Search

Saturday, February 6, 2016

‘ডাগদর কাম ল্যাকক’।

শ্রীলংকায় জন্ম নেওয়া স্যার স্ট্যানলি ডেভিডসনের ‘মেডিসিন’ কিতাবখানা কয় কোটি বিক্রি হয়েছিল জানি না তবে বাংলায় জন্ম নেওয়া অধ্যাপক এ কে এম ডা. ফজলুল হকের এই কিতাবখানা ৫০ কোটির কম বিক্রি হয়েছে বলে অন্তত আমি বিশ্বাস করি না!
অনেকেই অবিশ্বাসে মাথা নাড়ছেন এটা আমি মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি কিন্তু আমি আঁক কষে বলে দিতে পারি।

২৩ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। প্রত্যেকে মাথাপিছু ৪-৫টা করে এই কিতাব ক্রয় করলে ৫০ কোটি কী খুব একটা বড় অংক, একশ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়াও বিচিত্র কিছু না। কামানের গোলার ন্যায় কেউ-কেউ এই প্রশ্নটা ছুড়ে দেবেন ডা. ফজলুল হকের এই কিতাব কেন প্রত্যেকে ৫ কপি করিয়া খরিদ করিবে?

আহা, এও আমাকে বলে দিতে হবে বুঝি! একটা থাকবে স্টাডিতে সাজিয়ে রাখার জন্য। আরেকটা শোয়ার ঘরে। এই কপিখানা পেটের উপর পা রেখে, না-না, ভুল বললাম; পেট ভাসিয়ে দেওয়ালের উপর পা রেখে পড়ার জন্য। অন্যটা সঙ্গের ঝোলায় সর্বদা থাকবে, বাসে-ট্রামে-যানজটে পড়ার জন্য।
বইটার নাম যেহেতু ‘পাইলস, ফিস্টুলা, কোষ্ঠকাঠিন্য, আমাশয় ও ক্যান্সার’ তাই টাট্টিখানায় একটা বই থাকবে না তা কী হয়! আরেকটা বই কেউ ‘হুদাহুদি’ কিনলে আটকাচ্ছে কে? এই কারণে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক মহোদয় ‘উস্কানি কিতাব’ ক্রয় করার অপরাধে সিপাহি লেলিয়ে দেবেন এমনটা শত্রুও বলবে না।
এমনিতে এই সমস্ত বইকে বই বলার নিয়ম নেই সম্ভবত, গ্রন্থ বলাটাই সমীচীন।
এই ডাগদর সাহেবের ‘পাইলস, ফিস্টুলা, কোষ্ঠকাঠিন্য, আমাশয় ও ক্যান্সার’ গ্রন্থখানার বিজ্ঞাপন আমাদের দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিকগুলোতে বছরজুড়ে প্রকাশিত হয় ডাগদর সাহেবের ছবি-মোবারক, কালো গোঁফসহ। দিনের-পর-দিন নিয়ম করে যে-হারে বিজ্ঞাপন ছাপা হয় এতে করে এই ধারণাটা দোষের হবে না যে এপার-ওপার বাংলা মিলিয়ে এমন বইয়ের বিক্রির রেকর্ড অন্য আর কারও নাই।

এমনিতে বছরজুড়ে দূরের কথা হাতে গোনা কয়েক প্রকাশনী ব্যতীত অন্যরা ফেব্রুয়ারির বইমেলা ব্যতীত বই প্রকাশ করেন না! বইমেলা এলেই বই ছাপার হিড়িক শুরু হয় এবং তথাকথিত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকগণ অমার্যাদার সঙ্গে নিজেদের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেরাই দেন [১]। ওরে, এটা তো কথাসাহিত্যিকদের বেলায় ইনি তো কথাসাহিত্যিক নন যে নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেই দেবেন।
অবশ্য ডাগদর সাহেবের লেখা চটি টাইপের এই জিনিষ কোন প্রকাশনী প্রকাশ করেছে এটা আমি বিস্তর চেষ্টা করেও উদ্ধার করতে পারিনি। নিজের চেম্বার নামের টাকার খনির বিজ্ঞাপনের ভাল একটা উপায় বের করেছেন যাহোক!
(এই ডাগদর সাহেবকে নিয়ে পূর্বেও লিখেছিলাম [২]। এমন বিচিত্র ডাগদর আমাদের দেশে বিরল)

সহায়ক সূত্র:
১. সবই পেশা কিন্তু…: http://www.ali-mahmed.com/2011/02/blog-post_12.html
২. হর্স-মাউথ: http://www.ali-mahmed.com/2015/02/blog-post_19.html

Thursday, February 4, 2016

একালের খেলোয়াড়, মহোদয়গণ!

একজন কবি জীর্ণ ছালের আড়ালে ‘কায়কাউসের ছেলে’ নামে কেবল বিস্তর আবর্জনাই উৎপন্ন করেননি এক ধরনের সামাজিক অপরাধও করেছিলেন। কী জানি, বা হতে পারে এর মাথায় গোলমাল ছিল!
নইলে এই লোক কবিতার নামে এটা লেখে কেমন করে “…রবীন্দ্রনাথকে থাপড়াইলাম…তার ওপর মূত্র বিসর্জন করিলাম…।“ এ আবর্জনা-মাস্টারের সঙ্গে আমার মতো মানুষের জানাশোনা হতো না যদি-না প্রথম আলো ‘জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার’-এর নামে একে জন্তু থেকে মানুষের ভুবনে নিয়ে আসত।
অন্যত্র এক লেখায় যেটা আমি লিখেছিলাম:
"আচ্ছা, এই ইতর যেভাবে রবীন্দ্রনাথের নাম ব্যবহার করেছে সেই নামের স্থলে প্রথম আলোর সর্দারদের কারও নাম বসিয়ে দিলে কেমন হয়"?
এই সব স্যারদের কে বোঝাবে সব আবেগ নিয়ে খেলা করা চলে না, যা-ইচ্ছা তা লেখা যায় না। লিখলে সেটা হয় ‘কুতুয়াসাহিত্য’!

সম্প্রতি একজনের বদৌলতে আরিফ আর হোসেন নামে একজনের একটা ‘ইসটাটাস’ পড়ার দূর্ভাগ্য হয়েছে আমার। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, “হাতের ঝাড়ুই হবে অস্ত্র...এখন লাগবে কিছু মুক্তিবাহিনী…।”
লেখাটায় ভাল একটা উদ্যোগের কথা তিনি লিখেছেন সে ভাল কথা কিন্তু ঝাড়ু হবে অস্ত্র…এখন লাগবে কিছু মুক্তিবাহিনী, এই সব লিখতে হবে কেন?

এখন এই একটা নতুন ফ্যাশন চালু হয়েছে প্রয়োজন থাকুক বা না-থাকুক আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যে-কোনও প্রসঙ্গে নিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর কথা বলে লাভ নাই কারণ এদের ভাব দেখে মনে হয় সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাই কোনও-না-কোনও দলের সঙ্গে জড়িত! এর বাইরে কেউ নাই, কিচ্ছু নাই।

তো, স্যারদের বিনীত ভঙ্গিতে বলি, মুক্তিযুদ্ধ কোনও খেলা ছিল না! এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের স্বজনদের অবিরাম রক্তের স্রোত। অন্য ভুবনের সহ্যাতীত যন্ত্রণা! দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করা যায় না এমনসব কষ্ট! একটা পরিবারের ২৫ জনকে খুন করা হয়েছে ওই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে সাদী মহাম্মদ [১] নামের যে শিশুটি বেঁচে গিয়েছিল তাঁর চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা আমাদের কোথায়?

একজন মশিহুর রহমানকে [২] পাকিস্তানিদের স্বপক্ষে সই করাবার জন্য চাবুক মেরে মেরে গায়ের চামড়া খুলে ফেলা হয়েছিল। একে-একে কেটে ফেলা হয়েছিল হাত-পা তবুও তিনি সই করেননি! আমরা, এই প্রজন্মের এই ত্যাগ বোঝার মত মগজ কোথায়?  
ঠিক ১৬ ডিসেম্বরেই মুক্তিযোদ্ধা সুরুয মিয়া [৩] আত্মহত্যা করেছিলেন, কেন? এটা জানার আগ্রহ কোথায় আমাদের!

একজন উক্য চিং [৪]। যিনি ১৯৭১ সালে পাকআর্মির দ্বারা আমাদের নারীদের সম্ভ্রমহানীর প্রতিবাদে পাক-কমান্ডারসহ তার সহযোগীদের পুরুষাঙ্গ কেটে প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে রেখেছিলেন। এমন বীরকে আমাদের শিশুদের সামনে উপস্থাপন করার সদিচ্ছাই বা কোথায় আমাদের?
ইতিহাসের পাতায় বড়ো ম্লান ভাগিরথী [৫], রীনা [৬], প্রিনছা খেঁ [৭]। একজন দুলা মিয়ার [৮] শেষশয্যার খোঁজও আমরা পাই না। এমন কতশত উদাহরণ লিখে শেষ করাও যে যো নেই।

অথচ এখন এদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধা যেন একটা খেলার বিষয় হয়ে গেছে। যে যেমন করে পারছে, ইচ্ছা করছে...। এরা এটা বুঝতে চাইছে না যে-সমস্ত আবেগে আমরা থরথর করে কাঁপি সেই সমস্ত আবেগ নিয়ে খেলা করা চলে না।
আজ কেউ খেলাচ্ছলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ঝাড়ু ধরিয়ে দিচ্ছে কাল অন্য কেউ দু-চার জন বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কাঠের থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের ডামি ধরিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করবে। সাহেবসুবোরা দেদারসে লাল পানি গিলে এসে উল্লাসভরে সেই প্রদর্শনী দেখবেন। হলুদ দাঁত বের করে পেটকাঁপানো হাসির উল্লাসে বলবেন, "ওয়াও, হোয়াড আ মুক্টিজুড্ডা..."।

সহায়ক সূত্র:
১. সাদী মহাম্মদ: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/1971.html
২. মশিহুর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html
৩. সুরুয মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_28.html
৪. উক্য চিং: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8752.html
৫. ভাগিরথী: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_6057.html
৬. রীনা: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_7644.html
৭. প্রিনছা খেঁ: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_27.html
৮. দুলা মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_08.html 

Saturday, January 30, 2016

হানিফ সংকেত- অন্ধতমিস্র, আঁধারের শিক্ষক!

হানিফ সংকেত নামের মানুষটা ফজলে লোহানির হাত ধরে এই আলোকিত ভুবনে এসেছিলেন। ফজলে লোহানি অজানার দেশে চলে যাওয়ার পর এই মানুষটাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রমশ একলা-একলি এক আলোকচ্ছটায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন। এরপর তো ইতিহাস!

কায়দাদুরস্ত হানিফ সংকেত তাঁর ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে বছরের-পর-বছর ধরে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, এখনও! কালে-কালে তিনি নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠলেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ অভূতপূর্ব! এই প্রজন্মের একটা স্যালুট তিনি পাওনা হন এতে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু এই করে করে বছরের-পর-বছর কেমন করে পার করে দিলেন এটা দেখে স্যালুটটা ফিরিয়ে নেওয়াটা দোষের হবে বলে মনে করি না।
এমনিতে হেন কোনও অসঙ্গতি নেই যা নিয়ে কটাক্ষ করা তাঁর অনুষ্ঠানে উঠে আসে না। এন্তার অসঙ্গতি নিয়ে তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দেন। ফাঁকে-ফাঁকে নাচ-গান তো আছেই। এটা ফ্রি, ডাল ফ্রি (আগের আমলের)।

কত বছর পূর্বে ইত্যাদি অনুষ্ঠানে ‘হোটেল সালাদিয়া’ নামের এই গানটা শোনা হয়েছিল মনে নেই। বহু বছর পর Download Free24-এর কল্যাণে গানটির খোঁজ পাওয়া গেল, কৃতজ্ঞতা।
যথারীতি হানিফ সংকেত জানাচ্ছেন গানটা লিখেছেন লিটন অধিকারী রিন্টু এবং গেয়েছেন সান্টু। রিন্টু-সান্টু, সান্টু-রিন্টু, সান্টু-সান্টু-সান্টু, রিন্টু-রিন্টু-রিন্টু 'ইত্যাদি' অনুষ্ঠানে ঘুরেফিরে আমরা রিন্টু এবং সান্টুর নামই শুনে এসেছি। ভাগ্যিস এই ধরায় সান্টু-রিন্টু এসেছিল নইলে সর্বনাশ হয়ে যেত!

এ আরেক একলসেঁড়ে-অসামাজিক ভাবনা! হানিফ সংকেতের অভিধানে এই দেশে রিন্টু এবং সান্টু ব্যতীত গায়ক, গীতিকার নাই! সবাই বানের জলে ভেসে গেছে? বা হিমালয় পর্বতে চলে গেছে বাথরুম করার জন্য। আফসোস, বড়ই আফসোস- এই দেশ কবে পরিবারতন্ত্র-স্বজনপ্রীতি থেকে বেরিয়ে আসবে কে জানে! যাই হোক, আমরা হোটেল সালাদিয়া গানটা শুনি:
সূত্র: Download Free24 (https://www.youtube.com/watch?v=yzMzyWzIGCo)

বেশ-বেশ, কেটে গেলে মুগ্ধতার রেশ, এখন আমরা তাহলে ইগলসের অসাধারণ অসম্ভব বিখ্যাত ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ গানটার কথা আলোচনায় নিয়ে আসি। যে-গানটি কোটি-কোটি শ্রোতাকে এমনই আলোড়িত করেছিল যে এই গান নিয়ে গুজবের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এমন ডালই না মেলেছিল যে সেখানে রোদ ঢোকারও উপায় ছিল না। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। তারচেয়ে বরং গানটা শোনা যাক:

হায়, এরা তো ভাল করে চুরি করাও শেখেনি!  বটে রে, এহেন চৌর্যবৃত্তির জন্য আবার সুরকার গায়কেরও প্রয়োজন দেখা দেয়? যে মানুষটা ক্ষণে ক্ষণে নীতিকথা কপচান সেই মানুষটাই যখন ‘দিন দাহাড়ে’, এর বাংলা হবে দিন-দুপুরে চোখ ধাঁধানো আলোয় আয়োজন করে বছরের-পর-বছর ধরে এমনতরো কর্মকান্ড চালিয়ে যান তখন বুকের গভীর থেকে বেদনা পাক খেয়ে উঠে, এই দেশে আমাদের দাঁড়াবার জায়গার বড়ো অভাব...! 

*কেবল হানিফ সংকেতই না এমনতরো চুরি-চামারি চলেই আসছে এমন না। যেমন আরেকজন জাকারিয়া স্বপন []। 
হানিফ সংকেত, জাকারিয়া স্বপন এরা যে বিষবৃক্ষ রোপণ করেন যথারীতি সেই গাছে ফল ধরে পেকে টসটস করে। এরাই তৈরি করছেন নষ্ট এক প্রজন্ম। তখন আর চুরির বালাই থাকে না জন্ম নেয় একেকটা আস্ত ডাকাত। কচু গাছ কাটতে-কাটতে ডাকাত!

অন্যদের কাছে কালো-কালো, দুবলাপাতলা-লিকলিকে হলেও আমার লেখা আমার কাছে সন্তানসম। আমার নিজের সন্তানদের পরিচয় দিতে হবে এই চোর-ডাকাতদের কাছে []? মরণ!

সহায়ক সূত্র:
১. ডিয়ার, তোমাকে কী ডাকাত বলতে পারি: https://www.ali-mahmed.com/2015/02/priyocom.html
২. ডাকাতচুঞ্চু http://www.ali-mahmed.com/2015/10/blog-post_29.html

... ... ...
আমি কেবল একটা চুরির প্রমাণ দিলাম। এই মানুষটার বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য চুরির অভিযোগ আনা যাবে। কালে-কালে এই মানুষটার মাত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাত্র একটা আইডির ফলোয়ারের সংখ্যা ৫০ লক্ষ প্লাস!
 
 

Monday, January 25, 2016

স্মৃতি, কেবল স্মৃতিই বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে।

অতিথি লেখক Fakruddin Shahriar  লিখেছেন:
"চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিকথা বলা হবে আর ইউনিভার্সিটির সেই বিখ্যাত ট্রেনের কথা আসবে না তা কী করে হয়! তো, ইউনি'র সেই বিখ্যাত ট্রেন নিয়ে কিছু হালকা স্মৃতিচারণ করা যেতেই পারে। বিখ্যাত সেই ট্রেনের নান্দনিক কোনও বর্ণনা দেয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না। চবি'র প্রতিটা ছেলে-মেয়ের হৃদয়েই আঁকা আছে বিখ্যাত এই ট্রেনের ছবি।

একবার আমাদের বন্ধুর এক কাজিন, যে কিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে একটু নাক উঁচা ভাব নিয়েই সকালবেলা আমাদের সঙ্গেই ট্রেনে রওনা হয়েছিল চবি দেখবে বলে…। বিকেলবেলা শহরে আসার পর এই মানুষটারই আফসোসের সীমা ছিল না কেন সে চবি'তে ভর্তি হয়নি!
তখন আমি সেকেন্ড ইয়ারে, ট্রেনের মজা কিছুটা থিতিয়ে এসেছে। আমার ছোট ভাই সবেমাত্র চবি তে ভর্তি হয়েছে। ওর কাছে ট্রেনের মজা তখনও নতুন। সেই সময়ে আমার বাবা প্রথমবারের মতো জাপান সফরে যান এবং সফর শেষে সবে ফিরে এসেছেন। তো, বাসার সবাই, মামা-চাচারা সহ আব্বার জাপান সফরের গল্প শুনছি। বিশেষ করে জাপানের বিখ্যাত বুলেট ট্রেনে আব্বার ভ্রমণের গল্প। জাপানের বুলেট ট্রেন সেই সময়ে সবেমাত্র সার্ভিসে এসেছে এবং যখারীতি বিশ্বের দ্রুততম ট্রেন।

আমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে আব্বার বুলেট ট্রেনে চড়ার গল্প শুনছি, গল্পের মাঝেখানেই দুম করে ছোট ভাই আব্বার কাছে জানতে চাইল তিনি কখনো চবি'র ট্রেনে চড়েছেন কিনা? আব্বা বললেন, উনি চবি'তে বেশ অনেকবারই গিয়েছেন তবে গাড়িতে করে, ট্রেনে করে যাওয়া হয়নি। ছোটভাইয়ের সোজা জবাব, ‘তাহলে তো তোমার ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতাই পূর্ণ হয় নাই’!

যাই হোক, আমাদের সময়ে চবি ট্রেনের অনেকগুলো গ্রুপ এর মাঝে সবচেয়ে নামকরা গ্রুপটা ছিল 'খাইট্টা খা' গ্রুপ। ট্রেনে যাওয়া-আসার পথে এদের দেয়া বিনোদন তুলনাহীন, সত্যি বলতে কি প্রতিভা একেকটা! এই গ্রুপের বিখ্যাত গান, কবিতার নমুনা এমন:
'আমার সুখ নাই রে সুখ পরানের পাখি,
আঠারোটা বিয়া করলাম জেলায় জেলায় ঘুরি।
পরথমেতে বিয়া করলাম জেলা নোয়াখালি,
বউ আমার ভাল লাগেনা ভাল লাগে শালী।
তারপরেতে বিয়া করলাম জেলা চিটাগাং,
বউ আমার কথা শোনে না করে চটাং চটাং।
তারপরেতে বিয়া করলাম...।'
যাই হোক, সে এক লম্বা লিস্ট। আর বেশ কিছু বিখ্যাত (!) কবিতা কাম ছড়ার একটা ছিল: 
'ওগো প্রিয়তমা,
তুমি দাড়ি আমি কমা।
তুমি মশা আমি মশারী
তুমি ডাইল আমি খেশারি।
তুমি খাতা আমি কলম
তুমি ব্যথা আমি মলম।
তুমি সাগর আমি মাছ
তুমি পাহাড় আমি গাছ।
তুমি চা আমি কাপ
তুমি মা আমি ...!'
দিস লিস্ট গোওজ অন, প্রতিভা বটে একেকটা! এই স্মৃতির তালিকা্ আরো অনেক লম্বা। এবেলা বিলেতে এসে থিতু হয়েছি ট্রেনের জবে এবং বিশ্বের অনেক ধরনের ট্রেনেই চড়ার সৌভাগ্য হয়েছে তবুও মাঝে -মাঝে খুব মিস করি প্রিয় চবি'র অতি প্রিয় লক্কর-ঝক্কর সেই ট্রেনটিকে। স্মৃতি, আহ স্মৃতি…। "

‘এক গেলাসের ইয়ার’!

এই সরকারের অর্জন বলে কিছু নেই এটা বলাটা অতিশয়োক্তি হয়ে যায়! কিন্তু এরা মাঝে-মাঝে এমন কিছু কর্মকান্ড করে বসবে যার কারণে অর্জনের কফিনে পেরেক ঠোকাই সার। পুলিশ ব্যাংক কর্মকর্তা রাব্বীকে পিটিয়ে মাদকব্যবসায়ি বলে ক্রসফায়ারের আতংকেও রেখেছিল। নাটের গুরু পুলিশ কর্মকর্তা এস আই মাসুদ শিকদারকে প্রচলিত আইনে শাস্তি দিলেই হয় তা না ঘটা করে আবার আইজিপি সাহেব বক্তব্যও রাখেন,‘রাব্বী ফৌজদারি অপরাধ করেছেন’। এই সমস্ত কর্মকান্ড দেখার কেউ নেই!
এক পা লিমনের বিরুদ্ধে আমরা গোটা রাষ্টযন্ত্রের কামান তাক করে থাকতে দেখেছি অথচ এর কোনও প্রয়োজন ছিল না আদৌ! ভুলের খেসারত দিলেই হতো…। বা হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে সন্তান-স্বামীর সামনে ফের যৌন নির্যাতন করা হয় যে গৃহবধুটিকে,তাঁর চোখ চোখ রাখার ধৃষ্টতা কার আছে এই দেশে?
এটা সবাই বিলক্ষণ জানে আইনের শাসনের বালাই নেই। ২৮ বছর চলে গেছে চট্টগ্রাম গণহত্যার এখনও বিচার হয়নি, ভাবা যায়? এখন এই বিচার হলেই কি না-হলেই কী!

হালে যে ঘটনাটা ঘটে গেল এমনধারা ঘটনায় ভেসে যায় পদ্মা সেতু! আসাদগেট নিউ কলোনির বাসিন্দাদের ঘরের ভেতর রেখেই ভবনগুলো ভাঙ্গা শুরু হয়। একেক করে ভবনগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়। কোনও গণতান্ত্রিক দেশে এমন অসভ্য কান্ড ঘটতে পারে এটা আমার কল্পনাতেও আসে না। আমি চোখ বন্ধ করে কেবল খানিকটা ভাবার চেষ্টা করতেই গা হিম হয়ে আসে। কারও বাচ্চা স্কুলে গেছে, পরিবারের কর্তা যথারীতি চলে গেছেন অফিসে বয়স্করা রয়ে গেছেন বাসায়; এমতাবস্থায় তাঁরা দেখলেন তাঁদের বসতবাড়ি গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে! শপথ আমার লেখালেখির, সমস্ত ভাবনা গুলিয়ে আমার মস্তিষ্ক স্রেফ জমে যায়। গুছিয়ে লেখার অভ্যস্ত হাত খেই হারিয়ে ফেলে…।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৬
দৈনিক প্রথম আলো অসাধারণ একটা প্রতিবেদন ছাপিয়েছে, ‘ভেতরে মানুষ, বাইরে হাতুড়ির ঘা’ (বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৬)। এই প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে: ”বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে ভবন ভাঙ্গা হয়েছে…বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, নিউ কলেনি সোসাইটি ভবন ভাঙ্গার বিষয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ আছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এ বিষয়ে ১৮ জানুয়ারি শুনানি হওয়ার কথা ছিল। সেই শুনানি পিছিয়ে ২১ জানুয়ারি ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ আদালতের আদেশ অমান্য করে ভেঙ্গেছে…।“

“বাসিন্দারা অভিযোগ করেন”, “বাসিন্দারা অভিযোগ করেন”, “বাসিন্দারা অভিযোগ করেন”, বেশ-বেশ, বাসিন্দাদের অভিযোগ থেকে আমরা জানলাম ভবন ভাঙ্গার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা ছিল। যে-কোনও অভিযোগ যে-কেউ করতেই পারেন কিন্তু পাঠকের এটা জানার উপায় নেই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে। এটা সত্য, কোনও সংবাদমাধ্যম কোনও প্রতিবেদনে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে না কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির কারণে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কাগজ এখানে স্ক্যান করে দিয়ে দেওয়াটাই সমীচীন ছিল।
স্পষ্টত এটা আদালত অবমাননা। এবম্প্রকার এহেন আদালত অবমাননা শাস্তিযোগ্য অপরাধ কি না সেটা আদালতের বিবেচ্য বিষয়।

অবশ্য এই সমস্ত পত্রিকার সংবাদের গুরুত্ব বোঝার আদৌ ক্ষমতা আছে কি না এটা গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নও বটে। এবং এটা বোঝার জন্য নাসায় সিভি পাঠাবার প্রয়োজন পড়ে না। দৈনিক প্রথম আলো এই দিন এই সংবাদটি ছাপিয়েছে ভেতরে ৯ পৃষ্ঠায় এবং এই দিনই প্রথম পৃষ্ঠায় ঢাউস ছবি দিয়ে ছাপিয়েছে ‘হলুদ বাটো মেন্দি বাটো’।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৬
এটা হচ্ছে এদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন! এই হচ্ছে দেশের অগ্রসর একটা দৈনিকের নমুনা যারা ঘটা করে আমাদের শপথ করায়, দেশের আপামর জনতাকে বদলে দেওয়ার জন্য ‘গুছলেংটি’ খুলে -মুক্তকচ্ছ-কাছা খুলে নগ্ন হয়ে পড়ে। পত্রিকাটির ভেতরের ১৬ পৃষ্ঠার 'বিনোদন পাতায়' এটা ছাপালে এই পত্রিকার সর্দারদের কী পাঠক আহাম্মক বলত?
অথচ এদিনই ‘অধুনা’ নামে বাড়তি চার পাতায় মাহিয়া মাহির সুন্দর জীবন থেকে শুরু করে হাবিজাবি জিনিষে ঠাসা। ওখানে আমরা জানতে পারছি মাহিয়া মাহির প্রিয় খাবার ‘গরুর কালা ভুনা’। মাহিয়া মাহি গরুর কালা ভুনা, না কালা গরুর ভুনা খাবে নাকি তিমি মাছের ঝোল বা বাঘের দুধের পায়েস সেটা মতি ভাই বিশদ আকারে ছাপাবেন তাতে তো কোনও সমস্যা নেই। এখানেও কী ছাপাবার জায়গার আকাল হলো?

পত্রিকা চালনেো কম হ্যাপা না, খরচের বিষয়টা যে একেবারে বোধের বাইরে এমনও না কিন্তু তাই বলে...বাপু রে, আপনারা সবাই ‘এক গেলাসের ইয়ার’ সে নাহয় বুঝলুম তা শরীরে না সইলে এক পাত্র কম খেলে হয় না?

Saturday, January 9, 2016

ভোট-ম্যাজিক!

পত্রিকায় এসেছে এবারের পৌরসভা নির্বাচনে আ.লীগের ভোটের রেকর্ডে বিশ্লেষকেরা বিস্মিত! দলটি অনেক পৌরসভায় ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছে। কোথাও কোথাও যেমন সন্দ্বীপে পেয়েছে ৯৮ শতাংশ, কাজীপুর ৯৭, গফরগাঁও ৯৬...। বিশ্লেষকেরা অল্পতেই বিস্মিত হন। এতে বিস্মিত হওয়ার কী আছে- কোথাও তো আর ১০০ শতাংশ ভোট পাওয়ার উদাহরণ নাই। অতএব মামলা ডিসমিস।
অবশ্য আমার এখানে ভোট পাওয়ার গড় প্রায় ৮০ শতাংশ দেখে আমি মর্মাহত!

এমনিতে আমার এখানেও চমৎকার(!) ভোট হয়েছে। ভোট দিতে যাওয়ার পূর্বেই আমাকে ‘অভিজ্ঞ হেডমাস্টার’ টাইপের লোকজনেরা বললেন,‘যাইয়েন না’। হুশ-হুশ, বললেই হলো। আমি ‘দায়িত্ববান পুরুষ’(!) না-হতে পারি কিন্তু দায়িত্ববান নাগরিক হতে সমস্যা কোথায়!
গেছি ভোট দিতে। ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘আক্কাড়-পাক্কাড়’-অস্ত্রশস্ত্রের অভাব নাই, অভাব নাই মিডিয়ার লোকজনেরও। সেনাবাহিনী ব্যতীত সব বাহিনীর লোকজনেরাই এখানে আছেন। দেখে আরাম, চোখেরও আরাম। আগের দিন সন্ধ্যায়ও সমস্ত এলাকা জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবাই মিলে বেশ একটা মহড়া দিয়েছেন, যা হোক। আমার মত নিরীহ লোকজনেরা স্বস্তির শ্বাস ফেলেছে। হুঁ-হুঁ বাওয়া, আইনের বাইরে কিছু হলেই, ক্যাঁক, ক্যাঁক-ক্যাঁক-ক্যাঁক…।
তার উপর ভোটার তালিকা ছবিযুক্ত- একজনের ভোট অন্যজন দেবে সেই সুযোগ নাই।

তো, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা মানুষটা যখন আমাকে বললেন, ’আপনার ভোট তো দেওয়া হয়ে গেছে’, তখন আমি আকাশ থেকে পড়লাম। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে আমি তাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখালাম। এটা তাকে তাচ্ছিল্য করার জন্য না আঙ্গুলে অমোচনীয় কালি যে নেই সেটা দেখাবার জন্য। ওয়ালেট থেকে আইডিও বের করলাম। মানুষটা যে হৃদয়বান(!) এতে অন্তত আমার কোনও সন্দেহ নেই। তিনি বললেন,’এক কাজ করেন এই নামটা ফাঁকা আছে এই ভোটটা আপনি দিয়ে দেন’। আমি ওপথ মাড়াবার আগ্রহ বোধ করলাম না। এবং এই নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে গেলাম না কারণ জায়গাটা গরম। জাল ভোট দিতে এসেছি এটা বললে আটকাচ্ছে কে? ‘জাল ভোট প্রদানকারী’ লিখে গলায় ঝুলিয়ে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল আর মিডিয়া এসে ফটাফট ছবি তুলে ছাপিয়ে দিলে তখন আমার পাঠকরাই বলবেন: লোকটাকে তো ভালই জানতুম; ছি-ছি, ব্যাটার এই ছিল মনে! তবুও, তবুও যে-কোনও উপায়ে পত্রিকায় ছবি ছাপা হওয়াটা আমার মত মানুষের জন্য গর্বের কিন্তু কেন যেন আমি উৎসাহ বোধ করলাম না।

ভোট তালিকার ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী আমার মা'র ভোট নম্বরও পাশাপাশি। সেটায়ও দেখি টিক চিহ্ন দেওয়া। আমি ওখানে আঙ্গুল রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি হড়বড় করে বললেন,’অ, এইটা, তিনি তো অনেক আগেই ভোট দিয়ে চলে গেছেন’।
আমার মা ভোট দিয়ে চলে গেছেন এতে আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু আমি বিমর্ষ হলাম, দুঃখিত হলাম। কারণ তিনি ভোটও দিলেন চলেও গেলেন অথচ আমাদের কারও সঙ্গে দেখাটিও করলেন না, আমার সঙ্গেও না! আমার চেয়ে ভোট বড় হলো, কী কষ্ট-কী কষ্ট! এই কষ্টের কথা কাকে বলি! হায় মর্ত্যুকাম!

পাদটীকা: বিখ্যাত কোনও লেখক লেখাটা এখানেই শেষ করতেন। পাঠকও নিমিষেই লেখার মরতবা বুঝে ফেলতেন। কারণ বিখ্যাত মানুষদের বানিয়ান-চাড্ডির খবর সবার জানা বা পরিবারের লোকজনের খবরাখবর মায় পোষা বেড়াল কুত্তাটার খবরও।
তাই আমার মত অতি অখ্যাত মানুষের এটা জানানোটা জরুরি হয়ে পড়ে যে আমার মা মারা গেছেন বছর তিনেক পূর্বে…।

Tuesday, December 15, 2015

একজন ফয়সল আরেফিন দীপন…!

সালটা ২০০৩। তখন কেবল মাত্র আমার ২টা উপন্যাস বেরিয়েছে- ৯২ সালে অনন্যা থেকে আর ৯৫ সালে কাজী আনোয়ার হোসেনের প্রকাশনী থেকে। ৯৩ সালে বাংলা একাডেমির (এঁরা আমাদেরকে পরামর্শ দেন একাডেমি লিখতে কিন্তু নিজেরা লেখেন একাডেমী) ’উত্তরাধিকার’-এ আমার যে উপন্যাসটা ছাপা হলো [১] সেটা নিয়ে আমি বিপদে পড়ে গেলাম। কারণ তখন বাংলা একাডেমি ব্যতীত অন্য কোথাও ‘উত্তরাধিকার’ পাওয়া যেত না যা ছিল একেবারেই পাঠকের নাগালের বাইরে। আর পাঠক না-পড়লে লিখে কী হয়? লেখার প্রয়োজনটা-বা কী! সব বুঝলুম রে বাপ, কিন্তু ছাপাবে কে?
আহা, আমি তো সেইসব মহান লেখক না যে আলাদা একটা ভঙ্গি করে বলব, ওরে, আমি তো কেবল আমার নিজের জন্য লিখি, রে পাগলা। শোনো কথা, লেখালেখি নামের বাড়িটা পড়ার নাম করে পাঠক ছুঁয়ে না-দিলে ওটা যে-এক নিষ্প্রাণ ভুতুড়ে বাড়ি! এমন একটা বাড়িতে আমার কী কাজ- ওখানে তো বাস করবে ‘ভুতলেখক’? ভুতলেখক হওয়ার গোপন কোনও ইচ্ছা আমার ছিল না, আজও নাই। তাই দৌড়াদৌড়ি...!
আরেকটা মধুর বিপদের কথা না-বললেই নয়। সেটা হচ্ছে বাংলা একাডেমি আমাকে তখন সম্মানী দিয়েছিল ২০০১ টাকা। এই ১ টাকার মরতবা বুঝিনি। কাকে জিজ্ঞেস করব? এই ১ টাকা কেন, বাদাম খাওয়ার জন্য []! 

যাই হোক, তখন সুতীব্র ইচ্ছা বাংলা একাডেমির সেই উপন্যাসটা বই আকারে বের হোক কিন্তু কোনও প্রকাশক এটা ছাপাতে চাচ্ছিলেন না, কারণ…? ইতিমধ্যে বিচিত্রসব অভিজ্ঞতা হলো। কোনও প্রকাশক 'দুধেল লেখক' ওরফে হুমায়ূন আহমেদের জন্য মোষের দইয়ের নিমিত্তে মোষ কিনতে বাজারে গেছেন। তো কেউ বলছেন, টংকা ওরফে ট্যাকাটুকা দেন। শ্লা, মনে হচ্ছিল এটা বাংলা বাজার না, ঠাঠারি বাজার! একেকটা মাংসের কারবারি!
এমনকি 'দিব্য প্রকাশের' মইনুল আহসান সাবের পর্যন্ত বলে বসলেন, 'আমরা অথরের ফিন্যান্স ছাড়া বই প্রকাশ করি না’। 
বটে রে, তাহলে মননশীন-সৃজনশীল-‘চলনশীল’ বুলি কপচাবার প্রয়োজন কী, হে? যাই হোক, এরপর আর লেখালেখি নিয়ে কথা চলে না!

এভাবে বছরের-পর-বছর গেল। একজন লেখক, তিনি কোনও এক প্রকাশনীকে বলে-কয়ে বইটা ছাপাবার ব্যবস্থা করবেন বলে আমাকে দিনের-পর-দিন ধরে আশ্বাস দিয়ে গেলেন। হায়, সরকারি প্রেসনোটের মতই মিথ্যা তার আশ্বাস। পরে বুঝেছি তার আশ্বাস আর ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মধ্যে আদৌ কোনও পার্থক্য নাই। কালে-কালে তিনি যে চালবাজ একটা লেখক হয়ে উঠলেন শেষে তা প্রমাণ করেই ছাড়লেন। খোকা যখন বড় হলো—পাল্লা দিয়ে স্মাদের এই লেখকও বড় হলেন, অনেক!  
এমনিতেও আমার জেদ চেপে গেল, দেব না, কোনও প্রকাশককে একটা অচল আধুলিও দেব না। আধুলি দূরের কথা- 'চাইর আনাও দোব না'! কেন দেব, রে পাপিষ্ঠ! এমন অমর্যাদা মাথায় নিয়ে পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড়াবার প্রয়োজন কী আদৌ! কী হয় এমন ছাতার লেখালেখি না করলে…!
এই আলোকিত ভুবনের অন্ধকার দিকগুলো আমার ভাল লাগছিল না। নিতল অন্ধকারের শেষ মাথায় কোথাও-না-কোথাও এক চিলতে আলো থাকে, থাকেই…।

এতক্ষণ এই ভনিতার কারণটা বলি। একজন প্রকাশক ২০০৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ওই লেখাটা নিয়েই 'নিশিগন্ধা' বইটা বের করলেন। সেই মানুষটাই 'জাগৃতি প্রকাশনীর' ফয়সাল আরেফিন দীপন।
এদিকে আমি অতি আনন্দের সঙ্গে বইটা উৎসর্গ করলাম সেই চালবাজ লেখককে। বইয়ের ভূমিকায় লিখলাম:
"মি. এক্স। সেই লেখক, যিনি মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এক বছর আমাকে লাটিমের মত বনবন করে ঘুরিয়েছেন। আপনি হয়তো একজন ভাল লেখক- আই বেট, ভাল মানুষ নন। গড ব্লেস ইউ!"
এই লেখককে গড ভালই ব্লেস করলেন, করেন। হয়তো গড থাকেন এই সব মেকি মানুষদের 'ভদ্দরনোকপল্লীতে' ওরফে কারওয়ান বাজারে। কালে-কালে তিনি প্রিন্টমিডিয়ার ঢালের আড়ালে কাউকে এভারেস্টে কোলে করে তুলে নিয়ে গেলেন তো কাউকে পাতালে। মিডিয়ার চাকরিরসূত্রে যে কোনও প্রকারে নিজের লেখা-বইয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন সেটা কোনও অভিনেতা বা কোনও নেতার মুখে। বিশ্ববেহায়া এরশাদকেকে ছাড়িয়ে গেলেন—নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেই দেওয়া শুরু করলেন। নিজেই লিখে দেন প্রথম মুদ্রণ শ্যাষ দ্বিতীয় মুদ্রণ অন দ্য ওয়ে, আসিতেছে...।

যাই হোক, কেবল যে আমার বই প্রকাশ করার কারণেই ফয়সাল আরেফিন দীপনকে খুব পছন্দ করতাম এমন না, এই মানুষটা আমাকে খানিকটা বোঝার চেষ্টা করতেন। এমন উদাহরণের অভাব নেই।
আমার কাছের লোকজনেরা আমার ব্রেন নাই এটা নিয়ে বিস্তর রসিকতা করেন, এখনও!  কিন্তু এতে যে আমার প্রাণ যায়, সখা! আমি লোকেশন একেবারেই মনে রাখতে পারি না যেমনটা মনে রাখতে পারি না মানুষের মুখ। ঢাকায় কেউ-যদি বলে এই ঠিকানায় চলে আসবেন তাহলে ধরে নিন আমার মাথায় মাসুদ রানার প্রিয় ওয়েলথার পিপিকে তাক করা হলো। অবশ্যই গুলিভর্তি। কখন যে দুম করে গুলি বেরিয়ে পড়ে এর ঠিক নেই! অথচ পূর্বে ঢাকায় আমি অজস্রবার গেছি, তারপরও...!
এমনিতে সঙ্গে কেউ থাকলে আমার আনন্দের শেষ নেই। তখন আমার একটাই কাজ মানুষটার পেছন-পেছন ঘুরে বেড়ানো! কিন্তু একা হলেই সর্বনাশ! ঢাকার মত যান্ত্রিক শহরে হারিয়ে যাই, স্রেফ হারিয়ে যাই। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আমার লেখালেখির শপথ! তো, সেইসব সহৃদয় মানুষগুলোও এক সময় আমাকে নিয়ে তিতিবিরক্ত হয়ে পড়েন। রাগী গলায় সাফ ঘোষণা দেন: আমি লিখে সই করে দিচ্ছি, আপনি ঢাকা শহরে চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত বা অচল [৩]

যতটুকু মনে পড়ে তখন প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের অফিস ছিল দোতলায়। লেখার কাজে, প্রূফ দেখতে দীর্ঘ সময় ওখানে থাকা লাগত। কখনও পূর্বের টাট্টিখানা হালের ওয়াশরুম-রেস্টরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলে আমার মুখ শুকিয়ে যেত কারণ আজিজ সুপার মার্কেটের এই ভবনটা আমার কাছে গোলকধাঁধাঁর মত মনে হতো। সব দেখতে একই রকম! দীপনের অফিসের এমাথা থেকে ওমাথা কোনও প্রকারে যেতে পারলেও ঠিক-ঠিক চিনে ফিরে আসতে পারতাম না। তাই ওঠার জন্য আমি আমার পরিচিত এইটাই সিঁড়ি ব্যবহার করতাম নইলে আমার জন্য দীপনের অফিস চেনাটা মুশকিল হয়ে যেত। পরে একটা বুদ্ধি বের করলাম! ওয়শরুমের কাজ সেরে হাতের নাগালের সিঁড়িটা দিয়ে সোজা নীচে নেমে যেতাম এবং যথারীতি আমার পরিচিত সেই সিঁড়ি দিয়ে শিস বাজাতে-বাজাতে উঠে আসতাম।

একদিন বিষয়টা ফয়সাল আরেফিন দীপন ধরে ফেললেন, হাসি লুকিয়ে বললেন, ’ঘটনা কী, বলেন তো, আপনি ওয়শরুমের নাম করে নীচে কোথায় যান’?
আমি বিব্রত হয়ে বললাম, ‘না, মানে, ইয়ে, নীচে আমার একটা মানে একটা ইয়ে কেনার ছিল’।
এবার দীপন নামের সদাশয় মানুষটা মুখ ভরে হেসে বললেন, ‘হুম, আমি কিন্তু এই নিয়ে বেশ ক-দিন আপনাকে এমনটা করতে দেখেছি’।
চোখাচোখি বাঁচিয়ে আমি ছাদে লটকে থাকা পরিত্যাক্ত টি-ব্যাগ দেখি []। পরে দীপন যেটা করতেন আমার ওয়শরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলে সঙ্গে অফিসের কাউকে দিয়ে দিতেন। হে মাবুদ, একজন মার্চ করে আমার সঙ্গে যাচ্ছেন আবার ফিরে আসার সময়ও...মার্চ। কী লজ্জা-কী লজ্জা, এই দিনও দেখার ছিল, মরণ! দীপনকে বলেকয়ে আগের নিয়মটাই চালু রাখলাম।

ফয়সাল আরেফিন দীপন নামের সহৃদয় এই মানুষটা বিদায় দেওয়ার বেলায় কেবল যে নীচেই নেমে আসতেন এমন না রিকশা ঠিক করে রিকশাওয়ালা কাছে আগেই জেনে নিতেন: মামা, আপনি ওই জায়গা চেনেন তো, শোনেন কোন দিক দিয়া যাবেন...?
কারণ এই মানুষটা বিলক্ষণ জানেন রিকশাওয়াওয়ালা যখন মুখ ঘুরিয়ে আমার কাছে জানতে চাইবে 'কোন দিক দিয়া যাইতাম', তখন আমি কেবল অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকব।
...
৩১ অক্টোবর ফয়সল আরেফিন দীপন খুন হন নিজের অফিসে, নৃশংস ভাবে। কেন খুন হলেন এটা নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলাম কারণ আজও খুনি ধরা পড়েনি। যেমনটা আমরা এখনও জানি না সাগর-রুনির খুনি কে, কেন তাঁরা খুন হলেন? এই সব জানার চল এই দেশে নাই!
অবশ্য দীপনের বাবা স্পষ্ট করে বলেছেন অভিজিত রায়ের বই প্রকাশ করার কারণেই এই খুন। দীপন বিভিন্ন লেখকের আনুমানিক ১৬০০ বই প্রকাশ করেছেন যার মধ্যে আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য গ্রন্থ নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’র মত কালজয়ী অসংখ্য বই। কেবল একজন লেখকের বই প্রকাশ করার কারণে এই খুন হয়ে থাকলে, কাল যে-কেউ অভিজিৎ রায়ের বই পড়ার সময় কোপ খাবেন বা কেউ ওকে নিয়ে লিখলে! বটে রে, একজন অভিজিৎ রায়ের এমন বিপুল ক্ষমতা!
আচ্ছা, দেওয়ানবাগির পীর যে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কেবল অশ্লীল, আপত্তিকরই না [৫] ধর্ম অবমাননার আওতায় জঘন্য অপরাধ করে যাচ্ছেন দিনের-পর-দিন! তখন দেখি কেউ রা কাড়েন না? বিষয়টা কী, বাহে? তার গোপন অঙ্গে কোপ দূরের কথা আজ পর্যন্ত তার নামে একটা মামলা পর্যন্ত হয়নি! তার গোপন চুলও আপনারা  কেউ স্পর্শ করতে পারেননি!

বেশ-বেশ, তা আপনারা কী ধর্মের কারকুন-তত্ত্ববধায়ক? আপনাদের কারফরমা-আদেশে আমাদেরকে চলতে হবে? এই প্রসঙ্গে পূর্বে বিস্তর লেখা লিখেছি [৫] আপাতত এই প্রসঙ্গ থাকুক। কেবল আমার অন্য এক লেখা থেকে ধার করে বলি:
 “আমার যা ইচ্ছা তা পড়ব- অভিজিতকে পড়ব অভিজিতের বাপকে পড়ব, বান..., তোমাদের সমস্যা কী? ভুলেও অন্তত আমাকে কখনও এই সব জুজু, মৃত্যুর ভয় দেখাতে আসবা না। আর কাপুরুষের মত পেছন থেকে না সাহস থাকলে সামনাসামনি। শোন, নর্দমার কীটরা, কেউ থুত্থুড়ে বুড়া হয়ে গু-মুতে মাখামাখি হয়ে মারা যায়, কেউ ব্যাটলফিল্ড-যুদ্ধক্ষেত্রে, কেউবা তোমাদের মত নরকের কীট-কাপুরুষদের হাতে। কাউকে-কাউকে মেরে ফেলা যায় এ সত্য কিন্তু তার আদর্শ, তাঁর ভাবনাকে মেরে ফেলা যায় না। আমাকে মেরে ফেললে আমার ভাবনাগুলো কিন্তু থেকেই যাবে। সেই ভাবনার রেশ ধরে আমার গলিত শব থেকে জন্ম নেবে, নেবেই অন্য একজন। সেই মানুষটা হাতে থাকবে জ্ঞানের এমন এক তরবারি যেটা দিয়ে সে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে তোমাদের মত সমস্ত অন্ধকার, তোমাদের মত কাপুরুষদেরকে...। তোমাদের মুখে একগাদা থুতু, শুয়োরের ছা!”
ফয়সাল আরেফিন দীপন খুন হওয়ার পরই দীপনের বাবা আবুল কাশেম ফজলুল হক বললেন: ‘আমি আমার সন্তানের খুনের বিচার চাই না’।
একমাত্র সন্তানের শব কাঁধে নিয়ে একজন বাবা কেন এমনটা বলেন সেটা বোঝার মত মগজের বড় অভাব আমাদের দেশে। সরকারের দায়িত্বশীল একজন মানুষ যখন জনাব কাশেমের এই কথার রেশ ধরে অতি কুৎসিত কথাটা বললেন, এমন কুৎসিত অমানবিক কথা আমি আমার সমস্ত জীবনে কখনও শুনেছি এমনটা মনে করতে পারছি না। পারলে তিনি দীপনের বাবাকেই খুনি বানিয়ে দেন!
দীপনের বাবা নামের এই মানুষটাকে বেশ ক-বার দীপনের অফিসে আমি দেখেছি। আপাতত দৃষ্টিতে অতি সাধারণ এই মানুষের ব্যক্তিত্বের এমন ছটা যে তাঁর সামনে আমি নিজেকেই দেখেছি কাঠ হয়ে থাকতে।

