রাব্বি অফিসে এসে গুম মেরে বসে আছে। নিজের রুম থেকে বের হয়নি। আজকাল অফিসে মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
মুনিম প্রায় নিঃশব্দে চা-র কাপ টেবিলে নামিয়ে রাখল। সাথে ঝকঝক করছে এমন একটা কাঁচের গ্লাসে পানি। চায়ে চুমুক দিয়ে বরাবরের মত রাব্বির সেই একই অনুভূতি হলো। ওর ধারণা, মুনিমের চা হচ্ছে পৃথিবীর সেরা চা। লোপাও চমৎকার চা বানায় কিন্তু মুনিমের ধারেকাছেও নেই। অজান্তেই রাব্বির মুখ থেকে তৃপ্তির অস্ফুট শব্দ বের হলো।
মুনিম ভয়ে ভয়ে বলল, স্যার, চা ভাল হয় নাই?
না, ভাল হয় নাই।
কি করুম স্যার, কন। অন্যদিন যেমন বানাই আজও তেমনি বানাইলাম।
আরে না, ভাল হয় নাই কেন বললাম, জানো। খুব, খুবই ভালো হয়েছে। আচ্ছা মুনিম, তুমি অফিসের সবার জন্য কি একই চা বানাও?
রাব্বির এই প্রশ্নটা অনেক দিন থেকে করবে করবে করেও করা হয়নি। কারণ আছে। বেশ ক-দিন ভুলে শামসিরের চা ও চুমুক দিয়ে ফেলেছিল, ওই চা-টা আহামরি কিছু ছিল না।
মুনিম থেমে থেমে বলল, জানি না, স্যার। তয় আপনার চা-টা যখন বানাই মন থিক্যা।
বলো কি!
স্যার, এই অফিসে আপনেই একজন স্যার যে আমাদের মতো ছোট মানুষদের দাম দেন।
ধুর।
আপনারে আইজ বলি, আপনারে নিয়া এই অফিসের অন্য পিয়ন, ড্রাইভার কি কয় জানেন? অনেক অফিসে অনেক সাহেব দেখছি কিন্তু রাব্বি স্যারের মত দেখি নাই। তিনি সবার ভাল-মন্দ জিগান। সবার সাথে হাত মিলান। তাইনের লগে হাত মিলায়া যেই সুখ এইটা কোন তুলনা নাই।
রাব্বির কেমন লজ্জা-লজ্জা লাগছে। বিব্রত গলায় বলল, আচ্ছা, এখন তুমি যাও।
মুনিম বেরিয়ে যেতে যেতে ইতস্তত করছে দেখে রাব্বি বলল, তুমি কি কিছু বলবে?
না স্যার।
আচ্ছা ঠিকাছে।
মুনিম প্রায় দরোজার কাছে গেয়ে ফিরে আসল।
মুনিম, কিছু বলতে চাইলে বলো?
স্যার, একটা কথা বলি, রাগ করবেন না তো?
কেন, কথাটা কি রাগ করার মত?
স্যার, ছোট মুখে বড়ো কথা হইলে মাফ কইরা দিয়েন।
আচ্ছা যাও, আগেই মাফ করে দিলাম। এখন বলো।
আপনি এই অফিসের সবাইরে বিশ্বাস কইরেন না। খুব কাছের মানুষরেও না।
রাব্বি অবাক, এটা কেন বললে?
স্যার, আপনে আগেই বলছেন রাগ করবেন না।
তা বলেছি। কিন্তু এইসব কি বলছ!
স্যার, আপনার ভালার জন্যই কইলাম। আর কিছু জিগায়েন না। যাই স্যার।
রাব্বি অবাক হয়ে ভাবছে, এটা সত্য ও সবার ভালো-মন্দ খোঁজ করে, এটা ওর সহজাত অভ্যাস। আশ্চর্য, এই সামান্য বিষয়টা এরা মনে করে বসে থাকে! এটা নিয়ে আবার আলোচনাও হয়! এতো অল্পতে মানুষজন মুগ্ধ হয়ে পড়ে। আশ্চর্য!
এখন এটা ছাড়িয়ে ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, মুনিম এমনটা কেন বলল! নিশ্চয়ই ও কিছু জানে। অযথা একটা বিষয় বলে মুনিম ওকে বিভ্রান্ত করবে এটা ও বিশ্বাস করে না। মুনিম কোন এক বিচিত্র কারণে ওকে পছন্দ করে এটায় কোন সন্দেহ নেই।
রাব্বি গুছিয়ে মেইলটা লিখল। এম.ডি বরাবর মেইলটা পাঠিয়ে দিল। বুকের ভেতর থেকে একটা অজানা ভয় পাক খেয়ে উঠল। তীর বেরিয়ে গেছে, এখন এটা নিয়ে ওর করার কিছুই না। ওর সব কিছু এখন খড়গের উপর ঝুলছে। হয় খুব ভালো কিছু ঘটবে, নয় সব কিছু ভেঙ্গে পড়বে।
হইচই করে শামসির ঢুকল। শামসির কেবল ওর কলিগই না, অসম্ভব ভালও বন্ধুও।
আরে-আরে, আমাদের রাব্বি মিয়া দেখি ল্যাপটপের উপর উঠে বসে আছে। বিষয় কী? কোন প্রেজেন্টেশন বানাচ্ছিস নাকি?
নারে।
তো, কাহিনি কী!
এম.ডি-কে একটা মেইল করলাম।
ওরি বাবা, ডরাইছি। তোর দেখি হট-লাইন। একেবারে এম.ডি। বাপ, একটু ঝেড়ে কাশো।
‘ব্যাকবোন’।
মানে!
কেন, তুই জানিস না?
মনে পড়ছে না।
আরে, মনে নাই তোর, আমাদের জন্য একটা সুযোগ রাখা হয়েছিল। অফিসিয়াল কোন বিষয়ে যে-কারো বিরুদ্ধে রং-ডুয়িং কিছু ঘটলে তার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল অভিযোগ করা যাবে।
হুম। মনে পড়েছে। তো?
একটা অভিযোগ করলাম।
কার বিরুদ্ধে?
সৈয়দ বাসের।
বলিস কী?
হুঁ।
করেছিস কী!
কি আর করা, যা করার করে ফেলেছি।
শামসিরের চোখে আতংক, কি এমন সমস্যা হলো যে তুই ফট করে এম, ডিকে মেইল করে বসলি।
শুনলে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে!
মাথা খারাপ হলে দেখা যাবে। তুই সমস্যাটা বল।
রাব্বি ড্রয়ার খুলে বিলের কপিগুলো বের করল। একে একে কাগজগুলো গুছিয়ে শামসিরের হাতে দিল।
শামসির বিলের কপিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সময় নিয়ে।
রাব্বি চেয়ারে দোল খেতে খেতে বলল, কি বুঝলি?
সবই বুঝলাম, কিন্তু-।
কি?
শামসির এবার রাগি গলায় বলল, কোম্পানির টাকা জাহান্নামে যাক, তোর সমস্যা কী!
কী বলিস! কোম্পানির টাকা সৈয়দ খেয়ে ফেললে আমার সমস্যা নাই।
তোর সমস্যা কী, তোর টাকা তো আর না। নাকি তোর বাপের টাকা!
রাব্বি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দেখে শামসির তাড়াহুড়া করে বলল, ভাল কথা, তুই একবার আমার সাথে এই বিষয়ে কথাও বললি না।
সরি রে, আমার আসলে মাথা কাজ করছিল না।
তুই জানিস না সৈয়দের হাত কত লম্বা, জানিস না?
হুঁ।
তারপরও!
হুঁ।
মেইলটা কি পাঠিয়ে দিয়েছিস, নাকি পাঠাসনি?
না, পাঠিয়ে দিয়েছি।
ক্রাইস্ট, ঠিক বলছিস?
হুঁ।
শামসির আর কিছু না লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলতে লাগল। যাওয়ার সময় বিষণ্ন গলায় বলল, তুই ভুল করেছিস, বিরাট ভুল।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, হুঁ!
রাব্বির মনটা আরও বিষণ্ন হলো। শামসির যে কেবল ওর ভাল বন্ধু এটুকুই না, এমন খুব বিষয় আছে যা ওরা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করে না। এমনও দেখা গেছে পুরো অফিস একদিকে ও এবং রাব্বি আরেক দিকে। আজ পর্যন্ত এমন কোন বিষয় নাই দুজনের মতের মিল হয়নি। অথচ আজ শামসিরের আচরণ ওর কাছে কেমন দুর্বোধ্য মনে হয়েছে। রাব্বি খানিকটা বিভ্রান্ত, এই কাজটা ঠিক হলো নাকি বেঠিক এটা শামসিনের আচরণে স্পষ্ট হয়নি। এটাই ওকে ভাবাচ্ছে...।
* জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6
"ন্যানো ড্রাইভটা ফেলেছি হারিয়ে/ যেটায়—রাখা ছিল ৮০০ কোটি/ ইউনিটের স্মৃতি জড়িয়ে থাকা/ গাদা-গাদা ডিএনএ প্রোফাইল।"
Saturday, October 16, 2010
জীবনটাই যখন নিলামে: ৭
বিভাগ
জীবনটাই যখন নিলামে
Friday, October 15, 2010
জীবনটাই যখন নিলামে: ৬
রাব্বি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। হেড অফিস থেকে যে বিলের কপিটা ফেরত এসেছে এটায় এইসব কি হাবিজাবি লেখা আছে! সইটা ওর বস সৈয়দের কিন্তু প্রত্যেকটা ভাউচার অপরিচিত মনে হচ্ছে। যেসব আইটেম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে এগুলো তো কেনাই হয়নি! হায় খোদা, এক-দুই টাকা না, লক্ষ-লক্ষ টাকার বিল। ওর গা কাঁপছে। এসি চালু আছে তবুও কুলকুল করে ঘামছে। মাথাটা একেবারেই কাজ করছে না। অথচ এই সময় মাথা বরফের মত ঠান্ডা থাকা প্রয়োজন।
খানিকটা সামলে নিয়ে বিলের পুরো সেটটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে তালা মেরে দিল। এইবার ঠান্ডা মাথায় ভাবা যেতে পারে। বিষয়টা তাহলে কী দাঁড়াল? এই বিলের কপি অনুযায়ী মার্কেট ডেভেলপ করার জন্য লক্ষ-লক্ষ টাকার বিভিন্ন আইটেম কেনা হয়েছে যার সম্বন্ধে বিন্দুবিগর্স ওরা জানে না। অথচ সইটা সৈয়দের এতে কোন সন্দেহ নেই! কেমন করে এটা সম্ভব?
রাব্বি বুঝে উঠতে পারছে না এমন একটা বিল ওদের অগোচরে সৈয়দ পাঠিয়েছে কেন? কেন-কেন-কেন? এটা ওদের আজও জানা হতো না, যদি না বিলের হেড বদলে দেবার জন্য হেড অফিস থেকে ফেরত আসত। সৈয়দ অফিসে নেই নইলে এটা তার টেবিলেই যাওয়ার কথা। সচরাচর হেড অফিসের চিঠিগুলো ওরা সরাসরি সৈয়দের কাছেই পাঠিয়ে দেয়।
রাব্বি ড্রয়ার খুলে চিঠির সঙ্গের ভাউচারগুলো বের করল। একের পর এক উল্টে যাচ্ছে। অপিরিচিতসব আউটেম। ও ১০০ ভাগ নিশ্চিত অধিকাংশই কেনা হয়নি। ড্রাইভারকে বলল গাড়ি বের করতে। কয়েকটা দোকান থেকে একটাকে বেছে নিল। যেতে যেতে ভাবছে, কেমন করে বিষয়টা উত্থাপন করতে হবে? দোকানদারের সন্দেহ হলে ভজকট হয়ে যাবে। ব্যাটা আবার সৈয়দের লোক হলে ফট করে বলে দেবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। ও ফেঁসে যাবে।
রাব্বি দোকানে ঢুকে এটা-সেটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। এরা মুলত বিভিন্ন গিফট আইটেম বিক্রি করে। ক্যালকুলেটর, ঘড়ি, ছাতা, বালতি এইসব। এখান থেকে আউটলেটের জন্য বিভিন্ন গিফট কিনেছে সৈয়দ। প্রতিটি দোকানে যে-কোনও একটা আইটেম গিফট হিসাবে দেয়া হয়েছে এমনটাই সৈয়দ ক্লেইম করেছে। কী বিপুল অংক!
ছেলেটা রাব্বিকে বলল, আপনি কি কিছু খুঁজছেন, স্যার।
রাব্বি মুখ ভরে হাসল, আসলে আমি না, আমার কোম্পানি কিনবে। আপনাদের কাছ থেকে আগেও অনেক টাকার জিনিসপত্র আমরা নিয়েছি।
কোম্পানির নাম শুনেই ছেলেটা হাত কচলাতে শুরু করল, স্যার, আগে বলবেন না। যা লাগে নিয়ে যান, আপনাদের টাকা-পয়সা কোন বিষয় না।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, আচ্ছা, মেমোটা-।
স্যার, কি যে বলেন। এইটা কোন সমস্যা না। আগেও তো আস্ত মেমো বই আপনাদের দিয়ে দিয়েছি, দেই নি!
রাব্বি চেপে রাখা শ্বাস ছাড়ল। আচ্ছা, এই তাহলে বিষয়! সৈয়দ অল্প কিছু জিনিস এখান থেকে কিনেছে এরপর আস্ত মেমো নিয়ে ভুয়া বিল বানিয়ে পাঠিয়েছে। পরে যোগাযোগ করবে বলে রাব্বি এখান থেকে বেরিয়ে পড়ল।
অন্য দোকানে ঘুরে আর লাভ নেই। সব জায়গায় একই ফল হবে। দস্তুরমতো ওর মাথা ঘুরছে। কী অনাচার, কী লোভ। সৈয়দ কোম্পানি থেকে প্রায় ১ লক্ষ টাকা বেতন ড্র করে, বেসুমার সুবিধা ভোগ করে। তারপরও একজন মানুষ কেমন করে এমনটা করতে পারে, অসৎ হয়!
এটা নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করা ঠিক হবে না। চাকুরির খাতিয়ে অন্যরা ঠিকই সৈয়দের কানে কথাটা তুলবে। আগেভাগে সাবধান হয়ে গেলে সব ভেস্তে যাবে। হেড-অফিসে কার কাছে এটা জানানো যেতে পারে। এম.ডি-কে প্রমাণসহ জানালে কেমন হয়? এমডির নামটা বড়ো অদ্ভুত, হার্ট উইক। শুনেছে বাস্তবে হার্ট উইক না, স্ট্রং টাইপের মানুষ। কোন এক ডিপোতে নাকি কি একটা ঝামেলা হয়েছিল। এ কেমন করে যেন টের পেয়ে যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অফিস, যেখানে সচরাচর একজিকিউটিভ টাইপের কেউ যায় না সেখানে বেস্ট এয়ারের হেলিকপ্টার ভাড়া করে স্বয়ং এম.ডি গিয়ে হাজির। এ নিমিষেই সব তছনছ করে ফেলল। ওখানকার ইনচার্জ বমাল ধরা। ট্যাঁ ফোঁ করার সুযোগও রইল না!
রাব্বি মনস্থির করল সরাসরি এম.ডিকেই লিখবে। এমনিতে এই ভদ্রলোক জয়েন করার পরই কিছু নতুন নতুন নিয়ম-সুবিধা চালু করেছিলেন। ‘ব্যাকবোন’ নামে একটা অপশন চালু করেছেন। এটা হচ্ছে এমন, অফিস সংক্রান্ত কোন রং-ডুয়িং বা অসঙ্গতি কেউ খুঁজে পেলে যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারবে। এই অভিযোগ সরাসরি এম.ডিসহ লিগ্যাল এবং ফিন্যান্সের চীফকে নিয়ে গঠিত প্যানেল দেখবে। এবং অভিযোগ সত্য হলে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে। এইজন্য যে অভিযোগ করবে তার চাকুরি যাওয়া দূরের কথা গায়ে আঁচড়টিও পড়বে না। এটাও বলা হয়েছে, যদি এম.ডি বা প্যানেলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তারা এই দায়িত্ব থেকে তাঁরা সরে যাবেন। অন্য কেউ, আরও কোন উঁচু পর্যায়ের কেউ এই বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বে থাকবেন।
রাব্বি ভাবছে, কি করবে? চিঠি কি দেবে, নাকি দেবে না? সিদ্ধান্তটা নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
অনেকবার রিঙ হওয়ার পর রাব্বি ফোন ধরল। ধরবে কি ধরবে না এটা ঠিক করতে করতেই অনেকটা সময় চলে গেছে। আজকাল সৈয়দের ফোন ধরাও বড়ো কষ্টকর মনে হয়। এই মানুষটার সামনে বা কথা বলার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু উপায় কী, শালার পেট! আসলে পেটকে দোষ দিয়ে লাভ নাই, দোষ দিতে হবে একপেট আবর্জনাকে। এই আবর্জনাই সমস্ত কষ্টের উৎস। আচ্ছা, স্বর্গে যে নিষিদ্ধ ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল এটাই কী মানুষের খাওয়ার উপযোগি কোন খাবার, যা খেলে হাগু হয়। বিকট সমস্যটা এইজন্যই হয়েছিল কী, প্রথম মানব খেয়ে তো ফেলল এখন হাগু না হয়ে তো উপায় নেই। স্বর্গে যে আবার হাগু করার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। হলে স্বর্গের আর মান রইল কই! বাধ্য হয়ে প্রথম মানবের জন্য স্বর্গের বাইরে স্থান ঠিক করে দেয়া হলো। মানবের জানামতে কথিত পৃথিবী।
ফোনের ওপাশ থেকে সৈয়দ গলা ফাটাচ্ছে, হ্যালো, হ্যালো, হ্যাল-লো।
রাব্বি আপ্রাণ চেষ্টায় গলা স্বাভাবিক করে বলল, জ্বী বস।
কি ব্যাপার আপনার ফোনে রিঙের পর রিঙ হচ্ছে। যাও ধরলেন, কথা বলছেন না!
কি বলেন বস, আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না, আমি তো আপনার কথা স্পষ্ট শুনছিলাম। আপনি কেবল হ্যালো হ্যালো বলছিলেন। সম্ভবত নেটওয়ার্কে সমস্যা, বস।
কতবার বললাম আপনার এই সিটিসেল নাম্বার বদলান।
বস, সব সময় তো সমস্যা হয় না। কখনও কখনও-।
রাখেন আপনার কখনও কখনও, সিটিসেল ফোন কারা ব্যবহার করে জানেন, রিকশাওয়ালারা ব্যবহার করে।
রাব্বির মেজাজ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, জ্বী, তা করে। বস, গ্রামীনের নাম্বার আমি মেথরের হাতেও দেখেছি। ওই দিন এক মেথর ফোন করে বলছিল-।
সৈয়দের নাম্বার গ্রামীন। বলতে পেরে রাব্বির এখন মেজাজ শরীফ। ব্লাডার ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, এমতাবস্থায় এখন মুত্র ত্যাগের ন্যায় আরাম লাগছে।
এবার সৈয়দের গলা গম্ভীর, শুনুন, ফিজুল আলাপের জন্য আপনাকে ফোন করিনি। আপনি আমার টেবিল থেকে না-বলে পার্কার কলমটা কেন নিয়েছেন? অফিসে ফিরলে পাঠিয়ে দেবেন।
রাব্বি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না। কাল ও সৈয়দের টেবিলে কোন একটা কলম অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নাড়াচাড়া করেছিল এটা সত্য কিন্তু না-বলে কলম নিয়ে আসবে কেন? আজিব! অন্তত সৈয়দ এটা বললেও পারত, আপনি কি ভুলে কলমটা নিয়ে এসেছিলেন? অথচ এই চুতিয়া এমন করে বলছে যেন ও একটা দাগী চোর। কলম ওই নিয়েছে। শালার দুনিয়ায় কত ধরনের মানুষ যে পয়দা হয়েছে। ক-পাতা পড়ে ফেলেছে বলে এই কুতুয়াকে আবার লোকজন ঘটা করে চাকুরিও দেয়! হারামজাদাকে ও নিজে পিয়নের চাকুরিও দিত না। কার বরাতে যেন চাকুরি পেল? এমপি, না স্পিকার? মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এই দেশে ব্যবসা ভালই বোঝে। কাকে ক-কেজি তেল দিতে হবে, কাকে হাতে রাখতে হবে এটা এদের চেয়ে কে ভাল জানে! শালারা এই দেশের কাঁঠাল এ দেশের লোকজনের মাথায় ভেঙ্গে খাচ্ছে কি এমনি এমনি! ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এদের কাছে কোন ছার, নস্যি!
রাব্বির এই মুহূর্তে মনে পড়ল, সৈয়দ একবার অপারেটিং সিস্টেমের একটা সি.ডি চেয়েছিল ওর কাছে। এর কাছে কোন জিনিস গেলে সেটা ফেরত এসেছে এমন উদাহরণ গোটা অফিসে নাই। রাব্বি সি.ডি-টার কপি করে দিয়েছিল। কাজ চালাতে কোন সমস্যা নাই। ওমা, এই হার্মাদ এই নিয়ে কী নাটকই না করল! দস্তুরমতো একটা অফিসিয়াল চিঠির মতো লিখল। হাস্যকর একটা কাজ। কী চিঠি রে বাবা!
রাব্বি চিঠিটা পেয়ে নিশ্চিত হয়েছিল এ একটা বদ্ধউম্মাদ। ল্যাংটা পাগলের চেয়েও ভয়াবহ, স্রেফ কাপড় পরে থাকে এই পার্থক্য। একে পাগলা গারদে না রেখে খুব বড়ো ভুল করা হচ্ছে।
এর বিজনেস কার্ডটা দেখলেও কারও সন্দেহ থাকবে যে এর মাথায় সমস্যা আছে। ভাঁজ করা যায় এমন দু-পাতার একটা কার্ড। প্রথম পাতায় 'হেড অভ ট্রেড' এইসব ঠিক আছে কিন্তু অন্য পাতায় হাবিজাবি কী নেই যে লিখে রাখেনি। আল্লা জানে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা!
সৈয়দ এই বিজনেস কার্ড আবার সবাইকে দেয় না, বেছে বেছে। অফিসের অনেকেই জানে না, বিশেষ করে বড় কর্তারা। এর বিজনেস কার্ডে এই সব বাছাল পড়ে রাব্বির হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে উল্টে পড়েছিল। কেমন চুতিয়ার চুতিয়া!
রাব্বি আরেকটা বিষয় লক্ষ করেছে, সৈয়দ ফোনটা উঠিয়েই বলবে, সৈয়দ সাহেব বলছি। আবার অনেক সময় এমনও হয়, কাউকে বলবে, আচ্ছা তুমি যেটা করবে, ওর কাছে গিয়ে বলবে আমাকে সৈয়দ সাহেব পাঠিয়েছেন। হা হা হা। রাব্বির বিস্ময়ের শেষ নাই একটা মানুষ এতোটা নির্বোধ হয় কেমন করে। কেউ কি নিজেই নিজেকে সাহেব বলে নাকি!
রাব্বিকে একদিন বলছে, আচ্ছা, আপনি নাকি মার্কেটে দোকানদারদের কাছে আমার নাম ধরে বলেন?
রাব্বি অবাক, কই, না তো, বস!
হ্যা বলেন, ওই আর কি, আমার ডেজিগনেশনের সঙ্গে নাম জুড়ে দেন। এটা কি ঠিক?
বস, কি বলব তাহলে?
দোকানদারদের কি বলবেন, এটাও আপনাকে শিখিয়ে দিতে হবে! পান দোকানদার ডেজিগনেশনের কি বুঝবে? বলবেন, এটা সৈয়দ সাহেবের...।
রাব্বি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এই মানুষটার মাথায় কী এক ছটাক ঘিলুও নাই! এতো ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কেউ এমন অস্থির হতে পারে। অজান্তেই মনখারাপ করা শ্বাস বেরিয়ে এলো, এই সব অযোগ্য মানুষরাই যোগ্য স্থানে বসে আছে।
ফোনের ওপাশে হ্যালো হ্যালো শুনে রাব্বির চমক ভাঙ্গল। রাব্বি সামলে নিয়ে হিম গলায় বলল, মি. সৈয়দ, আপনার কলম আমি নেইনি। আমি কেন না-বলে আপনার কলম নিতে যাব!
সৈয়দ সম্ভবত রাব্বির গলার উত্তাপ টের পেলেন, আপনি নেন নাই তো কলম গেল কোথায়?
রাব্বির মুখে এসে গিয়েছিল, গেল কোথায়-গেল কোথায়, হুম। এক কাজ কর চিমটা দিয়ে তোর রেকটামে খুঁজে দেখ, না পেলে আমার নাম বদলে ফেলব। মুখে বলল, আপনার কলম কোথায় এটার উত্তর তো আমার কাছে নাই। বস, এক কাজ করলে কেমন হয়, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে?
সৈয়দ হিসহিস করে বললেন, আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন। আপনি খুব দ্রুত দৌড়াচ্ছেন, একটু আস্তে।
জ্বী বস, আস্তে, এতো আস্তে দৌড়াব পিপড়াও আমাকে ওভার-টেক করে চলে যাবে।
ওপাশের লাইন কেটে গেছে।
সহায়ক লিংক:
১. জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6
খানিকটা সামলে নিয়ে বিলের পুরো সেটটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে তালা মেরে দিল। এইবার ঠান্ডা মাথায় ভাবা যেতে পারে। বিষয়টা তাহলে কী দাঁড়াল? এই বিলের কপি অনুযায়ী মার্কেট ডেভেলপ করার জন্য লক্ষ-লক্ষ টাকার বিভিন্ন আইটেম কেনা হয়েছে যার সম্বন্ধে বিন্দুবিগর্স ওরা জানে না। অথচ সইটা সৈয়দের এতে কোন সন্দেহ নেই! কেমন করে এটা সম্ভব?
