Saturday, February 6, 2010

বিষবৃক্ষ গাছে জয়তুন ফল ধরে না

আনন্দমোহন কলেজে দুঃসহ ঘটনা, সবাই নীরব শিরোনামে যে খবরটা ছাপা হয়েছে এটা পড়ে চোখের জলে নাকের জলে অনেকের আন্ডারওয়্যার ভিজে যেতে পারে কিন্তু আমাকে খুব একটা প্রভাবিত করে না কারণ এই স্বাভাবিক! এমনটা হবে এ তো আর বিচিত্র কিছু না। আমাদের সন্তানদের আমরা যেমনটা করে বড়ো করছি তারা তেমনটা করেই বড়ো হচ্ছে, এর ব্যত্যয় হবে কেন? লাগাব ধুতুরা গাছ এটায় কী আম ধরবে নাকি? প্রকৃতির নিজস্ব একটা নিয়ম আছে না? অন্যথা হলেই রাগ করে, দুর্দান্ত রাগে তার পিঠে সওয়ার তার সন্তানকে ফেলে দেয়। প্রকৃতি নিয়মের বাইরে যেতে পছন্দ করে না, তাঁর অনন্ত ভ্রমনে থামাথামি নাই।

এর আগের পোস্টে আমি বলেছিলাম আমার এক বন্ধু বলছিলেন, এই দেশের লেখকরা এখন পুতিয়ে গেছেন! আসলে কেবল লেখক না এই দেশের বিবেক নামের জিনিসটা এখন জাদুঘরে রাখার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। প্রায়শ বড়ো অসহায় হয়ে পড়ি- দাঁড়াবার কোন জায়গা নাই! কার কাছে যাই, কোথায় যাই?

তো, আমরা অতি আগ্রহে লাগাচ্ছি বিষবৃক্ষ এটায় কী জয়তুন ফল ধরবে এই আশা নিয়ে আছি বুঝি? এই ছেলেগুলো যে কান্ড করেছে এটার জন্য তো এরা দায়ী না, দায়ী আমরা। ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে যখন হত্যা করা হয়,
একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (তিনি আবার মায়ের জাত) তখন বলেন, "...এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা কোন ব্যাপার না। এমনটি ঘটতেই পারে...।"
তো, আনন্দমোহন কলেজেন এই ঘটনাকে খুব বড়ো করে দেখার অবকাশ কই? পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম ফারুক যদি বলেন, "...এ ঘটনার কথা পরে লোকমুখে শুনেছি। ...কেউ কোন অভিযোগ করেনি।" (প্রথম আলো)
যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমনটা মনে করেন সেখানে এসপি সাহেবের এ কথায় আমরা অবাক হবো কেন?


আচ্ছা, একটা বিষয় আমার জানার খুব ইচ্ছা, কেউ যদি আমাকে খুন করে ফেলে আর আমার পরিবারের বা অন্য কেউ যদি অভিযোগ না করে তাহলে কী পুলিশ আমার হত্যাকারীকে ধরবে না? এসপি সাহেবের কথা শুনে তো মনে হচ্ছে, ধরবে না। আইনের কিলাশে(!) টর্ট আইন আমার খুব আগ্রহের বিষয় ছিল। যতটুকু মনে আছে, কেবল এই কথা বলার জন্য এসপি সাহেবের বিরুদ্ধে টর্ট আইনে মামলা হতে পারে, একজন প্রাণ হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এই আশংকায়।

থাকুক, এইসব আইনের প্যাচাল! আমাদের দেশের বিবেক ওরফে সুশীল সমাজের কথায় আসি। সম্প্রতী ৫জন খুনির ফাঁসি হল। এই নিয়ে কারও দ্বিমতের কিছু নাই- কেউ অন্যায় কররে তাকে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু এই ফাঁসিকে উপলক্ষ করে আমরা যে অন্ধকারের খেলা দেখলাম এটার সঙ্গে কেবল তুলনা চলে হটেনট জাতির সঙ্গে। আমাদের দেশের বিভিন্ন টাইপের মিডিয়া যেটা করেছে এরা ক্রমশ আমাদের ভেতরের পশুটাকে বার করে নিয়ে আসছে। এই জাতি আজীবন এদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে- কারণ আমরা চাই জঙ্গলের আইন, ফিরে যেতে চাই অন্ধকারে।

যে লোকজন লাশের গায়ে থুথু ফেলেছে এদের খুব একটা দোষ দেয়ার কিছু নাই
মন্ত্রীগোছের লোকজন যখন টক-শোতে এই কাজটাকে বাহবা দেন, তাহলে এদের দোষ দেব কেন? আমাদের দেশের লেখালেখি জগতের লোকজন নীরব। কাউকে দেখলাম না এই নিয়ে টুঁ-শব্দ করতে। ৫ খুনির একজন, আর্টিলারী মহিউদ্দিন ফাঁসি দেয়ার সময় অসুস্থ ছিলেন অনেক সূত্র থেকে এটা জানা গেছে। তিনি তাঁর পরিবারের লোকজনকেও বলেছিলেন, "আমি অসুস্থ, আমাকে এখনই ফাঁসি দিবে না।" এই বক্তব্যটা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তাঁর স্বজনদের কাছ থেকে শুনেছি।
জেলকোড অনুযায়ী একজন অসুস্থ মানুষকে কি ফাঁসি দেয়া যায়? কই, কাউকে দেখলাম না এই নিয়ে প্রশ্ন করতে! আমার একজন বন্ধু আরেকটা চমৎকার কথা বলেছেন, আমেরিকায় যেমন ১/ ১১ নিয়ে কোন কথা চলে না তেমনি আমাদের দেশে এদের নিয়ে। এরা পিতৃভূমি নিয়ে, আমরা মাতৃভূমি নিয়ে কস্তাকস্তি করছি।
প্রকারান্তরে আমরা যে এদের মত হয়ে যাচ্ছি এই খোঁজে আমাদের কাজ কী! অন্যকে নগ্ন করতে গিয়ে নিজে দিগম্বর হলে দোষ নাই?

আমার কাছের লোকজন এখন আমাকে নিয়ে সত্রাসে থাকেন (ইতিমধ্যে তাঁদের উদ্বিগ্ন হওয়ার মত কিছু ঘটনা ঘটেছে)। এদের সাফ কথা, আমি যেন এইসব আগুনসম বিষয় নিয়ে লেখালেখি না করি। সবার পেছনে কেউ-না-কেউ, কোন-না-কোন দল আছে, আমার পেছনে কে আছে। যেখানে দেশের শক্তিশালি লেখকদের এই নিয়ে বিকার নাই সেখানে আমার মত ৩ টাকা দামের কলমবাজের এইসব নিয়ে মাতামাতি করার প্রয়োজন কি। এদের কেমন করে বোঝাই একজন মানুষ একবারই মারা যায়- কেউ বিছানায়, কেউ ব্যাটলফীল্ডে। বিচিহারা এবং মাতৃহারা- এদের মত অভাগা আর কেউ নাই!

এঁদের এ কেমন কথা, আমি কী তাহলে এখন থেকে সিনেমার বিজ্ঞাপন লিখব? হা ভাই, আসিতেছে...।
আজিব, যা সত্য তা নিয়ে লিখতে পারব না? বিচিত্র এ দেশ- বিচিত্রসব কান্ড! এখানে হাজার-হাজার রাজনৈতিক মামলার দোহাই দিয়ে কতশত চোর-চোট্টা পার পেয়ে যাচ্ছে অথচ আমাদের দেশের সোনার শ্যূটার আসিফের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা যাচ্ছে না। এই বেচারা অনুশীলন করবে নাকি কোর্টে হাজিরা দেবে? সত্যিই এমন বিচিত্র দেশের দেখা মেলা ভার!

আমি বলছি না ওই খুনিদের শাস্তি দেয়া না হোক। অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে কারণ ৩৮ বছর কেন ৩৮০ বছর পরও রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু লাশের গায়ে থুথু, জুতা মেরে? একজন অসুস্থ মানুষকে ফাঁসি দিয়ে? তাহলে কী আমরা এদের পর্যায়ে নেমে আসব? নাকি এদের ছাড়িয়ে যাব? এই প্রজন্ম এইসব দেখে দেখে বড়ো হচ্ছে, বিভিন্ন উপায়ে এদের ভেতরের পশুটাকে আমরা বার করে নিয়ে আসছি। কতো উপায়েই না! এই দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি মায়া এখন সেল কোম্পানিগুলোর, ঘটা করে আমাদের মগজ ধোলাই করছে এরাই। এফ.এম রেডিও শেখায় বিচিত্র ভাষা, ততোধিক বিচিত্র কর্মকান্ড! একজন প্রফেসর বাথরুম উদ্বোধন করেন, শিক্ষকরাও করেন দলবাজী! শেখাচ্ছে মিডিয়া, কেমন করে উঁচুমাপের লোকজনকে অসম্মান করতে হয়। হরতালের নামে একজন অফিসযাত্রীকে উলঙ্গ করে ফেলা যায় আবার টিভির উপস্থাপকও হওয়া যায়। কতোশত উদাহরণ!

এই প্রজন্ম একেকটা চলমান পশু হবে এ আর নতুন কী!

No comments: