Search

Friday, November 14, 2014

বড় লোভ হে...।

‘আমাদের ইশকুল’ গুটিগুটি পায়ে প্রায় পাঁচ বছরে পড়ল। ২০১০ সালের শুরুতে আমি এবং আমার এক বন্ধু, শুরু হয় এই স্কুলের যাত্রা। করতে চেয়েছিলাম বৃদ্ধাশ্রম। করতে না-পেয়ে শুরু করেছিলাম স্কুল। তখন একসঙ্গে তিনটা স্কুলের কাজ চলত। একটা হরিজনপল্লী যেটার চালু নাম মেথরপট্টি সেখানকার শিশুদের জন্য। অন্যটা ছিল চোখে দেখতে পান না সেইসব মানুষদের সন্তানদের জন্য এবং তৃতীয়টা ছিল স্টেশনের শিশুদের জন্য যাদের অধিকাংশই ছিল পিতা-মাতাহীন।

স্কুলগুলো পরিচালনার জন্য অর্থের যোগানের ব্যবস্থা করতেন তিনি মানে আমার বন্ধু আর অন্য সমস্ত কাজ দেখার দায়িত্ব ছিল আমার। এক বছরের মাথায় কোনও প্রকার আগাম সতর্কতা না-দিয়েই তিনি অর্থের যোগান বন্ধ করে দিলেন। হয়তো কোনও প্রকারের সীমাবদ্ধতা হবে কিন্তু আমাকে না-জানানোটা মোটেও ভাল কাজ হয়নি! আমি পড়লাম পানিতে। এখন কী করি, কোথায় যাই কার কাছে যাই? তিন তিনটা স্কুলের তিনজন টিচারের সম্মানী, তিন তিনটা ঘর ভাড়া তো চাট্টিখানি কথা না আমার জন্য। তখন আবার আমার মাথার উপর বিপদ, ভীষণ বিপদ। বহুজাতিক এক কোম্পানির সঙ্গে লড়াই শুরু করেছি মাত্র। অসম এক লড়াই- যেটা কেবল আমার মত বোকা মানুষের পক্ষেই সম্ভব। গুলতি নিয়ে ডায়নোসরের বিরুদ্ধে লড়াই। আসলে আমি ওই বহুজাতিক কোম্পানিকে বোঝতে চেয়েছিলাম, শ্লা, তোমরা ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি না আর আমিও ব্লাডি নেটিভ না। দিস ইজ মাই ল্যান্ড, নো কাউবয় রাইডস হিয়ার।

আমার তখন টাকা-পয়সার বড়ো টানাটানি। কী কষ্টের সেইসব দিন- আহ, একেকটা দিন! এহেন অবস্থায় মাথায় চা চামচের এক চামচ ঘিলু থাকলে আমার যেটা করা প্রয়োজন ছিল সেটা হচ্ছে অতি দ্রুত স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া। পরিচিত লোকজনেরা জানেন ঘিলু জিনিসটা আমার নাই। তবে যেটা অনেকে জানেন না সেটা হচ্ছে মানুষটা আমি বড়ো ‘জিদ্দি’ টাইপের। আমি হাল ছাড়লাম না। আমার অপার সৌভাগ্য আমার কিছু সুহৃদ বিভিন্ন সময়ে এগিয়ে এসেছিলেন। এঁদের নাম প্রকাশ করলে এঁরা ভারী বিরক্ত হন বিধায় সেপথ মাড়ালাম না। খামাখা পাগল ক্ষেপিয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ না। আজ এবেলা তাঁদের প্রতি গভীর প্রকাশ করি। পেছনের এই হৃদয়বান মানুষগুলো কেবল ছায়াই হয়ে থাকেন। এ যে অন্যায়, বড়ো অন্যায়!

পরে অবশ্য কৌশল খানিকটা পরিবর্তন করলাম। একেক জায়গার নির্দিষ্ট সময়ে ওখানকার শিশুদেরকে ন্যূনতম শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা। তো, চার নম্বর যে স্কুলটা- যেখানে স্কুলটা চলছিল ওখানকার কাজ শেষ হলো কিন্তু স্কুলটা স্থানান্তর করা যাচ্ছিল না। আমি খুব প্রয়োজন বোধ করছিলাম স্টেশনের কাছাকাছি নতুন স্কুলটা খুলতে কিন্তু জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। রেলওয়ের কতশত জায়গা লোকজনেরা দখল করে রেখেছে অথচ বৈধ কোনও পন্থায় দশ ফিট বাই দশ ফিট একটা ঘরও পাওয়া গেল না!
অবশেষে স্টেশনের কাছে যেটা পাওয়া গেল নড়বড়ে আহামরি কিছু না সেটার জন্য আবার একগাদা টাকা সেলামিও দেওয়া লাগল। তবুও আমার আনন্দের শেষ নেই কারণ ফি-রোজ স্টেশনের চক্কর লাগাবার কারণে আমি এখানকার শিশুদেরকে নিজের হাতের তালুর মত চিনি। কে ড্যান্ডিতে আসক্ত, কার বাপ-মা নেই বিশদ জানার বাকী নেই। এদের সঙ্গে কাজ করাটা যে কতটা জরুরি সেটা বুঝতাম বলেই এখানে স্কুল করার কাতরতা প্রবল ছিল। এখানকার শিশুরা কেউ নিয়মিত ক্লাশ না-করলেও কেবল একদিনের জন্য কাউকে পেলেও কম না। মাথায় যতটা নাড়া দেওয়া যায় আর কী!

কিন্তু শুরুতেই আমি বিপত্তিতে পড়লাম স্কুলের জন্য যে ঘরটা নেওয়া হয়েছিল স্টেশনের শিশুদের জন্য যথেষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল কিন্তু জায়গার টানাটানি! স্টেশনের এই বাচ্চাগুলো পড়তে এতোটা আগ্রহ দেখাবে এটা আমার জন্য অনেকখানি অবাক হওয়ার মত। অবশ্য এখানে এরা যে কেবল পড়তে আসে এমন না, নিয়ম অনুযায়ী পড়ার আগে আধ-ঘন্টা খেলাও।

একজন রাখালবালক থেকে ড. আতিউর রহমান হতে পারলে আমি কেন এই স্বপ্ন দেখব না এই শিশুগুলোর মধ্যে থেকে কেউ একজন বের হয়েআসবে? বড় লোভ হে, বড় লোভ...।

* ’বড় লোভ হে’, কথাটা নাজমুল আলবাবের কাছ থেকে ধার করা। তিনি কোত্থেকে ধার করেছেন এটা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি!

Thursday, November 13, 2014

চুতিয়া কখনই মানুষ হয় না!

হালে একজন আমার সঙ্গে না-হক রাগারাগি করলেন। তিনি একদা একটা ওয়েব-সাইটে লেখার জন্য বলেছিলেন। তখন আমি সবিনয়ে না করেছিলাম। এবং এটাও বলেছিলাম, 'ভাইরে, আমি তো আমার নিজের ওয়েব-সাইট ব্যতীত অন্য কোথাও লিখি না'।
সবটা তখন মানুষটাকে বলা হয়নি যে কেন লিখি না। এ বিষয়ে অতীত অভিজ্ঞতা আমার খু্বই তিক্ত। লোকজনের সঙ্গে আমার বনিবনা হয় না। দলবাজী, দলাদলি জিনিসটা আমার একেবারেই পছন্দ না। এদিকে এই সমস্ত কর্মকান্ড না-করলে অনেকের আবার পেটের ভাত আস্ত চাউল হয়ে পড়ে। বড়ই সমস্যা! তো, এই নিয়ে কারও সঙ্গে কুতর্কে না-জড়িয়ে সানন্দে স্বীকার করে নেই বাপু রে, সমস্যাটা আমার নিজের মধ্যেই। 'খুশ'! তবুও জগতের সবাই সুখী হোক। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েই পড়ে। নিঃসঙ্গ সারথি- ব্যাটলফিল্ডে একা‍, অরক্ষিত! অন্য একটা ছোট্ উদাহরণ দেই । 

একটা ওয়েব-সাইটে বাংলায় যখন প্রথম লেখালেখির সুযোগ এলো (সেটা ২০০৫ সালের কথা) সেখানে 'শুভ' নামে আমি চুটিয়ে লেখালেখি করা শুরু করলাম। অন্য লেখার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সেখানে আমার শত-শত লেখা ছিল। ওই সাইটের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার মতের মিল না-হওয়ার ওখান থেকে লম্বা দিলাম। নিজের সাইটে লেখা শুরু করলাম। জনৈক চোদরি সাহাব (ইনিও ওখানে আমার সঙ্গে 'ল্যাকতেন')।

চোদরি সাহাব যখন মুক্তিযুদ্ধের ব্লগ ইতিহাস লিখলেন তখন পাশের বাড়ির জরিনার নামও নিলেন কিন্তু সেখানকার কোনও প্রসঙ্গেই 'শুভ' নামটা লিখলেন না। অনেকে বলবেন, বেচারা বাম থেকে ভাম হয়ে মস্তিষ্ক জ্যাম হয়ে গেছে। তা হওয়াটা বিচিত্র না কারণ দেশের গাওয়া ঘিয়ের বদলে বৈদেশের পুরু বাটার খেয়ে মস্তিষ্কে চর্বি জমাটা অস্বাভাবিক কিছু না। অথচ আমার অসংখ্য লেখায় এই 'ভদ্দনোকের' সহৃদয় মন্তব্য ছিল। সবগুলোর প্রিন্ট-আউটই আমার কাছে এখনও বর্তমান। তা, তিনি কেন এমনটা করলেন? কারণ আমি যে তাদের দলের কেউ নই। এদের ভাবখানা এমন, স্যারদের কাছ থেকে সনদ না-নিলে সবই বৃথা। বেচারা আমি আর কী করি, নিজেই লিখে মনিটরে পা তুলে নিজের লেখা আয়েশ করে পড়ি। ইশ-শ, যদি চোদরি সাহাবদের দলে থাকতুম তাহলে ফাটিয়ে ফেলতুম। 

যাই হোক, প্রসঙ্গ থেকে সরে এসেছি। তো, রাগারাগি করা মানুষটা একটা লিংক আমাকে ধরিয়ে দিলেন। ওই লিংক ধরে http://www.bengalinews24.com/opinion-bangla/2013/07/13/10601 -এ গিয়ে আমি তো হাঁ! অ আল্লা, মানুষটা তো ঠিকই বলেছেন। এখানে তো দেখতে পাচ্ছি ব্যাটা আলী মাহমেদ ঝাঁপিয়ে পড়ে লিখছে কিন্তু আমি যে বিন্দুবিসর্গও জানি না! bengalinews24.com- এখন এই একটা ঢং হয়েছে সব কিছুর মধ্যে 'টোয়েনন্টি ফোর' লাগিয়ে দাও। অবশ্য্ এরা 'টোয়েনন্টি ফোর'-এর স্থলে 'ফোর টোয়ান্টি' লাগালে ভাল করতেন- মানাত বেশ। ওরে, এখানে তো অনেক 'লুকজন' দেখতে পাচ্ছি!
[অ্যাডভাইজার: দেওয়ান নজরুল, এডিটর: পারভেজ খান, হেড অবস্ট্রাটেজি: কর্ণেল আমিনুল হক (অব:), ম্যানেজিং এডিটর: শাহ আরিফ বিন হাবিব, ম্যানেজিং এডিটর (ইংলিশ) আবদুল্লাহ আল মুরাদ, কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স এডিটর: শামীম বিল্লাহ, ফটো এডিটর: মেজর হামীম চৌধুরী (অব:)]
ওয়াল্লা, এখানে দিকি দুইজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর লোকও আছে! একজন তো আবার 'হেড অবস্ট্রাটেজি'! কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে, এরা আমার লেখা ছেপেছেন, এই আনন্দ কোথায় রাখি? দাঁড়ি-কমাসহ এরা হুবহু লেখাটা ছাপিয়ে দিয়েছেন, কিছুই বাদ পড়েনি- তসলিমার ছবি ব্যতীত। আহা, তসলিমার ছবি তোলার সুযোগ কোথায় আমার! 

তা, বেশ-বেশ। কিন্তু এই আমিই যে আমার সাইটে স্পষ্ট করে লিখে রেখেছি, "আমার লিখিত অনুমতি ব্যতীত আমার কোনও লেখা কোনও মাধ্যমেই প্রকাশ করা যাবে না"। লেখার অংশবিশেষ হলে না-হয় কথা ছিল না, কিন্তু দাঁড়ি-কমাসহ...। এখন আমার কী হবে গো? আনন্দে লাফালাফি করার সুযোগ কোথায় আমার? বিষাদের সঙ্গে বলতেই হয়, bengalinews24.com-কে চোর বলছি না অবশ্য, কারণ এরা দয়া করে আমার নামটা যে রেখেছেন। কিন্তু চুতিয়া না-বললে অন্যায় হয়...।

Wednesday, November 12, 2014

“ফান্দে পড়িয়া বগা...।”

আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা হয় যেখানে দেবতাও কোন ছার! এই সব করে-করে আমাদের এই অতি গৌরবের জায়গাটা এই প্রজন্মের কাছে কালে কালে হাস্যকর হয়ে পড়ে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই: 
একজন মুক্তিযাদ্ধাকে নিয়ে কাজ করার সুবাদে তাঁর সম্বন্ধে আমার প্রচুর জানা হলো। যেটা জানা হয়নি সেটা জেনেছিলাম পত্রিকা পড়ে। পত্রিকা বলে কথা! যেটা আমি জানতে পারিনি সেটা আমি পত্রিকায় পড়লাম, কি পড়লাম? ওই ভদ্রলোককে নিয়ে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ দুর্ধর্ষ এক লেখা ছাপল, ইনি নাকি যুদ্ধের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন বোনাস হিসাবে হাবিজাবি আরও অনেক কিছু। ইত্তেফাক জানাল, ১৯৭১ সালে তিনি পড়াশোনা ফেলে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। অথচ এই ভদ্রলোক নিরক্ষর [১]। নিরক্ষর একজন মানুষ মুক্তিযোদ্ধা হলে সমস্যা কোথায়? কারও কোনও সমস্যা নেই। সমস্যা মিডিয়ার। সত্যের সঙ্গে বিস্তর কল্পনা না-মেশালে এদের বাথরুমে সমস্যা হয়। বাথরুম তখন হলুদ না-হয়ে কালো হয়। আসলে হলুদ জিনিসটা মিডিয়া দেখতে পারে না কারণ হলুদের সঙ্গে মিশে আছে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’। 

প্রথম আলো কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়ের পরই তড়িঘড়ি করে ছাপাল, “...সোহাগপুরের বিধবারা...”। এরা বিধবাদের যে ছবি ছাপিয়েছে এটা যে আয়োজন করে, অনেক দু-নম্বুরি করে তোলা ছবি এটা একটা শিশুরও অবোধ্য থাকার কথা না। এই ফটোসেশন করতে গিয়ে যে এরা বিস্তর পরিশ্রম করেছে এটা বোঝার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হওয়া লাগে না। সবাইকে জড়ো করেছে, একই রঙের শাড়ি পরিয়েছে তারপর দেশবাসীর কাছে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একই রঙের শাড়ির শানে-নযুল কী! এমনটা না-করলে কী সমস্যা ছিল! কোনও সমস্যা ছিল না বরং এটা করতে গিয়ে এদের এই প্রতিবেদনের উপর ভরসা করতে ভরসা হয় না।
ছবি ঋণ: প্রথম আলো
প্রথম আলোর এই কর্মকান্ডকে আমার কাছে মনে হয়েছে স্রেফ একটা চরম অপদার্থগিরি। এরা ওই গ্রামের সহজ-সরল বয়স্ক মানুষদের নিয়ে যে আচরণটা করেছে এটা স্রেফ একটা কদর্য আচরণ। ছোটলোকের আচরণ! একটা অন্যায়, বিকট অন্যায়।
গ্রামের সহজ-সরল এই বয়স্ক মানুষদেরকে না-হক দোষ দিয়ে লাভ নেই কারণ প্রথম আলো এমন হলুদ সাংবাদিকতা যে এবারই করেছে এমন না। এবং এতে সানন্দে যোগ দেন ঝুলেপড়া গোঁফ এবং ঝুলেপড়া ইয়ের... আমাদের দেশের বুদ্ধিবাজ মহোদয়গণ। এমন অজস্র উদাহরণ আছে। আমি কেবল একটা উদাহরণ দেই। শপথবাজির খেলা দেখাতে গিয়ে এরা শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে আমাদেরকে বোকা বানিয়েছ [২]

প্রথম আলো গংদের ধারণা পাঠক তাদের ব্রেন এদের আপিসে জমা রেখে পত্রিকা পড়তে বসে! ভাবখানা এমন, এরা চামুচে করে আলকাতরা খাওয়ালে পাঠক সেটাও বিমল আনন্দে চপচপ করে খাবে! প্রথম আলো তাদের ওয়েব ভার্সান পত্রিকায় এই প্রতিবেদনটা ছাপালে, “কামারুজ্জামানের ফাঁসি দ্রুত কার্যকর চান সোহাগপুরের বিধবারা” (http://m.prothom-alo.com/bangladesh/article/362062 ) সেখানে পাঠক এদের পছন্দমতই মন্তব্য করেছেন কিন্তু এই প্রতিবেদনটাই ফেসবুকে শেয়ার করার পর ( https://m.facebook.com/DailyProthomAlo/photos/a.215619841804443.61850.163059227060505/874860285880392/ ) পাঠক নির্দয় ধোপার ভঙ্গিতে আচ্ছা করে ধুয়েছেন (মন্তব্য দ্রষ্টব্য)- সাবান, সোডা কোনটারই কমতি ছিল না।

মুক্তিযুদ্ধ এখন অনেকের কাছে একটা ব্যবসা, স্রেফ ব্যবসা। আসল মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ একেক করে দেহত্যাগ করছেন। আফসোস, এঁরা মরেও শান্তি পাবেন না। এটা অনুমান করাটা দোষের হবে না, মাটি খুঁড়ে এদের লাশ উধাও হয়ে যাবে। একদা এদের হাড়গোড় নিয়েও চমৎকার ব্যবসা হবে। 

১. http://www.ali-mahmed.com/2011/03/blog-post_26.html
২. http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_03.html

Tuesday, November 4, 2014

দ্বিতীয় নয়ন


Sunday, October 26, 2014

পারিজাত!

রিমাকে নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম [১] ওখানে এটা উল্লেখ করা হয়নি পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে কেবল এর পক্ষে হাঁটাই যে অসম্ভব এটুকুই না, এর বুদ্ধির বিকাশও হয়নি! যাদেরকে আমার ভাষায় বলি, ‘ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, ভালবাসার সন্তান’।

এই মেয়েটির জন্য দুইজন সহৃদয় মানুষ মমতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। এঁদেরকে বিস্তর অনুরোধ করেও নাম লেখার অনুমতি পাওয়া গেল না। এই মানুষদের প্রতি কেমন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় আমি জানি না, জানা থাকলে ভাল হতো।
যাই হোক, এই দুজন মানুষের অপার মমতার কারণে রিমার জন্য এখানে-ওখানে যাওয়ার এক স্বাধীনতা চলে এলো। আধুনিক মানুষরা যার নাম দিয়েছে, হুইলচেয়ার। এঁদের কল্যাণে কেবল যে একটা চকচকে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থাই হলো না, এই টাকায় রিমার জন্য দিব্যি হয়ে যায় কাপড়, খেলনা, রঙ করার পেন্সিল হাবিজাবি এটা-সেটা।
বারবার আমি যেটা বলি, আমি চোখে যে দৃশ্যগুলো দেখি এটা অন্যদেরকে দেখাই কেমন করে? এই দূর্লভ মুহূর্ত দেখাতে যে বড়ো সাধ জাগে। কিন্তু আহা, সেটা অতি সামান্যতমও ধরে রাখার ক্ষমতা ক্যামেরা নামের যন্ত্রের কোথায়?
রিমা নামের মেয়েটিকে হুইলচেয়ারে তার মা বসিয়ে দেওয়ার পর মনে হলো আমি যেন দেখছি পারিজাত-স্বর্গের একটা ফুলকে! তার কথা না-বলতে পারার ক্ষমতা যেটা পুষিয়ে দেওয়া হয়েছে তার হাসি দিয়ে। তার এই উচ্ছ্বাস, অতল আনন্দ কোন নিতল থেকে উঠে আসে কে জানে...!

১. মমতার দাবী...: http://www.ali-mahmed.com/2014/10/blog-post_22.html 

Friday, October 24, 2014

রক্তের দাগ শুকিয়ে যায়, মুছে যায় না।

গতকাল গোলাম আযমের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের মধ্যে এক ধরনের হাহাকার কাজ করেছিল, কেন তার মৃত্যুদন্ড হয়নি। আদালত বয়সের কারণে তাকে মৃত্যুদন্ড না-দিয়ে ৯০ বছরের কারাদন্ড দেন। এই রায় নিয়ে আমার নিজেরও অমত আছে। যদি এমন হত তার কৃত অপরাধগুলো মৃত্যুদন্ড পাওয়ার উপযুক্ত না তাহলে বিষয়টা ভিন্ন ছিল। কিন্তু এখানে তার বয়সটা বিবেচ্য হয়েছে। এমনিতে আমাদের দেশে একজন বয়স্ক মানুষ মৃত্যুদন্ড পাওয়ার মত জঘণ্য অপরাধ করলেও তিনি কী পার পেয়ে যাবেন? এটাই যদি আইনের কথা হয় তাহলে তো আর কথা চলে না।

গোলাম আযম অপরাধী হিসাবে দন্ডিত হওয়ার পর ১১০০ দিন কারাগারের পরিবর্তে হাসপাতালে কাটিয়েছেন। তিনি এমন কী অসুখে ভুগছিলেন যে তাকে ১১০০ দিনই হাসপাতালে রাখতে হলো? অন্য কয়েদির বেলায়ও কী এমনটাই ঘটে বা ঘটবে? উত্তরটা না-হয়ে থাকলে এখানে আইনের প্রয়োগে তারতম্য হয়েছে এমনটাই প্রতীয়মান হয়। এও এক ধরনের অন্যায়। আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা! এমন ব্যবস্থা একটা জাতির জন্য বাজে একটা উদাহরণ হিসাবে রয়ে গেল। 

অবশ্য গোলাম আযম মৃত্যুবরণ করেছেন একজন অপরাধী হিসাবে এটাও কিন্তু কম না। আমি যেটা বারবার বলি, রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না। এটাও একটা স্বস্তির কারণ মৃত্যুর পূর্বেই গোলাম আজম নিরপরাধ রূপে পার পেয়ে যাননি। এটাও কিন্তু কম পাওয়া না। আমি এটাকে একটা বিজয় হিসাবেই দেখি।

আজ ২০১৪ সালে এসে যেটা অতি সহজ মনে হয়, পূর্বে এতোটা সহজ কিন্তু ছিল না। ২০০৫-৬ সালের কথা বলি। তখন আমরা যারা ওয়েব সাইটে লেখালেখি করতাম তাদের কাছে বিষয়টা অতি দুরূহ ছিল। এক সময় তো দেখতে দেখতে কৃষিমন্ত্রী পরে শিল্পমন্ত্রী মতিউর নিজামীর গাড়িতে পতপত করে উড়তে শুরু করে আমাদের জাতীয় পতাকা! এদিকে তখন ওয়েবে এই সংক্রান্ত তেমন কোনও তথ্যই নেই। বিশেষ করে বাংলায়। হাতের নাগালে উল্লেখযোগ্য বই-পুস্তকও নেই। যাও আছে আগুনদাম, থাকলেও এর-ওর কাছে ছাড়া-ছাড়া ভাবে। যার কাছে যেটা আছে সেটা নিয়েই অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে লেখা শুরু করলেন।

তখন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দলিল আমার মত সাধারণ মানুষদের কাছে সহজলভ্য ছিল না। একটা লাইব্রেরিতে পাওয়া গেল জরাজীর্ণ অবস্থায়, পাতাগুলো ঝুরঝুরে! আমার মনে আছে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দলিল তখন ১৫০০০ হাজার পৃষ্ঠা ফটোকপি করেছিলাম। যেটা আমার কাছে এখনও আছে। তো, শুরু হলো ওখান থেকে এবং বিভিন্ন পেপার কাটিং স্ক্যান করে কপি-পেস্ট। লেখার-পর-লেখা।

সবাই যখন ঘুমুতে যায় আমি তখন বগলে করে একগাদা ফটোকপি নিয়ে আমার অফিসের কম্পিউটারের সামনে বসি। আহ, আমার সেই ‘জুতাখাওয়া’ কম্পিউটার (সেই কম্পিউটারকে কতবার চটি দিয়ে পিটিয়েছি তার ইয়াত্তা নাই, তবুও লাভ হয়নি!)! অথচ তখন লেখালেখির জন্য ৩৮৬ মেশিনকে ৪৮৬ মেশিনে আপগ্রেড করেছি কারণ ৩৮৬ মেশিনটা কেমন দুর্ধর্ষ ছিল খানিকটা বলি, ওটার হার্ড ডিস্ক ছিল ১০০ মেগাবাইটের! তাছাড়া ইন্টারনেট কানেকশনও অফিসে। টিএনটির ডায়াল-আপ লাইন। ধীর গতি কাহাকে বলে কত প্রকার ও কি কি! কখনও কম্পিউটার ঘুমিয়ে পড়ে কখনও-বা আমি।

কখন যে ভোর হয় তার হিসাব কে রাখে! কালে কালে হয়ে গেলাম ‘নিশাচর ড্রাকুলা’। প্রায়শ আমার মা ক্ষেপে গিয়ে বলতেন, ‘তুই আমার বাড়ি থিক্যা বাইর হ’। ভদ্রমহিলার হাজবেন্ডের বাড়ি বের করে দিলে তাঁকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। তাই আমি সুবোধ বালকের মত মাথা নেড়ে বলতাম, আচ্ছা, আর রাত হবে না। কীসের কী, তিনি ঘুমিয়ে পড়ামাত্র আমি যথারীতি যেই কে সেই! ‘নিশাচর ড্রাকুলা’!

সেই সময় খুব চালু একটা প্রতিরোধ ছিল। গোলাম আজমকে যে আপনারা অপরাধী বলছেন প্রমাণ কি, কেউ কি দেখেছে? তখন ২০০৬ সালে আমার অনেক লেখার একটা ছিল, ‘গোলাম আযমের চোখে, মুক্তিযুদ্ধ’ [১]
সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল গোলাম আযম ১৯৭১ সালে বলেছিলেন, “...বাংলাদেশ নামের কিছু হলে আমি আত্মহত্যা করবো...”
নিয়তির এ এক চরম পরিহাস, সেই গোলাম আযমকে মৃত্যুবরণ করতে হলো বংলাদেশে! এবং তিনি কখনই তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করেননি বা এই দেশের কাছে ক্ষমা চাননি। তাতে কিছুই যায় আসে না। রক্তের দাগ শুকিয়ে যায় কিন্তু মুছে যায় না। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এটা সত্য কিন্তু তিনি যে একজন অপরাধী ছিলেন এটা রাবার দিয়ে ঘসে মুছে ফেলা যাবে না।

১. http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_29.html

Thursday, October 23, 2014

নিছক দুর্ঘটনা।

এতটা কাল আমরা জেনে এসেছি লিমন এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী! অনেকটা এমনই মনে হয়েছিল তখন, প্রশাসনযন্ত্র, দেশের সমস্ত অস্ত্র লিমনের দিকে তাক করা। এমন একজন শক্তিশালী মানুষকে সমীহ না-করার কোনও কারণ দেখি না। তাই আমি এক লেখায় লিখেছিলাম, ‘কদমবুসি করার জন্য লিমনের এক পা-ই যথেষ্ঠ' [১]!

সম্প্রতি মাননীয় আদালত সব ধরনের অভিযোগ থেকে লিমনকে অব্যহতি দেন। আজ পত্রিকায় পড়ছি, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, “সাড়ে তিন বছর আগে লিমনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষযটি ছিল ‘নিছক দুর্ঘটনা’। ...একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে এই অ্যাক্সিডেন্টটি হয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে গুলিটি লিমনের পায়ে লেগে যায়। এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা”। (বিডিনিউজ এর বরাত দিয়ে এটা উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ প্রতিদিন ২৩ অক্টোবর, ২০১৪)

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই যে তিনি স্বীকার করেছেন লিমনের পায়ে যে র‌্যাব সদস্যরা গুলি করেছিল এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা। অবশ্য আমরা এই কুতর্কে যাব না যে মাননীয় আদালত লিমনকে অব্যাহতি দেওয়ার পর লিমনকে এখন আর সন্ত্রাসী বলার উপায় নেই। বললে সেটা আদালত অবমাননার আওতায় পড়ে।
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতের মান রেখেছেন বলে তিনি একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন। ধন্যবাদপর্ব শেষ হলে আমি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সবিনয়ে জনতে চাই, বেশ-বেশ, এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা ছিল আমরা না-হয় আপনার সঙ্গে একমত হলুম। তবে...? সেটা হচ্ছে, কেউ কার্ও এক পা উড়িয়ে দিয়ে আহা, এটা তো দুর্ঘটনা বলে পার পেয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। কেউ দুর্ঘটনাক্রমে কাউকে গাড়ি চাপা দিল বা ছাদ থেকে দুর্ঘটনাক্রমে নির্মাণসামগ্রী ফেলে কাউকে নীচ থেকে উপরে পাঠিয়ে দিল ব্যস, এটা নিছক দুর্ঘটনা বলে ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য দুর্ঘটনা ফ্রন্ট’।

তারপরও একটা কিন্তু, একটা কিন্তু রয়ে যায়! ভুলক্রমে গুলি করে লিটনের পা উড়িয়ে দেওয়ার পর র‌্যাব বুঝতে পারল এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা কিন্তু এরপর যে র‌্যাব লিটনকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে লিটনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে একটি অস্ত্র আইনে এবং অন্যটি সরকারী কাজে বাধা দেওয়ার জন্য। সাড়ে তিন বছর ধরে মামলা চলার পর আদালত গত বছর ২৯ জুলাই লিমনকে অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলা থেকে অব্যহতি দেন এবং এ বছর (২০১৪) ১৬ অক্টোবর সরকারী কাজে বাধা দেওয়ার জন্য দায়েরকৃত মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। এই যে দু-দুটি মামলা করেছিল র‌্যাব, সেটাও কী নিছক দুর্ঘটনা?

১. কদমবুসি করার জন্য লিমনের এক পা-ই যথেষ্ঠ : http://www.ali-mahmed.com/2011/05/blog-post_22.html

Wednesday, October 22, 2014

মমতার দাবী, বড় জোর দাবী!

রাধানগর স্কুলের হেড-টিচার জাকির হোসেন যখন বললেন, ‘একটা হুইল-চেয়ার যে দেওয়া লাগে’, তখন বিরক্তিতে মনটা ছেয়ে গেল। কারণ বলার পরও এরা বুঝতে চান না যে হুইল চেয়ারের কারখানা আমার কাছে নাই। কিছু সদাশয় মানুষ আমার অশক্ত হাত শক্ত করে মমতায় ধরেন, নইলে আমি কোত্থেকে দেব!

