Search

Thursday, July 8, 2010

দানবীয় উম্মাদনা

খেলা নিয়ে আবেগ দোষের কিছু না বরং আবেগ না থাকাটাই দোষের! কিন্তু 'এক কাপ চায়ে যখন দু-কাপ চিনি' দেয়া হয় তখন সেটাকে চা বলাটা বাতুলতা মাত্র। এই দেশ একেকবার একেক হুজুগে মাতে। 
কিন্তু এইবার বিশ্বকাপের আবেগ উম্মাদনায় পরিণত হলো, এই উম্মাদনা দানবীয় আকার ধারণ করল। এক পক্ষ অন্য পক্ষের মা-বোনকে জড়িয়ে কুৎসিত গালাগাল করছে তো কেউ কারও পেটে ছুঁরি সেধিয়ে দিচ্ছে।

কোথাও এটাও লিখেছিলাম, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বিদায় হলে আমি খুশি হই। আমি তিতিবিরক্ত হয়ে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে লিখলাম, "আমি দুর্বলের পক্ষে। বিশ্বকাপ থেকে সেলিব্রেটি সব দল বিদায় নিক। নতুন মুখ আসুক"।
গোটা গ্রহ আটকে আছে মুষ্টিমেয় কয়েকটা দলের প্রতি। এর পেছনে মিডিয়ার ভূমিকাও সীমাহীন। এরা কাকা বাঁকা হয়ে আছে তবুও তাকে স্টার বানিয়ে রাখা চাই। 
আমার ভাবতেও কষ্ট লাগে ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়া একটা দেশ ভারত বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতে পারে না। আমরা বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখব কেমন করে? কিন্তু এই স্বপ্ন তো আমাদেরকে দেখতেই হবে। 
(এখন যে দুটা দল ফাইনালে গেছে স্পেন এবং হল্যান্ড, এরা কখনই জয় করতে পারেনি এই সম্মান। ভাল লাগছে এটা জেনে নতুন মুখ আসছে।)

তো, পতাকায় পতাকায় ছেয়ে গেল গোটা দেশ, অধিকাংশ পতাকাই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার! কোথাও জাপানের পতাকা দেখলাম না। আজিব, ব্যাটা আবেগ থাকলে জাপানের জন্য থাকবে, এশিয়ার দেশ!  কোথায় কী! মেসি, কাকাই কেবল স্টার বাকি সব ছাতাফাতা!

কেউ বাদ রইল না[১]। প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে গেল, কে কত বড়ো পতাকা লাগাতে পারে! বিশ হাত ত্রিশ হাত থেকে শুরু করে এর পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকল- এদের অনেকেরই চুলায় বেড়াল ঘুমায়! 
এর পেছনে মিডিয়ার কিছু ব্যবসায়িক ভাবনা কাজ করেছে। বাজারে 'কালের কন্ঠ' [৪] আসার পর 'প্রথম আলো' [৫] পত্রিকা একটা ধাক্কার মত খেল। আমার অন্য একটা লেখার কারণে যেখানে যেতাম সেখানকার পত্রিকার হকারের সঙ্গে কথা বলতাম, জানতে চাইতাম, প্রথম আলোর সার্কুলেশন কতটা কমেছে? কয়েকজন আমাকে বলেছিলেন, প্রথম আলো আগের জায়গায় ফিরে যাবে কারণ বিশ্বকাপ নিয়ে এরা বিপুল আয়োজন করবে, বাড়তি পাতা যোগ করবে।
আমি যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি এই তথ্য কোথায় পেলেন? 
এরা অবহেলার হাসি হেসে বলতেন, সব খবর আছে আমাদের কাছে।
আমি কথা বাড়াতাম না। কারণ কার যোগাযোগ যে কার সঙ্গে এই সব খবর কী আর আমি নিয়ে বসে আছি। কে জানে, হয়তো মতি ভাইয়া এঁদের সঙ্গেও গোলটেবিল বৈঠক করেছেন! এখন পত্রিকাওয়ালারা কর্পোরেট ভুবনের লোকজনের চেয়েও চৌকশ হয়ে গেছে। এরা মার্কেটিং খুবই ভাল বোঝে। পাবলিক কোনটা খাবে, কোনটা খাবে না এটা এরা পাঠকের চেয়েও ভাল জানে।

কখন মুসা ইব্রাহিমকে এভারেস্টে কোলে করে উঠাতে হবে, কখন নামাতে হবে সবই এঁদের নখদর্পনে! মুসা ইব্রাহিমের তথ্য পরিবেশন করতে গিয়ে কেমন করে চুরি-চামারি [২] করতে হবে, ধরা পড়ার পরও দাঁত বের করে হাসতে হবে [৩], সবই মাপা। 
ক্ষণে ক্ষণে মুসা ইব্রাহিমের তথ্য আমাদের আপডেট করা হচ্ছে। প্রথম আলো পত্রিকা পড়ে আমরা এটাও জানতে পারছি, "মুসা ইব্রাহিম এখন মহাশূন্যে বিচরণ করতে চান"। 
আমি অপেক্ষায় আছি, কখন দেখব কোন এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আনিসুল হকের সঙ্গে মুসা ইব্রাহিম ডিম ভাজি করছেন, নিদেনপক্ষে পানি গরম করছেন। আমরা বসে হাঁ করে দেখব।

তো, প্রথম আলোতে খবরটা আসল মৌলভীবাজারে ৬০০ ফুট পতাকা উড়ানো হয়েছে। প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় এই খবরটা আসার পর অন্যরা বসে থাকবে বুঝি। দুদিনই পরই জানা গেল ৯০০ ফুট পতাকা উড়েছে, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে। 
আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম পত্রিকাওয়ালাদের বদান্যতায় যে এই খবরগুলো পড়ছি, কোন দিন না এটা পড়তে হয়: (ক্ষমা চাচ্ছি, বিডিআরের নতুন নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না)। 
আঞ্চলিক প্রতিনিধি: বিডিআর, বিএসএফের মধ্যে গোলাগুলি হইয়াছে কারণ একটি পতাকা বানানো হইয়াছে যাহা ষাট হাজার বর্গমাইলের কিন্তু ইহা বাংলাদেশ ছাড়াইয়া ভারতে চলিয়া গেলে বিএসএফ ঘোর আপত্তি জানাইয়াছিল। তাহাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ইহা কলিকাল নহে, এমনটা চলিতে পারে না। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মাঝে বৃষ্টির ন্যায় গোলাগুলি শুরু হইয়া যায়, এখনও জমিতে থাকা গুলির খোসার উপর দাঁড়াইয়া গুলি ছোঁড়া হইতেছে। ইহা লইয়া সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করিতেছে। আমাদের আঞ্চলিক প্রতিনিধি সেখানে অবস্থান করিতেছেন। 
(ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আঞ্চলিক প্রতিনিধি থাকেন কিন্তু মাখন-মাখন জায়গায় থাকেন আবার পত্রিকার বাঘা বাঘা স্যাররা।)

অনেকে বলবেন, পত্রিকায় এই খবর না আসলে আমরা জানতামই বা কেমন করে? তাও বটে! কিন্তু কাজটা যে ঠিক হচ্ছে না এই বিষয়ে পত্রিকার কোন ভাষ্য নাই। যেমন, এই খবরে জরিনা বেগমেরও একটা বক্তব্য ছাপা হতে পারত, বেডা গো মাথাত দুষ, ১০ হাত শাড়ি পিন্তাম পাই না আর হেরা...।
জানি-জানি, এরপর কি বলা হবে, এটা পত্রিকার দায়িত্ব না, সরাসরি খবরে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা ইত্যাদি। কেন রে বাপু, অতীতে কি আর এমনটা হয়নি, অন্যের মুখ দিয়ে নিজেদের কথা বলানো?
আহা, এটা কি আমরা বারবার পড়িনি, পেত্তম আলোর পেত্তম রিলিপ পাইয়া...। বা পেত্তম আলো মোরে ইলিপ দিয়া বাচাইল?


আবার অনেক নির্বোধ অতি চালাকি করতে গিয়ে অন্য দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে দিল। রোদ-বৃষ্টি-বিবর্ণতা, সকাল-সন্ধ্যা-রাত উপেক্ষা করে আমাদের পতাকা উড়তে থাকল। প্রশাসন থেকে কোথাও এই নিয়ে আপত্তি করতে দেখলাম না- খরচ হয়ে যাবে এই ভয়ে এঁরা আবার নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করেন না। কেবল উপরঅলার নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকেন!
এদের এটা কে বোঝাবে, এই পতাকাটা কেউ আমাদেরকে মুফতে-দানে দেয়নি। এটা অর্জন করার জন্য কাতারে কাতারে মানুষ মরেছে, রক্তের স্রোত বয়ে গেছে।

আমি অন্য একটা লেখায় লিখেছিলাম, 
"অন্য দেশের পতাকা নিয়ে আমাদের মাতামাতির শেষ নাই, নিজের দেশে ফুটবল খেলার মাঠের কোন খোঁজ নাই, ফুটবল ম্যাচের পাত্তা নাই! কয়েকজনকে আমি বললাম, আমি টাকার ব্যবস্থা দেখি, তোমরা কি পারবে একটা ফুটবর ম্যাচের আয়োজন করতে? সবাই আমাকে নিরাশ করলেন। তাদের বক্তব্য, আরে না, মারপিট হবে। শোনো কথা!"

হতাশার সঙ্গে আমাকে আবারও বলতে হয়, আমি এখনো লোক খুঁজে বেড়াচ্ছি যে এখানে একটা ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করে দিতে পারবেন...। 
সহায়ক লিংক: 
১. পতাকার প্রতিযোগীতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_8254.html 
২. চৌর্যবৃত্তিও একটি শিল্প: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_27.html 
৩. ধরা পড়ে গা বাঁচানোও একটি শিল্প: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_29.html
৪. কালের কন্ঠ: http://tinyurl.com/38qlfcf
৫. প্রথম আলো: http://tinyurl.com/3yadh4k  

পুলিশ জনগণের বন্ধু!

পুলিশ হেফাজতে তিন মৃত্যু, এই নিয়ে হাইকোর্ট অসাধারণ একটা কাজ করেছেন। হাইকোর্টকে সেলাম ঠুকি বারবার। কারণ কখনও কখনও এমনটা মনে হতো, এই গ্রহে বুঝি আমাদের আর কোন দাঁড়াবার জায়গা নাই। শেষ ভরসাস্থল হাইকোর্টেও যখন দেখি দাঁড়াবার জায়গা নাই [১] তখন আকাশপানে তাকিয়ে থাকি। নিজের প্রাণটাকে তখন বড়ো তুচ্ছ মনে হয়।
এমনিতে পুলিশের অজস্র অপরাধের প্রতি হাইকোর্ট রা কাড়েন না কিন্তু নিজেদের প্রতি পুলিশের তাচ্ছিল্য বুকে বড়ো বাজে! তাই বিচারকের প্রতি সম্মান না জানাবার কারণে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহুদুল হককে আদালত অবমাননার দায়ে ২ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ১ মাসের কারাদন্ডে দন্ডিত করেছিলেন।

এবার হাইকোর্ট যে অসাধারণ কাজটা করেছেন সেটা হচ্ছে, কেবল রুলই জারী করেননি, কিছু নির্দেশনা আলাদা করে উল্লেখ করেছেন। যেমন তদন্ত কমিটিতে পুলিশ থাকতে পারবে না, নিহত ব্যক্তিদের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাসপাতাল প্রথমেই হাইকোর্টে দাখিল করবে। মামলায় আদালতে আইনি সহায়তার জন্য এগারো আইজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অ্যামিকাস কিউরি হিসাবে কারা কারা থাকবেন তাঁদের নামগুলোও সুস্পষ্টরূপে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ঢাকার পুলিশ কমিশনারকে সতর্ক করা হয়েছে আগ বাড়িয়ে এমন কোন মন্তব্য না করতে যা তদন্তকে প্রভাবিত করে।
এবং এই মৃত্যু ঘটনার সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু পুলিশ অফিসারকে ১৯ জুলাই হাইকোর্টে হাজির হতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি হলফনামায় মৃত্যুর কারণ, প্রেক্ষাপট উল্লেখ করার জন্য। স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ ১১ জনকে ২১ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দেয়ার নির্দেশ।
আমার স্পষ্ট বক্তব্য, এই খুনগুলোর সঙ্গে পুলিশ জড়িত এটা প্রমাণিত হলে যত দ্রুত সম্ভব এই পুলিশদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা। সেটা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নাকি ফায়ারিং স্কোয়াডে সেটা নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নাই।

আমি মনে করি, হাইকোর্টই পারে আমাদেরকে এই সব পোশাকধারী গুন্ডাদের হাত থেকে রক্ষা করতে। এই দেশের একজন মানুষ খুন করলে তার ফাঁসি হয় কিন্তু পুলিশের কী হয়! কিসসু হয় না! পুলিশ খুনের মত অজস্র কান্ড ঘটায় কিন্তু এদের শাস্তি হচ্ছে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা। এই ক্লোজ করা হলে একজন পুলিশের শাস্তি কেমন করে হয় আমি জানি না! ওই স্যার কিছুদিন পুলিশ লাইনে বিশ্রাম নেয়ার পর মোটা অংকের টাকা লেনদেন করে আরেক জায়গায় পোস্টিং নেন। ওখানে গিয়ে আরও বিপুল উদ্যমে কুকর্ম করা শুরু করেন। কচু গাছ কাটতে কাটতে ডাকাত আর পুলিশ লাইনে ঘুরতে ঘুরতে আরও দুর্ধর্ষ পুলিশ অফিসার!