রাব্বি বুঝে উঠতে পারছে না এমন একটা বিল ওদের অগোচরে সৈয়দ পাঠিয়েছে কেন? কেন-কেন-কেন? এটা ওদের আজও জানা হতো না, যদি না বিলের হেড বদলে দেবার জন্য হেড অফিস থেকে ফেরত আসত। সৈয়দ অফিসে নেই নইলে এটা তার টেবিলেই যাওয়ার কথা। সচরাচর হেড অফিসের চিঠিগুলো ওরা সরাসরি সৈয়দের কাছেই পাঠিয়ে দেয়।
রাব্বি ড্রয়ার খুলে চিঠির সঙ্গের ভাউচারগুলো বের করল। একের পর এক উল্টে যাচ্ছে। অপিরিচিতসব আউটেম। ও ১০০ ভাগ নিশ্চিত অধিকাংশই কেনা হয়নি। ড্রাইভারকে বলল গাড়ি বের করতে। কয়েকটা দোকান থেকে একটাকে বেছে নিল। যেতে যেতে ভাবছে, কেমন করে বিষয়টা উত্থাপন করতে হবে? দোকানদারের সন্দেহ হলে ভজকট হয়ে যাবে। ব্যাটা আবার সৈয়দের লোক হলে ফট করে বলে দেবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। ও ফেঁসে যাবে।
রাব্বি দোকানে ঢুকে এটা-সেটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। এরা মুলত বিভিন্ন গিফট আইটেম বিক্রি করে। ক্যালকুলেটর, ঘড়ি, ছাতা, বালতি এইসব। এখান থেকে আউটলেটের জন্য বিভিন্ন গিফট কিনেছে সৈয়দ। প্রতিটি দোকানে যে-কোনও একটা আইটেম গিফট হিসাবে দেয়া হয়েছে এমনটাই সৈয়দ ক্লেইম করেছে। কী বিপুল অংক!
ছেলেটা রাব্বিকে বলল, আপনি কি কিছু খুঁজছেন, স্যার।
রাব্বি মুখ ভরে হাসল, আসলে আমি না, আমার কোম্পানি কিনবে। আপনাদের কাছ থেকে আগেও অনেক টাকার জিনিসপত্র আমরা নিয়েছি।
কোম্পানির নাম শুনেই ছেলেটা হাত কচলাতে শুরু করল, স্যার, আগে বলবেন না। যা লাগে নিয়ে যান, আপনাদের টাকা-পয়সা কোন বিষয় না।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, আচ্ছা, মেমোটা-।
স্যার, কি যে বলেন। এইটা কোন সমস্যা না। আগেও তো আস্ত মেমো বই আপনাদের দিয়ে দিয়েছি, দেই নি!
রাব্বি চেপে রাখা শ্বাস ছাড়ল। আচ্ছা, এই তাহলে বিষয়! সৈয়দ অল্প কিছু জিনিস এখান থেকে কিনেছে এরপর আস্ত মেমো নিয়ে ভুয়া বিল বানিয়ে পাঠিয়েছে। পরে যোগাযোগ করবে বলে রাব্বি এখান থেকে বেরিয়ে পড়ল।
অন্য দোকানে ঘুরে আর লাভ নেই। সব জায়গায় একই ফল হবে। দস্তুরমতো ওর মাথা ঘুরছে। কী অনাচার, কী লোভ। সৈয়দ কোম্পানি থেকে প্রায় ১ লক্ষ টাকা বেতন ড্র করে, বেসুমার সুবিধা ভোগ করে। তারপরও একজন মানুষ কেমন করে এমনটা করতে পারে, অসৎ হয়!
এটা নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করা ঠিক হবে না। চাকুরির খাতিয়ে অন্যরা ঠিকই সৈয়দের কানে কথাটা তুলবে। আগেভাগে সাবধান হয়ে গেলে সব ভেস্তে যাবে। হেড-অফিসে কার কাছে এটা জানানো যেতে পারে। এম.ডি-কে প্রমাণসহ জানালে কেমন হয়? এমডির নামটা বড়ো অদ্ভুত, হার্ট উইক। শুনেছে বাস্তবে হার্ট উইক না, স্ট্রং টাইপের মানুষ। কোন এক ডিপোতে নাকি কি একটা ঝামেলা হয়েছিল। এ কেমন করে যেন টের পেয়ে যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অফিস, যেখানে সচরাচর একজিকিউটিভ টাইপের কেউ যায় না সেখানে বেস্ট এয়ারের হেলিকপ্টার ভাড়া করে স্বয়ং এম.ডি গিয়ে হাজির। এ নিমিষেই সব তছনছ করে ফেলল। ওখানকার ইনচার্জ বমাল ধরা। ট্যাঁ ফোঁ করার সুযোগও রইল না!
রাব্বি মনস্থির করল সরাসরি এম.ডিকেই লিখবে। এমনিতে এই ভদ্রলোক জয়েন করার পরই কিছু নতুন নতুন নিয়ম-সুবিধা চালু করেছিলেন। ‘ব্যাকবোন’ নামে একটা অপশন চালু করেছেন। এটা হচ্ছে এমন, অফিস সংক্রান্ত কোন রং-ডুয়িং বা অসঙ্গতি কেউ খুঁজে পেলে যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারবে। এই অভিযোগ সরাসরি এম.ডিসহ লিগ্যাল এবং ফিন্যান্সের চীফকে নিয়ে গঠিত প্যানেল দেখবে। এবং অভিযোগ সত্য হলে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে। এইজন্য যে অভিযোগ করবে তার চাকুরি যাওয়া দূরের কথা গায়ে আঁচড়টিও পড়বে না। এটাও বলা হয়েছে, যদি এম.ডি বা প্যানেলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তারা এই দায়িত্ব থেকে তাঁরা সরে যাবেন। অন্য কেউ, আরও কোন উঁচু পর্যায়ের কেউ এই বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বে থাকবেন।
রাব্বি ভাবছে, কি করবে? চিঠি কি দেবে, নাকি দেবে না? সিদ্ধান্তটা নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
অনেকবার রিঙ হওয়ার পর রাব্বি ফোন ধরল। ধরবে কি ধরবে না এটা ঠিক করতে করতেই অনেকটা সময় চলে গেছে। আজকাল সৈয়দের ফোন ধরাও বড়ো কষ্টকর মনে হয়। এই মানুষটার সামনে বা কথা বলার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু উপায় কী, শালার পেট! আসলে পেটকে দোষ দিয়ে লাভ নাই, দোষ দিতে হবে একপেট আবর্জনাকে। এই আবর্জনাই সমস্ত কষ্টের উৎস। আচ্ছা, স্বর্গে যে নিষিদ্ধ ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল এটাই কী মানুষের খাওয়ার উপযোগি কোন খাবার, যা খেলে হাগু হয়। বিকট সমস্যটা এইজন্যই হয়েছিল কী, প্রথম মানব খেয়ে তো ফেলল এখন হাগু না হয়ে তো উপায় নেই। স্বর্গে যে আবার হাগু করার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। হলে স্বর্গের আর মান রইল কই! বাধ্য হয়ে প্রথম মানবের জন্য স্বর্গের বাইরে স্থান ঠিক করে দেয়া হলো। মানবের জানামতে কথিত পৃথিবী।
ফোনের ওপাশ থেকে সৈয়দ গলা ফাটাচ্ছে, হ্যালো, হ্যালো, হ্যাল-লো।
রাব্বি আপ্রাণ চেষ্টায় গলা স্বাভাবিক করে বলল, জ্বী বস।
কি ব্যাপার আপনার ফোনে রিঙের পর রিঙ হচ্ছে। যাও ধরলেন, কথা বলছেন না!
কি বলেন বস, আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না, আমি তো আপনার কথা স্পষ্ট শুনছিলাম। আপনি কেবল হ্যালো হ্যালো বলছিলেন। সম্ভবত নেটওয়ার্কে সমস্যা, বস।
কতবার বললাম আপনার এই সিটিসেল নাম্বার বদলান।
বস, সব সময় তো সমস্যা হয় না। কখনও কখনও-।
রাখেন আপনার কখনও কখনও, সিটিসেল ফোন কারা ব্যবহার করে জানেন, রিকশাওয়ালারা ব্যবহার করে।
রাব্বির মেজাজ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, জ্বী, তা করে। বস, গ্রামীনের নাম্বার আমি মেথরের হাতেও দেখেছি। ওই দিন এক মেথর ফোন করে বলছিল-।
সৈয়দের নাম্বার গ্রামীন। বলতে পেরে রাব্বির এখন মেজাজ শরীফ। ব্লাডার ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, এমতাবস্থায় এখন মুত্র ত্যাগের ন্যায় আরাম লাগছে।
এবার সৈয়দের গলা গম্ভীর, শুনুন, ফিজুল আলাপের জন্য আপনাকে ফোন করিনি। আপনি আমার টেবিল থেকে না-বলে পার্কার কলমটা কেন নিয়েছেন? অফিসে ফিরলে পাঠিয়ে দেবেন।
রাব্বি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না। কাল ও সৈয়দের টেবিলে কোন একটা কলম অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নাড়াচাড়া করেছিল এটা সত্য কিন্তু না-বলে কলম নিয়ে আসবে কেন? আজিব! অন্তত সৈয়দ এটা বললেও পারত, আপনি কি ভুলে কলমটা নিয়ে এসেছিলেন? অথচ এই চুতিয়া এমন করে বলছে যেন ও একটা দাগী চোর। কলম ওই নিয়েছে। শালার দুনিয়ায় কত ধরনের মানুষ যে পয়দা হয়েছে। ক-পাতা পড়ে ফেলেছে বলে এই কুতুয়াকে আবার লোকজন ঘটা করে চাকুরিও দেয়! হারামজাদাকে ও নিজে পিয়নের চাকুরিও দিত না। কার বরাতে যেন চাকুরি পেল? এমপি, না স্পিকার? মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এই দেশে ব্যবসা ভালই বোঝে। কাকে ক-কেজি তেল দিতে হবে, কাকে হাতে রাখতে হবে এটা এদের চেয়ে কে ভাল জানে! শালারা এই দেশের কাঁঠাল এ দেশের লোকজনের মাথায় ভেঙ্গে খাচ্ছে কি এমনি এমনি! ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এদের কাছে কোন ছার, নস্যি!
রাব্বির এই মুহূর্তে মনে পড়ল, সৈয়দ একবার অপারেটিং সিস্টেমের একটা সি.ডি চেয়েছিল ওর কাছে। এর কাছে কোন জিনিস গেলে সেটা ফেরত এসেছে এমন উদাহরণ গোটা অফিসে নাই। রাব্বি সি.ডি-টার কপি করে দিয়েছিল। কাজ চালাতে কোন সমস্যা নাই। ওমা, এই হার্মাদ এই নিয়ে কী নাটকই না করল! দস্তুরমতো একটা অফিসিয়াল চিঠির মতো লিখল। হাস্যকর একটা কাজ। কী চিঠি রে বাবা!
রাব্বি চিঠিটা পেয়ে নিশ্চিত হয়েছিল এ একটা বদ্ধউম্মাদ। ল্যাংটা পাগলের চেয়েও ভয়াবহ, স্রেফ কাপড় পরে থাকে এই পার্থক্য। একে পাগলা গারদে না রেখে খুব বড়ো ভুল করা হচ্ছে।
এর বিজনেস কার্ডটা দেখলেও কারও সন্দেহ থাকবে যে এর মাথায় সমস্যা আছে। ভাঁজ করা যায় এমন দু-পাতার একটা কার্ড। প্রথম পাতায় 'হেড অভ ট্রেড' এইসব ঠিক আছে কিন্তু অন্য পাতায় হাবিজাবি কী নেই যে লিখে রাখেনি। আল্লা জানে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা!
সৈয়দ এই বিজনেস কার্ড আবার সবাইকে দেয় না, বেছে বেছে। অফিসের অনেকেই জানে না, বিশেষ করে বড় কর্তারা। এর বিজনেস কার্ডে এই সব বাছাল পড়ে রাব্বির হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে উল্টে পড়েছিল। কেমন চুতিয়ার চুতিয়া!
রাব্বি আরেকটা বিষয় লক্ষ করেছে, সৈয়দ ফোনটা উঠিয়েই বলবে, সৈয়দ সাহেব বলছি। আবার অনেক সময় এমনও হয়, কাউকে বলবে, আচ্ছা তুমি যেটা করবে, ওর কাছে গিয়ে বলবে আমাকে সৈয়দ সাহেব পাঠিয়েছেন। হা হা হা। রাব্বির বিস্ময়ের শেষ নাই একটা মানুষ এতোটা নির্বোধ হয় কেমন করে। কেউ কি নিজেই নিজেকে সাহেব বলে নাকি!
রাব্বিকে একদিন বলছে, আচ্ছা, আপনি নাকি মার্কেটে দোকানদারদের কাছে আমার নাম ধরে বলেন?
রাব্বি অবাক, কই, না তো, বস!
হ্যা বলেন, ওই আর কি, আমার ডেজিগনেশনের সঙ্গে নাম জুড়ে দেন। এটা কি ঠিক?
বস, কি বলব তাহলে?
দোকানদারদের কি বলবেন, এটাও আপনাকে শিখিয়ে দিতে হবে! পান দোকানদার ডেজিগনেশনের কি বুঝবে? বলবেন, এটা সৈয়দ সাহেবের...।
রাব্বি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এই মানুষটার মাথায় কী এক ছটাক ঘিলুও নাই! এতো ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কেউ এমন অস্থির হতে পারে। অজান্তেই মনখারাপ করা শ্বাস বেরিয়ে এলো, এই সব অযোগ্য মানুষরাই যোগ্য স্থানে বসে আছে।
ফোনের ওপাশে হ্যালো হ্যালো শুনে রাব্বির চমক ভাঙ্গল। রাব্বি সামলে নিয়ে হিম গলায় বলল, মি. সৈয়দ, আপনার কলম আমি নেইনি। আমি কেন না-বলে আপনার কলম নিতে যাব!
সৈয়দ সম্ভবত রাব্বির গলার উত্তাপ টের পেলেন, আপনি নেন নাই তো কলম গেল কোথায়?
রাব্বির মুখে এসে গিয়েছিল, গেল কোথায়-গেল কোথায়, হুম। এক কাজ কর চিমটা দিয়ে তোর রেকটামে খুঁজে দেখ, না পেলে আমার নাম বদলে ফেলব। মুখে বলল, আপনার কলম কোথায় এটার উত্তর তো আমার কাছে নাই। বস, এক কাজ করলে কেমন হয়, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে?
সৈয়দ হিসহিস করে বললেন, আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন। আপনি খুব দ্রুত দৌড়াচ্ছেন, একটু আস্তে।
জ্বী বস, আস্তে, এতো আস্তে দৌড়াব পিপড়াও আমাকে ওভার-টেক করে চলে যাবে।
ওপাশের লাইন কেটে গেছে।
সহায়ক লিংক:
১. জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6
বিভাগ
জীবনটাই যখন নিলামে
Thursday, October 14, 2010
জীবনটাই যখন নিলামে: ৫
রাব্বি যখন ফিরল লোপা আড়চোখে লক্ষ করল রাব্বির হাত খালি। ক্ষীণ আশা ছিল, লোপার জন্য নিজ থেকে বই কিনে নিয়ে আসবে। পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝতে পারল। কী বোকা ও, রাব্বি যদি বই কেনার কথা ভাবত তাহলে অন্তত ফোন করে কি বই লাগবে জানার চেষ্টা করত। বই তো আর আলু-পটল না যে দুম করে একটা কিছু কিনে নিয়ে আসলাম। আসলে মানুষটার ন্যূনতম চেষ্টাও নেই, নেই খানিক অনুতাপও। মানুষটাকে প্রায়শ রোবট-রোবট মনে হয়!
জিজ্ঞেস করলে বলবে না তাই লোপা জিজ্ঞেস করল না। রাব্বির এটা বড়ো বিশ্রি অভ্যাস! ওর ইচ্ছা না-করলে কোন প্রশ্ন করলে উত্তর দেবে না। রাব্বির মতোই তার আচরণও দুর্বোধ্য কিন্তু কোন এক কারণে আজ রাব্বির মনটা ফুরফুরে।
লোপা বলল হতাশা লুকিয়ে, ভাত দেব, নাকি চা খাবে?
নাহ, একটু পর ভাত দিয়ে দাও। আজ প্রচুর চা খাওয়া হয়েছে।
তোমাদের মিটিং শেষ হলো ক-টায়?
আর বলো না, এই সৈয়দ মাদারচোদের যন্ত্রণায় আমি পাগল হয়ে যাব। একটা শেষ হলে আরেকটা মিটিং-এর এজেন্ডা ধরিয়ে দেয়।
প্লিজ রাব্বি, মুখ খারাপ করবে না।
কেন, এটা কী মসজিদ নাকি?
মসজিদ-মন্দিরের কথা আসছে কেন। প্লিজ, মুখ খারাপ করবে না। শুনতে বাল লাগে না!
লোপা বুঝতে পারছে রাব্বি খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়েছে। এ সামান্য কথাও ধরে বসে থাকে। তখন লোপার হয় বিপদ, রাব্বি কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কী কষ্ট, আগ বাড়িয়ে রাব্বির সঙ্গে সেধে সেধে কথা বলতে হয়। রাব্বি কখন ক্ষুব্ধ হলো এটা লোপাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ রাখতে হয়, কী অন্যায় আচরণ! কিন্তু আজকাল রাব্বির মুখ এমন খারাপ হয়েছে কেন? যখন-তখন মুখ খারাপ করে। ভুলটা ধরিয়ে দেয়ার পরও একে লজ্জিত হতে দেখা যায় না।
লোপা কথা ঘুরাবার জন্য বলল, আচ্ছা রাব্বি, গরুর পছন্দের রঙ কী?
হুম।
আহা, বলো না।
হুম।
আহা, বলোই না ছাই। আসলে পারবে না তো ঘন্টা!
হুম।
বলো না, প্লিজ।
লোপা, এটা একটা ফালতু প্রশ্ন, এর কোন উত্তর নাই।
উহুঁ, ফালতু না। গরুর পছন্দের রঙ সবুজ।
ধুর, সবুজ কেন? বোগাস!
আরে, ঘাসের রঙ সবুজ না!
আচ্ছা, তাইলে হলুদ না কেন?
লোপা অবাক, হলুদ হবে কেন?
তুমি বল?
পারলাম না, রাব্বি।
হলুদ এই জন্য, গরু খড়ও তো খায়।
তাই তো, তোমার দেখি অনেক বুদ্ধি।
এটাকে কি কমপ্লিমেন্টস হিসাবে নেব?
অবশ্যই।
রাব্বি ঠোঁট উল্টে বলল, ছ্যাহ বুদ্ধি, বুদ্ধিওয়ালি। গরু কালার ব্লাইন্ড-রঙকানা।
যাহ।
সত্যি।
ঠিক বলছ?
অবশ্যই।
রাব্বি, আমার মনে হয় তোমার এই তথ্যটা ঠিক না।
কেন?
কেন কি আবার। মনে হলো তাই।
লোপা, তোমার মনে হলে তো হবে না।
উহুঁ, এভাবে বললে তো হবে না। লাগবা বাজি?
কি বাজি?
তুমি হারলে যমুনা রিসোর্টে নিয়া যাবা।
রাব্বি মনখারাপ করা শ্বাস ফেলে বলল, নাহ, অফিসের ঝামেলা বেরুনো যাবে না।
নিমিষেই লোপার চোখ জলে ভরে গেল। বিয়ের ৮ বছর হল, এখনও রাব্বির সঙ্গে তেমন কোথাও যাওয়া হয়নি। ওর একটা-না-একটা ঝামেলা লেগেই থাকে। আজ এটা তো কাল ওটা।
রাব্বি বলল, কি হল?
কিছু না।
এতক্ষণ তো বেশ কথা বলছিলে!
ভাল লাগছে না কথা বলতে।
আহা, কি হয়েছে বলবে তো!
কিছু না।
লোপার কথা বলার ইচ্ছেটাই উবে গেছে।
রাব্বি সম্ভবত বিষয়টা লক্ষ করেনি। ও কখনও লক্ষ করে না। আজকাল লোপা ওর এইসব আচরণ সহ্য করতে পারে না। কীসের একটা চাকরি! ছাতার মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি, সেই সাত-সকালে বেরিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত। পরদিন আবার একই। বেছে বেছে ছুটির দিনে মিটিং, এর কোন মানে হয়! ওর কাছে স্রেফ আধুনিক দাসবৃত্তি মনে হয়! আদিম দাসবৃত্তিটাকেই আধুনিক মানুষ ঘষেমেজে আজ এমনটা দাঁড় করিয়েছে। মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশে অজস্র রোবট নামের দাস তৈরি করছে। স্রেফ দাস- একেকটা চলমান রোবট। এর পরিণতি যে কী ভয়াবহ এটা কেউ লক্ষ করছে না কেন?
সহায়ক লিংক:
১. জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6
জিজ্ঞেস করলে বলবে না তাই লোপা জিজ্ঞেস করল না। রাব্বির এটা বড়ো বিশ্রি অভ্যাস! ওর ইচ্ছা না-করলে কোন প্রশ্ন করলে উত্তর দেবে না। রাব্বির মতোই তার আচরণও দুর্বোধ্য কিন্তু কোন এক কারণে আজ রাব্বির মনটা ফুরফুরে।
লোপা বলল হতাশা লুকিয়ে, ভাত দেব, নাকি চা খাবে?
নাহ, একটু পর ভাত দিয়ে দাও। আজ প্রচুর চা খাওয়া হয়েছে।
তোমাদের মিটিং শেষ হলো ক-টায়?
আর বলো না, এই সৈয়দ মাদারচোদের যন্ত্রণায় আমি পাগল হয়ে যাব। একটা শেষ হলে আরেকটা মিটিং-এর এজেন্ডা ধরিয়ে দেয়।
প্লিজ রাব্বি, মুখ খারাপ করবে না।
কেন, এটা কী মসজিদ নাকি?
মসজিদ-মন্দিরের কথা আসছে কেন। প্লিজ, মুখ খারাপ করবে না। শুনতে বাল লাগে না!
লোপা বুঝতে পারছে রাব্বি খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়েছে। এ সামান্য কথাও ধরে বসে থাকে। তখন লোপার হয় বিপদ, রাব্বি কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কী কষ্ট, আগ বাড়িয়ে রাব্বির সঙ্গে সেধে সেধে কথা বলতে হয়। রাব্বি কখন ক্ষুব্ধ হলো এটা লোপাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ রাখতে হয়, কী অন্যায় আচরণ! কিন্তু আজকাল রাব্বির মুখ এমন খারাপ হয়েছে কেন? যখন-তখন মুখ খারাপ করে। ভুলটা ধরিয়ে দেয়ার পরও একে লজ্জিত হতে দেখা যায় না।
লোপা কথা ঘুরাবার জন্য বলল, আচ্ছা রাব্বি, গরুর পছন্দের রঙ কী?
হুম।
আহা, বলো না।
হুম।
আহা, বলোই না ছাই। আসলে পারবে না তো ঘন্টা!
হুম।
বলো না, প্লিজ।
লোপা, এটা একটা ফালতু প্রশ্ন, এর কোন উত্তর নাই।
উহুঁ, ফালতু না। গরুর পছন্দের রঙ সবুজ।
ধুর, সবুজ কেন? বোগাস!
আরে, ঘাসের রঙ সবুজ না!
আচ্ছা, তাইলে হলুদ না কেন?
লোপা অবাক, হলুদ হবে কেন?
তুমি বল?
পারলাম না, রাব্বি।
হলুদ এই জন্য, গরু খড়ও তো খায়।
তাই তো, তোমার দেখি অনেক বুদ্ধি।
এটাকে কি কমপ্লিমেন্টস হিসাবে নেব?
অবশ্যই।
রাব্বি ঠোঁট উল্টে বলল, ছ্যাহ বুদ্ধি, বুদ্ধিওয়ালি। গরু কালার ব্লাইন্ড-রঙকানা।
যাহ।
সত্যি।
ঠিক বলছ?
অবশ্যই।
রাব্বি, আমার মনে হয় তোমার এই তথ্যটা ঠিক না।
কেন?
কেন কি আবার। মনে হলো তাই।
লোপা, তোমার মনে হলে তো হবে না।
উহুঁ, এভাবে বললে তো হবে না। লাগবা বাজি?
কি বাজি?
তুমি হারলে যমুনা রিসোর্টে নিয়া যাবা।
রাব্বি মনখারাপ করা শ্বাস ফেলে বলল, নাহ, অফিসের ঝামেলা বেরুনো যাবে না।
নিমিষেই লোপার চোখ জলে ভরে গেল। বিয়ের ৮ বছর হল, এখনও রাব্বির সঙ্গে তেমন কোথাও যাওয়া হয়নি। ওর একটা-না-একটা ঝামেলা লেগেই থাকে। আজ এটা তো কাল ওটা।
রাব্বি বলল, কি হল?
কিছু না।
এতক্ষণ তো বেশ কথা বলছিলে!
ভাল লাগছে না কথা বলতে।
আহা, কি হয়েছে বলবে তো!
কিছু না।
লোপার কথা বলার ইচ্ছেটাই উবে গেছে।
রাব্বি সম্ভবত বিষয়টা লক্ষ করেনি। ও কখনও লক্ষ করে না। আজকাল লোপা ওর এইসব আচরণ সহ্য করতে পারে না। কীসের একটা চাকরি! ছাতার মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি, সেই সাত-সকালে বেরিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত। পরদিন আবার একই। বেছে বেছে ছুটির দিনে মিটিং, এর কোন মানে হয়! ওর কাছে স্রেফ আধুনিক দাসবৃত্তি মনে হয়! আদিম দাসবৃত্তিটাকেই আধুনিক মানুষ ঘষেমেজে আজ এমনটা দাঁড় করিয়েছে। মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশে অজস্র রোবট নামের দাস তৈরি করছে। স্রেফ দাস- একেকটা চলমান রোবট। এর পরিণতি যে কী ভয়াবহ এটা কেউ লক্ষ করছে না কেন?