এই মানুষটার কাছে স্কুল বিষয়ে আমি কৃতজ্ঞ বিধায় মুখের উপর না বলতে সংকোচ হয়। নিরুপায় আমি, আজ-কাল করে জাকির হোসেন নামের মানুষটাকে লাটিমের মত ঘুরাই। মনে মনে বলি, আরে, এই লোক হলো মাস্টার মানুষ, কেউ একজন বলল এইটা দরকার আর তিনিও মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুট লাগালেন। কিন্তু সদা হাস্যময় মাস্টার মানুষটা যে কচ্ছপমানব এটা আমার জানা ছিল না। তিনি ঠিকই কামড় দিয়ে পড়ে রইলেন।

আজ মানুষটার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে রওয়ানা হলাম। হা ইশ্বর! আমার এই অহেতুক বিলম্বের জন্য কার কাছে ক্ষমা চাইব? হুড়মুড় করে পড়ে যাবে এমন একটা বাড়ির সামনে দরোজায় পা ঝুলিয়ে রিমা মেয়েটিকে দেখলাম।
এর বয়স আনুমানিক ১০ বছর হবে কিন্তু ভারী শরীরের কারণে এর মা-বাবার পক্ষে একে এখানে-ওখানে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ওর মার কাছে শুনেছি ঘুম ব্যতীত সময়টুকু ওর সমস্ত ভুবনটা এই দরোজার চৌকাঠ পর্যন্ত। মেয়েটকে যখন দেখি গায়ে এর বোতামবিহীন একটা অতি জীর্ণ শার্ট সম্ভবত এটা ওর বাবার, যেটা ওর হাঁটু পর্যন্ত। পরে অবশ্য এর মা ভারী লজ্জিত হয় নিজের একটা ওড়না টাইপের কিছু একটা দিয়ে একে ঢেকে দিয়েছিলেন।
হাবিজাবি কাজ, অকাজে আমার অভিজ্ঞতার শেষ নেই কিন্তু আজ যে ঘটনার সম্মুখীন হলাম এ অভূতপূর্ব- আমার সঙ্গে আগে কখনও এমনটা ঘটেনি! চলে আসার সময় আমি রিমার মাকে বললাম, ‘আচ্ছা, আমি দেখি চেষ্টা করে এর জন্য একটা হুইল-চেয়ারের ব্যবস্থা করা যায় কিনা। তিনি যে উত্তর দিলেন আমি এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি তোতাপাখির মত অনর্গল বকে গেলেন, ‘না-না-না, আমি অনেক আশা নিয়া বইসা আছি। আপনে একটা ব্যবস্তা কইরা দিবেন-দিবেন-দিবেন। দিতেই হইব’।

এমন পর্যায়ে আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে এমন কঠিন দাবী নিয়ে এতো জোর দিয়ে বলেনি। কী তীব্র দাবী- কী স্থির বিশ্বাস! হায়, হায় বোকা মহিলা, এ কেমন করে জানবে যে মানুষটার কাছে তাঁর এমন মমতার দাবী সেই মনুষটার ক্ষমতার দৌড় যে বড়ো সীমিত...।

Tuesday, October 21, 2014

“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি”!

গতকাল দিনটা শুরু হয়েছিল বড় বাজে রকমের। সকাল-সকাল এক অন্য রকম অতিথি! তাও সুস্থ-সবল হলে একটা কথা ছিল, অসুস্থ-আহত। অতিথি নারায়ন কিন্তু আমি এই অতিথিকে নিয়ে বিরক্ত, চরম ত্যক্ত-বিরক্ত।

ছোট্ট এই জায়গাটায় প্রায় দুই লক্ষ মানুষের বাস। সবাইকে ছেড়ে আমার এখানে কেন, বাপু। হোয়াই? তোমার শরীরটা ভাল নেই ঠিক আছে, কোনও জায়গা না-পেলে তা গাছে বসে থাকতে সমস্যা ছিল কোথায়? আক্ষরিক অর্থেই বিরক্ত লাগছিল কারণ আমার অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর না। এমতাবস্থায় এদের প্রায় সবারই মৃত্যু হয়েছে। ফাঁকতালে আমার মত অমানুষের ভুবনটা এলোমেলো করে দিয়ে গেছে!
ভাগ্যিস, এদের পরিবার-পরিজন বদ টাইপের না নইলে আমার বিরুদ্ধে মিছে মামলা ঠুকে দিলে বাঁচার কোনও উপায় ছিল না।

আমি লক্ষ করলাম পাখিটা পাখা ছেড়ে দিয়েছে- এমনিতে আমি পাখি চিনি না (আসলে মনে রাখতে পারি না)। শালিক, গো-শালিক, দোয়েল সবই আমার কাছে একই মনে হয়। তবে এটুকু বুঝতে পারছি পাখিটার লক্ষণ খারাপ! এর বাঁচার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। এর ঠোঁট, পায়ের নাগালে যা যা প্রয়োজন রেখে আপাতত খাঁচায় রেখে দেওয়া ব্যতীত উপায় ছিল না।
আমার কিছু ডাক্তার বন্ধু আছেন এদের কি ফোন করব? একবার এক ডাক্তারকে আহত কুকুরের চিকিৎসা বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলাম তিনি চোখ লাল করে বলেছিলেন, আমি কী কুত্তার ডাক্তার! থাক বাবা, ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। পরে এরা হেন ডিজঅর্ডার, তেন ডিজঅর্ডার নাম দিয়ে আমার চিকিৎসা শুরু করে দেবেন। এমনিতেই যথেষ্ঠ কুখ্যাতি অর্জন করেছি। আমি আতংকিত, একদিন সত্যি সত্যি লোকজনেরা আমার বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে বলাবলি শুরু করবে: চল, পাগল দেইখ্যা আসি।

সন্ধ্যায় যখন খাঁচার ভেতর পিঁপড়ার আনাগোনা বেড়ে গেল তখন প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেল এর মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে, সময়ের ব্যাপার মাত্র। ক্রমশ এর গা পিঁপড়ায় ভরে যেতে লাগল। পিঁপড়া নিয়ে আমার কষ্টের স্মৃতি আছে। আমার মাকে যখন শুইয়ে দেই তাঁর সফেদ-সাদা কাপড়ে ঢাউস এক পিঁপড়া দেখে এক ঝটকায় ওটাকে ফেলে দিয়েছিলাম। মার সমস্ত শরীর এখানে-ওখানে যে গেরোগুলো দেওয়া ছিল তা একেক করে খুলে দিতে হয়। নিয়ম। এর অর্থ আমি জানতাম। যেন অতি দ্রুত পোকায় শরীরটাকে খেয়ে ফেলে। 

যাই হোক, পিঁপড়ারা বুঝে গেছে পাখিটার আর প্রতিরোধ ক্ষমতা নাই। কিন্তু পিঁপড়ারা সম্ভবত আমার কথা বিস্মৃত হয়েছিল। পাখিটাকে খাঁচা থেকে বের করে সবগুলো পিঁপড়া হঠাতে প্রচুর সময় লেগে যায়। এতে করে পিঁপড়া যে দু-চারটা মারা পড়ে না এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না। প্রকৃতির নিয়মের ব্যতয়- একটা প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে যে আরও দু-চারটে প্রাণ যাচ্ছে। পাখিটাকে আর খাঁচায় রাখা যবে না আবারও পিঁপড়া মহাশয়দের আগমণ হবে।
ছোট্ট শরীরটা আমার হাতের মুঠোয় আলতো করে ধরে রাখতে মোটেও সমস্যা হয় না। ধুকধুক করে এর প্রাণশক্তি এখনও টিকে আছে। একবার মনে হলো সম্ভবত স্পন্দনটা থেমে গেছে। কিন্তু অনুমান ভুল প্রমাণিত করে এ ঠিকই টিকে রইল।

বাঁ হাতে ধরে রেখে অন্য হাতে ফোনে কথা বলি, ভাত খাই। মহা মুসিবত, ব্যাটা যে টিকে আছে! আমার কেন যেন মনে হলো একে এভাবে মুঠোয় আটকে না-রেখে মৃত্যুটা তার মত করেই হতে দেওয়াটাই সমীচীন। থাকুক নীচে, চোখের সামনে। কিন্তু ছাপার অক্ষর বলি, প্রাণবায়ু তো আর বের হয় না। ধুর, মরে না কেন ছাই! একটা তুচ্ছ পাখি নিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকার সময় কোথায় আমার। দেশের কত বড়-বড় সমস্যা এই নিয়ে একটা লেখা না-নামিয়ে ফেললে তো চলছে না। আমি মানুষ পদবাচ্য নই এ সত্য কিন্তু এর যে মৃত্যুযন্ত্রণা এটা চোখে দেখে অমানুষ হওয়া সম্ভব না।

রাত গড়ায়। আমি এর মৃত্যুর অপেক্ষায় আছি- মরে গিয়ে কখন আমাকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে। এক সময় এই যন্ত্রণারও অবসান হয়। গভীর রাতে মাটি খুঁড়তে কার ভাল লাগে। বিভিন্ন সময়ে ঝাউ গাছটার নীচে, যেখানে পূর্বেও বেশ অনেকগুলো পাখিকে মাটি চাপা দিতে হয়েছিল, সেখানে।

ভাগ্যিস, আশেপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নেই নইলে কে বলতে পারে কোন ধারায় বমাল ধরা পড়তাম। এখন তো আমাদের দেশে নতুন-নতুন আইন হচ্ছে। সংসদে উত্থাপন হলেই এ-প্লাস পেয়ে চোখ বন্ধ করে আইন পাশ হয়ে যায়। ৫৭ ধারা সে তো পুরনো, ৫৮ বা ৮৫ ধারা নামে কখন কোন পশু-পাখি আইন পাশ হয়ে গেছে কে বলতে পারে...।

Sunday, October 19, 2014

রেলগাড়ি ঝমঝম, রেলমন্ত্রীর টমটম!

আমাদের রেলমন্ত্রী মহোদয় বিবাহ করছেন। ফরয কাজ-শুভ কাজ, আলহামদুলিল্লাহ। এমনিতে এখন অবশ্য রেলওয়ের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। এখন মহিলা-শিশুরাও রেলের ছাদে হাওয়া-বাতাস-রোদ খেতে খেতে ভ্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছে। রেলমন্ত্রী মহোদয়ের বিবাহের পর রেলওয়েতে আরও গতি আসবে এতে কোনও সন্দেহ নেই। 

পত্রিকা পড়ে জানলাম, রেলমন্ত্রী মহোদয় মাটির মানুষ। তিনি রাজনীতি নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত ছিলেন যে বিবাহ করার আর সুযোগ হয়নি! আমদের দেশের রাজনীতিবিদগণ বড়ই মাটির মানুষ। কেউ বিবাহ করার সময় পান না তো কেউ সংসদে, সভা-সমিতিতে মুখ হাঁ করে চোখ বন্ধ করে রাখেন। কী রহস্য? চোখ খুলে তিনি রহস্য ফাঁস করেন! তিনি নাকি ঘুমাননি ঘুমের ভান ধরে দেশ-জাতির কথা চিন্তা করছিলেন। শোনো কথা, আমরা আবার কখন বললাম তিনি ঘুমিয়ে পড়েন? কেবল এটাই তো বললাম, তিনি মুখ হাঁ-মুখ ব্যাদান করে চোখ বন্ধ করে রাখেন।

