Monday, July 16, 2018

ন্যানো কাপ!

এটাকে মাঠ বলা চলে না, বড় জোর উঠোন। এখানে নাকি এই স্কুলের মেয়েরা ফুটবল খেলে। হেড টিচার আমাকে এটা বলার পর আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর হওয়ার কথা, ধুর, কীসব আউলা-ঝাউলা কথা বলেন! কিন্তু এটা বলা হলো না কারণ এই স্কুলের হেড টিচার একজন কামেল মানুষ।

এই ভদ্রলোককে নিয়ে আমি আগেও কাজ করেছি। আমরা তখন সেইসব বাচ্চাদেরকে খুঁজে  বের করেছিলাম। যেহেতু এটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এই স্কুলের অনেকের স্কুল ড্রেস নাই। এই নিয়ে কেউ-কেউ অন্যদের কাছে ছোট হয়ে থাকে। এবং তখন আমি দেখেছি এই হেড টিচার নামের মানুষটা কী আবেগের সঙ্গেই না কাজটা করেছিলেন।

তো একদিন আমি মেয়েদের ফুটবল নিয়ে লাত্থালাত্থি দেখে পুরো হাঁ হয়ে গেলাম। খেলা নিয়ে এদের যে কী তীব্র আগ্রহ এটা চোখে না-দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। হেড টিচারকে বললাম এক কাজ করেন দুইটা কাপ যোগাড় করা যাক আপনি একটা খেলা লাগিয়ে দেন। ঠিক হল বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন হবে এই মেয়েদের খেলা, ন্যানো কাপ।

জায়গাটা এতই ছোট যে এখানে কোনও প্রকারেই বাইশ জনের খেলা চলে না। ঠিক হলো একেক দলে ৭জন করে খেলবে।
কোথায় মাটি, কোথায় ঘাস! এখানে এরা খেলে, ভাবা যায়! বুট-ফুট তো দূরের কথা জুতাই কোথায়!
এক পক্ষ একটা গোল দেয় তো অন্য পক্ষ জান বাজি রেখে ঝাপিয়ে পড়ে। দুই পক্ষই যখন ৬টা করে গোল দিয়ে ড্র হলো তখন খেলা টাইব্রেকারে গড়ালো।
৫টা করে গোল দুই পক্ষেরই। ড্র, কী সর্বনাশ। এই খেলার গতি কী! কোন পক্ষেরই ছাড়াছাড়ি নাই!
এটা একটা অসাধারণ ছবি। মনে হচ্ছে সূর্যও নেমে এসেছে খেলা দেখতে। এদের স্ট্যামিনার অভাব নাই কিন্তু খেলা শেষ করা প্রয়োজন। ঠিক হলো এবার ৩টা করে গোল। 
বড়ই আজব, দুই পক্ষেরই সমান গোল! রেফারি ওরফে হেড টিচারের কঠিন সিদ্ধান্ত। এবার ১টা করে গোল। শেষ পর্যন্ত অঘটন ঘটল। এক পক্ষের একটা বল মিস হলো গোল পোস্ট নামের পিলারে লেগে। 
যে পক্ষ রানার্স আপ হয়েছে তারা কোনও ভাবেই এই পরাজয় মেনে নিতে পারছিল না। এদের চোখের জল ট্যাপের জলের সঙ্গে মিশে যায়।
কোনও প্রকারেই এদের কান্না থামানো যাচ্ছিল না। এমন কি তখন এদেরকে রানার্স আপ কাপও দেয়া যায়নি। তখন আমরা আর এদের উপর জোর খাটালাম না কারণ এদের কান্না দেখে আমাদেরও চোখ ভিজে আসে। এই হেরে যাওয়া বাচ্চাগুলো আমাদের মত পোড় খাওয়া মানুষদেরকেও এদের কাতারে নামিয়ে নিয়ে এসেছিল। এটাই এদের বিজয়!
খেলায় বিজয়ী পক্ষ। সঙ্গে এদের ২ শিক্ষক- রেফারি এবং লাইনসম্যান। একেবারের বাঁয়ের ছেলেটা নাকি এদের কোচ! শোনো কথা, এদের আবার কোচও আছে।


ধন্যবাদ, মতি ভাইয়া!

আজকের পত্রিকার প্রথম পাতায় বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল- আমাদের মেয়েদের বিজয়ের ছবি দেখে ভাল লাগছে। জাগো বাংলাদেশ!
অবশেষে, প্রথম পাতায় মেয়েরা জায়গা পেল এই জন্য আমি মতিউর রহমান বাচ্চু, আমাদের মতি ভাইকে ধন্যবাদ জানাই।

গতকালকের পত্রিকায়ও এদের ছবি দূরের কথা খবরটাই খুঁজে পাওয়াও দায় ছিল! পূর্বের মত আরেকটা কুইজ চালু করে দেব কিনা ভাবছিলাম [১]। আরে বাপ, ফি রোজ কুইজ চালু করলে এত পুরষ্কার পাব কোথায়!

যাক, বুক থেকে একটা ভারী পাথর নেমে গেল! আমি আরও ভয়ে-ভয়ে ছিলাম এই কারণে মেয়েরা মতিউর রহমান বাচ্চু, আমাদের মতি ভাইয়ের পাকা ধানে মই দিল কিনা! আসলে পাকা ধানে মই’ এটা একটা কথার কথা- আজ আর সেইসব ধানক্ষেতই কই আর খেলার মাঠই-বা কই!

কে জানে, হয়তো এই মেয়েদের ছোড়া ক্রিকেট বলে মতি ভাইয়ের অফিসের কাঁচ-টাচ ভেঙ্গে থাকতে পারে। ঘটনা যাই হোক, এই মেয়েদের পক্ষ থেকে আমাগো মতি ভাইয়ের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।

মতি, ভাইয়া, গুসসা থুক দো…।

সহায়ক সূত্র: 
১. ইয়ে অমলিনhttp://www.ali-mahmed.com/2018/07/blog-post_10.html