Thursday, July 8, 2010

দানবীয় উম্মাদনা

খেলা নিয়ে আবেগ দোষের কিছু না বরং আবেগ না থাকাটাই দোষের! কিন্তু 'এক কাপ চায়ে যখন দু-কাপ চিনি' দেয়া হয় তখন সেটাকে চা বলাটা বাতুলতা মাত্র। এই দেশ একেকবার একেক হুজুগে মাতে। 
কিন্তু এইবার বিশ্বকাপের আবেগ উম্মাদনায় পরিণত হলো, এই উম্মাদনা দানবীয় আকার ধারণ করল। এক পক্ষ অন্য পক্ষের মা-বোনকে জড়িয়ে কুৎসিত গালাগাল করছে তো কেউ কারও পেটে ছুঁরি সেধিয়ে দিচ্ছে।

কোথাও এটাও লিখেছিলাম, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বিদায় হলে আমি খুশি হই। আমি তিতিবিরক্ত হয়ে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে লিখলাম, "আমি দুর্বলের পক্ষে। বিশ্বকাপ থেকে সেলিব্রেটি সব দল বিদায় নিক। নতুন মুখ আসুক"।
গোটা গ্রহ আটকে আছে মুষ্টিমেয় কয়েকটা দলের প্রতি। এর পেছনে মিডিয়ার ভূমিকাও সীমাহীন। এরা কাকা বাঁকা হয়ে আছে তবুও তাকে স্টার বানিয়ে রাখা চাই। 
আমার ভাবতেও কষ্ট লাগে ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়া একটা দেশ ভারত বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতে পারে না। আমরা বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখব কেমন করে? কিন্তু এই স্বপ্ন তো আমাদেরকে দেখতেই হবে। 
(এখন যে দুটা দল ফাইনালে গেছে স্পেন এবং হল্যান্ড, এরা কখনই জয় করতে পারেনি এই সম্মান। ভাল লাগছে এটা জেনে নতুন মুখ আসছে।)

তো, পতাকায় পতাকায় ছেয়ে গেল গোটা দেশ, অধিকাংশ পতাকাই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার! কোথাও জাপানের পতাকা দেখলাম না। আজিব, ব্যাটা আবেগ থাকলে জাপানের জন্য থাকবে, এশিয়ার দেশ!  কোথায় কী! মেসি, কাকাই কেবল স্টার বাকি সব ছাতাফাতা!

কেউ বাদ রইল না[১]। প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে গেল, কে কত বড়ো পতাকা লাগাতে পারে! বিশ হাত ত্রিশ হাত থেকে শুরু করে এর পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকল- এদের অনেকেরই চুলায় বেড়াল ঘুমায়! 
এর পেছনে মিডিয়ার কিছু ব্যবসায়িক ভাবনা কাজ করেছে। বাজারে 'কালের কন্ঠ' [৪] আসার পর 'প্রথম আলো' [৫] পত্রিকা একটা ধাক্কার মত খেল। আমার অন্য একটা লেখার কারণে যেখানে যেতাম সেখানকার পত্রিকার হকারের সঙ্গে কথা বলতাম, জানতে চাইতাম, প্রথম আলোর সার্কুলেশন কতটা কমেছে? কয়েকজন আমাকে বলেছিলেন, প্রথম আলো আগের জায়গায় ফিরে যাবে কারণ বিশ্বকাপ নিয়ে এরা বিপুল আয়োজন করবে, বাড়তি পাতা যোগ করবে।
আমি যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি এই তথ্য কোথায় পেলেন? 
এরা অবহেলার হাসি হেসে বলতেন, সব খবর আছে আমাদের কাছে।
আমি কথা বাড়াতাম না। কারণ কার যোগাযোগ যে কার সঙ্গে এই সব খবর কী আর আমি নিয়ে বসে আছি। কে জানে, হয়তো মতি ভাইয়া এঁদের সঙ্গেও গোলটেবিল বৈঠক করেছেন! এখন পত্রিকাওয়ালারা কর্পোরেট ভুবনের লোকজনের চেয়েও চৌকশ হয়ে গেছে। এরা মার্কেটিং খুবই ভাল বোঝে। পাবলিক কোনটা খাবে, কোনটা খাবে না এটা এরা পাঠকের চেয়েও ভাল জানে।

কখন মুসা ইব্রাহিমকে এভারেস্টে কোলে করে উঠাতে হবে, কখন নামাতে হবে সবই এঁদের নখদর্পনে! মুসা ইব্রাহিমের তথ্য পরিবেশন করতে গিয়ে কেমন করে চুরি-চামারি [২] করতে হবে, ধরা পড়ার পরও দাঁত বের করে হাসতে হবে [৩], সবই মাপা। 
ক্ষণে ক্ষণে মুসা ইব্রাহিমের তথ্য আমাদের আপডেট করা হচ্ছে। প্রথম আলো পত্রিকা পড়ে আমরা এটাও জানতে পারছি, "মুসা ইব্রাহিম এখন মহাশূন্যে বিচরণ করতে চান"। 
আমি অপেক্ষায় আছি, কখন দেখব কোন এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আনিসুল হকের সঙ্গে মুসা ইব্রাহিম ডিম ভাজি করছেন, নিদেনপক্ষে পানি গরম করছেন। আমরা বসে হাঁ করে দেখব।

তো, প্রথম আলোতে খবরটা আসল মৌলভীবাজারে ৬০০ ফুট পতাকা উড়ানো হয়েছে। প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় এই খবরটা আসার পর অন্যরা বসে থাকবে বুঝি। দুদিনই পরই জানা গেল ৯০০ ফুট পতাকা উড়েছে, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে। 
আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম পত্রিকাওয়ালাদের বদান্যতায় যে এই খবরগুলো পড়ছি, কোন দিন না এটা পড়তে হয়: (ক্ষমা চাচ্ছি, বিডিআরের নতুন নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না)। 
আঞ্চলিক প্রতিনিধি: বিডিআর, বিএসএফের মধ্যে গোলাগুলি হইয়াছে কারণ একটি পতাকা বানানো হইয়াছে যাহা ষাট হাজার বর্গমাইলের কিন্তু ইহা বাংলাদেশ ছাড়াইয়া ভারতে চলিয়া গেলে বিএসএফ ঘোর আপত্তি জানাইয়াছিল। তাহাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ইহা কলিকাল নহে, এমনটা চলিতে পারে না। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মাঝে বৃষ্টির ন্যায় গোলাগুলি শুরু হইয়া যায়, এখনও জমিতে থাকা গুলির খোসার উপর দাঁড়াইয়া গুলি ছোঁড়া হইতেছে। ইহা লইয়া সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করিতেছে। আমাদের আঞ্চলিক প্রতিনিধি সেখানে অবস্থান করিতেছেন। 
(ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আঞ্চলিক প্রতিনিধি থাকেন কিন্তু মাখন-মাখন জায়গায় থাকেন আবার পত্রিকার বাঘা বাঘা স্যাররা।)

অনেকে বলবেন, পত্রিকায় এই খবর না আসলে আমরা জানতামই বা কেমন করে? তাও বটে! কিন্তু কাজটা যে ঠিক হচ্ছে না এই বিষয়ে পত্রিকার কোন ভাষ্য নাই। যেমন, এই খবরে জরিনা বেগমেরও একটা বক্তব্য ছাপা হতে পারত, বেডা গো মাথাত দুষ, ১০ হাত শাড়ি পিন্তাম পাই না আর হেরা...।
জানি-জানি, এরপর কি বলা হবে, এটা পত্রিকার দায়িত্ব না, সরাসরি খবরে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা ইত্যাদি। কেন রে বাপু, অতীতে কি আর এমনটা হয়নি, অন্যের মুখ দিয়ে নিজেদের কথা বলানো?
আহা, এটা কি আমরা বারবার পড়িনি, পেত্তম আলোর পেত্তম রিলিপ পাইয়া...। বা পেত্তম আলো মোরে ইলিপ দিয়া বাচাইল?


আবার অনেক নির্বোধ অতি চালাকি করতে গিয়ে অন্য দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে দিল। রোদ-বৃষ্টি-বিবর্ণতা, সকাল-সন্ধ্যা-রাত উপেক্ষা করে আমাদের পতাকা উড়তে থাকল। প্রশাসন থেকে কোথাও এই নিয়ে আপত্তি করতে দেখলাম না- খরচ হয়ে যাবে এই ভয়ে এঁরা আবার নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করেন না। কেবল উপরঅলার নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকেন!
এদের এটা কে বোঝাবে, এই পতাকাটা কেউ আমাদেরকে মুফতে-দানে দেয়নি। এটা অর্জন করার জন্য কাতারে কাতারে মানুষ মরেছে, রক্তের স্রোত বয়ে গেছে।

আমি অন্য একটা লেখায় লিখেছিলাম, 
"অন্য দেশের পতাকা নিয়ে আমাদের মাতামাতির শেষ নাই, নিজের দেশে ফুটবল খেলার মাঠের কোন খোঁজ নাই, ফুটবল ম্যাচের পাত্তা নাই! কয়েকজনকে আমি বললাম, আমি টাকার ব্যবস্থা দেখি, তোমরা কি পারবে একটা ফুটবর ম্যাচের আয়োজন করতে? সবাই আমাকে নিরাশ করলেন। তাদের বক্তব্য, আরে না, মারপিট হবে। শোনো কথা!"

হতাশার সঙ্গে আমাকে আবারও বলতে হয়, আমি এখনো লোক খুঁজে বেড়াচ্ছি যে এখানে একটা ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করে দিতে পারবেন...। 
সহায়ক লিংক: 
১. পতাকার প্রতিযোগীতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_8254.html 
২. চৌর্যবৃত্তিও একটি শিল্প: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_27.html 
৩. ধরা পড়ে গা বাঁচানোও একটি শিল্প: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_29.html
৪. কালের কন্ঠ: http://tinyurl.com/38qlfcf
৫. প্রথম আলো: http://tinyurl.com/3yadh4k  

4 comments:

sairas said...

Now,You are in P.alo

হাফিজ said...

শুভ ভাই,প্রথম আলোয় আপনাকে নিয়ে লেখাটা পড়লাম।http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=40&date=2010-07-09 যাক,তবুও ভাল প্রথম আলোর দেরীতে হলেও এটা মনে হয়েছে পাঠকের জন্য এই লেখাটা দেয়া প্রয়োজন। কিন্ত এটার প্রতিবেদক দুলাল ঘোষ এই তথ্য কই পেলেন প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল,জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে?প্রথম আলোর ডেস্কে কি এমন কেউ ছিল না এই ভুলটা সংশোধন করে দেবে? এরা এমন ক্যালাস কেন?

।আলী মাহমেদ। said...

দেখলাম। @sairas

।আলী মাহমেদ। said...

"...প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল,জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে...?
হা ঈশ্বর! আমি তাহলে এতো দিন জলবায়ু নিয়ে কস্তাকস্তি করেছি? কসম, এটা আমার জানা ছিল না, আজই জানলাম- জেনে আমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার দশা!

কেন যেন জেনে সুখি হতে পারলাম না কারণ যারা পুরস্কারটা দিয়েছেন তাঁরা বলছেন অন্য কথা। এখন কার কথা বিশ্বাস করি?
অবশ্য প্রথম আলো খানিকটা তকলীফ করে লিংকটা দেখে নিলে তাদের আর সংশয়টা থাকত না।
http://ht.ly/21Z7s

@হাফিজ