সহায়ক লিংক:
১. জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6
বিভাগ
জীবনটাই যখন নিলামে
Wednesday, October 13, 2010
বৈদেশ পর্ব: চৌদ্দ
বৈদেশ পর্ব: ববস' নামের একটা ধারাবাহিক লেখা লিখেছিলাম [১]। বৈদেশ পর্ব: তোরোতে লিখেছিলাম: "...আমার জন্য অপেক্ষায় আছে বুড়া বাড়িটা। যার বয়স একশ ছুঁইছুঁই! অতি দ্রুত এর কাছে আমাকে ফিরতে হবে। বুড়া আমার অপেক্ষায় আছে। সবাই আমাকে ফেলে দিলেও এ আমাকে ফেলে দেবে না..."।
এই বুড়া বাড়িটা নামের অভিশপ্ত বাড়িটা আটকে ফেলেছে আমাকে। সবারই যেখানে আছে একটা করে ক্যারিয়ার সেখানে আমার হাতে টিফিন-ক্যারিয়ার। তো, এই বুড়ার নালায়েক সন্তান তিন দিনের মাথায় ঠিক ঠিক বুড়ার কাছে ফিরে এসেছিল। পরিশিষ্ট কবেই লেখা হয়ে গেছে, গল্প শেষ। এরপর বলার আর বাকী থাকে কী!
কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, এই লেখায় অতি প্রয়োজনীয় একটা বিষয় বাদ পড়েছে, অন্তত আমার কাছে! এমন জরুরি বিষয় কেমন করে ভুলে গেলাম এটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নাই কারণ হামেশাই দেখি ফাঁকা মস্তিষ্ক আমার সঙ্গে এই খেলাটা খেলে বড়ো আনন্দিত হয়!
লেখাটায় যেটা বাদ পড়েছে তা হচ্ছে চশমা বিষয়ক ভয়াবহ সমস্যা। চশমার বিষয়টা খানিকটা খোলাসা করি। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন থেকেই আমার চোখ অসম্ভব খারাপ- মাইনাস এইট পয়েন্ট ফাইভ! আমার ভাষায় যেটা বলি, চশমা ছাড়া আমি প্রায় অন্ধ! কালে কালে বরং আমার চোখ আগের চেয়ে ভাল হয়েছে।
তো, প্রাইমারিতেই পড়ার সময় আমি ব্ল্যাকবোর্ডে টিচারদের লেখা প্রায় কিছুই দেখতাম না। এই নিয়ে বড়ো যন্ত্রণা হতো যখন টিচার বললেন, ব্ল্যাকবোর্ডে যা লিখেছি তা খাতায় লেখো। তখন আমার মেজাজ খারাপ হতো, আরে, কী মুশকিল, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখার প্রয়োজন কি, মুখে বললে কি হয়?
আমার বাবা কেমন কেমন করে যেন টের পেয়ে গেলেন আমার চোখ খারাপ। চোখের ডাক্তার দেখালেন। ডাক্তার আঁতকে উঠে বললেন, 'আপনার ছেলের তো চোখ ভীষণ খারাপ, ভীষণ...। আর শোনেন, আপনার ছেলেকে চোখ খারাপ কোন মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবেন না'।
তখন বিয়ে-টিয়ে নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না, ছিল না চোখ খারাপ নিয়েও, মাথাব্যথার কারণ ছিল অন্য। যখন আমাকে চশমা ধরিয়ে দেয়া হলো তখন আমার ইচ্ছা করছিল মট করে এটাকে দু-টুকরা করে ফেলি। এ্যাহ, চশমা ধরিয়ে দিলেই হলো, আরে, সেই সময়টায় এই বয়সের ক-জন চোখে চশমা দেয়? অন্তত আমি তো কাউকে পাইনি। কী লজ্জা-কী লজ্জা! 'চারচোইক্খা' বলে যে ছেলেপেলেরা খেপায় এটা তো আর বাবার গায়ে লাগে না! বাবাটা যে একটা কী, অমানুষ-অমানুষ!
এদিকে বাবার কঠিন নির্দেশনা, চশমা চোখে দিয়েই স্কুলে যেতে হবে। বাবাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করতাম, ভয়ও [২] কিন্তু তাঁর এই আচরণের কারণে তখন তাঁকে রাক্ষস-রাক্ষস মনে হতো। যে মা, বাবার সমস্ত কঠিন আচরণ থেকে আমাকে রক্ষা করতেন তাঁকেও দেখলাম নির্দয় আচরণ করতে। তিনি এই বিষয়ে টুঁ-শব্দও করলেন না।
তখন আমার ব্রেন এখনকার চেয়ে ভাল ছিল, অন্তত ছিল বলেই ধারণা করি- প্রয়োজনের সময় যথেষ্ঠ সহায়তা করত। এখন ব্রেনহীন আমি সলাজে বলি, তখন খানিকটা ব্রেন ছিল বলেই মনে হয়। কালে কালে জিনিসটা নাই হয়ে গেছে, আফসোস!
যাই হোক, আমি একটা বুদ্ধি বের করলাম। স্কুলে যাওয়ার পূর্বে চশমা চোখে দিয়ে বের হই, কয়েক কদম গিয়েই চশমা পকেটে পুরে ফেলি। এই নিয়ম আমি হাইস্কুলেও চালু রাখলাম। এমনিতেও নিয়মিত স্কুলে যেতে আমার ভাল লাগত না। তারচেয়ে আমার জন্য অনেক আনন্দের ছিল গোয়াল ঘরে বসে গল্পের বই পড়তে [৩]। তখনকার ভাষায় 'আউট-বই'!
যাই হোক, এই গেল আমি এবং আমার চশমা। জার্মানি যাওয়ার পূর্বে ক-দিন ধরেই তীব্র মাথাব্যথায় ভুগছিলাম। সমস্যাটা কোথায় এটা আঁচ করতে পেরে চোখের ডাক্তারের কাছে গেলাম। যা অনুমান করেছিলাম, তাই। সমস্যাটা চশমার। কী সর্বনাশ! পূর্বে কাছে এবং দূরের কাজ একটা চশমা দিয়েই চলত এখন কাছের এবং দূরের জন্য আলাদা-আলাদা চশমা নিতে হবে। কাছের মাইনাস ফাইভ, দূরেরটা মাইনাস সেভেন। বড়ই যন্ত্রণা!
চশমার দোকানদার কাছেরটা চট করে দিয়ে দিল কিন্তু কি যেন একটা ভজকট হলো দূরেরটা দিতে পারছিল না। এদিকে আমার যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। যেদিন আমি আখাউড়া ছাড়ব সেদিন সকালে দূরের চশমাটা দেয়ার কথা। দোকানে যাওয়ার পর যখন এই ব্যাটা বলল, 'আসে নাই, আপনের চশমা কাইল ছাড়া পারুম না', তখন আমি মনে মনে ভাবছিলাম গদাম করে ঘুষিটা কোথায় মারা যায়? বিকশিত দাঁতে মারলে কেমন হয় বা নাকটা সমান করে দিলে? ব্যাটা বলে কি, আমার ট্রেন আজ এগারোটায় আর এ কিনা কাল দেবে চশমা!
কিছুই করার নেই, পড়ার জন্য যে কাছের চশমাটা এটাকেই সম্বল করেই রওয়ানা দিলাম। ক্ষীণ আশা, হয়তো ঢাকায় কোনো একটা উপায় করা যাবে। কিন্তু সময়ে কুলালো না। অধিকাংশ সময় নষ্ট হলো এমিরাটসের কারণে। দুবাই এয়ারপোর্টে আট ঘন্টা থাকতে হবে বিধায় হোটেল কূপন এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য এই হোটেল কূপন এদের অসভ্যতার কারণে আমার কোনো কাজেই লাগেনি। দুবাই এয়ারপোর্টে আমার রাতটা কেটেছিল ঘুমহীন!
চুতিয়া শব্দটা এখন আর ব্যবহার করি না নইলে বলতাম এমিরাটসের এটা চুতিয়াগিরি। কারণ দুবাই ইমিগ্রেশন কোনো কারণ ব্যতীত হোটেলে যাওয়ার অনুমতি না দেয়ায়, এমিরাটসের ওখানকার ডেস্কে জানানোর পরও এরা ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এই চশমা আমাকে বড়ো ভুগিয়েছে, পদে পদে। যখন দাউদ ভাই [৪, ৫] আমাকে বলছেন, 'ওই যে দেখছ, মানুষটাকে দেখছ...'। দেখো দিকি কান্ড, বেশ দূরে দাঁড়ানো জিনিসটা মানুষ না উট এটা আমি বলি কেমন করে! মুখে বলি, 'অ, আচ্ছা, হ্যা-হ্যা'।
আমি কথা ঘুরাই, 'আচ্ছা, দাউদ ভাই, যে কবিতা লেখার কারণে আপনাকে দেশ থেকে বের করে দেয়া দিয়েছিল ওই কবিতাটা এখন পাওয়া যাবে কোথায়'?
দাউদ ভাই এর হদিশ দিতে পারেন না। আমি খানিকটা অবাক হই। জানতে চাই, 'আপনার কবিতাটার নাম যেন কি ছিল'?
এই বুড়া বাড়িটা নামের অভিশপ্ত বাড়িটা আটকে ফেলেছে আমাকে। সবারই যেখানে আছে একটা করে ক্যারিয়ার সেখানে আমার হাতে টিফিন-ক্যারিয়ার। তো, এই বুড়ার নালায়েক সন্তান তিন দিনের মাথায় ঠিক ঠিক বুড়ার কাছে ফিরে এসেছিল। পরিশিষ্ট কবেই লেখা হয়ে গেছে, গল্প শেষ। এরপর বলার আর বাকী থাকে কী!
কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, এই লেখায় অতি প্রয়োজনীয় একটা বিষয় বাদ পড়েছে, অন্তত আমার কাছে! এমন জরুরি বিষয় কেমন করে ভুলে গেলাম এটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নাই কারণ হামেশাই দেখি ফাঁকা মস্তিষ্ক আমার সঙ্গে এই খেলাটা খেলে বড়ো আনন্দিত হয়!
লেখাটায় যেটা বাদ পড়েছে তা হচ্ছে চশমা বিষয়ক ভয়াবহ সমস্যা। চশমার বিষয়টা খানিকটা খোলাসা করি। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন থেকেই আমার চোখ অসম্ভব খারাপ- মাইনাস এইট পয়েন্ট ফাইভ! আমার ভাষায় যেটা বলি, চশমা ছাড়া আমি প্রায় অন্ধ! কালে কালে বরং আমার চোখ আগের চেয়ে ভাল হয়েছে।
তো, প্রাইমারিতেই পড়ার সময় আমি ব্ল্যাকবোর্ডে টিচারদের লেখা প্রায় কিছুই দেখতাম না। এই নিয়ে বড়ো যন্ত্রণা হতো যখন টিচার বললেন, ব্ল্যাকবোর্ডে যা লিখেছি তা খাতায় লেখো। তখন আমার মেজাজ খারাপ হতো, আরে, কী মুশকিল, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখার প্রয়োজন কি, মুখে বললে কি হয়?
আমার বাবা কেমন কেমন করে যেন টের পেয়ে গেলেন আমার চোখ খারাপ। চোখের ডাক্তার দেখালেন। ডাক্তার আঁতকে উঠে বললেন, 'আপনার ছেলের তো চোখ ভীষণ খারাপ, ভীষণ...। আর শোনেন, আপনার ছেলেকে চোখ খারাপ কোন মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবেন না'।
তখন বিয়ে-টিয়ে নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না, ছিল না চোখ খারাপ নিয়েও, মাথাব্যথার কারণ ছিল অন্য। যখন আমাকে চশমা ধরিয়ে দেয়া হলো তখন আমার ইচ্ছা করছিল মট করে এটাকে দু-টুকরা করে ফেলি। এ্যাহ, চশমা ধরিয়ে দিলেই হলো, আরে, সেই সময়টায় এই বয়সের ক-জন চোখে চশমা দেয়? অন্তত আমি তো কাউকে পাইনি। কী লজ্জা-কী লজ্জা! 'চারচোইক্খা' বলে যে ছেলেপেলেরা খেপায় এটা তো আর বাবার গায়ে লাগে না! বাবাটা যে একটা কী, অমানুষ-অমানুষ!
এদিকে বাবার কঠিন নির্দেশনা, চশমা চোখে দিয়েই স্কুলে যেতে হবে। বাবাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করতাম, ভয়ও [২] কিন্তু তাঁর এই আচরণের কারণে তখন তাঁকে রাক্ষস-রাক্ষস মনে হতো। যে মা, বাবার সমস্ত কঠিন আচরণ থেকে আমাকে রক্ষা করতেন তাঁকেও দেখলাম নির্দয় আচরণ করতে। তিনি এই বিষয়ে টুঁ-শব্দও করলেন না।
তখন আমার ব্রেন এখনকার চেয়ে ভাল ছিল, অন্তত ছিল বলেই ধারণা করি- প্রয়োজনের সময় যথেষ্ঠ সহায়তা করত। এখন ব্রেনহীন আমি সলাজে বলি, তখন খানিকটা ব্রেন ছিল বলেই মনে হয়। কালে কালে জিনিসটা নাই হয়ে গেছে, আফসোস!
যাই হোক, আমি একটা বুদ্ধি বের করলাম। স্কুলে যাওয়ার পূর্বে চশমা চোখে দিয়ে বের হই, কয়েক কদম গিয়েই চশমা পকেটে পুরে ফেলি। এই নিয়ম আমি হাইস্কুলেও চালু রাখলাম। এমনিতেও নিয়মিত স্কুলে যেতে আমার ভাল লাগত না। তারচেয়ে আমার জন্য অনেক আনন্দের ছিল গোয়াল ঘরে বসে গল্পের বই পড়তে [৩]। তখনকার ভাষায় 'আউট-বই'!
যাই হোক, এই গেল আমি এবং আমার চশমা। জার্মানি যাওয়ার পূর্বে ক-দিন ধরেই তীব্র মাথাব্যথায় ভুগছিলাম। সমস্যাটা কোথায় এটা আঁচ করতে পেরে চোখের ডাক্তারের কাছে গেলাম। যা অনুমান করেছিলাম, তাই। সমস্যাটা চশমার। কী সর্বনাশ! পূর্বে কাছে এবং দূরের কাজ একটা চশমা দিয়েই চলত এখন কাছের এবং দূরের জন্য আলাদা-আলাদা চশমা নিতে হবে। কাছের মাইনাস ফাইভ, দূরেরটা মাইনাস সেভেন। বড়ই যন্ত্রণা!
চশমার দোকানদার কাছেরটা চট করে দিয়ে দিল কিন্তু কি যেন একটা ভজকট হলো দূরেরটা দিতে পারছিল না। এদিকে আমার যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। যেদিন আমি আখাউড়া ছাড়ব সেদিন সকালে দূরের চশমাটা দেয়ার কথা। দোকানে যাওয়ার পর যখন এই ব্যাটা বলল, 'আসে নাই, আপনের চশমা কাইল ছাড়া পারুম না', তখন আমি মনে মনে ভাবছিলাম গদাম করে ঘুষিটা কোথায় মারা যায়? বিকশিত দাঁতে মারলে কেমন হয় বা নাকটা সমান করে দিলে? ব্যাটা বলে কি, আমার ট্রেন আজ এগারোটায় আর এ কিনা কাল দেবে চশমা!
কিছুই করার নেই, পড়ার জন্য যে কাছের চশমাটা এটাকেই সম্বল করেই রওয়ানা দিলাম। ক্ষীণ আশা, হয়তো ঢাকায় কোনো একটা উপায় করা যাবে। কিন্তু সময়ে কুলালো না। অধিকাংশ সময় নষ্ট হলো এমিরাটসের কারণে। দুবাই এয়ারপোর্টে আট ঘন্টা থাকতে হবে বিধায় হোটেল কূপন এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য এই হোটেল কূপন এদের অসভ্যতার কারণে আমার কোনো কাজেই লাগেনি। দুবাই এয়ারপোর্টে আমার রাতটা কেটেছিল ঘুমহীন!
চুতিয়া শব্দটা এখন আর ব্যবহার করি না নইলে বলতাম এমিরাটসের এটা চুতিয়াগিরি। কারণ দুবাই ইমিগ্রেশন কোনো কারণ ব্যতীত হোটেলে যাওয়ার অনুমতি না দেয়ায়, এমিরাটসের ওখানকার ডেস্কে জানানোর পরও এরা ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
দেশে ফিরে এমিরাটসকে এই হেনেস্তার বিস্তারিত লেখার পর, Customer Affairs থেকে Marsha Rozario নামের একজন আমাকে মেইল করে জানিয়েছে, "...I am happy to learn that you were provided with hotel accommodation within the terminal..." এই নির্বোধের উত্তর দেখে আমার হাসি চাপা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। আমি লিখলাম কি আর এ আমাকে উত্তর দিল কী!
![]() |
| মুকিত বিল্লাহ |
পূর্বের এক লেখায় মুকিত বিল্লাহ নামের মানুষটার কথা বলেছিলাম, ইউরোপিয়ান কমিশনে কাজ করেন। আমি যাব ডুজলডর্ফ আর তিনি ফ্রান্কফুট।
তাঁরও একই গতি, তাঁকেও এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতে দেয়া হয়নি। আমার অবশ্য খানিকটা শান্তি-শান্তি লেগেছিল, যাক, আমার চেহারার মধ্যে হয়তো ড্রাগ ডিলারের ছাপ আছে বলে কেবল আমাকেই আটকায়নি, মুকিত বিল্লাহকেও আটকিয়েছে।
মুকিত বিল্লাহ নামের মানুষটার কারণে দুবাই এয়ারপের্টের অসহ্য সময়টা পার হয়েছিল কিন্তু এই মানুষটার যে সহায়তার কথা আমি ভুলব না সেটাই উল্লেখ করা হয়নি! আমার চোখের চশমাটা কাছের, দূরের যা দেখি সব অস্পষ্ট-তমোময়। সবচেয়ে কষ্টকর মনে হতো, ডিসপ্লেতে যখন ফ্লাইট শিডিউল দেখতে হতো, তখন।
কপাল! আমার ফ্লাইটে যেন কী একটা ঝামেলা হলো। সব গেট একের পর এক ওপেন হচ্ছে, আমারটা বাদ দিয়ে। আমি খানিক পর পর বলি, 'মুকিত, দেখেন তো ফ্লাইটের কি অবস্থা'? মুকিত দেখে জানান। একটু পর আমি আবারও বলি, মুকিত, দেখেন তো...। তাঁর ফ্লাইট আবার অন্যটা। কখনও তিনি রগড় করতে ছাড়েন না, 'আপনার ফ্লাইট তো যাবে না'।
আমি চেপে রাখা ভয় প্রকাশ করি না, সর্বনাশ, এই কুখ্যাত এয়ারপোর্টে কি আমি আটকা পড়ব, যেখানে সহায়তা করার জন্য কেউ নেই। আমার মনে পড়ে 'টার্মিনাল' মুভির কথা। এমন কি এখানে এয়ারলাইন্সের লোকজনরাও বিচিত্র কারণে অসহযোগিতা করছে। অথচ জার্মানিতে এই এয়ারলাইন্সের লোকজনকেই আমি দেখেছি সহৃদয় আচরণ করতে!
আমার কেবল মনে পড়ছিল মাহাবুব আহমাদ নামের করপোরেট ভুবনের মানুষটার কথা, যিনি অফিসের কাজে হামেশা পায়ে চাকা লাগিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ান। দুবাই হয়ে যাচ্ছি শুনে তিনি বলেছিলেন, 'দুবাই এয়ারপোর্ট কুখ্যাত, গেলে বুঝবা'।
দুবাই ছেড়ে যাওয়ার পর হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। একবার ডুজলডর্ফ পৌঁছে গেলে আর চিন্তার কিছু নেই কারণ এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কপালের ফের, ডুজলডর্ফ এয়ারপোর্টে লাগেজ নিয়ে আরেক সমস্যা। লাগেজ খুঁজে পাচ্ছি না, ভুল বেল্টে লাগেজ চলে গেছে! এয়ারপোর্টের লোকজনকে জানাবার পর এরা আমাকে আশ্বস্ত করল, চিন্তার কিছু নেই, ব্যবস্থা হবে। আমাকে অপেক্ষা করতে বলে চার-পাঁচজন বিভিন্ন দিকে গিয়ে খোঁজ নেয়া শুরু করল। অল্পক্ষণেই আমাকে জানানো হলো, 'তোমার সমস্যার সমাধান হয়েছে। তুমি ওই ডিসপ্লেবোর্ডে...'। আমি মনখারাপ করা শ্বাস ফেললাম, আবারও ডিসপ্লে বোর্ড, আবারও আমার চশমা! হায়, এখন তো আর মুকিত বিল্লাহ নেই।
এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আর সমস্যা হয়নি। যে সহৃদয় মানুষরা আমাকে নিতে এসেছিলেন আমি এঁদের পিছু পিছু- এঁরা ডানে গেলে আমি ডানে, বাঁয়ে গেলে বাঁয়ে...।
![]() |
| দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে |
আমি কথা ঘুরাই, 'আচ্ছা, দাউদ ভাই, যে কবিতা লেখার কারণে আপনাকে দেশ থেকে বের করে দেয়া দিয়েছিল ওই কবিতাটা এখন পাওয়া যাবে কোথায়'?
দাউদ ভাই এর হদিশ দিতে পারেন না। আমি খানিকটা অবাক হই। জানতে চাই, 'আপনার কবিতাটার নাম যেন কি ছিল'?
দাউদ ভাই বলেন, 'কবিতাটার নাম হচ্ছে, কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নার কালো বন্যায়। অনেক বড়ো কবিতা। লিখেছিলাম রাত জেগে'।
আমি বিড়বিড় করি, কালো সূর্যের, কালো জ্যোৎস্নার...।
আমি বিড়বিড় করি, কালো সূর্যের, কালো জ্যোৎস্নার...।
সহায়ক লিংক:
২. দুম করে মরে যাওয়া...: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_21.html
৩. অপকিচ্ছা: http://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_02.html
৪. দাউদ হায়দার, ১: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_21.html
৫. দাউদ হায়দার, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_7633.html
৪. দাউদ হায়দার, ১: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_21.html
৫. দাউদ হায়দার, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_7633.html
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Tuesday, October 12, 2010
'রোবো-পশু'
তুরাগ নদীতে যে বাসটা ডুবে গেছে এটার চালক নাকি কেজিবির এজেন্ট ছিল। সুইসাইডাল স্কোয়াডের একজন ঝানু লোক- এই স্কোয়াডের লোকজনরা নিজের প্রাণের তোয়াক্কা করেন না, নির্দেশ পাওয়ামাত্র নিজের প্রাণ বিলিয়ে দেন। কেবল মিশন সফল হওয়া চাই।
এটা অবশ্য আমার জানা হতো না, মাসুক নানাকে (এ মাসুদ রানারও বাপ!) একটা ওয়েব সাইট বানিয়ে দেয়ার বিনিময়ে তথ্যটা পেয়েছি।
জানি-জানি, অনেকে নিশ্চিত হয়ে বসে আছেন রাত জেগে ব্লগিং করে করে আমার মাথাটা গেছে- কুৎসিত রসিকতা করছি! কী আশ্চর্য, মাথা থাকলে না মাথা যাবে! মাথা তো কেবল আছে আমাদের দেশের চালক মহোদয়গণের, যারা দেশটার চাকা বনবন করে ঘোরাচ্ছেন। আমাদের ফাঁকা মাথা এঁরা কথার ফুলঝুরি দিয়ে ভরে দেন। তখন আমাদের নর্দন-কুর্দন দেখে কে ! নেতা বলেছেন নাচো, তো নাচো- নেতা বলেছেন উদোম হও, তো উদোম হও- নেতা বলেছেন, প্রাণ নর্দমায় ফেলে দাও, ব্যস, ফেলে দাও।
সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ রেলক্রসিংয়ে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল এটার জন্য দায়ী কে সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। আমাদের নেতারা কি বলছেন সেটা আগে শুনি:
খালেদা জিয়া বলছেন, "দুর্ঘটনা নয়, একটা এজেন্সি হামলা চালিয়েছে। ...সিরাজগঞ্জের সমাবেশ বাতিল করতে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে রেল দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। ...সরকারের একটি এজেন্সি আগন্তুকদের উপর হামলা চালিয়েছে। এটা কোন দুর্ঘটনা হতে পারে না। এটা সরকারের পরিকল্পিত সন্ত্রাস..."। [১]
...
খালেদার উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, "...আমাদের বলা হয়েছে, দুপুর দুইটার পর থেকে সাতটা পর্যন্ত কোনো ট্রেন এই লাইনে চলবে না"। একই বক্তব্য ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিনেরও (প্রথম আলো, ১২.১০.২০১০)
যেমন নেতা তেমনি তাঁর কর্মী! এদের নাকি বলা হয়েছিল, দুপুর দুইটার পর থেকে সাতটা পর্যন্ত কোনো ট্রেন এই লাইনে চলবে না। এদের মাথার ভেতর সাবানের ফেনাও সম্ভবত নাই কারণ সমাবেশ করার জন্য এই দেশে এমন আদেশ জারি করার ক্ষমতা কারও আছে বলে আমার জানা নাই! সমাবেশ হবে, তাও রেললাইনের উপর, রেলগাড়ি বন্ধ করে দিয়ে! যাত্রীরা তখন কি হেলিকপ্টারে করে চলাচল করবে?
আসলে কালে কালে এই সব আমাদেরকে শেখানো হয়েছে, কথায় কথায় রাজপথে মিটিং-মিছিল করে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া। প্রধানমন্ত্রী বৈদেশ গমন করবেন, বৈদেশ থেকে তশরীফ আনবেন; তো, দলে দলে গিয়ে এয়ারপোর্টে হাজির হয়ে যাও। যারা যাবে না তাদেরকে হল থেকে বের করে দাও। তখন রাজপথ হয়ে যায় পিঁপড়াপথ, দ্রুতগামী গাড়িগুলোকে পিঁপড়াও অনায়াসে পিছু ফেলে যায়!
কোন-না কোন উপায়ে রাস্তা বন্ধ করে দিতে আমরা খুবই পছন্দ করি। এমবুলেন্সে যে শিশুটি কেবল রাস্তা না-থাকার কারণে ছটফট করতে করতে মারা যায়। অনেকে বলবেন, এ অভাগা, আলোর মুখ দেখল না। আমি বলব, শিশুটি ভাগ্যবান, তাকে এই দেশে অধিক কাল শ্বাস নিতে হলো না। যে দেশ হাসপাতালে যাওয়ার জন্য একটা শিশুকে ন্যূনতম সুবিধাটুকু দিতে পারে না সেই দেশে শিশুটির বাঁচার প্রয়োজন কী!
খালেদা জিয়ার বক্তব্য হিন্দি ছবিকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। নামটা ভুলে গেছি, চমৎকার একটা মুভি দেখেছিলাম, এক কথায় মুগ্ধ হওয়ার মত কিন্তু শাহরুখ খান যখন রিকশা নিয়ে ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়িকে ধাওয়া করে নাকানি-চুবানি খাইয়ে দিলেন তখন আমি মনে মনে বলেছিলাম, আরে, এ তো হিন্দি মুভি, ছাপ যাবে কোথায়!
খালেদা জিয়া এজেন্সির নাম বলেননি কিন্তু আমার জানার সুতীব্র ইচ্ছা। অন্যত্র এটাও পড়েছি, খালেদা জিয়া এটাকে হো মো এরশাদের সময়কার মিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দেয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ এরশাদ ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে সমাবেশ পন্ড করেছেন আর এই সরকার রেলগাড়ি উঠিয়ে দিয়ে।
ওয়াল্লা, আমি এতোদিন জেনে এসেছি, রেলগাড়ি চলে রেল লাইনের উপর দিয়ে এখন দেখছি এটা ট্রাকের মত ডানে-বাঁয়ে, যখন যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে! বাংলাদেশ কবে এমন রেলগাড়ি আবিষ্কার করল? এই পদ্ধতিটা পৃথিবীময় রফতানি করে বিস্তর টাকা কামানো সম্ভব।
কোন হিন্দি ছবির পরিচালকও এই আইডিয়া নিয়ে ছবি করার সাহস দেখাবেন কি না এই নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। অবশ্য খালেদা জিয়া নিজের খরচে মুভি বানালে কেউ আপত্তি করবে বলে মনে হয় না। খালেদা জিয়ার এটা বলার পেছনে হয়তো এর প্রভাবও থাকতে পারে, তিনি হিন্দি সিরিয়াল আগ্রহ নিয়ে দেখতেন, এখনও দেখেন কি না এটা অবশ্য জানা নাই।
"...স্টার প্লাস ও সনি টিভির বেশ কয়েকটি সিরিয়াল তিনি নিয়মিত দেখে আসছিলেন। তার প্রিয় সিরিয়ালগুলোর মধ্যে, 'কাভি সাস ভি বাহু থি' এবং 'কাসৌটি জিন্দিগি কি' ইত্যাদি। পূর্বেও তিনি নিয়মিত হিন্দি সিরিয়াল দেখতেন..."। (সাপ্তাহিক ২০০০, বর্ষ ১০/ ০৩.০৮.০৭)
এটা তো গেল নেতাদের কাহিনী, আমাদের কাহিনী কি?
আমরা এই কাজটা খুব ভালো পারি, আগুন ধরিয়ে দিতে, ভাংচুর করতে। রোগী মারা গেছে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ভেঙ্গে ফেল। পরীক্ষা পেছাতে হবে চুরমার করে ফেলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোন ঝামেলা হয়েছে তো গুড়িয়ে দাও একের পর এক গাড়ি!
এই দুর্ঘটনায় যে প্রাণ নষ্ট হয়েছে এতে আমাদের হাত ছিল না কিন্তু যে সম্পদ বিনষ্ট হলো এটা অবশ্যই আমাদের এখতিয়ারে পড়ে।
আমরা বড়ো বিচিত্র জাতি, আমরা এটা একবারএ ভেবে দেখি না যে সম্পদ বিনষ্ট করছি এটা আমাদের ঘামে-রক্তে সিক্ত কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় অর্জন করা। এই ট্রেনের যে বগিগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে এই বগিগুলো আবার চলাচলের উপযোগী না হলে আমাদের বগি আরও কমে গেল। এমনিতেই আমাদের দেশে ইঞ্জিন-বগির প্রচুর স্বল্পতা। কেন? এই কুতর্কে এখন আর যাই না- আমরা বগি বাড়াবার চেয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এয়ারপোর্ট করাটা জরুরি মনে করি। কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ হাওয়াই জাহোজে চাপতে পছন্দ করেন।
ইন্টারসিটি ট্রেনে যত যাত্রী বসার সুযোগ পান প্রায় তত যাত্রী টিকেট কেটে দাঁড়িয়ে থাকেন অথচ প্রত্যেকটা ট্রেনের সঙ্গে ৪/৫টা বগি জুড়ে দিলে এই প্রকট সমস্যা অনেকখানি লাঘব হয় কিন্তু ওই যে বললাম, বগির স্বল্পতা।
ক-দিন আগে আমি যে ট্রেনে জেলা শহর থেকে ফিরছি এটার নাম হচ্ছে 'নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস'। এটা জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকে চট্টগ্রামে আসা-যাওয়া করে। আমার যাত্রা অতি অল্প সময়ের জন্য, মিনিট বিশেকের- ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া থেকে আখাউড়া ফিরব। এই ট্রেনটা জগন্নাথগঞ্জ থেকে ছাড়ে রাত ২টায়, চট্টগ্রামে পৌঁছে পরের দিন রাত ১১/১২টার আগে না।
সব মিলিয়ে এটার বগির সংখ্যা চার। পা ফেলার জায়গা নেই। কেমন করে উঠব এটা নিয়ে ভাবছিলাম। ভাবাভাবির আর সুযোগ পাওয়া গেল না, পেছন থেকে ধাক্কা খেতে খেতে আবিষ্কার করলাম আমি ট্রেনের ভেতরে! বসা দূরের কথা, দাঁড়াবার জায়গাই নেই। খোদার কসম, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল শ্বাস ফেলতে পারছি না! এক ফোঁটা বাতাস নেই!
এরিমধ্যে দেখি এক মহিলা শিশু কোলে নিয়ে, তার পাশের আত্মীয় একজনকে ঝাঁঝালো গলায় বলছেন, 'ছাওয়াল (বাচ্চা) বড়ো না হইলে আর বাইত (বাড়ি) যাইতাম না'।
আলাপ করে জানা গেল এই মানুষটা জগন্নাথগঞ্জ থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসছেন, যাবেন চট্টগ্রাম। বিশ মিনিটের যাত্রায় আমি আমার নিজের কষ্টের কথা ভেবে লজ্জিত হলাম। এই মানুষটা শিশুকে কোলে নিয়ে প্রায় এক দিন ট্রেনে থাকবেন! ভাবা যায়! এই শিশুটি চট্টগ্রাম পৌঁছা পর্যন্ত বেঁচে থাকে তাহলে আমি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছি, এই শিশু এই গ্রহের যে-কোন জায়গায় সারভাইভ করতে পারবে। এমন কি একে অক্সিজেন ব্যতীত চাঁদে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেলেও অন্তত আমি অবাক হবো না। এটা সম্ভবত আমাদের দেশেই সম্ভব- এমন অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর কোন জাতির আছে? এই মানুষটা যাত্রাকালীন কষ্টের কথা ভেবে বাচ্চা বড়ো না-হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে যাবেন না বলে পণ করেছেন।
একটা দেশ তার সন্তানকে বাড়িতে যাওয়ার ন্যূনতম সুবিধাটুকুও দিতে পারছে না। মানুষটা ক্রমশ সরে যাবে শেকড় থেকে দূরে। একজন মানুষ যখন শেকড়ের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকেন তখন এর ফল সহজেই অনুমেয়। শেকড় থেকে দূরের মানুষরা ক্রমশ পরিণত হন রোবটে। আসলে মানুষ তো রোবট হতে পারে না, মানুষ পরিণত হয় রোবো-পশুতে। এই দেশে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য 'রোবো-পশু'। আমাদের দেশের সিস্টেমই এমন, কত বিচিত্র উপায়ে মানুষ থেকে অতি দ্রুত অসংখ্য 'রোবো-পশু' সৃষ্টি করা যায়। এই জন্য আমাদের নেতারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছেন!
...
আপডেট: ১৩ অক্টোবর, ২০১০
আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, খালেদা জিয়ার এমন উদ্ভট মন্তব্যের পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিক্রিয়ায় কি বলেন, এটার জন্যে।
লেজার-গান দিয়ে যখন কেউ চড়ুই পাখি শিকার করেন তখন দীর্ঘ শ্বাস ফেলা ব্যতীত আর কী-ই বা করার থাকে! এমন মন্তব্য করে অজান্তেই খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার হাতে লেজার-গান তুলে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা এর ব্যবহার করলেন এমন করে? তিনি বলেছেন, "যমুনা রিসোর্টে তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন লাশের জন্য?...সিরাজগঞ্জের ট্রেন দুর্ঘটনার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে দায়ী করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ওনার এখন ইস্যু দরকার। আর সে ইস্যুর জন্যই তিনি এখন খুনখারাবিতে লেগে গেছেন এবং রক্ত ঝরাতে শুরু করেছেন।...। (প্রথম আলো, ১৩ অক্টোবর, ২০১০) [২]
অথচ প্রধানমন্ত্রী সুচিন্তিত মন্তব্য করে খালেদা জিয়াকে শুইয়ে ফেলতে পারতেন। তিনি এজেন্সিটার নাম জানতে চাইতে পারতেন। বলতে পারতেন, এই পৃথিবীর যে-কোন প্রান্ত থেকে সুস্থ একজন মানুষকে এনে জিজ্ঞেস করুন, বাস্তবে এটা সম্ভব কি না? কিন্তু তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ পদ্ধতিই বেছে নিলেন। কপাল, এই-ই আমাদের নিয়তি!
একজন পাঠকের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি যেটা বলেছিলাম, সেটা আবারও বলি, নিজের পায়ের চটি খুলে নিজের কপালে মেরে বলতে ইচ্ছা হয়, হে প্রভু, আমাদের কী অপরাধ! এই দেশের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য কি আর কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না? কেয়ামতের আগ পর্যন্ত কি এরাই আমাদের নেতা থাকবেন?
সহায়ক লিংক:
১. প্রথম আলো: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-10-11/news/100598
২. প্রথম আলো: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-10-13/news/101012
এটা অবশ্য আমার জানা হতো না, মাসুক নানাকে (এ মাসুদ রানারও বাপ!) একটা ওয়েব সাইট বানিয়ে দেয়ার বিনিময়ে তথ্যটা পেয়েছি।
জানি-জানি, অনেকে নিশ্চিত হয়ে বসে আছেন রাত জেগে ব্লগিং করে করে আমার মাথাটা গেছে- কুৎসিত রসিকতা করছি! কী আশ্চর্য, মাথা থাকলে না মাথা যাবে! মাথা তো কেবল আছে আমাদের দেশের চালক মহোদয়গণের, যারা দেশটার চাকা বনবন করে ঘোরাচ্ছেন। আমাদের ফাঁকা মাথা এঁরা কথার ফুলঝুরি দিয়ে ভরে দেন। তখন আমাদের নর্দন-কুর্দন দেখে কে ! নেতা বলেছেন নাচো, তো নাচো- নেতা বলেছেন উদোম হও, তো উদোম হও- নেতা বলেছেন, প্রাণ নর্দমায় ফেলে দাও, ব্যস, ফেলে দাও।
সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ রেলক্রসিংয়ে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল এটার জন্য দায়ী কে সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। আমাদের নেতারা কি বলছেন সেটা আগে শুনি:
খালেদা জিয়া বলছেন, "দুর্ঘটনা নয়, একটা এজেন্সি হামলা চালিয়েছে। ...সিরাজগঞ্জের সমাবেশ বাতিল করতে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে রেল দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। ...সরকারের একটি এজেন্সি আগন্তুকদের উপর হামলা চালিয়েছে। এটা কোন দুর্ঘটনা হতে পারে না। এটা সরকারের পরিকল্পিত সন্ত্রাস..."। [১]
...
খালেদার উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, "...আমাদের বলা হয়েছে, দুপুর দুইটার পর থেকে সাতটা পর্যন্ত কোনো ট্রেন এই লাইনে চলবে না"। একই বক্তব্য ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিনেরও (প্রথম আলো, ১২.১০.২০১০)
যেমন নেতা তেমনি তাঁর কর্মী! এদের নাকি বলা হয়েছিল, দুপুর দুইটার পর থেকে সাতটা পর্যন্ত কোনো ট্রেন এই লাইনে চলবে না। এদের মাথার ভেতর সাবানের ফেনাও সম্ভবত নাই কারণ সমাবেশ করার জন্য এই দেশে এমন আদেশ জারি করার ক্ষমতা কারও আছে বলে আমার জানা নাই! সমাবেশ হবে, তাও রেললাইনের উপর, রেলগাড়ি বন্ধ করে দিয়ে! যাত্রীরা তখন কি হেলিকপ্টারে করে চলাচল করবে?
আসলে কালে কালে এই সব আমাদেরকে শেখানো হয়েছে, কথায় কথায় রাজপথে মিটিং-মিছিল করে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া। প্রধানমন্ত্রী বৈদেশ গমন করবেন, বৈদেশ থেকে তশরীফ আনবেন; তো, দলে দলে গিয়ে এয়ারপোর্টে হাজির হয়ে যাও। যারা যাবে না তাদেরকে হল থেকে বের করে দাও। তখন রাজপথ হয়ে যায় পিঁপড়াপথ, দ্রুতগামী গাড়িগুলোকে পিঁপড়াও অনায়াসে পিছু ফেলে যায়!
কোন-না কোন উপায়ে রাস্তা বন্ধ করে দিতে আমরা খুবই পছন্দ করি। এমবুলেন্সে যে শিশুটি কেবল রাস্তা না-থাকার কারণে ছটফট করতে করতে মারা যায়। অনেকে বলবেন, এ অভাগা, আলোর মুখ দেখল না। আমি বলব, শিশুটি ভাগ্যবান, তাকে এই দেশে অধিক কাল শ্বাস নিতে হলো না। যে দেশ হাসপাতালে যাওয়ার জন্য একটা শিশুকে ন্যূনতম সুবিধাটুকু দিতে পারে না সেই দেশে শিশুটির বাঁচার প্রয়োজন কী!
খালেদা জিয়ার বক্তব্য হিন্দি ছবিকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। নামটা ভুলে গেছি, চমৎকার একটা মুভি দেখেছিলাম, এক কথায় মুগ্ধ হওয়ার মত কিন্তু শাহরুখ খান যখন রিকশা নিয়ে ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়িকে ধাওয়া করে নাকানি-চুবানি খাইয়ে দিলেন তখন আমি মনে মনে বলেছিলাম, আরে, এ তো হিন্দি মুভি, ছাপ যাবে কোথায়!
খালেদা জিয়া এজেন্সির নাম বলেননি কিন্তু আমার জানার সুতীব্র ইচ্ছা। অন্যত্র এটাও পড়েছি, খালেদা জিয়া এটাকে হো মো এরশাদের সময়কার মিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দেয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ এরশাদ ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে সমাবেশ পন্ড করেছেন আর এই সরকার রেলগাড়ি উঠিয়ে দিয়ে।
ওয়াল্লা, আমি এতোদিন জেনে এসেছি, রেলগাড়ি চলে রেল লাইনের উপর দিয়ে এখন দেখছি এটা ট্রাকের মত ডানে-বাঁয়ে, যখন যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে! বাংলাদেশ কবে এমন রেলগাড়ি আবিষ্কার করল? এই পদ্ধতিটা পৃথিবীময় রফতানি করে বিস্তর টাকা কামানো সম্ভব।
কোন হিন্দি ছবির পরিচালকও এই আইডিয়া নিয়ে ছবি করার সাহস দেখাবেন কি না এই নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। অবশ্য খালেদা জিয়া নিজের খরচে মুভি বানালে কেউ আপত্তি করবে বলে মনে হয় না। খালেদা জিয়ার এটা বলার পেছনে হয়তো এর প্রভাবও থাকতে পারে, তিনি হিন্দি সিরিয়াল আগ্রহ নিয়ে দেখতেন, এখনও দেখেন কি না এটা অবশ্য জানা নাই।
"...স্টার প্লাস ও সনি টিভির বেশ কয়েকটি সিরিয়াল তিনি নিয়মিত দেখে আসছিলেন। তার প্রিয় সিরিয়ালগুলোর মধ্যে, 'কাভি সাস ভি বাহু থি' এবং 'কাসৌটি জিন্দিগি কি' ইত্যাদি। পূর্বেও তিনি নিয়মিত হিন্দি সিরিয়াল দেখতেন..."। (সাপ্তাহিক ২০০০, বর্ষ ১০/ ০৩.০৮.০৭)
![]() |
| ছবি ঋণ: সাইফুল ইসলাম, প্রথম আলো |
আমরা এই কাজটা খুব ভালো পারি, আগুন ধরিয়ে দিতে, ভাংচুর করতে। রোগী মারা গেছে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ভেঙ্গে ফেল। পরীক্ষা পেছাতে হবে চুরমার করে ফেলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোন ঝামেলা হয়েছে তো গুড়িয়ে দাও একের পর এক গাড়ি!
এই দুর্ঘটনায় যে প্রাণ নষ্ট হয়েছে এতে আমাদের হাত ছিল না কিন্তু যে সম্পদ বিনষ্ট হলো এটা অবশ্যই আমাদের এখতিয়ারে পড়ে।
আমরা বড়ো বিচিত্র জাতি, আমরা এটা একবারএ ভেবে দেখি না যে সম্পদ বিনষ্ট করছি এটা আমাদের ঘামে-রক্তে সিক্ত কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় অর্জন করা। এই ট্রেনের যে বগিগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে এই বগিগুলো আবার চলাচলের উপযোগী না হলে আমাদের বগি আরও কমে গেল। এমনিতেই আমাদের দেশে ইঞ্জিন-বগির প্রচুর স্বল্পতা। কেন? এই কুতর্কে এখন আর যাই না- আমরা বগি বাড়াবার চেয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এয়ারপোর্ট করাটা জরুরি মনে করি। কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ হাওয়াই জাহোজে চাপতে পছন্দ করেন।
ইন্টারসিটি ট্রেনে যত যাত্রী বসার সুযোগ পান প্রায় তত যাত্রী টিকেট কেটে দাঁড়িয়ে থাকেন অথচ প্রত্যেকটা ট্রেনের সঙ্গে ৪/৫টা বগি জুড়ে দিলে এই প্রকট সমস্যা অনেকখানি লাঘব হয় কিন্তু ওই যে বললাম, বগির স্বল্পতা।
ক-দিন আগে আমি যে ট্রেনে জেলা শহর থেকে ফিরছি এটার নাম হচ্ছে 'নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস'। এটা জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকে চট্টগ্রামে আসা-যাওয়া করে। আমার যাত্রা অতি অল্প সময়ের জন্য, মিনিট বিশেকের- ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া থেকে আখাউড়া ফিরব। এই ট্রেনটা জগন্নাথগঞ্জ থেকে ছাড়ে রাত ২টায়, চট্টগ্রামে পৌঁছে পরের দিন রাত ১১/১২টার আগে না।
সব মিলিয়ে এটার বগির সংখ্যা চার। পা ফেলার জায়গা নেই। কেমন করে উঠব এটা নিয়ে ভাবছিলাম। ভাবাভাবির আর সুযোগ পাওয়া গেল না, পেছন থেকে ধাক্কা খেতে খেতে আবিষ্কার করলাম আমি ট্রেনের ভেতরে! বসা দূরের কথা, দাঁড়াবার জায়গাই নেই। খোদার কসম, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল শ্বাস ফেলতে পারছি না! এক ফোঁটা বাতাস নেই!
এরিমধ্যে দেখি এক মহিলা শিশু কোলে নিয়ে, তার পাশের আত্মীয় একজনকে ঝাঁঝালো গলায় বলছেন, 'ছাওয়াল (বাচ্চা) বড়ো না হইলে আর বাইত (বাড়ি) যাইতাম না'।
আলাপ করে জানা গেল এই মানুষটা জগন্নাথগঞ্জ থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসছেন, যাবেন চট্টগ্রাম। বিশ মিনিটের যাত্রায় আমি আমার নিজের কষ্টের কথা ভেবে লজ্জিত হলাম। এই মানুষটা শিশুকে কোলে নিয়ে প্রায় এক দিন ট্রেনে থাকবেন! ভাবা যায়! এই শিশুটি চট্টগ্রাম পৌঁছা পর্যন্ত বেঁচে থাকে তাহলে আমি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছি, এই শিশু এই গ্রহের যে-কোন জায়গায় সারভাইভ করতে পারবে। এমন কি একে অক্সিজেন ব্যতীত চাঁদে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেলেও অন্তত আমি অবাক হবো না। এটা সম্ভবত আমাদের দেশেই সম্ভব- এমন অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর কোন জাতির আছে? এই মানুষটা যাত্রাকালীন কষ্টের কথা ভেবে বাচ্চা বড়ো না-হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে যাবেন না বলে পণ করেছেন।
একটা দেশ তার সন্তানকে বাড়িতে যাওয়ার ন্যূনতম সুবিধাটুকুও দিতে পারছে না। মানুষটা ক্রমশ সরে যাবে শেকড় থেকে দূরে। একজন মানুষ যখন শেকড়ের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকেন তখন এর ফল সহজেই অনুমেয়। শেকড় থেকে দূরের মানুষরা ক্রমশ পরিণত হন রোবটে। আসলে মানুষ তো রোবট হতে পারে না, মানুষ পরিণত হয় রোবো-পশুতে। এই দেশে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য 'রোবো-পশু'। আমাদের দেশের সিস্টেমই এমন, কত বিচিত্র উপায়ে মানুষ থেকে অতি দ্রুত অসংখ্য 'রোবো-পশু' সৃষ্টি করা যায়। এই জন্য আমাদের নেতারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছেন!
...
আপডেট: ১৩ অক্টোবর, ২০১০
আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, খালেদা জিয়ার এমন উদ্ভট মন্তব্যের পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিক্রিয়ায় কি বলেন, এটার জন্যে।
লেজার-গান দিয়ে যখন কেউ চড়ুই পাখি শিকার করেন তখন দীর্ঘ শ্বাস ফেলা ব্যতীত আর কী-ই বা করার থাকে! এমন মন্তব্য করে অজান্তেই খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার হাতে লেজার-গান তুলে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা এর ব্যবহার করলেন এমন করে? তিনি বলেছেন, "যমুনা রিসোর্টে তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন লাশের জন্য?...সিরাজগঞ্জের ট্রেন দুর্ঘটনার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে দায়ী করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ওনার এখন ইস্যু দরকার। আর সে ইস্যুর জন্যই তিনি এখন খুনখারাবিতে লেগে গেছেন এবং রক্ত ঝরাতে শুরু করেছেন।...। (প্রথম আলো, ১৩ অক্টোবর, ২০১০) [২]
অথচ প্রধানমন্ত্রী সুচিন্তিত মন্তব্য করে খালেদা জিয়াকে শুইয়ে ফেলতে পারতেন। তিনি এজেন্সিটার নাম জানতে চাইতে পারতেন। বলতে পারতেন, এই পৃথিবীর যে-কোন প্রান্ত থেকে সুস্থ একজন মানুষকে এনে জিজ্ঞেস করুন, বাস্তবে এটা সম্ভব কি না? কিন্তু তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ পদ্ধতিই বেছে নিলেন। কপাল, এই-ই আমাদের নিয়তি!
একজন পাঠকের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি যেটা বলেছিলাম, সেটা আবারও বলি, নিজের পায়ের চটি খুলে নিজের কপালে মেরে বলতে ইচ্ছা হয়, হে প্রভু, আমাদের কী অপরাধ! এই দেশের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য কি আর কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না? কেয়ামতের আগ পর্যন্ত কি এরাই আমাদের নেতা থাকবেন?
সহায়ক লিংক:
১. প্রথম আলো: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-10-11/news/100598
২. প্রথম আলো: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-10-13/news/101012
বিভাগ
ক্ষমতার অপব্যবহার
Monday, October 11, 2010
বেচারা এতিমদের উপায় কী!
খুন-খারাবি করাটা এখন মনে হয় খুব বড়ো ধরনের কোন অন্যায় না যদি না কেউ অভিযোগ করেন! অভিযোগ করলে কিন্তু খবর হয়ে যাবে, ফাঁসিতে লটকে মরে আর বাঁচার উপায় থাকবে না; তখন হু হু করে কেঁদেও লাভ হবে না।
কেবল লক্ষ রাখতে হবে অভিযোগ করার জন্য যেন কেউ না থাকে। কি বললেন? পরিবার-পরিজন সবাইকে খুন করে ফেলা। আরে নাহ, এটা কোন ভাল পরামর্শ হলো না। একজনের পরিবারের লোকজন দেশময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন এখন ওই পরিবার সব সদস্যকে খুন করার অভিপ্রায়ে একজন রক্তমাখা নাংগা তরবারি হাতে নিয়ে, পায়ে চাকা লাগিয়ে দেশময় ঘুরে বেড়াচ্ছে, দেখতে ভাল দেখায় না, বুঝলেন!
তারচেয়ে ভাল হয়, এতিম কাউকে পেলে। ব্যাটা অক্কা পেলে বাদী হবে কে, কেই-বা অভিযোগ করবে? আর অভিযোগ না পেলে পুলিশের কী দায় পড়েছে নড়াচড়া করার! আইন ভাঙ্গবে বুঝি?
...
