Sunday, August 9, 2009

হায় ঢাকা...

ঢাকায় আমার যে অল্প ক’জন বন্ধু বান্ধব আছে, এরা যতোক্ষণ পর্যন্ত স্বীকার না যান, যে আমাকে স্টেশন থেকে নিয়ে যাবেন, ততোক্ষণ পর্যন্ত আমি ঢাকামুখো হওয়ার কথা কল্পনাও করি না! কাউকে পটাতে পারলে আমার আনন্দ দেখে কে, একেবারে হাত পা ঝাড়া! এদের পিছু পিছু আরামসে ঘুরে বেড়াই... আহ, কি যে শান্তি লাগে! ছোটবেলায় বাবার আঙ্গুল ধরে ঘুরে বেড়ানোর মজা পাই!

ঢাকায় গেলে আমার মনে হয় কোটি-কোটি পিপড়া কি এক কাজে-অকাজে সর্বদা ছুটে বেড়াচ্ছে। অনেকের হাসিতে মনিটরের পর্দা কেঁপে উঠবে, জানি কিন্তু এটাই সত্য; আমার কেবল মনে হয়, এই রে, হারিয়ে গেলাম বুঝি!
তার উপর লোকেশন মনে না থাকার বিষয়ে আমি অতি কুখ্যাত!

লেখালেখির কাজে আজিজ সুপার মার্কেটে আমাকে প্রায়ই যেতে হতো, এখনো যেতে হয়। যার কাছে যেতাম তাঁর অফিস ছিল দোতলায়, যদিও ওঠার জন্য অনেকগুলো সিড়ি আছে কিন্তু মনে রাখার জন্য সব সময় আমি একই সিড়ি ব্যবহার করতাম। সমস্য হতো ওয়াশরুম বা বাথরুমে গেলে, ওই ফ্লোরেই কিন্তু একটু দূরে। এখানকার সব রুমগুলো প্রায় এক রকম হওয়ায়, ফিরে এসে আমি ঠিক চিনতে পারতাম না। পরে ভয়ে আর ওয়াশ রুমে যেতে চাইতাম না।

এখানে প্রুফ দেখার জন্য অনেকক্ষণ থাকা হয়, কাঁহাতক আর ব্লাডারের সঙ্গে যুদ্ধ করা যায়! পরে একটা বুদ্ধি বের করলাম, বাথরুম থেকে ফিরে এসে যে সিড়ি পেতাম সোজা নীচে নেমে যেতাম। তারপর সেই আমার অতি পরিচিত সিড়ি দিয়ে শিষ বাজাতে বাজাতে ফিরে আসতাম। একদিন ধরা খেয়ে গেলাম।
যার কাছে যাই, প্রকাশক, তিনি সিড়ি বেয়ে উঠার সময় আমার পথ আগলে দাঁড়ালেন, বললেন, বিষয়টা কি, গেলেন বাথরুমে, আসলেন নীচে দিয়ে!
আমি কথা ঘুরাবার জন্য বললাম, ইয়ে, মানে, নীচে একটা ইয়ে কেনার ছিল আর কি!
তিনি গলা ফাটিয়ে হেসে বললেন, চালবাজি করেন আমার সঙ্গে, এই নিয়ে আজ আপনাকে তিন দিন এই কান্ড করতে দেখলাম!

লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়, ওই মানুষটার আর বুঝতে বাকী রইল না যে আমার স্মরণশক্তি গোল্ডফিশের সমান। কী লজ্জা-কী লজ্জা, সহৃদয় মানুষটা পরে অবশ্য আমার সঙ্গে অফিসের কাউকে দিয়ে দিতেন! আমি একজনের পিছু পিছু বাথরুমে যাচ্ছি, লজ্জার একশেষ! অনেক বলে-কয়ে আগের নিয়মটাই চালু রাখলাম।
এই সহৃদয় মানুষটা বিদায় দেয়ার সময় নীচ পর্যন্ত কেবল এগিয়েই দিতেন না, রিকশাও ঠিক করে দিতেন। প্রথমেই নিশ্চিত হয়ে নিতেন, রিকশাওয়ালা কমলাপুর স্টেশন ঠিক ঠিক চেনে কিনা! লেখার জগতের এই মানুষটার এ ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না। 

তবে প্রত্যেকবার কঠিন হুমকিও দিতেন, কে বলে আপনাকে ঢাকা আসতে, নেক্সট টাইমে যেন আপনাকে ঢাকায় যেন আর না দেখি!