যাই হোক, রেলমন্ত্রী মহোদয় ৫০০ বরযাত্রী নিয়ে নিয়ে যাবেন এবং কনের বাড়িতে উভয় দিক মিলিয়ে ১২০০ মানুষের খাবারের ব্যবস্থা হচ্ছে। আগামী ১৪ নভেম্বর বৌভাত অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ ভবনের হলে ৩৫০০ হাজার এবং চৌদ্দগ্রামের অনুষ্ঠানে ৩০০০০ মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
“বিদ্যমান অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ১০০ জনের বেশি অতিথি হলে জনপ্রতি ২৫ টাকা করে সরকারী কোষাগারে কর দিতে হবে। তবে অতিথি অতিরিক্ত ৪শ’ জনের বেশি হওয়া চলবে না।“ 
ছ্যা, মাত্র ২৫ টাকা- এটা কত সালের আইন কে জানে! তখন সম্ভবত চাউলের কেজি ছিল ১০ টাকা! তারপরও জনপ্রতি ২৫ টাকা করে হলে রেলমন্ত্রী মহোদয়ের বিবাহ উপলক্ষে সরকারের কোষাগারে ৯ লক্ষ টাকা জমা হবে। এ ভারী আনন্দের খবর নিঃসন্দেহে।
কিন্তু ৪০০ জনের বেশি অতিথি হওয়া চলবে না আইনের এই প্যাঁচ, এটা খানিকটা ঝামেলায় ফেলে দেবে। যাক গে, আমাদের দুঁদে আইনমন্ত্রী মহোদয় আছেন যখন এটারও একটা গতি হবে- আইন সংশোধন করে নিলেই হবে।

পত্রিকার মাধ্যমে আরো জানা যাচ্ছে, কনের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাঘাট নির্মাণ কাজ ২৫ অক্টোবরের মধ্যে শেষ হবে বলে ঠিকাদার আশা প্রকাশ করেছেন। রেলমন্ত্রী কনের বাড়িতে যাবেন টমটমে করে। এটা একটা কথা হলো! রেলমন্ত্রী মহোদয়ের টাকায় কী টান পড়েছে যে কেবল রাস্তাই সংস্কার করছেন! টমটমে কেন, রেলমন্ত্রী যাবেন রেলগাড়িতে চড়ে। কনের বাড়ি পর্যন্ত রেললাইন বসাবার জোর দাবী জানাই...।

Thursday, October 16, 2014

খুন !

আজকের অতিথি-লেখক Aminul Islam, লিখেছেন বিচিত্র এক খুন নিয়ে। তিনি লিখেছেন:
“প্রথম ছবিতে দেখুন এপোলো হাসপাতালের মেডিসিন কন্সালটেন্ট, Sharad Dayadhan Sonawane (ভারত থেকে আসা Specialist) কর্তৃক এমারত হোসেন নামের এক বয়স্ক রোগীকে দেয়া পেপটিক আলসারের প্রেসক্রিপশন । পরের ছবিটিতে দেখুন একই ব্যাক্তিকে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট (Death Certificate)। সময়ের ব্যবধান মাত্র চার দিন ।

এই ৫৮ বছর বয়স্ক ডায়াবেটিক রোগীটি এপোলোতে গিয়েছিলেন পেটের উপরি অংশে জ্বালাপোড়া নিয়ে- যা কোনও গ্যাষ্ট্রিকের ওষুধেই কমছিল না। এমতাবস্থায় যে-কোনও জুনিয়র চিকিৎসকও তাকে একটা ECG করাতেন, সেটাই নিয়ম । কিন্ত হাজার টাকা ফিসের বিদেশী ডাক্তার, জৌলুষময় কর্পোরেট হাসপাতাল এসব কিছুই তার হার্ট-আট্যাকটা সময়মত diagnosis করে দিতে পারলো না শুধু একটা ECG না-করানোর কারণে। পরে যখন কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না তখন সরকারী হাসপাতালে নিয়ে ECG করালে তার গুরুতর হার্ট-আট্যাক (Myocardial Infarction) ধরা পড়ে । কিন্তু ততক্ষণে অনেক মহামুল্যবান সময় নষ্ট হয়ে গেছে । অবশেষে হৃদরোগ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
হার্ট আট্যাকের বেলায় ’Minute means Muscle’ যার অর্থ এক মিনিট আগেও যদি চিকিৎসা শুরু হয় তবে বেঁচে যায় কিছু heart muscle। যত মিনিট বিলম্ব তত বেশী হৃৎপেশীর মৃত্যু। এক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা শুরুর বিলম্ব করা মানে গুরুতর অপরাধ করা। সেই অপরাধটুকুই করেছেন এপোলোর কথিত এই বিশেষজ্ঞ। নাকি Dayadhan সাহেবও আমাদের খোরশেদ স্যারের মতো ইন্ডিয়ায় ধাওয়া খাওয়া কোন ওয়ার্ডবয়? ওখানে ধরা খেয়ে এদেশে তসরীফ এনেছেন!

প্রেসক্রিপশনটাতেও বানিজ্যিক শোষণ প্রক্রিয়াও লক্ষনীয়। বুকপেট ব্যথার রোগীকে অযথাই কিছু ভিটামিন দিয়ে দেয়া হয়েছে যার প্রতিটা ট্যাবলেটের মুল্য ৮০ টাকা। ১৯০০ টাকার প্রেসক্রিপশনে ১৬০০ টাকাই ভিটামিন। ডাক্তার যেহেতু বিদেশী বিশেষজ্ঞ তাই পরম বিশ্বাসে সব কিনে নেওয়া হয়েছে। যে বড় হাসাতালের বড় ডাক্তারকে তিনি আরাধ্য মানলেন । হার্ট-আট্যাকের রোগী হয়ে গ্যাষ্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে শেষমেষ তার হাতেই তিনি খুন হলেন।“ Aminul Islam 

এপোলো হাসপাতাল নিয়ে ভিন্ন এক লেখা লিখেছিলেন, Rukhsana Tajin, ‘এ-তে এপোলো, বি-তে বুচার...’। লেখাটা তিনি লিখেছিলেন নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে- যখন এই হাসপাতালে তিনি ভর্তি ছিলেন, অনাগত সন্তান তাঁর পেটে [১]

১. এ-তে এপোলো: http://www.ali-mahmed.com/2014/01/blog-post_504.html

Wednesday, October 15, 2014

মনে বড়ো সাধ জাগে!

EmOn SarWar , আজকের অতিথি লেখক, লিখেছেন ভিন্ন এক বিষয় নিয়ে। আমাদের দেশে যাদের পূর্বপুরুষ ইরান-তুরান-ইয়েমেন থেকে মাছের পিঠে করে এসেছেন তাঁদের প্রতি এক প্রকারের হাহাকার উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। মনিটর ভেদ করে এই হাহাকার আমাকেও স্পর্শ করে। আমিও তীব্র হিংসায় জ্বলে-পুড়ে ছাই হই তাদের প্রতি, যারা আরব থেকে বাঘের পিঠে করে এদেশে এসেছিলেন।

EmOn SarWar লিখেছেন:
“আমার পূর্বপূরুষরা নেংটি পড়ে ফেনী নদীর তীর ঘেঁষে ধান চাষ করত! খর্বকায়, শ্যামবর্ণ আর মোটা নাক ছিল তাদের। মেদহীন চকচকে কালো দেহে পাকধরা পেশীগুলো ঘামে ভিজে সূর্যের আলোয় চিকচিক করত! এক সময় ফেনী নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে। বহমান তীব্র স্রোত স্থিমিত হয়ে বদ্ধ জলাশয়ের রূপ নেয়।
সে জলাশয় বাঁধ দিয়ে পুকুর হলো, আর পাশে জেগে উঠা বালু চরে বসতবাটি। যে অংশটুকু কেউ দখল করতে পারেনি সেটা হল গিয়ে জল মহাল।

আমার পূর্বপূরুষরা অনেকেই কৈবর্ত্য হল। সারা দিন জাল বুনে, সেলাই করে আর ভোর রাতে শীর্ণ শরীরে শরিষার তেল মেখে নেংটি পড়ে জাল টানে! আমাদের ওখানে চক্রবর্তী সম্রাট না-থাকলেও চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ ছিল, মজুমদার ছিল। এরা জমি জিরাতের মালিকও ছিল। সে অর্থে জমিদার বটে। ওদের ঈশ্বর ছিল, মন্দির ছিল, পুজা-পার্বণ ছিল! আর আমার পূর্বপুরুষদের ঈশ্বর ধারণা শুধু তাদের দন্ডনায়ক হিসেবেই। তারা ভয়ে-ভয়ে থাকত নিজের ও পূর্বপূরুষের অজানা পাপের জন্য তখনও না -পাওয়া শাস্তি নিয়ে!

তখন অবশ্য পারস্য-আরবের ‘মহীসাওয়াররা’ আসা শুরু করেছে। তাদের পথ ধরে, সাগর আর নদীপথে ইসলাম খান চিশতী, বুজুর্গ উমিদ খান আর ছূট্টি খানরাও আসা শুরু করেছেন। আরক্কানী মগ'দের দৌরাত্ব ততদিনে শেষ! শাহ সুজা দিল্লীর মসনদের দৌড়ে হার মেনে প্রাণ নিয়ে আমার পূর্বপূরুষদের অর্ধনগ্ন দেহ আর কালো চোখের সামনে দিয়েই আরকানে পাড়ি জমিয়েছেন।
যাবার পথে রুগ্ন খাদিম আর আহত পাঠান সেনাদের এখানেই ফেলে গেছেন! তাদের দীর্ঘকায় গড়ন, শ্মশ্রুধারী কন্দর্পকান্তি মুখমন্ডল আর ফার্সী উর্দ্দু বয়ান আমার 'ছোটলোক' পূর্বপূরুষদের মুগ্ধ করেছিল হয়ত। রায়, চক্রবর্তি আর মজুমদারদের চেয়ে এদের ফর্সা চেহারা, বিজাতিয় ভাষা আমার পূর্বপুরুষদের কাছে অনেক বেশি দেবতুল্য আর স্বর্গীয় মনে হয়েছিল। এরপর থেকে আমার পূর্বপুরুষেরাও দীক্ষিত হল ওদের বিশ্বাসে, নেংটি ছেড়ে লুংগি পরা ধরল!

...এরপরও মাটি কচলে ধান চাষ করে আর জাল ফেলে মাছ ধরেই বহু যুগ পার করেছে আমার পূর্বপুরুষরা! আমার বাবা সে জীবন পেছনে ফেলে শহরমুখী হয়েছেন- লুংগি ফেলে পাৎলুন ধরেছেন; আমিও তাই।
কিন্তু আজকাল, মাঝে-মাঝে মনে বড্ড সাধ জাগে- আহা, আমার পূর্বপুরুষরা যদি ইরান-তুরান-ইয়েমেন থেকে মাছের পিঠে চড়ে বাংগাল মুল্লুকে আসতেন! আমার নাম যদি শেখ বা সৈয়দ হতো কিংবা নিদেনপক্ষে উত্তর ভারতের চৌধুরি বা ফ্রন্টিয়ারের খান তাহলে তো আমিও বলতে পারতাম ...!
কিন্তু হায়, হীনজন হয়ে ছিলাম তখনও, এখনও যেমন আছি ...!” EmOn SarWar

Monday, October 13, 2014

দুর্ভোগ এবং এক প্রকারের জন্তু!