এই ছবিটা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নাই।
এ নিয়ে আগেও আমি লিখেছিলাম, এই সব ফটো-সাংবাদিকদেরকে পুলিশে চাকরি দেয়া হোক এবং পুলিশকে কবিতা লিখতে [১] লাগিয়ে দেয়া যেতে পারে।
ক-দিন পূর্বে নাটোরে প্রকাশ্যে রাস্তায় পিটিয়ে একজন উপজেলা চেয়ারম্যানকে মেরে ফেলা হলো, পুলিশ নাকি হত্যাকারীকে খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ পত্রিকার ছবি, ভিডিও ফুটেজ সবই ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, সব কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, অভিযোগ করতে হয় তবেই না পুলিশ গিয়ে ধরবে। এই বিষয়ে ওসি মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, "...বাদী মামলা করতে দেরি করায় আসামিরা গা ঢাকা দিয়েছেন...।" (১১ অক্টোবর, ২০১০)
হত্যার অভিযোগে অভিযুক্তরা বুদ্ধিতে অতিশয় পাকা নইলে ঠিক এরা থানায় এসে বলত, 'মুঝে পাকড়ো-মুঝে পাকড়ো। পুলিশও হুড়মুড় করে উঠে বলত, নড়েছো কি মরেছো, কপালে একবারে আলু ফুটিয়ে দোব'।
কাজের কথায় আসি, আমার মতে, বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করা উচিৎ অভিযোগ করতে কেন তিনি দেরি করলেন? কেন তাঁর কারণে অভিযুক্তরা গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ পেল? কেন বাদীর কারণে পুলিশ বেচারারা আসামি ধরতে পারলেন না। কেন বাদী লোকজনকে এই নিয়ে হরতাল করে গোটা নাটোর অচল করে দেয়ার সুযোগ দিলেন? এবং বাদীর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা উচিৎ ক্ষতিপূরণের। নাটোর অচল হওয়ার কারণে যত টাকা ক্ষতি হয়েছে তার পাই পাই হিসাব বাদীকে দেতে হবে।
অবশ্য দুষ্টরা বলে থাকেন, যার যার জামা তার তার কাছে- দলবাজি না করলে আমাদের চলেই না [২]। কে খায় বাকী, কার জামা খাকি এই সব কোন বিষয় না। দলবাজিই আসল, উপরের নির্দেশই মুখ্য!
'সারদায় কি এই সব শেখায়?' [৩] এই লেখায় আমি লিখেছিলাম, "সমাজপতিরা বিচারের নামে বাবাকে দিয়ে ছেলের চোখ উঠাতে বাধ্য করে। ঈশ্বর, কোন সভ্য দেশে এমনটা সম্ভব? এ ব্যাপারে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন প্রথম আলোর কাছে বলেন, 'ঘটনাটা শুনেছি। আমার কাছে ছেলের বাবা এসেছিলেন। আমি তাঁকে বলেছি আগে চিকিৎসা করান। তারপর অভিযোগ দিয়েন'।
ভাল-ভাল! এই অফিসারের মনে দেখি অ-নে-ক মায়া! চোখের চিকিৎসা যখন শেষ হবে তখন পর্যন্ত দোষীরা বসে বসে ছা ফুটাবে।"
'তালেবানদের কী দোষ?' [৪] লেখায় লেখাটা হয়েছিল, দাউদকান্দিতে এক মেয়েকে দোররা মারা হয়েছে এটা নিয়ে। "দাউদকান্দি থানার ওসি সাহেব বলেছেন (ইনাদের নাকি এখন প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া হবে), 'বিষয়টি পুলিশের জানা ছিল না। কেউ অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে'। (আব্দুর রহমার ঢালী, প্রথম আলো, ২৪.০৫.০৯)
তো, সব জায়গায় একটা কথাই ঘুরেফিরে আসছে, অপরাধ করাটা সমস্যা না, সমস্যা হচ্ছে অভিযোগ করা নিয়ে। অভিযোগ না করলে কোন সমস্যা নাই। এমন কি খুন করে ফিরে এসে ব্লগিংও করা যাবে, রসিয়ে রসিয়ে খুনের বর্ণনা...।
সহায়ক লিংক:
১. পুলিশ লিখবে কবিতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_09.html
২. হরেক রকম জামা আছে: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_09.html
৩. সারদায় কি শেখায়: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_24.html
৪. তালেবানদের কি দোষ?: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_24.html
কেবল লক্ষ রাখতে হবে অভিযোগ করার জন্য যেন কেউ না থাকে। কি বললেন? পরিবার-পরিজন সবাইকে খুন করে ফেলা। আরে নাহ, এটা কোন ভাল পরামর্শ হলো না। একজনের পরিবারের লোকজন দেশময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন এখন ওই পরিবার সব সদস্যকে খুন করার অভিপ্রায়ে একজন রক্তমাখা নাংগা তরবারি হাতে নিয়ে, পায়ে চাকা লাগিয়ে দেশময় ঘুরে বেড়াচ্ছে, দেখতে ভাল দেখায় না, বুঝলেন!
তারচেয়ে ভাল হয়, এতিম কাউকে পেলে। ব্যাটা অক্কা পেলে বাদী হবে কে, কেই-বা অভিযোগ করবে? আর অভিযোগ না পেলে পুলিশের কী দায় পড়েছে নড়াচড়া করার! আইন ভাঙ্গবে বুঝি?
...
![]() |
| ছবি ঋণ: কালের কন্ঠ |
এ নিয়ে আগেও আমি লিখেছিলাম, এই সব ফটো-সাংবাদিকদেরকে পুলিশে চাকরি দেয়া হোক এবং পুলিশকে কবিতা লিখতে [১] লাগিয়ে দেয়া যেতে পারে।
![]() |
| ছবি ঋণ: প্রথম আলো |
হত্যার অভিযোগে অভিযুক্তরা বুদ্ধিতে অতিশয় পাকা নইলে ঠিক এরা থানায় এসে বলত, 'মুঝে পাকড়ো-মুঝে পাকড়ো। পুলিশও হুড়মুড় করে উঠে বলত, নড়েছো কি মরেছো, কপালে একবারে আলু ফুটিয়ে দোব'।
কাজের কথায় আসি, আমার মতে, বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করা উচিৎ অভিযোগ করতে কেন তিনি দেরি করলেন? কেন তাঁর কারণে অভিযুক্তরা গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ পেল? কেন বাদীর কারণে পুলিশ বেচারারা আসামি ধরতে পারলেন না। কেন বাদী লোকজনকে এই নিয়ে হরতাল করে গোটা নাটোর অচল করে দেয়ার সুযোগ দিলেন? এবং বাদীর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা উচিৎ ক্ষতিপূরণের। নাটোর অচল হওয়ার কারণে যত টাকা ক্ষতি হয়েছে তার পাই পাই হিসাব বাদীকে দেতে হবে।
অবশ্য দুষ্টরা বলে থাকেন, যার যার জামা তার তার কাছে- দলবাজি না করলে আমাদের চলেই না [২]। কে খায় বাকী, কার জামা খাকি এই সব কোন বিষয় না। দলবাজিই আসল, উপরের নির্দেশই মুখ্য!
'সারদায় কি এই সব শেখায়?' [৩] এই লেখায় আমি লিখেছিলাম, "সমাজপতিরা বিচারের নামে বাবাকে দিয়ে ছেলের চোখ উঠাতে বাধ্য করে। ঈশ্বর, কোন সভ্য দেশে এমনটা সম্ভব? এ ব্যাপারে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন প্রথম আলোর কাছে বলেন, 'ঘটনাটা শুনেছি। আমার কাছে ছেলের বাবা এসেছিলেন। আমি তাঁকে বলেছি আগে চিকিৎসা করান। তারপর অভিযোগ দিয়েন'।
ভাল-ভাল! এই অফিসারের মনে দেখি অ-নে-ক মায়া! চোখের চিকিৎসা যখন শেষ হবে তখন পর্যন্ত দোষীরা বসে বসে ছা ফুটাবে।"
'তালেবানদের কী দোষ?' [৪] লেখায় লেখাটা হয়েছিল, দাউদকান্দিতে এক মেয়েকে দোররা মারা হয়েছে এটা নিয়ে। "দাউদকান্দি থানার ওসি সাহেব বলেছেন (ইনাদের নাকি এখন প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া হবে), 'বিষয়টি পুলিশের জানা ছিল না। কেউ অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে'। (আব্দুর রহমার ঢালী, প্রথম আলো, ২৪.০৫.০৯)
তো, সব জায়গায় একটা কথাই ঘুরেফিরে আসছে, অপরাধ করাটা সমস্যা না, সমস্যা হচ্ছে অভিযোগ করা নিয়ে। অভিযোগ না করলে কোন সমস্যা নাই। এমন কি খুন করে ফিরে এসে ব্লগিংও করা যাবে, রসিয়ে রসিয়ে খুনের বর্ণনা...।
সহায়ক লিংক:
১. পুলিশ লিখবে কবিতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_09.html
২. হরেক রকম জামা আছে: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_09.html
৩. সারদায় কি শেখায়: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_24.html
৪. তালেবানদের কি দোষ?: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_24.html
Sunday, October 10, 2010
আমি ত্রিকালজ্ঞ না বলেই...
স্কুলগুলোয় [১] যাওয়ার আগামাথা নাই আমার। কখনও শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, কখনও স্কুল শেষ হয়-হয় এমন সময়ে। এর কিছু কারণ আছে। এক স্কুলের, সঙ্গত কারণেই স্কুলটার নাম বলতে চাচ্ছি না। তখনও স্কুলের নির্দিষ্ট ঘর হয়নি; স্কুল হয় উম্মুক্ত এক স্থানে, উঁচু চাতালের মত একটা জায়গায়।
স্কুল শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে অথচ গিয়ে দেখি ধু-ধু মাঠ, মাস্টার মশাইয়ের পাত্তা নেই। আমি চাতালে বসে ফোন করি। মাস্টার মশাই অতি আনন্দের সঙ্গে জানান, তিনি স্কুলে আছেন এবং বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন!
আমি মনে মনে বলি, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কম কিন্তু আমাকে ফাঁকি দিতে হলে আমার বুদ্ধিকে ছাড়িয়ে যেতে হবে যে। মুখে বলি, আমি স্কুলেই আছি।
মাস্টার মশাই হন্তদন্ত হয়ে আসার পর আমি কিচ্ছু বললাম না, অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু মাস্টার মশাই বুঝে গেলেন আমি মানুষটা বিশেষ সুবিধের না। এরপর থেকে আর সমস্যা হয়নি।
যাই হোক, আজ গেছি ইশকুল এক হরিজনপল্লীতে। এই সময়টা এদের খেলার। সবাই খেলায় ব্যস্ত। আমাকে দেখলেই এরা বিভিন্ন আবদার জুড়ে দেয়।
নিয়ম করে যেটা করতে হয় এদের ছবি তুলে দিতে হয়। কাঁহাতক ছবি তুলতে ভাল লাগে! এদের এই আবদার মেটাতে গিয়ে কখনও কখনও চালবাজি করি। ছবি না তুলেই বলি, হয়েছে, ছবি সোন্দর আসছে। এরা বুদ্ধির খেলায় আমাকে হারিয়ে দেয় যখন বলে, কই দেখান, দেখি কেমন আসছে?
আমি বিপদে পড়ি।
এই স্কুলের ছাত্রী প্রিয়া নামের ৭/৮ বছরের এক মেয়ে আজ অনুপস্থিত। টিচারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, প্রিয় ছুটি নিয়েছে, বাবা-মার সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাবে। এরিমধ্যে প্রিয়া এসে উপস্থিত। বেড়াতে যাবে বলে এ খানিকটা সাজগোজও করে এসেছে। আমিই প্রিয়াকে বলি, আসো, তোমার একটা ছবি উঠিয়ে দেই।
সেল-ফোনের ছোট্ট ডিসপ্লেতে তেমন বুঝিনি এখন ছবিটা বড়ো পর্দায় দেখে আমি আক্ষরিক অর্থেই হতভম্ব হয়ে আছি! কী অদ্ভুত, কী অদ্ভুত সুন্দর! কে বলবে এই শিশুটি হরিজন পল্লীতে জন্ম নিয়েছে! সৌন্দর্যের বিচারে আমার নিজের মেয়েও এর ধারেকাছে আসতে পারবে না।
আমি তর্কবাজ না কিন্তু তবুও তর্কেতর্কে তর্ক করতে ছাড়ব না, কে বলেছে এই মেয়েটি আগামীতে মিস ওয়ার্ল্ড হতে পারবে না? অন্তত এমন ভাবাটা দোষের...।
জানি-জানি, অনেকে অট্টহাস্যে গা দুলিয়ে হাসছেন। চোখের ভুল হতে পারে কিন্তু আমার মনিটরের পর্দা খানিকটা দুলে উঠতে দেখলাম সম্ভবত। ওহো, আপনারা ত্রিকালদর্শী বুঝি, এ হতে পারে না, 'কাভি নেহি'! ভবিষ্যৎ অনায়াসে টের পান নাকি? তাই বলুন...!
সহায়ক লিংক:
১. আমাদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_07.html
স্কুল শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে অথচ গিয়ে দেখি ধু-ধু মাঠ, মাস্টার মশাইয়ের পাত্তা নেই। আমি চাতালে বসে ফোন করি। মাস্টার মশাই অতি আনন্দের সঙ্গে জানান, তিনি স্কুলে আছেন এবং বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন!
আমি মনে মনে বলি, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কম কিন্তু আমাকে ফাঁকি দিতে হলে আমার বুদ্ধিকে ছাড়িয়ে যেতে হবে যে। মুখে বলি, আমি স্কুলেই আছি।
মাস্টার মশাই হন্তদন্ত হয়ে আসার পর আমি কিচ্ছু বললাম না, অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু মাস্টার মশাই বুঝে গেলেন আমি মানুষটা বিশেষ সুবিধের না। এরপর থেকে আর সমস্যা হয়নি।
যাই হোক, আজ গেছি ইশকুল এক হরিজনপল্লীতে। এই সময়টা এদের খেলার। সবাই খেলায় ব্যস্ত। আমাকে দেখলেই এরা বিভিন্ন আবদার জুড়ে দেয়।নিয়ম করে যেটা করতে হয় এদের ছবি তুলে দিতে হয়। কাঁহাতক ছবি তুলতে ভাল লাগে! এদের এই আবদার মেটাতে গিয়ে কখনও কখনও চালবাজি করি। ছবি না তুলেই বলি, হয়েছে, ছবি সোন্দর আসছে। এরা বুদ্ধির খেলায় আমাকে হারিয়ে দেয় যখন বলে, কই দেখান, দেখি কেমন আসছে?
আমি বিপদে পড়ি।
এই স্কুলের ছাত্রী প্রিয়া নামের ৭/৮ বছরের এক মেয়ে আজ অনুপস্থিত। টিচারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, প্রিয় ছুটি নিয়েছে, বাবা-মার সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাবে। এরিমধ্যে প্রিয়া এসে উপস্থিত। বেড়াতে যাবে বলে এ খানিকটা সাজগোজও করে এসেছে। আমিই প্রিয়াকে বলি, আসো, তোমার একটা ছবি উঠিয়ে দেই।
সেল-ফোনের ছোট্ট ডিসপ্লেতে তেমন বুঝিনি এখন ছবিটা বড়ো পর্দায় দেখে আমি আক্ষরিক অর্থেই হতভম্ব হয়ে আছি! কী অদ্ভুত, কী অদ্ভুত সুন্দর! কে বলবে এই শিশুটি হরিজন পল্লীতে জন্ম নিয়েছে! সৌন্দর্যের বিচারে আমার নিজের মেয়েও এর ধারেকাছে আসতে পারবে না।
আমি তর্কবাজ না কিন্তু তবুও তর্কেতর্কে তর্ক করতে ছাড়ব না, কে বলেছে এই মেয়েটি আগামীতে মিস ওয়ার্ল্ড হতে পারবে না? অন্তত এমন ভাবাটা দোষের...।
জানি-জানি, অনেকে অট্টহাস্যে গা দুলিয়ে হাসছেন। চোখের ভুল হতে পারে কিন্তু আমার মনিটরের পর্দা খানিকটা দুলে উঠতে দেখলাম সম্ভবত। ওহো, আপনারা ত্রিকালদর্শী বুঝি, এ হতে পারে না, 'কাভি নেহি'! ভবিষ্যৎ অনায়াসে টের পান নাকি? তাই বলুন...!
সহায়ক লিংক:
১. আমাদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_07.html
বিভাগ
আমাদের ইশকুল: এক
Saturday, October 9, 2010
মুক্তিযুদ্ধ: আলাদা একটা সাইট
বিষয়টা লক্ষ করে ওদিন মনটা ভারী বিষণ্ন হয়েছিল! মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রচুর লেখা নাই। ঠিক কোথায় কোথায় আছে এটা আমি নিজেও জানি না! বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ওয়েব-সাইটে লিখেছি। কখনও চলে আসার সময় সব পোস্ট মুছে দিয়ে এসেছি। কখনও-বা কেউ আমার সমস্ত পোস্ট মুছে দিয়েছেন। এই কান্ডটা একটা সো-কলড এলিট ওয়েব-সাইট করেছিল, বানরের হাতে ক্ষুর থাকলে যা হয় আর কী! হাঁটু পানিতে সাঁতরানো এই নির্বোধরা কখন বুঝবে, একজনকে পছন্দ না করাটা অন্যায় না কিন্তু তার সন্তানকে খুন করাটা অন্যায়! আমার কাছে আমার সমস্ত লেখালেখিই সন্তানসম।
বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখাগুলোর প্রতি আমার আলাদা মমতা আছে। কেবল বিষয়বস্তুর কারণেই না। আগেও বলেছি, অনেক বিনিদ্র রজনী কেটেছে এই লেখাগুলোর পেছনে। আমি যে ডেস্কটপে কাজ করতাম সেটা থাকত অফিসে। সব কাজ শেষ করে রাতে আমি অফিসে চলে যেতাম, কখন ভোর হয়ে যেত টেরটিও পেতাম না। দিনের-পর-দিন একই ঘটনা। বাচ্চার মা জনে জনে এটা বলে বেড়াতে লাগলেন আমার নাকি মাথায় গন্ডগোল দেখা দিয়েছে। সত্যি সত্যি তখন আমার পারিবারিক জীবনে অশান্তি নেমে এসেছিল।
সেই সময়টায় একটা ওয়েব সাইটে শুভ নামে চুটিয়ে লেখালেখি করি। একের-পর-এক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পোস্ট। সময়টা বড়ো প্রতিকূল। তখন নামকরা সব রাজাকারের গাড়িতে পত পত করে উড়ে বাংলাদেশের পতাকা। আমার বাড়তি সুবিধা ছিল যেটা সেটা হচ্ছে, শুভ নিকটাকে তখন কেউ চিনত না। তখন খুব অল্প কিছু মানুষই আমার ফোন নাম্বার জানতেন। এই নাম্বার কারা কারা কাকে দিয়েছিলেন এই বিস্তারিত আলাপে যাই না। কিন্তু তখন রাত-বিরাতে ভয় উদ্রেক করার মত ফোন আসে। লাভ হবে না জেনেও নিরুপায় হয়ে আমি তখন থানায় জিডি করেছিলাম। সে আরেক কাহিনি!
যাই হোক, পরে আমি আমার নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে ফোন নাম্বারগুলোর হোতাকে খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়েছিলাম। ঈশ্বর, মানুষ এমন বিশ্বাসঘাতক হয় কেমন করে!
এটা তখনকার কথা বলছি, সালটা ২০০৫। তখন বিষয়টা এতো সহজ ছিল না, ওয়েব সাইটে বাংলায় মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত তেমন বিশেষ তথ্য ছিল না। তার উপর মুক্তিযুদ্ধের বই-পত্রের দাম আগুন। এ এক বিচিত্র, কেন মুক্তিযুদ্ধের বইপত্রের মূল্য আয়ত্বের বাইরে রাখা হয় এটা সংশ্লিষ্ট লোকজনরা ভাল বলতে পারবেন। হয়তো এটাও একটা কারণ হতে পারে এই সব বই পয়সাওয়ালাদের স্টাডিতে সাজিয়ে রাখার জন্যে।
আমার মনে আছে, 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস'-এর সবগুলো পর্ব ফটোকপি করতে গিয়ে আমার নাভিশ্বাস অবস্থা হয়েছিল। ১৫০০০ পৃষ্ঠা ফটোকপি করা চাট্টিখানি কথা ছিল না! এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত, বিভিন্ন ছবি। বেচারা ফটোকপিয়ার মেশিন, বেচারা!
মুক্তিযুদ্ধের ছবির জন্য আলাদা একটা সাইট করেছিলাম [১]। নিয়মিত আপডেট করা হয় না। বড়ো অন্যায় হচ্ছে। দেখি, এখন থেকে নিয়মিত আপডেট করার চেষ্টা করব।
মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত লেখাগুলোর জন্য আলাদা একটা সাইট করে [২] এখান থেকে লেখাগুলো সেখানে নিয়ে যাচ্ছি। এটা আমার নিজের জন্যই প্রয়োজন, কাজের সময় এই বিশেষ লেখাগুলো খুঁজে পেতে সমস্যা হয়। মাত্র শতেক লেখা পেয়েছি- আমি নিশ্চিত, প্রায় ১০০ লেখা না, এর সংখ্যা আরও অনেক হওয়ার কথা। সম্প্রতি একটা ওয়েব সাইট থেকে আমার ড্রাফট করা কিছু লেখা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যেটা আমি 'নিধন' নামে শুরু করেছিলাম। খুঁজলে আরও কিছু লেখা এদিক-ওদিক পাওয়া যাওয়ার কথা।
ওই সাইটে লেখাগুলো পোস্ট করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, কিছু বানান ভুল রয়ে গেছে, অসঙ্গতি আছে। আসলে যে সময়কার এই লেখাগুলো তখন ইউনিকোডে লেখার অনেক সমস্যা ছিল। ফন্ট ছিল অন্য রকম, 'ক্ষ' অক্ষর আসত না। এই সব কিছু কিছু ঠিক করেছি, তারপরও অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে! লেবেল উল্টাপাল্টা আছে, সময় করে ঠিক করতে হবে।
কোন সহৃদয় মানুষ সাইটটা ভিজিট করলে কোন অসঙ্গতি চোখে পড়লে, জানালে আগাম কৃতজ্ঞতা। এখুনি আমি এই সাইট থেকে লেখাগুলো ডিলিট করছি না। আগে সংশোধন শেষ হোক তারপর।
সাইটটার নাম 'প্রসব বেদনা, ১৯৭১' দিয়েছি। হা হা করে হাসতে হাসতে অনেকে বলবেন, 'প্রসব বেদনা' নামটাই বা কেন? হাসাহাসি শেষ হলে একটু বলি, এর পেছনে আমার খানিক যুক্তি আছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামের শিশুটির জন্ম হতে গিয়ে এই দেশের মানুষদের যে অমানুষিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল তার তুলনা চলে কেবল একজন মার প্রসব বেদনা-গর্ভ যন্ত্রণার সঙ্গে। একজন মার প্রসব বেদনার সবটুকু আঁচ কি কারও পক্ষে সম্ভব? এমন কি মার পক্ষেও? একজন মা কি তখনকার সবটুকু কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন? আমার ধারণা, পারেন না কারণ তখন তাঁর বাহ্যেন্দ্রিয় জ্ঞান লোপ পায়।
৭১ সালটা তেমনি। এখনকার সময়ে আমরা খানিক অনুমান করতে পারি কিন্তু পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারব না, পারা সম্ভব না। যারা তখন এই সত্যগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন তাঁদের পক্ষেও না। সন্তান জন্মদানের পর মার যেমন কষ্টের স্মৃতিসব মনে রাখা সম্ভব হয় না, ঠিক তেমনি তাঁদের পক্ষেও।
সহায়ক লিংক:
১. ছবি ব্লগ, মুক্তিযুদ্ধ: http://71photogun.blogspot.com/
২. প্রসব বেদনা, ১৯৭১: http://1971-bangladesh.blogspot.com/
বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখাগুলোর প্রতি আমার আলাদা মমতা আছে। কেবল বিষয়বস্তুর কারণেই না। আগেও বলেছি, অনেক বিনিদ্র রজনী কেটেছে এই লেখাগুলোর পেছনে। আমি যে ডেস্কটপে কাজ করতাম সেটা থাকত অফিসে। সব কাজ শেষ করে রাতে আমি অফিসে চলে যেতাম, কখন ভোর হয়ে যেত টেরটিও পেতাম না। দিনের-পর-দিন একই ঘটনা। বাচ্চার মা জনে জনে এটা বলে বেড়াতে লাগলেন আমার নাকি মাথায় গন্ডগোল দেখা দিয়েছে। সত্যি সত্যি তখন আমার পারিবারিক জীবনে অশান্তি নেমে এসেছিল।
সেই সময়টায় একটা ওয়েব সাইটে শুভ নামে চুটিয়ে লেখালেখি করি। একের-পর-এক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পোস্ট। সময়টা বড়ো প্রতিকূল। তখন নামকরা সব রাজাকারের গাড়িতে পত পত করে উড়ে বাংলাদেশের পতাকা। আমার বাড়তি সুবিধা ছিল যেটা সেটা হচ্ছে, শুভ নিকটাকে তখন কেউ চিনত না। তখন খুব অল্প কিছু মানুষই আমার ফোন নাম্বার জানতেন। এই নাম্বার কারা কারা কাকে দিয়েছিলেন এই বিস্তারিত আলাপে যাই না। কিন্তু তখন রাত-বিরাতে ভয় উদ্রেক করার মত ফোন আসে। লাভ হবে না জেনেও নিরুপায় হয়ে আমি তখন থানায় জিডি করেছিলাম। সে আরেক কাহিনি!
যাই হোক, পরে আমি আমার নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে ফোন নাম্বারগুলোর হোতাকে খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়েছিলাম। ঈশ্বর, মানুষ এমন বিশ্বাসঘাতক হয় কেমন করে!
এটা তখনকার কথা বলছি, সালটা ২০০৫। তখন বিষয়টা এতো সহজ ছিল না, ওয়েব সাইটে বাংলায় মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত তেমন বিশেষ তথ্য ছিল না। তার উপর মুক্তিযুদ্ধের বই-পত্রের দাম আগুন। এ এক বিচিত্র, কেন মুক্তিযুদ্ধের বইপত্রের মূল্য আয়ত্বের বাইরে রাখা হয় এটা সংশ্লিষ্ট লোকজনরা ভাল বলতে পারবেন। হয়তো এটাও একটা কারণ হতে পারে এই সব বই পয়সাওয়ালাদের স্টাডিতে সাজিয়ে রাখার জন্যে।
আমার মনে আছে, 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস'-এর সবগুলো পর্ব ফটোকপি করতে গিয়ে আমার নাভিশ্বাস অবস্থা হয়েছিল। ১৫০০০ পৃষ্ঠা ফটোকপি করা চাট্টিখানি কথা ছিল না! এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত, বিভিন্ন ছবি। বেচারা ফটোকপিয়ার মেশিন, বেচারা!
মুক্তিযুদ্ধের ছবির জন্য আলাদা একটা সাইট করেছিলাম [১]। নিয়মিত আপডেট করা হয় না। বড়ো অন্যায় হচ্ছে। দেখি, এখন থেকে নিয়মিত আপডেট করার চেষ্টা করব।
মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত লেখাগুলোর জন্য আলাদা একটা সাইট করে [২] এখান থেকে লেখাগুলো সেখানে নিয়ে যাচ্ছি। এটা আমার নিজের জন্যই প্রয়োজন, কাজের সময় এই বিশেষ লেখাগুলো খুঁজে পেতে সমস্যা হয়। মাত্র শতেক লেখা পেয়েছি- আমি নিশ্চিত, প্রায় ১০০ লেখা না, এর সংখ্যা আরও অনেক হওয়ার কথা। সম্প্রতি একটা ওয়েব সাইট থেকে আমার ড্রাফট করা কিছু লেখা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যেটা আমি 'নিধন' নামে শুরু করেছিলাম। খুঁজলে আরও কিছু লেখা এদিক-ওদিক পাওয়া যাওয়ার কথা।
ওই সাইটে লেখাগুলো পোস্ট করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, কিছু বানান ভুল রয়ে গেছে, অসঙ্গতি আছে। আসলে যে সময়কার এই লেখাগুলো তখন ইউনিকোডে লেখার অনেক সমস্যা ছিল। ফন্ট ছিল অন্য রকম, 'ক্ষ' অক্ষর আসত না। এই সব কিছু কিছু ঠিক করেছি, তারপরও অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে! লেবেল উল্টাপাল্টা আছে, সময় করে ঠিক করতে হবে।
কোন সহৃদয় মানুষ সাইটটা ভিজিট করলে কোন অসঙ্গতি চোখে পড়লে, জানালে আগাম কৃতজ্ঞতা। এখুনি আমি এই সাইট থেকে লেখাগুলো ডিলিট করছি না। আগে সংশোধন শেষ হোক তারপর।
সাইটটার নাম 'প্রসব বেদনা, ১৯৭১' দিয়েছি। হা হা করে হাসতে হাসতে অনেকে বলবেন, 'প্রসব বেদনা' নামটাই বা কেন? হাসাহাসি শেষ হলে একটু বলি, এর পেছনে আমার খানিক যুক্তি আছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামের শিশুটির জন্ম হতে গিয়ে এই দেশের মানুষদের যে অমানুষিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল তার তুলনা চলে কেবল একজন মার প্রসব বেদনা-গর্ভ যন্ত্রণার সঙ্গে। একজন মার প্রসব বেদনার সবটুকু আঁচ কি কারও পক্ষে সম্ভব? এমন কি মার পক্ষেও? একজন মা কি তখনকার সবটুকু কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন? আমার ধারণা, পারেন না কারণ তখন তাঁর বাহ্যেন্দ্রিয় জ্ঞান লোপ পায়।
৭১ সালটা তেমনি। এখনকার সময়ে আমরা খানিক অনুমান করতে পারি কিন্তু পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারব না, পারা সম্ভব না। যারা তখন এই সত্যগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন তাঁদের পক্ষেও না। সন্তান জন্মদানের পর মার যেমন কষ্টের স্মৃতিসব মনে রাখা সম্ভব হয় না, ঠিক তেমনি তাঁদের পক্ষেও।
সহায়ক লিংক:
১. ছবি ব্লগ, মুক্তিযুদ্ধ: http://71photogun.blogspot.com/
২. প্রসব বেদনা, ১৯৭১: http://1971-bangladesh.blogspot.com/
বিভাগ
১৯৭১: প্রসব বেদনা
Thursday, October 7, 2010
'আমাদের ইশকুল' এবং আমার কিছু কথা
আমাদের ইশকুল: ১ [১], যেটা হরিজনদের সন্তানদের নিয়ে, এটা শুরু হয় এ বছরের জুন মাসে। আমাদের ইশকুল: ২ [২], অন্ধদের সন্তানদের জন্যে, এটা চালু হয় এ বছরেরই জুলাইয়ে। আমাদের ইশকুল: ৩ [৩], মূলত মৌলিক সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্যে, যাদের অধিকাংশদেরই বাবা-মা-স্বজন নেই, এরা পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে এবং ঘুমায় স্টেশনের ওভারব্রীজে। এটা আরম্ভ হয় গত মাসে।
এই স্কুলটা করার কথা আমি আমার নিজের সাইটে লিখেছিলাম, "পারলে আমি আগামীকালই চালু করে দেই। কে দেখেছে সামার, কে দেখেছে শীত"?
এটা একরকম পাগলামি ছিল কারণ তখন পর্যন্ত স্কুলঘরের পাত্তা নেই, টিচারের পাত্তা নেই। আমি জানি না কেমন কেমন করে পরদিনই স্কুলটা চালু করা সম্ভব হয়েছিল!
আমি খুবই সৌভাগ্যবান, জানি না কেমন কেমন করে তিনটা স্কুলই দাঁড়িয়ে গেল! লাক? হতে পারে! কিন্তু অনেকের অযাচিত সহায়তা পেয়েছি যার বর্ণনা শুরু করলে আস্ত একটা উপন্যাস হয়ে যাবে! কার কথা ছেড়ে কার কথা বলব?
সম্প্রতি 'আমাদের ইশকুল' নিয়ে ডয়চে ভেলে একটা রেডিও অনুষ্ঠান করেছে [৪]। ডয়চে ভেলের তাদের সাইটে প্রতিবেদনও ছাপিয়েছে [৫]। আমাদের দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও কিছু প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে [৬], [৭], [৮], [৯]।
ওখানে আমি বলেছিলাম, "আমি কেবল অক্ষর শেখাবার উপরই জোর দিচ্ছি না। একটা শিশুর শেখার জন্য যা যা প্রয়োজন। হাতের নোখ ছোট কি না, খাওয়ার আগে হাত ধুচ্ছে কি না। কলাটা কেমন করে খাচ্ছে"?
আমি কিছু বয়স্ক মানুষদেরকেও দেখেছি, কলার খোসাটা সবটা ছাড়িয়ে কলাটা হাতে ধরে অবিকল বাঁদরের মত খেতে! তো, শিশুটি কলাটা খাচ্ছে কেমন করে? মনে করে কলার খোসাটা আবর্জনার বাক্সে ফেলছে কি না? এরপর সমস্ত খোসা জমিয়ে ছাগলকে দিচ্ছে কি না। তাকে এটাও শেখাবার চেষ্টা করা তার জন্য যেমন কলাটা প্রয়োজন তেমনি ছাগলের জন্য খোসা।
যাই হোক, মিডিয়ায় স্কুলের প্রসঙ্গ আসাটা অত্যন্ত আনন্দিত হওয়ার মত বিষয় কিন্তু আমি বেশ খানিকটা বিব্রত বোধও করছি। কারণ সব ছাপিয়ে কেবল আমার নাম চলে আসছে। এ অন্যায়! সত্যি বলতে কি এখানে আমার ভূমিকা গৌণ- আমি কেবল এই সব শিশুদের স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করছি। ব্যস, এই-ই। আমার কাজ এটুকুই। তবে এও সত্য, আমি আমার অর্জিত অতি সামান্য মননের পুরোটাই কাজে লাগাবার চেষ্টা করছি।
আর স্বার্থপরের মত নিজে যে স্বপ্নটা দেখছি, রাখালবালক থেকে একজন ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে পারলে এদের কেউ পারবে না কেন, কে এই মাথার দিব্যি দিয়েছে?
আমি কেমন করে বিস্মৃত হই, আমার এই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের পেছনে সাদিক আলমের অবদানের কথা। যে 'পড়শী ফাউন্ডেশন' আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, এবং পড়শী ফাউন্ডেশনে যারা আর্থিক যোগান দিয়েছেন তাঁদের কথা। এই মানুষগুলোর অধিকাংশই কী নির্মোহ, এঁরা তাঁদের নাম কোথাও আসুক এটা পর্যন্ত চাননি! আর আমার স্ত্রী, যে দিনের-পর-দিন মুচির মেয়েদেরকে পড়াচ্ছে তার কথাই বা কেমন করে ভুলে যাব?
ভাল কথা, চর্মকার-মুচির সন্তানদের নিয়ে পরবর্তী স্কুল করার ভাবনাটা মাথায় আছে আমার। এবং বেদেদের সন্তানদের নিয়েও একটা স্কুল চালু করার।
বেদে নামের এই রহস্যময় মানুষদের নিয়ে আমার আগ্রহ সীমাহীন।
এঁদের বিষয়ে জানতে আমি আগ্রহী। আমার সংগ্রহশালার জন্যে একটা বীনও (সঠিক নামটা আমি জানি না, যেটা বাজিয়ে সাপের খেলা দেখানো হয়) প্রয়োজন। এটা সংগ্রহ করার শখ আমার অনেকদিনের।
কালই এক বেদে বহরের খোঁজ পেয়েছিলাম। এরা নাকি গঙ্গাসাগর নামের একটা জায়গায় আস্তানা গেড়েছে। কিন্তু গিয়ে হতাশ হলাম কারণ এখানে সাকুল্যে চারটা পরিবার থাকে তাও এরা মাসখানেকের মধ্যে এখান থেকে সরে পড়বে। এমনিতে এরা সাপ ধরে না, সাপের খেলাও দেখায় না, নৌকায়ও বসবাস করে না। ডাঙ্গায় ছাপড়ার মত ঘর উঠিয়ে থাকে।
এমন না বাস্তবতা আমি বুঝি না, আমি চাইলেই নতুন স্কুল খুলতে পারব না- আমাকেও কিছু জবাবদিহিতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এভাবে কাজ করে আমি আরাম পাই না। আমার মধ্যে সমস্যা আছে, আমি কোন চাপে থেকে কাজ করতে পারি না। আমি আমার নিজস্ব ভঙ্গিতে কাজ করতে পছন্দ করি। এটা কারও ভাল লাগুক বা না-লাগুক এতে আমার অহেতুক কাতরতা নাই।
যে তিনটা স্কুল এখন চলছে এটা কতদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে আমি জানি না। আমি শিউরে উঠি এটা ভেবে, কখনও যদি স্কুলগুলো বন্ধ করে দিতে হয়...। এসবের মধ্যে নতুন স্কুল করার কথা ভাবাটাও বোকামি।
কিন্তু আমি ভাবব, এমন বোকামি করব, বারবার করব। চালু করব মুচিদের সন্তানদের নিয়ে এবং বেদেদের সন্তানদের জন্যে স্কুল।
পুরনো কথাটাই আবারও বলি, কে দেখেছে সামার...?
সহায়ক লিংক:
১. আমাদের ইশকুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
২. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
৩. আমাদের ইশকুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3
৪. ডয়চে ভেলের রেডিও অনুষ্ঠান: http://tinyurl.com/2umlksm
৫. ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন: http://www.dw-world.de/dw/article/0,,6087822,00.html
৬. কালের কন্ঠ, ১: http://tinyurl.com/3a5ckr4
৭. কালের কন্ঠ, ২: http://tinyurl.com/33mdvw9
৮. আমার দেশ, ১: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/07/31/36761
৯. আমার দেশ, ২: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/08/22/40362
১০. পড়শী ফাউন্ডেশন, সাদিক আলমের ব্লগ: http://www.mysticsaint.info/p/sacred-activism.html
এই স্কুলটা করার কথা আমি আমার নিজের সাইটে লিখেছিলাম, "পারলে আমি আগামীকালই চালু করে দেই। কে দেখেছে সামার, কে দেখেছে শীত"?
এটা একরকম পাগলামি ছিল কারণ তখন পর্যন্ত স্কুলঘরের পাত্তা নেই, টিচারের পাত্তা নেই। আমি জানি না কেমন কেমন করে পরদিনই স্কুলটা চালু করা সম্ভব হয়েছিল!
আমি খুবই সৌভাগ্যবান, জানি না কেমন কেমন করে তিনটা স্কুলই দাঁড়িয়ে গেল! লাক? হতে পারে! কিন্তু অনেকের অযাচিত সহায়তা পেয়েছি যার বর্ণনা শুরু করলে আস্ত একটা উপন্যাস হয়ে যাবে! কার কথা ছেড়ে কার কথা বলব?
সম্প্রতি 'আমাদের ইশকুল' নিয়ে ডয়চে ভেলে একটা রেডিও অনুষ্ঠান করেছে [৪]। ডয়চে ভেলের তাদের সাইটে প্রতিবেদনও ছাপিয়েছে [৫]। আমাদের দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও কিছু প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে [৬], [৭], [৮], [৯]।
ওখানে আমি বলেছিলাম, "আমি কেবল অক্ষর শেখাবার উপরই জোর দিচ্ছি না। একটা শিশুর শেখার জন্য যা যা প্রয়োজন। হাতের নোখ ছোট কি না, খাওয়ার আগে হাত ধুচ্ছে কি না। কলাটা কেমন করে খাচ্ছে"?
আমি কিছু বয়স্ক মানুষদেরকেও দেখেছি, কলার খোসাটা সবটা ছাড়িয়ে কলাটা হাতে ধরে অবিকল বাঁদরের মত খেতে! তো, শিশুটি কলাটা খাচ্ছে কেমন করে? মনে করে কলার খোসাটা আবর্জনার বাক্সে ফেলছে কি না? এরপর সমস্ত খোসা জমিয়ে ছাগলকে দিচ্ছে কি না। তাকে এটাও শেখাবার চেষ্টা করা তার জন্য যেমন কলাটা প্রয়োজন তেমনি ছাগলের জন্য খোসা।
যাই হোক, মিডিয়ায় স্কুলের প্রসঙ্গ আসাটা অত্যন্ত আনন্দিত হওয়ার মত বিষয় কিন্তু আমি বেশ খানিকটা বিব্রত বোধও করছি। কারণ সব ছাপিয়ে কেবল আমার নাম চলে আসছে। এ অন্যায়! সত্যি বলতে কি এখানে আমার ভূমিকা গৌণ- আমি কেবল এই সব শিশুদের স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করছি। ব্যস, এই-ই। আমার কাজ এটুকুই। তবে এও সত্য, আমি আমার অর্জিত অতি সামান্য মননের পুরোটাই কাজে লাগাবার চেষ্টা করছি।
আর স্বার্থপরের মত নিজে যে স্বপ্নটা দেখছি, রাখালবালক থেকে একজন ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে পারলে এদের কেউ পারবে না কেন, কে এই মাথার দিব্যি দিয়েছে?
আমি কেমন করে বিস্মৃত হই, আমার এই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের পেছনে সাদিক আলমের অবদানের কথা। যে 'পড়শী ফাউন্ডেশন' আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, এবং পড়শী ফাউন্ডেশনে যারা আর্থিক যোগান দিয়েছেন তাঁদের কথা। এই মানুষগুলোর অধিকাংশই কী নির্মোহ, এঁরা তাঁদের নাম কোথাও আসুক এটা পর্যন্ত চাননি! আর আমার স্ত্রী, যে দিনের-পর-দিন মুচির মেয়েদেরকে পড়াচ্ছে তার কথাই বা কেমন করে ভুলে যাব?
ভাল কথা, চর্মকার-মুচির সন্তানদের নিয়ে পরবর্তী স্কুল করার ভাবনাটা মাথায় আছে আমার। এবং বেদেদের সন্তানদের নিয়েও একটা স্কুল চালু করার।
বেদে নামের এই রহস্যময় মানুষদের নিয়ে আমার আগ্রহ সীমাহীন।এঁদের বিষয়ে জানতে আমি আগ্রহী। আমার সংগ্রহশালার জন্যে একটা বীনও (সঠিক নামটা আমি জানি না, যেটা বাজিয়ে সাপের খেলা দেখানো হয়) প্রয়োজন। এটা সংগ্রহ করার শখ আমার অনেকদিনের।
কালই এক বেদে বহরের খোঁজ পেয়েছিলাম। এরা নাকি গঙ্গাসাগর নামের একটা জায়গায় আস্তানা গেড়েছে। কিন্তু গিয়ে হতাশ হলাম কারণ এখানে সাকুল্যে চারটা পরিবার থাকে তাও এরা মাসখানেকের মধ্যে এখান থেকে সরে পড়বে। এমনিতে এরা সাপ ধরে না, সাপের খেলাও দেখায় না, নৌকায়ও বসবাস করে না। ডাঙ্গায় ছাপড়ার মত ঘর উঠিয়ে থাকে।
এমন না বাস্তবতা আমি বুঝি না, আমি চাইলেই নতুন স্কুল খুলতে পারব না- আমাকেও কিছু জবাবদিহিতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এভাবে কাজ করে আমি আরাম পাই না। আমার মধ্যে সমস্যা আছে, আমি কোন চাপে থেকে কাজ করতে পারি না। আমি আমার নিজস্ব ভঙ্গিতে কাজ করতে পছন্দ করি। এটা কারও ভাল লাগুক বা না-লাগুক এতে আমার অহেতুক কাতরতা নাই।
যে তিনটা স্কুল এখন চলছে এটা কতদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে আমি জানি না। আমি শিউরে উঠি এটা ভেবে, কখনও যদি স্কুলগুলো বন্ধ করে দিতে হয়...। এসবের মধ্যে নতুন স্কুল করার কথা ভাবাটাও বোকামি।
কিন্তু আমি ভাবব, এমন বোকামি করব, বারবার করব। চালু করব মুচিদের সন্তানদের নিয়ে এবং বেদেদের সন্তানদের জন্যে স্কুল।
পুরনো কথাটাই আবারও বলি, কে দেখেছে সামার...?
সহায়ক লিংক:
১. আমাদের ইশকুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
২. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
৩. আমাদের ইশকুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3
৪. ডয়চে ভেলের রেডিও অনুষ্ঠান: http://tinyurl.com/2umlksm
৫. ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন: http://www.dw-world.de/dw/article/0,,6087822,00.html
৬. কালের কন্ঠ, ১: http://tinyurl.com/3a5ckr4
৭. কালের কন্ঠ, ২: http://tinyurl.com/33mdvw9
৮. আমার দেশ, ১: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/07/31/36761
৯. আমার দেশ, ২: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/08/22/40362
১০. পড়শী ফাউন্ডেশন, সাদিক আলমের ব্লগ: http://www.mysticsaint.info/p/sacred-activism.html
বিভাগ
আমাদের ইশকুল
Wednesday, October 6, 2010
নিধন: ড. আবুল খায়ের
ড. আবুল খায়ের ছিলেন ভারী আত্মভোলা টাইপের মানুষ।
একদিনের ঘটনা। তিনি নিজেই গাড়ী চালিয়ে যাচ্ছেন। সিগনালের লাল বাতি দেখে গাড়ী থামালেন। লাল বাতী সবুজ হলো । সবুজ থেকে আবার লাল হলো কিন্তু এই আত্মভোলা মানুষটা গাড়ী থামিয়ে চুপচাপ গাড়ীতে বসে আছেন, ভুলেই গেলেন তাকে আবার গাড়ীটা চালাতে হবে।
কিন্তু আল বদররা এই আলাভোলা মানুষটাকেও ক্ষমা করেনি!
ড. আবুল খায়েরের ফ্ল্যাট ছিল নীচ তলায়। ১৪ ডিসেম্বর। সকাল ৮টা। ঘুমাবার পোষাক পায়জামা, শার্ট পরেই তিনি পায়চারী করছেন। এই আলাভোলা মানুষটা এমন, তাঁর গায়ের চাদরটা যে তাঁর স্ত্রীর এটা আর খেয়াল করেননি!
ভাবছিলেন, কারফিউ উঠে গেলেই তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাবেন- তাঁর স্ত্রী বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন।
এমনি সময় আল বদরের লোকজনরা এসে হাজির হলো। তারা তাঁকে ওই পায়চারি করা অবস্থায় ধরে নিয়ে গেল।
আলবদরদের সঙ্গে তাঁর কি কথা হয়েছিল, তা কেউ শোনেনি! ড. আবুল খায়ের তাঁর স্ত্রীকেও কিছু বলে যেতে পারেননি!
*তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ।
(ওই মানুষটার শেষ কথা আমরা জানি না, জানা হবে না আর কখনও।
যদিও ঢাকায় এখন পোকা-মাকড়ের মত গিজগিজ করছে মানুষে কিন্তু ঢাকা এখন একটা মৃত-নগরী! ঢাকা নামের লাশটায় এখনও পচন ধরেনি কারণ এটা ফরমালিনে চুবিয়ে রাখা হয়েছে। কেউ কোন দিন এটাও দেখবে না, ঢাকা শহরের রাস্তা ফাঁকা-ফাঁকা! কিন্তু ঈদের মতো সময়টাতে কে জানে হয়তো ফাঁকা-ফাঁকা রাস্তা দেখা যেতেও পারে।
কিন্তু যেটা কেউ কখনও দেখবে না, সিগনালের বাতী লাল থেকে সবুজ হচ্ছে, সবুজ থেকে লাল কিন্তু একটা গাড়ী থেমে আছে। থেমেই আছে! ভেতরে একজন মানুষ স্টিয়ারিং ধরে বসে আছেন, বসেই আছেন, চুপচাপ। আলাভোলা, বুদ্ধিদীপ্ত একজন মানুষ, যার চোখগুলো অসম্ভব ঝকঝকে- যার চোখে আটকে থাকে গোটা সুর্যটা!)
একদিনের ঘটনা। তিনি নিজেই গাড়ী চালিয়ে যাচ্ছেন। সিগনালের লাল বাতি দেখে গাড়ী থামালেন। লাল বাতী সবুজ হলো । সবুজ থেকে আবার লাল হলো কিন্তু এই আত্মভোলা মানুষটা গাড়ী থামিয়ে চুপচাপ গাড়ীতে বসে আছেন, ভুলেই গেলেন তাকে আবার গাড়ীটা চালাতে হবে।
কিন্তু আল বদররা এই আলাভোলা মানুষটাকেও ক্ষমা করেনি!
ড. আবুল খায়েরের ফ্ল্যাট ছিল নীচ তলায়। ১৪ ডিসেম্বর। সকাল ৮টা। ঘুমাবার পোষাক পায়জামা, শার্ট পরেই তিনি পায়চারী করছেন। এই আলাভোলা মানুষটা এমন, তাঁর গায়ের চাদরটা যে তাঁর স্ত্রীর এটা আর খেয়াল করেননি!
ভাবছিলেন, কারফিউ উঠে গেলেই তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাবেন- তাঁর স্ত্রী বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন।
এমনি সময় আল বদরের লোকজনরা এসে হাজির হলো। তারা তাঁকে ওই পায়চারি করা অবস্থায় ধরে নিয়ে গেল।
আলবদরদের সঙ্গে তাঁর কি কথা হয়েছিল, তা কেউ শোনেনি! ড. আবুল খায়ের তাঁর স্ত্রীকেও কিছু বলে যেতে পারেননি!
*তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ।
(ওই মানুষটার শেষ কথা আমরা জানি না, জানা হবে না আর কখনও।
যদিও ঢাকায় এখন পোকা-মাকড়ের মত গিজগিজ করছে মানুষে কিন্তু ঢাকা এখন একটা মৃত-নগরী! ঢাকা নামের লাশটায় এখনও পচন ধরেনি কারণ এটা ফরমালিনে চুবিয়ে রাখা হয়েছে। কেউ কোন দিন এটাও দেখবে না, ঢাকা শহরের রাস্তা ফাঁকা-ফাঁকা! কিন্তু ঈদের মতো সময়টাতে কে জানে হয়তো ফাঁকা-ফাঁকা রাস্তা দেখা যেতেও পারে।
কিন্তু যেটা কেউ কখনও দেখবে না, সিগনালের বাতী লাল থেকে সবুজ হচ্ছে, সবুজ থেকে লাল কিন্তু একটা গাড়ী থেমে আছে। থেমেই আছে! ভেতরে একজন মানুষ স্টিয়ারিং ধরে বসে আছেন, বসেই আছেন, চুপচাপ। আলাভোলা, বুদ্ধিদীপ্ত একজন মানুষ, যার চোখগুলো অসম্ভব ঝকঝকে- যার চোখে আটকে থাকে গোটা সুর্যটা!)
বিভাগ
১৯৭১: প্রসব বেদনা
Tuesday, October 5, 2010
নিধন: শ্রী যোগেশচন্দ্র ঘোষ
সাধনা ঔষধালয়। শ্রী যোগেশচন্দ্র ঘোষ। একটি নাম! একটি ইতিহাস!
