছে জানতে চাইলাম, তোমার গালে কি হইছে?
রাজু বলে, যেই বেডা আমার হাত ভাইঙ্গা দিছিল হে গালে কামড় দিছে।
আমি খানিকটা থমকে যাই। কারণ আমার ধারণা ছিল যে রাজুর হাত ভেঙ্গে দিয়েছিল তার কোনও হদিস পাওয়া যাবে না কারণ রাজু গুছিয়ে বলতে পারেনি কে তার হাত ভেঙ্গেছিল। আমি উত্তেজনা চেপে রাখি, শেষপর্যন্ত কী লোকটার সন্ধান পাওয়া যাবে?

আমি বলি, তুমি কি এই লোককে চেন?
রাজু খেলা থামিয়ে বলে, হ, চিনি তো। হের নাম জাইঙ্গা। হে আমার হাতের নখও তুইলা লাইছে।
আমি বুঝতে পারি এর নাম জাহাঙ্গির। আমার ভেতরে অজানা এক দ্রোহ পাক খায়। অজান্তেই শ্বাস দ্রুত হয়। খানিকটা সামলে নিয়ে বললাম, তুমি কি এই জাহাঙ্গিরকে চিনিয়ে দিতে পারবে?
রাজু ভয়পাওয়া গলায় বলল, পারুম না। হে আমারে মাইরা লাইব। আমি রাজুকে আশ্বস্ত করি, ভয় নাই। তুমি দূর থিক্যা আমারে দেখায়া দিবা। পারবা না?
রাজুকে কোনওপ্রকারেই রাজী করানো গেল না। সে ভয়ে আধমরা হয়ে আছে। এরপর এই শিশুটির প্রতি অন্যায় চাপাচাপি করতে মন সায় দিল না।

স্টেশনে আমি এবং মাস্টার অপু চক্কর লাগাই। পাওয়া গেল রাজুর মাকে। রাজুর মাকে বললাম, আপনি কি জানেন আপনার ছেলের হাত কে ভেঙ্গেছে?
আগের লেখায় বলেছিলাম রাজুর বাবা নেই এবং রাজুর মা খানিকটা অপ্রকৃতস্থ- স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। তিনি বললেন, হ, জানি তো। জাহাঙ্গিরা রাজুর হাত ভাঙ্গছে। হেরে ডরে কেউ কিছু কয় না।
আমি আশার আলো দেখি। বলি, আপনি কি দূর থেকে জাহাঙ্গিরকে চিনিয়ে দিতে পারবেন? তিনি কষ্ট করে উঠে দাঁড়িয়ে এই মানুষটাকে চিনিয়ে দেন।
আমি কাছে গিয়ে জাহাঙ্গির নামের এই মানুষটাকে বললাম, তোমার নাম জাহাঙ্গির?
সে হেলাফেলা করে বলল, হ। ক্যান, হি হইছে?
আমি দুর্দান্ত রাগ চেপে বললাম, এখনও কিছু হয় নাই, তবে হবে। তুমি রাজুর হাত ভেঙ্গে দিয়েছ কেন? আবার এর গালে কামড়ও দিয়েছে, কেন? নখ তুলে ফেলেছ!
জাহাঙ্গির আমাকে বলল, তো আপনের কি হইছে, হে আপনের কিছু লাগে?

বলা হয়ে থাকে, যে হাত দিয়ে লেখক লেখে সে হাত নাকি অন্য কোনো কাজে লাগে না। কথাটা রূপকঅর্থে বলা। মোদ্দা কথা, ওই হাত কেবলই লেখালেখির জন্য। কথা হচ্ছে ডান হাত নিয়ে। বাম হাতের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তো, বাম হাত যদি চোখের পলকে উঠানামা করে তাহলে সমস্যা কোথায়?

ক্রমশ ভীড় জমে যায়। একজন কসম কেটে বলেন, তিনি নিজের চোখে দেখেছেন এই জাহাঙ্গিরকে যে চলন্ত ট্রেন থেকে রাজুকে ফেলে দিয়েছিল। চোর ব্যাটা আমার ছবি তোলার সমস্ত উপকরণ নিয়ে গেছে বটে কিন্তু মাস্টার অপুরটা তো বর্তমান। মাস্টার অপু তার সেলফোনে তোলা রাজুর ছবিগুলো গোল হয়ে দাড়িয়ে থাকা জনতাকে দেখাতে থাকে। জনতা কখন যে পুরো বিষয়টা আমার হাত থেকে আলগোছে সরিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে আমি ঠিক জানি না।

একজন নাদুননুদুস টাইপের মানুষ ‘তবে রে’ বলে জো ফ্রেজিয়ার পাঞ্চ কষিয়ে নিজের হাতই মচকে ফেললেন। পরে এই মানুষটাকেই আমি দেখেছি স্লিং ঝুলিয়ে চলাফেরা করতে। অন্য একজন কোমরের বেল্ট খুলে (এই দৃশ্য পুরনো সময়কার মারকুটে সিনেমায় দেখা যেত। এখনকার সিনেমায় এই দৃশ্য অচল) যে ভঙ্গিতে পেটাতে লাগলেন তা দেখাটা সুখকর না। আমি আস্তে করে এই বৃত্ত থেকে সরে আসি। এখানে এখন আর আমার কোনও কাজ নাই। এই নিয়ে আমার মধ্যে কোনও প্রকারের অপরাধ বোধ কাজ করে না। কারণ মানবের আইন পশুর জন্য না- জঙ্গলে চলে জঙ্গলের আইন।

সময় গড়ায়। বৃত্তের ভেতরের উত্তাপ সীমা ছাড়িয়ে যায়। আমি ভেবে দেখলাম, এই পশুটাকে মেরে ফেললে তো আরেক ঝামেলা হয়ে যাবে। কিন্তু এখন এই বৃত্তের ব্যূহ ভেদ করা প্রায় অসাধ্য। আমি সেই অসাধ্য কাজটাই করলাম। জাহাঙ্গিরকে রেলপুলিশের কাছে সোপর্দ করা হলো। জনতা আমার উপর ভারী রুষ্ট। তাদের কথা, পুলিশ একে ছেড়ে দেবে।

মাত্র দুদিন পরই শুনলাম। জাহাঙ্গির ফিরে এসেছে। এবং রাজু ভয়ে কোথায় পালিয়েছে এর খোঁজ কেউ জানে না, তার মা-ও না! বিচিত্র কারণে জাহাঙ্গিরের সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে না অথচ দেখা হওয়াটা জরুরি...।

সহায়ক সূত্র:
১‌. দুপেয়ে পশু: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/blog-post_27.html 

*এই লেখার সবগুলো ছবিই মাস্টার আলী আজ্জম অপুর তোলা।

Monday, May 25, 2015

দুখু মিয়া-‘সুখু মিয়া’!