ঢাকায় আমার থাকার কোন জায়গা নাই অথচ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন নেই যে এমন না
(আমি ঠিক জানি না, মনে হয় এমন, শহুরে লোকজনকে বিব্রত করা ঠিক হবে না) তবুও কেন জানি না কোথাও থাকা হয় না। অথচ অনেক যন্ত্রণা করে রাতের ট্রেনে সারা রাত কাবার করে ফিরেছি, পরের দিন ফেরা যাবে না এমন কোন দিব্যি কেউ দেয়নি, তবুও। কখনও সারারাত কমলাপুর স্টেশনে কাটিয়েছি, আমি নিশ্চিত মশারা সবগুলো দাঁত বের করে বলেছে, এমন গাধামানবকেই তো আমরা খুঁজছিলুম...। মশককুলের মধ্যে নিশ্চই এটা রটিয়ে দেয়া হয়েছিল, এমন ভালোমানুষের ছা আজকাল কোথায়! জানি না এইসব নিয়ে মশক মহোদয়গণ কোন সাহিত্য-ফাহিত্য রচনা করেছিলেন কিনা কিন্তু আমার যে ভারী লোকসান হয়েছে এমনও না।
এখানেই আমি পেয়েছি 'খোদেজা' উপন্যাসের একটা চরিত্র সোহাগকে। এর সঙ্গে পরিচয় না হলে আমি জানতেই পারতাম না এইসব অভাগা শিশুদের অধিকাংশই ড্যান্ডি নামের নেশায় আসক্ত।
এখানেই আমি দেখেছি, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসা শিক্ষিত ছেলেগুলো কেমন করে পত্রিকা বিছিয়ে দিব্যি রাত পার করে দেয়।
তবে মানুষ হিসাবে নিজেকে বড় দীন-হীনও মনে হতো। কী অল্প ক্ষমতা নিয়েই না এসেছি! এই দেশে কী এমন কেউ নাই? এদের জন্য স্টেশনের কাছে একটা ডর্ম খুলবে? যেখানে প্রায় বিনামূল্যে এইসব শিক্ষিত ছেলে-মেয়েগুলো থাকতে পারবে। জটিলতার তো কিছু নাই। যারা চাকরির ইন্টাভিউর কার্ড দেখাতে পারবে তাঁরাই থাকবেন। দস্তরমতো নাম-ঠিকানা, সই-টিপসই যা যা প্রয়োজন রাখা হলো, একটা সফটওয়্যার বানিয়ে ডাটাগুলো রেখে দিলেই হয়। চাকরি পেয়ে পরে এরা সাধ্যমত পরিশোধ করবে। কেউ করবেন, কেউ করবেন না; তাতে কী আসে যায়?
আফসোস, কী একটা চুতিয়া জীবন নিয়েই এসেছি! শালার জীবন, কুতুয়া জীবন, আমি জুতা মারি এমন জীবনের!

মওলানা ভাসানী কর্তৃক স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ঘোষণা

...মহান নেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গতকাল শুক্রবার ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মরণপণ সংগ্রামের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা করিয়াছেন। 
এই জনসভায় ভাষণ দানকালে তিনি জনগণকে সকল ভীরুতা-জড়তা ত্যাগ করে উক্ত সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।

মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তানের এই দাবী আইনসঙ্গত- এই সংগ্রামও আইনসঙ্গত। এটি নিছক হুমকির বা চাপ সৃষ্টির আন্দোলন নয়; স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তানের এই সংগ্রামের প্রতি এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার শান্তিকামী ও মুক্তিকামী জনগণের পূর্ণ নৈতিক সমর্থন থাকবে।’

এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম জীবন-মরণের সংগ্রাম। পূর্ব পাকিস্তানের ১৪ লক্ষ মানুষ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ দিয়েছে। আমাদের সংগ্রামের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা হলে আরও ১৫/২০ লাখ লোক জীবন দিয়ে হয় অভীষ্ট সিদ্ধ করবে, না হয় মৃত্যু বরণ করবো।’

মওলানা বলেন, ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান বন্ধ করার জন্য কোন সৈন্য দেওয়া হয় নাই। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান বললে যদি সৈন্য নিয়োগ করা হয়, তাহলে বিরাট ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।’

ইতিহাসের নজীরবিহীন প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলায় বিধ্বস্ত পূর্ব বাংলায় লক্ষ লক্ষ মৃতদেহের উপরে দাঁড়িয়ে যারা নির্বচনী প্রচারণার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে চলেছে তাদের সম্পর্ক-এ মওলানা ভাসানী বলেন, ‘তাঁদের ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে চাই না, তারা নিজেরোই বলুন যে তারা জনতার শত্রু না মিত্র।’

‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে’ শরিক হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নব্বই বছরের বৃদ্ধ জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, ‘মুজিব, তুমি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সংগ্রামে যোগ দাও। যদি আমেরিকা ও ইয়াহিয়ার স্বার্থ-এ কাজ কর তাহলে আওয়ামী লীগের কবর ’৭০ সালে অনিবার্য। ...।'

এই প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানী আরও বলেন, ‘যারা বলে নির্বাচনে শতকরা একশটি আসনে জয়ী হয়ে প্রমাণ করবে জনতা তাদের পেছনে রয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের মতের মিল নেই। দক্ষিণ ভিয়েতনামে দেশপ্রেমিক গেরিলারা যখন লড়াই করেছে তখনও সংগ্রামের মুখে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু তার দ্বারা একথা প্রমাণ হয়নি যে নির্বাচনে বিজয়ীরা জনগণের বন্ধু। বরং তারা সাম্রাজ্যবাদ ও স্বৈরাচারের তল্পীবাহক।’

মওলানা ভাসানী বলেন, ‘শুধু শ্লোগানে সংগ্রাম হয় না। হয় মরে যাব, নয়তো সার্বভৌমত্ব পাব এই কি আপনারা চান? বিবেকের কাছে জিজ্ঞেস করুন। যদি কোরবানী দিতে প্রস্তুত থাকেন তবে হাত তুলুন।’
জনতা মুহুমূহু শ্লোগানের সাথে হাত তোলেন। মওলানা ভাসানী তখন নিজেই শ্লোগান দেন, নারায়ে ‌'তকবীর-আল্লাহু আকবর’ ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান-জিন্দাবাদ’। 

সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ কণ্ঠ থেকে তাদের প্রিয় নেতার শ্লোগান প্রতিধ্বনি ভেসে আসে।...’।"

(সূত্র: বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র দ্বিতীয় খন্ড)

*আমাদেরকে এটা প্রতি পদে পদে শেখানো হয়, দেশের সেরা সন্তানদেরদের কত প্রকারে নিচু-অসম্মান করা যায়। অতি উঁচু শ্রেণীর (এদের দাবী মোতাবেক) প্রিন্ট মিডিয়া মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকীর খবরটা ছাপিয়েছে বিজ্ঞপ্তি আকারে। এই লজ্জা লুকাই কেমন করে আসলে কাপড় পরলেই মানুষ হটেনড জাতি থেকে সভ্য জাতি হয়ে যায় না!


সহায়ক সূত্র
১. প্রথম আলো: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_17.html

**হুবহু-অবিকল, প্রতিটা অক্ষর আবু জুবায়ের নামের একজন, একটা ওয়েবসাইটে কপি-পেস্ট করে দিয়েছেন।
যেখানে প্রথম আলোর মত পত্রিকা ওয়েবসাইট থেকে একটা লেখা নিয়ে 'ওয়েবসাইট অবলম্বনে' লিখে দায় সারে সেখানে এই মানুষটাকে কী আর বলব! তবে সোর্স উল্লেখ করলে আকাশ ভেঙ্গে পড়ত বলে আমার মনে হয় না। এ অন্যায়!

গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, গরীব মানুষ নামের নিক, ব্লগারের প্রতি যিনি এই বিষয়টা উল্লেখ করায় আমারও জানা হলো।