কর্মরত অবস্থায় অপরাধের কারণে কয় জন পুলিশম্যানের ফাঁসি হয়েছে? ইয়াসমিন হত্যা মামলা ব্যতীত আমার তো মনে পড়ছে না। 
পুলিশ দিনাজপুরের ইয়াসমিন নামের অভাগা মেয়েটিকে শারীরিক চরম নির্যাতন করে তাঁকে হত্যা করে। একটা ঠেলাভ্যানে করে পুলিশ নিদারুণ অবহেলায় রাস্তায় ফেলে রাখে। এই মামলাটিকে পুলিশ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। এদের এই অপচেষ্টায় পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকেই যোগ দিয়েছিলেন কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে এরা পার পেয়ে যান।
তারপরও এটা একটা বিশাল কাজ হয়েছিল, নয় বছর পর এই খুনের খুনিদের বিচার হয়েছিল। রংপুর কারাগারে এই পুলিশ নামের পশুদের ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে রাষ্ট্র শাস্তি দিয়েছিল। 
ওই পুলিশদের নাম ছিল মঈনুল হক এবং আবদুস সাত্তার। ইয়াসমিন হত্যা মামলায় এদেরই ফাঁসি হয়েছিল।
 
আমাদের দেশে ফলোআপের চল খুবই কম। হঠাৎ মিডিয়া ক্ষেপে না গেলে আমাদের জানার উপায় থাকে না। তৎকালিন চট্টগ্রামের উপকমিশনার (বন্দর) আলী আকবর খান যে অপরাধটা করেছিলেন এটা খুনের চেয়েও কম না। আমরা এটাও জানি না এই মহোদয়ের কি শাস্তি হয়েছিল? নাকি ইনি উপ থেকে পুরোস্তুর কমিশনার হয়ে বসে আছেন। এই দেশে সবই সম্ভব কেবল উপরঅলার সঙ্গে ভাল যোগাযোগ থাকলেই যথেষ্ট! এই উপরঅলা যে কে এটা বলা মুশকিল। প্রায়শ আমার মনে হয়, এদের আটকাবার জন্য এই দেশে কেউ নাই। তখনই হাইকোর্টের ভূমিকার বড়ো প্রয়োজন হয়ে দেখা দেয়।

আমি একটা লেখায় লিখেছিলাম সাংবাদিকদের পুলিশে ঢুকিয়ে দেয়া হোক এবং পুলিশদের কবিতা লেখার জন্য রেখে দেয়া হোক [২]। যে পুলিশ মহোদয়গণ আমাদের সোনার ছেলে আসিফদের হাত ভেঙে দিয়েছিলেন এদেরই বা কি শাস্তি হয়েছে [৩]? এই অপরাধ কি খুনের চেয়ে কম? আমাদের দেশে পুলিশ কিছু কাজ-কারবার বড়োই বিচিত্র, কেউ অভিযোগ না করলে [৪] এরা নাকি নড়াচড়া করতে পারেন না! অশ্লীলতার সংজ্ঞা [৫] কি এটা আমি ভালো জানি না কিন্তু যখন দেখি পুলিশ বলছে 'আমরা জনগণের বন্ধু' তখন বাক্যটা আমার কাছে বড়ো অশ্লীল মনে হয়।

*ঋণ: ভোরের কাগজ, এএফপি

সহায়ক লিংক:
১. সাধুবাদ-মুর্দাবাদ: http://www.ali-mahmed.com/2008/12/blog-post_08.html
২. পুলিশ লিখবে কবিতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_09.html
৩. এটা কি খুব বড়ো চাওয়া মি.প্রেসিডেন্ট: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_2646.html
৪. বিষবৃক্ষ গাছে জয়তুন ফল ধরে না: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_6667.html
৫. অশ্লীলতার সংজ্ঞা: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_22.html

Monday, July 5, 2010

বৈদেশ পর্ব: তেরো

আজ আমি জার্মানি ছেড়ে যাচ্ছি। আবারও আরাফাত-মায়াবতী দম্পতির হ্যাপা। আমাকে ডুজলডর্ফ এয়ারপোর্টে রেখে আসতে হবে। আমার মনে হয় এই দম্পতি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। এই দুই দিনে আমার কারণে এঁদের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। মানুষ কাঁহাতক সহ্য করতে পারে!

লাগেজ গোছানো আমার জন্য বিরাট এক ঝামেলার কাজ। কোথাও গেলে, সচরাচর আমি দু-একদিন আগে থেকেই গোছানো শুরু করি, ক্রমশ এর পরিধি বাড়তে থাকে। ছোটখাটো একটা ইস্ত্রিও আমি সর্বদা বহন করি কিন্তু এটা আমার কখনো কাজে লেগেছে বলে মনে পড়ে না! ব্যাগ যখন উপচে পড়ে তখন ব্যাগ নিয়ে টানাটানি করতে গিয়ে জান বেরিয়ে যায়। পরে একটা সহজ বুদ্ধি বের করলাম। ব্যাগের চেইন লাগাবার পূর্বে কিছুক্ষণ এটার উপর বসে থাকা। অল কোয়ায়েট অন...সব ঠান্ডা, এরপর চেইন বাবাজীর না লেগে উপায় থাকে না!

এখন এখানে এতো সময় কোথায়? কিছুই কেনা হয়নি কিন্তু আরাফাত দম্পতি আমার বাচ্চাদের জন্য হাবিজাবি কি কি যেন দিয়ে দিয়েছে। তো, ব্যাগ উপচে পড়ার ঝামেলাটা যাবে কোথায়? আমি আরাফাতকে বলি, এটা তো মুশকিল হয়ে গেল দেখছি! এবার তো বসে কাজ হবে না, এটার উপর দাঁড়িয়ে গেলে কেমন হয়? 
এঁরা আমাকে সরিয়ে নিজেরাই ব্যাগ গোছাতে লেগে যান। এঁরা কি কি করেন আমি জানি না দেখি ব্যাগ দিব্যি সুবোধ বালক!
আমি যেতে যেতে আবারও যতটুকু পারি দেশটাকে দেখার চেষ্টা করি, এখানকার লোকজনদের বোঝার চেষ্টা করি। আমার নতুন উপাধি 'ছিদ্রান্বেষি' চোখ দিয়ে অসঙ্গতি খুঁজে বেড়াই। বলার মত, লেখার মত তেমন কোন অসঙ্গতি আমার চোখে পড়ে না। ব্যাড, টু ব্যাড- হিটলারের দেশে এমনটা যে আমার কাম্য না। কেউ কেউ বলতে পারেন, মিয়া, তুমি মাত্র দুই দিনে কী ছাতাফাতা দেখলা? এদের সঙ্গে কুতর্কে আমি যাব না। যে লেখাটা আমি এক ঘন্টায় লিখি সেই লেখাটা বছরখানেক লাগিয়ে লিখলে চমৎকার একটা জিনিস দাঁড়াবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। 

এদের যে বিষয়টা আমাকে খুব টেনেছে সেটা হচ্ছে, 'ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের' [১] [২] জন্যে এদের ভাবনা, ভালবাসা। বাস-ট্রামে দেখেছি এঁদের বসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা, পারতপক্ষে এখানে কেউ বসে না। এঁদের সুবিধার্থে এমন কি বিশেষ ব্যবস্থায় বাসের কিছু অংশ কাতও করা যায়।

কিছু সীট দেখলাম ডাবল। আরাফাত আমাকে বলছিলেন, এটা খুব মোটা কোন মানুষ যদি উঠেন তাঁর জন্যে। রাস্তা পারাপারেরর সময় কেবল যে বাতির ব্যবহারই শেষ এমন না, নির্দিষ্ট লয়ে শব্দও হতে থাকে। আর এসব হবে না কেন? এই দেশের লোকজন তাঁর বেতনের ৪৫ ভাগ ট্যাক্স খাতে জমা দেয়।

অহেতুক দবদবা, অর্থ অপচয়ের নমুনা আমার চোখে পড়েনি। যেটা টেনেছে পুরনো স্থাপনার ছড়াছড়ি। কী চমৎকার করেই না এরা যত্ন করে ধরে রেখেছে এদের শেকড়কে। প্রত্যেকটা জায়গায় একটা ছন্দ আছে, সব নির্দিষ্ট ছন্দে চলছে। অতিশয়োক্তি নাই।
আমাদের যেমন বিশেষ বিশেষ দিনে, সময়ে উচ্ছ্বাসের চোটে প্রাণ বেরিয়ে যায় এমনটা না। ওহ, মনে পড়ল, আমার গায়ে ভাষাসংক্রান্ত ফতুয়া দেখে কেউ একজন বলছিলেন, আরে, আপনি দেখি শোকের মাস, ফেব্রুয়ারির জিনিস গায়ে দিয়ে বসে আছেন!
আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমার অল্প জ্ঞানে আমি যেটা বুঝি, ভাষা হচ্ছে হৃদপিন্ড, সর্বদা ধুকধুক করে সচল থাকবে, বিশেষ মাস কী আবার! আর শোকের মাস কি, এটা তো অহংকারের মাস- এই দেশের সেরা সন্তানরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন কেমন করে ভাষার জন্য, দেশের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে অহংকার করার সুযোগ দিতে হয়।

তবে এটা আমি এখন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে, যে কোন ভাবেই হোক, যে কোন কারণেই হোক, এই অনুষ্ঠানে না আসাটা বুদ্ধিমানের কাজ হতো না। অন্তত বাংলা ভাষার অপকার বৈ উপকার হতো না। 
ডয়চে ভেলে ৩০টা ভাষা নিয়ে কাজ করে, বিশেষ একটা ভাষা নিয়ে আদেখলা দেখাবার সময় জার্মানদের নাই। বাংলা ভাষাটা ভালো পারলে এরা বাংলা বিভাগটাও নিজেদের লোক দিয়েই চালাতো। এরা যেটা ভাল মনে করে সেটাই করে কারও ধার ধারে না।
আমাদের অনেকের ধারণা, বাংলা বিভাগ বুঝি এখানকার হর্তকর্তা, বাংলা বিভাগ বললেই ডয়চে ভেলে কাত হয়ে যায়। ভুল, এমনটা না। ছোট-ছোট বিষয়েও আমি দেখেছি বাংলা বিভাগের লোকজনকে ছুটাছুটি করতে। এর ফল যে খুব একটা ফলপ্রসূ হয়েছে এমনটা আমার মনে হয়নি!

ডুজলডর্ফ এয়ারপোর্টে ঢুকে যাওয়ার আগে আমার কেবলি মনে হচ্ছিল, এখান নিয়ে টুকরো-টুকরো সুখ-স্মৃতিগুলো নিয়ে যাচ্ছি। এই স্মৃতিগুলো হয়তো আমি ভুলে যাব কিন্তু আমার মস্তিষ্ক ভুলবে না, ঠিকই মনে রাখবে। আমি চাই, বিভিন্ন সময়ে আমার এই সব জমানো সুখ-স্মৃতিগুলোর ক্রমশ ভারী হোক। আমি এও চাই, আমার মৃত্যুর সময় আমার মস্তিষ্ক সচল থাকুক, তখন এই সুখ-স্মৃতিগুলো একেক করে ভিড় করতে থাকুক। ওরা ওদের খেলা খেলতে থাকুক, আমি নিশ্চিন্তে অন্য ভুবনে যাত্র করি।

এয়ারক্রাফটে আমার পাশে আবারও একজন জার্মান। এর বয়স অনেক কম। ছটফটে। ফ্রেডরিক নামের এই ছেলেটা প্রথমেই আমাকে বলে নেয়, আমার ইংরাজি কিন্তু খুব খারাপ। আমি হেসে বলি, আমার ইংরাজি তোমার চেয়েও খারাপ। ফ্রেডরিকের সঙ্গে দুবাই পৌঁছার আগ পর্যন্ত বকবক চলতে থাকে। এ যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ঘুরতে। আমি তাকে বলি, ধুর মিয়া, অস্ট্রেলিয়া কেন, বাংলাদেশে আসো। পৃথিবীর দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত এখানে, এখানে সুন্দরবন। তুমি আসলে আমি তোমার গাইড হবো। 
ফ্রেডরিক চকচকে চোখে বলে, সত্যি, তাহলে নেক্সট ভেকেশনে তোমার দেশে আসব। ফ্রেডরিক হয়তো আসবে, হয়তো আসবে না; সেটা মূখ্য না।
এবার আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত কারণ দুবাই এয়ারপোর্টে আমাকে থাকতে হবে মাত্র ২ ঘন্টা। চেক-ইন, চেক-আউট করতেই এই সময়টা চলে যাবে। এই নরকে [৩] আমার খুব বেশি সময় থাকার আগ্রহ নাই!

ঢাকায় আমি চলে আসি ২৪ জুন, সকাল নটায়, অনেকটা চোরের মত। ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। যেহেতু আমি একা তাই ভয়ে ভয়ে আছি, স্কুটারঅলা না আমাকে ফেলে দিয়ে আমার বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে উধাও হয়। আমি চোখ খুলে রাখতে পারছি না তবুও একটা বুদ্ধি বের করলাম, ব্যাটাকে বুঝতে দেয়া চলবে না যে আমি একটু পর পর ঘুমিয়ে যাচ্ছি। ঘুমটা একটু কাটলেই রাশভারী গলায় বলি, আহ, একটু দেইখ্যা চালাও, এক্সিডেন্ট করবা ।  
ট্রেন ৩টায়। জার্মানি যাওয়ার পূর্বেই আমি ট্রেনের টিকেট কেটে নিয়ে গিয়েছিলাম।  কাজটা বুদ্ধিমানের কারণ ঝটিকা সফরের পর ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে যেত।

আমার জন্য অপেক্ষায় আছে বুড়া বাড়িটা [৪]। অতি দ্রুত এর কাছে আমাকে ফিরতে হবে। বুড়া আমার অপেক্ষায় আছে। সবাই আমাকে ফেলে দিলেও এ আমাকে ফেলে দেবে না...।



বৈদেশ পর্ব, বারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_05.html

সহায়ক লিংক: 
১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post.html
২. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের জন্য আমরা কি প্রস্তুত: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_03.html
৩. বৈদেশ পর্ব, সাত: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_3252.html 
৪. বুড়া বাড়িটা: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_24.html         

বৈদেশ পর্ব: বারো

পুরস্কার প্রদানের মূল পর্ব শেষ হলে আমরা কয়েকজন চলে আসি আরাফাত-মায়াবতীদের বাসায়। নৈশভোজের দাওয়াত। বাংলা বিভাগের প্রধান ফারুক ভাইকে ডাক্তারের নিয়ম মেনে চলতে হয় তারপরও এই মানুষটা চলে এসেছেন, আগামীকাল আমি চলে যাচ্ছি বলে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা। 

সঞ্জীব বর্মন দাউদ ভাইকে নিয়ে পড়েন। 'আচ্ছা, দাউদ ভাই, আপনি রাত দুইটার দিকেই সব সময় মেইল করেন কেন'?
আমি খানিকটা শুনেছিলাম দাউদ ভাইয়ের কম্পিউটারের সঙ্গে তেমন সখ্যতা নাই। তিনি এখনও তাঁর লেখা লেখেন কাগজ-কলমে।

দাউদ ভাই অবাক হন, 'তুমি এটা জানলে কেমন করে, মানে সময়টা'?
সঞ্জীব বর্মন হেলাফেলা ভঙ্গিতে বলেন, 'এটা জানব না মানে? মেইল পাঠালে ওখানে সময় থাকে না, সব থাকে'?
দাউদ ভাই আরও অবাক, 'বলো কী'! 
সঞ্জীব বর্মনের মুখে ফিচেল হাসি, 'আরে, কেবল মেইল পাঠাবার সময়ই না, ওই সময় মানুষটা কি-কি করছে তাও দেখা যায়। দাউদ ভাই চিন্তা করে দেখেন, সময়টা কিন্তু বিপদজনক, রাত দু'টো। তখন আপনি কি-কি করেন, না করেন সব কিন্তু দেখা যায়'।
এবার তিনি বলটা পাঠিয়ে দেন আমার দিকে, 'এই যে শুভকেই জিজ্ঞেস করেন না। এই শুভ, আপনি স্কাইপি-তে তিন ঘন্টা আটকে ছিলেন না'?
আমি হাসি গোপন করে বলি, 'না, ঠিক তিন ঘন্টা না, আড়াই ঘন্টা হবে'।
দাউদ ভাই চিন্তিত, 'শুভ, তাই নাকি'!
আমি মুখ যথাসম্ভব গম্ভীর করে বলি, 'না, দাউদ ভাই, ঠিক আড়াই ঘন্টাও না, দুই ঘন্টা বিশ-পচিঁশ মিনিট হবে'।

দাউদ ভাই মহা চিন্তিত। তিনি তাঁর পছন্দের কোন একজনকে (মানুষটার পরিচয়ের বিশদে যাচ্ছি না) ফোন করেন। ফোনে কথা বলার সময় আমরা দাউদ ভাইয়ের এপাশের কথা বলা শুনতে পাই, 'না-না, আমি তো কেবল মেইল ব্যবহার করি। স্কাইপি ব্যবহার করি না'। 
ফোনে কথা বলা শেষ হলে তিনি পরম আনন্দে বলেন, 'তোমরা আমাকে বোকা বানিয়েছে। ধ্যাত, খামোখা 'ডুমকফ' শুনতে হলো'।
আমি জানতে চাই, 'দাউদ ভাই, 'ডুমকফ' কি'?
তিনি হা হা করে হাসতে হাসতে বলেন, 'ডুমকফ' মানে হচ্ছে নির্বোধ।
আমি অবাক হয়ে দাউদ হায়দার নামের শিশুটিকে দেখি! হয়তো তিনি আমাদের এই নির্দোষ খেলায় উল্টো আমাদেরকেই বোকা বানিয়েছেন। সবটাই তাঁর ভান কিন্তু তাতে কী আসে যায়!

সুপ্রিয়দা ফোন করেন। কাজে আটকে পড়ার কারণে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। দীর্ঘ সময় ফোনে সদাশয় কিছু কথা বলেন।
ডিনার শেষ হলে একে একে সবাই, জানা, সঞ্জীব বর্মন, ফারুক ভাই বিদায় নেন। ফারুক ভাই বুকে জড়িয়ে বলেন, 'শুভ, ভাল থেকো'। 
আমার মনটা অন্য রকম হয়। আমি জার্মানি থেকে কালই চলে যাব কিন্তু এই মানুষগুলোর আন্তরিকতা বিস্মৃত হবো না। আমি ভুলে গেলেও আমার মস্তিষ্ক ভুলবে না।

থেকে যাই আমি এবং দাউদ ভাই। বেচারা আরাফাত-মায়াবতীদের মোমের আলোয় স্নিগ্ধ ঘরটা সিগারেটের ধোঁয়ায় অন্ধকার করতে ইচ্ছা করে না। বাইরে হিম-হিম ঠান্ডা। আমরা বাইরের ঝুল-বারান্দায় সিগারেট ধরাই। মানুষটার সঙ্গে কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে কথা হয়। 
মানুষটার সঙ্গে সাবধানে কথা বলতে হবে এটা আমি ভুলে যাই। আমি আমার বই থেকে 'মুখবন্ধ' শব্দটা ভুল উচ্চারণ করায় বিকেলেই তাঁর তোপের মুখে পড়েছিলাম। আরে, কী মুশকিল! আমি কি লেখক নাকি? যে মানুষটা লোককে বলে 'লুক', পেয়ারাকে বলে 'গয়াম', এই মানুষটা ভুল উচ্চারণ করবে নাতো কে করবে? অবশ্য আমি এখনও অধ্যাপক কাম প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে [১] ছাড়িয়ে যেতে পারিনি।

দাউদ হায়দারকে নিয়ে আমি কিছু লেখা লিখেছিলাম [২] [৩] [৪]। এই মানুষটাকে এবং আমাকে জড়িয়ে কিছু নাটকও হয়েছিল। প্রথম আলোর মত মিডিয়া টাইকুনও [৫] সেই নাটকের নাট্যকার ছিল। প্রথম আলো গং আমাকে খাটো করতে গিয়ে দাউদ হায়দারকে কেবল খাটোই করেনি, তাঁর প্রতি ভয়াবহ অন্যায়ও করেছিল!
আমি ববস প্রতিযোগীতা জেতার জন্য দাউদ হায়দারকে তৈল মর্দন করেছি ইত্যাদি। প্রথম আলোর অন-লাইন পত্রিকায় [৬]। এরা নিজেরাই এমন মন্তব্য করেছে এটা বোঝার জন্য রকেট বিজ্ঞানী হতে হয় না। মিডিয়ার লোকজন ব্যতীত একজন সাধারণ পাঠকের পক্ষে এটা জানাটা অবাক হওয়ার মতই ঘটনা যে দাউদ হায়দার ডয়চে ভেলের সঙ্গে জড়িত। এবং দু-জন পাঠকেরই মন্তব্যের টোনও একই রকম। একজন তবলা ধরেছেন, অন্যজন ধরেছেন গান। 
এখানে অবিশ্বাস্য যেটা, সেটা হচ্ছে, এটা কিন্তু প্রথম আলোর ব্লগ ছিল না, ছিল প্রথম আলো পত্রিকা। এখানে ইচ্ছা করলেই কোন মন্তব্য করা যায় না। মন্তব্য যাচাই-বাছাই করেই ছাপানো হয়। না-হলে আমি যদি মন্তব্য করি যে, আসলে প্রথম আলোর সম্পাদক মোসাদের মি. ভক্স, এটা কি প্রথম আলো ছাপাবে?

অথচ দাউদ হায়দারকে নিয়ে আমি প্রথম লেখাটা লিখি ২১ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০০৯-এ। তখন ববসের প্রতিযোগীতায় বাংলা ভাষা যোগ হবে কি না এটাই সম্ভবত ঠিক হয়নি। আর আমি যে তখন থেকেই লবিং করা শুরু করেছি এটা আমার নিজেরও জানা ছিল না! 
সত্যি বলতে কি আমার এটাও জানা ছিল না দাউদ হায়দার ডয়চে ভেলের সঙ্গে জড়িত। এটা আমি জেনেছি এই সেদিন। তারপরও প্রথম আলো যে নিম্ন রূচির আচরণ করল এটা দেখে কমিউনিটি ব্লগের ঈর্ষাম্বিত চিকিৎসার বাইরের লোকজনকে দোষ দেই কোন মুখে!
পূর্বে দাউদ হায়দারকে নিয়ে আমি যে-সমস্ত লেখা লিখেছিলাম ওই সব লেখাগুলো তো তাঁর জন্য ছিল না, ছিল আমার জন্যে। তাঁর জায়গায় আমি নিজেকে কল্পনা করলে নিজেকে পাগল-পাগল লাগত।

তো, দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে রাজ্যের বিষয় নিয়ে আলাপ হতে থাকে। আমি তাঁর জন্য কিছু উপহারের সঙ্গে দেশের খানিকটা মাটি নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম এটা বললে তিনি বললেন, আরে, না-না, খানিকটা মাটি আছে তো আমার কাছে। অনেক পূর্বেই তিনি নাকি তাঁর জন্য দেশের একটু মাটি নিয়ে একজনকে আসার জন্য বলেছিলেন। 
যাক, আমার মনের বিষণ্নতা খানিকটা কেটে গেল। আরাফাতের একটা ছোট্ট অনুরোধ ছিল আমি যেন আসার সময় দাউদ ভাইয়ের জন্য খানিকটা দেশের মাটি নিয়ে আসি। আমি আমার বাসা থেকে বেরুবার পূর্বে তাঁর জন্য খানিকটা মাটি নিয়েও ছিলাম। আমি মেইলে এই সন্দেহও প্রকাশ করেছিলাম এটা আনতে দেবে কি না। সোয়াইন ফ্লুর পর থেকে এই সব নিয়ে খুব কড়াকড়ি। 
পরে আরাফাতই নিষেধ করেছিলেন: শুভ, অহেতুক এরা আপনাকে ঝামেলায় ফেলে দেবে। বাধ্য হয়ে ঢাকায় সেই মাটি আমাকে ফেলে দিতে হয়েছিল। দেশের মাটি প্রসঙ্গে আমার একটা লেখা ছিল, মাটি বিক্রি করব [৭]। পরে ঠিক করলাম, বাতাস বিক্রি করব [৮]। দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে এই সব হাবিজাবি বিষয় নিয়ে কথা চলতে থাকে। মানুষটা হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন, আরে, এইটা আবার কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম!

