Thursday, May 28, 2009

বেশি আলো-নিকষ কালো!




যে ১৩ (অন্য সূত্রমতে ১০ বছর) বছরের বালক মুক্তিযুদ্ধে গ্রেনেড মেরে পাক-আর্মির বাঙ্কার উড়িয়ে দিয়েছিলেন। যে বালকটিকে কোলে নিয়ে জনাব, শেখ মুজিবর রহমান গর্বের সঙ্গে ছবি উঠিয়েছিলেন। সেই বালক, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বকনিষ্ঠ বীর প্রতীক, শহিদুল ইসলাম লালু (তাঁর প্রতি সালাম) মারা গেছেন। আমি তো বলব, তিনি মরে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ভাগ্যিস, সুরুয মিয়ার মত লালুকে (তাঁদের প্রতি সালাম) আত্মহত্যা করতে হয়নি!

মানুষটা আমাদের বড় যন্ত্রণা দিচ্ছিলেন। যখন লালুকে নিয়ে ওই লেখাটা লিখি তখন আমার কাছে তেমন বিশেষ তথ্য ছিল না। সম্বল কেবল আফতাব আহমদের তোলা সেই ছবিটি।
পরে অনেকটা সহযোগীতা করেছিলেন অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসি মাহবুব সুমন। সুমনের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

লালু তখন মিরপুরে একটা চা-র দোকান চালান। খাবারের বড় কষ্ট! পশুর ন্যায় জীবনযাপন- হায়রে জীবন!
অভাগা দেশ, এখানে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের রাবনের গুষ্ঠির প্রতিদিন ১২২ জনের খাবারের ব্যবস্থা হয়, হয় না কেবল লালু নামের অগ্নিপুরুষদের! একজন দুর্ধর্ষ কমান্ডো ঠেলা চালান এতে আমাদের কোন লাজ-বিকার নাই!

একটা দেশকে প্রথমেই চেনা যায় সেই দেশের এয়ারপোর্টে নেমে আর একটা জাতিকে চেনা যায, সে তার সেরা সন্তানদের কেমন সম্মান করে তার নমুনা দেখে।

শহিদুল ইসলাম লালুর মৃত্যুর খবরটা প্রথম আলো ছাপিয়েছে, ২৬ মে, ২০০৯। বিজ্ঞপ্তি আকারে, ১৯ পৃষ্ঠায়, সিঙ্গেল কলামে, ছোট্ট করে। আজকাল প্রথম আলোর অনেক কিছুতেই অবাক হই না- না ছাপালেও বিস্মিত হতাম না। কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞপ্তি আকারে- হা ঈশ্বর!
এরা সম্ভবত এদেশের সেরা সন্তানদের তাচ্ছিল্য করে পাশবিক আনন্দ পান নইলে ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের সঙ্গে একই ঘটনা।
আহারে, এদের জায়গার কী সঙ্কট! সংসদে, কোন নেতা কী কালারের শাড়ি পরে এসেছেন, কোন নেতার শাড়ির পাড় কী কালারের এইসব অতি জরুরি খবর ছাপিয়ে পত্রিকায় জায়গা কোথায়? অবশ্য বিজ্ঞাপনের নামে এদের দিয়ে যে কোন কাজ করিয়ে নেয়া সম্ভব! শেরাটনের বলরুম ব্যতীত এরা আবার মুক্তিযুদ্ধের কথা গুছিয়ে বলতে পারেন না।

৩০০ বাংলাদেশি নিয়ে ট্রলার ডুবে যায়, এই খবরটা আসে পেছনের পাতায়, হেলাফেলা করে। এ আর বিচিত্র কী- যে দেশে প্রাণের মূল্য কেজি দরে। পত্রিকা আলাদা করে মূল্যায়ন করবে কেন! কিন্তু জাঁক করে এটা বলারও প্রয়োজন নাই, আমরা হেন, আমরা তেন। বাস্তবে, যাহা ইনকিলাব তাহাই প্রথম আলো- লাউ আর কদু; আমরা শ্লা বদু।

প্রথম আলো ভুলভাল তথ্য আমাদের একের পর এক দিতে থাকবে আর আমরা বিমলানন্দে গলাধঃকরণ করব, হলাহলকে লাড্ডু ভেবে। এই না হলো আমাদের হলুদাভ মিডিয়া- মুক্তচিন্তার দৈনিক।
এখন পত্রিকাটি পণ করেছে, দেশে আলো জ্বালাবে, অন্ধকার ঝেটিয়ে বিদায় করবে। "নিজেকে বদলাতে হবে আগে" ভাল উদ্যোগ সন্দেহ নেই কিন্তু নিজে দিগম্বর-নগ্ন থেকে অন্যকে কাপড় পরাতে যাওয়াটা কোন কাজের কাজ না। যে পত্রিকা ফটো-সাংবাদিকের নাম ছাপাতে কার্পণ্য করে । ভুল করার পরও যাদের সামান্য একটা মেইলের উত্তর দিতে বড্ড তকলীফ হয়, তাদের, আর যাই হোক এমন লম্বা লম্বা বাতচিত শুনতে ভাল লাগে না।