কিন্তু এই মানুষটারই ব্লগ-ব্লগিং নিয়ে [] খুব ভাল একটা ধারণা নেই এটা বোঝা যায় তাঁর এই মন্তব্য থেকে।
হয়তো কোনও সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিল: আপনার ছেলে কি ব্লগ লিখতেন?
তিনি সোজাসাপটা বলেছেন, ও ব্লগে ঢোকেনি।
কিন্তু বিষয়টা এমন আকারে এসেছে যে মনে হচ্ছে তিনি আগ বাড়িয়ে এটা বলতে চাইছেন। কারও সাক্ষাৎকার-বক্তব্য মিডিয়ার কল্যাণে কেমনতরো হয় তার নমুনা এখানে পাওয়া যাবে []। দীপনের বাবার এই মন্তব্য নিয়েও পানি কম ঘোলা হয়নি। এখন দেশে পাঠকের চেয়ে লেখকের আধিক্য এবং এই সমস্ত লেখক মহোদয়গণ এই গ্রহের এমন কোনও বিষয় নাই যেটা নিয়ে কাটাকুটি খেলা খেলেন না।

আর মিডিয়া, আহ, আমাদের চুতিয়া মিডিয়া! খুনিরা কেবল দীপনকে কুপিয়েছে আর মিডিয়া কুপিয়েছে দীপনের পরিবারের লোকজনকে, সবিরাম। এমনিতে এরা অবলীলায় মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের মুখে বুম ধরে বলতে পারে: আপনি এখন কেমন বোধ করছেন?
এরা অবিকল একটা হায়েনার মত! শকুনের চোখ নিয়ে (যার চালু নাম ক্যামেরা) অপেক্ষায় থাকে কোন এঙ্গেলে হাহাকার-করা বুক ভেঙ্গে কাঁদার ছবিটা ভাল আসবে। এই অপেক্ষায় এদের কোনও ক্লান্তি নেই। এদের জন্য প্রিয়মানুষের শব ধরে কেঁদে বুক হালকা করারও উপায় নেই। দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া প্রিয়মানুষটার নিথর দেহ ধরে যেসব আবেগঘন কথা বলেন: 'তুমি না বলছিলা...'।
তা আমরা দাঁড়ি-কমাসহ প্রথম আলোর কল্যাণে জেনে যাই। বদলে দাও, এরাই বদলে দিচ্ছে আমাদের ভাবনা। নোংরা ভাবনা!
ওহে, মতিউর রহমান, ব্যক্তিগত কর্মকান্ড করার সময় আপনার ওয়শরুমে গিয়ে আপনার মুখে বুম ঠেসে ধরলে আপনার অনুভূতিটা কেমন হবে, হে?

যেদিন ফয়সাল আরেফিন দীপনকে খুন করা হলো এর পরদিনই দীপনের ছেলে রিদাতের জেএসসি পরীক্ষা। ছেলে বড়োসড়ো হয়ে গেছে বাপের জুতো পায়ে দিব্যি এঁটে যায় তবুও আগে হয়তো বাপ ছেলের হাত ধরে পরীক্ষা হলে নিয়ে গেছেন। পরীক্ষা হলে ছেলে ঢুকছে আর বাপ বিড়বিড় করে বলছেন: ব্যাটা, মাথা ঠান্ডা রাখবি, একদম ঠান্ডা। প্রশ্ন হাতে পেয়ে কিন্তু …।
এইবার এমনতরো বলার কেউ ছিল না তবুও বাবার শীতল শব রেখে 'রিদাত' গেছে পরীক্ষা দিতে। ‘শকুনক্যামেরা’ সেখানেও তার পিছু ছাড়েনি। কালেরকন্ঠ ঠিকই রিদাতের পরীক্ষাকক্ষের ছবিটা ছাপিয়েছে। এই হচ্ছে আমাদের দেশে চালু পত্রিকাগুলোর নমুনা! আহ, কালের কন্ঠ! মিডিয়া-পত্রিকার নাম করে একজন পরোক্ষ খুনি কেমন করে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের কিনে নেয় কয়েকটা নোংরা কাগজের বিনিময়ে []! আমি নতজানু ইমদাদুল হক মিলনকে দেখতে পাই উদ্ধত আনভিরের পাশে...মিলনের মত বয়স্ক একটা মানুষকে নগ্ন দেখতে ভাল লাগে না।

বিচিত্র এই দেশের রাজনীতিবিদদের ন্যায় সবজান্তা-সর্বজ্ঞ এই গ্রহের অন্য কোথাও আর নাই! এদের কেউ হয়তো কৃষিবিভাগের সঙ্গে জড়িত কেউ বা সড়ক বিভাগের সঙ্গে, তাতে কী আসে যায়। একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এরা অপরাধীকে চিহ্নিত করে ফেলে, গণহারে একের-পর-এক বক্তব্য দিতে থাকে। ফল যা হওয়ার তাই হয়, অস্ত্র-চাপাতির খোঁজ আমরা পাই কিন্তু চাপাতির পেছনের মানুষটা অদৃশ্যই থেকে যায়। নিশ্চিন্তে এরা ঘুরে বেড়ায় আমাদের আশেপাশেই। আপনি টেরটিও পাবেন না হয়তো আপনার পাশে বসেই চুকচুক করে চা খাচ্ছে।

আহারে-আহারে, বাবার গায়ের গন্ধ মিশে যায় সন্তানের চোখের জলে সেটা দেখার সময় কোথায় আমাদের! পরে রিদাতের পরীক্ষার খাতা যিনি দেখবেন তিনি ভারী বিরক্ত হবেন এটা দেখে এই ছেলেটার পরীক্ষার খাতার জায়গায়- জায়গায় কালি লেপ্টে আছে! কেন? ওই শিক্ষকের মাথায় আসবে না এই কালির সঙ্গে লেপ্টে আছে বাবাহারা এই ছাত্রের চোখের জল। শিক্ষক বিড়বিড় করবেন: কী অমনোযোগী ছেলে রে বাবা, পরীক্ষা মনে হয় এর কাছে খেলা, হাহ।

ফাঁকতালে ফয়সাল আরেফিন দীপন নামটা হারিয়ে যাবে। যাবে না কেবল দীপনের সন্তানদের নাকে আটকে থাকা তাদের বাবার গায়ের গন্ধটা। আর দীপনের প্রচন্ড রাশভারী বাবাটার চশমার কাঁচ কখনও-কখনও ঝাপসা হয়ে আসবে, আহা-আহারে, আমার বাবুটার সঙ্গে সময়ে-সময়ে এতো কঠিন হওয়ার কী-ই বা দরকার ছিল। আহারে, আমার বাবুটা...!
দীপনের অজস্র স্মৃতি তাড়া করবে এই পরিবারটিকে, আজীবন...।  

সহায়ক সূত্র:
১. আমার আনন্দ-বেদনার অপকিচ্ছা: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post.html
২. ১ টাকার মরতবা: https://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_01.html
৩. বন ভয়েজ, বইমেলা: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_27.html
৪. টি-ব্যাগ, শিল্পকর্ম: https://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_5091.html 
৫. ধারা ৫৭: http://www.ali-mahmed.com/2015/10/blog-post_7.html
৬. কয়েদখানার মেহমান: http://www.ali-mahmed.com/2015/09/blog-post_23.html
৭. একটি আদর্শ সাক্ষাৎকার: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_05.html 
 ৮. কালের কন্ঠ-মুড়ির ঘন্ট: https://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_16.html

 

Thursday, October 29, 2015

ডাকাতচুঞ্চু!

কারও গাছ থেকে যখন কেউ না-বলে লুকিয়ে ফল নিয়ে যায় তখন আমরা কেউ-কেউ উদাস দৃষ্টিতে দেখি, দেখি না? আহা-আহা, খাক, খাক না। ফলবান গাছের ফল তো কেবল গাছের মালিকই খাবে না চোর-চোট্টা, পশু-পাখিও খায়। কিন্তু ওই মানুষটাই যখন এসে নীতির কথা শোনায় তখন তাকে ডাকাতচুঞ্চু বা বিশিষ্ট ডাকাত না-বলে উপায় থাকে না।

‘কনক পুরুষ’ নামে একটা উপন্যাস আছে আমার- এটাকে নভেল বলা হবে নাকি নভেলা সেই তর্ক এখন থাক। বইটা ছাপিয়ে ছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, আমার দেখা অসাধারণ একজন মানুষ [১]!
বইটা ছাপা হয়েছিল ৯৫ সালে। রিপ্রিন্ট আর হয়নি। পরের বছর থেকেই বইটা বাজারে নেই। সহৃদয় পাঠক বইটার খোঁজ করলে দুইটা কারণে আমি ভারী বিব্রত হতাম। এক, এটার প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদটা দেখে ইচ্ছা করত উঁচু কোনও দালান থেকে দেই একটা লাফ। আফসোস, প্রচ্ছদের উপর আমার কোনও হাত ছিল না। প্রচ্ছদটা আমি দেখেছিলাম ছাপা হওয়ার পর। ভূমিষ্ট সন্তান দর্শনীয় না-হলে তাকে তো আর ফেলে দেওয়া চলে না, কপাল!
দুই, বইটার কোনও খোঁজ কাউকে দিতে পারি না। একবার ভেবেছিলাম পিডিএফ ফরম্যাটে আমার সাইটে যুক্ত করে দেব। কিন্তু আমার ‘অকাজেই’ যে সমস্ত দিন যায়- সময় কোথায়!

একজন পাঠকের অযাচিত উল্লাসভরা একটা মেইল পেলাম লিংকসহ, ‘...জিনিস পাইছি’। এই লিংক [২] ধরে গিয়ে দেখি ওয়াল্লা, এখানে যে বাজার জমে গেছে। আর আস্ত বইটা এরা পিডিএফ করে ফেলেছে। ওখান থেকে লোকজনরা ডাউনলোড করে পড়ছেও। পূর্বেই উল্লেখ করেছি অনেক বছর ধরে বইটা বাজারে নেই তাই ভাবলাম লোকজনরা পড়ছে যখন তা পড়ুক না। কিন্তু ডাউনলেোড করার পদ্ধতি দেখে আমি বিরক্ত হলাম। ‘হিডেন কনটেন্ট’ তখনই দৃশ্যমান হবে যখন ‘লাইক’ দেওয়া হবে নইলে কোনও প্রকারেই ডাউনলোড করা যাবে না। যেন গান পয়েন্টে রেখে- এক ধরনের বাধ্য করা। এই বাধ্যতামুলক লাইক দেওয়ার বিষয়টা আমার মোটেও ভাল লাগল না।

এই এক চুতিয়াগিরি শুরু হয়েছে এখন, লাইক ভিক্ষা। আমাদের দেশের প্রথম শ্রেণির দৈনিকগুলো যখন লাইক-ভিক্ষা [৩] করে তা এরা কোন ছার! যাই হোক, মন্তব্য করতে গিয়ে দেখা গেল এদের এখানে ‘সাইন আপ’ করতে হয়। কী যন্ত্রণা! এই ঝামেলা চুকিয়ে আমি ওখানে মন্তব্য করলাম,
পরে আর ছাপা না-হওয়ার কারণে প্রজাপতির এই বইটি অনেক বছর ধরেই পাঠকের নাগালে নেই! বইটি এখনও পাঠকের ভাল লাগে জেনে মনটা অন্য রকম হয়ে। সলাজে বলি, এই ভাল লাগার তীব্রতা আমাকে স্পর্শ করে...। তবে বিষাদের সঙ্গে এ-ও বলি, বই ডাউনলোড করার জন্য 'লাইক' বাধ্যতামূলক করাটা ভাল লাগল না!”

'আপনার মন্তব্যটি বিবেচনার অপেক্ষায় আছে'। বেশ, আমি অপেক্ষায় থাকলাম। কিন্তু মন্তব্যটা পাবলিশ করা হলো না। আমার মনে হলো এই সব ভূমিকুষ্মান্ডদের সত্য শোনার বিন্দুমাত্র সহনশীলতা নেই। তাই এদের এই সমস্ত হালকামি অনেকটা ‘হালকা দেহের জন্য বলকা দুধ’। আমি আবারও মন্তব্যে লিখলাম,
"প্রিয় মহোদয়, গতকালের এই মন্তব্য পাবলিশ করেন নাই কেন দয়া করে এটা কি একটু জানাবেন?" এরপর মন্তব্যে লিখলাম, "লেখকের অনুমতি ব্যতীত আস্ত বইটা যে পাবলিশ করে দিলেন বিষয়টা কী অনৈতিক না?! "

‘মুর্দা বলে না, বলে তো কাফান ফাড়কে বলে’, প্রিয় মহোদয় ওরফে এডমিন একেবারে কাঁপিয়ে দিলেন। তিনি লিখলেন,
নৈতিক অনৈতিকতার কাদা ছুড়াছুড়ি না করে, মুল কথায় আসুন। আপনি কি চান না বইটি সাইটে থাকুক? আপনি যদি কোনভাবে লেখক বা প্রকাশনার সাথে জড়িত থাকেন, তাহলে উপযুক্ত প্রমানসহ আমাকে মেসেজ করুন, সাথে সাথে লিঙ্ক রিমুভ করা হবে। পূর্বেও এমন বহু লিঙ্ক রিমুভ করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে।
### একটা কথা না বলে পারছি না, আপনার এই বই নীলখেতে সেকেন্ডহ্যন্ড পাওয়া যাচ্ছে। যার বিক্রির ১ পয়সাও আপনি পাবেন না। আশা করি এই বিষয়ে কোন একটা ব্যাবস্থা নিবেন। যদিও কিছু করতে পারবেন কিনা বা করবেন কিনা সেই বিষয়ে সন্দেহ আছে। আজ পর্যন্ত কাউকে তো করতে দেখলাম না। সবাই খালি অনলাইন সাইট গুলার পিছনেই লেগে থাকতে ব্যস্ত।

ওরে ‘সূর্যের চেয়ে যে বালির উত্তাপ বেশি’ কথাটা শুনেছিলাম, শুনেছিলাম ‘দারোগার নায়ের (নৌকার) মাঝির শালা'র কথা। ‘চোরের মার বড়ো গলা’, এটা আমাদের ভাষায় বহুল ব্যবহারে জীর্ণ বিধায় এর কথা এখানে উল্লেখ করলাম না। এমনিতে আমি এদের জন্য একটা কথা ব্যবহার করি, ‘এক কাপ চায়ে দু-কাপ চিনি'।
জাকারিয়া স্বপনের মত প্রতিভাবান মানুষ যখন ‘দিন দাহাড়ে’ লেখা চুরি-চামারি করেন [৪] তখন এই সমস্ত ‘জুম্মা জুম্মা সাতদিন’ টাইপের লোকজনকে অল্প কথাই বলি…।

নৈতিক অনৈতিকতার কাদা ছুড়াছুড়ি না করে, মুল কথায় আসুন…’
জ্বী, মূল কথাতেই আসছি। আমার অনুমতি ব্যতীত বইটা পাবলিশ করে আপনি অপরাধ করেছেন তাই আপনি একজন অপরাধী। 

‘আপনি যদি কোনভাবে লেখক বা প্রকাশনার সাথে জড়িত থাকেন…’
প্রকাশনার বিষয়টা আমার কাছে গুরুত্বহীন কারণ বই-এ পরিষ্কার করে লেখা আছে, ‘গ্রন্থস্বত্ব লেখকের’।

'তাহলে উপযুক্ত প্রমানসহ আমাকে মেসেজ করুন, সাথে সাথে লিঙ্ক রিমুভ করা হবে...’
আপনি একজন অপরাধী- একজন অপরাধীর কাছে প্রমাণ দিতে আমার বয়েই গেছে।

‘পূর্বেও এমন বহু লিঙ্ক রিমুভ করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে...’। বাহ, কী-সোন্দর কথা! পূর্বেও চুরি করে বমাল ধরা পড়ার পর মাল ফেরত দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও চুরি করা হবে ধরা পড়লে তখনও মাল ফেরত দেওয়া হবে।

### একটা কথা না বলে পারছি না...’
আমিও একটা কথা না-বলে পারছি না সেটা হচ্ছে একজন অপরাধীর সঙ্গে আর বাতচিত করাটা আমার কাছে কেবল ক্লান্তিকরই না শব্দের অপচয়ও বটে।

সহায়ক সূত্র:
১. কাজীদা: একজন লেখক বানাবার মেশিন!: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_13.html
২. http://banglapdf.net/threads/kanok-purush%E0%A5%A4%E0%A5%A4ali-mahmed-sheba-uponyas.2771/
৩. জাতীয় ফকির: আল্লার ওয়াস্তে একটা পইসা...: http://www.ali-mahmed.com/2014/07/blog-post_22.html
৪. priyo.com: ডিয়ার, তোমাকে কি ডাকাত বলতে পারি?: http://www.ali-mahmed.com/2015_02_16_archive.html






Thursday, October 22, 2015

ভুলে-ভরা জীবন এবং গুছিয়ে রাখা ব্যাগ।

রাজুর [১, ২] বয়স পাঁচ এবং মৌসুমির বয়স চার [৩, ৪], এরা ভাই-বোন। এদেরকে আমি চিনতাম ‘আমাদের ইশকুলে’ পড়ার সুবাদে। এদের বাবা মারা যাওয়ার পর আক্ষরিক অর্থেই এরা ভেসে গেল কারণ অপ্রকৃতিস্থ মা থেকেও নেই। যেদিন এদের মা একেবারেই উধাও হয়ে গেল সেদিন আমিও ভেসে গেলাম কারণ এই দুইটা বাচ্চার স্রোতে ভেসে যাওয়া তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার জন্য যে কঠিন হৃদয়ের প্রয়োজন তা আমার ছিল না।

একদা মৌসুমি মেয়েটার একটা গতি হয়। সহৃদয় একটি পরিবার এই বাচ্চাটির দায়িত্ব নিলে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু ওর ভাই রাজু নামের এই পাজিটার কোনো গতি হবে এমনটা আমি কল্পনাও করিনি কারণ ৫/৬ বছরের এই শিশুটির খোঁজ নিতে গিয়ে সকালে যদি শুনতাম চট্টগ্রামে তো বিকালে জানা যেত পাজিটা ঢাকায়। বেশ কিছুদিন ধরে রাজু উধাও ফিরে আসার পর জানা গেল একা-একা এ ভারতের আগরতলাতে চলে গিয়েছিল। রাজু নামের এই ছেলেটি যে একালের রাম এতে শরৎবাবুর সন্দেহ থাকলেও আমার মোটেও সন্দেহ ছিল না। 
আমি নিশ্চিত,‘রামের সুমতি’ হলেও রাজুর সুমতি হবে না। কালে-কালে এ যে ‘বাইট্টা ছগির’ পেটকাটা রমজানের স্থলে ‘কাইল্যা রাজু’ হয়ে উঠবে না এটা কে বলতে পারে।

আমি হাল ছেড়ে দিলেও আমাদের ইশকুলের শিক্ষক আলী আজ্জম অপু হাল ছাড়ে না।
যে পরিবারের সঙ্গে এখন রাজু আছে সেই পরিবারের লোকজনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই এঁরা কেবল যে রাজুকে পরম মমতায় নিজের করে নিয়েছেন এমনই না এরা আমার দীর্ঘ সময় ধরে কষ্ট করে চেপে রাখা শ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমাকে পোকামানব হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
ছবি ঋণ: আলী আজ্জম অপু
রাজুর মাঝে যে পরিবর্তন আমি দেখেছি তা আমার চিন্তারও বাইরে! কখনও কখনও এ এই পরিবারের লোকজনকে হুমকি দেয়, ‘আমি কিন্তুক চইলা যামু’। ওরা হাসি গোপন করে বলে, ‘চইলা যা’, তখন রাজু মনখারাপ করা শ্বাস ফেলে বলে, ‘তাইলে আমারে আদর করব কেডা’? আমার কেবল মনে হয় যেন এটা নিয়ে একটা গল্প, একটা উপন্যাস একটা মহাকাব্য লিখে ফেলা চলে।

ভুল! এখন হচ্ছে অগল্প-অপন্যাস-অপকাব্য-অন্ধকারের যুগ। ‘মজার স্কুল’-এর সঙ্গে জড়িত আরিফুর রহমান, জাকিয়া সুলতানা, ফিরোজ আলম খান এবং হাসিবুল হাসানকে পুলিশ মানবপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করল, রিমান্ডে নেওয়া হলো। এই নিয়ে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র নিন্দা-ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দেওয়া হলো। প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের লোকজনের অবগতির বিষয়টা নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা উল্লসিতও হলাম- যাক, এবার তাহলে একটা সুরাহা হচ্ছে।
আমরা পত্রিকায় পড়লাম,‘অবশেষে মুক্তি পেলেন অদম্য বাংলাদেশের চার তরুণ-তরুণী’। বাহ, এই দেশের সমস্ত বিষয়ে যদি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় তাহলে গুচ্ছের টাকা খরচ করে বিপুল বাহিনীর প্রয়োজন কী!

বেশ, কিন্তু আমাদের এটা জানা হলো না সরকার বাহাদুরের চৌকশ গোয়ান্দা এদেরকে গ্রেফতারের পূর্বে এদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের কোনো প্রকারের গন্ধ-দুর্গন্ধও পেল না। মানব তো আর বাদাম না যে পকেটে লুকিয়ে পাচার হয়ে গেল। এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ম্যাজিশিয়ানও তো চোখের পলকে একজন মানবকে উধাও করে ফেলার পদ্ধতি রাখেননি! একটা লাশ পচে-গলে যেতেও তো বছর দুয়েক সময় লাগে। তারপরও কোনও-না-কোনও ছাপ থেকেই যায়।
আমাদের এটাও জানা হলো না এক শিশুর চাচা যিনি এই অভিযোগ এনেছিলেন তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো বা যেসমস্ত আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এর সঙ্গে জড়িত তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হলো কিনা?

পত্রিকায় আমরা এটাও পড়লাম, পুলিশ দীর্ঘ এক মাস তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে পাচারের অভিযোগের কোনো প্রমাণ পায়নি। …এরপর আদালত তাদের জামিন দেন। এর পূর্বে পুলিশ বলেছিল, এদের কোনো নিবন্ধন নেই, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো সনদও তারা নেয়নি।
খারাপ, খুব খারাপ কথা। ‘আমাদের ইশকুল’ শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। তা বছর পাঁচেক তো হয়েই গেল। এই সুদীর্ঘ বছরেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো প্রকার অনুমতি নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আচ্ছা, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমতি পাওয়ার জন্য যে-সমস্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় তার কোনো প্রকার ধারণা কি আছে কারও? দয়া করে কেউ ফরমটা যোগাড় করে খানিকটা চোখ বুলিয়ে নিলে ভাল করবেন। চার পাতার আবেদনপত্রে যে অসংখ্য চাহিদার কথা উল্লেখ আছে তা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে যোগাড় করা অসম্ভব! এটা তাদের পক্ষেই সম্ভব যাদের হাতি-ঘোড়া, লাওলস্কর আছে। যারা বৈদেশ থেকে মোটা অংকের ডোনেশন বাগিয়ে চকচকে গাড়ি হাঁকিয়ে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়ে সমাজ উদ্ধার করেন।

একটি শিশুর লেখাপড়া,নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার জন্য সরকার বাধ্য। এর অন্যথা হলে এর দায়ভাগ সরকার নিজের কাঁধে নিয়ে লজ্জিত হবেন। সরকার যেখানে ব্যর্থ সেখানে সাধারণ লোকজন এগিয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল। এখন রাস্তায় পড়ে থাকা কলার খোসা সরাবার জন্যও যদি মেয়র মহোদয়ের বরাবর পিটিশন লিখতে হয়, স্যার, হাম্বল রিকোয়েস্ট… তাহলে তো ভারী মুশকিল।
সব মিলিয়ে এখন মনে হচ্ছে একটি শিশুকে পড়াবার, আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করাটা ভুল। যেদিন এদেরকে পুলিশ হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল সেদিনই আমি ছোট্ট একটা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি, মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কোনো একদিন শিশু পাচারের অভিযোগে কোমড়ে দড়ি বেঁধে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেলে কেউ-কেউ অবাক হলেও আমি হবো না। ভুল করলে খেসারত দিতে হবে এ আর বিচিত্র কী! আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে সমস্যা তো নেই।
তবুও আমি এমন ভুল করব, বারবার। কপাল আমার, ভুলে-ভরা যে এ জীবন…!

