Search

Saturday, March 6, 2010

ডাক্তার নামের মানুষটা!

এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার কতশত ভয়াবহ অন্যায় করেন তার লেখাজোঁকা নাই। এইসব নিয়ে অসংখ্য পোস্ট দেয়া সম্ভব। আমার পূর্বের একটা পোস্টে এর খানিকটা আঁচ করা যাবে। ডাক্তারদের প্রতি আমার রাগের শেষ নাই।
অনেক সময় আমরা নিজেদের বিকিয়ে দেই ক্ষিধার জ্বালায়। একজন আল মাহমুদ কেন তার কলম বিক্রি করে দেন তা আমি খানিকটা বুঝি, বেচারার জন্য মায়া হয়।

কিন্তু একজন ডাক্তার পুরোপুরি সৎ থেকেও ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এই দেশের জন্য টাকার অংকটা বিপুল- এই দেশে সরকারী চাকুরে ওরফে পাবলিক সার্ভেন্ট এখনও ৫০ হাজার টাকার উপরে বেতন পান না। তারপরও এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার,
দ্বিতীয় ঈশ্বর নামের এই মানুষগুলো কেন অমানুষ হয়ে যান এটা আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জানতে পারব এই ভরসা নাই। এই একটা পেশাকে আমি ঈর্ষা করি

আমি বারবার যে কথাটা বলে আসছি একজন ভালো ডাক্তার, ভালো লেখক মানেই একজন ভাল মানুষ না। ভাল মানুষ বলতে আমার অল্প জ্ঞানে বুঝি, যার আছে প্রকৃতির জন্য এবং প্রকৃতির সন্তানদের জন্য অগাধ ভালোবাসা।

ভাল ডাক্তার তো আছেন কিন্তু ডাক্তার নামের ভালো মানুষ কী নাই! থাকবেন না কেন, আছেন। কুমিল্লার মুরাদনগরের একজন ডাক্তার ইনি প্রতিদিন বিনা ফি-তে শত শত রোগি দেখেন। সকালে অন্তত ২০/৩০ জন রোগি না দেখে নাস্তা করেন না। আশ্রমে থাকেন, আশ্রমে ঘুমান, আশ্রমের কাপড় গায়ে দেন- মহাআনন্দেই আছেন।

মানুষটার কাছে আমি অনেকবার চিকিৎসার জন্য গিয়েছি। কোন এক বিচিত্র কারণে মানুষটা আমাকে পছন্দ করেন। তাঁকে ফি দিতে আমাকে বেগ পেতে হতো। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার যেভাবে টাকা আয় করেন সেভাবে চইলে এই মানুষটা অন্তত দেড় লক্ষ টাকা মাসে বাড়তি আয় করতে পারতেন। কিন্তু এই নিয়ে তাঁর কোন বিকার, উদ্বেগ নেই।

বাংলাদেশে খুব কম ডাক্তার আছেন যারা প্যাথলজি থেকে কমিশন খান না। সাফ হিসাব, ডাক্তার সাহেব যত টাকা টেস্ট লিখবেন তার ৪০ থেকে ৫০ ভাগ টাকা ডাক্তার সাহেব পেয়ে যাবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা যে টেষ্টগুলো লেখেন তা কেবল টাকার লোভে, সীমাহীন লোভ! ওষুধ কোম্পানি থেকে পান নিম্নমানের ওষুধ চালাবার জন্য মাসে মাসে মাসোহারা। ওষুধ কোম্পানীগুলো স্যাম্পলের নামে যেসব ওষুধ দেয় তা বস্তা ভরে বাজারে বিক্রি করে দেন। ওষুধ কোম্পানিগুলো হেন কোন জিনিস নাই যা ডাক্তারকে উপহার দেন না।
আমার জানার খুব আগ্রহ, ডাক্তার সাহেবরা যে আন্ডারওয়্যার পরে থাকেন এটাও কি ওষুধ কোম্পানির দেয়া? অথবা তাঁদের ইস্তারি সাহেবার...?
যে মা-র নরমাল ডেলিভারী করা সম্ভব ডাক্তার সাহেব তার পেট কেটে ফেলবেন কারণ এখান থেকে বড়ো অংকের টাকা তিনি পাবেন। এইসব খুব কমন প্র্যাকটিস।
কোন কোন ডাক্তার বাড়তি যেটা করেন, ট্রলি থেকে পশুর মত ছটফট করতে থাকা মাকে মেঝেতে নামিয়ে দেন টাকা দিতে দেরি হচ্ছিল বলে। ওই মাটা সারারাত আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে করতে ভোরে হাল ছেড়ে দিয়ে মারা যান। এই পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই হারিয়ে যায় একটি শিশু। আইন-সিস্টেম বলে, এই ডাক্তার সাহেবের গোপন কেশও কেউ স্পর্শ করতে পারবেন না। আর আমরা বলি, সবই আল্লাহর ইচ্ছা, মা-বাচ্চাটার হায়াত আছিল না।

আমি প্রায় দু-বছর ধরে ডাক্তার নামের মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আজ পর্যন্ত তিনি প্যাথলজি থেকে ১ পয়সা কমিশন নেননি, কোন ওষুধ কোম্পানি থেকে ওষুধ চালিয়ে দেয়ার নাম করে মাসোহারা নেননি, স্যাম্পল দাবি করেননি। কোন কোম্পানি জোর করে স্যাম্পলের নামে ওষুধ দিয়ে গেলে তা একটা বাক্সে জমান। পরবর্তীতে যাদের অষুধ কেনার টাকা নেই তাদের বিনা পয়সায় দিয়ে দেন।
যাদের ফি দেয়ার সামর্থ্য নাই তাদের এমনিতেই দেখে দেন। এবং ওই মানুষটাকে দেখেন যথাসম্ভব প্রথমে যেন তার এটা ধারণা না হয়, বিনা পয়সায় দেখাচ্ছেন বলে ডাক্তার তাকে অবহেলা করছেন।
একজন রোগীকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত দেখেন যতক্ষণ পর্যন্ত না রোগটা বের করতে পারেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ১ ঘন্টা ১০ মিনিট দেখার রেকর্ড তাঁর আছে! অভ্যাস নেই বলে প্রায়শ রোগী বিরক্ত হয়, ডাক্তার সাব, ছাইড়া দেন, কাজ আছিল।
খুব শান্ত খর্বাকৃতির এই মানুষটা তখন ক্ষেপে যান, আপনি কি আমার কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছেন, নাকি বেড়াতে!

তো, তাঁকে আমার চিকিৎসার জন্য ফি দিলে তিনি নিতে না চাইলে,
আমি বলতাম, আমার কাছ থেকে ফি না নেয়ার পেছনে আপনার যুক্তি, কি বলেন তো শুনি?
তিনি মিনমিন করে বলতেন, আপনি..., তাছাড়া আপনার সঙ্গে...। ইত্যাদি।
তাঁকে আমি সাফ সাফ জানিয়ে দিলাম, আমার কাছ থেকে ফি না-নিতে চাওয়ার পেছনে আপনার যুক্তি আমার পছন্দ হলো না। এমনটা করলে পরবর্তীতে আপনাকে দেখাব না। আপনি যদি এই ফেভারটাই কোন মুক্তিযোদ্ধাকে করেন সেটা একটা কাজের কাজ হয়। এই দেশের সেরা সন্তান এরাই, আমরা না।
আমি সীমা ছাড়াই, আপনি আমাকে কথা দেন, কোন মুক্তিযোদ্ধা এলে আপনি বিনা ফি-তে
তাঁর চিকিৎসা করবেন।
আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। তিনি কথা দিয়েছিলেন।

সেই কথার ভরসা করে আমি মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডো ফযু ভাইকে তাঁর ওখানে পাঠিয়েছিলাম। কারণ ফযু ভাই প্রচন্ড শ্বাস কষ্টে ভুগছেন। তিনি ফযু ভাইয়ে কেবল যত্ম করে দেখেই দেননি। তাঁর জমানো ওষুধ বদলে দামী সব ইনহেলারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, বিনা মূল্যে!
পরে ফযু ভাই একটা শিশুর লাফাতে লাফাতে আমার কাছে এসেছিলেন, চোখ-মুখ আলোয় ঝলমল, এতো বড়ো একজন ডাকতর আমারে কি কইল, জানেন?
আমি নিরীহ মুখ করে বলি, কি কইলো?
কইলো, আপনাগো সেবার লাইগাই আমরা বয়া আছি। দরকার হইলেই চইলা আইবেন, কুনু সমস্যা নাই।

আমি নিজের অজান্তেই শ্বাস ফেলি, আসলে প্রয়োজন কেবল আমাদের একটু সদিচ্ছার। এই ডাক্তারের মত মানুষগুলো যদি খানিকটা এগিয়ে আসেন তাহলে দেশের এইসব সেরা সন্তানদের মৃত্যুর পূর্বে আমাদের মুখে একরাশ, ঘৃণা-থুথু ফেলে মরতে হয় না।

Friday, March 5, 2010

অভাগা মানুষটা দেখবেন আমার চোখ দিয়ে

আমি বিভিন্ন সাইটে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শত-শত পোস্ট দিয়েছি। আমার লেখাগুলো ছিল অনেকটা, চালু ভাষায় খাপছাড়া। এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাদের নাম শুনতে শুনতে কানে তালা লেগে যায় তাঁদের নিয়ে লিখতে আমি উৎসাহ বোধ করতাম না। এদের নিয়ে লেখার লোকের তো অভাব নাই, আমি কেন?

আমার আগ্রহ ছিল, এই দেশে অতি সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অবদান নিয়ে: মুক্তিযুদ্ধে একজন সুইপার, একজন আদিবাসী নারী; আদিবাসি একজন কমান্ডার, একজন সাধারণ হিন্দু বালিকা, একজন বালক, একজন কৃষক, একজন অন্যদেশি, একজন ক্যামেরাবাজ, একজন সাধারণ নেতা(!), একজন কথাবাজ, বীরাঙ্গনাদের কথা; এইসব অজস্র মানুষ।
কেমন কেমন করে যেন আমাদের ধারণা দেয়া হয়েছে, গুটিকয়েক মানুষই এই দেশটা স্বাধীন করে ফেলেছেন, অন্য আর কারও অবদান ছিল না। এবং ওইসব মানুষদের ছায়াতলে আমাদের আজীবন নতজানু হয়ে থাকতে হবে। বুশ ইস্টাইল, হয় তুমি আমার দলে নইলে তুমি খেলা থেকে বাদ, রাজাকার।

আমার অফ-ট্র্যাকের লেখার ভঙ্গি অনেকেই পছন্দ করতেন না, কেন আমি অতি বিখ্যাতদের নিয়ে লিখি না এই নিয়ে পারলে আমাকে শূলে চড়ান, এমন। কখনও কখনও এটাও বলতে ছাড়তেন না, আমি একজন রাজাকার ভাবপন্ন, বয়সে কুলাতে রাজাকার উপাধি দিয়ে দিতেন।
তখন মুক্তিযুদ্ধের উপর ওইসব লেখায় অসংখ্য মন্তব্য পেয়েছি, ভাল লাগল, প্লাসাইলাম, মাইনাইসিলাম, স্যালুট ইত্যাদি। অবশ্য এইসব প্রতিক্রিয়া আমাকে লেখা চালিয়ে যেতে জোর তাগিদ দিত, লেখা তরতর করে লেখা এগুতো। এমনও দেখা গেছে, টাইপ করতে করতে ভোর হয়ে গেছে, নিজের অজান্তেই কখন গাল ভিজে গেছে টেরটিও পাইনি! লিখতে গিয়ে সত্যি সত্যি তখন দমবন্ধ হয়ে আসত। তখন মাথায় কেবল ঘুরপাক খেত, আহারে, কেমন করে এইসব মানুষদের ঋণ খানিকটা শোধ করার চেষ্টা করি।

সুরুয মিয়া (তাঁর প্রতি সালাম), যিনি ২০০৫ সালে ঠিক ১৬ ডিসেম্বর ভোরে আত্মহত্যা করেন। সুরুয মিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে যখন আলাপ করি তখন আমার মধ্যে খানিকটা পরিবর্তন আসে। কেন, আজ বলি:
এই ভদ্রমহিলার ছেলেও বিয়ে করে তাঁকে ছেড়ে গেছে, তিনি কেমন করে সংসার চালান আমি জানি না- তিনবেলা আদৌ খেতে পান বলে আমার মনে হয়নি! তিনি যখন তাঁর গাছের আম-পেপে কেটে আমাকে খেতে জোরাজুরি করছিলেন তখন আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এখান থেকে ভোজবাজির মত উধাও হয়ে যেতে পারতাম যদি। না খেলে মানুষটা বড়ো কষ্ট পাবেন। কিন্তু খাবার গলা দিয়ে কী নামতে চায় শালার, আমার কেবল মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে খাবারগুলো চিবুচ্ছি। কী দীর্ঘ সেই খাওয়ার সময়- মনে হচ্ছিল এই মহিলার মাংস চিবুচ্ছি।

আমার অন্য রকম কষ্ট হচ্ছিল, মুক্তিযুদ্ধটাকে আমরা সবাই মিলে একটা ব্যবসা বানিয়ে ফেলেছি। কেউ এটা থেকে টাকা কামাচ্ছি, কেউ নাম! কিন্তু এই মানুষগুলোর মুখে সামান্য হাসি আনার কোন চেষ্টা আমাদের নাই। কেবল প্লাসাইলাম আর মাইনাইসিইলাম, ব্যস, একেকজন অনেক বড়ো বড়ো দেশপ্রেমিক হয়ে বসে রইলাম! লম্বা-লম্বা বাতচিত সার, সরকার কেন কিছু করছে না? সরকার এসে রাস্তার কলার ছিলকাটা সরিয়ে দিলে আমরা হাঁটব!
ফাঁকতালে আমারও দেশপ্রেমিকের একটা তকমা জোটার সম্ভাবনা দেখা দিল!
শ্লা, প্রবাসে আমরা কয়েক ক্যান বিয়ার খেয়ে পেশাবের সঙ্গে যে টাকা বের করে দেই এই টাকা দিয়ে অন্তত একজন মুক্তিযোদ্ধার ঘরে ঈদ নিয়ে আসা যায়, অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্য!

এরপর থেকে অন্য কোন ওয়েব সাইটে লেখা আমি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলাম। ওখানে লিখলে অনেক পাঠক পড়ল, অনেক হিট হলো, অনেক মন্তব্য আসল। কী লাভ, কার লাভ-
তাতে দেশের এইসব সেরা সন্তানদের কী আসে যায়! এটা একজন নৌকমান্ডো, ফজু ভাইয়ের ঠেলা চালাবার জন্য কী কাজে লাগবে? কী কাজে লাগবে সুরুয মিয়ার স্ত্রীর? কেবল ওনাদের লাল সেলাম লিখে খালাশ! এই লাল সেলাম জিনিসটা কি? কি করে এইটা দিয়ে?
তারচেয়ে নিজের সাইটে লিখে খুব আরাম পাই। যে দু-চারজন পাঠক পড়েন এতেই আমার ভারী সুখ। বাড়তি কোন চাপ নাই।

ক-দিন পূর্বে প্রবাসী একজন দুম করে আমাকে বেশ কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন। এর একটা অংশ মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডোকে দেয়ার জন্য। মানুষটার
টাকার অংক এবং নাম প্রকাশে অনীহা বিধায় এই প্রসঙ্গটা আপাতত উহ্য থাকুক।
কিন্তু
ফজু ভাইকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। অবশেষে পাওয়া যায়, অসুস্থ, প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট তাঁর। তাঁর হাতে টাকা দিলে তিনি তাঁর শীর্ণ হাতে আমার হাত খামচে ধরে রাখেন। এখনও ফজু ভাইয়ের গায়ে কী জোর! আমি তাঁকে বলি, বিদেশ থেকে একজন মানুষ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।
ফজু ভাইয়ের যে অভিব্যাক্তি আমি দেখেছি এটা কি কুবরিক তাঁর ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন? বা মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতি তাঁদের লেখার মাধ্যমে? আমি জানি না, জানি না আমি।
আমি এর ছবি উঠিয়ে রাখতে পারতাম। ইচ্ছা করেনি। পৃথিবীর সব ছবি কি উঠানো যায়, নাকি উঠানো উচিৎ?

প্রবাসী ওই মানুষটি এই টাকা খরচ করার জন্য আমাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন। এখনও তাঁর টাকা থেকে কিছু টাকা আছে,
আমি ঠিক করেছি সুরুয মিয়ার স্ত্রীকে এটা দেব। শেষবার আসার সময় এই মহিলা তাঁর দুর্বল হাত দিয়ে আমার হাত ধরে বলেছিলেন, কথা দেও, তুমি আমারে আবার দেখতে আইবা।
আমি কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু কথা রাখিনি। যাইনি, গিয়ে কি করতাম? আবারও কি তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম, আইচ্ছা, কইনছেন দেহি, আপনের সোয়ামি যুদ্ধ যাওয়ার আগে কেমুন স্বপ্ন দেখছিল? শোনো কথা, যুদ্ধে যাওয়ার আগে আবার স্বপ্ন দেখে নাকি, এইসব স্বপ্ন তো দেখতেন আমাদের বড়ো বড়ো ন্যাতারা!

আমার মনটা অনেকখানি খারাপ হলো, আহা, যে প্রবাসী মানুষটা ফযু ভাইয়দের জন্য এই উপহার পাঠিয়েছেন সেই মানুষটা কী অভাগা, প্রবাসে থাকার কারণে এই দুর্লভ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হলেন, আহা!
কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে, প্রবাস থেকে যখন কেউ বরফ পড়া নিয়ে লেখেন, অন্য ভুবনের আনন্দ নিয়ে বরফের বল একজন অন্যজনের গায়ে ছুঁড়ে দিচ্ছেন, আমি সেইসব বর্ণনা পড়ে যেমন তার চোখ দিয়ে এটা দেখি তাহলে ওই মানুষটা কেন আমার চোখ দিয়ে এমন দৃশ্য দেখতে পাবেন না?

Thursday, March 4, 2010

এ অসভ্যতারই নামান্তর

কখনও কোন নগরে গেলে আমি প্রথমেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, পুরনো স্থাপনা। আমার কেবলি মনে হয়, আমার পূর্বপুরুষদের কেউ ডেকে ডেকে বলছে, কাছে আয়, গায়ে হাত বুলিয়ে দেই। এই অনুভূতিটা আমার নিজস্ব, কেউ হা হা করে হাসলে এতে আমার বয়েই গেছে!

শেকড়হীন, বৈদেশি সাহেবরা, যাদের পূর্বপুরুষ, বাবা-মা নিয়ে কোন বাড়তি আবেগ নাই তারাও আপ্রাণ চেষ্টা করে শেকড়-পুরনো স্থাপনাগুলো যথাসম্ভব সংরক্ষণ করার। আমাদের শেকড় ছড়িয়ে থাকে নারকেল গাছের মত কিন্তু এ নিয়ে আমাদের বিকার নেই!
পূর্বপুরুষদের ছায়া ধরে রাখার আগ্রহ আমাদের নাই, আজিব!

আমাদের দেশে এখনও যেসব পুরনো স্থাপনাগুলো টিকে আছে সাধারণ মানুষদের দেখার যো নেই। কেউ-না-কেউ, কোন-না-কোন উপায়ে দখল করে রেখেছে। কোনটাকে স্কুল বানানো হয়েছে, কোনটা কলেজ, ডিসি সাহেবের অফিস, কালেক্টর সাহেবের অফিস। নয়েতো সরকার বাহাদুরের খাস কোন অফিস, 'দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি' কেন জনসাধারণের জন্য উম্মুক্ত থাকবে না? কেন আমি 'কার্জন হল' ঘুরে ঘুরে দেখতে পারব না? এটা দেখার জন্য কেন আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে হবে?

আমার স্পষ্ট মনে আছে, ময়মনসিংহে এক রাজবাড়ি দেখার জন্য গিয়েছিলাম। ঢুকতেই পারিনি। এটাকে মহিলা কলেজ বানানো হয়েছিল। উল্টো এক লক্ষ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল, কেন আমি না বলে মহিলা কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। নিশ্চয়ই আমার মনে কু আছে, আমি হয়তো বা কোন ছাত্রীকে 'আগওয়া'-অপহরণ করার মতলবে এসেছি।
আমি ভীতু টাইপের মানুষ কিন্তু ওদিনের পর থেকে আমার খানিকটা সাহস জন্মাল, যাক, লোকজন যখন এমনটা ভাবছে আমি ছাত্রী অপহরণ করতে পারি তাহলে মানুষটা আমি একেবারে পুতুপুতু না।



১৯২৭ সালের এই নয়নাভিরাম, সুরম্য স্থাপনাটিকে এখানকার সবাই চেনে পূবালী ব্যাংক বিল্ডিং নামে! কে এদের সঙ্গে তর্কে যাবে ১৯২৭ সালে পূবালী ব্যাংক ছিল, কি ছিল না।
বাইরে মানুষ এবং পোস্টারে সয়লাব। স্থাপনাটার ভেতরে ঘুরে দেখার ইচ্ছা ছিল, একেকটা জানালাই দেখছি ৬ ফুটের উপর। কিন্তু ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে আটকা পড়তে চাইনি এবং আটকা পড়লে আজ পোস্ট দেয়া সম্ভব হতো না এই ভাবনায় সোজা লম্বা দিলাম।



'রানীর কুঠি' বিশাল ধর্মসাগরেই পাশে। ছবি উঠাবো কি ছাই, সাইনবোর্ডের আড়ালে কুঠিটা দেখা গেল তো! এটার ভেতরেও যাওয়া সম্ভব হলো না কারণ এটা দখল করে রেখেছে 'বার্ড'। এটা তাদের অতিথিশালা। আচ্ছা, 'অতিথি শালা' এই জিনিসটা কি, অতিথিশালায় কারা কারা থাকে? না, নামটার সঙ্গে শালা শব্দটা আছে তাই গুলিয়ে ফেলেছি। আমি আরেক অভাগা, ইস্তিরি সাহেবার সন্তানের আপন মামা নাই কিনা! আহা, এই অতিথিশালায় থাকার কোন উপায় আমার নাই, আহারে!

'ড. আখতার হামিদ খান স্মারক বাসগৃহ' এটার দেখি আরেক কাহিনী। রানীর দিঘীর সংলগ্ন পুরনো একটা বাড়িতে ঠিক এমন একটা কথাই লেখা দেখলাম। ইনি কী পুরনো বিখ্যাত স্থাপনা বেছে বেছে কিছু কাল বাস করতেন নাকি? হতে পারে এগুলো ওনার আত্মীয়দের ছিল। তাই হবে।
গুগলে সার্চ দিলে ওনার সম্বন্ধে জানা যাবে কিন্তু আগ্রহ বোধ করছি না। এই দেশের নামী-দামী মানুষদের প্রতি আমার আগ্রহ কম। কারণ এদের মনন স্পর্শ করার ক্ষমতা, এদের সঙ্গে কথা বলার যোগ্যতা, এদর নিয়ে ভাবার মত যথেষ্ঠ ঘিলু আমার নাই।
আফসোস, থাকলে ভালো হতো।

Wednesday, March 3, 2010

মুক্তিযুদ্ধে, একজন ট্যাংক-মানব!

মুক্তিযোদ্ধা এম এ জব্বার।
এই মানুষটা আমার জন্য অসাধারণ এক উপহার নিয়ে এসেছেন। ১৯৭১ সালের গুলির বাক্স।
(আমার জীবনে এমনিতেই জটিলতার শেষ নাই। তাই জটিলতা এড়াবার জন্য আমাদের দেশের চৌকশ গোয়েন্দাদের আগাম বলে রাখি, এই গুলির বাক্সটা খালি।)
 
১৯৭১ সালে এই মানুষটাই পাকিস্তান থেকে আস্ত একটা রাশিয়ান T-55 ট্যাংক নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। জিটি রোড, ওয়াগা সেক্টরে ট্যাংক চালিয়ে পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সীমান্তে চলে এসেছিলেন। 
জব্বার ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব, হানিফ, জহির, হাবিব, তরিকুল ইসলাম চিনু সহ ৬ জন। কিন্তু পালাবার সময় যে ঝামেলাটা হলো তাঁদের কাছে বের হবার পাসওয়ার্ড নাই, তখন বাঙালিদেরকে পাসওয়ার্ড দেয়া নিষেধ ছিল। পাসওয়ার্ড বলতে না-পারলে গেইটে আটকে দেবে! এরপর পরিণাম কোর্ট-মার্শাল। সামরিক আইনে বিচার!
এরপর চিনু ভাই একটা বুদ্ধি বের করলেন। মুলতান রোডে যে অ্যামুনেশন ডিপো ছিল ওখানে সবাই লুকিয়ে রইলেন।
যখন অবাঙালি অফিসার জিপে করে আসলেন গেটের সেন্ট্রি যথারীতি তাকেও আটকে দিল, পাসওয়ার্ড জানতে চাইল? তখন সে অফিসার বলল, 'আসমান জমিন'। এভাবেই জব্বার ভাইরা পাসওয়ার্ড জেনে গেলেন।
কী এক পাগলামী, কী অকল্পনীয় এক কান্ড! একটা রগরগে মুভিকেও হার মানায়! ভারতীয় সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করার পর চলে বিরামহীন জিজ্ঞাসাবাদ- মানুষটা কি পাকিস্তানী চর? ভারতীয় সেনার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে

মানুষটা বলে যাচ্ছেন। আমি শ্বাস আটকে শুনি সেইসব আগুন দিনের কথা, তাঁর অসম সাহসীকতার কথা। কতশত অজানা কথা! আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধা হোমো এরশাদ সাহেবের বীরত্বের(!) কাহিনী। তিনি এবং রওশন এরশাদ যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে। ওখানে ওনারা উর্দুতে বাতচিত করতেন। যারা পালিয়ে আসার জন্য ফাঁকফোকর খুঁজতেন তাদের প্রতি এরশাদ মারাত্মক উষ্মা প্রকাশ করতেন, উর্দুতে:
'শালে, তুমলোগ কে লিয়ে আমলোগ কা জিনা হারাম হো যাতা। ইন্ডিয়া তুমলোগ কা দিমাগ ঘুমা দিয়া'। 
এরশাদ সাহেবের এইসব বাতচিত বাংলাতে অনুবাদ করলে অনেকটা দাঁড়াবে এমন: 'শালারা, তোমাদের জন্য আমাদের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে গেছে। ভারত তোমাদের মাথা এলোমেলো করে দিয়েছে'।
 
মানুষটা এখন একজন সুখি মানুষ। তার আছে ভদ্রস্থ জীবন-যাপন করার সুযোগ। শুনে ভালো লাগে। তার গোলায় আছে ধান, পুকুরে মাছ, চলে যায়। তবুও মানুষটার কী এক হাহাকার! তাঁর সাহসীকতার জন্য তাঁকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়া হয়েছিল। লিখিতাকারেও আছে কিন্তু পরবর্তীতে তিনি প্রবাসে চলে গেলে এই বীরপ্রতীক খেতাবটা গেজেটে উঠেনি তদ্বিরের অভাবে। আজ তিনি একজন খেতাববিহীন মানুষ! সোজা বাংলায় রাষ্ট্র তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকার করে না!
তাঁর আক্ষেপ আমার কানে তালা লাগিয়ে দেয়:
"কেন আমাকে খেতাবের জন্য তদ্বির করতে হবে? কেন? আমি কি এই জন্য আস্ত একটা ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে দেশে চলে এসেছিলাম?ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান একটা T-33 বিমান নিয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, তিনি এই দেশের বীরশ্রেষ্ঠ। তাঁকে আমি স্যালুট করি। আর আমি ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে সফল হই কিন্তু আমাকে তদ্বির না করার অপরাধে একজন খেতাব বিহীন মানুষ হয়ে থাকতে হবে, কেন?"
আমি ক্রমশ নগ্ন হয়ে পড়ি- এক চিলতে কাপড়ের যে বড় প্রয়োজন! এইসব ক্ষেত্রে আমি চুপ করে থাকি, আকাশ দেখি। ভুলেও সামনের মানুষটার চোখে চোখ রাখি না।

 
*বক্তব্যগুলো জনাব এম, এ, জব্বারের নিজস্ব। তাঁর এইসব বক্তব্যর সপক্ষে প্রমাণ এবং সচিত্র-চলমান চিত্র (যার চালু নাম ভিডিও ক্লিপ) আমার কাছে সংরক্ষিত।
**আমার মাথায় নতুন এক ভূত আসন গেড়েছে। এখন থেকে এইসব আগুন-মানুষদের আনন্দ-বেদনা ভিডিও করে রাখব। এঁদের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে, পাল্লা দিয়ে কমছে আমার আয়ু। এ ব্যতীত আমার গতি কী! সুরুয মিয়ার (তাঁর প্রতি সালাম), যে মানুষটা ২০০৫ সালে, ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে আত্মহত্যা করেন। ওইসব অজানা কথা তখন সেলফোনে ধারণ করে না রাখলে আজ কোথায় পেতাম?
জনাব, এম, এ, জব্বারকে নিয়ে একটা সিরিজ লেখার ইচ্ছা আছে, দেখা যাক।


*** হালনাগাদ তথ্য: অবশেষে দেশ তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
 

Tuesday, March 2, 2010

বাংলালিংক, তবুও তোমায় ধন্যবাদ

'বাংলালিংক' সেল কোম্পানিটি অসাধারণ একটা কাজ করে ফেলেছে। 'বাংলালিংক এ্যাডভান্স' নামে দুর্দান্ত এক অফার চালু করেছে। কারও ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে সে ৫ টাকা আগাম ব্যালেন্সের সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
অতি সংকটময় মুহূর্তে কারও টাকা শেষ হয়ে গেলে অন্তত ফোন করে কাউকে বলতে পারবে, ভাইরে, আমি বড়ো বিপদে আছি। এটা ভুক্তভোগি ব্যতীত অন্য কেউ বুঝবেন না, যেমনটা বুঝবেন না পোস্ট-পেইড গ্রাহক।

বিজ্ঞাপনটা দেখে আমার মনটা ভারী বিষণ্ন হয়।
ক-মাস আগের কথা। মাহাবুব ভাই নামে আমার একজন সিনিয়র আছেন। মানুষটা বিচিত্র কারণে আমাকে পছন্দ করেন, আমার যাবতীয় প্রলাপ শোনেন, আমাকে আশার বাণী শোনান। আমার নিজেকে যখন পুরোপুরি বাতিল মানুষ মনে হতো, এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলে ক্ষীণ আশা জন্মাত, হয়তো এখনও পুরোপুরি বাতিল হইনি। মানুষটার এই ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না।
তো, তাঁর সঙ্গে দুনিয়ার হাবিজাবি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হতো, এখনও হয়- কতশত আইডিয়া আমার মাথায় ঘুরপাক খায়। কয়েক মাস পূর্বে কথা প্রসঙ্গে তাঁকে বলেছিলাম, এই আইডিয়াটার কথা। এটার সঙ্গে জুড়ে অসম্ভব মানবিক একটা বিজ্ঞাপনের প্লটও।
তিনি উল্লসিত হয়ে বলেছিলেন, বাহ, বেশ তো!

আমি যখন থেকে সেল ফোন ব্যবহার করি তখন থেকেই প্রি-পেইড গ্রাহক। বেকায়দা অবস্থায় যখন ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায় তখন কতটা অসহায় বোধ হয় এটা আমার চেয়ে কে ভালো জানে।
বেশ ক-বছর আগের কথা। আমাদের ভালবাসা-বাসির প্রথম সন্তান আসি আসি করছে। আসি আসি বাবুর মার তখন উথাল-পাতাল জ্বর। গভীর রাতে আমি ডাক্তারের কাছে যখন ফোন করলাম, সমস্যা বলার আগেই আমার ব্যালেন্স শেষ। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, সেই রাতটা, কী দীর্ঘ একটা রাত!

পরবর্তীতে আমি আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করতাম, কোম্পানিগুলো কেন এমন কোন সুযোগ দেয় না যেন গ্রাহক চরম জরুরী সময়ে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলেও অন্তত দু-চার মিনিট ফোন করতে পারে। পরবর্তীতে রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গে আগাম টাকাটা কেটে নিলেই হয়, সমস্যার তো কিছু নাই। সেই অপেক্ষা আর শেষ হয় না।

এইসব নিয়ে তখন মাহাবুব ভাইয়ের সঙ্গে আইডিয়া শেয়ার করছিলাম। এমন কোন সেল কোম্পানি পাওয়া গেলে এই আইডিয়া নিয়ে চমৎকার একটা ক্যাম্পেইন শুরু করা যায়।
তিনি কিছু সুবিধা-অসুবিধার কথা বললেন। অনেক হিসাব-কিতাবের বিষয় এখানে জড়িত। ইত্যাদি।
আমি বলেছিলাম, এমনিতে সেল কোম্পানিগুলো কত ছাতাফাতা অফার তো দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু লিজেন্ড হলে গেলে নতুন কোন আইডিয়ার বিকল্প নাই। এবং পাশাপাশি ধামাকা বিজ্ঞাপন অন্য কোম্পানিকে শুইয়ে ফেলার জন্য।
আমি চাচ্ছিলাম, গ্রামীন ব্যতীত অন্য কোন কোম্পানি। প্রয়োজনে অন্য সেল কোম্পানিকে বিনে পয়সায় আগ্রহের সঙ্গে আইডিয়া দেব কিন্তু গ্রামীন টাকা দিলেও না। আমি চোখ বুজে এখনই বলে দিতে পারি গ্রামীন নামের এই দানব কালে কালে এই দেশের প্রায় সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে, এমন কী আমরা বিছানায় কেমন কেমন করে সময় কাটাবো, এটাও! এদের সাথে থাকুক প্রথম আলোর মতি ভাইয়া, ওনারা দুনিয়া কাঁপালেন, নাকি বিছানা তাতে আমার কী!
এমন একটা দানবের সঙ্গে জড়াজড়ি থাকতে আগ্রহ বোধ করি না- কামসূত্র আছে কোন দিনের জন্য!

বিজ্ঞাপনটা দেখে
কাল যখন মন খারাপ করে মাহাবুব ভাইকে ফোন দেই, তিনি কঠিন বকা দেন, লিখে রাখেন, আপনার কিসসু হবে না।
আমি মন খারাপ করা শ্বাস ফেলি, লিখে আর কি করব! আমাকে দিয়ে কিসসু হবে না এটা জানার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না, এ তো আমি বিলক্ষণ জানি।
তিনি আমাকে ছাড় দেন না, আপনি কি মনে করে বসে রইলেন!
এর কি উত্তর হয়, এই দেশে যারা আইডিয়া ভাজাভাজি করেন তাদের কাউকে তো আমি চিনি না।
এবার
হয়তো তাঁরও মন খারাপ হয়, আপনি অন্তত ওয়েব সাইটে লিখতে পারতেন।
মানুষটাকে কেমন করে বোঝাই ওয়েব সাইট হচ্ছে গণিমতের মাল, নন-কমার্শিয়াল সেক্স ভলন্টিয়ারের সঙ্গে এর খুব একটা ফারাক নাই। অন্যদের দোষ দেই কোন মুখে! আমাদের দেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলো ওয়েব সাইট থেকে হরদম চুরি-চামারি করেই যাচ্ছে। চোট্টামি সমাপ্ত করে,
লিকারের প্রভাবে মনটা খানিকটা উৎফুল্ল থাকলে বদনা হাতে টাট্টিখানায় যাওয়ার পূর্বে লিখে দেয়, 'ওয়েব সাইট অবলম্বনে'।

এই দেশে চুরি-চামারিটা চলে গেছে শিল্পের পর্যায়ে। একজন ডলি সায়ন্তনি একবেলা ভাত খাইয়ে ১০০ টাকা ধরিয়ে
কাঙালিনী সুফিয়ার গান হাপিস করে দেন, একজন মাহমুদুজ্জামান বাবু অতুল বাবুর গান অনায়াসে নিজের বলে চালিয়ে দেন। অতুল বাবু প্রতিবাদ করলে খোঁড়া যুক্তি দেখান, আমি তো ওঁকে গিয়ে পাইনি। বাহ, বেশ!
সেলিব্রেটিরা আমাদের শেখান কেমন করে অন্যের মাল নিজের বলে চালিয়ে দিতে হয়।

যাগ গে, এই আইডিয়া অন্য একজন বাস্তবায়িত করে দেখিয়ে দিয়েছেন, আমি বিমর্ষমুখে তাঁকে স্যালুট করি। অনেকের কাছে বিষয়টা অতি তুচ্ছ মনে হবে কিন্তু আমার বুকের গভীর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসে, এমন কেন হবে? আমার ভাবনা-আইডিয়া নামের সন্তানগুলো বিকলাঙ্গ হবে কেন? আমি হেরে যাই তাতে ক্ষতি নাই কিন্তু আমার আইডিয়াগুলোর ভ্রুণাবস্থায় মৃত্যু হবে কেন?

কোথাও শেয়ার করলে তা চুরি হয়ে যাবে, মাথায় লুকিয়ে রাখলে তাও কেউ-না-কেউ আগেভাগেই ভেবে বসে থাকবে। কতশত আইডিয়া মাথায় ঘুরপাক খায়। এইগুলো নিয়ে কী করব! আহারে, বাথরুমে ফ্ল্যাশ করার ব্যবস্থা নাই, থাকলে ভালো হতো।

একবার একজন আসলেন, রিয়েলিটি শো করবেন। তিনি আমাকে বাতলে দিচ্ছিলেন, আমি কেমন কেমন করে তার ভাবনাগুলো ভাবব- পেইড রাইটাররা যা করেন আর কী! ভালো পয়সা পেলে পেইড রাইটাররা তাঁদের যন্ত্র দিয়েও লিখে দেবেন, আই বেট!
আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, কেন রে বাপু, আকাশ ছোঁয়া নারকেল গাছে একজন মানুষ তরতর করে উঠে যাচ্ছে এটা কী রিয়েলিটি শো না?
মানুষটা পশ্চাদদেশ দোলাতে দোলাতে চলে গিয়েছিলেন। তা যাক, পুরুষদের পশ্চাদদেশ দোলানো আমায় টানে না।

সফট-ড্রিংকস নিয়ে একটা চমৎকার আইডিয়া আছে, অপেক্ষায় আছি, কবে, কার মাথা থেকে এটা বের হয় তা দেখার জন্য। শ্লা, সব সময় দর্শক হতে ভালো লাগে আর। চুতিয়া আমি, আমার উপর নিজেই বিরক্ত! হুশ! দূর হ মরদুদ, না ফাতেহা, না দরুদ!

Monday, March 1, 2010

কবি নজরুল, আপনি মরে বেঁচে গেলেন

কবি নজরুল। আমার অসম্ভব পছন্দের কবি এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না। কিন্তু "খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে, বি-রা-ট শিশু..." তাঁর এই অমর সৃষ্টি যখন অনুপ জালোটার গলায় শুনি তখন মনে হয় এটা গান না, অসাধারণ এক প্রার্থনা। এটা লেখার পর নজরুল আর এক লাইনও না লিখলে সমস্যা ছিল না। এমনিতেই অমর হয়ে থাকতেন।

আমাদের দেশে অনেকে কখনও কখনও নজরুলকে নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অনাবশ্যক বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। প্রতিপক্ষ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দাঁড় করিয়ে আরাম পান কারণ রবিদাদা হিন্দু। অনেক শিক্ষিত মানুষের মুখে যখন এইসব শুনি তখন মনে হয়, গোবর খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করার পরামর্শ না দিয়ে গতি কী!

নজরুল বেশ কিছু দিন কুমিল্লায় ছিলেন। এটা ভাসা ভাসা জানতাম।
এবার রাণীর দিঘীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, আচ্ছা,
মানুষটা যখন এখানে এসে বসতেন, লিখতেন, আড্ডা দিতেন তখন কি মানুষটার বাবরি চুল ছিল? ছিল কি মানুষটা ভাবুলতায় মাখামাখি দু-চোখ?
আচ্ছা, মানুষটা কি এই দিঘীতে পা ডুবিয়ে বসতেন? আচ্ছা, এখানে কি মাধবী লতার গাছ ছিল? আচ্ছা, প্রমিলাকে যখন চিঠি লিখতেন তখন তাঁর মনে কি ভাব খেলা করত? আচ্ছা, তিনি কি ভুল করেও কখনও
প্রমিলাকে চিঠিতে লিখে ফেলেছিলেন, প্রাণসখি চুম্বন লইয়ো...। লিখে ফেলে ভারী বিব্রত হয়ে ওই কাগজটা কুচিকুচি করে দিঘীর জলে ফেলে দিয়েছিলেন? আচ্ছা, ...?

এই ছবিগুলো উঠাতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে কারণ এর নীচে বসে কেউ-না-কেউ ব্লাডার খালি করছে, যার চালু নাম পেশাব করা।
এই কুৎসিত দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে আগ্রহ হয়নি কারণ এদের দোষে দেই কেমন করে! পেছনে অতি নিকটে কালো যে দেয়ালটা দেখা যাচ্ছে এটা হচ্ছে এই শহরের সভ্য মানুষদের বানানো পাকা ডাস্টবিন! রাজ্যের আবর্জনা ফেলা হয় এখানে।
আমরা বড়ো বিচিত্র জাতি, এ দেশের সেরা সন্তানদের কত রকমে অসম্মান করা যায় এই নিয়ে আমাদের প্রতিযোগীতার শেষ নাই!

ভিক্টোরিয়া কলেজের আয়ত্বের ভেতর নজরুলের এই স্তম্ভটা। যে কলেজ নামের কারখানা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে বের হচ্ছে, এরা স্বাধীনতার সৌধে কুৎসিত কথাবার্তা লিখবে, ততোধিক কুৎসিত ছবি আঁকবে এতে বিস্মিত হওয়ার কী আছে! ধুতুরা গাছে ধুতুরাই তো ধরবে, কেন এটায় স্ট্রবেরি ধরে না এ নিয়ে ফিজুল অস্থির হওয়ার মত বোকামী আর কিছু নাই।

Sunday, February 28, 2010

আমাদের সূর্য-সন্তান, লহ মোর সালাম!

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, পরে উচ্চতর শিক্ষাদানের সঙ্গেও যুক্ত হয়। কবি নজরুলের কারণেও বিখ্যাত রাণীর দিঘীর পাড়ে অবস্থিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি একদা গ্রেটার কুমিল্লার গর্ব, এখনও।

কোথাও গেলে প্রথমেই আমাকে টানে পুরনো স্থাপনাগুলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খানিকটা আঁচ করা সম্ভব হয় তখনকার মানুষগুলো কতটা এগিয়ে ছিলেন।


এর প্রতিষ্ঠাতা রায় বাহাদুর আনন্দ মোহন রায়। আমি কুমিল্লাবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ, মূর্তি নামের ভাস্কর্যটি এখনও অটুট আছে।


কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শহীদদের স্মরণে প্রতীকটির কারুকাজ দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় কী!


গুটিকয়েক শহীদদের নাম।



স্বাধীনতা সৌধ নামের এই স্থাপনার গায়ে অসংখ্য অশ্লীল ছবি, কথা! আমার তোলা অসংখ্য কুৎসিত ছবি থেকে বেছে বেছে খানিকটা সহনীয় ছবি এখানে যোগ করলাম। কখনও ছবি এমন জান্তব হয় উপরের এই ছবিটা না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আমি যখন ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল পেশাবের ছিটা আমার গায়ে এসে পড়ছে!

আমার মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় আসলে সূর্য-সন্তান কারা? যাঁরা এখানে শুয়ে আছেন, তাঁরা? উঁহু। যারা এই ছবিগুলো, কথা এখানে লিখেছে, তারা? উঁহু, আমার মনে হয় না। কারণ ভুল ইতিহাস নিয়ে বড়ো হওয়া এই প্রজন্মকে খুব একটা দোষ আমি দেই না।
তাহলে কারা? এই ব্যস্ততম রাস্তার মাঝ দিয়ে অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন। এটা কারও-না-কারও চোখে পড়েনি এ আমি বিশ্বাস করি না! তাছাড়া এই ভিক্টোরিয়া কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েই আছেন সিকি-আধুলী (আমার আবার সহকারী, সহযোগী অধ্যাপক এইসব মনে থাকে না) পরফেসর (!) সাহেবরা! এইসব সূর্য-সন্তানরা আসলে ভাবেননি এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু। কারণ তারা যে সূর্য-সন্তান, আমাদের দেশের সেরা সন্তান!

ডিসেম্বর, হালের ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে যে কান্নাটা আমরা কেঁদেছি, ওই কান্নার পানি সরে না গেলে দেশে অকাল বন্যা বয়ে যেত এতে অন্তত আমার কোন সন্দেহ নাই। আজ ১৬ ফাল্গুন যার চালু নাম ২৮ ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মাস প্রায় শেষ, আগামী বছরের ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাসে জাতি বিনম্র শ্রদ্ধার নামে আবারও কাঁদার জন্য প্রস্ত্তত হবে, ইনশাল্লাহ। কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে...।

Saturday, February 27, 2010

বন ভয়েজ, বইমেলা

২১ তারিখের বইমেলার মানবস্রোতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। অতি দ্রুত এখান থেকে বেরুতে পারলে বেঁচে যাই। আহা, আমি বেরুতে চাইলেই তো হবে না, মানবস্রোত আমায় বেরুতে দিলে তো!
তাছাড়া আমায় ফিরতে হবে কাফরুল, স্কুটারে ফেরা যাবে না। আমি নিশ্চিত, আটকে দেবে। আবারও এলিয়েন ওরফে আর্মিদের মুখোমুখি হতে চাচ্ছিলাম না। গতবার এই নিয়ে কম হেনেস্তা হতে হয়নি।

হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় থামতে বাধ্য হই, কাশেম প্রকাশনীর কাছে। এই প্রকাশনীর সবগুলো বইই একজন লেখকের! এ পর্যন্ত ওনার ৯৪টি বই বের হয়েছে। লেখক এবং প্রকাশক একই ব্যক্তি। আমি বইগুলোর নাম পড়ার চেষ্টা করি, বোরকাওয়ালীর প্রেম, প্রেমে এতো জ্বালা কেন?, প্রেম একটি ফুটন্ত গোলাপ, ইত্যাদি। আমি ওই লেখকের জরায়ুর জন্য বেদনা বোধ করে ওখান থেকে সরে আসি।

আমার বন্ধুরা বুদ্ধি দিল বাসে করে চলে যেতে, এলিয়েন-আর্মিরা নাকি বাস আটকায় না (আহা, বাস আটকালে নিজেদের চলাফেরায় খুব সমস্যা হয় বুঝি!)। ৪ নাম্বার বাসে করে গেলেই সহজেই চলে যেতে পারব। আমি চোখে অন্ধকার দেখি। বাস আমাকে কোত্থেকে কোথায় নামিয়ে দিয়ে ভুস করে চলে যাবে, তখন আমার গতি কী? পারতপক্ষে সঙ্গে কেউ না-থাকলে আমি বাসে উঠি না।

এরা আমাকে পানির মত সব বুঝিয়ে দিলেন, যথারীতি আমি কিছুই বুঝলাম না। রাসেল, মাশা এঁরা আমার সম্বন্ধে খানিকটা ওয়াকিবহাল, এঁদের মনটাও নরোম। এরা বললেন, 'ঘটনা বুজছি আর বলতে হবে না। আসেন শাহবাগ যাই, চা-চু খাই। ওখান থেকে আপনাকে বাসে উঠিয়ে দেব'।
আমি
মহা আনন্দে এদের পিছুপিছু হাঁটতে থাকি, এরা হাঁটলে আমি হাঁটি, থামলে থামি। ফাঁকতালে কথা, ভাবনা চালাচালি হতে থাকে। বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া, সিগারেট টানার সঙ্গে অন্য আনন্দের তুলনা কোথায়?

অসম্ভব ব্যস্ত শাহবাগ চৌরাস্তা পেরুতে হবে। এদের সঙ্গে আমিও অপেক্ষা করি। এরা হাঁটা ধরলে আমিও হাঁটা ধরি, থামলে থামি। কোথাও একটা ভজকট হয়ে যায়, মাঝ রাস্তায় বেকুবের মত দাঁড়িয়ে আছি। আরেকটু হলেই স্কুটার গায়ের উপর উঠে আসত। রাসেলের চিল চিৎকার, 'আপনি নিজেও মরবেন, সাথে আমারেও মারবেন'।
রাস্তা পার হওয়ার পর রাসেল চোখ লাল করে রাগে লাফাতে থাকেন, 'আচ্ছা, বিষয়টা কী! হে, বিষয়টা কী! আর একটু হইলেই তো কাম সারছিল! বাড়িত থিক্যা কি বিদায় নিয়া আইসেন?'

আমি মুখে বোকা বোকা হাসি ঝুলিয়ে রাখি। কি বলব, এই প্রশ্নের কী উত্তর হয়!
রাসেলের রাগ কমে না, 'এইটা আপনের মফস্বল না, এইটা ঢাকা শহর। এইখানে মানুষকে প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটতে হয়'। নইলে সব শেষ'।
আমি উদাস হয়ে সিগারেট টানতে টানতে বলি, 'তাই! মন্দ কী, মাঝে মাঝে জীবনটা বড়ো ক্লান্তিকর মনে হয়'।
রাসেল নামের মানুষটা একসময় হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু রাগ কমে না, 'আপনে আর ঢাকা আইসেন না। ঢাকা শহর আপনের জন্য না। আমি লেইখা সই কইরা দিব, আপনে ঢাকা শহরে চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত-অচল'!

তিনি এই অচল মালকে মাশার কাছে হস্তান্তর করে বিদায় নেন। আমি যেদিকে যাব মাশা যাবে এর উল্টোদিকে। বাসের জন্য অপেক্ষার একশেষ! ৪ নাম্বার বাস তো আর আসে না। সব ৩ নাম্বার। আজ ৩ নাম্বাররা সব দলে-দলে বেরিয়ে পড়েছে! মাশা হচ্ছে একটা চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া- এ কেমন করে সব মুখস্ত করে বসে থাকে আমি ভেবে ভেবে সারা। দুনিয়ার তাবৎ বই পড়ে বসে আছে, জিজ্ঞেস করামাত্র গড়গড় করে বলে দেয়, এমন।
তো মাশা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, ৩ নাম্বার বাসে গিয়ে ফার্মগেটে নেমে কেমন কেমন করে পৌঁছা যাবে। আমি হুঁ-হুঁ, ও আচ্ছা-আচ্ছা করছি কিন্তু এর বুঝতে বাকী থাকে না, এটা পন্ডশ্রম। মাশা নামের দয়াবান মানুষটা বলেন, 'চলেন, ফার্মগেট পর্যন্ত আমিও যাই'।
অবশেষে ফার্মগেটে ৪ নাম্বার বাসে উঠিয়ে কন্ডাকটরকে বলে দেন, 'মামা, অসুস্থ মানুষ একটু কাফরুল নামায়া দিয়েন'। মানুষটা বিদায় নেন।

বাসে উঠে আমি গভীর শ্বাস ফেলে বলি, প্যারাডাইস লস্ট। বন ভয়েজ, বইমেলা। আগামীতে তোমার সঙ্গে দেখা হবে এ আশা ক্ষীণ!

Friday, February 26, 2010

ঘুষ দিতে আমার মোটেও আপত্তি নাই

দুর্নীতির প্রধান একটা স্তম্ভ, ঘুষ। এই দেশে সুযোগ পেলে ঘুষ কে খান না এটা গবেষণার বিষয়! খানিকটা ঘুরিয়ে বললে ঘুষ খান না, বেশ, কত টাকা খান না? অবশ্য একটা অংশ আছে যাদের সুযোগ এবং সাহসের অভাব।
খুব অল্প মানুষই আছেন যারা তাঁদের নীতিতে অটল- মরে যাবেন তবুও ঘুষের টাকা ছুঁয়েও দেখবেন না।

একজন আমলা সাহেব ৩ কোটি টাকা খরচ করে এম, পি পদে দাঁড়ান। এই খরচ কেমন করে যুগিয়েছেন, একজন শিক্ষিত মানুষকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, ইনি ম্যালা টাকা বেতন পান। এই ম্যালা টাকা কত?
এই দেশে, এই পদমর্যাদার সরকারী চাকুরে কেউ ৫০ হাজার টাকার উপরে বেতন পান বলে আমার জানা নাই।

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, গড়ে তিনি ৫০ হাজার টাকা করে বেতন পেতেন। পুরো টাকাটাই জমাতেন। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, ইনি অতি হিসাব করে চলতেন। ইনার ইস্তিরি সাহেবার মাত্র দুইটা কাপড় ছিল। একটা গায়ে দিতেন অন্যটা শুকাতে। ওনার ছাওয়াল-বাচ্চারা ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে, ফ্রি হাই-স্কুলে, ফ্রি কলেজে, ফ্রি ভার্সিটিতে নেকাপড়া (!) করে তাবড়- তাবড় ডিগ্রি বাগিয়েছেন। তর্কের খাতিরে আরও ধরে নিলাম, ইনি আলু চাষ করতেন, তিন বেলায়ই আলু খেতেন (সাবেক সেনাপ্রধান আলু খাওয়ার আইডিয়াটা সম্ভবত এখান থেকেই বাগিয়েছিলেন)। বেলায় বেলায় আলুর জুস, আলুর সরবত, আলুর নুডুলস, আলু ফ্রাই, হট ডগের বদলে আলুডগ, আলুর সুরুয়া ইত্যাদি।

এইসব করেও ৩ কোটি টাকা জমাতে মাত্র ৫০ বছর লাগবে। মাত্র ৫০ বছর। এবং আমরা এটাও জেনে আনন্দিত হবো, যেহেতু ৫০ বছর ধরে চাকুরীতে থাকতে হবে তাই ওনাকে বালকবেলায় (যখন মানুষ ঢোলা-ঢোলা হাফ-প্যান্ট পরে এবং বসলে ইয়ে দেখা যায়) চাকুরিতে যোগ দিতে হবে এবং তখনই ৫০ হাজার টাকা মহিনা-বেতন পেতে হবে।

ঘুষ না দেয়ার কারণে জীবনে আমাকে অনেক যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফিরিস্তি অনেক লম্বা। সাধারণ একটাই বলি, বাড়তি টাকা-ঘুষ দিতাম না বলে আসনবিহীন টিকেট পেতাম। ট্রেনে উঠার পর সবাই ঘুষ দিয়ে ফাঁকতালে খালি আসন ম্যানেজ করে ফেলত। আর চুতিয়া আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করেছি। অবশ্য বই পড়তে পড়তে সময়টা কেটেই যেত।

স্রোতের বিপরীতে গিয়ে লাভ নাই, এই ক্ষমতাও আমার নাই।
এখন থেকে ঠিক করেছি ঘুষ দেব, দেবো না কেন? আমি দেব। কেবল চাহিদা মাফিক ঘুষের টাকাই দেব না, বোনাসও দেব।
তবে...।
ঠিক করেছি, বিভিন্ন টাকার মাপে কাগজ কেটে নিজস্ব টাকা বানাব। গভর্নরের স্বাক্ষরের জায়গায় আমার স্বাক্ষর থাকবে। কাউকে চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিলে সরকারের ছাপানো আসল টাকার সঙ্গে আমার টাকাও দেব। একদম ফ্রি!
আগাম সতর্কতা: পোস্ট এখানেই শেষ।

(পরের অংশটুকু সূক্ষরূচির পাঠকেদের জন্য না। যাদের রূচি আমার মত ভোঁতা তাদের জন্য)।

আমার টাকাগুলোর মাপের কাগজগুলোর নমুনা এমন। ৫০ টাকার সমান নোটে লেখা থাকবে 'আবর্জনা খা'। ১০০ টাকার নোটে 'গু খা'। ৫০০ টাকার নোটে 'কাচা গু খা'। ১০০০ টাকার নোটে...। 


*ঘুষখোর ব্যাংকের গভর্নর: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_3654.html

Thursday, February 25, 2010

হুজুগে বাংগাল (!)

পূর্বের একটা পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম, ঠিক ২১ ফেব্রুয়ারি বইমেলায় যাওয়ার একটা উদ্দেশ্য ছিল আমার। কাছ থেকে লোকজন দেখা, এদের আবেগ-ভাবনা স্পর্শ করার চেষ্টা করা।

বইমেলায় মানব-স্রোত দেখে আমার মনে হচ্ছিল, আজ আর কেউ বাড়িতে নাই সবাই বইমেলায় চলে এসেছে! আমি কান পেতে অনেকের কথা শুনছিলাম, এদের অধিকাংশদের মধ্যেই আবেগের ছিটেফোঁটাও নেই। বিচিত্রসব উদ্দেশ্য, কোনটাই ভাষা-বইমেলার সঙ্গে যায় না।
লাভের লাভ যা হয়েছে আমাকে কষ্ট করে রাস্তা খুঁজে বইমেলায় যেতে হয়নি। এরাই আমায় নিয়ে গেছে। বহু দূরে এক জায়গায় কেবল দাঁড়িয়েছিলাম, অনেকটা সময় পর আবিষ্কার করলাম, কেমন কেমন করে যেন আমি বইমেলার ভেতরে চলে এসেছি। এই ম্যাজিক দেখে আমি মুগ্ধ!

আমি নিজে যেটা করেছিলাম, দুই হাত উপরে তুলে হ্যান্ডস আপের ভঙ্গিতে ছিলাম। না, নড়েছো কি মরেছো বলে কেউ মাথার উপর হাত তুলতে বলেনি, কাজটা ছিল ইচ্ছাকৃত। আমি আসলে নারীঘটিত কোন জটিলতায় যেতে চাইনি। এই মানবস্রোতে কোন এক তাড়কা রাক্ষসি টাইপের মহতরমা অন্যের দায় আমার উপর চাপিয়ে ফট করে বলে বসলেন, এই আমার গায়ে হাত দিলি কেন? অভিযোগ খন্ডাবার প্রমাণ কোথায়, বাওয়া? হাতি যেমন কলাগাছের ভর্তা করে ফেলে আমাদের দেশের অতি উৎসাহী আমজনতা আমাকে মানবগাছের ভর্তা করে ফেলত। একটাই প্রাণ, মরলে আর বাঁচার উপায় ছিল না আমার!

বইমেলার প্রকাশকদের জন্য শংকা বোধ করছিলাম। আজ এদের কি উপায় হবে? এই মানবস্রোত, এদের দশ ভাগের এক ভাগও যদি একটা করে বই কেনে তাহলে নিমিষেই স্টলগুলোর বইয়ের তাক খালি হয়ে যাবে। এরপর এরা কি করবেন! আহারে, বেচারা প্রকাশক!

কিন্তু কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা হলো। এরা মুখ লম্বা করে উদাস হয়ে বসে আছেন। মুখ অন্ধকার করে বললেন, অন্য দিন যা বিক্রি হয় আজ তার চেয়ে বিক্রি অনেক কম।
বই তো আর উড়ে উড়ে পাঠকের নাকের ডগায় বসে না, পাঠককে এগিয়ে আসতে হয়, বই উল্টেপাল্টে দেখতে হয়। সেই সুযোগ কোথায়, এই মানবস্রোত দাঁড়াতে দিলে তো!

আমার মোটা মাথায় এটা ঢুকছিল না, এই মানবস্রোতের এখানে আগমণের উদ্দেশ্য কী! নাকি 'হুজুগে বাংগাল' নামটার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে গিয়ে এই ক্লেশ! ভনিতাবাজি!

*আমাদের ভনিতাবাজির খানিকটা নমুনা এখানে,
"১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ আবুল বরকতের ছোট ভাই এর ছেলে আলাউদ্দিন বরকত বলেন, চাচা শহীদ হবার পর আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশের অনুষ্ঠানে কিংবা বই মেলায় আমাদের কেউ কোন দিন ডাকেনি।..."
.................


Wednesday, February 24, 2010

এক কাপ চায়ে দু-কাপ চিনি

অসাধারণ ব্যক্তিগণ কিছু চালু কথা চালু করে গেছেন। 'দা থেকে আছাড় বড়ো', 'বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচী', 'দারোগার নৌকার মাঝির শালা' ইত্যাদি।
আমরা সাধারণ যারা তারা বসে থাকব বুঝি? তাই 'এক কাপ চায়ে দু-কাপ চিনি'। উপায় কী, কখনও কখনও এর বড্ডো প্রয়োজন দেখা দেয়!

কোটি-কোটি বাচ্চা প্রসব হয়, এটা কোন খবর না কিন্তু বিমানে কোন বাচ্চা প্রসব হলে তা অবশ্যই খবর। এবারের বইমেলায় হাজার-হাজার বই বেরিয়েছে, মোড়ক উম্মোচন হয়েছে কিন্তু এইসব আলোচনায় আসে না।
পত্রিকার খবর, রাজধানীর একটা হোটেলে এম আসফউদ্দৌলার প্রবন্ধ 'অব পেইনস অ্যান্ড প্যানিকস' (
'প্যানিকস' শব্দটা পড়ার সময় সতর্কতা আবশ্যক। তাড়াহুড়োয় সর্বনাশ হয়ে যাবে, বেইজ্জতির একশেষ)। বইটির মোড়ক উম্মোচন করা হয়।

রাজধানীর এই হোটেলটির নাম এখানে দেয়া হয়নি এমন কি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও বলা হয়নি কিন্তু এই হোটেলটির কার্পেটের নকশা দেখে নিশ্চিত হয়েছি এটা ফাইভ স্টার হোটেল সোনারগাঁ।
দেশের বাঘা বাঘা সুশীলগণ এখানে তশরীফ এনেছিলেন। ভদ্রতার খাতিয়ে এঁদের জন্য নানাপ্রকার চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় এবং মুত্রত্যাগ এই সবের সুব্যবস্থা ছিল বলেই অনুমান করি।

যেখানে প্রকাশকবৃন্দ লেখকদের বাদামের খোসাও ধরিয়ে দিতে চান না সেখানে অখ্যাত এই প্রকাশনী এই লেখক বই প্রসব করামাত্র পাঁচ তারকা হোটেলে মোড়ক উম্মোচনের নামে যে মাস্তির আয়োজন করেছিলেন এ লা-জবাব। আমি এমন লেখকের জরায়ুকে সেলাম জানাই।

আমি খসড়া
একটা হিসাব করে দেখেছি, বইটার অন্তত ১ লক্ষ কপি বিক্রি হলে প্রকাশক সাহেবের এই উদ্যোগ নেয়াটা স্বাভাবিক মনে হতো। আমার জানামতে, বাংলাদেশে এখনও কোন একটা বই ১ লক্ষ কপি বিক্রি হয়নি, তাও আবার প্রবন্ধ! এই বইটা কিনতে গিয়ে মারামারি করতে গিয়ে মেলায় দু-চার জন বিচি, নিদেনপক্ষে দাঁত হারিয়েছেন এমনটাও এখনও শুনিনি। জাস্ট কৌতুহলের কারণে এই প্রকাশনীর স্টলে কয়েক দফা সময় নস্ট করেছি কিন্তু কাউকে তখন বইটা কিনতে দেখিনি। অনুমান করি, আমি ওখান থেকে সরে আসা-মাত্র হাজার-হাজার বইক্রেতা পঙ্গপালের মত বই কেনার জন্য স্টলটাতে ঝাপিয়ে পড়েছেন। আফসোস, এই দৃশ্য চাক্ষুষ করতে পারলুম না।
তাই হবে! এরাই লেখক বাকীসব তক্ষক।

Tuesday, February 23, 2010

আদিমানুষ: পড়ো, শক্তিমানের নামে



পার্শ্ববর্তী দেশে উপাসনালয় (বাবরি মসজিদ) ভাঙ্গলে আমাদের দেশে রক্তগঙ্গা বয়ে যায়। একেকজনের শরীরে তখন কী জেহাদী জোশ! এই দেশের যে মানুষটি দাঁড়াবার ভঙ্গিই এখনও শেখেনি, শেখেনি কারও দিকে তাকালে মুখ বন্ধ রাখার ভব্যতা। পেশাবের পর যে মানুষটি প্রকাশ্যে যন্ত্র ধরে হাঁটাহাটিঁ করে, কাশাকাশি করে; সেই মানুষটার হাতেও নাঙ্গা তলোয়ার শোভা পায়।
অথচ এখন এই আমাদের দেশেই উপাসনালয় আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, পদদলিত করছে এটা তেমন কোনো বিষয় না। কারণ, এঁদের প্রতিরোধ করার সেই ক্ষমতা কই!

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঘাইহাটে যে কান্ডটা ঘটে গেল এটা দেখার পর একজন ইসরাইলির সঙ্গে নিজের খুব একটা তফাত খুঁজে পাচ্ছি না। এবং প্যালেস্টাইনদের প্রতিও আলাদা করে মমতা দেখাবার উৎসাহ পাচ্ছি না। আদৌ এই নিয়ে আদিখ্যেতা দেখাবার প্রয়োজন আছে বলেও আমার মনে হয় না।

বাঙ্গালিরা আদিমানুষদের (আমরা এদের অবজ্ঞা করে কখনও উপজাতি বলি, কখনও আদিবাসি) প্রতি তাদের ক্ষোভ জানিয়েছেন। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। কিন্তু
আদিমানুষদের ভয়ংকর অভিযোগ আছে, (যেটা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এসেছে ) সেনাবাহিনী বাঙ্গালীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছে, আদিমানুষদের সঙ্গে নৃশংস আচরণ করেছে!
মা-হারা সুনীতার চোখের সামনে যখন তার মার মৃত্যু হচ্ছিল তখন তার মাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলে আর্মি তাদের দিকে বন্দুক তাক করে। তারা বাধ্য হন বন্দুকের মুখে মুমূর্ষু এই মাটাকে মৃত্যুর কোলে ফেলে পালিয়ে যেতে। এমন অজস্র উদাহরণ!

এই ঘটনাগুলো ঘটল ২০ ফেব্রুয়ারি, যখন গোটা জাতি তাদের ভাষার লড়াই, অস্তিত্বের লড়াইয়ের দিনটাকে নতজানু হয়ে স্মরণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমরা আমাদের সেই লড়াইটা নিয়ে অহংকার করি কারণ আজ আমরা বাঙালিরা বিজয়ী, শক্তিশালী। পাকিদের বিরুদ্ধে লড়াইটা আমরা জিতে গেছি, না-জিতলে এই পাহাড়িদের মতই হতো আজ আমাদের অবস্থা।

এই পাহাড়ি নামের আদিমানুষদের ভুবনটা তছনছ করা শুরু করি আমরা আশির দশকে। এর পুরোটা ক্রেডিট দিতে হয় জিয়াউর রহমান সাহেবকে। তিনি পুনর্বাসনের নামে পাহাড়ে বাঙ্গালিদের পাঠাতে শুরু করেন। ধুতুরা গাছটা তখনই লাগানো হয়ে গিয়েছিল, কালে কালে এতে ধুতুরা ফল ধরবে এতে অবাক হওয়ার কী আছে?


আজ আমরা পাহাড়িদের খুঁত ধরি। কিন্তু কোনঠাসা, পাহাড়ের এইসব মানুষদের পিঠ ঠেকাবার জন্য পেছনের গাছও অবশিষ্ট রাখছি না আমরা।
আমরা এইসব আদিমানুষদের ভব্যতা শেখাবার নাম করে আমাদের মত করে কথা বলাবো, আমাদের মত পোশাক পরাবো, আমাদের মত করে ভাবতে শেখাবো। একদা এদের ভাষা কোনো এক পাহাড়ে হারিয়ে যাবে।

আহারে, এদের তো একজন মতিউর রহমান নাই যে, জন রীডের ভাবনা ধার করে গ্রামীনের মত জোঁকের হাত ধরে, 'পাহাড় কাঁপানো ২০ ফ্রেব্রুয়ারি' নামে একটা সার্কাসের আয়োজন করবেন। বা আমাদের গাফফার চৌধুরী সাহেব ফেনীর জয়নাল হাজারীকে নিয়ে গান রচনা করা থেকে অবসর পেলে একটা গান রচনা করে ফেলবেন, 'আমার পাহাড়িদের বাড়তি রক্তে রাঙানো...'।

খর্বাকৃতির চেয়েও ক্ষুদ্র খুঁজে পাওয়া যায়। পাকিদের কাছে অনেক মার খেয়েছি দুর্বল আমরা, আর না। এবার আমাদের পালা। বিশ্বের কাছে সেই ক্ষুদ্র আমরা পদে পদে অপদস্ত হই। এবার আমাদের পালা। আমাদের আছে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মার্সেনারি, আছে সুশীল সমাজের বুদ্ধি। এবার আমাদের আর পায় কে?

অসহ্য ক্ষিধা নিয়ে সভ্যতা-লোভ-যান্ত্রিকতার কাঁধে ভর দিয়ে শহর ক্রমশ এগিয়ে আসছে। গ্রাস করে ফেলছে প্রকৃতি, প্রকৃতির আদি-সন্তানদের। পাহাড় থাকল, না আদিমানুষ তাতে কী আসে যায়! এই দানবকে থামাবার সাধ্যি কার? সহসাই আমরা সগর্বে বলব, 'দিস ইজ মাই ল্যান্ড, নো পাহাড়ি রাইডস হিয়া()'।

*ছবি ঋণ: রবি শংকর, কালের কন্ঠ

** জামাল ভাস্করের ধারাবাহিক লেখা। হেথাক তুকে মানাইছে নারে: http://www.amrabondhu.com/vashkar/1591 

সহায়ক সূত্র:
১. ইসরাইল...: http://www.ali-mahmed.com/search/label/%E0%A6%87%E0%A6%B8%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%B2
২.  মতিউর...:  

Monday, February 22, 2010

আমারব্লগ, মলাটবন্দি: স্বপ্ন এবং বাস্তব


গতকাল ২১ ফ্রেব্রুয়ারি আবারও বইমেলায় যাওয়া হলো। ঠিক ২১ তারিখে যাওয়ার একটা বিশেষ কারণ ছিল। সেটার বিস্তারিত অন্যত্র, অন্য পোস্টে বলব।

সালটা ২০০৭। তখন আমি একটা ওয়েব সাইটে শুভ নিকে ব্লগিং-এর নামে লেখালেখি করি। ওখানকার পোস্টগুলো নিয়ে "শুভ'র ব্লগিং" নামে একটা বই বের হলো। বাংলায় ব্লগিং-এর উপর প্রথম বই, আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু ওই সময় অনেকখানি বিষাদগ্রস্ত ছিলাম। কারণটা এখন বললে অনেকের কাছে হয়তো বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না। না হোক, তাতে আমার আবেগের কী আসে যায়, ঘন্টা!

আমি যাদের সঙ্গে ওখানে দিনের পর দিন লেখালেখি করেছি, মন্তব্য চালাচালি করেছি। যাদের লেখার ক্ষমতা আমাকে হতভম্ব করেছে, পারলে এঁদের হাতগুলো সোনা দিয়ে বাঁধাই করে দেই! এঁদের বিচিত্র ভাবনা, লেখার ক্ষমতা দেখে আমি হিংসায় মরে যাই।
অথচ আমার আস্ত একটা বই বের হলো- আমার নিজেকে কেমন অপরাধি অপরাধি লাগছিল। আমি এটা মেনে নিতে পারছিলাম না, কেন এঁদের অন্তত একটা করে লেখা নিয়ে বই বের হবে না?

তখন চেষ্টা করেছিলাম ওখানকার অন্তত ১০০জন ব্লগারের লেখা নিয়ে একটা বই বের করতে। কিন্তু পারিনি, ব্যর্থ হয়েছিলাম। আমি এই বেদনাটা আজও ভুলিনি! তখন এইসব নিয়ে অসম্ভব মন খারাপ করে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম: একজন দুর্বল মানুষের দুর্বল মস্তিষ্ক

মেলায় এবার আমার থাকার জায়গাটা ছিল লিটল ম্যাগ চত্ত্বরে। অনেক কারণের একটা হচ্ছে জায়গাটা তুলনামূলক ফাঁকা। অন্তত শ্বাস ফেলা যায়, পরিচিত লোকজনের সঙ্গে দু-চারটে কথা বলা যায়।
প্রায় সবাই নিজ নিজ দলের সঙ্গে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ান, আমি দলছুট টাইপের মানুষ- না ঘার কা, না ঘাট কা। আমি পারতপক্ষে এখান থেকে নড়ি না কারণ বইমেলা নামের এই ব্যবসায়িক বাজারে (মতান্তরে ঠাঠারি বাজার) হারিয়ে যাব।

এখানে আবার আমার ব্লগের স্টল। আজ 'মলাটবন্দি আমারব্লগ' বইটা কিনলাম। আক্ষরিক অর্থেই মুগ্ধ। সবচেয়ে বেশি টেনেছে নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে ব্লগারদের নাম দিয়ে লেখা সাজানো- কারও ট্যাঁ ফো করাও যো নাই। আমার ব্লগের এই প্রকাশনীটা প্রায় নিখুঁত একটা কাজ হয়েছে। এখনও পড়া শুরু করিনি। এখানকার অল্প ব্লগারই আমার পরিচিত, তাতে কী! বরং এও ভাল নতুনদের ছড়াছড়ি। একজন নতুন লিখিয়ের কাছে একটা লেখা প্রকাশ হওয়ার যে কী আনন্দ এটা আমি খানিকটা বুঝি। এক সময় পত্রিকার পাতায় চিঠিপত্র কলামে আমার কয়েক লাইনের লেখা ছাপা হতো। ওই আনন্দের সঙ্গে কিসের তুলনা হয়, আজ আর সেই আনন্দ কোথায়!

আমি খানিকটা আঁচ করতে পারি এটা বার করাটা চাট্টিখানি কথা না। এর পেছনে আছে এক ঝাঁক হার-না-মানা, অদম্য তরুণ। সেইসব তরুণ যারা ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে গান গাইতে গাইতে হাঁটতে জানে! কেবল এরাই পারে সব কিছু বদলে দিতে। কাল আমার ব্লগের স্টলে আমি যখন
'মলাটবন্দি আমারব্লগ' বইটা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলাম, তাঁদের এই উচ্ছ্বাস তেমন স্পর্শ করতে পারেনি, এ আমি বিলক্ষণ জানি। কারণ এরা জানেন না, আমি যে কাজটা করতে পারিনি এঁরা তা করে দেখিয়ে দিয়েছেন। হার-মানা আমার কাছে এরচে আনন্দের আর কি হতে পারে।

*ছবি ঋণ: http://dewdropsreturn.amarblog.com/posts/99566

Sunday, February 21, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৪


লোপার রাগ অনেকখানি উবে গেছে। রাব্বিকে কেমন অস্থির-অস্থির লাগছে। মানুষটা এমনিতে বড়ো অস্থির কিন্তু বেশ কয়েক মাস ধরে এ অনেকখানি পাল্টে গেছে। এর স্বাভাবিক জীবন-যাপন, নিজের সময় বলতে কিছু নেই। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। একটা কথা জিজ্ঞেস করলে হা-হু বলতেও বড্ড কষ্ট হয় এমন। বারবার জিজ্ঞেস করলে ঘুরেফিরে একটাই উত্তর, অফিসে খুব ঝামেলা যাচ্ছে।
কি ঝামেলা জিজ্ঞেস করলেই চিড়বিড় করে উঠে, আহ, আমি অফিসের সমস্যা নিয়ে তোমার সাথে ডিসকাস করব নাকি! কী যন্ত্রণা, আমাকে কী লিখিতাকারে তোমার কাছে রিপোর্ট করতে হবে! তুমি কি আমার বস?

লোপা অবাক হয়ে ভাবে, মানুষটা কতো বদলে গেছে। মানুষটা শেষ কবে তাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে, শেষ কবে গল্প করেছে, শেষ কবে তাকে কাছে টেনেছে মনেও পড়ে না। মানুষটা একটা রোবট হয়ে গেছে। আজ আট বছর হলো ওদের কোন সন্তান নেই। এই নিয়েও মানুষটার কোন বিকার নেই। হা-হুতাশ নেই, কোন চেষ্টা নেই। লোপার এটা আজও বোধগম্য হয় না, একটা মানুষ সন্তান নেয়ার ব্যাপারে কেমন করে এতোটা নির্বিকার থাকে। এই বিষয়ে কিছু বললেই গা-ভাসানো উত্তর, এতো অস্থির হওয়ার কী আছে। যখন হওয়ার এমনিই হবে।

এটা কেমন কথা। এতো বছর হলো, সন্তান না-হওয়ার পেছনে কোন না কোন জটিল একটা সমস্যা আছে নিশ্চয়ই। কার সমস্যা, কেন সমস্যা এটা জানাটা কি জরুরি না? অন্তত ডাক্তারের কাছে না-যাওয়ার পেছনে যুক্তি কী। চুপিচুপি লোপা ডাক্তারের কাছে যায়নি এমন না কিন্তু কিছু বিষয় আছে যার জন্য দু-জনের যাওয়াটা জরুরি। লোপা একবার বলেছিল। রাব্বি ঠোঁট উল্টে বলেছিল, তোমার প্রয়োজন হলে তুমি যাও, আমি যাব না।
লোপা নাছোড়বান্দা, আহা, ডাক্তারের কাছে গেলে তো আর দোষ নেই। মানুষ বেড়াতেও তো যায়।
বেড়ালে তুমি বেড়াও। আর এই নিয়ে হইচই করো না তো, অফিসের যন্ত্রণায় দম ফেলার ফুরসত নাই।
রাগে লোপার গা জ্বলে যায়। অফিস আর অফিস, যেন এই পৃথিবীতে আর কেউ অফিস করে না। বিয়ের পর পরই কোথাও ঘুরতে যাওয়া দূরের কথা, আত্মীয়দের বাড়িতেই যাওয়া হয়নি!

কিন্তু এখন এইসব সব ভুলে গেছে। রাব্বিকে দেখে এখন কী মায়াই না লাগছে!
রাব্বি, কি হয়েছে তোমার?
রাব্বি চুপ করে রইল।
লোপা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নরম গলায় বলল, বলো না কি হয়েছে?
কিছু না, অফিসের ঝামেলা।
তোমার এই ঘোড়ার অফিসের ঝামেলা কবে শেষ হবে! বিয়ের পর থেকে তো শুনেই আসছি এটা।
রাব্বি ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফায় গা এলিয়ে দিল।
লোপা রাব্বির গায়ে হাত রাখলে রাব্বি বিরক্তি ভরে হাতটা সরিয়ে দিল। লোপা কষ্টের শ্বাস গোপন করল। রাব্বি কি এটা জানে ওর এই আচরণ ওকে কতটা কষ্ট দেয়? ও কোন দিন জানার চেষ্টাও করবে না। একজন মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কেমন করে? এইসব মানুষরা বিয়েই বা করে কেন? এরা থাকবে একা একা, পৃথিবী থেকে বিদায়ও নেবে একা।

লোপা আবারও হাত ধরার চেষ্টা করলে রাব্বি সজোরে সরিয়ে দিল। লোপার কষ্টের শ্বাস এবার আর গোপন থাকল না। লোপা নিজেকে ধিক্কার দিল, ওর মত বেহায়া মানুষ এই পৃথিবীতে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাব্বির এতোটা তাচ্ছিল্যের পরও রাব্বির জন্য ওর এই মায়ার উৎস কমে না কেন? এই উত্তরটা ওর অজানাই থেকে যাবে। আজকাল এই উত্তরটার জন্য ওর মনে প্রশ্নটা কেবল ঘুরপাক খায়, কেন-কেন!
লোপা ম্লান গলায় বলল, চা খাবে?
হুঁ, চা খাওয়ার বিষয়ে রাব্বির কোন না নাই।
শুধু চা, সঙ্গে আর কিছু খাবে?
নাহ, চা-ই দাও।
খালি পেটে চা খাবে?
আহ, না বলতাম তো।
অফিসে সন্ধ্যায় নিশ্চয়ই কিছু খাওনি?
লোপা, তুমি বড়ো বিরক্ত করো।

লোপা আর কথা বাড়ালো না। কিন্তু চা নিয়ে আসার সময় কয়েকটা বিসু্কট নিয়ে এসেছে। রাব্বি ঠিকই আগ্রহের সঙ্গে চার-পাঁচটা বিস্কুট খেল। লোপা কাতর চোখে তাকিয়ে আছে। মানুষটার পেটে ক্ষিধে অথচ ইচ্ছা করেই সে অন্য কিছু খাচ্ছে না।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, লোপা, আমার না অফিসে খুব সমস্যা হচ্ছে। আমার এই চাকরিটা করতে আর ভাল লাগছে না।
চাকরি করতে কার ভালো লাগে, বলো।
জানো, আমি এখানে আর কিছুদিন চাকরি করলে ঠিক পাগল হয়ে যাব।
লোপা অজান্তেই কেঁপে উঠল। নিশ্চিত এ খুব বড়ো সমস্যায় আছে। মানুষটা শক্ত প্রকৃতির। লোপা অনেকবার দেখেছে, কেমন করে অনেক বড়ো বড়ো সমস্যা এ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। অনেক গুন্ডা-পান্ডাকে দেখেছে একে সমীহ করে কথা বলতে। অনেক জায়গায় লোপা রাব্বির বউ হওয়ার সুবাদে আলাদা খাতির পেয়েছে। অথচ আজই একে দেখল একেবারে ভেঙ্গে পড়তে।
রাব্বি, তোমার অফিস থেকে কি চাকুরি ছেড়ে দিতে বলেছে?
নাহ।
তাহলে?
আরে, সৈয়দ মাদারফাকারটার জন্য-।
প্লিজ রাব্বি, মুখ খারাপ করবে না।
মুখ খারাপ করব আবার কী, এর নাম মুখে নিলে অজু ভেঙ্গে যায়, জানো না?
না জানি না।
আজ তো জানলে।
জানলাম, বেশ। প্লিজ, তুমি মাথা গরম করো না। কুল।
ফাকিং কুল।
রাব্বি, তুমি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে খুব মুখ খারাপ করো।
হুম।
হুম, কুল।
হুম।
হুম, কুল।
রাব্বির মুখে অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।
আচ্ছা রাব্বি, তুমি কি জানো, তোমাকে হাসলে খুব সুন্দর দেখায়?
না, জানি না।
আজ তো জানলে।
লোপা বাজে বকবে না, আমাকে সুন্দর দেখায়। আমার মা-ই এই গ্রহের একমাত্র মহিলা যিনি আমাকে সুন্দর বলে এসেছেন, তার চোখে আমার চেয়ে সুন্দর আর কেউ নাই।
লোপা হাসি চাপল। রাব্বি এটা প্রায়শ বলে ওর চেহারা নিয়ে আলোচনা করার কিছু নেই। যারা করে তারা চাটুকার ইত্যাদি ইত্যাদি। রাব্বিকে বললে বিশ্বাসই করবে না লোপা কখনও এই মানুষটার চেহারা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এটা ভেবে লোপা লাল হয়ে গেল, রাব্বিকে ওর বেশ লাগে!
কী আশ্চর্য, মানুষটা সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছে!

লোপা অবাক হতেও ভুলে গেছে, মানুষটা এতো যন্ত্রণার মধ্যেও কী অবলীলায় ঘুমিয়ে পড়েছে। লোপার কেন যেন অন্য রকম কষ্ট হতে লাগল। এই মুহূর্তে একে কী অসহায়-ভঙ্কুরই না লাগছে! মাথাটা কেমন এলিয়ে আছে, চোখ থেকে চশমাটা পর্যন্ত খুলে পড়েছে। লোপা আলগোছে চশমাটা সরিয়ে রাখল। লোপা অপেক্ষা করছে রাব্বি উঠলে একসঙ্গে খাবে বলে কিন্তু রাব্বি গাঢ় ঘুমে। সারাটা রাত ও সোফায় শুয়ে রইল। কয়েকবার জাগাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, এই ছোট্ট সোফায় ঘুমাতে ওর কষ্ট হবে ভেবে। কেমন গোল হয়ে শুয়ে আছে, পা মুড়ে। খালি পেটে কেমন করে ঘুমাবে কে জানে! নিরুপায় হয়ে একটা চাদর ওর গায়ে দিল। এখানে এভাবে ওকে ফেলে যায় কেমন করে? লোপার রাত কাটল নির্ঘুম!

*জীবনটাই যখন নিলামে: ৩

**সুলেখক শেখ জলিল, যিনি নিজেও লিখেন চমৎকার। বইটার একটা সমালোচনা লিখেছেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

Saturday, February 20, 2010

রাতারাতি বিবাহযোগ্য বাচ্চা পয়দা হয় না


কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকা অনেকগুলো পলাশ গাছ ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছে।
কেন?
নিরাপত্তার জন্য নাকি এই অসভ্য কান্ডটা করার প্রয়োজন ছিল।

এই পলাশ ফুলের সঙ্গে ফাল্গুন-ফেব্রুয়ারি মাখামাখি হয়ে থাকে।
পেছনে নীল আকাশ, রক্তলাল পলাশ দেখে আমাদের কত ভাবনাই না খেলা করে। আজিব একটা দেশ, ততোধিক আজিব এই দেশের মানুষ, আমাদের এই ভাবনাটাগুলোও এদের কারাগারে আটক!

ঢাকা শহর রোবট বানাবার কারখানা হয়ে যাচ্ছে, গেছে। যেসব প্রাচীন অল্প গাছ এখনো টিকে আছে এগুলো কেটে সাফ করে ফেললে পুরোপুরি রোবট হতে সুবিধে হয়। তখন আর সভ্য-সভ্য ভাব ধরে থাকার প্রয়োজন নাই, পুরোপুরি দিগম্বর হয়ে গেলেই হয়।

নিরাপত্তার অজুহাত? আগেকার জমানা হলে বলতাম, নিরাপত্তার সমস্যা দেখা দিলে পলাশ গাছে কিছু হনুমান উঠিয়ে রাখলেই হয়। আহা, সেই রামের আমলও নাই সেই অযোধ্যাও নাই‍! এখন কলিকাল। এখন কি আর হনুমানজীকে অনুরোধ করা চলে?
আচ্ছা, কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে বৈদেশ থেকে ট্রেনিং দিয়ে যে Sniper (A skilled military shooter detailed to spot and pick off enemy soldiers from a concealed place.) আনা হয়েছে এরা কি বিল-হাওরে পাখি শিকার করে বেড়াচ্ছেন? নাকি রাইফেলে মঘা কোম্পানির হালুয়া মাখাচ্ছেন?
এমন নিরাপত্তার সমস্যা মনে করলে এদের পলাশ গাছে উঠিয়ে বসিয়ে রাখলেই হতো, আটকাচ্ছে কে? বাংলা-লাদেন টাইপের কাউকে দেখলেই সাইলেন্সার লাগানো রাইফেল দিয়ে মাথাটা তরমুজের মত ফাটিয়ে দিলেই হতো, দাবড়াচ্ছে কে?

আমাদের দেশে যারা এইসব সিদ্ধান্ত নেন, তাদের কে বোঝাবে লক্ষ-লক্ষ শিমুল গাছের চারা লাগানো যায় কিন্তু চট করে এগুলোতে ফুল ফোটানো যায় না। যেমন যায় না বিবাহযোগ্য বাচ্চা (মতান্তরে অবাচ্চা) পয়দা করা!

*ছবি ঋণ: রাশেদ সুমন, কালের কন্ঠ
**এটার চেয়ে প্রথম আলোর ছবিটা পছন্দ হয়েছিল কিন্তু ওটায় সমস্যা,
ওই ছবিটার উঠিয়েছে প্রথম আলো। আমি বুঝে উঠতে পারছি না প্রথম আলো ছবি উঠায় কেমন করে? এও ধরতে পাছি না এটা কি এই অফিসের কোন চাপরাসি উঠিয়েছেন নাকি মতিউর রহমান স্বয়ং? অবশ্য মতিউর রহমানের ছবি উঠাবার কায়দা-কানুনই অন্য রকম, নমুনা এখানে

Friday, February 19, 2010

মতিউর রহমান: আগে নিজের শপথটা সেরে ফেলুন

এখন টিভি দেখাটা এক যন্ত্রণা হয়ে গেছে। ফ্রেব্রুয়ারি মাসটা জুড়ে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নেই। একেকজনের কী কান্না, কপাল ভিজে যাচ্ছে! আমরা আবার বিশেষ আয়োজন ব্যতীত, বিশেষ দিন ব্যতীত ঘটা করে কাঁদতে পারি না। শব সামনে নিয়ে চালবাজরা যেমন ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে, লাউ দিয়া শোল মাছ খাইতে চাইছিল রে-এ-এ-এ। হেই দিন আমারে কইল, বাজারে লইয়া চল, কে রে লইয়া গেলাম না, রে-এ-এ। যাওয়ার আগে কইয়া গেলো না, রে-এ-এ।
টিভিতে কী একেকটা বিজ্ঞাপন! দেশের সেলিব্রেটিরা বুকে কালো কাপড় লাগিয়ে ভাব ধরে বলছেন, 'ভাষা...বিনম্র শ্রদ্ধা'...'ওয়ালটন আমাদের পণ্য'।  আহ, আমাদের সেলিব্রেটি, এরা ভাল পেমেন্ট পেলে পটিতে বসারও পোজ দেবেন। টাকার অংকটা ভালো হলেই হয়, ব্যস।

এই দেশের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি মায়া সেল কোম্পানীগুলোর, রক্তচোষা গ্রামীন ফোন সবার আগে মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটছে। ১৬ কোটি মানুষ এদের গ্রাহক এটা শুনলেও আমি বিস্মিত হবো না।
এদের সঙ্গে যোগ দেন আমাদের দেশের সুশীলগণ। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এগুলোকে এরা এখন জাস্ট একটা পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। বিক্রয়যোগ্য পণ্য। হজম করার জন্য আমরা জনগণ আছি না!

১৬
ফ্রেব্রুয়ারি, মতিউর রহমান সাহেব প্রথম আলোয় লিখলেন, "দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট"।
জন রীডের বিখ্যাত একটা বই আছে "দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন"।
আমি এই ফিজুল তর্কে যাই না কিন্তু অনুমান করি, মতি সাহেব ওখান থেকে দশ দিনটাকে ৩০ মিনিট করে দিয়েছেন।
জন রীড তাঁর বইয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন কেমন করে ১০ দিনে দুনিয়াটা কেঁপে উঠেছিল।
এ সত্য, ভাষার জন্য লড়াই এটা আমাদের জন্য বিপুল, বিশাল এক ঘটনা, আমাদের অহংকার কিন্তু আমি যদি পক্ষপাতহীন-নির্মোহ দৃষ্টিতে মতিউর রহমানের এই লেখাটা পড়ি তাহলে বুঝে উঠতে পারি না কেমন করে এই ৩০ মিনিট দুনিয়াটাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল! এটা আমাদের জন্য কাঁপানো দিন, দুনিয়ার জন্য কেমন করে? মতি সাহেব জন রীডের লেখা পড়ে মাছিমারা কেরানির মতো আইডিয়া প্রসব করে ফেলেছেন নাকি? ভালো-ভালো!

এই লেখার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, "আমরা নতুন করে শপথ নেব...জনগণের সঙ্গে নানাভাবে সংশ্লিষ্ট গ্রামীনফোন। ...।" গ্রামীনফোনের মত কোম্পানি আমাদের চোর বানাতে উস্কে দিলেও আমরা মতি সাহেবদের কল্যাণে এদের লেজ ধরে হাঁটব, ইনশাল্লাহ।
ওয়াল্লা, আবারও দেখি মতিউর রহমানের শপথ কিচ্ছা। এতো শপথ করিয়া আমরা কী করিব, কোথায় যাইব, কোথায় রাখিব? শপথ করিতে গিয়া শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জানের মত সুশীলদের কাছা খুলুক, আমার কী! মতি সাহেব দেখছি আমাদের শপথ করাইয়া করাইয়া সুশীল-মানুষ বানাইয়া দিবেন। কিন্তু একটা বিষয় আমার বোধগম্য হইতেছে না তিনি নিজে কেন শপথ নিচ্ছেন না, নাকি তিনি আকাশলোকের বাসিন্দা, তাহার শপথের প্রয়োজন নাই?

এখন
হরদম গ্রামীনের (প্রকারান্তরে মতি সাহেবের আইডিয়া) ওই বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে, "...আহারে সেই ত্রিশ মিনিট, দুনিয়া কাঁপানো ত্রিশ মিনিট"। আহারে, আমাদের মতিউর রহমানরা যা ভাবেন তাই আমাদের গিলিয়ে ছাড়েন, করপোরেট ভুবনের রাক্কসদের কাঁধে ভর করে। যথারীতি এতে যোগ দিয়েছে গ্রামীন ফোন।
আহারে, এইসব কোম্পানিগুলো কান্নাকাটি খানিকটা কমালে তাদের অন্তর্বাস ভেজার হাত থেকে বেঁচে যেত! আমাদের ক-জনই বা ভাষাসৈনিক আজ বেঁচে আছেন। যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাঁদের একটা করে ফ্ল্যাট দিয়ে দিক না। অন্তত ভদ্রস্ত হয়ে বাঁচার জন্য ন্যূনতম সহযোগীতা।

মতিউর রহমানরা ব্যবসাটা ভালই বোঝেন, একটু বেশি বেশি। যে ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে মতিউর রহমান কাঁদতে কাঁদতে শ্যাষ, গামছা ভিজিয়ে ফেলছেন। এই ভাষা আন্দোলন যারা করেছিলেন তাঁদের প্রতি মতিউর রহমানের শ্রদ্ধা দেখে আমাদের প্যান্টলুন খুলে যাওয়ার দশা। ভাষাসৈনিক গাজিউল হকের মৃত্যু সংবাদ আমাদের মতিউর রহমান সাহেবের পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় জায়গা হয় না, ছাপা হয়েছিল শেষ পৃষ্ঠায়, সিঙ্গেল কলামে, হেলাফেলা ভঙ্গিতে। কারণ এই পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় কোথাকার কোন ভাষাসৈনিকের খবর ছাপাবার চেয়ে জরুরী জল্লাদ কোন কালারের আন্ডারওয়্যার পরেছিলেন এর বিশদ বর্ণনাসহ ঢাউস ছবি ছাপানো।

মতিউর রহমান সাহেব আমাদের মগজ ধোলাই করবেন কখন আমরা কোন শপথ নেব, কাকে কখন সম্মান করব, কখন অসম্মান। ভয়ে ভয়ে আছি, আমাদের মতি সাহেব কোন একদিন, আমরা কেমন করে বিছানায় আচরণ করব এই বিষয়ে কোন একটা শপথ আহ্বান করে বসেন। বড়ো ভয়ে ভয়ে আছি, তখন আমাদের কী হবে গো!

Thursday, February 18, 2010

ওড়নাসমগ্র এবং কলার খোসা


বইমেলায় একজন লেখকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছি।আমার বইয়ের প্রকাশকের স্টল থেকে নিরাপদ দূরত্বে। কারণ প্রকাশক আমাকে দেখলেই রে-রে করে তেড়ে আসবেন। তিনি আমার একখানা বহি বাহির করিয়াছিলেন। তাঁর বিক্রি-বাট্টার কোনো উন্নতি হচ্ছিল না। ফি-বছর সবসুদ্ধ আমার ২টা বই-ই বিক্রি হত। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, একটার ক্রেতা শুভ, অন্যটার আলী মাহমেদ। গোপনে এ-ও খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এই দুজন একই 'লুক'। নামে-বেনামে খরিদ করে।
একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বদ্দা, বই বিক্রি বাড়াবার রহস্য কি?
তিনি বলেছিলেন, 'মিয়া, তুমি আজ-অবধি তোমার বইয়ের মোড়ক উম্মোচনই করলা না! 'মল-বাক্স' (রুচিমান লোকজনেরা কানে আঙুর দেন); মল-বাক্সের (মতান্তরে পেট) কাছে বই ধরে পোজ দিতে হয়, ফটাফট ছবি উঠাতে হয়। এইসব না করলে তোমার বই শুভ এবং আলী মাহমেদ কেনে এতেই তুষ্ট থাকো। আগামীতে এরাও কিনব না। কিনলে ভোঁতা দাও দিয়া কান কাইট্যা ফেলব'।
আমি ভাবনায় পড়ে গিয়ে বললাম, 'মোড়ক উম্মোচন কি খুব জরুরি'?
তিনি রাগ চেপে বললেন, 'তুমি কলা খাও'।
আমি মিসিং ২টা দাঁত ব্যতীত সবগুলো দাঁত বের করে বললাম, 'সেতো সবাই খায়, আমি খাই এ খাই ও খায় মায় বাঁদরও'।
এইবার তিনি রাগটা আর চেপে রাখতে পারলেন না, 'কলাটা কি খোসা সহ খাও'?
আমি বললাম, 'না, তা কেন, ওইটা তো খায় ছা...ছাগ'।
তিনি লাফিয়ে উঠলেন, 'ব্যস-ব্যস। কলা যেমন খোসা সহ খাওয়া যায় না তেমনি বইয়ের খোসা-মোড়ক না সরালে বইও বিক্রি হয় না। বই আর নারী...'। (কাশি) বাকীটা ভদ্র সমাজে বলার মতো না।
পাশ থেকে কে যেন বলল, 'একটা অটোগ্রাফ দিবেন'? আমি গা করি না, গল্প চালিয়ে যাই। সাথের লেখক বিরক্ত হলেন, বিষয় কী, অটোগ্রাফ দেন না কেন? এইটা কি বেতমিজগিরি!
আমি দুম করে আকাশ থেকে পড়লাম। মানুষটা আমাকে বলছে নাকি, আমার ক্কা কাছে, অ-অট-অটোগ্রাফ! মানুষটা পাগল নাকি, দুনিয়ায় আর লোক খুঁজে পেল না! আমি ভাল করে মানুষটাকে দেখি। তাঁর সমস্যা বোঝার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই, তদুপরি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করি আমার কাছে কেন রে, বাপ! আঁচ করার চেষ্টা করি কিন্তু মানুষটাকে স্বাভাবিকই মনে হয়। ওয়াল্লা, ইনি দেখি সত্যি সত্যি আমাকেই বলছেন! অটোগ্রাফ কড়চা লেখার পর আমার ধারণা ছিল কেউ আর আমার টিকিটিও স্পর্শ করতে আসবেন না।

বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাশের লেখক তাড়া দেন, 'আরে কি মুশকিল, অটোগ্রাফ দিয়ে শেষ করেন'।
আমি চিঁ চিঁ করে বলি, 'ইয়ে, হয়েছে কি বুঝলেন, অটোগ্রাফ যে দেব আমার তো যথেষ্ঠ প্রস্তুতি নাই। আগে বুঝি নাই কাজে লাগবে, ওড়না কাম চাদরটা তো কিনি নাই'।
তিনি বললেন, 'সুমন্ত আসলামের কাছে অনেকগুলো ওড়না-চাদর আছে। তিনি যে স্টলে বসেন ওখানে পেরেকে অসংখ্য ওড়না-চাদর ঝোলানো থাকে। কিছুক্ষণের জন্য একটা ওড়না নিয়া আসেন। না-দিলে আমার কথা বইলেন'।
আমার দিকভ্রষ্ট রোগ আছে। কোথায় 'ওড়নাখ্যাত সুমন্ত আসলাম' বসেন সেটা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমি হাল ছেড়ে মানুষটাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আচ্ছা ভাই, আপনি তো অনেক বিখ্যাত লেখকদের অটোগ্রাফ নিয়েছেন। তো এঁরা অটোগ্রাফে আসলে কি লেখেন? ওখান থেকে ধার করে লিখে দিতাম আর কি'। 
তিনি বললেন, 'সিনিয়র, জুনিয়র বুঝে লেখা হয়। শুরুটা হয় শ্রদ্ধাস্পদেষু, শ্রদ্ধাভাজনেষু, স্নেহপুত্তলি, স্নেহার্শীবাদ ইত্যাদি'।
আমি জপ করতে থাকি, বানান মনে করার চেষ্টা করি। শ্রদ্ধা পদেশু, ভাজ-ভাজনেষু ইয়ে পুত্তলি। কী কষ্ট-কী কষ্ট, জীবন নষ্ট!

এমনিতে আমার মাথায় আসছিল না একজন লেখককে ওড়না দিয়ে বুক ঢাকতে হবে কেন? ওড়নার চল তো এমনিতেই উঠে যাচ্ছে। আজকাল মেয়েরাই ওড়না নামের জিনিসটা পছন্দ করছেন না। শখ করে কেউ পরলেও গলায় পেঁচিয়ে রাখেন বা কেউ একপাশে ফেলে রাখেন, একটা ইয়ে...। হোয়াই একটা? 'ইয়ে বাহোত না-ইনসাফি হ্যায়'!
আরেকজনকে বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, 'ভাই, আপনার নাম কি হ্রস্ব উ-কার নাকি দীর্ঘ উ-কার' দিয়ে?
তিনি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, 'কেন, এই নামটা আপনি গুরু রবীন্দ্রনাথেরেওমুক গ্রন্থে পড়েননি'!
আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, 'না, মানে কেউ রহমান লিখে কেউ রাহমান। আর ভাই, গুরুর সব লেখা পড়ব কি, আজপর্যন্ত একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতই লিখতে পারলুম না'!

যাক গে, লেখক মহোদয় মায়াকোভস্তি-দস্তয়ভস্কি-ট্রটস্কি-চমস্কিদের নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, এঁরা এই দেশে আসলে দেশটার চেহারাই পাল্টে যেত।
আমি নিরীহ মুখে বললাম, 'এঁরা সম্ভবত এই দেশে আসতেন না কারণ এখানে বরফ কোথায়? স্কি করার সুযোগ কই'!
তিনি অবাক, 'মানে কী, স্কির প্রসঙ্গ আসছে কেন'!
আমি বললাম, 'না, সবার নামের শেষে স্কি আছে তো তাই আমি ভাবলাম এরা স্কি করতে পছন্দ করেন'।
তিনি চিড়বিড় করে বললেন, 'রসিকতা করবেন না। একদম না। আপনি রসিক লোক না। আর আপনাকে দেখলাম লোকজনের সঙ্গে হা-হা হি-হি করছেন। এইসব করবেন না। একজন লেখকের এইসব মানায় না'।
আমি ম্রিয়মান হয়ে বললাম, 'লোকজন না, এঁরা সবাই আমার বন্ধু। ব্লগিং-এর নামে এঁদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় লেখালেখি করেছি, মন্তব্য চালাচালি করেছি, অনেক বিনিদ্র রাত পার করেছি। সে এক সোনালি সময়! এঁরা আমার জন্য কতটা কাতর আমি জানি না কিন্তু আমি এদেঁর জন্য বড়ো কাতর'।
তিনি বিরক্ত হলেন, 'এইসব ছাতাফাতা বললে তো হইব না। একজন লেখক হতে গেলে রাশভারী ভঙ্গি ধরে রাখবেন। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে পা ফাঁক করে এলোমেলো ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করবেন'।
আমি মন খারাপ করা শ্বাস ফেললাম। হবে না, হবে না আমাকে দিয়ে, লেখক হওয়ার দেখি অনেক হ্যাপা! আফসোস, লেখক হওয়ার বড়ো ইচ্ছা ছিল, হতে পারলাম না। আফসোস...!

*পোস্টের সঙ্গে যে জিনিসটা যুক্ত করা হয়েছে এটা নামেই জলরঙ বাস্তবে জবরজ। চেষ্টাটা করা হয়েছিল এমন, একজন মানুষের মুখ আর একজন গর্ভবতী মহিলা মিলেমিশে থাকবে...।

Wednesday, February 17, 2010

লেজটা লুকিয়ে রাখা আবশ্যক


কিছু কান্ড দেখে কখনও কখনও আমার ইচ্ছা করে আফ্রিকার কোন জঙ্গলে গিয়ে বাস করি। নিদেনপক্ষে এমন কোন জায়গায় যেখানে চলে কেবল জঙ্গলের আইন।
হায় সভ্যতা, এমন সভ্যতা লইয়া আমরা কী করিব?

গত দুই দিন ধরে আমাদের মহান সংসদ ভবনে দলীয়-বিরোধী দলীয় কতিপয় মহান সংসদ সদস্যদের যেসব কান্ড, যেসব ভাষার প্রয়োগ দেখছি তারপর আর সভ্য-সভ্য ভাব ধরে থাকতে ইচ্ছা করে না। ইচ্ছা করে দিগম্বর হয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করি।
এই সংসদ সদস্যারাই আমাদের জন্য আইন বানান, আইন প্রণেতা!
দেশের কতসব জটিল সমস্যা। সব বাদ দিয়ে কোন নেতার বাক্সে লাশ ছিল না, কোন নেতা এবং তাঁর সন্তানকে ট্রাকে নিয়ে যাওয়ার সময় লাশ আগুপিছু হয়েছে তাই নিয়ে একজন অন্যজনের উপর ঝাপিয়ে পড়ছেন।

বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। সব দলই একই কাজ করেছেন। এই নিয়ে নতুন করে বাতচিতে যাই না কারণ যখন যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা এই কাজটা খুব যত্মের সঙ্গে করেছেন। এই নিয়ে নতুন করে কালি খরচ করা হালের কী-বোর্ড নিয়ে কস্তাকস্তি করার কোন মানে হয় না।

কার কথা এটা ভুলে গেছি, 'ফ্রিডম' বইয়ে ব্যাবহার করেছিলাম:
"There is a thin layer between a genius and a mad man and a thinner layer between a politician and a scoundrel."
এরপর আর বলার অবকাশ থাকে না! এইসব রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আমাদের আর চাওয়ার কী থাকতে পারে? নেতা এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যাবে কেবল এই মানুষটাকে দেখলে।

তবে জিয়া বিমানবন্দর নিয়ে যে খেলাটা খেলা হয়েছে এই নিয়ে আমার একটু কথা ছিল। পোস্টের সঙ্গে ছবিটা একটা দুর্দান্ত ছবি! শেখ হাসান নামের মানুষটার তারিফ করি। প্রথমে এই বিমানবন্দরটার নামের হ্রস্ব ই-কার উড়িয়ে দেয়া হয়েছে, জিয়া থেকে হয়েছে জয়া। আমি আরও আনন্দিত হতাম, যদি কামান দেগে এই কাজটা করা হতো। পরে আবার জিয়া হলো, এরপর জিয়া উধাও।

যাগ গে, আমার আলোচ্য বিষয় এটা না। উল্লেখ করলাম এই কারণে, এদের বুদ্ধির তারিফ করার জন্য! আমি যেটা বলতে চেয়েছিলাম, ভালো কথা, মন্ত্রী পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেন নিয়েছে, এটা নিয়ে কুতর্কে আমি যাই না। আমি কেবল জানতে চেয়েছিলাম, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কি লিখিত আকারে কোন চিঠি পেয়েছেন? যেটায় নির্দেশ দেয়া হয়েছে কামান দেগে এই নাম উড়িয়ে দাও? আমি নিশ্চিত, লিখিত নির্দেশ এখনও পৌঁছেনি কারণ মাত্র মন্ত্রীসভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, এটার প্রসেস করতেও তো সময়ের প্রয়োজন।
তাহলে?
এই কাজটা লিখিত নির্দেশ পাওয়ার পর করলে কি বিমান বন্দরের উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ত? নাকি দু-চারটা বিমান গোত্তা খেতে খেতে বিমানবন্দরের উপর উল্টে পড়ত! লিখিত নির্দেশ না আসা অবধি এই সময়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা গেল না, না?

আমরা শুধুশুধু রাজনীবিদদের দোষ দেই এদের শিক্ষা কম ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু এইসব গামলা নামের আমলা, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, এঁরা তো অতি শিক্ষিত। অনেকগুলো পাশ দিয়ে এইসব
জায়গায় চেয়ারের পেছনে তোয়ালে ঝুলিয়ে বসেছেন। তাহলে? আফসোস, এইসব অতি শিক্ষিত মানুষদের যখন বাথরুম উদ্বোধন করার প্রয়োজন হয় তখন বুকের গভীর থেকে ঠান্ডা শ্বাস বেরিয়ে আসে আহা, এরা লেজটা কেন লুকিয়ে রাখেন না।

ছবি সূত্র: শেখ হাসান, কালের কন্ঠ ১৭.০২.১০
WhatsApp