রাত গড়ায়। আমার আবার সকালে ফ্লাইট ধরার জন্য ছুটতে হবে। দাউদ ভাই বলেন, 'শুভ, তুমি শুয়ে পড়ো। তোমাকে তো আবার সকাল সকাল উঠতে হবে। আমার কিছু লেখালেখির কাজ শেষ করতে হবে'।
আমি মনে করে দাউদ ভাইয়ের আমাকে দেয়া তাঁর বই, 'নদীর উৎস ছিল এখানে' গুছিয়ে রাখি। সকালে তাড়াহুড়োয় না-আবার বইটা ফেলে আসি। তাঁর কবিতার এই অংশ পড়ে দম আটকে আসে:
"দোহারপাড়ার ভূগোল বলতে কিছু নেই আর-
বাঁশবাগান, পঞ্চবটীর মাঠ, দিগন্তহীন পদ্মার
গান, গাজনের উৎসব, এখন স্মৃতির অস্পষ্ট কোলাজ...।"
আমি মনে মনে বলি, কবি, নদীর উৎস ছিল এখানে। কোন নদীর, কবি? তোমাকে তো আমরা কোন নদী দেইনি! কোন দোহারপাড়া? তোমার জন্য আমরা তো কোন দোহারপাড়া রাখিনি!
 
এ বড়ো বিচিত্র দেশ! এখানে ধর্মের দোহাই দিয়ে একজন মানুষকে তাঁর মার কাছে, তাঁর দেশমার কাছে ফিরতে দেয়া হয় না। আমাদের দেশের যেসব মানুষ ধর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, এঁরা অবলীলায় কতোসব তুচ্ছ বিষয়ে ফতোয়া দেন কিন্তু দুজন নারী বছরের-পর-বছর ধরে দেশ শাসন করছেন এই বিষয়ে ফতোয়া দেয়া থেকে বিরত থাকেন। কেন যেন তখন এদের ফতোয়া ফুরিয়ে যায়!
পারতপক্ষে আমি কারও বিশ্বাস, ধর্ম নিয়ে কুতর্কে যেতে চাই না, অসম্মান করতে চাই না। কিন্তু আমরা কেন এটাও মনে রাখি না, শত-শত বছর ধরে একেকটা ধর্ম সুতীব্র বিশ্বাসের উপর টিকে আছে। কারও ধর্ম তো কাঁচের বাসন না যে হাত থেকে পড়ল আর ভেঙে চাকনাচুর হয়ে গেল! কারও নিজ ধর্মের প্রতি এমন অহেতুক ভয় থাকলে সেটা অবশ্যই দুর্বল একটা ধর্ম। সেই ধর্ম নিয়ে অযথা বড়াই করার কিছু নেই।

দাউদ ভাই জেগে থাকেন। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। এক ঘুমে সকাল। ঘুম ভাঙে আরাফাতের কোমল ডাকে, 'শুভ উঠেন'। 
আমার উঠতে ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু হোটেলে আমার লাগেজ পড়ে আছে এলোমেলো। গুছিয়ে ছুটতে হবে এয়ারপোর্টে। তীব্র অনিচ্ছায় উঠতে হয়। দাউদ ভাইকে পাই গভীর ঘুমে, মানুষটা রাতে কখন ঘুমিয়েছেন আমি জানি না। মানুষটা ঘুমের মধ্যে বিচিত্র শব্দ করছেন, শব্দগুলো ভারী বেদনার- কেমন একটা হু-হু-করা শব্দ!। কানে আটকে আছে এখনো আমার। আমি জানি না, ঘুমের মধ্যে দাউদ ভাই যে অপার্থিব শব্দ করেন এটা কী তাঁর জানা আছে! কেন করেন? তাঁর কি ফেলে আসা জন্মস্থান 'দোহারপাড়ার' কথা মনে পড়ে যায়? আমি জানি না। 
 
টেবিলে তাঁর কবিতার বই, 'কেউ প্রতীক্ষায় নেই', পাশেই তাঁর সদ্য সমাপ্ত লেখার খসড়া। মানুষটার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য তাঁর ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছা করে না। ছোট্ট একটা চিরকূট তাঁর বইয়ে রেখে আসি, "দাউদ ভাই, গেলাম। আপনার সঙ্গে দেশে দেখা হবে, সহসাই"। 
 
আমার মন খারাপ হয়ে যায়, কেন লিখে এলাম এই কথাটা? দেশে দেখা হবে, সহসাই। কবির সঙ্গে কী চাতুরি করলাম? না, আমার লেখালেখির শপথ, এতে এক ফোঁটা ভান ছিল না, ছিল না মিথ্যাচারের ছিটেফোঁটাও। ছিল কেবল অকল্পনীয় ভাবনা। এই গ্রহে কতশত অবাস্তব ঘটনা ঘটে আর একটা ঘটলে কী প্রলয় নেমে আসবে....!

*দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার কিছু ছবি আছে কিন্তু তাঁর নিরাপত্তাজনিত কারণে জার্মান সরকারের আপত্তি থাকায় ছবিগুলো এখানে দেয়া সম্ভব হলো না।
*বৈদেশ পর্ব, এগারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_03.html 

সহায়ক লিংক:
১. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8885.html 
২. দাউদ হায়দার, শুভ জন্মদিন বলি কোন মুখে: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_21.html
৩. দাউদ হায়দার, তোমার কাছে খোলা চিঠি: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_7633.html
 ৪. দাউদ হায়দার, তোমাকে, আবারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_20.html 
৫. পরম করুণাময়, এদের ক্ষমা করো: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_22.html 
৬. প্রথম আলোর চালবাজি: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-04-20/news/57539 
৭.মাটি বিক্রি করব: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_15.html 
৮. বাতাস বেচব: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post.html 

Saturday, July 3, 2010

বৈদেশ পর্ব: এগারো

পুরস্কার দেয়ার অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। অনুষ্ঠানের কারণে এই সময়টায় ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগে অলিখিত তালা। কাজ গুছিয়ে, কাজ জমিয়ে সবাই চলে এসেছেন এখানে। বাংলা বিভাগের প্রধান আবদুল্লাহ আল ফারূক, হক, সঞ্জীব বর্মন, সাগর সরওয়ারসহ প্রায় সবাই।
সুদূর বার্লিন থেকে চলে এসেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ মান্নান, কবি দাউদ হায়দার। এসেছেন সাংবাদিক নাজমুন নেসা, সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা। আরও হয়তো অনেকে আছেন, এখন আমার নাম মনে পড়ছে না বলে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
যে মানুষটির অনেক গল্প আজকের এই আয়োজনের পেছনে জড়িয়ে আছে, সেই দেবারতি গুহ নাই। ভাইয়ের বিয়েতে কলকাতা গেছেন। মিস করছিলাম তাঁকে।
কি বলা হবে এটা আমরা আলোচনা করে ঠিক করি। সময় মাত্র এক মিনিট, এরিমধ্যে গুছিয়ে যতটা বলা যায়। লিখে দেন দাউদ ভাই, কম্পোজ করে দেন সঞ্জীব বর্মন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

সবাই হাসিখুশি। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে আজ এখানে ঈদ-পূজা। কেবল আমি সিটিয়ে আছি, ভয়ে কাঠ। আমার বলার পালা যখন আসবে তখন বলতে গিয়ে কোনো একটা ভজকট করে ফেলব না তো? ঝামেলা একটা হয়ে গেলে আমার আর কী হবে, কচু? কিন্তু আমার কারণে যে দু-দেশের মাথা নীচু হবে! তখন এই লজ্জা কোথায় রাখব, কার কাছে বলব? কোথায় গিয়ে ডুবে মরব?
খানিকটা সাহস পাই, যথারীতি আরাফাত আমাকে আগলে রাখেন। নিয়ম ভেঙে আমার পাশে এসে বসেন। তিনি ননস্টপ আমার কানের পাশে অনবরত বকে যান, 'শুভ, কুল। কুল। মাথা ঠান্ডা রাখেন। একদম ঠান্ডা। দেখবেন সব ঠিকঠাক হবে, কোনো সমস্যা হবে না'।

তিনি কাগজ ঘেঁটে বের করেন আমার বলার পালা আসবে অনেকের পর অতএব খানিকটা সময় পাওয়া যাবে। আরাফাত নরোম করে বলেন, 'আরে, দেখেন না অন্যরা কি করে...'।
এরপর একেক দেশের একেকজন আসেন। এঁদের সামান্য কোন খুঁত পেলেই আরাফাত চাপা উল্লাসে বলেন, 'দেখলেন-দেখলেন, বলেছিলাম না'। 
পারলে আরাফাত নিজের হাতে কিল মেরে বসেন। এখানে বসেই আমি বলার মূল অংশের সঙ্গে জার্মানি ভাষায় 'ডাংকেসুন' যার বাংলা অর্থ ধন্যবাদ যোগ করি। উপস্থাপিকার বলা বাংলায় 'দোননোবাদ' এর মতই হয়তো-বা আমার বলা ভুলভাল 'ডাংকেসুন' শোনায় কিন্তু তাতে কী! 

আমার পালা যখন আসে। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আমি হোঁচট খাই। দোষটা আমার না, মেঝের অদেখা অপ্রয়োজনীয় বাড়তি উচ্চতার কারণে এই সমস্যাটা হয়েছে। কিন্তু আমি এতোটাই বিব্রত হয়ে পড়ি যে আমার মাথায় সব কেমন জট পাকিয়ে যায়। 
এখনো আমার কানে ভাসে আরাফাতের কথা, 'শুভ, এইটা কোন ব্যাপার না। বাংলা ভাষাও অনেকবার হোঁচট খেয়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে'।

আমার ঘোরলাগা এক অনুভূতি। শত-শত বিভিন্ন ভাষার মানুষদের সামনে এখানে বারবার উঠে আসছিল বাংলাদেশ, বাংলা ভাষার কথা। তখন আমার কেবল মনে হচ্ছিল, আজ আমার মৃত্যু হলেও সেটা হবে এক গভীর প্রশান্তির ঘুম। আমার মত অতি সামান্য একজন মানুষ বাংলা ভাষার জন্যে একটা ন্যানো ফোঁটা যোগ করতে পারলাম এরচেয়ে বড়ো পাওনা জীবনে আর কী হতে পারে? 

আমার চোখে জল, আমি সব কেমন ঝাপসা দেখছি। আপ্রাণ চেষ্টা করছি নিজেকে সামলাতে। আমি দুর্বলচিত্তের একজন মানুষ, কাজটা আমার জন্যে বড়ো কঠিন।
এটা কেবল আমার অর্জন ছিল না, ছিল সবার। কিন্তু আমি জানি না অনেকে কেন এটাকে কেবল আমার অর্জন হিসাবেই দেখেন! হা ঈশ্বর, কেন দেখেন? প্রয়োজনে মধ্য-রাস্তায় আমাকে চাবুক মারেন কিন্তু ভাষাটাকে সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেন। এটা একটা টিম-ওয়র্ক, এখানে অনেক মানুষের মেধা-শ্রম-আবেগ-চেষ্টা-ভালাবাসা-শুভাশিস-রাতজাগা ভোর-অবহেলা-অবজ্ঞা-অপমান-অদম্য রাগ-চোখের জল মিশে আছে।
এখানে আমি কেউ না-আমি কেউ না...কেউ না...।



 
(সবার মাঝখানে জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ মান্নান, সস্ত্রীক। কেবল একজন রাষ্ট্রদূত হিসাবে না, চমৎকার একজন মানুষ হিসাবে [১] তাঁর প্রতি আছে আমার মুগ্ধতা)  

*বৈদেশ পর্ব, দশ: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_8079.html
**ছবি ঋণ: সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা 
***পুরস্কার গ্রহন নিয়ে ডয়চে ভেলের রেডিও অনুষ্ঠান: http://www.dw-world.de/popups/popup_single_mediaplayer/0,,5721397_type_audio_struct_11977_contentId_5721306,00.html

 সহায়ক লিংক: 
১. মাসুদ মান্নান: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_01.html

Friday, July 2, 2010

বৈদেশ পর্ব: দশ

সকালে উঠে যে একটু আয়েশ করে চায়ে চুমুক দেব সে যো নেই, সময়ের পাগলা ঘোড়া ঘাড়ের উপর বসে আছে। এখুনি ছুটতে হবে আমাকে হোটেলে, ঝাড়া দুই দিন হয়ে গেছে আমার গোসল করা হয়নি। তাছাড়া জরুরি যেটা, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে আমার খানিকটা শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল। শ্বাসকষ্টের ওষুধ-টষুধ সব হোটেলে, গাঁটরি-বোঁচকায়।

আরাফাতেরও অফিসের তাড়া। হক নামের সদাশয় মানুষটা আমাকে হোটেলে ড্রপ করবেন। পরে হোটেল থেকে ডয়চে ভেলের অফিসে আমার যাওয়ার জন্য কেউ একজন আবারও কষ্ট করবেন। আমার ভারী লজ্জা করছিল, আমার মত একজন যাচ্ছেতাই মানুষের জন্য এঁদের কী ঝামেলাটাই না যাচ্ছে! কী করব, এতে আমার হাত কি? কারও শরীরের কোন অংশ থাকে না, আমারও একটা অংশ নাই। আমার ব্রেন নাই। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন, তাহলে তোমার লেখাগুলো কে লিখে দেয়? কেন কলম, হালের কী-বোর্ড', আমি কি আর লিখি, ছাই!

অনেকের কাছে এটা বড়ো হাস্যরসের যোগান দেয় কিন্তু আমার প্রাণ যায়। জার্মানি আসার পূর্বে দেশে আমার কিছু কেনাকাটা ছিল। ওখানেও সময়ের স্বল্পতা। আমার এক জুনিয়র বন্ধু জাকির। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল না কিন্তু সিনেমার মতই রাস্তায় দেখা হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি একটা স্কুটার খুঁজছিলাম, ঢাকার স্কুটার যারা চালান তাঁরা একেকজন লাটসাহেব। জাকিরের সঙ্গে গাড়ি থাকায় অসম্ভব সুবিধে হলো। সে বলল, আলী ভাই, আজিজ মার্কেটে গেলে আপনাকে আমি নিয়ে যাই?
যাই মানে, বলে কী ব্যাটা! আমি তাকে বললাম, আমার কিছু জিনিস কিনতে হবে, তুমি সাথে থাকলে আমার সুবিধা হয়। 
বেচারা মুখ শুকিয়ে বলল, আলী ভাই, আমার বউকে অফিস থেকে নিয়ে আসতে হবে। আপনি আমাকে ১ ঘন্টা সময় দেন, এই যাব আর আসব। এরিমধ্যে আপনি যা কেনার কিনে ফেলেন। রাতে কিন্তু আমরা একসাথে ডিনার করব।
আমি মনে মনে ঠান্ডা শ্বাস ফেলি, এই ১ ঘন্টা মানে তো আটটা, আটটায় তো আজিজের সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওখানে আমি গিয়ে কী ঘণ্টাটা করব? আমার লেখালেখির সুবাদে আজিজ মার্কেটে আমাকে অসংখ্যবার যেতে হয়েছে কিন্তু এখানকার সব আমি গুলিয়ে ফেলি। অতীতে এই নিয়ে অনেক কেলেংকারী হয়েছে [১]

সে আমাকে এখানে নামিয়ে দেয়ার পর সব কেমন গোলমাল হয়ে যায়। সাড়ে সাতটা বাজে, হাতে সময় মাত্র ত্রিশ মিনিট। এই অল্প সময়ে আমি কি করব, বড়ো অসহায় লাগে নিজেকে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় দোকানদার আমাকে জানান, এই গেট এখন বন্ধ হয়ে গেছে আপনি ওই গেট দিয়ে নীচে যেতে পারবেন। আমি তাকে কাতর অনুরোধ করি, ভাইরে, কোন গেট, কি গেট বুঝতে পারছি না। আমার সঙ্গে একজন কাউকে দেন, সে কেবল আমাকে নীচে নামার রাস্তা দেখিয়ে দেবে। সেই মানুষটার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

যাই হোক, হোটেলে ফিরে খানিকটা আরামের শ্বাস ফেলি। হোটেলটাকে হোটেল-হোটেল মনে হয় না কেমন বাড়ি-বাড়ি ভাব! হোটেলটা কী নীরব! আমার ধারণা ছিল, তেমন কোন গেস্ট নেই। আমার ধারণটা ভুল, গেস্ট উপচে পড়ছে কিন্তু বাড়তি কোন শব্দ নাই। এরা দেখলাম শব্দের বিষয়ে ভারী সচেতন। কেউ গাড়ির হর্ণ বাজাচ্ছে না, বাজালে ধরে নিতে হবে সামনের গাড়িটার চালকের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করল, গালি দিল। পারতপক্ষে যেটা এরা করতে চায় না। 
হোটেলের বাইরে বসার জায়গাটাও দেখলাম চমৎকার গুছিয়ে রেখেছে।

আমি আয়েশ করে বসে সিগারেট ধরাই। এখানে বসে সিগারেট খেতে কোন মানা নেই। বসে বসে চারপাশ দেখি। হঠাৎ নজর পড়ে আমার নিজের হাতের উপর। হায়-হায়, একি অবস্থা! আমি মানুষটা কালো কিন্তু এমন ঝিক কালো তো না! ঝিক কালো না বলে আলকাতরা বললে আমার জন্য বোঝাতে সুবিধে হয় কিন্তু তাই বলে আলকাতরা, ছ্যা। 
চামড়া কেমন কুঁকড়ে আছে, রঙ হয়েছে আবলুশ কাঠের মত (আবলুশ কাঠ জিনিসটা আমি কখনও দেখিনি কিন্তু লেখার সময় কুচকুচে কালো বোঝাতে হলে এটা লেখার চল আছে)। 
সমস্যটা খানিকটা বুঝতে চেষ্টা করি, সম্ভবত আবহাওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। 



একটা পাখি এসে বসে। অবাক হই, যাক, এই দেশে তাহলে এখনও পাখি-টাখি আছে! দেশটা তাহলে পুরোপুরি যান্ত্রিক হয়ে উঠেনি! এই দেশে পাখি যখন আছে তখন মানুষগুলোর মনও নিশ্চয়ই পাথরসদৃশ হয়নি।

পাখিটা আমার সঙ্গে ফাজলামি শুরু করে, আমি এর ছবি উঠাবার জন্য চেষ্টা করলেই এ অন্যদিকে গিয়ে বসে। 
আমি মনে মনে বলি, রসো, তুমি জার্মানির পাখি, ভাবছো তোমার বুদ্ধি বঙাল দেশের মানুষের চেয়ে বেশি? 
লুকোচুরি খেলার সমাপ্তি ঘটে, পাখিটা ছবিতে আটকা পড়ে, আটকা পড়ি আমিও, দরোজার কাঁচে!

আমার মধ্যে গা-ছাড়া ভাব। তাড়া নেই। কারণ আরাফাত বলেছে, আমাকে নিয়ে যাবে। আর আমি মনে মনে বলি, আরাফাত আজ কাজের চাপে আটকা পড়ুক। অন্তত ট্রেন মিস করুক, বাস মিস করুক তবুও যেন এখুনি হোটেলে এসে না পৌঁছে। অন্য কারও কি দায় পড়েছে আমাকে নিয়ে যাওয়ার। আমি খানিকটা আলস্যে গা ভাসিয়ে দেই। 
কপালের ফের, আরাফাত কাজের চাপে ঠিকই আটকা পড়েছে কিন্তু ব্যবস্থা একটা ঠিকই করেছে। মায়াবতী এসে হাজির, এই সব জটিলতায় ওর আজ ক্লাশ বাদ পড়েছে। মায়াবতী তাড়া দেয়, এখুনি আমাকে ডয়চে ভেলের অফিসে যেতে হবে।

আবারও ছুট। যেতে যেতে. হাঁটতে হাঁটতে আমি বন শহরটাকে দেখি। দেখি এখানকার লোকজনকে। কোথাও কোন অসঙ্গতি চোখে পড়ে না, চোখে পড়লে আরাম পেতাম। 
আবারও চরম বিরক্তি আসে, মিডিয়া ফোরামের উপর। এরা কোন বুদ্ধিতে এতো স্বল্প সময়ের জন্য টিকেট দিল? নাকি এদের বীমা কোম্পানির সঙ্গে আঁতাত আছে? আমাকে যে আসার সময় ত্রিশ হাজার ইউরোর বীমা করতে হয়েছিল কি এই জন্যে; আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসাখাতে ব্যয় হবে! :)

এই সব পুরনো স্থাপনা আমাকে খুব টানে। আমি নিজেও থাকি প্রায় ১০০ বছরের পুরনো একটা বাড়িতে। বাড়িটা বুড়া হয়ে গেছে, অনেক যন্ত্রণা দেয় কিন্তু আমি আমৃত্যু এই বুড়ার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছা প্রকাশ করি। আমার কেবল মনে হয়, এই বুড়ার দিকে যে রাস্তাটা গেছে এটা স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা [২]। তীব্র ইচ্ছা, এই বুড়ার কোলে মরতে চাই।

আমাদের নিজেদের কত স্থাপনা অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। পানাম নগরীতে [৩] গিয়ে আমার কান্না পেয়েছিল, হাতে ধরে আমরা আমাদের শেকড়গুলোকে কেমন করে নষ্ট করছি।

নাচঘরে আমি দেখেছিলাম গরু চড়তে। এই কষ্ট কাকে বলি, কোথায় রাখি। ময়নামতির হাজার বছর পূর্বের ইট দিয়ে দেখেছি গরুর খুঁটা বসাতে!
যাও অল্প স্থাপনাগুলো আছে সেইসব দেখার অনুমতি আমাদের মত সাধারণ মানুষদের নাই, এ এক অসভ্যতারই নামান্তর [৪]। 
ব্রিটিশদের করা রেলওয়ের এই সব চমৎকার বাংলোগুলো [৫] সহসাই ভেঙে ফেলা হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

মায়াবতী আমাকে ডয়চে ভেলের অফিসে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেন। এখানে মডারেশন নিয়ে জানা এবং আমার একটা রেডিও সাক্ষাৎকার [৬] ছিল। এই সাক্ষাৎকার নিয়ে আমি খুব একটা আরাম বোধ করছিলাম না। কারণ কমিউনিটি ব্লগে আমি দীর্ঘ সময় লেখালেখি করি না। কারণ বিবিধ। দলাদলি বিষয়টা আমার ভারী অপছন্দের। যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত [৭] দলবাজি করেন সেখানে আমার মত দলহীন একজন মানুষ এবং একটা কলাগাছের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। তাছাড়া কমিউনিটি ব্লগে একজনের অন্যজনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা বোধ না থাকা। নো মডারেশনের নামে যা খুশি তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু এটা আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি না, কলম হচ্ছে ছুঁরির মত। এখন ছুঁরিটা কার হাতে এটাও মূখ্য বিষয়। বানরের হাতে ছুঁরি থাকলে যা হওয়ার তাই হয়! 

যাই হোক, যারা কমিউনিটি ব্লগে ব্লগিং করেন তাঁরা মডারেশন বিষয়ে আরও ভালো বলতে পারবেন। এবং কমিউনিটি ব্লগে যেটা আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি না সেটা হচ্ছে ভলতেয়ারের চমৎকার সেই কথাটা:
"আমি তোমার সঙ্গে একমত না কিন্তু তোমার মত প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু লড়ব"।

*বৈদেশ পর্ব, এগারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_03.html 

সহায়ক লিংক:
১. হায় ঢাকা: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_9358.html
২. বুড়া বাড়িটা: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_24.html
৩. পানাম নগর: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_10.html
৪. অসভ্যতারই নামান্তর: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_04.html 
৫. 'গরিবারোগ': http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_14.html 
৬. মডারেশন নিয়ে রেডিও সাক্ষাৎকার: http://ht.ly/22gl0
৭. স্যাররা, দলবাজি বন্ধ করেন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_19.html           

Thursday, July 1, 2010

বৈদেশ পর্ব: নয়

আমার সাথে মুকিত বিল্লাহ না থাকলে সময়টা কী দুঃসহ হতো ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়। মানুষটা প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। যেহেতু তিনি যাবেন ফ্রাঙ্কফুট, তাঁর ফ্লাইট আটটা পঁচিশে, আমারটা আটটা চল্লিশ। মানুষটা আমার কাছ থেকে বিদায় নেন।

দুবাই থেকে যখন আবার আমি জার্মানি যাওয়ার উদ্দেশ্যে চেক-ইন করলাম, তখন আবারও সমস্যা। ইমিগ্রেশনের লোকজন কেন যাচ্ছি হেনতেন এই সব একগাদা প্রশ্ন করতে লাগল। এরা আমার ভিসা এবং অন্যান্য কাগজপত্র দেখেও খুব একটা তুষ্ট হলো বলে মনে হলো না। 
এখন এদের জন্য এটা কেন এতোটা জরুরি এটা আমার মাথায় আসছিল না। বাপ, আমি ট্রানজিট যাত্রী, আমি কেন জার্মানি যাচ্ছি এতে তোদের কী কাজ? আমি তো তোদের দেশে থাকছি না, সমস্যাটা কী তোদের! তোদের দেশে থাকা দূরের কথা, দুঃস্বপ্নও দেখতে চাই না। তোদের দেশে থাকার চাইতে আমি চাইব আমার আয়ু খানিকটা কমে যাক।
কোন প্রকারে আটকাতে না পেরে পরে আমাকে বলা হলো, আমি যে জার্মানিতে থাকব ওখানকার হোটেলের রিজার্ভেশন আছে কি না? ভাগ্যিস, এটার কপিও আমার কাছে ছিল। এটা দেখাবার পর এরপর সম্ভবত এদের ফাজলামী করার আর কোন সুযোগ ছিল না। ফাজিলের দল! 
যারা আমার পাসপোর্ট দেখে বলে তোমার তো ভিসার মেয়াদ শেষ এদেরকে দেয়া হয়েছে একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্ব! আমি তিতিবিরক্ত, এদের সঙ্গে হেত্বাভাস-কুতর্ক করার কোন ইচ্ছা আমার মধ্যে আর অবশিষ্ট ছিল না।

আমার পাশের সিটে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। প্লেন ছাড়ার পর থেকেই একটা বই বের করে কাটাকুটি খেলায় মগ্ন। সম্ভবত সুডুকো (নামের বানান ভুল হতে পারে)। তাঁর খেলার ফাঁকে টুকটাক কথা হয়। জার্মান নাগরিক। জার্মানি কেন যাচ্ছি এটা জেনে দেখি বুড়া খুব উৎফুল্ল। তিনি বলছিলেন, তোমাদের বাংলা ভাষার জন্য খুব আনন্দের দিন, না?
তাঁর কথায় সম্ভবত কিছু একটা ছিল, আমার চোখ ভরে আসে। আমি মাথা নাড়ি। ছোট্ট জানালা দিয়ে মেঘ দেখি।
নামার পূর্বে এই মানুষটার ফোন থেকেই আমি আরাফাতুল ইসলামকে ফোন করি। আমি এও আশংকা করছিলাম, জার্মানিতে নামার পর কোন-না-কোন কারণে আমাকে আটকাবার চেষ্টা করা হবে। দেখা গেল ফিরতি প্লেনে উঠিয়ে দিল, বিশ্বাস কী! ঢাকা, বিশেষ করে দুবাই এয়ারপোর্টেই যদি এতো যন্ত্রণা হয় আর এ তো খোদ জার্মানি। যাদের দেশে আমাকে বেরুতে হবে, থাকতে হবে; আপত্তিটা এদেরই প্রবল হওয়ার কথা। কেউ যদি বলে আমাদের দেশে তোমাকে ঢুকতে দেব না তাহলে আর যাই হোক এ নিয়ে কুস্তি করার জন্য কস্তাকস্তি করা চলে না।

আমি আগেই জোর অনুরোধ করেছিলাম, আমি কোন সুবিধা চাই না কেবল কেউ একজন যেন আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে যায়। আমি ঢাকার লোকেশনই মনে রাখতে পারি না তা আবার জার্মানি! আরাফাতুল ইসলাম নামের সহৃদয় মানুষটা আমাকে বারবার নিশ্চিত করেছিলেন, কোন সমস্যা নেই, আপনি চলে আসেন। আপনাকে নিয়ে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা হবে।
আমি যখন ডুজলডর্ফে নামি তখন জার্মানির সময় আনুমানিক ২টা হবে। ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে আসছে। পূর্বের লেখায় লিখেছিলাম, দুবাই এয়ারপোর্টে [১] হোটেলে যেতে না দেয়ার কারণে ঘুমাবার সুযোগ হয়নি! দীর্ঘ ২২ ঘন্টার ধকল শরীরের উপর দিয়ে গিয়েছে। আমার তীব্র ইচ্ছা, জার্মানিতে হোটেলে গিয়ে লম্বা একটা ঘুম দেব। কেউ জাগাতে আসলে তার সঙ্গে খুনাখুনি হয়ে যাবে।

ইমিগ্রেশন, কাস্টমস সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সম্ভবত আমার দু-মিনিটও লাগেনি। আমার কাছে কিচ্ছু জানতে চায়নি, বাড়তি একটা শব্দও না। কেবল পাসপোর্ট-ভিসা মেশিনের রে-এর মাধ্যমে চেক করে নিয়েছে ঠিক আছে কি না। সীল মেরে আমার পাসপোর্ট ফেরত দেয়ার পর আমি বিভ্রান্ত চোখে বললাম, আমি কি তাহলে এখন যেতে পারি?
দায়িত্বে থাকা মানুষটা সহাস্যে বলেন, কেন নয়! আশা করছি আমাদের দেশ তোমার ভাল লাগবে।
লাগেজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একজনকে এটা বলার পর নিমিষেই সে অন্যদের জড়ো করে ফেলল। একেকজনকে একেকটা দিক দেখার জন্য বলে আমাকে বলল, তোমার অস্থির হওয়ার কোন কারণ নেই। আমরা দেখছি।
লাগেজের হদিশ মিলল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

এয়ারপোর্টে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কোথায়, কেউ তো নেই! এখানেও একজন ভদ্রমহিলা আমাকে ফোন করতে দিয়ে সহায়তা করেন। আমার আশা ছিল হয়তো আরাফাতই আসবেন কিন্তু তাঁর সঙ্গে মানুষটাকে দেখে খানিকটা হোঁচট খাই। আরাফাত এই মানুষটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর জানলাম ইনি আরাফাতের 'ইস্তারি সাহেবা'। মেয়েটার চমৎকার একটা নাম আছে, নামটা এখন আমার মনেও আছে কিন্তু এখন আমি এই মেয়েটির নাম দিলাম 'মায়াবতী'। কেন? সেটা পরে যথাসময়ে বলা হবে। 
আরাফাত আমাকে যেটা বললেন সেটা শুনে আমার মুখ শুকিয়ে আসে। এখুনি ছুটতে হবে, সন্ধ্যা পাঁচটায় নাকি একটা অনুষ্ঠানে আমাকে থাকতে হবে। ওয়াল্লা, আমার ঘুমের কী হবে, আমার তো ইচ্ছা করছে এখানেই রাস্তায় শুয়ে পড়ি। 
ডুজলডর্ফ থেকে বন শহরে যেতে হবে ট্রেনে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের তিনজনের দৌড় শুরু হলো। হাঁটা-দৌড়-চলন্ত সিড়ি-ট্রেন-ক্যাব-বাস-ট্রাম। 
আরাফাত বলছিলেন, রাইন নদীর একটা সেতু দেখিয়ে। সেতুর লোহার জালে হাজার-হাজার তালা। এই তালাগুলোর নাম নাকি 'লাভ লক'! এখানে প্রেমিক-প্রেমিকারা তালা মেরে চাবিটা রাইন নদীতে ছুঁড়ে ফেলে। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে থাকি এই কারণে, জার্মানদের মত মানুষরাও দেখছি আমাদের মতো অহেতুক আবেগ ধরে রেখেছে! আমি মনে মনে ভাবি, এরা কি তাহলে এখনও পুরোপুরি রোবট হয়ে উঠেনি?

হোটেলে লাগেজপত্র রেখে সম্ভবত দশ মিনিট সময় পেয়েছিলাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য। আমি নিশ্চিত, সঙ্গে আরাফাত না থাকলে পুরো একদিন লাগত আমার হোটেল পর্যন্ত পৌঁছতে। এই সহৃদয় মানুষটা একটা শিশুর মত আগলে রেখেছিলেন আমাকে জার্মানির পুরোটা সময়। এই ঋণ শোধ হয় কেমন করে আমার জানা নেই!

ডয়চে ভেলের অফিসের কাছেই রাইন নদীতে ইয়টে করে নৌভ্রমণ টাইপের কিছু একটা। অরি আল্লা, আস্তে আস্তে দেখি এখানে বাজার জমে গেছে, লোকে গিজগিজ করছে। ইশকুল খুইলাছে টাইপ।

এখানেই পরিচয় হয় বিডিনিউজের খালেদ সাহেবের সঙ্গে। তিনি এখানে এসেছেন সস্ত্রীক। আগে কখনও দেখা হয়নি, মানুষটার কাছে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যাই, সঙ্গের একজন আমার পরিচয় করিয়ে দেন। মানুষটা আমার বাড়ানো হাত ধরেন নিরাসক্ত ভঙ্গিতে, মনে হচ্ছিল ধরতে না পারলে সুখি হতেন। ইনি সম্ভবত বৈদেশিদের গ্লভস লাগানো হাত ধরতেই অভ্যস্থ। আহা, কেন এমন বোকামী করলাম? নিদেনপক্ষে একটা গ্লভস কেন যোগাড় করলাম না। 
আমাদের আগামীকালের অনুষ্ঠান বিষয়ে তিনি একটা টুঁ-শব্দও করলেন না। এটাই হয়তো আবেদ খানের মত তাঁরও একটা 'এস্টাইল' [২]। একেকজনের একেক 'এস্টাইল' থাকতেই পারে এতে দোষ ধরার কিছু নেই কিন্তু আমি মানুষটার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। ইয়টের ডেকের টেবিলে খালেদ সাহেব, ওঁর স্ত্রী এবং আমরা আরও দু-একজন। 
কিছু মানুষের সঙ্গ আমার বিরক্তির উদ্রেক করে। যেহেতু এখানে একজন ভদ্রমহিলা আছেন তাই অনুমতি নিয়ে আমি উঠে চলে আসি ডেকের ফাঁকা একটা জায়গায়।
আমার কাছের লোকজন বুঝতে পারেন, আমাকে আমার মত করে ছেড়ে দেন বলে কৃতজ্ঞতা।

এখানে সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। এখানেই পরিচয় হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মসুদ মান্নানের সঙ্গে। এই মানুষটাকে আমার পছন্দ হয়েছিল, খুব। কারণ তিনি আর আট-দশটা আমলাদের মত না। তিনিও এসেছেন সস্ত্রীক। জনাব মসুদ মান্নানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আমার কথা হয়। আমি তাঁকে বলি, পাট নিয়ে আমাদের এখন ভারী সুসময়, সহসাই পাটের জেনেটিক প্যাটেন্ট হবে। আমি তাঁকে অনুরোধ করি, পাট নিয়ে কাজ করার জন্য, তাঁর পক্ষে যতটা সম্ভব। 
তিনি আমাকে আমার পাট নিয়ে লেখাগুলো [৩] মেইল করতে অনুরোধ করে কথা দিয়েছিলেন, তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। 
তাঁকে আমি এটাও বলি, আমাদের দেশের পাটের পণ্যে বড়ো ধরনের একটা সমস্যা আছে সেটা হচ্ছে, পাটের সূক্ষ আশগুলো খুলতে থাকে, উড়তে থাকে যা একজন মানুষের এলার্জির প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ। এই আশের সঙ্গে কোন এক ধরনের আঠা মিশিয়ে আশগুলো বসানো গেলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।
আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, কাল পুরষ্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে তিনি থাকবেন কি না। মানুষটা ঝকমকে চোখে বলেন, বলেন কী, থাকব না কেন, অবশ্যই থাকব। আমাদের দেশের এমন একটা দিন। বিভিন্ন ভাষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলা ভাষাটাও সগর্বে দাঁড়াবে, এটা দেখব না, বলেন কী?
আমি মুখ ঘুরিয়ে রাইন নদী দেখি। রাইন নদী এমন ঝাপসা কেন, নাকি আমার চশমা!

রাইন নদীর হিম বাতাস। ইয়ট ফিরে আসছে। রাইনের তীরে কী চমৎকারই না ছবির মত বাড়িগুলো!

ঘড়িতে স্থানীয় সময় সাড়ে নটা। কী আশ্চর্য! বাইরে এখনও ফকফকা! সূর্য বাবাজির ডোবার নাম নেই!
হনুমানজী কি এখন তাহলে জার্মানিতে? সূর্য বগলে চেপে দিব্যি পা নাচাচ্ছেন? তাই হবে! কিন্তু আমি যে শুনেছিলাম ডিজিটাল টাইমের জটিলতার [৪] কারণে তিনি বাংলাদেশে তশরীফ এনেছিলেন। 
আহা, তিনি জার্মানিতে আসবেন জানলে আমিও সাথে চলে আসতে পারতাম।

লোকজনের ভিড়ে আমার দমবন্ধ ভাব হয়। এরিমধ্যে ঝড়ের গতিতে একেকজনের সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষ হয়। আমার ওয়ালেটে জমে গেছে অনেকগুলো ভিজিটিং-বিজনেস কার্ড। কেবল আমি বেচারারই কোন কার্ড নাই- কি লিখব আমার কার্ডে? দু-কলম লেখালেখি করা ব্যতীত আমার যে ঘটা করে বলার মত তেমন কিছুই নাই।

ঝাঁ চকচকে হোটেলে পড়ে থাকে আমার লাগেজ, গাট্টি-বোঁচকা। ফিরে আসি আরাফাত-মায়াবতীদের বাসায়। সেটার অবস্থান মোটামুটি একটা ছোটখাটো পাহাড়ের মাঝামাঝি। প্যাঁচানো সিড়ি বেয়ে বেয়ে উঠতে হয়। একেবারে উপরে নাকি অনেক পুরনো স্থাপনা, সময়ের অভাবে সেটাও দেখা হলো না।

সঙ্গে আসেন বাংলা বিভাগের হক, এই ভদ্রলোক আমাদেরকে সঙ্গ দেয়ার জন্য চলে এসেছেন। আমি আরাফাত-মায়াবতীর সাজানো গোছানো সংসার দেখি। দেখি এদের পরস্পরের প্রতি অন্য ভুবনের মায়া। আমি মনে মনে বলি, আহা, সমস্তটা জীবন যেন এরা ঠিক এমনটিই থাকে, আমৃত্যু। এই গ্রহের কোন মালিন্য যেন এদের স্পর্শ করতে না পারে।

দেখি, এদের ঝুল বারান্দায় ক্ষুদ্র পটে ছোট-ছোট গাছ। কী অদ্ভুত, একটা গাছের ফুলেও সৌরভ নেই। গাছগুলোও কি রোবটগাছ হয়ে গেছে? কেবল সৌরভ আছে দেশ থেকে নিয়ে আসা গন্ধরাজ গাছের ফুলে। 
ছোট্ট পটে স্ট্রবেরী ধরেছে, একটাই। কী চমৎকারই না দেখাচ্ছে! 
স্ট্রবেরী ফলটা আমার তেমন পছন্দের না কিন্তু মাথায় দুষ্টমি চাপে, আচ্ছা, কপ করে ফলটা খেয়ে ফেললে কেমন হয়? আরাফাত-মায়াবতীর মুখটা তখন কেমন দাঁড়াবে! মুখে কিছু বলতে পারবে না কিন্তু এরা ব্যাঙের মত গাল ফুলিয়ে মনে মনে বলবে, একটাই ফল, মানুষটা কেমন করে পারল এমন হৃদয়হীন একটা কাজ করতে। হা হা হা।

ইচ্ছা ছিল, সম্ভব হলে ছোট পটের এমন একটা গাছ সাথে করে নিয়ে আসব। ক্যাকটাস, অর্কিডের উপর আমার দুর্দান্ত লোভ, ভাল লাগা। সময় স্বল্পতায় তা আর হয়ে উঠে না। হায় সময়, সময়টা মনে হয়েছে এক পাগলা ঘোড়া, যাকে বাগ মানাতে বেগ পেতে হয়েছে। তাও আরাফাত না থাকলে এই ঘোড়া আমাকে ফেলে পগারপার হতো এতে কোন সন্দেহ নেই। কেবল হোটেলে আমাকে দশ মিনিট ফ্রেশ হওয়ার জন্য মানুষটা বাসের অপেক্ষা না করে ক্যাব নেন। এখান থেকে ওখানে- আমার জন্য ঠিক করে রাখা হোটেলে কিন্তু ভাড়া আমাদের টাকায় প্রায় আটশ! আমার সঙ্গে থাকা ইউরো খরচ করবার কোন সুযোগই দেন না মানুষটা।

জমাট আড্ডা চলে। রাত গড়ায়...। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি। এক ঘুমে রাত কাবার। আশ্চর্য, কোথায় গেল জেটল্যাগ, কোথায় গেল বিছানা বদল, কোথায় গেল দেশের ভাবনা? এটা কি আরাফাত-মায়াবতীদের জন্যে, প্রবাসে থেকেও মনে হয়েছে দেশেই আছি? আমি ঠিক জানি না...।

*বৈদেশ পর্ব, দশ: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_8079.html

সহায়ক লিংক:
১. বৈদেশ পর্ব, সাত: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_3252.html
২. আবেদ খানের এস্টাইল: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_27.html
৩. পাট, ঘুরে দাঁড়ায় স্বপ্ন: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post.html
৪. হনুমানজী: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_30.html

বৈদেশ পর্ব: আট

আমার ইচ্ছা ছিল বৈদেশ পর্বটা একটানে লিখে যাব কিন্তু দুবাই এয়ারপোর্টে স্টপওভারের মত এই পর্বের লেখারও একটা স্টপওভার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বৈদেশ পর্ব: সাত [১] নিয়ে তীব্র জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল একজন কঠিন একটা মেইল করেছেন। এটাকে মেইল না বলে বলা যেতে পারে খড়গ দিয়ে ধড় আলাদা করে ফেলা। না, ভুল বললাম, তাহলে যন্ত্রণাটা টের পাওয়া যেত না। বলা যেতে পারে চাপাতি দিয়ে কোপানো। তিনি আমার এই পর্বের লেখা নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এটা পড়ে আমি স্তম্ভিত, ক্রুদ্ধ!

ইতিপূর্বে আমাকে নিয়ে বা আমার লেখা নিয়ে কেউ কেউ অতি উৎকট ভঙ্গি প্রকাশ করেছেন- কেউ কুৎসিত ছবি দিয়েছেন, তো কেউ ততোধিক কুৎসিত কথা লিখেছেন। যেসব সহযোদ্ধাদের সঙ্গে লেখালেখি করেছি তারা সকালে ফোনে চমৎকার কথা বলে অন্য নামে বিকালে ঈর্ষায় কঠিন লেখা লিখেছেন। এই সব আমার গা সওয়া। এদের ভঙ্গি চেনা, এদের দৌড় জানা। এদের প্রতি আলাদা কোনো টানও নেই আমার। 
কিন্তু এখনকার বিষয়টা খানিকটা অন্য রকম। এখন যে মানুষটা আমার প্রতি যে ধারণা পোষণ করেছেন, তিনি আমার অসম্ভব পছন্দের একজন মানুষ ছিলেন বলেই আমার অনুভূতিটা অনেকটা খুব কাছ থেকে ছুঁরি খাওয়ার অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতা আমার নতুন!

প্রশ্ন আসতে পারে মেইলে এই সব না লিখে এখানে কেন? তাঁর অন্য একটা মেইল "...রাতে আমার খিদে পায় বেশি, মা সবসময় আমার বিছানার পাশে বিস্কুটের টিন রাখতেন, এদেশ আসার আগ পর্যন্ত..."। এটা পড়ে আমার বুক ভেঙে কান্না আসছিল। আমার নয় ইঞ্চি মনিটর তখন ঝাপসা। এই মানুষটাই যখন এমন ভাষায় আমাকে আক্রমণ করেন তখন দরদর করে আমার শরীর থেকে রক্ত পড়ে। আমি ভেজা চোখে সেই রক্ত পড়া দেখি, আমার মোটেও ইচ্ছা করে না রক্তপাত থামাতে। আমার ইচ্ছা করে না তাঁকে বলি, তুমি আমাকে এভাবে ছুঁরি মারলে কেন? কার জন্যে?

ভাল হতো মেইলটার আদ্যেপান্ত এখানে তুলে দিতে পারলে। নীতিগত কারণে এটা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আর মেইলে উত্তর দিতে আমার আগ্রহ বোধ হয়নি কারণ এই মানুষটা নিজেও জানেন না তিনি মেইলে কী লিখেছেন! কী তীব্র ভঙ্গিতেই না আমাকে আক্রমণ করেছেন! দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরে আমার লেখার মাধ্যমে আমাকে জানার পরও আমার সম্বন্ধে কী নীচু ধারণা! হা ঈশ্বর! আমার ধারণা, তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন, প্রার্থনা করি, ঠান্ডা মাথায় নিজের মেইলটা আবারও পড়লে খানিকটা আমাকে বুঝতে পারবেন।

তিনি আরবের কোনো এক দেশে থাকেন। সেই দেশ তাঁকে অনেক কটা বছর থাকতে দিয়েছে, লালন করেছে। সেই দেশের প্রতি তাঁর আছে সুগভীর মায়া। থাকুক, এতে আমার কোন বক্তব্য নাই কিন্তু তাঁর এই আবেগ আমাকেও স্পর্শ করবে এটা ভাবাটা বোকামী! 
আমার লেখার যে অংশ নিয়ে তাঁর তীব্র আপত্তি তা হচ্ছে:
তো, দুবাই এয়ারপোর্ট দেখে আমি বিরক্ত। সুবিশাল অথর্ব এক জিনিস বানিয়েছে! ওই অনুযায়ী যথেষ্ঠ লোকবল চোখে পড়েনি। অসংখ্য পুরুষ নামের মহিলা চোখে পড়েছে। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পিচ্ছিল সাদা কাপড় গায়ে দিয়ে হিজড়াদের মত হাঁটাহাঁটি করতে থাকা লোকজন বাসাবাড়ির মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাত্রির লম্বা লাইন অথচ ডেস্কে দায়িত্বে থাকা লোকগুলো নিজেদের মধ্যে ফালতু আলাপ করছে। এটা বোঝাই যাচ্ছে কারণ একজন অন্যজনের গায়ে হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
যাত্রির লাইন লম্বা হয়, এতে এদের কিছুই যায় আসে না। স্রেফ দম্ভ, বেশুমার টাকার অহংকার! এই অসভ্যদের বোঝার এই বুদ্ধিটুকু কখনই হবে না যে যাত্রিরা দাঁড়িয়ে আছে এঁরা এই মুহূর্তে এদের অতিথি। আমি অন্য সময়ে প্রয়োজনে কঙ্গো এয়ারলাইন্সে ভ্রমণ করব কিন্তু এই সব অসভ্যদের দেশে ব্লাডার হালকা করতেও আগ্রহী হবো না। শপথ আমার লেখালেখির। 


তিনি আমাকে মেইলে জানাচ্ছেন, "এই এয়ারপোর্ট দিয়ে প্রতিদিন দেড়লাখ যাত্রী যাতায়ত করেন"।
তো? তাতে আমার কী! দেড়লাখ যাত্রী যাতায়ত করলেই এই এয়ারপোর্টটা দেখে আমাকে বিগলিত হতেই হবে কেন? কারও শতকোটি টাকা থাকলেই মানুষটা একজন ভালমানুষ হবেন এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? তার সব কিছুতেই লাফাতে হবে কেন?


জার্মানির 'ডুজলডর্ফ' এয়ারপোর্টের তেমন জৌলুশ নেই কিন্তু কোথাও কোনো অসঙ্গতি আমার চোখে পড়েনি। সম্ভবত ২ মিনিট লেগেছে আমার ইমিগ্রেশন পার হতে। আমার লাগেজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জানাবার সঙ্গে সঙ্গে অন্তত চার-পাঁচজন মানুষ ছুটে এসেছিলেন। একজন অন্যজনকে একেকটা বিষয় চেক করার জন্য বলছিলেন। এঁরা বারবার আমাকে বলছিলেন, তোমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নাই, আমরা দেখছি। এরা কিন্তু এমিরাটসের লোক ছিলেন না, ছিলেন বিমান বন্দরের।

কেউ যদি বলে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বানিয়েছে 'বুর্জ খলিফা'। 
তো? এটা দেখে আমাকে কাত হয়ে যেতে হবে কেন? আমার কাছে এটা স্রেফ একটা জঞ্জাল! আমার কোনই আগ্রহ জাগে না যে এই জঞ্জালটা দেখে আসি। এই সব আবর্জনা দেখার জন্য অনেক বড়ো মাপের মানুষ রয়ে গেছেন, তাঁদের জন্য না-হয় থাকুক।

আমি এমিরাটসে দুবাই হয়ে যাচ্ছি এটা শুনে মাহাবুব ভাই নামের এক সিনিয়র বলেছিলেন, পারলে টিকেটটা বদলে ফেলেন কারণ দুবাই এয়ারপোর্ট একটা কুখ্যাত এয়ারপোর্ট। তিনি কর্পোরেট ভুবনের একজন মানুষ, তাঁকে হরদম এদিক-ওদিক যেতেই হয়।  কিন্তু তখন তাঁর কথাটা তেমন গা করিনি।
আমার সঙ্গে ইউএন এর যে মুকিত বিল্লাহ ছিলেন তিনিও বলছিলেন পারলে তিনিও টিকেটটা বদলে ফেলতেন। কিন্তু আমাদের কারও এই উপায় ছিল না কারণ টিকেটগুলো কাটা হয়েছিল আমন্ত্রণকারীদের ইচ্ছায়, সুবিধায়।

মূল যে অংশটা নিয়ে ওনার ক্ষোভ, আমি কেন এটা লিখেছি, "অসংখ্য পুরুষ নামের মহিলা চোখে পড়েছে, পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পিচ্ছিল সাদা কাপড় গায়ে দিয়ে হিজড়াদের মত হাঁটাহাঁটি করতে থাকা লোকজন যেন বাসাবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে"।
আমার কাছে এমনটাই মনে হয়েছিল, এখন আমি কি এটা বানিয়ে বানিয়ে লিখব, ওহ, কী একেকটা পুরুষ দেখলুম- সিংহাবলোকনন্যায়! এই পোশাকে একেকজনকে কী চমৎকারই না লাগছিল গো। আমি 'মুগধ'!

আচ্ছা, আমাদের এয়ারপোর্টে সব লোকজন লুঙি পরে থাকলে অন্যরা এই নিয়ে মন্তব্য করলে কি তার মুখ চেপে ধরা হবে, নাকি শূলে চড়ানো হবে?

তিনি আমাকে মেইলে জানিয়েছেন, এরা কেনো লম্বা কাপড় পরে থাকে। এটা এই প্রথম তাঁর কাছ থেকে জানলাম এমন না। চামড়াপোড়া গরম লু-বাতাস যখন বয়, বাতাসের সঙ্গে উড়তে থাকে গরম বালি; এ থেকে বাঁচার জন্য গোল চাকতিতে আটকে থাকা মাথার বড়ো কাপড়টা দিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে উবু হয়ে থাকতে হয়। 
সে তো মরুভূমির কাহিনি! দুবাই এয়ারপোর্টে, এখানে মরুভূমি এলো কোত্থেকে? তারপরও কারও ইচ্ছা হলে একটা না দুইটা পরুক, ইচ্ছা হলে আরও গা দুলিয়ে হাঁটুক কিন্তু এটা নিয়ে আমি লিখতে পারব না এমন টিপসই আমি কখন কোথায় দিলাম?
আমার লেখালেখি তার সামনে কাউকে দাঁড়াতে দেয় না, আমাকেও না। লেখা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে, আমি না। সাদাকে সাদা বলব, কালোকে কালো। জনে জনে জিগেস করে আমাকে লিখতে হবে নাকি! 

