Thursday, February 19, 2015

‘হর্স-মাউথ’।

প্রফেসর ডা. একেএম ফজলুল হক। একজন কলোরেকটাল সার্জন। এই ভদ্রলোকের দাবী তিনি বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রথম কলোরেকটাল সার্জন। এটা ঘটা করে লিখে বিভিন্ন দৈনিকে নিজের বিজ্ঞাপন নিজেই দেন যে তিনি জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতাল থেকে এখন তিনি বসছেন নতুন চেম্বার ইডেন মাল্টিকেয়ার হাসপাতালে।

কেউ ধানমন্ডিতে ইডেন মাল্টিকেয়ার হাসপাতালে গেলে সবিস্ময়ে লক্ষ করবেন কেবিন নামের খুপরির প্রতিটি দরোজায় এই ডাক্তার সাহেবের নাম লেখা, প্রফেসর ডা. একেএম ফজলুল হক। আমি এর মরতবা বুঝতে পারিনি! ঘটনা কী! এই ডাক্তার সাহেবের কী ধারণা রোগি যাওয়ার সময় কেবিনের দরোজা খুলে নিয়ে যাবে?
রিসেপশনের মনিটরে অনবরত চলছে এই ডাক্তার সাহেবের দেওয়া বিভিন্ন মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার। একটু ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে এই সাক্ষাৎকারের ভিডিও ক্লিপিংগুলো পূর্বেই রেকর্ড করা।

আমাদের দেশের আইনে এমনটা বলা নেই যে কেউ তার সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে আগত লোকজনকে হরদম দেখাতে পারবেন না যেমনটা এমন আইনও নেই যে কেউ গুরুত্বপূর্ণ কোনও আলোচনায় টেবিলে উঠে ‘ধুম মাচা দে’ গানটা গাইতে পারবে না। কিন্তু, একটা কিন্তু থেকে যায়।
চারপাশে কিছু লোকজন আছে যাদের দেখাবার ভঙ্গি বড়ো স্থুল। এদের মধ্যে আমাদের এই ডাক্তার সাহেব যে একজন এতে অন্তত আমার কোনও সন্দেহ নেই। আমি এমন চালবাজ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও পেয়েছি যিনি চেম্বারে ভিনাইলে ইয়া বড়ো করে ঝুলিয়ে দিয়েছেন এই তারিখ থেকে ওই তারিখ পর্যন্ত তিনি ওমুক-ওমুক দেশে বিভিন্ন কনফারেন্সে বক্তৃতা দেবেন। বাস্তবে তিনি তখন পরিবার-পরিজনসহ কক্সবাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

পত্র-পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপনগুলো দেওয়া হচ্ছে এগুলো যে এই ডাক্তারের ঠিক করে দেওয়া এটা বোঝার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হওয়া লাগে না। বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রথম কলোরেকটাল সাজর্ন এটা বিজ্ঞাপনে দেওয়াটা স্থূল কিনা সেই প্রসঙ্গ থাকুক। আমি এই বক্তব্যের সপক্ষে তথ্য ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম ঘুরেফিরে চলে আসছে এই ডাক্তারেরই চালুকরা ওয়েবসাইটগুলো।
এমনকি উইকিতে [১] আমরা তার যে তথ্য পাচ্ছি যে তিনি বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রথম কলোরেকটাল সাজর্ন তাও উইকি নিয়েছে ডা. ফজলুল হকের ওয়েবসাইট থেকেই [২]। এই ডাক্তার সাহেব আরও কিছু ওয়েবসাইট চালু করেছেন যেমন, পাইলস ডট কম বা পাইলসট্রিটমেন্টবিডি ডট কম- সর্বত্র একই কাহিনী! তার মানে অন্য কেউ বলছে না তিনি নিজেই নিজেরটা বলছেন। লাইক আ ‘হর্স-মাউথ’। চিঁহিঁহিঁহিঁ-চিঁহিঁহিঁ!

এটা ডাক্তার ফজলুল হকের বক্তব্য কিন্তু অন্যদের বক্তব্য কি? প্রফেসর ডা: মো: সহিদুর রহমান বলছেন ভিন্ন কথা [৩]:
"…বর্তমানে বাংলাদেশে একজন নিজেকে এই বিষয়ের পাকভারত উপমহাদেশের একমাত্র সার্জন বলে দাবী করছে বিভিন্ন লেখা লেখিতে যা আদৌ সত্য নয়।তিনি কোথাও কোন প্রোগ্রামে অংশ নেননি। তার এই দাবীর কোন তথ্য তার হাতে নেই। বাংলাদেশে আমিই প্রথম, পাকভারত উপমহাদেশে আমিই প্রথম।...

যদিও তিনি নাম বলেননি, সম্ভবত ভদ্রতা করে কিন্তু এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে ‘ওই একজন’ মানুষটা প্রফেসর ডা. একেএম ফজলুল হক। কারণ এমন দাবী যেটা তিনি ব্যতীত অন্য কেউ ভাঙ্গা রেকর্ডের মত বকে যাচ্ছেন এমনটা অন্তত আমার জানা নাই। যাই হোক, এই সব তো গেল ফজলুল হকের বিভিন্ন বিশেষ কায়দা-কানুনের কথা। এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গে। তার কাছে ম্যালিগন্যান্ট আক্রান্ত টিউমার অপারেশন করতে অপারেশনের টাকা কেমন কেমন করে যেন সব মিলিয়ে তিন লক্ষ ছাড়িয়ে চার লক্ষের ঘর ছুঁই ছুঁই করে। কলোনস্কপি, ইকো বা অন্য টেস্টগুলোর খরচ কিন্তু এর বাইরে।

আমার বন্ধু, এক সার্জনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ঠিক এমন একটা অপারেশন করতে কেমন টাকা খরচ হতে পারে? তিনি আমাকে যে হিসেব দিলেন তা বিস্ময়কর! সার্জনের টাকা, ওটির খরচ, ওষুধের দাম এবং হাসপাতালে থাকা বাবত বড়জোর ষাট হাজার টাকা লাগতে পারে।
এই দেশে কারও কোনও জবাবদিহিতা নেই! তাই আমাদের জানার কোনও উপায় নেই ফজলুল হকের মত ডাক্তাররা কেন গলাকাটা টাকা নিচ্ছেন- ‘ইট লাইক আ হর্স’! মাসে আনুমানিক চল্লিশ-পঞ্চাশ লক্ষ টাকা আয় করে কত টাকা ট্যাক্স দিচ্ছেন? বছরে পাঁচ-ছয় কোটি টাকার বিপরীতে তার দেওয়া ট্যাক্স যথার্থ কি না?

সহায়ক সূত্র:
১. প্রফেসর ডা: মো: সহিদুর রহমান, পায়ুপথ ও পাইলস ... : http://www.medicalinfobd.com/index.php/new-book/278-dr-shahidurpg 
২. উইকি: http://en.wikipedia.org/wiki/Professor_Doctor._AKM_Fazlul_Haque 
৩. ডা. ফজলুল হকের ওযেবসাইট: http://www.profdrakmfazlulhaque.com/about.html

No comments: