Sunday, October 3, 2010

নিধন: অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী

"১৪ই ডিসেম্বর। খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গলো তাঁর। ...বিছানায় শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় মুনীর চৌধুরীর ফ্ল্যাট যদিও দোতলায়, যুদ্ধের সময় তিনি নীচের একটা ফ্লাটে থাকতেন। শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনতে শুনতে এক সময় তাঁর স্ত্রীকে ডেকে বললেন, 'শোন, আর মাত্র ৪৮ ঘন্টা বাকী আছে দেশ স্বাধীন হওয়ার'।
তাঁর কন্ঠে ছিল স্থির বিশ্বাস'!


...গোসল সেরে মুনীর চৌধুরী চুল আঁচড়াচ্ছিলেন। দুপুর তখন বারোটা কি একটা। এমন সময় নীচে লোহার গেটে শব্দ শোনা গেল। কে যেন দরোজা ধাক্কাচ্ছে। মুনীর চৌধুরী উঁকি দিয়ে দেখলেন, কম বয়সী কয়েকটা বাঙ্গালী ছেলে দরজা ধাক্কাচ্ছে। মুনীর চৌধুরী তাঁর স্ত্রীকে বললেন, 'থাক দেখার দরকার নেই। সরে এসো'। বলে তিনি আবারও চুল আঁচড়াতে লাগলেন। স্ত্রীর সাথে মুনীর চৌধুরীর ওটাই ছিল শেষ কথা।

এমন সময় নীচ থেকে মুনীর চৌধুরীর ছোট ভাই ওপরে এসে বললেন, 'মুনীর ভাই, আপনাকে নীচে ডাকছে'!
মুনীর চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার নাম করে বলেছে'?
'হ্যাঁ'।


পাঞ্জাবী পরে আস্তে আস্তে তিনি নীচে নেমে গেলেন। মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী লিলি চৌধুরী কিন্তু তখনও আতংকিত হননি। তার স্বামীকে যে কেউ ধরে নিয়ে যেতে পারে এ কথা তার মনে হয়নি। কারণ, যারা তাকে ডাকতে এসেছে সবাই কমবয়সী, বাঙ্গালী।
তবুও লিলি চৌধুরী সিড়ি দিয়ে নীচে নামলেন। দেখলেন, মুনীর চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন নীচে। আশেপাশে বন্দুক নিয়ে কয়েকটা অল্পবয়সী বাঙ্গালী ছেলে। তিনি শুনলেন, মুনীর চৌধুরী তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের অফিসার কোথায়'?
এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা ছেলে তাঁর পিঠের কাছে বন্দুক উঁচিয়ে বলল, 'আছে, আপনি চলুন'। মুনীর চৌধুরী আস্তে আস্তে হেঁটে তাদের সঙ্গে চলে গেলেন।"
(সেই শেষ যাওয়া- মুনীর চৌধুরী নামের মানুষটা আর ফিরে আসেননি!)


*১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। (বিচিত্রা/ ১৯৭৩)
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/

No comments: