Search

Tuesday, June 10, 2014

খুনি!



সাবেক এক মন্ত্রী আমার অমায়িক ক্ষতি করে দিয়েছেন। পূর্বে এ-ও আমার এখানে বেড়াতে আসতেন। এখন আসতে চান না, ভয়ে। একজনকে আসার জন্য পটাতে চেষ্টা করছিলাম। ওদিন ফোনে বললেন, তুমি যেখানে থাকো তা নাকি ১০০ বছরের পুরনো ইমারত
আমার লেখা পড়ার কুফল। পূর্বে কোথাও এটা শেয়ার করেছিলাম।

এ ইমারত শব্দটা সম্ভবত ওই মন্ত্রীর কাছ থেকে শিখেছে।
আমি চিঁ চিঁ করে বললাম, তা অব্শ্য ঘটনা সত্য কিন্তু
কোনও কিন্তু-টিন্তু নাই। আমাকে বেকুব ভাববা না! তোমার কি, তিন টাকা দামের কলমবাজের ছ-টাকা দামের প্রাণ...!
মন্ত্রীর মুন্ডুপাত করা ব্যতীত কী-বা করার ছিল আমার। কিন্তু এরপর থেকে খানিকটা সাবধানে থাকার চেষ্টা করি। আগে মন খারাপ হলে সংগ্রহে থাকা রণ-পাটা ঝেড়েঝুড়ে পায়চারি না-করে রণচারি করতাম। এখন এটাও বাদ দিয়েছি! কী জানি বাবা, রণ-পার রণাঘাতে ইমারতটা যদি হুড়মুড় করে ধসে পড়ে! মন্ত্রীর বাণী বলে কথা-আমাদের মন্ত্রীরা সব জানে।

যাই হোক, এই অতিথির কথা বলি। গতকাল যে শিশুটির কাছে ছিল সেই শিশুটি আমি যে স্কুলটার সঙ্গে জড়িত আমাদের ইশকুলে ওটায় পড়ত। এই শিশুটিকে আমার বেশ মনে আছে। অসম্ভব ডানপিটে। চোখের নিমিষে এ তরতর করে নারকেলগাছে উঠে পড়ে! দস্যি একটা!
বড়দের সঙ্গে কথায় পারি না বলে একটা শিশুর সঙ্গেও কথায় পারব না, তাই কী হয়! কথার মারপ্যাচে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাসায় এনে ছেড়ে দিতে গিয়ে দেখি কী সর্বনাশ, এ তো দোয়েল ছানা। এ তো এখনও খেতেও শেখেনি। ধরা পড়ার আগ পযন্ত মা পরম মমতায় তার হাঁ করা মুখে খাবার ঢুকিয়ে দিত। আমি এখন মা পাব কোথায়? কী যন্ত্রণা- নিজেকে এখন কেমন বেকুব বেকুব লাগছে। তার উপর এ আহত, ক্ষতবিক্ষত। এমনিতেই এ বাঁচানো মুশকিল হয়ে পড়বে।
ওকে ফোন দিলাম। ওর আবার পাখি-টাখি পোষার খুব শখ- হৃদয়ের স্থলে কেবল নৃশংসতা! বইপত্র ঘেঁটে-ঘেঁটে দিগগজ হয়েছে। আমি বললাম, তুমি তো এলে না কিন্তু পাখি চলে এসেছে। এটা তো একেবারেই বাচ্চা। একে খাওযাব কি?
সে বলল, মাটির নীচের পোকা-মাকড়, কেঁচো ধরে খাওয়াও
আমি হতভম্ব, ক্ক-ক্কী বললে! কেঁচো খাওয়াও মানে! রসিকতা করছ?
ওরে ফালতু, রসিকতা করব কেন। এ তো খুব সহজ। কেঁচো ছোট-ছোট টুকরা করে খাওয়াবে। হি হিহি। নইলে কিন্তু তোমার পাখি দাঁড়াতেই পারবে না।
তুমি পাগল নাকি! আমি একটা পিঁপড়াও মারতে পারি না এখন আমাকে খুন-খারাপি করতে বলছ। খুনি, সিরিয়াল কিলার বানাতে চাচ্ছ?
ভাঁড়গিরি বন্ধ করো। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। বেঁচে থাকার জন্য এক প্রজাতি অন্য প্রজাতিকে হত্যা করবে। এ তো নতুন কিছু না

কপাল! শেষ পর্যন্ত কী আমি খুনি হয়ে যাব...। 

Monday, June 9, 2014

কেবল দোহাই লাগে, ধর্মের দোহাই দিয়েন না...।

অতি ধার্মিক মহতরমাগণ কাপড়ে মুখ বেঁধে রাখেন। একবার আমার বাসায় মেহমান আসলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ডাক্তার। এরা আবার আমার আত্মীয়ও। ভদ্রমহিলা মুখ বেঁধে কথা বলছিলেন। কেউ বলে দেয়নি কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল আমি এই গ্রহের সবচেয়ে দুষ্ট মানুষ! আমি চিন্তা করছিলাম এই মহতরমা খাওয়ার সময়ও কী তার মুখের কাপড় খুলবেন না?

পর্দা প্রথার কথা যদি বলা হয় তাহলে আমাদের পোশাকগুলো কিছু ক্ষেত্র ব্যতীত কোনও প্রকারেই অশালীন বলা চলে না। তারপরও যদি কেউ মনে করেন আলাদা চাদর ব্যবহার করবেন বা স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢেকে রাখবেন সেটা তার অভিরুচি। নানরা মাথা ঢেকে রাখেন এই নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয় বলে তো শুনিনি।
এমনিতে ঢিলেঢালা বোরকার বিষয়ে অনেকে অন্য রকম যুক্তিও দেখান পোশাক বিবর্ণ-মলিন-ময়লা থাকলে আলাদা করে পোশাক বদলাবার হুজ্জত নেই। বা কাউকে দামি- কমদামি পাশাক নিয়ে লজ্জিত হতে হয় না।  

আমাদের দেশে এতোটা কাল মহিলারা শাড়ি-কামিজ পরে কাটিয়ে দিয়েছেন। সমস্যা হয়নি। অল্প ক-বছর হলো দাবানলের মত বোরকা, মুখ ঢেকে রাখা ছড়িয়ে গেল। অনেক ক্ষেত্রে বোরকা নামের সিল্ক টাইপের কাপড়ের যে জিনিসগুলো পরা হয় এতোটাই আঁটসাঁট যেন এটা গায়ে রেখে সেলাই করা হয়! আবার পেছন দিকে দড়ির মত একটা জিনিস দিয়ে কষে বেঁধেও রাখা হয়। এতে করে আবেদন বাড়ে না কমে এই বিতর্কে যেতে চাচ্ছি না? 
আহা, গল্প-উপন্যাস লেখার একটা সুবিধা আছে একটা চরিত্র সৃষ্টি করে তার মুখ দিয়ে অনেক কিছু বলিয়ে নেওয়া যায়। এখানে এই সুবিধাটুকু নেই বলে বিশদে গেলাম না। ...কে লিয়ে ইশারাই কাফি।