সহায়ক সূত্র:
১. দু-পেয়ে পশু: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/blog-post_27.html
২. পশুর জন্য কেবল জঙ্গলের আইন: http://www.ali-mahmed.com/2015/05/blog-post_28.html
৩. একজন দুর্বল মানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2015/09/blog-post.htmls
৪. হর্ষ-বিষাদ, বিষাদ-হর্ষ: http://www.ali-mahmed.com/2015/09/blog-post_20.html

Wednesday, October 7, 2015

ধারা ৫৭।

হালের খবর হচ্ছে, ‘ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে স্কুলছাত্র গ্রেফতার’! [] ছাত্রটি নবম শ্রেণির এক বালক। এ দেশের আইনমতে শিশু। অবশ্য ড. জাফর ইকবালের মতে এ নিশ্চিত দুগ্ধপোষ্য শিশু। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ইয়া ধামড়া-ধামড়া যুবকরা যদি জাফর ইকবালের দৃষ্টিতে ‘বাচ্চা ছেলে’ হয়ে থাকে তাহলে নবম শ্রেণি পড়ুয়াকে আমরা অবলীলায় দুগ্ধপোষ্য শিশু বলতে পারি।

যাই হোক, এর বয়স বিবেচনা করে একে এবং এর পরিবারকে সতর্ক করে ছাড় দিলে মঙ্গল গ্রহের পানি শুকিয়ে যেত বলে আমি মনে করি না। কিন্তু আইন সম্বন্ধে আমার ভাল জ্ঞান নেই বিধায় এই বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলাম। বিষয়টা আইনজ্ঞদের জন্য তোলা রইল।

(ভিডিও সূত্র: ইউটিউব: https://www.youtube.com/watch?v=5str8--rVyQ
)
দেওয়ানবাগির এই ভিডিও ক্লিপটি বছর দুয়েক পুরনো কিন্তু সম্প্রতি আমার দেখার দূর্ভাগ্য হয়েছে। দেখার পর আমি অনেকটা সময় বাকরুদ্ধ হয়ে ভাবছিলাম এই দেশেরই একজন মানুষ এমনসব ভয়ংকর কথা প্রকাশ্যে বলে পার পেয়ে যেতে পারে এ তো অকল্পনীয়, অসম্ভব, অবাস্তব। এমন না যে অপরিচিত কেউ-একজন যা-তা বলে গা ঢাকা দিল। এই মানুষটা তার অসংখ্য মুরিদের কাছে এমনতরো ভয়াবহ বক্তব্য প্রকাশ্যে বলে আসছে, দিনের-পর-দিন ধরে! এবং এই কারণে এই মানুষটাকে বিন্দুমাত্রও কোনও প্রকারের জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে এমনটা আমরা জানি না। বরং আমরা ৩০০ পাউন্ডের কেক কেটে মানুষটার জন্মদিন পালন করতে দেখেছি। ঠিক ৩০০ পাউন্ড কেক কেন কে জানে এই মানুষটার ওজন কী ৩০০ পাউন্ড!

আচ্ছা, এই মানুষটা-এই মানুষটা বলছি কেন?! একে কী বলব? পরমপুরুষ? পরম ক্ষমতাধর! অসীম ক্ষমতাবান? দূর-দূর, আমার মত মানুষের পক্ষে এটা নির্ধারণ করা কী সম্ভব! আহা, কী পরম ক্ষমতাধর রে আমার! নিজের চোখের দৃষ্টি ঠিক করার মত সামান্য ব্যবস্থা যার সাধ্যের বাইরে, চশমাই ভরসা! বেলুনের মত ফুলে যাওয়া রোধ করার ক্ষমতা নাই যার- আফসোস, ফেটে যাওয়া আটকাচ্ছে কে!

তথ্যপ্রযুক্তির এই ধারা ৫৭ একটি কালো আইন। কিন্তু যেহেতু এখন পর্যন্ত এটা বহাল আছে তাহলে এই মানুষটার বক্তব্যগুলো কী ধর্মীয় অবমাননার পর্যায়ে পড়ে না? নাকি দেওয়ানবাগির মত লোকজনেরা দেশের প্রচলিত আইনের উর্ধ্বে?
এই গ্রহে তো ঈশ্বরের বিরুদ্ধেও মামলা হয়। রুমানিয়ার পাভেল মির্চা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। কেন করেছিলেন সে এক লম্বা কাহিনী। আদালত এই মামলা গ্রহনও করেছিলেন। মামলা শুরু করার পূর্বে বিবাদীকে সমন জারী করতে হয়। উকিল বিবাদী ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সমন জারি করতে পারছিলেন না কারণ...। কারণ ঈশ্বরের আবাসিক ঠিকানার খোঁজ কারও জানা নেই! ঈশ্বর পার পেয়ে যান কেবল এই কারণে যে তাঁর আবাসিক ঠিকানা নেই। অতএব মামলা ডিসমিস।
কিন্তু দেওয়ানবাগির আবাসিক ঠিকানা আছে বলেই জানি...।

সহায়ক সূত্র:
১. ফেইসবুকে ধর্মাবমাননার অভিযোগে স্কুলছাত্র গ্রেপ্তার, মামলা: http://m.bdnews24.com/bn/detail/bangladesh/1033133
*ভিডিওটি Jun 23, 2013 সালে ইউটিউবে আপলোড করেছিলেন thinkbd. তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

Wednesday, September 23, 2015

কয়েদখানার মেহমান!

সবই পণ্য বিক্রয়ের জন্য- চকচকে মোড়কে আলকাতরা কোন ছাড় বাচ্চাদের ইয়েও অবলীলায় বিক্রি হয়! ধর্মকে কাঠ-মোল্লারা বেচে শস্তায় মিডিয়া বেচে চড়া দামে। যেটা আমরা মাহমুমুদর রহমানের বেলায় দেখেছি।

ডয়চে ভেলের মত আন্তর্জাতিক একটি মিডিয়া এক ব্লগারের কেবল সাক্ষাৎকার নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি সাক্ষাৎকারের নীচে আমাদের মত পাঠকদের উদ্দেশ্যে এটাও জুড়ে দিয়েছে, ‘আপনি কি এর সঙ্গে একমত পোষণ করেন?’
‘এর’ মানে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছে সেই মহান দুঁদে ব্লগার। সাক্ষাৎকারের সঙ্গে ছবিও ছাপা হয়েছে। আমরা বেকুব পাঠক যদি বুঝতে না-পারি তাই নাম লিখে আমাদেরকে অবগত করা হয়েছে। এটা দোষের কিছু না কিন্তু ওখানে লেখা হয়েছে ‘নাস্তিক ব্লগার’।

বাহ, চমৎকার তো! কানকাটা রমজান, মুরগী মিলন, বাইট্টা দবীরের মত এটাও এখন অচিরেই চালু হয়ে যাবে দেড়-চোখ ট্যারা ব্লগার, চশমাচোখা (চোষা না) ব্লগার, এক ঠ্যাংওয়ালা ব্লগার, ‘বেলুন ব্লগার’!
পেটফাঁপা ব্লগার না-বলে ‘বেলুন ব্লগার’ বলা হবে সম্ভবত এই কারণে যে ওই ব্লগার আস্ত একটা গ্যাসের খনি! সঙ্গে ব্লগারের ‘স্বহস্তে’(!) গাওয়া গান,‘বড় সাধ আকাশে উড়াই তিন কুড়ি বেলুন’, (গ্যাসের যেহেতু অভাব নেই হাজার-কুড়ি বেলুন উড়াতে দোষ কোথায়) এটাও ওখানে জুড়ে দেওয়া যেতে পারে।

তো, এই ব্লগার মহতরমা সাক্ষাৎকারে জানাল [১],…‘ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে নবীকে সমালোচনা করার সপ্তাহ পালন দোষের কিছু না’।
বটে রে! পূর্বে ‘নবী …সপ্তাহ’ নামের ইভেন্টগুলো যখন দেখতাম সেখানে এমনসব অশ্লীল, কুৎসিত, গা শিরশিরে গালাগালি লেখা থাকত তা দেখে আমি কেবল হতবাক হয়ে ভাবতাম এমনতরো কথা তো চটুল আড্ডায় বলতেও আমাদের রুচিতে আসে না। অথচ এরা জনসমক্ষে এই কাজটাই করছে। বড়ো বাথরুম সারার কাজটাও কী এরা গিজগিজে লোকজনের মাঝেই সেরে থাকে? এই মহতরমা থার্ড রেটেড মুক্তমনা শিক্ষিত দূরের কথা এ তো দেখি চুতিয়ারও অধম!

আহ, শিক্ষিত! আমার এখন মনে পড়ছে উচ্চশিক্ষিত এক কুলাঙ্গারের কথা; কোটি-কোটি মানুষের কাছে অতি শ্রদ্ধার একজনকে নিয়ে যে নোংরা ভাষায় এন্তার আবর্জনা উৎপন্ন করে গেছে এমন ভাষা অশিক্ষিত উগ্র বেশ্যারাও ব্যবহার করে কিনা এতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। এ নাকি একজন মুক্তচিন্তার মানুষ ছিল! এটার নাম যদি মুক্তচিন্তা হয় এমন মুক্তচিন্তার মুখে আমি থুথু ফেলতেও আলস্য বোধ করব। কালে-কালে সবাই মিলে ব্লগিং-ব্লগার নামটাকে স্রেফ একটা শবে পরিণত করছে [২]

আমাদের দেশে আরজ আলী মাতব্বুরের চেয়ে বড় নাস্তিক কমই আছে। তাঁর অধিকাংশ লেখা আমার পড়া। কিন্তু কোথাও তিনি কোনও ধর্মকে নিয়ে নোংরা কথা বলেছেন এমনটা আমার জানা নাই। কিন্তু তিনি বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে কঠিন কঠিনসব যুক্তি দিয়ে লিখে গেছেন। এই লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায় কী অগাধ পড়াশোনা তাঁর! ধর্ম নিয়ে ‘ভবঘুরে’ নামের একজনের সিরিজ আকারে লেখা আছে কিন্তু কোথাও নোংরা কথা চোখে পড়েনি। বরং তথ্য-উপাত্ত দেখে মনে হয়েছে ধর্ম নিয়ে তার প্রচুর পড়াশোনা। আলি দস্তির লেখা পড়লেও একই কথা বলা চলে। তো, এরা বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেছেন কিন্তু মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করেননি।

ইভেন্ট খুলে…এই চুতিয়ারা বুঝতে চায় না সব কিছু নিয়ে খেলা করা চলে না যেমনটা চলে না কারও আবেগ নিয়ে। কিছু ক্ষেত্রে যুক্তি অচল। কেউ তার মৃত মার সম্ভ্রম রক্ষার জন্য লড়াই করে হিংস্র কুকুরের ন্যায়। কেন করে? কী আছে মা নামের মৃতদেহের পুরনো ক-খানা হাড়ে? উত্তর নেই! সব প্রশ্নের উত্তর হয় না।

আর আমরা নাস্তিক এবং ধর্মবিদ্বেষীকে গুলিয়ে ফেলছি। পূর্বের এক লেখায় যেটা আমি লিখেছিলাম:
“এমন অনেকেই আছেন যাদের ১০০টা লেখার মধ্যে দেখা যাবে ৯৯-টাই ধর্মসংক্রান্ত অতি জঘন্য কথা লেখা। যুক্তি, তথ্যের বালাই নেই। এদের এই কাজটা ইচ্ছাকৃত। লোকজনকে উত্তেজিত করার অপচেষ্টা! এই সমস্ত শিক্ষিত মানুষগুলো কেন এমনটা করে, 'জাস্ট এটেনশন সিকার'? কোন-এক পাহাড়ির কাছে একটা নিরেট পাথর ঈশ্বরতুল্য- অন্য একজনের কি কাজ এটায় লাথি মারার। এই গ্রহে কী লাথি মারার পাথরের অভাব পড়েছে! এরা নাস্তিক কিনা সেটা জরুরি না কিন্তু এরা নাস্তিক-মুক্তমনা(!) নামের আড়ালে একেকজন চলমান ইতরবিশেষ। অন্যের মত-বিশ্বাস-আবেগকে পদদলিত করে কেমন করে মুক্তমনা হওয়া যায় এটা আমার বোধগম্য হয় না!” [৩] 
আরেক দল আছে এরা ধর্ম উদ্ধারের নামে অবলীলায় অন্যের প্রাণ নষ্ট করছে [৪]। যেগুলো স্রেফ জঘন্য খুন! এই দুই দলই অতি উগ্র জন্তুবিশেষ। এদেরকে যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় আনাটা জরুরি। কয়েদখানার মেহমান না-হলে এরা যে বড়ো বেমানান…।

সহায়ক সূত্র:
১. ডয়চে ভেলে: http:/dw.com/p/1GTBW
২: ব্লগিং-বোলোগিং, আস্তিক-নাস্তিক! : http://www.ali-mahmed.com/2013/03/blog-post_15.html
৩. একটি খুন, অতঃপর: দুই। :http://www.ali-mahmed.com/2015_03_23_archive.html
৪. পাজি-অসভ্য-ইতর-দানব-খুনি!: http://www.ali-mahmed.com/2015_04_09_archive.html

Sunday, September 20, 2015

হর্ষ-বিষাদ, বিষাদ-হর্ষ!

এই শিশুটির [১] কোনও গতি করতে পারছিলাম না। দিন গড়ায় কিন্তু কোন গতি হয় না। গতির চাকা যে চারকোনা। না-হওয়ার তো কোনও কারণ নেই অল্প কয়েকটা উদাহরণ দেই।
উদাহরণ এক: এই দেশের অসম্ভব প্রভাবশালী পত্রিকার এক সাংবাদিক ভাইজানকে শিশুটির বিষদ জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, জেলা শহরে শিশুদের রাখা হয় এমন কোনও সরকারী ব্যবস্থার খোঁজ দিতে পারেন? আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে তিনি বললেন, আমার জানা নাই। আহা-আহা, সাংবাদিক সাহেবের স্কন্ধে কত্তো-কত্তো ‘লিউজ’ এই অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কোথায়?
উদাহরণ দুই: এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দুঁদে সাংবাদিক মহোদয়কে এমন কোনও খোঁজের কথা বলার পর তিনি বললেন, আচ্ছা জেনে জানাব। আজও আমি অপেক্ষায় আছি।

শোনো কথা, অপেক্ষায় অপেক্ষায় এভাবে কী চলে? আমার তো আবার অকাজের শেষ নেই। বাহে, আমি তো আর অন্য গ্রহ থেকে আসিনি। রাত তিনটায় যখন কোনও শিশু বলে, ‘আমার হাগা ধরছে, হাগুম’ তখন সকালের অপেক্ষায় কোনও শিশুর হাগা-মুতা থামিয়ে রাখা চলে না। আর খানিকটা সাহস সঞ্চয় করতে পারলেই আমার পক্ষে শিশুটিকে ফেলে দেওয়াটা কোনও বিষয় ছিল না।

সবই অন্ধকার বিষাদের গল্প- কোথাও কী কোনও আলো নেই! আলো থাকে, থাকতে হয়; না-থেকে আলো বেচারার কোনও উপায় নেই। খুব একটা স্বচ্ছল নন এমনই এক পরিবারের দু-সন্তানের জননী গভীর মমতায় শিশুটির হাত ধরে আমাকে বলেন, ‘এই বাচ্চাটার দায়িত্ব আমাকে দেবেন? কোনও সমস্যা হবে না আমার দুই বাচ্চার সাথে এও বড়ো হবে’।
ঝাপসা হয়ে আসা অতি সাদামাটা এই মহিলার দিকে আমি তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম এটা কী কোনও রসিকতা নাকি এটা একটা খেলা মনে করছেন। ২৪ ঘন্টা না-পেরুতেই এসে বলবেন, জল্লা-জল্লা, এই খেলা আর খেলব না!

আহা, কেমন করেই বা ভরসা হবে? ইনি তো আর আমাদের মত দু-পাতা ‘ন্যাকাপড়া’ জানা মানুষ না যে পাতার-পর-পাতা দস্তয়োভস্কি মায়াকভস্কি পড়ে উচু-উচু ভাবনা ধার করে তলতলে হয়ে আছেন। বা নিদেনপক্ষে এঁর একটা এফবি একাউন্টও নেই যে আমাদের মত ‘দেশ-দশউদ্ধার’ করে গণতন্ত্র-মায়াতন্ত্রে হাবুডুবু খেয়ে ভুস করে ভেসে উঠে এমন একটা কান্ড করে ফেলবেন!

শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার পর এঁর বাসায় গিয়ে শিশুটির ঢলঢলে মুখ দেখে চোখ জুড়ায়। কিন্তু কোনও অনুরোধেই ছবি উঠাবার অনুমতি পাওয়া গেল না। আমি যতই বোঝাই এটা আমাদের সবারই জানা প্রয়োজন। এঁর এক রা, এটা আর এমন কী! আমি খানিকটা ঘুরিয়ে বলি শিশুটির একটা স্মৃতির জন্য নাহয়…। তিনি সদয় শর্ত জুড়ে দেন, আচ্ছা কিন্তু কোথাও ছবিটি দেওয়া যাবে না। হায়, নি-মোরাদ আমি দুর্দান্ত লোভ সামলাই কেমন করে? বড়ো অনিচ্ছায় ছবিটি এখানে জুড়ে দিলাম কিন্তু সঙ্গত কারণেই অচেনা আকারে।

সহায়ক সূত্র: ১. একজন দুর্বল মানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2015/09/blog-post.html 


Tuesday, September 15, 2015

একজন দুর্বল মানুষ।

মৃত্যুদন্ড নিয়ে আমার একটা বক্তব্য ছিল, একটা মানুষের প্রাণ নষ্ট করার অধিকার কোনও মানুষের থাকাটা সমীচীন না। রাষ্ট্রেরও না। কিন্তু এমন বক্তব্য আসলে মানুষের জন্য, দানবের জন্য না। যেমন রাষ্ট্র যদি জাহাঙ্গির নামের এই মানুষটাকে মেরে ফেলে তাহলে আমি বিন্দুমাত্র কাতর হব না। এই দানবের দেহাত্যয়ই একমাত্র সমাধান।

হালে নিজের জাগতিক সমস্যার কারণে এখন আমি আর বাড়তি চাপ নিতে চাই না। ‘অকাজের’ পাল্লা ভারী হয়ে গেছে মনে হয় এমনটা। চারপাশে এতো এতো কেজো লোকের সঙ্গে দলছুট হয়ে থাকাটা কোনও কাজের কাজ না। তাই এখন নির্ভার সময়- যাক, এতো দিনে তাহলে আমার একটা গতি হচ্ছে। কালে কালে কাজের লোক হচ্ছি বলে…। শান্তিতেই ছিলাম। কিন্তু ঝামেলা আমার পিছু ছাড়বে কেন। কপাল!
মৌসুমি এবং রাজু
পূর্বে জাহাঙ্গির নামের এক দানবকে নিয়ে লিখেছিলাম। আমাদের ইশকুলে রাজু নামের চার-পাঁচ বছরের যে শিশুটি পড়ত এ সেই রাজু শিশুটির দুই হাত ভেঙ্গে দিয়েছিল [১]। এই রাজুরই একটা বোন আছে মৌসুমী নামে। এ-ও এই স্কুলে পড়ত। এই স্কুলের শিক্ষক আমাকে জানিয়েছিল মৌসুমী অনেক দিন ধরেই স্কুলে আসছে না। আমি শুনেও না-শোনার ভান করেছি কারণ এরা এমনই। স্কুলে এদের-কেউ নিয়মিত আসবে এমনটা আশা করাটাই বোকামী।

ফি-রোজ স্কুলে যাওয়া হয় না আমার। এই স্কুলের যে শিক্ষক, আজম- এ কেবল পড়াবার জন্যই পড়ায় না স্কুলের বাচ্চাদের জন্য এর আছে প্রগাঢ় মমতা। খুব সমস্যা না-হলে আমাকে বিরক্ত করে না। ফোন করে আমাকে যখন জানালো মৌসুমি ফিরে এসেছে কিন্তু সেই জাহাঙ্গির এরও দুই হাত ভেঙ্গে দিয়েছে। নরসিংদী না কোথায় যেন সে এই বাচ্চা সমেত ধরা পড়ার পর ওখানে লোকজনেরা খাতিরযত্ম করে জাহাঙ্গিরের পা ভেঙ্গে দিয়েছে। ওখানকারই কোনও সহৃদয় মানুষ মৌসুমির মুখে এখানকার কথা শুনে মৌসুমিকে এখানে পৌঁছে দিয়ে গেছে।
তখন আক্ষরিক অর্থেই আমি বিরক্তি গোপন করলাম। আমার শান্তিতে থাকার দিন শেষ। এবং এর পরের অংশটুকু চোখ বন্ধ করে আমি আগাম বলে দিতে পারি। এখন জনে জনে ঝামেলা হবে।
মৌসুমি এবং শিক্ষক আজম
কপাল, যা ভেবেছিলাম তাই! দুই হাত ভাঙ্গার পাশাপাশি মৌসুমির শরীরে অসংখ্য কামড়ের দাগ ছিল, হাতের একটা নোখ উপড়ানো। আমার মনে হয়েছিল একজন গাইনিকে দেখানোটা অতি জরুরি। পরদিন একে নিয়ে যখন হাসপাতালে গেলাম কোনও গাইনিকে পাওয়া গেল না। শ্লা, কপাল আমার, ড্রেন রাস্তার মাঝখানে চলে আসে! এই হাসপাতালের প্রধান যিনি, এখন আমাকে তার কাছে যেতে হবে। এই ভদ্রলোককে নিয়ে একদা একটা লেখা লিখেছিলাম,‘সম্ভাব্য মৃত্যু’ [২]। তাই এর কাছে আমি বিশেষ প্রিয় পাত্র নই! কী আর করা।
তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানালেন গাইনি ভদ্রমহিলা ট্রেনিং-এ আছেন। আমি জানতে চাইলাম, এই হাসপাতালে গাইনি ক-জন? তিনি জানালেন, তিন জন। আমার পাল্টা প্রশ্ন ছিল, তিন জন হলে এক জন ট্রেনিং-এ, অন্যরা? তিনি হড়বড় করে বললেন, এই তো চলে আসবে। ট্রেনে আছে।
বেলা বাজে তখন বারোটা। আমি রাগ চেপে বললাম, বাচ্চাকে তো আর ট্রেনে নিয়ে গিয়ে দেখাতে পারব না।

যাই হোক, পরদিন গিয়ে একজনকে পাওয়া গেল। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আশার বাণী শোনালেন যে এই সংক্রান্ত জটিলতা থেকে এই শিশুটি মুক্ত। এবার অর্থোপেডিকস ডাক্তার মহোদয়ের কাছে যাওয়া। ইনি আবার কেবল বিশেষ বিশেষ দিনেই হাসপাতালে আসেন। ভাগ্যক্রমে এই দিনটাই বিশেষ দিন। এক্সরে দেখে তিনি জানালেন, শিশুটির হাত ভাঙ্গা হয়েছিল বেশ ক-দিন পূর্বেই এখন জোড়া লাগা শুরু হয়ে গেছে বিধায় আপাতত করণীয় কিছু নেই।
বেশ! হোয়াট নেক্সট, এরপর? এই শিশুটির বাবা নেই মা-ও খানিকটা অপ্রকৃতিস্থ, স্থির হয়ে দাঁড়াতেই পারেন না। তার উপর ভয়ংকর যে খবর সেটা হচ্ছে এই মহিলা বেশ কিছুদিন ধরে উধাও। ফিরে আসবেন এমনটা ধারণা করি না।
এখন এই শিশুটির গতি কী। স্টেশনে রেখে এলে ঝামেলা চুকে যায়? এটাই সহজ সমাধান কিন্তু এর জন্য যে সাহস প্রয়োজন তা আমার নাই। একজন দুর্বল মানুষের এমন সাহস কোথায়...।

সহায়ক সূত্র:
১. পশুর জন্য কেবল জঙ্গলের আইন!: http://www.ali-mahmed.com/2015/05/blog-post_28.html
২. সম্ভাব্য মৃত্যু: http://www.ali-mahmed.com/2013_10_16_archive.html