তাঁর তীব্র ক্ষোভ, আমি হিজড়াদের সঙ্গে উদাহরণ কেন দিলাম। তিনি কঠিন ভাষায় আমাকে এটাও জানিয়ে দিলেন, "হিজড়া না হয়ে আমি পুরুষ হয়ে জন্মেছি বলেই কী আমার এই অহংকার? হিজড়াদের প্রতি আমি তাচ্ছিল্য করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি"।
আমার কাছে এদের হাঁটার ভঙ্গিটা এমন মনে হয়েছে তাই আমি হিজড়াদের সঙ্গে তুলনা করেছি। কেউ যখন চোখ থাকার পরও অন্ধের মত চলাফেরা করে তখন আমরা এটাই বলি, দেখো, কী অন্ধের মত হাঁটছে। এর অর্থ এটা না কোন অন্ধের প্রতি তাচ্ছিল্য করা। তাচ্ছিল্যটা করা হচ্ছে সেই মানুষটার প্রতি যে চোখ থাকার পরও অন্ধের মত ভঙ্গি করছে।
একটা আরবী প্রবাদ আছে, 'কোন ল্যাংড়া-লুলা দেখলে তাকে একটা লাথি দেবে কারণ সৃষ্টিকর্তা যাকে করুণা করেননি তাকে আমার করুণা করার প্রয়োজন কি'।
এই উদাহরণটাকে কি আমরা আক্ষরিক অর্থে গ্রহন করব? রূপক অর্থে কি কিছুই বলা যাবে না, মুখে তালা!

হিজড়া নামের ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের [২] নিয়ে আমি রসিকতা করতে যাব কোন দুঃখে! এঁদের যখন দেখি তখন নিজেকে বড়ো লজ্জিত মনে হয়, কেবল মনে হয়, কী অপার সৌভাগ্য নিয়েই না জন্মেছি। এঁদের নিয়ে এই উদাহরণ দেয়ায় যে মানুষটা আক্ষরিক অর্থে গ্রহন করেন তাঁর সঙ্গে ফিযুল বুলি কপচাবার চেষ্টা করতে আগ্রহ বোধ করি না। আমার এই অমানুষ [২] লেখাটা নিয়েও হইচই করা চলে। কেন আমি হিজড়াদের 'অমানুষ' বললাম? এরা কী মানুষ না? ইত্যাদি ইত্যাদি।

আহ, এইখানে এসে মানুষটার সঙ্গে আমার আর কোন যোগ থাকে না! আফসোস, বড়ই আফসোস। কপাল আমার, প্রিয় সব কিছু আমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়! ইনি লিখেছেন, "যে রেমিট্যান্সের টাকায় গড়ে উঠা বিমানবন্দরের সুশীতল হাওয়া গায়ে মাখিয়ে আবেদ খান, আনিসুল হক, আলী মাহমেদরা বৈদেশ যাত্রা করেন"।
নো, নো স্যার, আপনি এখানে দুইটা ভুল করলেন!
এক: আনিসুল হক, আবেদ খানের সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলে। এঁরা অনেক বড়ো মাপের মানুষ, এঁদের চোখে থাকে রঙিন চশমা। এঁদের সঙ্গে তিন টাকা দামের কলমবাজ আলী মাহমেদের তুলনা করাটা হাস্যকর। আমার কলম ড্যাম চিপ! রি-সেল ভ্যালুও নেই এঁদের কলমের আছে। বাজার উঠানামা করে বলে এরা হরদম কলম কেনাবেচা করতেই থাকেন কারণ বাজারে এর কদর আছে। এরা মুখিয়ে আছেন আপনাদের মত পাঠকদের জন্য চমৎকার সব কথা প্রসব করার জন্য। আর আমার কলম কেউ সাড়ে তিন টাকা দিয়েও কিনতে চাইবে না।
দুই: দুঃখিত স্যার, আমি আপনাদের এই অর্জনটাকে খাটো করছি না কিন্তু এটা আপনার ভ্রান্ত ধারণা, রেমিট্যান্সের টাকায় এয়ারপোর্ট-রাস্তা-ঘাট-ব্রীজ করা হয় না। 
আমি কি আপনাকে মনে করিয়ে দেব, এবারের বাজেটের ১,৩২,১৭০ কোটি টাকার মধ্যে আয়ের উৎসগুলো কি কি? জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, বহির্ভূত কর হচ্ছে ১,৩২,১৭০ কোটি টাকার মধ্যে ৬০ ভাগ! অর্থাৎ ৬০ ভাগ টাকা আসছে কেবল আমাদের দেয়া কর থেকে। এই টাকাটা আসে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষভাবে আমাদের কাছ থেকেই। 
এটা আসে টাট্টিখানা হালের ওয়শরুমে আমরা ঘুম থেকে উঠে যখন দাঁত মাজি তখন থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাবার পূর্বে যে টয়লেট টিস্যু ব্যবহার করি সেখান থেকে। এই টাকা থেকেই সরকার রাস্তা-ঘাট-ব্রীজ-বিমানবন্দর বানায়, আপনাদের রেমিট্যান্সের টাকায় না। 
রেমিট্যান্সের টাকায় দেশের চাকাটা বনবন করে ঘুরতে থাকে এটা সত্য, চাকাটায় আলাদা গ্রীজ যোগ হয় এও সত্য। আপনি বিমানবন্দরের হাওয়ার কথা বললেন বলেই এই উদাহরণটা দেয়া।

পোস্টের শুরুতে বলেছিলাম কাছ থেকে ছুঁরি মারার কথা এবং মেইলে ছোট্ট করে লিখেছিলামও, অতি পক্ষপাতদুষ্ট মানুষদের সঙ্গে কথা বলে আমি আরাম পাই না। এটা বলার কারণ হচ্ছে, আপনি এদের জন্য গভীর মমতা দেখিয়েছেন দেখে আমার ভাল লাগছে কিন্তু আপনি কি আমার এই পোস্টেই এটা পড়েননি? "...আমার প্রয়োজন ঘুম। কারণ এই সমস্তটা রাত আমার কেটেছে নির্ঘুম"। 
আমার জার্নিটা ছিল প্রায় ২২ ঘন্টার! একফোঁটা আমি ঘুমাতে পারিনি। পরের সারাটা দিন আমার ছুটাছুটি, এর পরের দিনই আবার আমাকে ফেরার জন্য ছুটতে হয়েছে। আমার ঘুমাতে না পারার কষ্টটা আপনাকে দেখি বেদনাহত করল না! কই, মেইলে আপনি দেখি এই বিষয়ে একটা শব্দও ব্যয় করলেন না! কেন? 
আপনার কি ধারণা জাগতিক কষ্টে কাবু একজন মানুষের মত আমার ঘুমের প্রয়োজন হয় না? নাকি তিন টাকা দামের 'কলমবাজ', এরা কেবল এই গ্রহে আসেন কৌপিন পরে উবু হয়ে লেখালেখি করে গ্রহ উদ্ধার করতে? এদের জাগতিক আর কোন চাহিদা নাই?

যেখানে একজনের যাতে ঘুম ভেঙে না যায় সেই কারণে মহা পবিত্র গ্রন্হ নিঃশব্দে পাঠ করার জন্য বলা হয় সেখানে আপনি একটা মানুষকে ঘুমাতে দেবেন না, চোখের পাতা এক করতে দেবেন না। বাহ, বেশ তো! যথার্থ কাগজপত্র-হোটেল কূপন থাকার পরও আপনি আমাকে হোটেলে যেতে দেবেন না, ঘুমাবার সুযোগ দেবেন না, কারণ কী, বাহে! কেবল যে ঘুমাতে দেবেন না এই-ই না; কোনো ব্যাখ্যাও দেবেন না, কি আমার অপরাধ? কোন কারণে আমার সঙ্গে এই আচরণ করা হচ্ছে? একজন ফাঁসির আসামীকেও তো তার অপরাধ জানিয়ে দেয়া হয়, কি কারণে তার ফাঁসি হচ্ছে।
আমার খুব দায় পড়েছে এদেরকে সভ্য বলার জন্য।

আরব জাতি নিয়ে আপনি চমৎকার সব কথা বলেছেন, শুনে প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়ার কথা। এরা আপনাদেরকে থাকার জায়গা দিচ্ছে ইত্যাদি। ভুল! এরা মানবতার কারণে আপনাদেরকে থাকার জায়গা দিচ্ছে এমনটা না, দিচ্ছে দায়ে পড়ে। কারণ এদের লোক প্রয়োজন। এমন অনেক কাজ আছে যেটা সে দেশের লোকজন করতে চায় না। আর এটা তো স্রেফ একটা লেনদেন। আমরা শ্রম দিচ্ছি এরা দিচ্ছে শ্রমের দাম। এখানেও এরা গুরুতর অন্যায় করছে, শ্রমের যথার্থ মূল্যটুকুও এরা দিচ্ছে না।
আমরা দেখেছি, কোন মুসলমান দেশে এরা কতটা আর্থিক সহায়তা দেন। আমাদের প্রকৃতিক দূর্যোগে এদের দানের বহর দেখে হাসি চেপে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে।   
কেন যেন আপনার এই বিপুল উল্লাস আমাকে স্পর্শ করছে না। আরব জাতির প্রতি আপনার প্রালঢালা আবেগ থাকতে পারে, আমার নাই। আমি অধিকাংশ আরবদের পছন্দ করি না।

এরা একসময় বীর জাতি ছিল কিন্তু এখন একটা কাপুরুষ জাতি, এহেন কোন অনাচার-অন্যায় নাই যেটা এরা করে না। মুসলমানদের ক্ষতি অন্য ধর্মের লোকজনরা যতটা না করেছে তারচেয়ে অনেক বেশি এরা করেছে। ইরাকের পবিত্র স্থানগুলো যখন অপবিত্র হচ্ছিল তখন এরা বসে বসে তামাশা দেখেছে। আমি অপেক্ষায় আছি, এদের পবিত্র স্থানগুলো যখন অপবিত্র হবে সেটা দেখার জন্য, হিস্ট্রি রিপিট। 
আমেরিকা ইসরাইল যখন সভ্যতার নমুনা দেখায় [৩] তখন এরা নিশ্চয়ই উট দৌড়াবার উল্লাস বোধ করে। করে না? উট দৌড়াচ্ছে, স্পীড-স্পীড মো() স্পীড। এতে জকির প্রাণ গেল নাকি উটের সঙ্গে বেঁধে রাখা শিশুটির তাতে কি আসে যায়?
ইসলাম ধর্মের দন্ড ধরে রাখা সৌদি আরবদের ধর্মের নমুনা দেখে চোখে জল চলে আসে। গভীর রাতে 'মুতোয়া' নামের পুলিশ বাঙালির ঘরে ঢুকে জিনিস তছনছ করে। খুঁজে পায় তাঁর মায়ের ছবি, সেই মানুষটার সামনে তাঁর মার ছবিটা ছিড়ে ফেলে বলে, হারাম। সেই মানুষটা কিচ্ছু বলে না কেবল দাঁত দিয়ে কামড়ে নিজের হাত থেকে রক্ত ঝরাতে থাকে। 
এই বদমাশদের কে এই অধিকার দিয়েছে, জোর করে পুলিশ দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে থানায় নামাজ পড়িয়ে বন্ড সই দিয়ে ছেড়ে দিতে? ইসলামে কোথায় এটা লেখা আছে?

ইরান একাই লড়ে যাচ্ছে, একে থামাতে হবে। আরব জাতি আছে না! সৌদি আরবের মত মহান ধার্মিক দেশ আছে কোন দিনের জন্য? ইরানে বোমা হামলা চালাবার জন্য ইসরাইলকে বিমান চলাচলের করিডর দিচ্ছে, জায়গা করে দিচ্ছে সৌদি আরব। 
ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সাড়ে ২২শ কিলোমিটারের দূরুত্বে ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্রের বাইরে। এখন সৌদি আরবের বদান্যতায়  ইসরাইলি বিমান অতি সহজেই ইরানে বোমা ফেলতে পারবে, ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে পারবে। আমরা ইরানি শিশুদের দেখব ভাঙাচোরা পুতুলের মত মরে পড়ে থাকতে। যেমনটা আমরা দেখেছি প্যালেস্টাইনে, ইরাকে [৩]
এমন আরব জাতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় (!) আমার মাথা নত হয়ে আসে। ইচ্ছা করে নিজেই নিজেকে খুন করে ফেলি...।

*বৈদেশ পর্ব, নয়: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_01.html

সহায়ক লিংক:
১. বৈদেশ পর্ব: সাত: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_3252.html
২. অমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_30.html
৩. সভ্যতা: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_493.html