আমাদের পায়ের অদৃশ্য শেকলগুলোর মধ্যে সামাজিকতার শেকলও একটাওয়াল্লা,অমুকের ছাওয়াল কাজটা করছে বা তমুকের বেটি...মুখ বেঁধে রাখার যে অপব্যবহার হচ্ছে কে কোথায় কেন যাচ্ছে তা আঁচ করার কোনও যো নেই। মুখে কাপড় বেঁধে বাপ-মার সামনে দিয়ে মেয়ে বখামি করবে টেরটি পাওয়ার কোনও উপায় নেই। কে ড্রাগ নিয়ে যাচ্ছে কে তার খোঁজ রাখছে? এখন কেবল বাকী আছে মুখ ঢেকে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া। সিসিটিভি ক্যমেরায় ছবি আসলেই কি- ওটা জরিনা নাকি ক্যাটরিনা বার করে কার সাধ্য।   

কোরান শরীফে পর্দা প্রথার কথা যেটা আছে:
হে নবী! তুমি তোমাদের স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও বিশ্বাসী নারীদের বলো তারা যেন চাদরের কিছু অংশ নিজেদের মুখের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে কেউ উত্যক্ত করবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
(সুরা আহজাব: ৫৯)

এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট যেটা বলা হচ্ছে:
নবীপত্মী হযরত আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) নবী করীম (ছ) এর নিকট বলতেন, আপনার স্ত্রীদেরকে পর্দায় রাখুন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী করিম (ছ) তা করেননি। নবী করিম (ছ.) এর স্ত্রীরা প্রাকৃতিক প্রয়োজন রাতেই বাইরে গিয়ে সেরে আসতেন। তারপর একদা সাওদা বিনতে যামআ (রা.) বাইরে গেলেন। তিনি দীর্ঘাঙ্গিনী স্ত্রীলোক ছিলেন। তাঁকে দেখেই ওমর (রা.) বললেন, হে স্ওদা! আমি আপনাকে চিনে ফেলেছি।
পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়ই ওমর (রা.) ঐরূপ উক্তি করেছিলেন। আয়েশা (রা.) বলেন, অতঃপর আল্লাহ তাআলা পর্দার আয়াত নাযিল করলেন।
(বোখারী শরীফ, কিতাবুল ইস্তিযান, ৩৬৪২)

প্রেক্ষাপট তো জানা গেল। তারপরও কেউ যদি মনে করেন আক্ষরিক অর্থে এর পালন করবেন তাহলে চাদর ব্যবহার করেন, আটকাচ্ছে কে! শরীরের সঙ্গে সিল্ক টাইপের কাপড় সেলাই করে ফেলার প্রযোজন কী বা পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলার? বেশ তো, শরীর আপনার সেটা দড়ি দিয়ে বাঁধবেন নাকি চাবুক দিয়ে সে আপনার অভিরুচি। ফ্যাশন-স্টাইল করলে কার কী বলার আছে! প্রয়োজনে 'বাড্ডি-চাড্ডি পরে ঘুরেন। কেবল দোহাই লাগে, ধর্মের দোহাই দিয়েন না...। 

Sunday, June 8, 2014

সাপের বিবাহ


বাসার ঠিক সামনেই ফাঁকা যে জায়গাটা যেখানে, হাবিজাবি গাছ লাগানো এখানে ফি রোজ নিয়ম করে হাঁটাহাঁটিঁ করা, গাছের সঙ্গে সময় কাটানোটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে নইলে কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে!
শেষ বিকেলটায় পারতপক্ষে আমি কারও সঙ্গে দেখা করা বা কোনো কাজ রাখি না

আজও যথারীতি গাছের সঙ্গেসাপটা যখন আমার চোখে পড়ল তখন আমি নিঃশব্দে পিছিয়ে এলামশতবর্ষ পুরনো বাড়ি এখানে সাপ থাকাটা তো বিচিত্র কিছু নাপরী নেই এটাও জোর দিয়ে বলা চলে না
পশু-পাখি, সাপ-খোপ এরা আমাকে ঘাঁটায় না আমিও এদের লেজ মাড়াই নাকোনও সমস্যা হয় না আমাদের, চলে যায়আমি সাপটার সঙ্গীটাকে খুঁজছিলামআশেপাশে কোথাও দেখলাম না

পরে যখন আমি একজনকে ঘটনাটা বলছিলাম তিনি চোখ লাল করে বললেন, ‘ফাজলামীর একটা সীমা থাকা দরকারএ-হ, এর আবার সঙ্গীকেও খোঁজা হচ্ছে, কারণ কী’?
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘সঙ্গীটাকে পেলে এদের বিবাহ দিয়ে দিতামআরে, কী মুশকিল এতে অবাক হওয়ার কী আছে! কেন পত্রিকায় তো আমরা হরদম পড়ি ব্যাঙের বিয়ে’, পড়ি না? পত্রিকাওয়ালা তো ঘটা করে প্রথম পাতায় ব্যাঙের বিবাহের খবরটা ছাপায়অবশ্য পত্রিকায় কাজের তথ্য জানা যায় নাএই যেমন ধরো, মোহরানা কত ছিল? ব্যাঙ ভাইয়া কী পরে বিবাহ করেছিলেন, শেরোয়ানি নাকি লুঙ্গি? বাসর রাতে কোন কোম্পানির জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রি ব্যবহার করেছিলেন? বা ব্যাঙ ভাইয়া ব্যাঙানি ভাবিকে বাসররাতে কি বলে সম্বোধন করেছিলেন? এরপর (সেন্সর)... ইত্যাদি ইত্যাদি...

আচ্ছা, ধরো এটা করলে কেমন হয়? বর্ষাকালে যেন বৃষ্টি না-হয় এ জন্য আমি সাপের বিবাহ দিলাম ভাল কথা, এই নিউজটা কি মতিউর রহমান ছাপাবেন? শিরোনামটাও হবেপাঠকখাওয়ানিয়াটাইপের, 'সাপের বিবাহ, যৌতুকবিহীন'...আহা-আহা, কেউ মতিউর রহমানকে রাজি করাতে পারত, চাইলে মতিউর রহমানকে বিবাহের উকিলও বানিয়ে দেওয়া যেতে পারেঅবশ্য টাকা দিলে এটা বিজ্ঞাপন আকারে হাসতে হাসতে ছাপিয়ে দেবেন
আগেভাগে এটা জানতে পারলে সাপ ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলতে হবেএরপর আবার কথা বলতে হবে মহিলা সাপের সঙ্গেযন্ত্রণার কী শেষ আছে,...’!

ভোরের কাগজ। সম্পাদক, মতিউর রহমান
প্রথম আলো। সম্পাদক, মতিউর রহমান

Thursday, June 5, 2014

কল্পনাকেও ছাড়িয়ে...!



কাছাসুল আম্বিয়া নামে খুব চালু একটা ইসলামি বই আছে। মূল লেখক হিসাবে নাম দেওয়া আছে, হযরত মাওলানা তাহের সুরাটী। সম্পাদনা করেছেন, অধ্যাপক মাওলানা সিরাজউদ্দীন। যিনি বি, এ (অনার্স) এবং এম, এ করেছেন মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং পি, এইচ, ডি করেছেন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামীক ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া থেকে।

এই বইটা যত পড়ছি ততই বুকের গভীর থেকে অজানা বেদনা পাক খেয়ে ওঠছে, কত অজানা রে! অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা এখানে। এর মধ্যে থেকে আমি কেবল দুইটা ঘটনা উল্লেখ করব। হুবহু, দাঁড়ি-কমাসহ:
১. হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদিসে আছে...সেই ভীষণ কালো রং বিশিষ্ট অগ্নিপূর্ণ দোজখের মুখে আল্লাহ একখানা পাথর চাপা দিয়ে রেখেছেন। আর একখানা বিশাল পাথর বানিয়ে তা দোজখের নীচে স্থাপন করেছেন। উক্ত পাথরখানা এক ফেরেশতা তার মাথার উপর ধারণ করে রয়েছে। ঐ ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছে একটি মশার পিঠের উপর। মশাটি দয়ান্ডমান আছে সিক্ত মাটির উপর। উক্ত সিক্ত মাটি রয়েছে একটি বড় গাভীর শিংয়ের উপর। গাভীটির মাথায় আছে সত্তর হাজার শিং। গাভীটি রয়েছে একটি বিশাল মাছের পিঠে দয়ান্ডমান। মাছটি এতই বড় যে, এটার সুদীর্ঘ লেজ গিয়ে আরশের পায়া স্পর্শ করেছে। গাভীটিকে যথাস্থানে সুস্থির রাখার উদ্দেশ্যে আল্লাহ একটি অতি বৃহৎ মশা সৃষ্টি করতঃ এটার কাছে রেখেছেন। গাভীটি সেই মাথার (সম্ভবত বানান ভুল, মশা হবে) ভয়ে সামান্য মাত্র নড়াচড়া না করে একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যদি সে গাভীটি সামান্য মাত্র নড়াচড়া করতো তাহলে কখন না জানি এই বিশ্ব সংসার লন্ডভন্ড হয়ে যেত।
(কাছাসুল আম্বিয়া, পৃষ্টা নং: ২৬)

২. কথিত আছে যে, উজ বিন ওনোকের দেহের দৈর্ঘ্য ছিল ত্রিশ হাজার তেত্রিশ গজ। যা সাড়ে এগারো মাইলের মত। আর এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, সাড়ে তিন হাজার বছর সে জীবিত ছিল। তার ভূমিষ্ঠকালে হযরত আদম (আঃ) জীবিত ছিলেন। ঐ সময় হযরত মুসা (আঃ)-এর সময় পর্যন্ত উজ দুনিয়র আবহাওয়া ভোগ করছিল। উজের মাতার নাম ছিল ওনোক।...তার পিতার নাম ছিল সোবহান। উজের মাতা ওনোক আদম (আঃ)-এর অন্যতমা কন্যা ছিল।
বিশাল আকারের ওনোক হযরত নূহ (আঃ)-এর যমানায় মহাপ্লাবনের সময় তাঁর জাহাজে না উঠেও জীবিত ছিল। ঐ প্লাবনের সময় দুনিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতও ডুবে গিয়েছিল, কিন্তু প্লাবনের পানি ওজের কেবল বুক পর্যন্ত উঠেছিল। আর স্বাভাবিক অবস্থায় সে সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়ালে পানি হত তার হাঁটু পর্যন্ত। সে সমুদ্রে নেমে বিরাট বিরাট মাছগুলো ধরে সূর্যের উত্তাপে সিদ্ধ করে তা ভক্ষণ করত।
(কাছাসুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠা নং: ৩১৯)

Tuesday, June 3, 2014

সিক পিপল!

আবেপ্রবণ জাতি হিসাবে আমাদের যেমন অন্য রকম সুনাম আছে তেমনই হুজুগে জাতি হিসাবেও। একজনের বেল্ট ছিঁড়ে প্যান্ট নেমে গেছে ব্যস আর যায় কোথায় সবাই ঝাপিয়ে পড়ল। খুলে-খুলে যায় এমন প্যান্ট না-পরলে চলছে না যে! সামান্য উবু হলেই যে পশ্চাদদেশ দেখা যাচ্ছে তাতে কী আসে যায়। আহা, সমস্যা কেথায়- পশ্চাদেশে তো আর হলুদ ফুল লেগে নেই।

খেলা নিয়ে মাতামাতি হওয়া নিয়ে আমরা উল্লসিত হই। ভাল করে গোঁফ উঠেনি এমন পোলাপানরা বাপের নাম বলতে তোতলায় কিন্তু তোতাপাখির মত মুখস্ত যখন বলে যায় উথাপ্পা, পিযুস চাওলাদার, চিন্নাস্বামীর নাম তখন আমরা তিন উল্লাসে বলি, পোলা তো না যেন আগুনের গোলা। মিনিটে-মিনিটে রানের আপডেট এদের ঠোঁটে-ঠোঁটে!
কিন্তু এদের অনেকেই যে ক্রিকেট-জুয়ায় আসক্ত এই খবর কে রাখে। আমি এমন প্রচুর লোকজনকে চিনি যাদের বাবা বেলা শেষে বাজারে যান শস্তায় সদাইপাতি কেনার জন্য অথচ ছেলে ২০/২৫ লাখ টাকা ক্রিকেট-জুয়ায় হেরে বসে আছে। ফলাফল জমি বিক্রি।
ভারত আমাদেরকে ফেনসিডিল খাওয়া শিখিয়েছে, আইপিএলের নাম করে শিখিয়েছে জুয়া। একরাতে আতশবাজি উড়ে হাজার-হাজার টাকার, এটাও ভারত থেকেই আসে!

এখন এদেরকে ফুটবল নিয়ে জুয়া খেলতে আটকাবে কে। গত বিশ্বকাপ থেকে আমাদের দেশে এটা চালু হয়েছিল কে কত বড়ো পতাকা লাগাতে পারে। আমদের মিডিয়া ঘটা করে এই সব ছাপিয়ে ছিল। গত বিশ্বকাপের সময় লিখেছিলাম:
...প্রথম আলোতে খবরটা আসল মৌলভীবাজারে ৬০০ ফুট পতাকা উড়ানো হয়েছেপ্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় এই খবরটা আসার পর অন্যরা বসে থাকবে বুঝিদুদিনই পরই জানা গেল ৯০০ ফুট পতাকা উড়েছে, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে...
...আবার অনেক নির্বোধ অতি চালাকি করতে গিয়ে অন্য দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে দিলরোদ-বৃষ্টি-বিবর্ণতা, সকাল-সন্ধ্যা-রাত উপেক্ষা করে আমাদের পতাকা উড়তে থাকল... [১] 

এবারও নিশ্চিত আমাদের মিডিয়া তাদের ক্যামেরায় শান দিচ্ছে এই অসুস্থ প্রতিযোগীতার ঝকঝকে খবর ছাপার জন্য। মাত্র কাল পড়লাম পতাকা লাগাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজনের মৃত্যু। মিছিলের মত এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়বে। পত্রিকার দামী স্পেসে কয়টার আর খবর আসবে!
ভিন দেশের পতাকা লাগবার এই অসভ্য প্রতিযোগীতা নিয়ে আমাদের কোনও বিকার নেই। একজন বিশ হাত লম্বা পতাকা লাগিয়েছে অন্য জন বাদ যাবে বুঝি? এখন ত্রিশ হাত লম্বা পতাকা না-লাগালে যে রাতে ওর ঘুমের সমস্যা হয়!
বিশেষ দিনে যখন আমাদের জাতীয় পতাকা লাগাবার প্রয়োজন হয় তখন এই ঢাউস বাড়িগুলোতে পতাকা লাগাবার কোনও গোপন ইচ্ছা থাকে না। আহা, নীচের ভাড়াটিয়া দোকানদার পতাকা তো লাগিয়েছে। তাও কী, লম্বা ঝাড়ুর হাতল উল্টো করে! লোকজন এখন অনেক চালাক হয়েছে এরা ইয়া লম্বা ভিনদেশি পতাকা লাগিয়ে উপরে আমাদের ছোট্ট একটা পতাকা লাগিয়ে দেয়। ভাবখানা এমন,
আমিও দেশপ্রেমিক বটে
বুদ্ধির অভাব নাই ঘটে।

Monday, June 2, 2014

সাদা তোয়ালে এবং হলুদ ফুল!

জায়গাটার খুব চালু নাম বাথরুম। কিন্তু এখানে লোকজনরা যে কেবল গোসলইকরেন এমনটা বুকে হাত দিয়ে বলা চলে না। আরও কিছু কর্মকান্ড করেন। পাঠককে আমি আমার চেয়ে বুদ্ধিমান মনে করি বিধায় ওই কর্মকান্ডের বিস্তারিত বর্ণনায় যাচ্ছি না।
এবং বাথরুমে যেসমস্ত জিনিস নিয়ম করে রেখে আসা হয় এর বিশদ বর্ণনাও দিচ্ছি না কারণ অতি সূক্ষরুচির পাঠকের গা গুলাতে পারে। এর একটা নাম দিলাম আদর করে, খাবলা খাবলাহলুদ ফুল।

যাই হোক, হিন্দুস্তান টাইমসে চমৎপ্রদ একটা খবর ছাপা হয়েছে:
“Why, have you ever wondered, do almost all seats of government power in India come draped in milky white Turkish towels? Be it the plush U-bend chairs in their offices or the bucket seats of their official cars, the white towel perhaps conjures up for ordinary citizens the most powerful symbol of the ruling elite in this country…” [১]
ছবি ঋণ: www.hindustantimes.com
 ভারতের বাঘা-বাঘা রাজনীতিবিদদের চেয়ারে সাদা তোয়ালে থাকে, থাকবেই। গুরুত্বপূর্ণ আমলা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কেউ বাদ নেই! টাট্টিখানার জিনিস অফিসে কেন? এর কোনও সদুত্তর এই প্রতিবেদনে পাওয়া গেল না। কিছু অনুমান করার চেষ্টা যে হয়নি এমন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার হত বা শাসক শোষিতদের মধ্যে এক অদৃশ্য সাদা দড়ির খেলা ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি অনেকখানি আতংকিত! বাপু, টাট্টিখানার জিনিস অফিসে! এর রেশ ধরে না অন্য জিনিসগুলোও চলে আসা শুরু করে। কে বলতে পারে দুম করে বদনা চলে আসল। বদনা ভরা রজনিগন্ধা। হতে পারে না এমন, বেশ পারে। এর রেশ ধরে চলে আসল হলুদ ফুল। শোনো কথা, চলে আসলে আটকাচ্ছে কে!
হলুদ ফুলের মৌতাত- সবাই হয়ে গেছে কাত।   

১. http://www.hindustantimes.com/india-news/the-white-towel-unveiling-the-symbol-of-indian-power-politics/article1-1224205.aspx


Sunday, June 1, 2014

মঞ্জুর খুন!!

তৎকালীন সরকারি শ্বেতপত্রে বলা হয়:
“…As soon as the jeep reached near tri-junction in front…about 20 to 30 armed troops stopped the vehicle and asked the officer to allow them to search it. Before he could say anything, they opened the back door and found the general (Manzoor)
When Captain Emdad returned…they found Major General Manzoor lying face-down in the drain with a gaping hole in the back of his head…”

“…in the end, Manzoor, Mehboob and Moti were buried without fuss in unmarked graves in the Chittagong cantonment graveyard much against the wishes of the troops…”
Bangladesh: A Legacy of Blood/ ANTHONY MASCARENHAS

জেনারেল মঞ্জুরের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেজর রেজাউল করিম (অব.), যিনি জেনারেল মঞ্জুরের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। চট্টগ্রাম সেনাবিদ্রোহ মামলায় ১০ বছর সাজা হয় তার। ধরা পড়ার পর তদেরকে আলাদা করে ফেলা হয়। মেজর রেজাউল সাক্ষাৎকারে বলেন:
জেনারেল মঞ্জুর বলেন, শাহজাহান সাহেব (তৎকালীন ডিআইজি) আমি এই হাবিলদারের কাছে সারেন্ডার করছি...। শাহজাহান সাহেব তাড়াতাড়ি আমাদেরকে চিটাগাং জেলে পাঠান।
...কিছুক্ষণ পর দেখি আর্মির গাড়ি এসে ঢুকল, হাটহাজারির থানায়...শাহজাহান সাহেব আর আসেননি। আসলেন ক্যাপ্টেন এমদাদ। দাঁড়িয়ে (এমদাদ) বললেন, ভাবী আমরা আপনাদেরকে নিতে এসেছি। আপনি আসেন
তখন মিসেস মঞ্জুর বলেছেন, নো, আমি কেন আপনাদের সাথে যাব। আমরা পুলিশের কাছে সারেন্ডার করেছি

জেনারেল মঞ্জুর কিন্তু একটি কথা কয়েকবার রিপিট করেছেন, আর্মির কাছে হ্যান্ডওভার করলে আমাকে ওরা মেরে ফেলবে। আমাকে তাড়াতাড়ি সেফ কাস্টডিতে পাঠান...I should get an opportunity to face the trail. দেশবাসীকে জানতে হবে। আমার অনেক কথা বলার আছে এবং সেটি বলব আমি...
...তখনই একজন সুবেদার খপ করে তার (মঞ্জুর) ডান হাতটি ধরল...এরপর জেনারেল মঞ্জুর আর কথা বলেননি। ...তারা উঠে মিসেস মঞ্জুরকে টেনে হিঁচড়ে নামাল। বাচ্চাদেরকেও নামাল।
...তখন সম্ভবত একজন পুলিশ অফিসার বলল ভেতরে মেজর সাহেব রয়ে গেছেন। তখন এমদাদ আসল। এমদাদ আমাকে দেখে চমকে গেল। ...এমদাদ এবং আমি একই ব্যাচের।...হাত বেঁধে চোখ বেঁধে আমাকেও গাড়িতে উঠাল।
...পরের দিন সকাল বেলা মুজিব আসলেন।...আমি আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, ‘What about General Manzoor’?
উনি (মেজর মুজিব) ডানে বামে তাকিয়ে আস্তে করে আমাকে বললেন, গত রাতে আর্মি চিফের নির্দেশে জেনারেল মঞ্জুরকে মেরে ফেলা হয়েছে
ওই সময় আর্মি চিফ ছিলেন জেনারেল এরশাদ।...
-সশস্ত্র বাহিনতে গণহত্যা ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১/ আনোয়ার কবীর

আজ ১ জুন মঞ্জুর হত্যার ৩৩ বছর  হয়ে গেল, ১৯৮১ সালের ১ জুন জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়। সম্ভাব্য খুনি এরশাদের বিরুদ্ধে করা এই মামলায় ১৯ বছরে ২৩ বার বিচারক বদল হয়েছেন। এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারক খন্দকার হাসান ফিরোজ সিআইডিকে মামলাটির বিষয়ে আরও তদন্তের নির্দেশ দেন।

সম্প্রতি লরেন্স লিফশুৎজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল মঞ্জুরের বড় মেয়ে রুবানা মঞ্জুর বলেন:
...আমরা জানতে চাই, আমদের বাবাকে কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের বাবার সমাধিস্থলে যেতে চাই...
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা যাকে এই দেশ বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেছিল। অথচ দেশ জানে না তার এই বীর সন্তানকে কোথায় সমাহিত করা হয়েছে! লজ্জা-লজ্জা! দিগম্বর হওয়ার লজ্জা!
Homar sometimed nods- দেবতাদেরও ভুল হয়। জেনারেল মঞ্জুর দেবতা ছিলেন না- তাঁর করা ভুল নিয়ে আলোচনা... তা অন্যত্র আলোচনার ক্ষেত্র। কিন্তু...।

লেখায় এতক্ষণ একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা, ঈর্ষনীয় খেতাবধারী এক জেনারেলের কথা বলছিলাম। এখন চলে এসেছে একজন বাবার কথা।
ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখো আমার হাড়। স্বজনের পুরনো হাড়ে কী থাকে এই নিয়ে বিশদ আলোচনায় যেতে চাচ্ছি না। অল্প কথায় বলি, স্মৃতিই বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে নইলে একেকজন মানুষ, নিজের লাশ নিজেই নিজের কাঁধে বয়ে বেড়াত। সন্তান তার পিতার লাশ ছুঁয়ে দেখতে পারবে না। শেষ শয্যার জায়গাটির এক চিমটি ধুলো কপালে মাখতে পারবে না, হাউমাউ করে কেঁদে বুকটা হালকা করতে পারবে না এমন অন্যায় পিতাসম রাষ্ট্র করে কেমন করে!

Friday, May 30, 2014

পশুমানব!

এই গ্রহের কঠিন গোমড়ামুখো যে মানুষটি সেও মুখ ভরে হাসবে যদি এমন একটা দৃশ্য দেখে ভারী শরীর নিয়ে কেউ নাচার চেষ্টা করছে। আহা, এমন দৃশ্য দেখে না-হেসে পারা যায় বুঝি? একজন মানুষ অতি ভারী শরীর নিয়ে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার এই অমানুষিক কষ্টে গা দুলিয়ে না-হাসলে কেমন হয়! যেমনটা কেউ পা পিছনে বা চেয়ার উল্টে পড়ে গেলে আমরা হেসে মাটিতে গড়াগড়ি খাই। হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গেলে পেট চেপে হাসি।

আমি একবার কি যেন একটা অনুষ্ঠান দেখছিলাম কিন্তু একটা জায়গায় এসেআমার শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অতি ভারী শরীর নিয়ে একটা মেয়ের নাচ। তুর্কি নাচ, দমবন্ধ করা নাচ! চোখে না-দেখলে বিশ্বাস করা যায় না যে কী অসাধারণ তার প্রাণশক্তি। তার উপর নাচের একটা স্টেপও ভুল করতে দেখিনি।
ভারী শরীরের মানুষদের নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি, কেন? এর উত্তর জানা নেই আমার। অথচ মামুলি কিছু উদাহরণ ব্যতীত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেটায় তার হাত নেই। শারীরিক ক্রুটি নিয়ে এমন তো অনেক ক্ষেত্রেই অনেকেরই হাত নেই। কারও হাত-পা থাকে না, কারও-বা মাথায় চুল গজায় না। যেমন আমি চশমা ছাড়া দেখি না। তো? এখন এই কারণে আমাকে কী ইলেকট্রিক পোলে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে?

তা, ভারী শরীরের একজন মানুষের কী নাচার ইচ্ছা থাকাটা দোষের বা অন্যরা যা করে সেইসব? ভারী শরীর হওয়ায় একজনের কী অপরাধ? খাদ্যাভাস মূখ্য বিষয় বটে কিন্তু তার জেনেটিক কোডের তথ্যগুলো কী রাবার দিয়ে ঘষাঘষি করে মুছে দেওয়া যাবে? অনেকে বলবেন এতো খায় কেন? বাপু, এও তো মস্তিষ্কের এক খেলা। যেমন কাউকে দোররা মারলেও সিগারেট ছাড়বে না আবার কাউকে চাবুক মারলেও সে সিগারেট খাবে না। মোটা দাগে আমি নিজে যেটা বুঝি, শরীর চাচ্ছে তাই খাচ্ছে। উল্টোটা বললে সবাই এমন খায় না কেন তাহলে? তাকে বাড়তি বা জোর করে খেতে বললে দেখি বমি করে সব ভাসিয়ে দেবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভারী শরীরের মানুষকে নিয়ে বিভিন্ন প্রকারে মস্তিষ্ক খেলে- সে অসহায় দর্শক মাত্র।


আমি নিজে আন্ডার ওয়েট। আমাকে বিখ্যাত খাদক বলা যাবে না কিন্তু ফ্যাট জাতীয় খাবার হরদম খাই। ফি রোজ বাদামই খাই এক বয়ম। ফলাফল? আজ পর্যন্ত আমার শরীরে ‘চিংগুরাদেশের’ মন্ত্রীদের মাথায় যতটুকু মস্তিষ্ক থাকে তার অর্ধেক ফ্যাটও যোগ হয়নি! দেখো দিকি কান্ড!

জেনে, না-জেনে ভারী শরীরের মানুষদের নিয়ে আমরা হাসাহাসি করেই যাই। হাহাহিহিহোহো-গোলহয়ে তামাশা দেখি। এই পশুমানবের ভিড়ে, ভিড়ভাট্টায় লুকিয়ে থাকাটা মুশকিল, বুঝলেন। কোথাও-না-কোথাও আমাকে, আমার টিকিটি ঠিকই চোখে পড়বে।
একবার আমি শফিক রেহমানকে নিয়ে কঠিন একটা লেখা লিখলাম- এই মানুষটা 'ভিনসেন্ট পিউরিফিকেশনের' নামে বিস্তর ফাজলামি করেছেন। কুখ্যাত স্মৃতিশক্তি আমার। যথারীতি লেখাটার কথা ভুলেও গেলাম। অনেক পরে কেকা ফেরদৌসিকে নিয়েএকটা লেখা লিখেছিলাম [১] । চরম বিরক্তিকর এক মহিলা। এই বিরক্তির রাশ ছিঁড়ে গেল যখন এই ভদ্রমহিলা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ফাজলামি করছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা খিচুড়ির একটা রেসিপি বাতলে যাচ্ছিলেন। লেখাটার এক জায়গায় লিখেছিলাম: 
“ইনি 'স্বাস্থ্য সচেতন রান্না'-এর বই লিখে Gourmand world cook book-এ নাম লেখান। স্বাস্থ্য সচেতন? এটা অবশ্য এই ভদ্রমহিলাকে দেখলেই আঁচ করা যায়!”
ব্যস,আর যায় কোথায়। এক পাঠক ঠিক-ঠিক শফিক রেহমানকে নিয়ে আমার ওই লেখাটা খুঁজে বের করলেন। ওই লেখায় আমি যেটা লিখেছিলাম:
"শিক্ষিত মানুষরা কেন যে কারও শারীরিক ক্রুটি নিয়ে কটাক্ষ করেন, কে জানে- যেটায় তার হাত নাই!"
এটার উদ্ধৃতি দিয়ে আমাকে শুইয়ে দিলেন। আমি শক্ত কিছু যুক্তি দেখাতে পারতাম কিন্তু সেপথ মাড়ালাম না। সোজা দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জার হাত থেকে নিজেকে বাঁচালাম...।
 
১. মুক্তিযোদ্ধাদের খিচুড়িও যখন একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য! : http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_21.html

গাট্টা!



চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়নি, বরং শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের ঠাট্টায়সাংবাদিক পালিয়েছিলেনবলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে
পরবর্তী পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ওই সাংবাদিক কাউকে কিছু না বলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যানরোগী ও তার স্ত্রী অজানা শঙ্কা থেকে হাসপাতাল ত্যাগ করে নিয়মবিরোধী কাজ করেছেন... 
সূত্র: bdnews24.com (http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article794449.bdnews)
এই প্রতিবেদনটি সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করার পর মাননীয় বিচারক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে নতুন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন

চার সদস্যের এক কমিটি এই প্রতিবেদনটি যে বিস্তর যন্ত্রণা করে  প্রসব করেছেন এতে কোনও সন্দেহ নেই। আমি তাদের প্রসবযন্ত্রণার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। এবং এই দুঃসাধ্য‌ কর্ম করতে গিয়ে তাদের কীরূপ সসেমিরা বা বাহ্যজ্ঞানশূন্য অবস্থা হয়েছিল তা খানিকটা আঁচ করতে পারি।
তাদের দেওয়া প্রতিবেদনে জরুরি যে বিষয়টি নেই তা হচ্ছে, শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ঠাট্টাচ্ছলে ওই সাংবাদিককে এই কথাটা বলেছিলেন কেন! এদের মধ্যে কী রসিকতার সম্পর্ক আছে? মামা-ভাগিনা, শালা-দুলাভাই টাইপের? এমনটা হয়ে থাকলে আমার কোনও বক্তব্য নাই কারণ এটা তাদের পারিবারিক বিষয়। এটা তারা পারিবারিক ভাবেই শেষ করবে। আমার নাক গলাবার কোনও গোপন ইচ্ছা নাই। 

সাংবাদিক মহোদয়গণ এই সংবাদে অনেক খুঁটিনাটি তথ্য দিয়েছেন কেবল কাজের তথ্যটাই দেননি! অসাধারণ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন চার কুতুব, এরা কারা, এরে নাম কি? আর মাননীয় আদালত এই প্রতিবেদনে তুষ্ট হননি আবারও নতুন করে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন, আদালতের প্রতি অসম্ভব ভাল লাগা কিন্তু এই চার কুতুবকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালে আরও ভাল লাগত। কারণ ভবিষ্যতে অন্য কেউ এমন ফাজলামি করার পূর্বে দ্বিতীয়বার চিন্তা করত। 

চার কুতুবের জন্য বাচ্চাদের ছড়া আওড়াই:
"আবারও করলে এমন ঠাট্টা
মাথয় মারব এক রাম গাট্টা।"

Monday, May 26, 2014

অব্যবস্থিতচিত্ত!



খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত যে তিন জন RAB কর্মকর্তা এদেরকে গ্রেফতার করার জন্য হাইকোর্ট সুষ্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার পরও এই নিয়ে জল কম ঘোলা হয়নি। কষ্টার্জিত অনুমানের প্রয়োজন পড়ে না যে তিতাসের জল মেঘনায়, মেঘনার জল তিতাসে গড়িয়েছে।
হাইকোর্টের এই নির্দেশনার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ...কথায়-কথায় রিট করা ঠিক না...। তিনি আরও বলেন, ...সরকার ঠিকমতোই এগোচ্ছিল। রিট করে বরং সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে।...যার যার কাজ তারাই করবে। ...নির্বাহী বিভাগের কাজ নির্বাহী বিভাগ করবে...। (দৈনিক আমাদের সময়, ১৫.০৫.১৪)
এটা আমার নিজস্ব মত, হাইকোর্ট এখানে শক্ত ভূমিকা না-নিলে এদেরকে আইনের আওয়ায় আনাটা দুষ্কর ছিল। এই দেশের সমস্ত মানুষ আমার মতের সঙ্গে একমত না-হলেও আমি আমার মতে অটল থাকব। ক্ষমতাশীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রীর জামাতাকে কাঠগড়ায় তোলা, একী ছেলের হাতের মোয়া! যে দেশে ক্ষমতাশীন দলের অতি প্রভাবশালী মানুষ বলেন, ...৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসেছি। আন্দোলনের নামে নাশকতা করলে হাত-পা কেটে দেওয়া হবে...

এই হচ্ছে আমাদের দেশের একজন আইনপ্রণেতার ভাষা! এই রাষ্ট্র কী আইনের আওতায় থেকে কাউকে কারও হাত-পা কাটার ক্ষমতা দেয়? মৃত্যুদন্ড দেওয়া নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি আছে আমি সে পথ এখন মাড়াব না। রাষ্ট্র চাইলে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে কিন্তু রাষ্ট্র কী কারও হাত-পা কেটে ফেলার ক্ষমতা রাখে? রাখে না কিন্তু ক্ষমতাশীন দলের লোকজনেরা রাখেন। এই কারণে কী কোনও শাস্তি হয়েছে।? এর উত্তরটা যে না এটা একটা শিশুও জানে।  

আদালতের প্রতি প্রধানমন্ত্রী যে উষ্মা দেখিয়েছেন সেই আদালত্ই যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন তখন আংশিক বক্তব্যই বেদবাক্য হয়ে যায়।
আর এই নির্বচনের পরে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলের নেতার প্রতি কটাক্ষ করে বলেছিলেন, গোলাপি ট্রেন মিস করলি...। আরও পরে, গোলাপি এখন উপজেলা ট্রেনে...। (দৈনিক আমাদের সময়, ০৯.০২.১৪)
এই নিষ্ঠুর রসিকতাটা করার পূর্বে তিনি এটা ভাবার প্রয়োজন বোধ করেননি যে এই কটাক্ষ এই দেশের অধিকাংশ মানুষকে আহত করে যারা তাঁদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি।

প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, আমি নিজেই প্রতিদিন সকালে এক ঘন্টা এবং বিকালে এক ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছি। যাতে মানুষ ভুলে না যায় তারা কী কষ্টে ছিল...। (দৈনিক প্রথম আলো, ০৬.০৯.১২)
অর্থাৎ ২৪ ঘন্টার বিদ্যুৎ প্রধানমন্ত্রীর হাতে আছে কিন্তু তাঁর খুশি তিনি দুই ঘন্টা দেবেন না।

যে RAB কর্মকর্তারা খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত এরা যে গাড়ি, অস্ত্র, চেতনানাশক স্প্রে, ইট, রশি, যে ছুঁরি দিয়ে পেট ফেঁড়ে দিয়েছেন সবই আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় কেনা অথচ আমরা এদেরকে কাঠগড়ায় তুলতে পারব না। বাহ!  
তো, হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ না-করলে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎবিষয়ক বক্তব্যের মত যদি এটা বলে বসতেন, এই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করার ক্ষমতা আমার আছে কিন্তু আমি বিচার করব না কারণ মানুষ যেন ভুলে না-যায় খুন হলে কত কষ্ট লাগে..।
তাহলে তো সেটা হতো ভারী মুশকিলের কথা।

Thursday, May 22, 2014

গুডবাই, আ ‘বাইক-বয়’।

‘নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না’ নামে একটা উপন্যাস আছে আমার যেটা ছাপা হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। এই উপন্যাস জুড়ে অদ্ভুত এক চরিত্র আছে। আমার সৃষ্ট অদ্ভুতদর্শন এক চরিত্র, 'ফুয়াদ'!
বিভিন্ন সময়ে যখন কোনও পাঠক আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, এমন-এক অদ্ভুতদর্শন চরিত্র যেটা বাস্তব বিবর্জিত এটা কেন গোটা উপন্যাস জুড়ে? এর উত্তরে আমি এমন এক হাসি হাসতাম যার অর্থ হ্যাঁ-না কিছুই বোঝায় না।

আমার সৃষ্ট চরিত্র যে বললাম এটা আসলে জাঁক করে বলা। বলা হয়ে থাকে, সৃষ্টি-বিনাশ বলে আসলে কিছু নাই। যা আছে সবই প্রকৃতি, প্রকৃতির সন্তানের নকল। এমনিতে আমি যেটা বলি, ফ্যান্টাসির জন্ম রিপোর্টিং-বাস্তবের গর্ভে! এই ফুয়াদ নামের চরিত্রটির পেছনে যে বাস্তব মানুষটার ছায়া ...বাস্তবের এই মানুষটার সমস্ত কর্মকান্ড লিখতে গেলে কয়েকটা উপন্যাস হয়ে যাবে।

আমার চেয়ে বয়সে বড়ো এমন একজন মানুষের সঙ্গে এমন তীব্র বন্ধুত্ব কেমন করে হলো এ এক বিস্ময়! বাস্তবের এই মানুষটার নাম খুব জরুরি না এখানে, লেখার সুবিধার কারণে বাস্তবের এই মানুষটার নাম দিলাম, ‘বাইক বয়’। এঁর সঙ্গে কতশত স্মৃতি...!

একজন কাউবয়ের যেমন অধিকাংশ সময় কাটে ঘোড়া-স্ট্যালিয়নের পিঠে তেমনি এই বাইকবয়ের সময় কাটত মটরসাইকেলের পিঠে!  ও তখন চালাতো হন্ডা সিডিআই টু স্ট্রোক। ওর কথামতে ‘সুইটি’। অঘটনঘটনপটীয়সী সুইটি।
এবং যথারীতি অধিকাংশ সময়ে পেছনে আমি। পেছনে আমি এটা বাড়িয়ে বললাম, কোন প্রকারে ঝুলে থাকতাম। কারণ হাইওয়েতে ১০০-এর নীচে চালাবার খুব-একটা উদাহরণ এর নাই!

আমি সেসময়ের কথা বলছি যখন আমার এখনকার মত শেকড় গজিয়ে যায়নি। প্রচুর ঘুরতাম তখন। আমরা তিন জন। আমি বাইক-বয় আর সুইটি। কেবল ঘোরাঘুরির সময়ই যে সুইটি থাকত এমন না, অতি প্রয়োজনেও।

সেটা ১৯৯৭ সালের কথা। আমার ছোটবোনের বাচ্চা হবে। আগেভাগেই তাকে জেলা শহর কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাচ্চা হওয়ার তারিখ আরও কদিন পরে কিন্তু কী যে একটা ভজকট হলো, প্লেসেন্টা না কি যেন...তখনই জরুরি অপারেশন বা রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। আমার মাথা পুরোপুরি ফাঁকা। কী করি, কেমন করে যাই?

দুপুর বেলা। বাইক-বয়ের বাসায় পা ছড়িয়ে বসে আছি। বাইক-বয় আরেক জেলা শহর থেকে মাত্র ফিরল বাসায়। ভাত খেতে। এমন অবস্থায় ওকে কিচ্ছু বলার সাহস করতে পারছিলাম না। বাইক-বয় বলে, ‘কি হইছে তোমার’? আমি বিড়বিড় করি।
মানুষটা অস্থির। সবটা শোনার প্রয়োজন বোধ করে না। শিস বাজাতে বাজাতে বলে, ‘চাল মেরে ভাই’। আমার চোখে তখন আনন্দের জল!

সুইটি উড়ে যাচ্ছে! হাইওয়েতে কখনও ১০০ কিলোমিটারের নীচে ওঁ চালিয়েছে এমনটা আমার মন পড়ে না! ৭০ কিলোমিটার যাত্রাপথে কেবল একবার  সুইটিকে থামিয়ে দিলাম। কারণ ক্ষিধায় ওঁর হাত কাঁপছিল। আমার ঝোলায় সবসময়ই চকোলেট হাবিজাবি থাকত। ওকে বললাম, ‘আপনি এমন অবস্থায় ড্রাইভ করতে পারবেন না। খায়া নেন’।
এরপর আবারও সুইটি উড়ে চলে। 

ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট এর কাছে নস্যি। মেয়েকে পেছনে বসিয়ে সিলেট চলে যায়! নাক ঝাড়ার জন্য, একটা ব্যাটারির জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়াটা ডালভাত! একবার আমার পেছনে পড়ল, ‘চলো বান্দরবন থেকে ঘুইরা আসি’। তখন আমি হড়বড় করে বলেছিলাম, ‘ওয়াল্লা, বাইক নিয়ে! মাফ চাই, দোয়াও চাই। আর আমি ফ্যামেলি ম্যান'!
বাইক-বয় ক্ষেপে গেল, 'কী, আমি কি গাঙ দিয়া ভাইস্যা আসছি। আমার ফ্যামেলি নাই'!

একবার গেছি চট্টগ্রাম। আমরা দুজন হোটেলে এবং যথারীতি সুইটি বাইরে। তীব্র দাঁতের ব্যথায় মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি যেন বাইক-বয়ের ঘুম না-ভাঙ্গে। কেমন করে টের পেলেন আমি জানি না... চোখ অবিকল গরুর চেখের মত করে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কী হৈছে’?
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বলি, ‘কিছু না, দাঁত ব্যথা’।
ওঁ স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রসিকতা করতে ছাড়েন না, ‘দাঁতে তুমি মঘার হালুয়া লাগাও’।
তখন মঘার হালুয়ার বিজ্ঞাপনের খুব চল। রাগ করার কথা কিন্তু রাগ করার কোনও সুযোগ থাকল না কারণ সে একের-পর-এক গল্প শুরু করল। সকাল পর্যন্ত চলত এই গল্পের খেলা। এরিমধ্যে অবশ্য বেশ ক-বার এটা তাঁর বলা হয়ে গেছে যে তাঁর নাকি ঘুম আসছে না। শোনো কথা, আমি কী শালা বেকুব, নাকি ঘাস খাই! ওরে, কখনও-কখনও অসহ্য ভালোবাসা সহ্য হয় না, রে!