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা ‘দুখু মিয়া’ নামেও চিনি। তিনি কেবল দুখি মানুষই ছিলেন না তাঁর গোটা পরিবারই ‘দুখি পরিবার’। আমি তো বলব, ‘অভাগা পরিবার’। যাদেরকে অহরহ এটা জানতে-শুনতে-পড়তে হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু হয়েছে সিফিলিসে? কেবল দিনের-পর-দিনই না বছরের-পর-বছর যুগের-পর-যুগ ধরে এই অপবাদ বয়ে বেড়াতে হয়েছে গোটা পরিবারকে।

অথচ এটা ছিল নিরেট মিথ্যা! এখনও, আজও আমি অজস্র লেখায় এটা পাই, এই মিথ্যাচার নিয়ে [১]।  এখানে বিশদ লিখেছি। নজরুল নিউরো সিফিলিসে ভুগছিলেন না, ভুগছিলেন Pick's disease তাঁর চিকিৎসা হয় ভিয়েনায়, ড. হফের তত্ত্বাবধায়নে। এখন এই লেখায় আর চর্বিতচর্বণ করি না।
তিনি কেবল দুখু মিয়াই ছিলেন না, সুখু মিয়াও ছিলেন। কেমন করে? বলছি...।

তিনি যখন বাবরি চুল দুলিয়ে এই গান লিখলেন:
"...খোদারও প্রেমের শরাব পিয়ে, বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে...।"
ক্কী-ক-কী, কয় কী! খোদার প্রেমের সঙ্গে শরাব! কী সর্বনাশের কথা! কিন্তু তখন কারও চাকু-চাপাতির কোপে তাঁর বাবরি চুল লুটিয়ে পড়েনি।

যখন নজরুল লিখলেন:
“...দোযখ আমার হারাম হ'ল পিয়ে কোরানের শিরীন শহদ।...” (খোদার বন্ধু/ কাজী নজরুল ইসলাম।)
বলে কী-বলে কী, ‘কোরানের শিরীন শহদ’! মধু না বিষ সে পরের কথা কিন্তু কোরানের সঙ্গে তুলনা! তখনও কিন্তু নজরুলের বাবরি চুল গড়াগড়ি খায়নি! বুদ্ধিমান পাঠকের জন্য বাবরি চুলের সঙ্গে যে নজরুলের গোটা মাথাটাও গড়িয়ে পড়ত এটা আর উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করলাম না।

আর যখন লিখলেন এটা:
“...খোদার আসন আরশ ছেদিয়া, উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!...
...তাজী বোর্‌রাক্ আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!...
...আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন! আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!..."
(বিদ্রোহী/ কাজী নজরুল ইসলাম।)
কাট মাই শি...! বলে কী, 'খোদার আসন আরশ ছেদিয়া', 'ভগবানের বুকে...'!
তখনও কিন্তু খোদাভক্ত কেউ ‘কোপা সামসু’ বলে কোপায়নি বা ভগবানভক্ত কেউ ‘কোপা শংকর’ বলে ভোজালি দিয়ে নজরুলকে ফালা-ফালা করেনি! 

অবশ্য তখন অনেকে নজরুলকে ‘লোকটা শয়তান না মুসলমান?' বা 'ইসলাম বৈরী মুসলমান কবি', 'ধর্মজ্ঞানশূন্য বর্বর' 'কুলাঙ্গার', ‘কাফের', 'ফেরাউন', 'নমরুদ', 'খোদাদ্রোহী', 'ধর্মদ্রোহী', ইত্যাদি সম্বোধনে সম্বধন করতে ছাড়েনি। কিন্তু নজরুলের বাবড়ি, বাবড়ির সঙ্গে মুন্ডুর কোন সমস্যা হয়নি। সেটা স্বস্থানেই ছিল।

আবার কিন্তু অনেকে লেখার উত্তর লেখা দিয়ে দিতেও ভুল করেননি। সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠিতে ‘গাজী আব্বাস বিটকেল', 'ভবকুমার প্রধান' নামে লিখতেন। সজনীকান্ত দাস নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতাটির জবাবে একটি ব্যঙ্গ কবিতা লিখেছিলেন, 'ব্যাঙ'।
”আমি ব্যাঙ
লম্বা আমার ঠ্যাঙ
ভৈরব রসে বরষা আসিলে ডাকি সে
গ্যাঙোর গ্যাঙ
আমি ব্যাঙ
দুইটি মাত্র ঠ্যাঙ...।“
আমাদের বাপ-দাদাদের চেয়েও আমরা এখন অনেক বড় মুসলমান না মুছলমান—দা থেকে আছাড় বড়!
এমনিতে সুখু মিয়ার ভাগ্য-সুখ দেখে ঈর্ষা-ঈর্ষা! ভাগ্যিস, নজরুল আজ আর বেঁচে নেই, ঠিক সময় মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন! নইলে হাওয়ায় কেবল তাঁর বাবরি চুলই উড়ে বেড়াত না সঙ্গে কাটা মুন্ডুটাও...!

সহায়ক সূত্র:

Wednesday, May 20, 2015

‘অস্ত্র করা’ ওরফে অপারেশন...।

আমার চোখে একটা অপারেশন করার প্রয়োজন দেখা দিল। অপারেশনের পূর্বে আমি হালকা চালের একটা লেখা লিখেছিলাম, “...'আবার আসিব ফিরে'। এই অপারেশনে কারও মৃত্যু হয়েছে এমনটা শুনিনি। আমার বেলায় এটা ঘটলে সেটা হবে বিরল ঘটনা!... তবে এই অপারেশনে অন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটাও তোপ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। অবশ্য এও সত্য, একজন লেখকের জন্য অন্ধ হয়ে যাওয়াটা মৃত্যুসম। তখন বাঁচা না-বাঁচা সমান...।”
এই লেখাটা যে আমার জন্য ভারী হয়ে দেখা দিতে পারে সেটা তখন বুঝিনি!

ডাক্তার সাহেব বিভিন্ন 'আক্কাড়-পাক্কাড়’, নাট-বল্টুর সহায়তায় আমার চোখ দেখে বললেন, একি অবস্থা! আপনার তো দু-চোখেই অপারেশন লাগবে।
আমি বললাম, জরুরি কোনটা?
ডাক্তার বললেন, দুই-ই সমান। দুইটাই করাতে হবে।
এই বাণীর জন্য আমি ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। সামলে নিয়ে বললাম, কোনটা করানোটা প্রয়োজন...? আপাতত একটাই করাই...।
উঁহু, আপনাকে দুইটা চোখই করাতে হবে।
ডাক্তার সাহেব এই কথাটাই বেশ ক-বার বলার পর এবং যখন উষ্মা নিয়ে বললেন, আচ্ছা, আপনার সমস্যাটা কী বলুন তো!
ডাক্তারকে কে বোঝাবে যে আমি টাকা ছাপাবার মেশিন নিয়ে ঘুরে বেড়াই না, এটা আমার কাজ না- এই কাজটা আতিউর রহমানের। আমিও গম্ভীর হয়ে বললাম, আপনি কী একটা চোখ ফ্রিতে করে দেবেন?
যেসব ডাক্তারের নামের সঙ্গে এবিসিডিএক্সওয়াইজেড এন্তার ডিগ্রি থাকে তাদের সঙ্গে এমন করে বলার নিয়ম নাই। বলা তো শেষ, কপাল! তাছাড়া যে ডাক্তারের ছুরি-ছুঁচের নীচে আমাকে শুতে হবে তাকে ক্ষেপিয়ে দেওয়াটাও মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ না। হয়তো দেখা গেল ডাক্তার সাহেব আমার একটা চোখ তুলে চিমটা দিয়ে ধরে অন্য চোখের সামনে এনে বললেন, ছিঃ, কী ময়লা! এই কে আছিস, শিরীষ কাগজ নিয়ে এটাকে ঘষে পরিষ্কার কর। আর শোন, ব্লিচিং পাউডারে ডুবিয়ে রাখতে ভুলবি না কিন্তু।
আহা, এমনটা করলে আটকাচ্ছে কে!

ডাক্তার সাহেবের রেগে যাওয়ার কথা কিন্তু তিনি রাগ না-করে হাসি-হাসি মুখে বললেন, আচ্ছা, তা কোনটা করাবেন?
আমি হড়বড় করে বললাম, বাম চোখটাই করাই। (দুইটার মধ্যে বেছে নিলে হলে বামটাই সই। বললে বলল লোকজন নাহয়, ‘এক চোখ কানা বুইদ্দার...’।)
এবার ডাক্তার হাসি গোপন করে বললেন, করাতে পারেন। কিন্তু...।
আমি চিড়বিড় করে বললাম, কোনও কিন্তু-টিন্তু নাই। এইটাই ফাইনাল।
ডাক্তার বললেন, আচ্ছা, অপারেশনের পনেরো দিন পর মনে করে চোখটা দেখিয়ে যাবেন।

এখানে দেখি কেবল ডাক্তার না নার্স-টার্স সবাই খুব মাই ডিয়ার টাইপের। ওয়াল্লা, অপারেশনের পূর্বে কেবল আগুনগরম কফিই দিয়ে গেল না সঙ্গে কুকিজও! আমি বিছানায় শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে কফিতে চুমুক দিচ্ছি। ডাক্তার নিয়ম ভেঙ্গে এখানে চলে এসে যেটা বললেন তা শুনে আমার গা হিম হয়ে এলো।
ডাক্তার কষ্টার্জিত গম্ভীর হয়ে বললেন, দেখুন, আপনাকে জানানোটা প্রয়োজন মনে করছি। আপনার হাই মায়োপিয়া। অপারেশনে আপনি কিন্তু ঝুঁকিতে আছেন। ট্রাই মাই বেস্ট, বাকীটা আল্লাহ ভরসা। কি, ভয় করছে?

আমি ভয় চেপে বললাম, না, বলে ভাল করেছেন। তথ্য পাওয়াটা আমার অধিকার। আর অপারেশনটা করবেন আপনি। আপনি ভয় না-পেলেই আমার জন্য মঙ্গল। ইয়ে, আপনারা দেখি রোগির জন্য ভালই খাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। এমনিতে রোগির চেয়ে কিন্তু ডাক্তারের জন্য এটা জরুরি। ক্ষুধার্ত সার্জনের ছুরির নীচে শুতে নেই।
ডাক্তার এবার হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ভাল-ভাল, আপনি ট্রিকটা ধরে ফেলেছেন দেখি! রোগি স্বাভাবিক থাকলে আমাদের জন্য সুবিধা। আমাদেরকে মাইক্রোসকোপের নীচে কাজ করতে হয়। রোগি ভয় পেয়ে চোখের মনি বনবন করে ঘুরতে থাকলে বড়ো মুশকিল হয়ে যায়, বুঝলেন। পাঁচ মিনিট পর ওটিতে আসেন, কাজটা সেরে ফেলি।

ভাল ভাবেই অপারেশনটা শেষ হলো। মহাআনন্দে আমি বুড়া বাড়িটার কাছে ফিরে এলাম। কিন্তু দু-চোখে দুই রকম দেখি। কী যন্ত্রণা! পনেরো দিন দুঃসহ সময়টা পার করাটা আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ল। পনেরো দিন পর ডাক্তারকে যখন বললাম, অন্য চোখটাও অপারেশন করে ফেলেন তখন ডাক্তার মুখ ভরে হেসে বললেন, কী বলেছিলাম না...।

Sunday, May 17, 2015

হাজার-হাজার ‘টার্মিনাল’!

অনেক বছর পূর্বে অসাধারণ একটা মুভি দেখেছিলাম ‘The Terminal’। আমার দুর্বল স্মৃতিশক্তির কারণে আজ আর তেমন বিশেষ কিছুই মনে নাই কিন্তু সেই মানুষটার কিছু অনুভূতি এখনও আমি স্পর্শ করতে পারি, অম্লান।
সেই মানুষটার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সম্ভবত টম হ্যাংকস। এই ‘ম্লেচ্ছ ব্যাটা’ ব্যতীত এমন একটা মানুষের ভূমিকায় এমন দুর্ধর্ষ অভিনয় করা সম্ভব না। এয়ারপোর্টে আটকাপড়া সেই মানুষটা, যে হঠাৎ করেই শুনতে পায় রাজনৈতিক জটিলতার কারণে তার দেশ বলে আর কিছু নাই! এক পয়সার মূল্য নাই তার সঙ্গে থাকা ভিসা-পাসপোর্ট-মুদ্রার।

সেই মানুষটা উদভ্রান্ত সেই চোখের দৃষ্টি আমাকে তাড়া করে, আজও! একটা মানুষ এমনঅবস্থায় আটকা পড়ে আছে ভিনদেশের এক এয়ারপোর্টে দিনের-পর-দিন! এই ‘সুন্দর-করুণ’ অনুভূতিটা আসলে কেবল স্পর্শই করা চলে, আমার মত মানুষের লিখে বোঝাবার ক্ষমতা কই!

তবুও ওই মানুষটার খাবার ছিল, মাথার উপর নিরাপদ ছাদ ছিল। ভাষা না-জানুক অন্তত বডি ল্যাংগুয়েজ দিয়ে অন্যদেরকে বোঝাবার চেষ্টা ছিল কিন্তু এখন আন্দামান-মালাক্কায় যে হাজার-হাজার মানুষ সমুদ্রে ভাসছে তাদের অনেকের মাথায় উপর সূর্য নেমে এসেছে, খাবার নেই, চারপাশে বিপুল জলরাশি অথচ এক ফোঁটা খাওয়ার পানিও নেই।
এঁরা ভাসছে কেবল দিনের-পর-দিনই না মাসের-পর-মাস ধরে। রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এদের এখন কোনও দেশ নেই। কূলে পৌঁছামাত্র কোনও দেশ ইঞ্জিন বিকল করে ভাসিয়ে দিচ্ছে তো কোনও দেশ ইঞ্জিন ঠিক করে দিয়ে কিন্তু কোনও দেশই এদেরকে নিতে চাচ্ছে
না।

আজ জানলাম, খাবারের জন্য নাকি এরা খুনাখুনি করছেন! যদি এটা শুনি, একজন অন্যজনের মাংস খাচ্ছে এতে অন্তত আমি মোটেও অবাক হবো না।
এঁদের অসহ্য বেদনা-অনুভূতি আমি খানিকটা বুঝতে পারি এই মিথ্যাচার করার কোনও অর্থ হয় না। অন্তত নিজের সঙ্গে এই কপটতা করার চেষ্টা করি না...।

Saturday, April 18, 2015

আবার আসিব ফিরে...।

এই অপারেশনে কারও মৃত্যু হয়েছে এমনটা শুনিনি। আমার বেলায় এটা ঘটলে সেটা হবে বিরল ঘটনা! অখ্যাত পত্রিকার ভেতরের পাতায় ‘বিরল ঘটনা’ হিসাবে খবরটা দু-চার লাইনে চলে আসাটা একেবারেই অলীক-অসাড় বলাটা সঠিক হবে না।

তবে এই অপারেশনে অন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটাও তোপ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। অবশ্য এও সত্য, একজন লেখকের জন্য অন্ধ হয়ে যাওয়াটা মৃত্যুসম। তখন বাঁচা না-বাঁচা সমান...।

ছেঁড়া চাদর এবং ‘মনোনীত সদস্য’।

এ বছর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘন্টার-পর-ঘন্টা ধরে যে ঘটনা ঘটল এটা নিয়ে গুছিয়ে লেখার ক্ষমতা আমার নাই। কেবল অল্প কথায় বলি, আমাদের দাঁড়াবার আর জায়গা রইল না।
হালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটা হচ্ছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। এখানে দিনদুপুরে চরম অশ্লীলতা করা যায়, সন্তানের সামনে মাকেও অপদস্ত করা যায় । চাপাতি দিয়ে কাউকে কুপিয়ে ফালা ফালা করা তো কোনও বিষয়ই না।

কালে কালে গালকাটা রমজান, পেটকাটা আবুল হবে এখানকার আসল কারিগর। এরা এদের চেলাচামুন্ডাদেরকে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে নিয়ে আসবে হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। লাউয়ের উপর ব্লেড চালিয়ে পকেটকাটা বিভাগের প্রধান পকেটমারের সর্দার বাইট্টা ছগিরও পিছিয়ে থাকবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সব এলাকাগুলো নাকি এমনিতেই নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকে।সিসিটিভি নামের যে চোঙ্গাগুলো লাগানো থাকে এগুলো দিয়ে নাকি কাক-পক্ষীর গতিবিধি ধারণ করা হয়। বিশেষ-বিশেষ দিনে তো এই চাদর নাকি কয়েক স্তরের হয়ে যায়। 'এই চাদর দিয়ে মাথা ঢাকতে গিয়ে পেছনটা উদোম হয়ে যায়', এটা লিখতে পারলে আরাম পাওয়া যেত কিন্তু মাথা-পেছনটার (পাছা শব্দটা আমি এখানে লিখতে চাচ্ছি না) দোষ দেওয়াটা সমীচীন হবে না। দোষ বেচারা চাদরের। আহা, বেচারা চাদর- ছেঁড়া চাদর।

অনেকে আবার দোষ চাপাবার চেষ্টা করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার-হাজার শিক্ষার্থীর যিনি পিতা, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের প্রতি। এই পুরো নামটা ‘আ আ ম স’ এটা ভুলে গেছি তবে দুষ্ট ছেলেরা যেটা বলে সেটা বিচিত্র কারণে মনে আছে। এখানে এটা উল্লেখ করাটা অসমীচীন মনে করছি।)।
জনাব, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সাহেবের প্রতি কারও অঙ্গুলি নির্দেশ করার প্রতি আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাই, নিন্দা জ্ঞাপন করি। কারণ জনাব আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সাহেবের দোষ দেওয়াটাও দোষ হবে। ওরে অবুঝ, প্রক্টর সাহেব দাবা খেলায় ব্যস্ত থাকেন কিন্তু আরেফিন সাহেব কী অবসর? বেচারা আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সাহেবের কতো-কতো কাজ! যেমনটা আমরা দেখেছি তেলের খনি [১] থেকে তৈল উত্তোলনে তাঁর ব্যস্ততা। এটা তো ছোট্ট একটা উদাহরণ, এমন কত্তো কত্তো কাজ তাঁর...।

১. তেলের খনি: http://www.ali-mahmed.com/2012/04/blog-post.html

Friday, April 17, 2015

মিডিয়া...!

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হলো। এই বিষয়ে পুর্বের বলা অল্প কথাটাই আবারও বলি, "৪৪ বছর গেল নাকি ৪৪০ বছর তাতে কী আসে যায়- রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না"। 
প্রায়শ এমনটা দেখি বা শুনি, অনেকের কাছে এর (যুদ্ধের অপরাধের জন্য বিচার) প্রয়োজনীয়তা তুচ্ছ কারণ এরা তাদের পরিবারের কাউকে হারাননি। কিন্তু এটা জিজ্ঞেস করুন ১৯৭১ সালে যারা তাঁদের স্বজন-প্রিয়মানুষকে হারিয়েছেন। সাদী মহাম্মদকে [১], প্রবীর শিকদারকে [২] যারা ১৯৭১ সালে তাদের স্বজনের প্রায় সবাইকে হারিয়েছিলেন। এরা কী করে ভুলে যাবেন তাদের দগদগে ক্ষত?

কিন্তু এই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পূর্বে মিডিয়াগুলো কারাগারের সামনের রাস্তা দখল করে যেটা করেছে সেটা দেখে মনে হচ্ছিল...একেকটা কাঁপা-কাঁপা গলায় এমনসব ভঙ্গিতে বলছিল মনে হচ্ছিল এখুনি এ নির্ঘাত মুর্চ্ছা যাবে। আবার থেমে থেমে ঘটা করে বলছিল, আমরা চার দিন ধরে অপেক্ষায় আছি...। ওরে, তোকে বলেছে কে চার দিন ধরে অপেক্ষা করতে? কেউ-কেউ আবার লাইভ অনুষ্ঠানও প্রচার করছিল। পারলে এরা ফাঁসির দৃশ্যটাই লাইভ দেখিয়ে দিত। একজন তো আবার একটা শিশুকে দেখিয়ে বলছে এই ফাঁসি দেখার জন্য এ-ও চলে এসেছে।

আমাদের দেশে এখন অবৈধ টাকা হলেই একটা চ্যানেলের মালিক হয়ে বসে থাকে। চ্যাংড়া-চ্যাংড়া ছেলে-মেয়েরা ‘বুম’ হাতে অধিকাংশ সময় যেটা করে এটাকে এক কথায় বলা চলে অসভ্যতা। কতশত যে এখন মিডিয়াকর্মী আল্লা জানে। এদের অনেক আচরণ অসভ্যতাকেও ছাড়িয়ে যায়। আমরা বিভিন্ন ঘটনায় এটা প্রত্যক্ষ করেছি, রানা প্লাজা, জিহাদের মৃত্যু এমন উদাহরণের শেষ নেই। তখন উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর কাজ করাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চার দিন ধরে রাস্তা আটকে এখানে বসে থাকার আদৌ এর প্রয়োজনটা কী! এরা লাশবাহী গাড়ির পেছনে পেছনেও দৌড় লাগায়। এবার নাকি ১ কিলোমিটার পূর্বে এদের আটকে দেওয়া হয়েছে বলে জল কম ঘোলা হয়নি।

আহ, মিডিয়া! এখন অনলাইনেও মিডিয়া গিজগিজ করে। নমুনা! আরেক মিডিয়া 'প্রিয় ডট কম' [৩] একটা শিরোনাম করেছে, 'সর্বস্ব হারিয়ে লায়লা নাঈম কাঁদছেন'। ঘটনা পড়ে পাঠক ভাববে অন্য কিছু কিন্তু আসল ঘটনা হচ্ছে লায়লা নঈম নামের এই বিকারগ্রস্ত মহিলার ল্যাপটপ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে- এই মহিলা আবার ল্যাপটপটা পাঠককে দেখাচ্ছেন যেন ভাইরাস গিজগিজ করছে। এই মিডিয়া-এই মহিলা দুই বিকারগ্রস্ত।

কারও মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে। কারাকর্তৃপক্ষ ব্রিফিং দেবে আজ এতোটা সময়ে ওমুকের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে, ব্যস। অনেকে বলবেন, এটা সাধারণ কোনও ঘটনা না, জনগণের এই নিয়ে বিপুল আগ্রহ ছিল বিধায় ইত্যাদি ইত্যাদি। যে দেশের জনগণ মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান-টু-থ্রি বললেই শতেক লোক জমে যায় সেই দেশে অবশ্য এটা বলা যেতেই পারে।

অবশ্য মিডিয়ার এতো কিছুর পরও অনেকের মধ্যে সংশয় কাজ করেছে কেন কামারুজ্জামানের মৃতদেহের মুখমন্ডল কোথাও দেখানো হলো না। এরা এটা বুঝতে চাইছেন নােএটা সত্য রাষ্ট্র নিরুপায় হয়ে কখনও-কখনও প্রাণহরণের মত অতি নিষ্ঠুর কাজটা করতে বাধ্য হয়- যে প্রাণ সৃষ্টি করার ক্ষমতা কারও নাই সেই প্রাণটা ছিনিয়ে নেয়। আইনের শাসনের কারণে কখনও-কখনও রাষ্ট্রের এই কাজটা না-করে উপায় থাকে না। কিন্তু এটাও মাথায় রাখাটা প্রয়োজন রাষ্ট্র ইচ্ছা করলেই মৃতদেহ নিয়ে যা-খুশি তা করতে পারে না। কিন্তু কেন, কেন এই সংশয়টা জনসাধারণের মধ্যে কাজ করে!

কারণ দেশটা বাংলাদেশ। এই দেশে আমরা প্রচুর নাটক দেখি- জজ মিয়ার নাটক, ছলিমুল্লার নাটক...। জনসাধারণের মধ্যে যেন সংশয় ঘুরপাক না-খায় এটা দেখার দায়িত্বও কিন্তু সরকারের উপর বর্তায়। তাই বিতর্ক এড়াবার জন্য যা-যা করণীয় যেমন প্রয়োজনে সরকারী মহফেজখানায় তথ্য-উপাত্তগুলো সংরক্ষণ করা ভবিষ্যতের জন্য। প্রয়োজনে ডিএনএ-এর নমুনাও রাখা যেতে পারে। তথ্য অধিকার আইনে কেউ জানতে চাইলে বিচারবিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

যেমনটা যুদ্ধঅপরাধ-যুদ্ধাপরাধী নিয়ে সরকারের এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও এই দেশের একটা অংশের মধ্যে সংশয় কাজ করে। এটার জন্যও সরকারের দায়টা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা যদি জানতে চাই রাজাকার নুলা মুসার [৪] বিচারের কি হলো? সরকার এই উত্তর দেবে না। দেবে না বলেই আমাদের মধ্যে সংশয়টা ঘুরপাক খায়।

১. আমার বাবার কবরস্থান: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_4.html
২. ১৯৭১: খুন, সাদি মহাম্মদের ২৫ স্বজন: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/1971.html
৩. প্রিয় ডট কম: http://www.ali-mahmed.com/2015/02/priyocom.html 
৪. নুলা মুসা: http://www.ali-mahmed.com/2014/12/blog-post_19.html

Thursday, April 9, 2015

পাজি-অসভ্য-ইতর-দানব-খুনি!

অনেকের কাছে ধর্মটা হচ্ছে কাঁচের বাসন। হাত থেকে ফসকে গেল তো ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। লেখার উত্তর লেখা দিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এদের নাই তাই এরা ঝাঁপিয়ে পড়েন চাপাতি নিয়ে। যারা ধর্মের নামে আইন নিজ হাতে তুলে নিচ্ছেন, প্রকাশ্যে রাস্তায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মানবদেহ ফালা ফালা করছেন তাদেরকে দ্রুত আদালতে বিচার করাটা আবশ্যক। এরা খুনি- খুনির প্রতি প্রচলিত আইন যে আচরণ করে থাকে সেই আইনই এদের বেলায়ও প্রযোজ্য হবে। রাষ্ট্র কখনও নিজ হাতে কাউকে আইন তুলে নিতে দিতে পারে না। প্রচলিত আইন যদি তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে তাও অতি দ্রুত কার্যকর করাটাও জরুরি। এই নিয়ে কোনও প্রকারের দ্বিমত নাই। একটি বিষবৃক্ষ নির্মূল হলো। সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।

এখান পর্যন্ত লেখাটা বড়ই সরল এবার খানিকটা গরল কথা বলি। কখনও বিষবৃক্ষ গাছ আপনাআপনি হয় কখনও বা কেউ সযতনে পরিচর্যা করে লাগায়। সুদীপ্ত সুজয়-এর বদৌলতে আমার এটা দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে। কতিপয় ইতরবিশেষ একটা ইভেন্ট চালু করেছে। ইভেন্টটির নাম, ‘নবীজির উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি সপ্তাহ’। শিরোনাম দেখে অনেকে আপ্লুত হবেন, বাহ, নবীজীর প্রতি কী তমিজ! কিন্তু আসল ঘটনা তা না। এই ইভেন্ট খুলে অতি কুৎসিতসব কথাবার্তা, ততোধিক কুৎসিত গালাগালি করা হচ্ছে। কোনও তথ্য-উপাত্তের বালাই নাই, কোনও যুক্তি নাই!

এই তাহলে জ্ঞানের চর্চা, মুক্তমনের চর্চা? মুক্ত মানে অবাধ, স্বাধীন যা-খুশি বলার অধিকার? কারও মৃত্যুশয্যায় তাকে নিয়ে রঙ্গ করার অধিকার- কোনও ভাবগম্ভীর পরিবেশে, জরুরি আলোচনায় ‘ধুমমাচা দে’ গান গাওয়ার অধিকার? তাহলে এই সমস্ত অসভ্যদের জন্য সভ্যতার সংজ্ঞা নতুন করে লিখতে হবে। এদেরকে কারা-কারা মুক্তমনা বললেন এ নিয়ে আমার কাতরতা নাই কারণ আমার কাছে এরা স্রেফ ‘ইতরবিশেষ তথাকথিত মুক্তমনা’।
বেচারা ভলতেয়ার, "I do not agree with what you have to say, but I'll defend to the death your right to say it." এটা বলেও তিনি এদের কাছে মুক্তমনা হতে পারলেন না।

তো, এরা যদি ভেবে থাকে আমরা এই সব ইতরবিশেষ মুক্তমনাদের এই সমস্ত কর্মকান্ডের জন্য ‘শাবাসি’ দেব তাহলে ভুল করবেন। আমরা চাইব এই সব ইতরদেরকেও যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় নিয়ে আসতে। কারণ এরা দানব বানাবার মেশিন! এরা ঠান্ডা মাথায় একটা খেলা খেলছে। ভযংকর এক খেলা। কোটি-কোটি মানুষের বিশ্বাস-আবেগকে পদদলিত করার খেলা! এরাই তারা, যারা রামুতে বৌদ্ধমূর্তি গুঁড়িয়ে লুঙ্গির কাছা মেরে নাচের মুদ্রায় দাঁড়িয়ে ছিল।

আচ্ছা, এবার অন্য প্রসঙ্গ। কারও প্রিয়মানুষকে, কারও মাকে নিয়ে কেউ কুৎসিত কথা বললে তার প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে? এখানে যে জেনেভা কনেভনশন কপচানো পন্ডশ্রম এটা ওই মার সন্তানটাকে কে বোঝাবে! এটা জেনেও যে আইন কিন্তু তাকে, তার আবেগকে ক্ষমা করবে না এবং ঠিকই তার প্রাণটাকেও নষ্ট করে ফেলবে, তারপরও। তখন সে একটা খুনি! কিন্তু তার মত ছাপোষা একজন মানুষ, মানুষ থেকে খুনিতে রূপান্তর; ফ্রানজ কাফকার ‘মেটামরফোসিস’- গ্রেগর সামসার আরশোলায় রূপান্তরকেও হার মানায়।
এ যেন অকল্পনীয় রূপান্তর! কিন্তু এই রূপান্তরের পেছনে যুক্তি কী! কেন সে তার মৃত মার জন্য হিংস্র কুকুরের ন্যায় লড়বে? পুরনো ক-খানা হাড়ে এমন কী আছে যা তাকে লড়াই চালিয়ে যেতে বাধ্য করবে! হয় মরবে নয়তো মেরে ফেলবে। কেন? আসলে এর কোনও উত্তর হয় না। কিন্তু তাকে খুনি বানাবার এই দুঃসাধ্য কর্মকান্ডটা করল কারা?

ওরাই, যারা ভয়ংকর দানব- খুনি বানাবার একেকটা চলমান মেশিন। এই দানবরা নাস্তিক কি আস্তিক, এটা মূখ্য বিষয় না, বিষয়টা হচ্ছে এরা অপরাধি। নাস্তিক হওয়াটা কোনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ না এবং কে নাস্তিক হবেন এটা তার নিজস্ব বিবেচনা। কিন্ত এই সব ইতরামি অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ । অতি শীঘ্রই এই ইতরদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসাটা আবশ্যক। সেটা কোনও ধর্মের ব্যক্তিত্বকে নিয়ে করুক বা অন্য কাউকে। ‘রামজীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি সপ্তাহ’ নিয়ে ইভেন্ট চালু করলেও আমার বক্তব্য হুবহু একই থাকবে। “তপস্যা করার অপরাধে রামচন্দ্র খড়গ দিয়ে ‘শম্বুক’ নামক এক শূদ্র তাপসের শিরোচ্ছেদ করেন” (শম্বুক শূদ্র হওয়ার অপরাধে) -বাল্মীকির রামায়ন। এটা বললে আমি ধৈর্য ধরে শুনব কারণ এর পেছনে তথ্য আছে কিন্তু রামকে নিয়ে ইতরতা করলে আমি ধৈর্যহারা হবো।

মুক্তমনার আভিধানিক অর্থ কি এটা নিয়ে অভিধানে-অভিধানে চালাচালি-খোজাখুঁজি-খোলাখুলি চলতে থাকুক। আমি আমার সাধারণ জ্ঞানে বুঝি, জ্ঞান হচ্ছে সরলরেখা আর জ্ঞানহীনতা হচ্ছে বৃত্ত। মুক্তমনের লোকজনেরা কোনও বৃত্তে আটকে থাকবেন না- কেবল এগিয়ে যাবেন। তাঁর হাঁটার রাস্তায় কাকের কর্কশ রব যেমন থাকবে তেমনি সুকন্ঠী পাখির সুরেলা বোলও। হাস যেমন ঘোলা জল থেকে তার খাবার পানিটা বের করে নেয় তেমনি তিনিও সমস্ত অন্ধকার থেকে আলোকে বের করে নিয়ে আসবেন।

আমি পূর্বেও বিভিন্ন লেখায় স্পষ্ট করে বলেছি, আমি কোনও বিশেষ ধর্মের অবমাননা বুঝি না আমি বুঝি সমস্ত ধর্মের অবমাননা। মধ্যরাতে ওয়াজের নামে আট-দশটা চোঙ্গা লাগিয়ে যখন হিন্দু ধর্মের ব্যক্তিত্বদের মুন্ডুপাত করা হয় তখন সেটাও ধর্মের অবমাননা। আরজ আলী মাতুব্বর ঘোর নাস্তিক ছিলেন। বিভিন্ন ধর্মের বিপক্ষে প্রচুর লেখা রেখে গেছেন কিন্তু তাঁর লেখাগুলোর মধ্যে কেউ এটা দেখাতে পারবেন না যে তিনি কোনও ধর্ম নিয়ে কুৎসিত কথা বলেছেন বা গালাগালি করেছেন অথবা অযথা ছোট করার চেষ্টা করেছেন। যেটাই বলেছেন তার যুক্তি দিয়ে বলেছেন কারও আপত্তি থাকলে যুক্তি খন্ডন করুক তাতে কোনও সমস্যা নাই।

গোল্ডা মায়ারের চমৎকার একটা কথা আছে, ‘নিজ হাতে হত্যা করা এবং হত্যা করার নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নাই’। আমি এর সঙ্গে যোগ করি, হত্যা করা বা হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করার মধ্যেও খুব একটা তফাত নাই।

Thursday, April 2, 2015

রাজার মুরগি, বুশ এবং নাড়িছেঁড়া এক গল্প!

রাজার মুরগির বিষয়টা আগে বলি। রাজামশাই যখন ভ্রমণে মুরগি খাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন তখন তার পেয়াদা বাহাদুররা সাত গ্রাম তছনছ করে মুরগির ব্যবস্থা করে।
আমাদের জুনিয়ার বুশ আরেক কামেল মানুষ। তাকে মেঝে উঁচু করার কথা বললে সে অল্প সময়েই এটা করে দেবে। সব মেরে সাফ করে কবর বানিয়ে।
এই মানুষটার চোখের জল শুকিয়ে গেছে কারণ আজ সাত দিন তার একমাত্র সন্তানের খোঁজ নেই। যেদেশে নামকরা লোকজনেরা উধাও হয়ে যায় সেদেশে স্টেশনে যার বাসস্থান এমন একজন মানুষের সন্তান উধাও হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র কিছু না। এই মানুষটার নাম আমি জানি না। সবাই বলে জান্নাতের মা, আমিও বলি জান্নাতের মা।
বাঁদিকের মেয়েটা জান্নাত। গতবছর পহেলা বৌশাখে তোলা। দানে পাওয়া ঢলঢলে এই পোশাকেই তার আনন্দের শেষ নেই।
তার মেয়ে জান্নাত ‘আমাদের ইশকুল’ নামের স্কুলটায় বছরখানেক ধরে পড়ে। স্টেশনের কাছটায় এই স্কুলটায় প্রতিদিন নিয়ম করে আসে ছেলেপেলেরা আসে এই সংখ্যা খুবই কম। জান্নাতও মাঝেমধ্যে আসত না কারণ ও একটা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করত। ওখান খেকে যে খাবার পাওয়া যেত এতে মা-মেয়ের হওয়ার কথা না কিন্তু হয়ে যেত নিশ্চয়ই। এদের পেটপুরে খেতে হবে এই দিব্যি কে দিয়েছে।
তো এই কারণে জান্নাতের কখনও-কখনও স্কুলে আসা হতো না। কিন্তু ঝাড়া ছয় দিন অনুপস্থিত থাকার পর আমি স্কুলের মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলে সে জান্নাত বিষয়ে কোনও তথ্য দিতে পারল না।

আজ জান্নাতের মার কাছে যেটা শুনলাম তাতে কিছুই স্পষ্ট হলো না। পুলিশ নাকি জান্নাতকে ধরে নিয়ে গেছে। কোথায়? জান্নাতের মা জানে না! আশেপাশের অন্যরাও তেমন সদুত্তর দিতে পারল না। ১০/১২ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়েকে পুলিশ কেন ধরে নিয়ে যাবে? রেলওয়ে পুলিশের এক এস,আই আমাকে যেটা বলল এটা শুনে আমি জীবনে এতো হতবাক কমই হয়েছি। সরকারী একটা সংস্থার (সামাজিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র) লোকজনেরা ভাসমান কিছু পতিতাতে ধরে নিয়ে গেছে। এদের মধ্যে জান্নাতও ছিল। একপ্রসঙ্গে এ আমাকে জোর দিয়ে এটাও বলেছে, জান্নাত...। হা ঈশ্বর! এই অপদার্থ এই সব কী বলছে!
অবশ্য জিআরপি ওসি যথেষ্ঠ সহায়তা করলেন। এখানে কাজের তথ্যগুলো পাওয়া গেল।

সহৃদয় @Shahadat Hossain যখন এই কেন্দ্রে (সামাজিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র) যান তখন এরা পতিতাদের ধরে এনেছেন এটা অস্বীকার করেন। চমৎকার-চমৎকারসব কথা বলেন। সাহাদাতের কাছে শুনে আমি নিজেও মুগ্ধ (!)।
অথচ আমি দেখছি এখানে এরা লিখেছে: “...পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে নানাহ কারণে বঞ্চিত হয়ে অসামাজিক তথা দেহ ব্যবসার মত ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত রয়েছে।...”
আচ্ছা, সেই তো দেখছি ঘুরেফিরে দেহ ব্যবসা! আরও লেখা আছে, "...এখানে আসন সংখ্যা ১০০ জন হলেও বর্তমান নিবাসীর সংখ্যা ১৬ জন। বাকী ৮৪টি আসন শূন্য থাকায়..."।
ওরে, এই তাহলে ঘটনা! শূন্য স্থান পূরণ করো, শূন্য আসন...। আর পারিবারিক বন্ধনের কথা যে বলা হচ্ছে এই জান্নাত মেয়েটির পারিবারিক বন্ধন আছে কী নেই এই বিতর্কে নাহয় গেলাম না কিন্তু একজন মার কাছ থেকে তার সন্তানকে পাইক-পেয়াদা দিয়ে জোর করে ধরে নিয়ে আটকে রেখে কী দেশ উদ্ধার করবেন আপনারা? এই ছয় দিন ধরে মা জানত না তার সন্তান কোথায় -সন্তান জানত না তার মার খোঁজ! এই ক-দিনে মা-মেয়ের চোখ গড়িয়ে কত জল ভেসে গেছে তার খোঁজ রাখার আদৌ প্রয়োজন কী আমাদের!
এখন এরা বলছে, বেশ, জান্নাতকে ধরে এনে নিবন্ধন করে ফেলা হয়েছে তাই একে এখন এখান থেকে নিয়ে যেতে চাইলে তার অভিভাবকের এই-এই কাগজ লাগবে। এই-এই কাগজ যেমন জন্মনিবন্ধন পৌর মেয়রের সনদ ইত্যাদি ইত্যাদি লাগবে। এই ইত্যাদি এবং ইত্যাদি কাগজপত্র জান্নাতের বা জান্নাতের মার কখনও ছিল না ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও অতি ক্ষীণ। অতএব...। জান্নাতের এখন কেবল জান্নাতে(!) যাওয়ার অপেক্ষা। তা কেন রে বাপু, ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় মা-র খোঁজের, কাগজের প্রয়োজন হয় না, এখন কেন?

রাজার মুরগি খাওয়ার গল্পটা শুরুতে বলেছিলাম এই কারণেই বা বুশ...। সরকারের সদিচ্ছা অতি উত্তম কিন্তু তার বাহিনী সেই মুরগিখাওয়া লাঠিয়াল বাহিনীর মতই...। বিস্তর সহায়তা করেছেন, Shahadat Hossain এবং Masuk Hridoy । তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
...
আপডেট: ৫ এপ্রিল, ২০১৫

সরকারের উদ্যোগটা কিন্তু চমৎকার কিন্তু লোকজনের কাজ করার ভঙ্গিটায় ঝামেলা আছে! জান্নাতকে নিয়ে আসতে সময় লাগবে। জান্নাতকে ওখানেই রেখে দেওয়া যায় কিনা এটাও ভাবা হচ্ছে...।
আপাতত যে কাজটা করা গেছে- আজ জান্নাতের সঙ্গে জান্নাতের মার দেখা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।  




গত বছর জান্নাতকে নিয়ে লেখাটা:
WhatsApp