দুস্থ-অসহায় মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একটি প্রাণ! তাঁর জীবনের একমাত্র সাধনা ছিল ‘সাধনা ঔষধালয়’। যে ঔষধালয়ের খ্যাতি এ দেশ ছাড়িয়েও সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। নব নব সৃষ্টির মাঝেই যোগেশ বাবু বেঁচে ছিলেন।
পঁচিশে মার্চ।
পুরনো ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার অনেকেই এরই মধ্যে শহর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সমস্ত এলাকায় বাড়ী কাম কারখানায় কেবল যোগেশ বাবু রয়ে গেলেন। বিরাট এলাকা জুড়ে সাধনা ঔষধালয় কারখানা। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়, গবেষণা করেছেন! তাঁর একমাত্র সাধনাস্থল এই কারখানা, এখানকার একেকটা ইটে আছে তাঁর মমতার ছোঁয়া! নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সাথীরা ছিল কারখানার শ্রমিকরা। সবাই যখন কাজ সেরে ফিরে যেত তখন কেবল থাকতেন, সুরুজ মিয়া এবং রামপাল।
সুরুজ মিয়া এবং রামপাল কারখানার দারোয়ান। তাঁরা দীর্ঘ ১৭ বছর যোগেশ বাবুর সঙ্গে কাটিয়েছে। ২৫ শে মার্চের পর সবাই যখন একে একে বাবুকে ফেলে চলে গেল, গেলেন না কেবল এই ২ জন! ২৫ শে মার্চের পরের ঘটনা। গভীর রাত। একটি মিলিটারী জীপ এসে থামলো। ৫/৬ জন সশস্ত্র সৈনিক জীপ থেকে নামলো। তাদের সবার হাতে ভারী অস্ত্র। একে একে গেটের তালা ভেঙ্গে ফেললো তারা। কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লো।
পাহারাদার সুরুজ মিয়ার হাতের বন্দুকও গর্জে উঠলো। সেনাদের দিকে তাক করে তিনিও গুলি ছোড়া শুরু করলেন। শুরু হলো অসম যুদ্ধ। সামান্য অস্ত্র, সামান্যতম অস্ত্রচালনায় পারদর্শী একজন সাধারণ বাঙ্গালী সুরুজ মিয়া পাহারাদারের কাছে হার মানলো পাক সৈন্যরা। রাতের আধারে পাক সেনারা পালিয়ে গেল।
সুরুজ মিয়া যোগেশ বাবুকে বললেন পালিয়ে যেতে। যোগেশ বাবুর এক কথা, মরতে হয় দেশের মাটিতে মরব। আমার সন্তানসম এই সব ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?
পরদিন সকাল। পাকিস্তানী আর্মি আবারও ফিরে এলো, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং লোকবল নিয়ে। পাক সেনারা নীচে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করালো।
এরা যোগেশ বাবুকে উপরে নিয়ে গেল। রাইফেলের মুখে ওই বয়স্ক মানুষটা কি বলেছিলেন তা কোনদিন আর জানা হবে না! পাক সেনারা তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। তাদের উল্লাসধ্বণী নীচে ভেসে আসছিল! নীচের লোকজনরা সুযোগ বুঝে পালিয়ে প্রাণ বাঁচালেন। যোগেশচন্দ্র ঘোষ নামের বয়স্ক এই মানুষটা শুধু পড়ে ছিলেন এলোমেলো ভঙ্গিতে, মৃত। শরীরে অজস্র বেয়নেটের দাগ নিয়ে। পাক আর্মিরা শুধু তাঁকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লুটে নিয়ে গিয়েছিল যোগেশ বাবুর অর্জিত সমস্ত সম্পদ।
(কেবল নিতে পারেনি এ দেশের জন্য যোগেশ বাবুর একবুক ভালোবাসা!)
*তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ/ অষ্টম খন্ড
**ভাষা ঈষৎ পরিবর্তিত।
***শ্রী যোগেশচন্দ্র ঘোষ রচিত কিছু অসাধারণ বই আছে। তাঁর লেখা 'আমরা কোন পথে', ১৯৪০ সালে প্রকাশিত এই বইটি ভাগ্যক্রমে পেয়েছিলাম। অপার আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। মানুষটার যে কী অসাধারণ পান্ডিত্য ছিল, ছিল দেশের জন্য তীব্র ভাবনা তা কেবল এই একটা বই পড়লেই অনেকখানি আঁচ করা যায়!
****মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
দুস্থ-অসহায় মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একটি প্রাণ! তাঁর জীবনের একমাত্র সাধনা ছিল ‘সাধনা ঔষধালয়’। যে ঔষধালয়ের খ্যাতি এ দেশ ছাড়িয়েও সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। নব নব সৃষ্টির মাঝেই যোগেশ বাবু বেঁচে ছিলেন।
পঁচিশে মার্চ।
পুরনো ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার অনেকেই এরই মধ্যে শহর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সমস্ত এলাকায় বাড়ী কাম কারখানায় কেবল যোগেশ বাবু রয়ে গেলেন। বিরাট এলাকা জুড়ে সাধনা ঔষধালয় কারখানা। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়, গবেষণা করেছেন! তাঁর একমাত্র সাধনাস্থল এই কারখানা, এখানকার একেকটা ইটে আছে তাঁর মমতার ছোঁয়া! নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সাথীরা ছিল কারখানার শ্রমিকরা। সবাই যখন কাজ সেরে ফিরে যেত তখন কেবল থাকতেন, সুরুজ মিয়া এবং রামপাল।
সুরুজ মিয়া এবং রামপাল কারখানার দারোয়ান। তাঁরা দীর্ঘ ১৭ বছর যোগেশ বাবুর সঙ্গে কাটিয়েছে। ২৫ শে মার্চের পর সবাই যখন একে একে বাবুকে ফেলে চলে গেল, গেলেন না কেবল এই ২ জন! ২৫ শে মার্চের পরের ঘটনা। গভীর রাত। একটি মিলিটারী জীপ এসে থামলো। ৫/৬ জন সশস্ত্র সৈনিক জীপ থেকে নামলো। তাদের সবার হাতে ভারী অস্ত্র। একে একে গেটের তালা ভেঙ্গে ফেললো তারা। কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লো।
পাহারাদার সুরুজ মিয়ার হাতের বন্দুকও গর্জে উঠলো। সেনাদের দিকে তাক করে তিনিও গুলি ছোড়া শুরু করলেন। শুরু হলো অসম যুদ্ধ। সামান্য অস্ত্র, সামান্যতম অস্ত্রচালনায় পারদর্শী একজন সাধারণ বাঙ্গালী সুরুজ মিয়া পাহারাদারের কাছে হার মানলো পাক সৈন্যরা। রাতের আধারে পাক সেনারা পালিয়ে গেল।
সুরুজ মিয়া যোগেশ বাবুকে বললেন পালিয়ে যেতে। যোগেশ বাবুর এক কথা, মরতে হয় দেশের মাটিতে মরব। আমার সন্তানসম এই সব ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?
পরদিন সকাল। পাকিস্তানী আর্মি আবারও ফিরে এলো, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং লোকবল নিয়ে। পাক সেনারা নীচে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করালো।
এরা যোগেশ বাবুকে উপরে নিয়ে গেল। রাইফেলের মুখে ওই বয়স্ক মানুষটা কি বলেছিলেন তা কোনদিন আর জানা হবে না! পাক সেনারা তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। তাদের উল্লাসধ্বণী নীচে ভেসে আসছিল! নীচের লোকজনরা সুযোগ বুঝে পালিয়ে প্রাণ বাঁচালেন। যোগেশচন্দ্র ঘোষ নামের বয়স্ক এই মানুষটা শুধু পড়ে ছিলেন এলোমেলো ভঙ্গিতে, মৃত। শরীরে অজস্র বেয়নেটের দাগ নিয়ে। পাক আর্মিরা শুধু তাঁকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লুটে নিয়ে গিয়েছিল যোগেশ বাবুর অর্জিত সমস্ত সম্পদ।
(কেবল নিতে পারেনি এ দেশের জন্য যোগেশ বাবুর একবুক ভালোবাসা!)
*তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ/ অষ্টম খন্ড
**ভাষা ঈষৎ পরিবর্তিত।
***শ্রী যোগেশচন্দ্র ঘোষ রচিত কিছু অসাধারণ বই আছে। তাঁর লেখা 'আমরা কোন পথে', ১৯৪০ সালে প্রকাশিত এই বইটি ভাগ্যক্রমে পেয়েছিলাম। অপার আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। মানুষটার যে কী অসাধারণ পান্ডিত্য ছিল, ছিল দেশের জন্য তীব্র ভাবনা তা কেবল এই একটা বই পড়লেই অনেকখানি আঁচ করা যায়!
****মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
বিভাগ
১৯৭১: প্রসব বেদনা
Monday, October 4, 2010
নিধন: অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী।
১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১।
আল বদর এবং রাজাকাররা বিশ্ববিদ্যালয় ফ্ল্যাটে তাঁর খোঁজ করে পেল না। পরে তাঁর তবললীগপন্থী চাকরের কাছ থেকে আল বদররা তাঁর মালীবাগের ঠিকানা যোগাড় করে, সেখানে হাজির হলো।
দরোজায় দমাদম শব্দ। মোফাজ্জল হায়দারের ছোট ভাই লুৎফুল হায়দার দরোজা খুলে দিলে আল বদররা বলল, 'মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী কোথায়'?
লুৎফুল হায়দার বললেন, 'এখানেই আছেন'।
আল বদররা বলল, 'আমাদের অফিসার তার সঙ্গে কথা বলবেন, তাকে একটু ডেকে দিন'।
মোফাজ্জল হায়দার এবং তাঁর স্ত্রী বেরিয়ে এলেন।
মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী বললেন, 'আপনাদের অফিসার কোথায়'?
আল বদররা বলল, 'গাড়ীতে আছেন'।
মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী বললেন, 'আপনারা যে তাঁকে নিতে এসেছেন, ওয়ারেন্ট আছে আপনাদের সাথে'?
আল বদররা বলল, 'আছে'।
আবার মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী বললেন, 'আপনারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওকে'?
আল বদররা বলল, 'জানি না'।
মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী অবাক হয়ে, ভয়ে বললেন, 'বাঃ, এটা কেমন কথা'!
মোফাজ্জল হায়দার বললেন, 'ঠিক আছে, আমি কাপড় পরে নেই'।
তাঁর স্ত্রী বললেন, 'আমিও ওর সঙ্গে যাবো'।
একজন আল বদর বলল, 'আপনি আমাদের মায়ের মতো। আপনি আর কই যাবেন। আর উনি তো আমাদের স্যার। আমরা এখনই তাকে ফেরত দিয়ে যাবো'।
মোফাজ্জল হায়দার বললেন, 'আমি ক্ষুধার্ত, আমি চাট্টিখানি খেয়ে নিতে পারি'?
আল বদররা বলল, 'আমাদের ওখানে সব ব্যবস্থা আছে। আপনি চলুন'।
মোফাজ্জল হায়দার বললেন, 'ঘড়িটা পরে নেই'।
আল বদররা বলল, 'না না, তার দরকার নেই। আপনি তো এখনই আবার চলে আসবেন'।
মোফাজ্জল হোসেন যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। যাওয়ার আগে স্ত্রীকে বললেন, '...আমি এখনই চলে আসব'।
(মানুষটা ভুলেও অনুমান করতে পারেননি, তাঁর আর খাওয়া হবে না। এটা তাঁর শেষ যাত্রা- ওয়ান ওয়ে জার্নি, যেখান থেকে মানুষ আর ফিরে আসে না! থেকে যায় কেবল কিছু স্মৃতি!
আর এঁরা দুর্দান্ত অভিমানে রেখে যান পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে একরাশ লজ্জা!)
*১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। (বিচিত্রা/ ১৯৭৩)
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
আল বদর এবং রাজাকাররা বিশ্ববিদ্যালয় ফ্ল্যাটে তাঁর খোঁজ করে পেল না। পরে তাঁর তবললীগপন্থী চাকরের কাছ থেকে আল বদররা তাঁর মালীবাগের ঠিকানা যোগাড় করে, সেখানে হাজির হলো।
দরোজায় দমাদম শব্দ। মোফাজ্জল হায়দারের ছোট ভাই লুৎফুল হায়দার দরোজা খুলে দিলে আল বদররা বলল, 'মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী কোথায়'?
লুৎফুল হায়দার বললেন, 'এখানেই আছেন'।
আল বদররা বলল, 'আমাদের অফিসার তার সঙ্গে কথা বলবেন, তাকে একটু ডেকে দিন'।
মোফাজ্জল হায়দার এবং তাঁর স্ত্রী বেরিয়ে এলেন।
মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী বললেন, 'আপনাদের অফিসার কোথায়'?
আল বদররা বলল, 'গাড়ীতে আছেন'।
মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী বললেন, 'আপনারা যে তাঁকে নিতে এসেছেন, ওয়ারেন্ট আছে আপনাদের সাথে'?
আল বদররা বলল, 'আছে'।
আবার মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী বললেন, 'আপনারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওকে'?
আল বদররা বলল, 'জানি না'।
মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী অবাক হয়ে, ভয়ে বললেন, 'বাঃ, এটা কেমন কথা'!
মোফাজ্জল হায়দার বললেন, 'ঠিক আছে, আমি কাপড় পরে নেই'।
তাঁর স্ত্রী বললেন, 'আমিও ওর সঙ্গে যাবো'।
একজন আল বদর বলল, 'আপনি আমাদের মায়ের মতো। আপনি আর কই যাবেন। আর উনি তো আমাদের স্যার। আমরা এখনই তাকে ফেরত দিয়ে যাবো'।
মোফাজ্জল হায়দার বললেন, 'আমি ক্ষুধার্ত, আমি চাট্টিখানি খেয়ে নিতে পারি'?
আল বদররা বলল, 'আমাদের ওখানে সব ব্যবস্থা আছে। আপনি চলুন'।
মোফাজ্জল হায়দার বললেন, 'ঘড়িটা পরে নেই'।
আল বদররা বলল, 'না না, তার দরকার নেই। আপনি তো এখনই আবার চলে আসবেন'।
মোফাজ্জল হোসেন যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। যাওয়ার আগে স্ত্রীকে বললেন, '...আমি এখনই চলে আসব'।
(মানুষটা ভুলেও অনুমান করতে পারেননি, তাঁর আর খাওয়া হবে না। এটা তাঁর শেষ যাত্রা- ওয়ান ওয়ে জার্নি, যেখান থেকে মানুষ আর ফিরে আসে না! থেকে যায় কেবল কিছু স্মৃতি!
আর এঁরা দুর্দান্ত অভিমানে রেখে যান পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে একরাশ লজ্জা!)
*১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। (বিচিত্রা/ ১৯৭৩)
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
বিভাগ
১৯৭১: প্রসব বেদনা
Sunday, October 3, 2010
নিধন: অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী
"১৪ই ডিসেম্বর। খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গলো তাঁর। ...বিছানায় শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় মুনীর চৌধুরীর ফ্ল্যাট যদিও দোতলায়, যুদ্ধের সময় তিনি নীচের একটা ফ্লাটে থাকতেন। শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনতে শুনতে এক সময় তাঁর স্ত্রীকে ডেকে বললেন, 'শোন, আর মাত্র ৪৮ ঘন্টা বাকী আছে দেশ স্বাধীন হওয়ার'।
তাঁর কন্ঠে ছিল স্থির বিশ্বাস'!
...গোসল সেরে মুনীর চৌধুরী চুল আঁচড়াচ্ছিলেন। দুপুর তখন বারোটা কি একটা। এমন সময় নীচে লোহার গেটে শব্দ শোনা গেল। কে যেন দরোজা ধাক্কাচ্ছে। মুনীর চৌধুরী উঁকি দিয়ে দেখলেন, কম বয়সী কয়েকটা বাঙ্গালী ছেলে দরজা ধাক্কাচ্ছে। মুনীর চৌধুরী তাঁর স্ত্রীকে বললেন, 'থাক দেখার দরকার নেই। সরে এসো'। বলে তিনি আবারও চুল আঁচড়াতে লাগলেন। স্ত্রীর সাথে মুনীর চৌধুরীর ওটাই ছিল শেষ কথা।
এমন সময় নীচ থেকে মুনীর চৌধুরীর ছোট ভাই ওপরে এসে বললেন, 'মুনীর ভাই, আপনাকে নীচে ডাকছে'!
মুনীর চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার নাম করে বলেছে'?
'হ্যাঁ'।
পাঞ্জাবী পরে আস্তে আস্তে তিনি নীচে নেমে গেলেন। মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী লিলি চৌধুরী কিন্তু তখনও আতংকিত হননি। তার স্বামীকে যে কেউ ধরে নিয়ে যেতে পারে এ কথা তার মনে হয়নি। কারণ, যারা তাকে ডাকতে এসেছে সবাই কমবয়সী, বাঙ্গালী।
তবুও লিলি চৌধুরী সিড়ি দিয়ে নীচে নামলেন। দেখলেন, মুনীর চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন নীচে। আশেপাশে বন্দুক নিয়ে কয়েকটা অল্পবয়সী বাঙ্গালী ছেলে। তিনি শুনলেন, মুনীর চৌধুরী তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের অফিসার কোথায়'?
এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা ছেলে তাঁর পিঠের কাছে বন্দুক উঁচিয়ে বলল, 'আছে, আপনি চলুন'। মুনীর চৌধুরী আস্তে আস্তে হেঁটে তাদের সঙ্গে চলে গেলেন।"
(সেই শেষ যাওয়া- মুনীর চৌধুরী নামের মানুষটা আর ফিরে আসেননি!)
*১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। (বিচিত্রা/ ১৯৭৩)
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
তাঁর কন্ঠে ছিল স্থির বিশ্বাস'!
...গোসল সেরে মুনীর চৌধুরী চুল আঁচড়াচ্ছিলেন। দুপুর তখন বারোটা কি একটা। এমন সময় নীচে লোহার গেটে শব্দ শোনা গেল। কে যেন দরোজা ধাক্কাচ্ছে। মুনীর চৌধুরী উঁকি দিয়ে দেখলেন, কম বয়সী কয়েকটা বাঙ্গালী ছেলে দরজা ধাক্কাচ্ছে। মুনীর চৌধুরী তাঁর স্ত্রীকে বললেন, 'থাক দেখার দরকার নেই। সরে এসো'। বলে তিনি আবারও চুল আঁচড়াতে লাগলেন। স্ত্রীর সাথে মুনীর চৌধুরীর ওটাই ছিল শেষ কথা।
এমন সময় নীচ থেকে মুনীর চৌধুরীর ছোট ভাই ওপরে এসে বললেন, 'মুনীর ভাই, আপনাকে নীচে ডাকছে'!
মুনীর চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার নাম করে বলেছে'?
'হ্যাঁ'।
পাঞ্জাবী পরে আস্তে আস্তে তিনি নীচে নেমে গেলেন। মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী লিলি চৌধুরী কিন্তু তখনও আতংকিত হননি। তার স্বামীকে যে কেউ ধরে নিয়ে যেতে পারে এ কথা তার মনে হয়নি। কারণ, যারা তাকে ডাকতে এসেছে সবাই কমবয়সী, বাঙ্গালী।
তবুও লিলি চৌধুরী সিড়ি দিয়ে নীচে নামলেন। দেখলেন, মুনীর চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন নীচে। আশেপাশে বন্দুক নিয়ে কয়েকটা অল্পবয়সী বাঙ্গালী ছেলে। তিনি শুনলেন, মুনীর চৌধুরী তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের অফিসার কোথায়'?
এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা ছেলে তাঁর পিঠের কাছে বন্দুক উঁচিয়ে বলল, 'আছে, আপনি চলুন'। মুনীর চৌধুরী আস্তে আস্তে হেঁটে তাদের সঙ্গে চলে গেলেন।"
(সেই শেষ যাওয়া- মুনীর চৌধুরী নামের মানুষটা আর ফিরে আসেননি!)
*১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। (বিচিত্রা/ ১৯৭৩)
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
বিভাগ
১৯৭১: প্রসব বেদনা
Saturday, October 2, 2010
নিধন: ডাক্তার আলীম এবং একজন মাওলানা মান্নান
২৯ নম্বর পুরানা পল্টনের দোতলায় থাকতেন মিটফোর্ড হাসপাতালের ডাক্তার আলীম চৌধুরী। তার নীচের তলায় থাকতেন মওলানা আব্দুল মান্নান।
নীচের তলায় আগে ডাক্তার আলীমের ক্লিনিক ছিল। কিন্তু মাওলানা সাহেব একবার বিপদে পড়ে প্রাক্তন স্পীকার এ.টি.এম.মতিনকে ধরে বসেন আশ্রয়ের জন্যে। মতিন সাহেব আলীম সাহেবকে বললেন, 'ডাক্তার চৌধুরী, আপনি ক্লিনিক উঠিয়ে মওলানাকে আশ্রয় দিন'।
১৫ ডিসেম্বর ঢাকায় তখন ভারতীয় বিমান হরোদমে বোমা বর্ষণ করছে। কার্ফু ও চলছে। শুধু সকাল আটটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কার্ফু ওঠান হল।
আলীম চৌধুরী ভাবছিলেন, এ ফাঁকে একবার অন্য কোন জায়গায় আশ্রয় নেয়া যায় কিনা দেখে আসবেন এবং একবার হাসপাতালটাও ঘুরে আসবেন। তাঁর স্ত্রীর ইচ্ছা ছিল না তখন তিনি বের হন। আলীম চৌধুরী বেরুবেনই।
স্ত্রীকে বললেন, 'আমাকে তো একবার হাসপাতালে যেতেই হবে। ডাক্তার মানুষ আমি যদি না যাই তো কে যাবে? তারপর বললেন, আমি যতো তাড়াতাড়ি পারি ফিরবো। তুমি তৈরী থেকো। আমি ফিরলে সবাইকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবো'।
আলীম চৌধুরীর স্ত্রী বললেন, 'তুমি ঠিক মতো ফিরবে- তাহলেই হয়েছে। তুমি কার্ফুর সময় পার করে দিয়ে আসবে আর আমাদেরও যাওয়া হবে না'!
আলীম চৌধুরী স্ত্রীকে বারবার কথা দিলেন যে কার্ফুর অনেক আগেই তিনি ফিরবেন।
তারপর কোরোসিনের একটি টিন নিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। বাসায় তখন কেরোসিনের অভাব।
গাড়ি করে হাসপাতালে গেলেন ডাঃ চৌধুরী। হাসপাতালে তার সহকর্মীরা তো তাঁকে দেখে অবাক। এই দুর্যোগ আর উনি কিনা এসেছেন হাসপাতালে।
...বাসায় ফিরলেন।
স্ত্রী সাথে সাথে ঝংকার দিয়ে বলে উঠলেন, 'কি বলেছিলাম, কার্ফু পার করে দিয়েই তো ফিরলে'।
তিনি বললেন, 'ঠিক আছে ঠিক আছে। কাল একেবারে সক্কালেই চলে যাবো'।
...বিকেল সাড়ে চার। একটা মাইক্রোবাস এসে থামলো বাসার নীচে। কয়েকজন আলবদর নামলো। ডাক্তার চৌধুরীর স্ত্রী একটু উঁকি দিয়ে দেখছিলেন তখন তিনি বললেন, 'অতো উঁকিঝুকি দিয়ো না। বোধহয় আর্মি এসেছে'। বলে তিনি বাথরুমে গেলেন। কারণ মাওলানা মান্নানের বাসায় হরদম এ ধরনের লোকজন আসা-যাওয়া করত।
এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। ...তিনি নীচে নামার উদ্যোগ নিলেন। ডা. চৌধুরীর মা তখন বলে উঠলেন, 'আরে কোথায় যাচ্ছো'?
তিনি বললেন, 'নীচে, মওলানার কাছে (মওলানা আব্দুল মান্নান)। মওলানা বলছিল, এ ধরনের কোন ব্যাপার ঘটলে যেন তাকে খবর দেয়া হয়'।
নীচে নেমে তিনি মওলানার দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন। এমনিতে মওলানার দরজা সব সময় খোলা থাকতো। কিন্তু সেদিন দরজা বন্ধ। এদিকে ডা. চৌধুরী দরজা ধাক্কাচ্ছেন, চীৎকার করে মওলানাকে দরজা খুলতে বলছেন। কিন্তু মওলানার কোন সাড়াশব্দ নেই। খানিক পর মওলানা ভিতর থেকে বললেন, 'ভয় পাবেন না। আপনি যান। আমি আছি'।
তিনি ফের উপরে উঠার জন্য পা বাড়ালেন এমন সময় আলবদরের আদেশ, 'হ্যান্ডস আপ, আমাদের সাথে এবার চলুন'।
'কি ব্যাপার কোথায় যাবো'? প্রশ্ন করলেন ডাঃ চৌধুরী।
'আমাদের সাথে চলুন'।
'প্যান্টটা পরে আসি'।
'কোন দরকার নেই'।
আলবদররা তাঁকে ঘিরে ধরলো। আস্তে আস্তে তিনি মাইক্রোবাসের দিকে অগ্রসর হলেন।
(সেই তাঁর শেষ যাওয়া)
*১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, জাতীয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা/ ১৯৭৩)
**এখন দেখতে পাচ্ছি, এই লেখাটাই 'বিশ্বাসঘাতক' নামে এই সাইটেই পূর্বে পোস্ট করেছিলাম। রি-পোষ্ট হয়ে গেল, দুঃখজনক!
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
নীচের তলায় আগে ডাক্তার আলীমের ক্লিনিক ছিল। কিন্তু মাওলানা সাহেব একবার বিপদে পড়ে প্রাক্তন স্পীকার এ.টি.এম.মতিনকে ধরে বসেন আশ্রয়ের জন্যে। মতিন সাহেব আলীম সাহেবকে বললেন, 'ডাক্তার চৌধুরী, আপনি ক্লিনিক উঠিয়ে মওলানাকে আশ্রয় দিন'।
১৫ ডিসেম্বর ঢাকায় তখন ভারতীয় বিমান হরোদমে বোমা বর্ষণ করছে। কার্ফু ও চলছে। শুধু সকাল আটটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কার্ফু ওঠান হল।
আলীম চৌধুরী ভাবছিলেন, এ ফাঁকে একবার অন্য কোন জায়গায় আশ্রয় নেয়া যায় কিনা দেখে আসবেন এবং একবার হাসপাতালটাও ঘুরে আসবেন। তাঁর স্ত্রীর ইচ্ছা ছিল না তখন তিনি বের হন। আলীম চৌধুরী বেরুবেনই।
স্ত্রীকে বললেন, 'আমাকে তো একবার হাসপাতালে যেতেই হবে। ডাক্তার মানুষ আমি যদি না যাই তো কে যাবে? তারপর বললেন, আমি যতো তাড়াতাড়ি পারি ফিরবো। তুমি তৈরী থেকো। আমি ফিরলে সবাইকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবো'।
আলীম চৌধুরীর স্ত্রী বললেন, 'তুমি ঠিক মতো ফিরবে- তাহলেই হয়েছে। তুমি কার্ফুর সময় পার করে দিয়ে আসবে আর আমাদেরও যাওয়া হবে না'!
আলীম চৌধুরী স্ত্রীকে বারবার কথা দিলেন যে কার্ফুর অনেক আগেই তিনি ফিরবেন।
তারপর কোরোসিনের একটি টিন নিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। বাসায় তখন কেরোসিনের অভাব।
গাড়ি করে হাসপাতালে গেলেন ডাঃ চৌধুরী। হাসপাতালে তার সহকর্মীরা তো তাঁকে দেখে অবাক। এই দুর্যোগ আর উনি কিনা এসেছেন হাসপাতালে।
...বাসায় ফিরলেন।
স্ত্রী সাথে সাথে ঝংকার দিয়ে বলে উঠলেন, 'কি বলেছিলাম, কার্ফু পার করে দিয়েই তো ফিরলে'।
তিনি বললেন, 'ঠিক আছে ঠিক আছে। কাল একেবারে সক্কালেই চলে যাবো'।
...বিকেল সাড়ে চার। একটা মাইক্রোবাস এসে থামলো বাসার নীচে। কয়েকজন আলবদর নামলো। ডাক্তার চৌধুরীর স্ত্রী একটু উঁকি দিয়ে দেখছিলেন তখন তিনি বললেন, 'অতো উঁকিঝুকি দিয়ো না। বোধহয় আর্মি এসেছে'। বলে তিনি বাথরুমে গেলেন। কারণ মাওলানা মান্নানের বাসায় হরদম এ ধরনের লোকজন আসা-যাওয়া করত।
এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। ...তিনি নীচে নামার উদ্যোগ নিলেন। ডা. চৌধুরীর মা তখন বলে উঠলেন, 'আরে কোথায় যাচ্ছো'?
তিনি বললেন, 'নীচে, মওলানার কাছে (মওলানা আব্দুল মান্নান)। মওলানা বলছিল, এ ধরনের কোন ব্যাপার ঘটলে যেন তাকে খবর দেয়া হয়'।
নীচে নেমে তিনি মওলানার দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন। এমনিতে মওলানার দরজা সব সময় খোলা থাকতো। কিন্তু সেদিন দরজা বন্ধ। এদিকে ডা. চৌধুরী দরজা ধাক্কাচ্ছেন, চীৎকার করে মওলানাকে দরজা খুলতে বলছেন। কিন্তু মওলানার কোন সাড়াশব্দ নেই। খানিক পর মওলানা ভিতর থেকে বললেন, 'ভয় পাবেন না। আপনি যান। আমি আছি'।
তিনি ফের উপরে উঠার জন্য পা বাড়ালেন এমন সময় আলবদরের আদেশ, 'হ্যান্ডস আপ, আমাদের সাথে এবার চলুন'।
'কি ব্যাপার কোথায় যাবো'? প্রশ্ন করলেন ডাঃ চৌধুরী।
'আমাদের সাথে চলুন'।
'প্যান্টটা পরে আসি'।
'কোন দরকার নেই'।
আলবদররা তাঁকে ঘিরে ধরলো। আস্তে আস্তে তিনি মাইক্রোবাসের দিকে অগ্রসর হলেন।
(সেই তাঁর শেষ যাওয়া)
*১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, জাতীয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা/ ১৯৭৩)
**এখন দেখতে পাচ্ছি, এই লেখাটাই 'বিশ্বাসঘাতক' নামে এই সাইটেই পূর্বে পোস্ট করেছিলাম। রি-পোষ্ট হয়ে গেল, দুঃখজনক!
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
বিভাগ
১৯৭১: প্রসব বেদনা
Friday, October 1, 2010
নিধন: শহীদুল্লাহ কায়সার
"এমনিতে শহীদুল্লাহ কায়সার খুব কথা বলতেন। কিন্তু যেদিন যুদ্ধ শুরু হলো সেদিন থেকে তিনি চুপ। সারাদিন টেনশনে থাকেন। যুদ্ধের আগে তাঁকে অনেকে বাড়ী ছেড়ে চলে যেতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। কারণ ব্যস্ত ছিলেন একটি উপন্যাস রচনায়। তিনি বলতেন, 'যুদ্ধ আমাকে দেখতে হবে। কারণ তথ্যগুলো আমার উপন্যাসে লাগবে'।
চৌদ্দই ডিসেম্বর।
সকাল বেলায় দেখা গেল বিদেশী দূতাবাসের নম্বর প্লেট লাগানো একটি গাড়ি এসে শহীদুল্লাহ কায়সারের বাড়ী থেকে একটু দূরে দাঁড়ালো। অনেকক্ষণ গাড়ীটা সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর একসময় চলে গেল।
সকাল ন’টা-দশটার দিকে সদরী ইস্পাহানীর টেলিফোন।
'কি করবো কায়সার সাহেব'?
কায়সার সাহেব তাকে অভয় দিলেন।
বেলা তখন তিনটা।
বারান্দায় স্ত্রীর সাথে বসে আছেন তিনি। এমন সময় দেখলেন টুপি মাথায় একটি লোক এক দৃষ্টে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এ দেখে তাঁর স্ত্রী বললেন, 'তুমি ভিতরে যাও, দেখ না লোকটা কিভাবে তাকিয়ে আছে'।
সন্ধ্যা ছ’টা।
শহীদুল্লাহ কায়সার বসে বসে খবর শুনলেন। এক সময় চাকরকে ডেকে বললেন, 'আমার জন্য দু’টো রুটি বানিয়ো'।
শহীদুল্লাহ কায়সার প্রায়ই স্ত্রীকে বলতেন: দেখো আমাকে যে কোন সময় নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং সব সময় আমার জন্য কিছু কাগজ-কলম আর সিগারেট রেখে দেবে। আর কিছু টাকা। শহীদুল্লাহ কায়সার আরো বলতেন, 'আমি একজন সাংবাদিক। তারা আমাকে যাই করুক মারবার সাহস পাবে না।'
চাকরকে তিনি রুটি বানাবার কথা বলেছেন এমন সময় দরোজায় ধাক্কা। মিলিটারী এসেছে...।
...আলবদররা এদিকে দরজা ধাক্কাচ্ছে। তিনি বললেন, 'দরোজা খুলে দাও'। একথা বলে উপরে বেডরুমে গেলেন; স্ত্রীকে বললেন, 'শীগগীর আমাকে কিছু টাকা দাও'। বলে তিনি প্যান্ট পরতে লাগলেন। তাঁর স্ত্রী তখন বললেন, 'টাকা দিতে বলে তুমি যাচ্ছ কোথায়'?
শহীদুল্লা কায়সার বললেন, 'না, একটু ভালো পোষাক পরে নেই'।
...ইতিমধ্যে আলবদররা তাঁর বেডরুমে ঢুকে পড়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনারা কাকে চান'?
'আপনার নাম কি'? তারা (আলবদর) পাল্টা জিজ্ঞেস করলো।
'শহীদুল্লাহ কায়সার'।
সঙ্গে সঙ্গে আলবদররা তাঁর হাত ধরলো। 'আপনার সাথে কথা আছে'। বলে তারা তাঁকে বারান্দায় নিয়ে এলো।
এদিকে বাসা জুড়ে হৈ-চৈ চিত্কার। আলবদররা তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় শহীদুল্লাহ কায়সার কঠিন কন্ঠে বললেন, 'আমি তো যাচ্ছিই। আপনারা আমার হাত ধরবেন না'। এ বলে তিনি একবার পিছন ফিরে সবাইকে দেখতে চাইলেন। কিন্তু আলবদররা তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। (সেই তাঁর শেষ যাওয়া)।"
(১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অষ্টম খন্ড)
*শীতের পাখিরা শীত শেষ হলে ফিরে আসে কিন্তু শহীদুল্লাহ কায়সাররা আর ফিরে আসেন না।
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
চৌদ্দই ডিসেম্বর।
সকাল বেলায় দেখা গেল বিদেশী দূতাবাসের নম্বর প্লেট লাগানো একটি গাড়ি এসে শহীদুল্লাহ কায়সারের বাড়ী থেকে একটু দূরে দাঁড়ালো। অনেকক্ষণ গাড়ীটা সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর একসময় চলে গেল।
সকাল ন’টা-দশটার দিকে সদরী ইস্পাহানীর টেলিফোন।
'কি করবো কায়সার সাহেব'?
কায়সার সাহেব তাকে অভয় দিলেন।
বেলা তখন তিনটা।
বারান্দায় স্ত্রীর সাথে বসে আছেন তিনি। এমন সময় দেখলেন টুপি মাথায় একটি লোক এক দৃষ্টে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এ দেখে তাঁর স্ত্রী বললেন, 'তুমি ভিতরে যাও, দেখ না লোকটা কিভাবে তাকিয়ে আছে'।
সন্ধ্যা ছ’টা।
শহীদুল্লাহ কায়সার বসে বসে খবর শুনলেন। এক সময় চাকরকে ডেকে বললেন, 'আমার জন্য দু’টো রুটি বানিয়ো'।
শহীদুল্লাহ কায়সার প্রায়ই স্ত্রীকে বলতেন: দেখো আমাকে যে কোন সময় নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং সব সময় আমার জন্য কিছু কাগজ-কলম আর সিগারেট রেখে দেবে। আর কিছু টাকা। শহীদুল্লাহ কায়সার আরো বলতেন, 'আমি একজন সাংবাদিক। তারা আমাকে যাই করুক মারবার সাহস পাবে না।'
চাকরকে তিনি রুটি বানাবার কথা বলেছেন এমন সময় দরোজায় ধাক্কা। মিলিটারী এসেছে...।
...আলবদররা এদিকে দরজা ধাক্কাচ্ছে। তিনি বললেন, 'দরোজা খুলে দাও'। একথা বলে উপরে বেডরুমে গেলেন; স্ত্রীকে বললেন, 'শীগগীর আমাকে কিছু টাকা দাও'। বলে তিনি প্যান্ট পরতে লাগলেন। তাঁর স্ত্রী তখন বললেন, 'টাকা দিতে বলে তুমি যাচ্ছ কোথায়'?
শহীদুল্লা কায়সার বললেন, 'না, একটু ভালো পোষাক পরে নেই'।
...ইতিমধ্যে আলবদররা তাঁর বেডরুমে ঢুকে পড়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনারা কাকে চান'?
'আপনার নাম কি'? তারা (আলবদর) পাল্টা জিজ্ঞেস করলো।
'শহীদুল্লাহ কায়সার'।
সঙ্গে সঙ্গে আলবদররা তাঁর হাত ধরলো। 'আপনার সাথে কথা আছে'। বলে তারা তাঁকে বারান্দায় নিয়ে এলো।
এদিকে বাসা জুড়ে হৈ-চৈ চিত্কার। আলবদররা তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় শহীদুল্লাহ কায়সার কঠিন কন্ঠে বললেন, 'আমি তো যাচ্ছিই। আপনারা আমার হাত ধরবেন না'। এ বলে তিনি একবার পিছন ফিরে সবাইকে দেখতে চাইলেন। কিন্তু আলবদররা তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। (সেই তাঁর শেষ যাওয়া)।"
(১৪ ডিসেম্বর '৭১-এ আল-বদরদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাত্কারের ভিক্তিতে রচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অষ্টম খন্ড)
*শীতের পাখিরা শীত শেষ হলে ফিরে আসে কিন্তু শহীদুল্লাহ কায়সাররা আর ফিরে আসেন না।
**মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
বিভাগ
১৯৭১: প্রসব বেদনা
Thursday, September 30, 2010
নিধন: দানবীর নূতন সিংহ এবং জনৈক সালাউদ্দিন
দানবীর নূতনচন্দ্র সিংহ:
তাঁর একমাত্র ইচ্ছে ছিল তিনি যেনো দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারেন। সে ইচ্ছা তার পূরণ হয়েছে। দেশের মাটিতে তিনি মরতে পেরেছেন। তবে বড় নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে তাঁকে- কখনো কেউ যা কল্পনাও করেনি।
গত বছর এই ১৩ এপ্রিলে চট্টগ্রামের অদূরে নিজের হাতে গড়া কুন্ডেশ্বরী ভবনে তাঁকে হত্যা করা হয়। কুন্ডেশ্বরী বিদ্যাপিঠের প্রতিষ্ঠাতা বাবু নূতন সিংহের কথা বলছি। এপ্রিলের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম শহরের পতন হয়েছিল। ১৩ তারিখে পাক বাহিনী কুন্ডেশ্বরী আক্রমণ করে। বাবু নুতন সিংহ তখন মন্দিরে প্রার্থনা করছিলেন।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৭ জন অধ্যাপক সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে। সৈয়দ আলী আহসান, ডঃ এ আর মল্লিক, ডঃ আনিসুজ্জামান, ডঃ কোরাইশী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম থেকে আগরতলা যাওয়ার পথে জনাব এম, আর, সিদ্দিকীও কুন্ডেশ্বরীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
পাক বাহিনীর অগ্রগতির খবর শুনে সবাই কুন্ডেশ্বরী ছেড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়। বাবু নূতন সিংহকে যাওয়ার কথা বললে তিনি রাজী হননি। বলেছিলেন, যদি মরতে হয় দেশের মাটিতেই মরব। অনেক পীড়াপীড়ির পরও তাঁকে রাজী করান গেল না। এদিকে পাক বাহিনী দ্রুত এগিয়ে আসছিল। ১৩ই এপ্রিল পাক বাহিনী কুন্ডেশ্বরী ভবনে প্রবেশ করে।
ছেলেরা আগেই পালিয়ে গিয়েছিল। বাবু নূতন সিংহ তখন মন্দিরে প্রার্থনা করছিলেন। জনৈক সালাউদ্দিন তাঁকে সেখান থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এসেছিল। তাঁর চোখের সামনে মন্দিরটি উড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল নৃশংসভাবে। মেজর তিনটি গুলি করার পরও- সালাউদ্দিন রিভলবারের গুলি ছুঁড়েছিল নূতন বাবুর দিকে। তিনি লুটিয়ে পড়েছিলেন। তেমনি মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন তিন দিন।
নিজের মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে পারেননি তিনি। সেজন্যে একটা ক্ষোভ ছিল মনে। তখন রাউজান থানায় কোন বিদ্যালয় ছিল না। রাউজান থানার মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগের জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন কুন্ডেশ্বরী বালিকা মন্দির। পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিদ্যালয় ছিল এটি। শুধু রাউজান থানা নয় দেশের সব এলাকা থেকেই ছাত্রীরা যায় সেখানে লেখাপড়া করার জন্যে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ডাকঘর, সরাসরি টেলিফোন যোগাযোগ, পানির পাম্প, জেনারেটর, বাস ইত্যাদি ছিল। মোট প্রায় ২ লাখ টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে সেখানে।
*তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা ১৩ এপ্রিল, ১৯৭২ (ভাষারীতি অবিকল রাখা হয়েছে)।
** এই লেখাটাই ২০০৭ সালে একটা ওয়েব সাইটে লিখেছিলাম। তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ওই সাইটে চুটিয়ে লিখছিলাম। তো, এই লেখাটা পরে আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ বেশ ক-বছর হয়ে গেল ওই সাইটে আমি আর লেখালেখি করি না। আমার শত-শত লেখা মুছে ফেলে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম।
পরবর্তীতে ওখানে আবারও লেখা শুরু করেছিলাম, যথারীতি বন্ধও করে দিয়েছিলাম। আমার খেয়াল ছিল না কিছু লেখা ড্রাফটও করা ছিল। ভাগ্যিস, ড্রাফট করেছিলাম নইলে এই লেখাটাও আর খুঁজে পেতাম না।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিক্ষিপ্ত আকারে বিভিন্ন জায়গায় লিখেছিলাম। সবগুলোর হদিস বার করা এখনও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এটা আমার জন্য ভারী বেদনার! কারণ অন-লাইনে এখন মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য পাওয়াটা যতোটা সহজ তখন এতোটা সহজ ছিল না। খুব কম তথ্যই ওয়েব-সাইটে পাওয়া যেত। তথ্য-উপাত্ত যোগাড় করতে, একেকটা লেখা লিখতে গিয়ে কেটেছিল অনেক বিনিদ্র রজনী!
এখন আমার সাইটে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত [১] যেসব লেখা আছে, ভাল করে লক্ষ করে দেখলাম, অনেক লেখা নাই যা আমি ইতিপূর্বে লিখেছিলাম। এই বেদনার কথা কাকে বলি! তবুও মনটা অন্য রকম হচ্ছে, অন্তত কিছু লেখা তো উদ্ধার করা গেছে।
***নূতন সিংহের হত্যার জন্য দায়ী জনৈক সালাউদ্দিন...। এই জনৈক সালাউদ্দিন যে সাকা চৌধুরী এটা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। কারণ ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল রাউজানে গেলে, "নূতন চন্দ্রের ছেলে প্রফুল্ল সিংহ সাংবাদিকদের বলেন, '১৩ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সাকা চৌধুরী আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে মন্দির থেকে বের করেন। পরে তাকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় বলে শুনেছি। পাকিস্তানি বাহিনী এর আগে দুবার এসে বাবার সঙ্গে কথা বলে চলে যায়। পরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সাকা চৌধুরী এসে বলেন, 'তার বাবা (ফজলুল কাদের চৌধুরী) নূতন সিংহকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন'।'" [২] (প্রথম আলো, ২৫.০৯.১০)
****সো-কলড ইসলামের ধারক-বাহক পাকিস্তানিরা প্রার্থনারত অবস্থায় অবলীলায় একজন মানুষকে খুন করে, প্রার্থনাস্থল উড়িয়ে দেয়। আজ তাদের প্রার্থনাস্থলে বোমা ফাটে, প্রাণ বিনষ্ট হয়।
হিস্ট্রি রিপিট!
*****সাকা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, "...গঠিত ট্রাইব্যুনাল...হিন্দুপাড়ায়, শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে ফিরেছেন। সাইরেন বাজিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করতে গেছেন মনে হয়...। (কালের কন্ঠ, ২৯.০৯.১০)
শাবাশ, যোগ্য দেশের যোগ্য মরদ (!) বটে! আমাদের উচিত সাকার পদাম্বুজে চুমু খাওয়া।
******মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
সহায়ক লিংক:
১. ১৯৭১, প্রসব বেদনা: http://tinyurl.com/37wksnh
২. প্রথম আলো: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=1&date=2010-09-25
তাঁর একমাত্র ইচ্ছে ছিল তিনি যেনো দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারেন। সে ইচ্ছা তার পূরণ হয়েছে। দেশের মাটিতে তিনি মরতে পেরেছেন। তবে বড় নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে তাঁকে- কখনো কেউ যা কল্পনাও করেনি।
গত বছর এই ১৩ এপ্রিলে চট্টগ্রামের অদূরে নিজের হাতে গড়া কুন্ডেশ্বরী ভবনে তাঁকে হত্যা করা হয়। কুন্ডেশ্বরী বিদ্যাপিঠের প্রতিষ্ঠাতা বাবু নূতন সিংহের কথা বলছি। এপ্রিলের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম শহরের পতন হয়েছিল। ১৩ তারিখে পাক বাহিনী কুন্ডেশ্বরী আক্রমণ করে। বাবু নুতন সিংহ তখন মন্দিরে প্রার্থনা করছিলেন।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৭ জন অধ্যাপক সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে। সৈয়দ আলী আহসান, ডঃ এ আর মল্লিক, ডঃ আনিসুজ্জামান, ডঃ কোরাইশী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম থেকে আগরতলা যাওয়ার পথে জনাব এম, আর, সিদ্দিকীও কুন্ডেশ্বরীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
পাক বাহিনীর অগ্রগতির খবর শুনে সবাই কুন্ডেশ্বরী ছেড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়। বাবু নূতন সিংহকে যাওয়ার কথা বললে তিনি রাজী হননি। বলেছিলেন, যদি মরতে হয় দেশের মাটিতেই মরব। অনেক পীড়াপীড়ির পরও তাঁকে রাজী করান গেল না। এদিকে পাক বাহিনী দ্রুত এগিয়ে আসছিল। ১৩ই এপ্রিল পাক বাহিনী কুন্ডেশ্বরী ভবনে প্রবেশ করে।
ছেলেরা আগেই পালিয়ে গিয়েছিল। বাবু নূতন সিংহ তখন মন্দিরে প্রার্থনা করছিলেন। জনৈক সালাউদ্দিন তাঁকে সেখান থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এসেছিল। তাঁর চোখের সামনে মন্দিরটি উড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল নৃশংসভাবে। মেজর তিনটি গুলি করার পরও- সালাউদ্দিন রিভলবারের গুলি ছুঁড়েছিল নূতন বাবুর দিকে। তিনি লুটিয়ে পড়েছিলেন। তেমনি মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন তিন দিন।
নিজের মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে পারেননি তিনি। সেজন্যে একটা ক্ষোভ ছিল মনে। তখন রাউজান থানায় কোন বিদ্যালয় ছিল না। রাউজান থানার মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগের জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন কুন্ডেশ্বরী বালিকা মন্দির। পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিদ্যালয় ছিল এটি। শুধু রাউজান থানা নয় দেশের সব এলাকা থেকেই ছাত্রীরা যায় সেখানে লেখাপড়া করার জন্যে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ডাকঘর, সরাসরি টেলিফোন যোগাযোগ, পানির পাম্প, জেনারেটর, বাস ইত্যাদি ছিল। মোট প্রায় ২ লাখ টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে সেখানে।
*তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা ১৩ এপ্রিল, ১৯৭২ (ভাষারীতি অবিকল রাখা হয়েছে)।
** এই লেখাটাই ২০০৭ সালে একটা ওয়েব সাইটে লিখেছিলাম। তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ওই সাইটে চুটিয়ে লিখছিলাম। তো, এই লেখাটা পরে আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ বেশ ক-বছর হয়ে গেল ওই সাইটে আমি আর লেখালেখি করি না। আমার শত-শত লেখা মুছে ফেলে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম।
পরবর্তীতে ওখানে আবারও লেখা শুরু করেছিলাম, যথারীতি বন্ধও করে দিয়েছিলাম। আমার খেয়াল ছিল না কিছু লেখা ড্রাফটও করা ছিল। ভাগ্যিস, ড্রাফট করেছিলাম নইলে এই লেখাটাও আর খুঁজে পেতাম না।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিক্ষিপ্ত আকারে বিভিন্ন জায়গায় লিখেছিলাম। সবগুলোর হদিস বার করা এখনও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এটা আমার জন্য ভারী বেদনার! কারণ অন-লাইনে এখন মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য পাওয়াটা যতোটা সহজ তখন এতোটা সহজ ছিল না। খুব কম তথ্যই ওয়েব-সাইটে পাওয়া যেত। তথ্য-উপাত্ত যোগাড় করতে, একেকটা লেখা লিখতে গিয়ে কেটেছিল অনেক বিনিদ্র রজনী!
এখন আমার সাইটে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত [১] যেসব লেখা আছে, ভাল করে লক্ষ করে দেখলাম, অনেক লেখা নাই যা আমি ইতিপূর্বে লিখেছিলাম। এই বেদনার কথা কাকে বলি! তবুও মনটা অন্য রকম হচ্ছে, অন্তত কিছু লেখা তো উদ্ধার করা গেছে।
***নূতন সিংহের হত্যার জন্য দায়ী জনৈক সালাউদ্দিন...। এই জনৈক সালাউদ্দিন যে সাকা চৌধুরী এটা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। কারণ ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল রাউজানে গেলে, "নূতন চন্দ্রের ছেলে প্রফুল্ল সিংহ সাংবাদিকদের বলেন, '১৩ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সাকা চৌধুরী আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে মন্দির থেকে বের করেন। পরে তাকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় বলে শুনেছি। পাকিস্তানি বাহিনী এর আগে দুবার এসে বাবার সঙ্গে কথা বলে চলে যায়। পরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সাকা চৌধুরী এসে বলেন, 'তার বাবা (ফজলুল কাদের চৌধুরী) নূতন সিংহকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন'।'" [২] (প্রথম আলো, ২৫.০৯.১০)
****সো-কলড ইসলামের ধারক-বাহক পাকিস্তানিরা প্রার্থনারত অবস্থায় অবলীলায় একজন মানুষকে খুন করে, প্রার্থনাস্থল উড়িয়ে দেয়। আজ তাদের প্রার্থনাস্থলে বোমা ফাটে, প্রাণ বিনষ্ট হয়।
হিস্ট্রি রিপিট!
*****সাকা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, "...গঠিত ট্রাইব্যুনাল...হিন্দুপাড়ায়, শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে ফিরেছেন। সাইরেন বাজিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করতে গেছেন মনে হয়...। (কালের কন্ঠ, ২৯.০৯.১০)
শাবাশ, যোগ্য দেশের যোগ্য মরদ (!) বটে! আমাদের উচিত সাকার পদাম্বুজে চুমু খাওয়া।
******মুক্তিযুদ্ধের কিছু ছবি: http://71photogun.blogspot.com/
সহায়ক লিংক:
১. ১৯৭১, প্রসব বেদনা: http://tinyurl.com/37wksnh
২. প্রথম আলো: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=1&date=2010-09-25
বিভাগ
১৯৭১: প্রসব বেদনা
Subscribe to:
Posts (Atom)