কীসব টাচি কথাবার্তা! প্রথম পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে, "আইলাও বাধা হতে পারেনি"। মানে হলো, ঘূর্ণিঝড় উপেক্ষা করে লোকজন পিলপিল করে ছুটে আসছে। নব্য হ্যামিলন আর কী! যায় য়দি যাক প্রাণ, করিবো স্বাক্ষর দান। আসলে নিজের ঢোল পেটাবার সময় হুঁশ থাকে না। ফাটে ফাটুক মোর ঢোল, তবুও সমাপ্ত করিব বোল। বোল বোল, হরিবোল!
২৪ মে, প্রথম আলোতে একটা ছবিতে দেখলাম, হাতি ছুটে চলে এসেছে। এদের ডাকে দেশের সুশীলরা ছুটে আসেন, হাতি কোন
ছার! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, হাতি স্বাক্ষর দিতে ঝড়ের বেগে চলে এসেছে। হাতি লিখবে, 'আমি শপথ করিতেছি যে, কলা-বাগানের মালিকের অনুমতি না লইয়া, আমি এককিনি কলা-গাছও মুখে তুলিব না। এবং আমি শপথ ভঙ্গ করিলে হাতি সমাজের নিয়মানুযায়ী প্রচলিত আইনের যে কোন শাস্তি পা পাতিয়া নিব। স্বজ্ঞানে আমার এই শপথ প্রথম আলোর নিকট হাওলা করিলাম। ইহা নিয়া তাহারা বই বাহির করিতে চাহিলে আমার কোনরূপ আপত্তি টিকিবে না। সানন্দে পা-সহি দিলাম।'
খবরটা পড়ে দেখি, কাহিনি অন্য। হাতি এসেছে স্বাগত জানাতে, এসো, এসো হে, শপথ-যান!

*হুবহু এই লেখাটাই অন্য সাইটে দিলে, ওখানে একজন মন্তব্য করেন, "প্রথম আলো খারাপ বুঝলাম কিন্তু প্রথম আলো বাদে একটা ভালো পত্রিকার নাম বলেন?
...ইদানিং প্রথম আলোর গুষ্টি উদ্ধার করা একটা ফ্যাসনে পরিনত হইছে।সস্তার ইন্টানেট পাইয়া বাসায় বইসা বইসা কি-বোর্ডে ঝড় তোলাও এক ধরনের ভন্ডামী ...পোস্টের লেখক পোস্ট টা দিয়ে হাওয়া, আর ওনার প্রথম আলোর সাথে ব্যক্তিগত কোন সমস্যা আছে সেটা পোস্ট পড়েই বোঝা যায়। ...আমার ধারনা পোস্টদাতা একজন সাংবাদিক অথবা সংবাদ পত্রের সাথে জরিত। "

অনলাইনে লেখালেখির এই এক যন্ত্রণা। এইসব 'এক কাপ চায়ে দুকাপ চিনি' টাইপের মানুষদের নিয়ে বড় সমস্যা হয়ে যায়। আজকাল আর যন্ত্রণা ভাল লাগে না। শান্ত থাকাটা বড় কঠিন হয়ে পড়ে! লিখে জনে জনে ব্যাখ্যা দাও, বকের ন্যায় এক পায়ে অন লাইনে বসে থাকো। এটা জার্মানি না যে বছরের পর বছর ধরে পাওয়ার যায় না। ডিজিটাল বিদ্যুতের কাহিনি এদের কে বাঝাবে?

তবুও ঘোর অনিচ্ছায় লিখতে হয়েছিল:

"ডিয়ার ...,
এই পোস্টের সহায়ক কিছু লিংক দেয়া হয়েছিল। আপনি সম্ভবত লক্ষ করেননি! প্রথম আলো নিয়ে যেসব অসঙ্গতি-ভুলের কথা আমার পোস্টে করা হয়েছে; এগুলো নিয়ে, আমার লেখার ভুল উল্লেখ করলে আমার সুবিধা হতো। আমার ভুল স্বীকার করতে লাজ নাই, আছে কৃতজ্ঞতা। আপনি তা না করে কঠিন কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন।

আপনার প্রশ্নটার উত্তর একটু অন্যভাবে দেই।
আমাদের দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাদের বিরুদ্ধে দূর্নীতি-অত্যাচার নিয়ে কথা উঠলে তারা কমন একটা উত্তর দেন। সেটা হচ্ছে, আগের সরকার আমাদের চেয়েও বড় চোর ছিল। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আগের সরকার অনেক বড় চোর ছিল। তো? তাহলে কী বর্তমান সরকারের দূর্নীতি-চুরি নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না? নাকি কোন আইনের আওতায় এটা আসবে না? ধরে নিলাম, আর কোন ভাল পত্রিকা নাই তাহলে কী প্রথম আলোর কোন অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না?

ব্লগিং এখন অসম্ভব শক্তিশালি মাধ্যম। যারা বইও লিখেন, অনলাইনে লেখালেখিও করেন তারা বলতে পারবেন ব্লগিং বা অনলাইনে লেখালেখির শক্তি কতটা দানবীয়!
অন্য একটা উদাহরণ দেই। ইরান-ইরাক কট্টর-অসভ্য দেশ। এখনও প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়, লোকজনরা সিনেমা দেখার মত দলে দলে ফাঁসির অনুষ্ঠান উপভোগ করে! ছোট-ছোট বাচ্চাদের ফাঁসি দেখানো হয়, দেখতে বাধ্য করা হয়। এতে যে একটা সভ্যতার মৃত্যু হয় এটা এদের কে বোঝাবে?
কিন্তু ইরাকের মত একটা দেশের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজা ২০০৬ সাল থেকে ওয়েবলগ লেখা শুরু করেন। এই দেশটি যে কালে কালে পৃথিবীর মানচিত্রে বিশেষ একটা জায়গা করে নেবে এতে অবাক হওযার কিছু নাই।
এখানে এই প্রশ্ন উত্থাপন করার অবকাশ নাই তিনি প্রেসিডেন্ট হিসাবে কী বিনে পয়সায় নেট ব্যবহার করেন নাকি চুরি-চামারি করে।

‘দি সান’ পত্রিকাটির ২০০২ সালেই পাঠকসংখ্যা ছিল ৩৫ লক্ষ। বৃটেনের সর্বকনিষ্ঠ গ্রাজুয়েট ১৩ বছরের একজনকে ১ দিনের জন্য ওই পত্রিকার সম্পাদক করা হয়েছিল। ওই দিন ১ দিনের সম্পাদকের ইচ্ছানুযায়ী পত্রিকাটি বের হয়। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ যেটা বুঝতে চেয়েছিলেন নতুন সম্পাদকের ভাবনা। ফাঁকতালে নতুন কিছু যদি শেখা যায়। কারণ কোন নিউজ কোন পাতায় যাবে এই পত্রিকার এই সেন্সটুকুই নাই!

তো ধরুন, আপনাকে ১ দিনের জন্য প্রথম আলোর সম্পাদক বানিয়ে দেয়া হল। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনি কী চাইবেন, এই দেশের একজন সেরা সন্তান, একজন অগ্নিপুরুষের শেষ বিদায়ের খবরটা বিজ্ঞপ্তি আকারে ছাপাবেন, ভেতরের পাতায় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে? আপনি কী প্রথম পাতা এসব লিখে ভরাবেন? সংসদে কোন নেতা কী রঙের শাড়ি পরে এসেছিলেন, কোন নেতার শাড়ির পাড় কী রঙের ছিল?
চাকুরির খোঁজে, এই দেশের ৩০০ মানবসন্তান সাগরে ভেসে গেছে। এটা কী আপনি পেছনের পাতায় ছোট্ট করে ছাপাবেন? কেবল ৩০০ মানুষ তো না! একেকজন মানুষের সঙ্গে তার পরিবারের ৫জন সদস্য ধরলেও দেড় হাজার মানুষের আনন্দবেদনা কাব্য!
এখানে উল্লেখিত লিংক ব্যতীত প্রথম আলোর আরও ১০টা অসঙ্গতির লিংক আমি দিতে পারি। সেই বিশদে এখন যাই না। শপথ নিয়ে আমার আপত্তি না। আমার আপত্তি অন্যখানে। আপনি নিজের ঘর নোংরা রেখে গোটা দেশে ঝাড়ু দিতে বেরিয়ে পড়লে কেমন হয়? আপনি কী প্রথম আলোর বা এর সঙ্গে জড়িত কারও শপথবাক্য পেয়েছেন? তার মানে কী, এদের নিজেদের শপথ করার ভাবনা নাই- এদের নিজেদের বদলাবার কিছু নাই।
এরা তথ্য বিক্রি করে। আমরা পাঠক তথ্য কিনি। কেউ কারও মাথা কিনে নিচ্ছে না। পাঠকেরও আছে তার তথ্য পাওয়ার অধিকার। আপনি দুম করে হররোজ ছেপে দিলেন, আজ অনলাইন পাঠকসংখ্য ৭ লাখ। এখন পাঠক হিসাবে আমি কি এ প্রশ্ন করতে পারব না, এটা কী পাঠকসংখ্যা নাকি ক্লিক সংখ্যা? একজন পাঠক পত্রিকাটি পড়তে গিয়ে ২৫ বার ক্লিক করলে এটা কী ২৫বার ধরা হবে, নাকি ১ বার? এটা নিয়ে পাঠক জানতে চাইতেই পারে।
আমার লেখার ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা করলেই ভাল হত। 'পোস্ট দিয়ে হাওয়া…' এটা লিখে আপনি আমাকে অহেতুক আক্রমন করলেন। এর কোন প্রয়োজন ছিল না। একজন মানুষের কত ধরনের সমস্যা থাকতেই পারে- একজন মানুষ পোস্ট দিয়ে অনলাইনে ঠায় বসে থাকবে এটা কোন ধরনের যুক্তি হল? আর আমি পত্রিকার সাংবাদিক, না পত্রিকার চাপরাসি এই বিষয় এখানে শেয়ার করার আগ্রহ বোধ করি না। ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার মন্তব্যর জন্য।"

*ছবিঋণ: প্রথম আলো