অনেক কটা বছর প্রবাসে থেকে আসা এই মানুষটা দেশের বিভিন্ন অনাচার দেখে দেশের প্রতি ছিল দুর্দান্ত রাগ। কথায় কথায় বলতেন, ‘হেল আউট অভ হিয়ার’।
আমাকে পটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন দুজনে মিলে কোনও উন্নত দেশে একেবারের জন্য চলে যেতে। খরচ নিয়ে পরোয়া নেই এটা তার দায়িত্ব।
আমি হাঁই তুলে বলতাম, 'আমার যদি দেশের বাইরে সেটেল করতে  হয় তাহলে... আমার যে লাইফ লাইন এর থেকে পাঁচ বছর কমে যাক তবুও আমি দেশ ছেড়ে যাব না। কচ্ছপের মত কামড় দিয়ে থাকব'।

যে বার আমি দেশের বাইরে জার্মানিতে গেলাম লেখালেখির এক আমন্ত্রণে। এই মানুষটা আমার কানের পোকা নাড়িয়ে দিলেন, ‘এদেরকে বলো তোমার সঙ্গে একজন যাবে। তোমার তো খরচ নিয়া চিন্তা নাই ওরা দিবে আর আমার খরচ নিয়াও চিন্তা নাই। আমারটা আমি দিব’।
মানুষটার শিশুসুলভ আচরণের সঙ্গে আমি পরিচিত। হাসি গোপন করে বলি, ‘আপনি ওখানে গিয়ে কী করবেন’?
মানুষটার তড়িঘড়ি উত্তর, ‘কও কী, দেশ দেখব। তোমার সাথে-সাথে থাকব। তুমি এদেরকে বইলা দেখো’।
আমি উদাস হয়ে বলি, ‘পাগল, তাই কী হয়। কেবল একজনের জন্য যাওয়ার অনুমতি'।

অনেকগুলো দেশে ভ্রমণের সুযোগ থাকা সত্বেও তিন দিনের মাথায় ফিরে আসার পর মানুষটা হিসহিস করে বললেন, ‘এই দেশে অরিজিনাল গাধা এইটাই আছে ওইটা তুমি, লেইখা রাখো’।
আমি পাগলটাকে ঠান্ডা করার জন্য গা দুলিয়ে বলি, ‘আলবত, আমি আপনার সঙ্গে একমত। আপনি সত্য বলছেন। আখাউড়া বর্ডার দিয়ে ভারত থেকে যে দশটা গাধা এসেছিল ওদের মধ্যে আমিও ছিলাম’।

হন্ডা চুরি হওয়ার পর বেশ কটা বাইক বদল হয়েছিল। হালে লাখ পাচেঁক টাকা দিয়ে কি একটা ব্রান্ডের বাইক কিনেছিলেন আমি জানি না। কারণ...! খুব বেশি দিন হয়নি এই বাইক-বয়ের সঙ্গে আমার দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল।
দুইটা জিনিস আমি সহ্য করতে পারি না। এক, আমাকে কেউ অবিশ্বাস-অপমান করলে। দুই, খুব কাছের মানুষের কাছ থেকে সামান্যতমও অবহেলা পেলে। তখন মানুষটার অস্তিত্ব আমার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।

দূরুত্বের কারণটা আমাকে নিয়ে না! বাইক-বয়কে নিয়ে বাজারে তখন প্রচুর কথা। শপথ আমার লেখালেখির, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম মানুষটাকে রক্ষা করতে কিন্তু তিনি আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করলেন। মানুষটার নাগাল পাওয়া যায় না! একদিন, অনেক খোঁজ লাগিয়ে একদিন আমার বাসায় ধরে আনলাম। যেটা আমি অকাট্য জানি সেটা তিনি স্রেফ অস্বীকার করলেন। আমি একটা ধাক্কার মত খেলাম। অথচ আমার কাছে অস্বীকার করার প্রয়োজন ছিল না—আমি দু'হাত আগলে তাকে রক্ষা করতাম! তারমানে তিনি আমাকে বিশ্বাস করছেন না! এটা এই প্রথমবার ঘটল!

আমার ওই উপন্যাসটার শেষ লাইনটা এমন ছিল: 
‘...ফুয়াদ এই শহরেই থাকে, দেখা হয় কদাচিৎ’।
সেই ফুয়াদ যার আদলে সৃষ্টি সেই বাইকবয় সিলেট যাত্রাপথে হবিগঞ্জে পড়ে থাকেন হাত-পা-কোমর ভেঙ্গে। মসৃণ রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে একমাত্র আদরের  মেয়ের জন্য কেনা এটা-সেটা...। গলগল  করে গড়িয়ে পড়া রক্ত রাস্তার পিচ নিমিষেই শুষে নেয়। শুষে নেয় ওঁর সমস্ত প্রাণশক্তি।  কথায়-কথায় যে মানুষটার মারা যাওয়ার বড়ো শখ দেখেছি সেই মানুষটার আজ বাঁচার কী তীব্র আকুতি। প্রিয়মানুষকে ফোন দিয়ে কাঁদেন, 'তাড়াতাড়ি আসো, আমি মরে যাচ্ছি যে...'।

মানুষটা আজ অন্য ভুবনে! দেখা হবে না যে আর কোনও দিন। জীবিত থাকতে এই মানুষটাকে দেখেছি অস্থির, বড় অস্থির! ওকে, বাইক-বয়, সারাটা জীবন অনেক, অনেক করলে অস্থিরতা—এবার একটু চুপচাপ স্থির হয়ে ঘুমাও...।
...
উন্নত দেশগুলোতে লোকজন প্রথমেই যাবে পুলিশের কাছে। আমাদের দেশে উল্টো, আজরাইলের কাছে যাবে কিন্তু পুলিশের কাছে যাবে না! পুলিশ নিয়ে কোনও ভাল কথা আমরা শুনতে পছন্দ করি না। তাই মিডিয়ারও এই বিষয়ে আগ্রহ প্রায় শূন্য!
হবিগঞ্জে এই দুর্ঘটনা ঘটার পর পুলিশ যদি যথা সময়ে চলে না-আসত তাহলে এই বাইক, সঙ্গে থাকা টাকা এবং দামী দুইটা মোবাইল হাপিশ হয়ে যেত। ইনি মারা যাওয়ার পূর্বে সঙ্গে থাকা এক লাখ তেইশ হাজার টাকা সার্জেন্টের হাতে তুলে দেন। তাঁর স্ত্রী যাওয়ার পর বাইক, টাকা, সেল ফোন সবই ঠিক-ঠিক বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ও পুলিশ, নতজানু হই...।
WhatsApp