প্রতি ঈদে ঘরফেরা মানুষের যে বর্ণনাতীত কষ্ট হয় এটা ভুক্তভোগি ব্যতীত অন্য কারও বোঝার উপায় নেই। হয়তো খানিকটা আঁচ করা চলে, ব্যস, এই!
পত্রিকায় নিয়ম করে ইদের আগে-পরের এই সংশ্লিষ্ট ছবি ছাপা হয়। মানুষে উপচেপড়া লঞ্চ-ট্রেন। বহুলব্যবহৃত একটা শব্দ ব্যবহার করা হয়,‘দুর্ভোগ’। এই দুর্ভোগের নমুনা খানিকটা অনুভব করলাম আজ।

‘মহানগর প্রভাতী’ নামের এই ট্রেনটায় ১৬টা বগি। এরমধ্যে ১০টাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত! আমাদের রেল কর্তৃপক্ষের কেমন কেমন করে যেন একটা ধারণা জন্মেছে এই দেশের অধিকাংশ লোকজনেরই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরার প্রয়োজন। ট্রেন ঢোকামাত্র মনে হলো কেউ যেন মৌমাছির বাসায় ঢিল ছুড়েছে। সে দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। বিপাকে পড়লেন নারী যাত্রী- লজ্জার মাথা খেয়ে নিরুপায় হয়ে এরা ছাদে উঠার চেষ্টা করতে লাগলেন। এটাকে দুরাধর্ষ-দুর্ধর্ষ কাজ বললেও কম বলা হয়। কী দুঃসাধ্য এক কাজ! কী মনখারাপ করা এক দৃশ্য। অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকা ব্যতীত কিছুই করার নেই।

‘মহানগর প্রভাতী’ নামের এই ট্রেনটা ঢাকা থেকে ছাড়ে সকাল ৭টায়। দুপুর ২টায় চট্টগ্রাম পৌঁছার নিয়ম। পরে আমি জানতে পেরেছিলাম ওদিন এই ট্রেনটা চট্টগ্রামে পৌঁছেছিল রাত সাড়ে নটায়! আমাদের রেলমন্ত্রী মহোদয় বিবাহ নিয়ে ব্যস্ত। নইলে বলতাম, মন্ত্রী মহোদয়, একটু চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করুন তো একজন মহিলা মানুষ-শিশু এই প্রখর রৌদ্রে ট্রেনের ছাদে প্রায় সারাটা দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন। কোথায় পানি, কোথায় খাওয়া, কোথায় বাথরুমের ব্যবস্থা?

ব্যাপারটা এখান পর্যন্তই চুকে গেলে আমি বেঁচে যেতাম। কিন্তু আমি হতভম্ব-হতবাক হয়ে লক্ষ করে দেখলাম এতে অনেকেই বিমল আনন্দ পাচ্ছেন। মানুষের দুর্দশায় এমন আনন্দ আসে কোত্থেকে! কারণ আমাদের তোরতরিবত-শিক্ষাদীক্ষায় ঝামেলা আছে। ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, শারীরিকভাবে অসুবিধাসম্পন্ন মানুষকে দেখে আমরা অবজ্ঞার হাসি ছুড়ে দেই। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা মানুষদেরকে দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাই। চুতিয়া লেখক স্যাররাও পাগল নাম দিয়ে এক চরিত্র সৃষ্টি করে আমাদেরকে হাসিখুসি রাখার চেষ্টা করেন। চারদিকে আনন্দই আনন্দ!

হাতের নাগালে মুখভরানো হাসিতে হাসতে থাকা এক জন্তুকে পেলাম। কিছু বাতচিত হলো। এই বাতচিতের বিশদ বর্ণনা এখানে জরুরি না। আহা, যাদের এমন বদ্ধমূল ধারণা আছে আমি সর্বদাই ‘ছাপার অক্ষরে’ কথা বলি তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করার কী দায় পড়েছে আমার। কেবল বলি, জঙ্গলে চলে জঙ্গলের আইন- জন্তুর সঙ্গে বলতে হয় জন্তুর ভাষা...।

Sunday, October 12, 2014

হায় দেশ, এমন পাশবিকতার জন্ম দিলে কেমন করে!

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৯ অক্টোবর, ২০১৪
সিলেটের শ্রীমঙ্গলে একটা বধ্যভূমি ছিল, ‘বধ্যভূমি ৭১’। এটা এখন তাহলে পর্যটন কেন্দ্র হয়ে গেছে? কেবল পর্যটন কেন্দ্রই হয়ে যায়নি অন্য বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রগুলো যেমন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিচ্ছে! বাহ, বেশ তো! ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’।

আমার মত আমজনতার এটা জানাই হতো না যদি না মিডিয়া আমাদেরকে জানাতো। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ নামের দৈনিকটি ছবির অকাট্য প্রমাণ দিয়ে আমাদেরকে সদর্পে জানাচ্ছে। ভাগ্যিস, এরা ছবি দিয়েছে। ছবি না-দিলে আমার মত মানুষ বিশ্বাস করতেই চাইত না।
এমনিতে এই পত্রিকাটির দাবী এরা ‘দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক’ এবং এদের আরও জোর দাবী, ‘আমরা জনগণের পক্ষে’। আহ, আমাদের মিডিয়া- হাতে কিল মেরে তিন উল্লাসে বলি, এই না হলো গিয়ে আমাদের মিডিয়া! হবেই-বা না কেন? সমস্ত মিডিয়াই তো শাহআলম সাহেবদের মত টাইকুনদের বগলে।
তিনি আবার খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন সন্তানের গর্বিত পিতা এবং খুনটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় পরোক্ষ খুনিও বটে। গোল্ডা মায়ারের সেই বিখ্যাত কথা, ‘নিজ হাতে হত্যা করা বা হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া অথবা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই’।

কেবল এই পত্রিকাটিকেই চুতিয়া বলাটা সমীচীন হবে না কারণ এটা সত্য এদের তথ্যের উপস্থাপনায় বিকট চুতিয়াগিরি আছে কিন্তু যেসমস্ত মানুষেরা ‘বধ্যভূমি ৭১’ উল্লাস করতে গিয়েছিলেন, যে প্রশাসন এই উল্লাস করার সুযোগ করে দিয়েছেন এরা সবাই একই পথের পথিক।

মাছের পচন নাকি শুরু হয় মাথা থেকে। দেশ নামের বিশাল এই মাছটার মাথা পচে গেছে সেই কবেই! বাকী ছিল শরীরের অন্য অংশগুলো এগুলোতেও পচন ধরেছে। দেশ নামের এই পৃথুল মাছটা ফরমালিনের জারে চুবানো আছে বলে আমরা টের পাচ্ছি না। যেদিন জারটা ভেঙ্গে পড়বে সেদিন পচনের তীব্র-উৎকট গন্ধে আমরা সবাই হড়হড় করে বমি করে দেব। কে জানে, হয়তো-বা কালে কালে সেই ‘বমির সৈকত’ নামে চমৎকার এক পর্যটন কেন্দ্র চালু হবে। সেখানে আমরা দলে দলে গিয়ে বমিতে গা ভাসিয়ে অমায়িক আনন্দ করব...।

Saturday, October 11, 2014

হা!

এই মানুষটার একটা নাম আছে বটে তবে কারও কারও নামে কী আসে যায়! কিছু-কিছু মানুষ আছেন যাদের নিয়ে আস্ত একটা উপন্যাস নামিয়ে ফেলা যায় কিন্তু এঁদের নিয়ে লেখা হয়ে উঠে না, জানি না কেন! আজও লেখা হতো না হয়তো। কিন্তু...।

কর্পোরেট ভুবনের দুঁদে এই মানুষটাকে দেখে আমার বড়ো দুঃখ হতো। মনে হতো কী অভাগা এই মানুষটা! অদৃশ্য এক জালে আটকা পড়ে আছেন। আটকা পড়ে আছে শিশুর মতো একটা মন।
স্বপ্ন তো দেখে সবাই কিন্তু স্বপ্ন দেখাতে পারেন ক-জন! সেই অল্প কিছু দুর্লভ মানুষদের একজন। এই মানুষটা যে বুক-পকেটে স্বপ্নের 'পোকা' নিয়ে ঘুরে বেড়ান। পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ালে সমস্যা ছিল না কিন্তু কতবারই না মানুষটা আমার মাথায় আলগোছে স্বপ্নের পোকা' ছেড়ে দিয়ে সটকে পড়েছেন।

ঢাকা নামের কংক্রিটের বস্তিতে মানুষটার বাস অথচ যে মানুষটার মন পড়ে থাকে জ্যোৎস্নায় ভেসে যওয়া ধ্যানরত সেই মুনির সংস্পর্শে। মানুষটার সঙ্গে আমার দেখা হয় কালেভদ্রে। কারণ বছর গড়িয়ে যায় ঢাকা যাওয়া হয় না আমার।
তিতিবিরক্ত হয়ে আজ সেই মানুষটাই আমার এখানে চলে আসেন। হিজিবিজি-হাবিজাবি কত কথা। সময় গড়ায় দ্রুত। আমি আধ-হাত লম্বা চুরুটটা ত্যক্ত হয়ে ফেলে দেই- ধুর, আমি তো চার্চিল, চে না যে ভকভক করে স্টিম-লোকোমোটিভের মত ধোঁয়া উগরে দেব।

আমার সংগ্রহের রাজ্যের আবর্জনা থেকে বের হয় মরচেধরা তির-ধনুক। আমি টার্গেটের কাছাকাছি যেতে পেরেছিলাম, ঢাউস টার্গেটটার পাশ ঘেঁসে- লাগেইনি! এমনিতে আমি ছবি সম্বন্ধে কিছু না-বুঝেও ফটাফট ছবি তুলি সেল-ফোনে, অন্যদের ছবি তোলার যন্ত্র নামের কামানগুলোর পাশে দাঁড়িয়েও। সার্জন থেকে নাপিতের যেমন সাহস থাকে বেশি, তেমনি। 

মানুষটার ছবি দেখে আমি হাঁ। এই ছবিটা ভাল করে লক্ষ করে দেখলাম তিনি যখন তির ছুড়েছেন তিরের ছুটে যাওয়ার প্রায় পুরোটাই ধরা পড়েছে। কামানওয়ালারা এটা দেখে দ্বিতীয়বার তাকাবেন না এটা আমি নিশ্চিত কিন্তু আমি বিমুগ্ধ। পুরো কৃতিত্ব ক্যামেরা নামের এই জিনিসটার। আফসোস, ক্যামেরা নামের এই জিনিসটা যদি পুরুষ হতো তাহলে তিন উল্লাসে বলতাম, মরদ বটে একখান। আর মহিলা হলে...।

Thursday, October 2, 2014

আমাগো ‘মনতিরি’ বাহাদুর!

কালে-কালে ‘মনতিরি’ বাহাদুরদের আগমন ঘটে। বিএনপির সময় একজন ‘মনতিরি’ বাহাদুর ছিলেন তিনি গুড়ো দুধের দাম বেড়ে যাওয়ার পর আমাদেরকে সময় অবগত করিয়েছিলেন, ‘আমার ছয় বছরের ছেলে এখনও মার দুধ খায় আমি নিজে বারো বছর পর্যন্ত মার দুধ খেয়েছি’
সেই ‘মনতিরি’ বাহাদুর বারো বছর কেন আরো ক-বছর লাগিয়ে দুধ খেলেও আমাদের বলার কিছু ছিল না। তাই হয়তো এই ‘মনতিরি’ বাহাদুর ছিলেন গোলগাল-তনদুরস্ত ছিলেন!

সেই সময়কার আরেক ‘মনতিরি’ বাহাদুর আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘বিল গেটস কম্পিউটার বিক্রি করিয়া এই দেশ থিক্যা কুটি-কুটি টাকা নিয়া যাইতেছে’
শোনো কথা, বিল গেটস ব্যাটা নাকি কম্পিউটার বিক্রি করে!

হালের একজন ‘মনতিরি’ বাহাদুর আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে দেশ উত্তাল। তিনি অতি কুৎসিত যে-সমস্ত বাতচিত করেছেন তা এখানে বলে আর চর্বিতচর্বন করি না। বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই সবাই জেনে গেছেন। তবে কিছু বিষয় আমার খুবই ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। যেমন, এক পত্রিকায় লিখেছে, "...একই সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে লতিফ সিদ্দিকী ধর্ম নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর এসব অস্বাভাবিক কথাবার্তায় সভাস্থলের ভিতরে এবং বাইরে প্রচন্ড ক্ষোভের সঞ্চার হলে এক পর্যায়ে তাকে অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয়কে নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দলের একজন মন্ত্রীর এমন কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।..." 
‘বিশেষ করে’, এই বিশেষ করেই বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে!

পত্র-পত্রিকায় এখন ছেয়ে গেছে, ‘দুর্নীতির পাহাড়ে লতিফ’, ‘লতিফের শত-শত কুকর্ম’ ইত্যাদি ইত্যাদি। লতিফ যখন পাট মন্ত্রণালয়ে ছিলেন তখন নাকি সরকারের হাজার-হাজার কোটি টাকা নষ্ট করেছিলেন। এই সমস্ত তথ্য এখন গিয়ে জানা যাচ্ছে। কেউ জানত না! না আমাদের প্রধানমন্ত্রী, না গোয়েন্দা সংস্থা, না দুদক। এখন গিয়ে জানা যাচ্ছে দেশে ফিরলেই দুদকের মুখোমুখি হতে হবে লতিফ সাহেবকে। দুদক এখন হুড়মুড় করে জেগে উঠেছে- যেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরি!

লতিফ সাহেব বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিস্তর কুৎসিত কথা বলেছেন। বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি অনুতপ্ত নন। এই নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নাই। কে অনুতপ্ত হবে, কে তপ্ত এটা তার নিজস্ব বিবেচনা। আমার বক্তব্য অন্য খানে। বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন...।
বিবিসি: '...সরকারের মন্ত্রী হিসাবে সেই বক্তব্য দেবার ক্ষেত্রে আপনার কিছু বিধিনিষেধের অধীনে থাকতে হতে পারে'

লতিফ: 'হ্যাঁ, বিধিনিষেধ আছেই। সেটা তো আমি আমার দেশে করি নাই। আমি ভাবছিলাম মুক্ত পৃথিবীতে আসছি, যেখানে সবাই মুক্ত বিহঙ্গ, এখানে কোনও কিছুতেই বাধা নাই। এখানে যে কালো বিড়াল এত রয়ে গেছে তা তো আমি জানি না।..."

আমাগো 'মনতিরি' বাহাদুর নিশ্চয়ই এই ধর্মীয়স্বাধীনতার কথা বলছেন না? FREEDOM OF THOUGHT AND RELIGION:

18. "Everyone has the right to freedom to thought, conscience and religion; this right includes freedom to change his religion or belief, and freedom, either alone or in community with others and in public or private, to manifest his community or belief in teaching, practice, worship and observance." (The Universal Declaration of Human Rights [UDHR]) 

তাছাড়া...ওহো, আমাগো ‘মনতিরি’ বাহাদুর একেবারেই বিস্মৃত হয়েছেন তিনি এই প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কর্মচারী। আমেরিকা কেন মঙ্গলগ্রহে গেলেও একজন বেতনভুক্ত কর্মচারীর যা খুশি বলার, করার অধিকার নাই। আফসোস, এটা আমাদের দেশের অধিকাংশ বেতনভুক্ত কর্মচারীই মনে রাখেন না...।

Tuesday, September 30, 2014

১ লক্ষ ইরাকি, একজন মেথর এবং মিডিয়া!

অতি পুরনো একটা কৌতুক। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী কলিন পাওয়েল জরুরি বৈঠকে বসেছেন। বসেছেন তো বসেছেনই আর দাঁড়াবার নাম নেই! বাইরে অপেক্ষায় থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ভেতরে গিয়ে বুশকে তিতিবিরক্ত হয়ে অপ্রাকশ্যে বললেন, বা..., মিটিং না মেটিং করছে! প্রকাশ্যে যেটা বললেন সেটা হচ্ছে, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, ঘটনা কী, দয়া করে বলবেন কী নিয়ে আপনাদের এই ম্যারাথন মিটিং’?

বুশ আলাদা গাম্ভীর্য এনে বললেন, ‘বিষয়টা জরুরি। আমরা শলা করছি কেমন করে ১ লক্ষ ইরাকি এবং একজন আমেরিকান মেথরকে খুন করা যায়’।
চেনি অবাক হয়ে বললেন, ‘সে তো ভাল কথা কিন্তু মেথরকে খুন করতে হবে কেন’!
বুশ এবার হলুদ দাঁত বের করে পাউয়েলকে বললেন, ‘দেখলা পাওয়েল, তোমাকে বলেছিলাম না ১ লক্ষ ইরাকিকে খুন করলে এটা নিয়ে কেউ দ্বিতীয়বারও ভাববে না'।

এটা হচ্ছে কৌতুক- বাস্তবতাটা অনেকটা এমনই। আইএস নামের একদঙ্গল দানবকে রোখার নামে আমেরিকা অভিযান শুরু করেছে। এবার পূর্বের মত বোকামি করেনি। পারলে এই গ্রহের সমস্ত দেশকেই দাওয়াত দিয়ে বসে। যথারীতি এরমধ্যে বাংলাদেশ নামের দুবলা-পাতলা, লিকলিকে দেশটিও আছে।

যাই হোক, এই দমন করার খবরটা পশ্চিমা মিডিয়া যথারীতি তাদের মত করেই ছাপিয়েছে। এমনকী আমাদের মিডিয়াও! উদাহরণ দেই? 'বাংলাদেশ প্রতিদিন' নামের দৈনিক পত্রিকাটি (২৪. ০৯.১৪) লিখেছে, “...দুই মার্কিন এবং এক ব্রিটিশ নাগরিকের শিরচ্ছেদের ভিডিও প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছে সংগঠনটি (আইএস)। এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি...।“

এই হচ্ছে আমাদের চুতিয়া মিডিয়া! আইএস নামের এই সংগঠনটি একদিনে ১৫০০ মানুষকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। শিরচ্ছেদের সহজ বাংলা গা কেটে অসংখ্য মানুষের মুন্ডু স্টেডিয়ামে ঝুলিয়ে দিয়েছে। এই সব ভিডিও কিন্তু বিশ্ববাসী দেখেছে। কিন্তু মানুষগুলো কেউই আমেরিকা, ব্রিটেনের নাগরিক না। অতএব পশ্চিমা মিডিয়ার কাছে এর কোনও গুরুত্বই নেই। নেই আমাদের মিডিয়ার কাছে। কারণ আমাদের এই সমস্ত মিডিয়াও পশ্চিমা মিডিয়ার অবৈধ সন্তান!

Sunday, September 28, 2014

হর্ষ-বিষাদ!

মাহবুবের সঙ্গে কয়েকটা কারণে দেখা করাটা জরুরি ছিল। একজন, মাহবুব-তানিয়ার জন্য কিছু কাপড়-চোপড় পাঠিয়েছেন। ওইসব দেওয়ার ছিল। অন্য একজন আবার ইনবক্সে জানিয়ে ছিলেন মাহবুব-তানিয়ার পড়াশোনার খরচের দায়িত্ব তিনি নিতে চান। এই সংবাদগুলো যে আমাকে কতটা অভিভূত করে এই সমস্ত মানুষদেরকে কেমন করে বোঝাই! কেমন করে লিখলে খানিকটা বোঝানো যায়- আহা,কেমন করে!

যাওয়াটা তারচেয়েও জরুরি ছিল যেজন্য সেটা হচ্ছে, মাহবুবকে হুইল-চেয়ারটা দেওয়ার সময়, খোলার পরই আমি লক্ষ করেছিলাম, পাদানি বা পা রাখার জায়গাটা বাইরের দিকে। কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করছিলাম- পা রাখার জয়গাটা বাইরের দিকে থাকলে তো পা রাখতে সমস্যা হওয়ার কথা। মাহবুবকে নিয়ে লেখাটার সঙ্গে যুক্ত ছবিটা [১] ভাল করে লক্ষ করতে বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যায়। কিন্তু ক্যাটালগ দেখেও এর আগামাথা আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওটায় সামান্য নাট কিভাবে খোলা হবে এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে কিন্তু এই বিষয়ে বিন্দুবিগর্সও লেখা নাই! আজব!

ওখান থেকে ফিরে আসার পর থেকেই কেমন একটা খচখচ করছিল। আজ নাটক-সিনেমার মতই এর সমাধান খুঁজে পাওয়া গেল! পূর্বে যে ছেলেটাকে (হৃদয়) হুইল-চেয়ার দেওয়া হয়েছিল ও আজ সকালে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য চলে এসেছে। ছেলেটা খানিকটা পাগলা টাইপের। ওর বাড়ি থেকে দূরত্ব কম না তবুও হুইল-চেয়ার নিয়ে মাঝে-মাঝেই আমার সঙ্গে দেখা করতে চলে আসে। কিচ্ছু না, কোনও কাজ না, এমনি-এমনি। আজ আসার পর আমি লক্ষ করে দেখলাম ওর হুইল-চেয়ারের পাদানিটা কিন্তু ভেতরের দিকেই। জানতে চাইলেই ও সবগুলো দাঁত বের করে আমাকে শিখিয়ে দিল কেমন করে এটা বাইরের দিক থেকে ভেতরে আনতে হয়। ওরে, শেখার যে কোনও শেষ নেই!

যাই হোক, খুব সহজেই মাহবুবেরর সমস্যার সমাধান হলো। ওদিন ওর বাবা-মা ছিলেন না কিন্তু আজ দুজনকেই পেয়ে যাই। আমার ধারণা ছিল, অন্তত মাহবুরের স্কুলে পড়ার খরচ লাগে না। মাহবুরের মত এমন শারীরিক অসুবিধাসম্পন্ন ছাত্রের কাছ থেকে স্কুলের টাকা না-নেওয়ারই কথা। নেবে কেন? আহা, কার না ওকে দেখলে মায়া হবে! আর যে স্কুলের হাজারের উপর ছাত্র-ছাত্রী সেই স্কুলে একজন মাহবুরের জন্য এই সহায়তাটা দেওয়াটা তো বিশেষ কিছুই না।

কিন্তু মাহবুরের বাবা-মার কথা শুনে আমি হতভম্ব। বিষাদে মনটা ছেয়ে গেল। মাহবুরের মা অসম্ভব মন খারাপ করে বলছিলেন, ‘আমার মাইয়াডারে ভর্তি করার সময় সব টেকা দিছি। মাহবুরের বেলায় অনেক দিন লাগায়া ঘুরছি হেড মাস্টরের পিছনে কিন্তুক আমার কাছ থিক্যা এক টেকাও কম রাখে নাই’।  
মাহবুরের মার যে আরও ভয়ংকর অভিযোগ কেবল যে টাকা কম রাখেনি এমনই না হেড টিচার তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহারও নাকি করেছেন। মাহবুরের মার তীব্র কষ্ট এটাই, মাগনা না-পড়াতে পারলে না পড়াবে কিন্তু তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করা কেন?

আমি শুনতে শুনতে বাকহীন হয়ে ছিলাম। এমনিতে সরকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়ার খরচের জন্য ‘উপবৃত্তি’ নামে বিস্তর টাকা খরচ করে। এই স্কুলেও উপবৃত্তি চালু আছে। কিন্তু মাহবুরের বোন তানিয়া বা শারীরিক অসুবিধাসম্পন্ন মাহবুব উপবৃত্তির এক টাকাও পেল না। তাহলে কারা পায় এই টাকা? মানুষ এমন হৃদয়হীন হয় কেমন করে, কতটা নষ্ট হলে...!

১. http://www.ali-mahmed.com/2014/09/blog-post_24.html

Thursday, September 25, 2014

ইতিহাস- ‘নেতাহাস’!

এ এক বিচিত্র দেশ তেতাধিক বিচিত্র এই দেশের নেতারা। তারচেয়েও বিচিত্র এই দেশের জনগণ! এই বিচিত্র নেতাদের নিয়ে এই দেশের জনগণ নাচেন, চিত্র-বিচিত্র ভঙ্গিতে। পূর্বে ইতিহাস লিখতেন ইতিহাসবিদ এখন ইতিহাস লেখেন নেতারা। কালে-কালে সেই ইতিহাস হয়ে উঠে ‘নেতাহাস’।

ক-দিন ধরেই বিরাটসব চোঙ্গা লাগিয়ে মাইকিং হচ্ছিল, খালেদা জিয়া ব্রাক্ষণবাড়িয়া আসবেন। দেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দেবেন। এই নিয়ে দলীয় লোকজনের বিপুল উৎসাহ। খালেদা জিয়া ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় এসে বিস্তর কথা বলেছিলেন এর মধ্যে দুইটা প্রসঙ্গ নিয়েই আলোচনা।
খালেদা জিয়া বলেন, ...আমরা ইমানদার। সবসময় নামাজ পড়ি। আল্লাহকে ভয় করি...।” (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪, প্রথম পাতা)।

কে নামাজ পড়ে কে পড়ে না এই প্রসঙ্গ জনসমক্ষে নিয়ে আসার মরতবা আমি বুঝি না। যার যার ব্যক্তিগত বিষয় ঘটা করে বলার আদৌ প্রয়োজনটা কী! এমনিতে কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা আমার কাছে অরুচিকর মনে হয়। তবুও একটু বলি, খালেদা জিয়া ইমানদার-নামাজের কথা যে বলছেন এই আমরায় কিন্তু খালেদা জিয়াও আছেন। এতে কোনও সন্দেহ নেই এটা তার জীবন-যাপনের ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায়।

খালেদা জিয়া আরও বলেন, “...জামায়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে আছে তাই জামায়েত ইসলামীকে খারাপ বলছে। এখন তাদের নানাভাবে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। ...কখনও বলা হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী।...”

কখনও বলা হচ্ছে? খালেদা জিয়ার কঠিন অভিযোগ জামায়াতে ইসলামীকে স্বাধীনতাবিরাধী বলা হচ্ছে আসলে তারা স্বাধীনতাবিরোধী না। খালেদা জিয়া অর্ধেক ‘নেতাহাস’ লিখেছেন যে জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতাবিরোধী না। বাকী আছে এটা লেখা যে জামায়েতে ইসলামী ছিল স্বাধীনতাপক্ষের শক্তি কেবল এই নেতাহাসটা লিখে দিলেই আমাদের নেতাহাসের ষোলো কলা পূর্ণ হয়...।

Wednesday, September 24, 2014

আলোর পথে গুহামানব!

মাহবুবকে নিয়ে যখন লেখাটা দিয়েছিলাম [১] তখন বেশ খানিকটা ভয়ে ভয়ে ছিলাম! ওর হুইল-চেয়ারের ব্যবস্থা হবে তো? ভয়ের কারণটা বলি। ইতিপূর্বে অনেকবারই এই ধরনের সমস্যা নিয়ে লিখেছি- এ সত্য, অনেকেই মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অনেকের কাছে এমনটাও মনে হতে পারে এই রে, ব্যাটা বুঝি আবারও ‘ট্যাকাটুকা’ চাইবে! এই যন্ত্রণায় লোকজনেরা বিরক্ত হয়ে আমার লেখা পড়া ছেড়ে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। শেষে নিজের লেখা নিজেই পড়তে হবে। আমাদের দেশের দুঁদে সাহিত্যিকদের অনুকরণ করে মাথা দুলিয়ে বলতে হবে, আমি তো আমার নিজের জন্যই লিখি। শোনো কথা- ‘ট্যাটনামির’ কথা!

যাই হোক, লেখাটা দেওয়ার পর অজান্তই বিড়বিড় করতে হলো, ওরে, আপনারা এতো ভাল কেন। কেন-কেন? ইনবক্সে আলাদা ম্যাসেজ দিয়ে কয়েকজনই মাহবুবের প্রতি মমতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তো, স্বভাবতই প্রথম যিনি যোগাযোগ করেছিলেন, যিনি কোনও প্রকারেই নাম প্রকাশ করতে ইচ্ছুক নন তাঁর ইচ্ছায় মাহবুবের জন্য হুইল-চেয়ার কেনা হলো। মানুষটার প্রতি কেবল পুরনো কথাটাই বলি, আপনারা এতো ভাল কেন!

আজ মাহবুবকে এই হুইল-চেয়ারটা দেওয়ার জন্য একটা অটো-রিক্সা ভাড়া করতে হয়েছিল। আমার সঙ্গে যিনি ছিলেন তাঁর সঙ্গে বিস্তর বাদানুবাদ করেও তিনি কোনও ক্রমেই আমাকে ভাড়া দিতে দিলেন না- কেবল বাকী ছিল মারামারিটা করা। অটো-রিক্সার চালক নায্য ভাড়া নিতে চাইলেন না।
লোকজনরা শুরু করল কী! এই সমস্ত কাজ (আমার ভাষায় অকাজ) করতে গিয়ে আমার কেবল এটাই মনে হয়, আসলে আমরা বেশিরভাগ মানুষই ভাল থাকতে চাই-হতে চাই কেবল খানিকটা সুযোগের অপেক্ষা।

এটা ঠিক, হুইল-চেয়ারের নিয়ে স্কুলে যাওয়াটা একটু দূর হয়ে যায়। কিন্তু মাহবুব এখন যখন চাইবে তখেই স্কুলে যেতে পারবে তারচেয়ে জরুরি হচ্ছে এখন সে ইচ্ছা করলেই, বিষণ্ন বোধ করলেই অন্তত বাড়ির আশেপাশে যেতে পারবে। খোলা আকাশের নীচে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়াতে পারবে। চুল এলোমেলো করা বাতাসে গা জুড়াতে পারবে।

প্রথম দিন যখন মাহবুবকে দেখেছিলাম তখন এটাও মনে হয়েছিল অন্ধকার যেন গুহায় এক গুহামানব। আজ মাহবুব এবং তানিয়ার ছবিগুলো যখন আমি দেখছিলাম আমার এমনটাও মনে হচ্ছিল গুহামানব আলোতে বেরিয়ে এসেছে।
হুইল-চেয়ার দিয়ে যে মানুষটা গুহামানবকে আলোতে টেনে নিয়ে আসলেন সেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মানুষটার প্রতি আমি নতজানু হই...।

১. http://www.ali-mahmed.com/2014/09/blog-post_20.html 

Saturday, September 20, 2014

ডানা-ভাঙ্গা পাখি!

হৃদয়কে যখন হুইল-চেয়ার দেওয়া হয়েছিল [১] তখনই শুনেছিলাম এই স্কুলেই আরেকটি ছেলে নাকি পড়ে যার হাঁটাচলায় খুব সমস্যা। তখন এক শিক্ষককে বলে এসেছিলাম আমাকে এই ছেলেটির খোঁজ দেওয়ার জন্য। শিক্ষক মহাশয় আর খোঁজ দেননি! আজকালকার শিক্ষক মহাশয়ের প্রাইভেট পড়িয়ে হাতে সময় কোথায়?

যাই হোক, কেমন-কেমন করে আমার ফোন নাম্বার জোগাড় করে আশেপাশের কারও ফোন থেকে মাহবুব নামের এই ছেলেটি আমাকে ফোন দেয়। তার সঙ্গে কথাবার্তা নিম্নরূপ:
মাহবুব ক্ষীন গলায় বলে, ‘আমি ইসকুলে যাইতে চাই’।
আমি বললাম, ‘তো সমস্যা কোথায়। যাও না’।
মাহবুব এবার কুন্ঠিত হয়ে বলল, ‘আমি তো হাটতাম পারি না’।
আমার চট করে মনে পড়ে গেল আমি তো একেই খুঁজছিলাম। আমি জানি না কেমন করে একটা হুইল -চেয়ারের ব্যবস্থা হবে কিন্তু ঠিকই সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিন্তু তোমার বাড়ি থেকে তোমাকে সঙ্গে করে কে নিয়ে আসবে’?
মাহবুব হড়বড় করে বলে, ‘আমার বইন, তানিয়া। হে নিয়া যাইব। হে-ও আমার লগে ক্লাস সিক্সে পড়ে’।

অনেক যন্ত্রণা করে মাহবুবের বাড়ি খুঁজে বের করতে হলো। কেউ চেনে না কিন্তু যখন বললাম হাঁটতে যে একটু সমস্যা হয়। এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই চিনে ফেলল। কেউ-কেউ খানিকটা বিরক্তিও প্রকাশ করল: ধুর মিয়া, আগে কইবেন না, ‘ল্যাংড়া মাহবুব’। এই এক চুতিয়া পাবলিক! এরা, এরাই অপ্রকৃতস্থ লোকজনকে দেখলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। যেন এই গ্রহে এরচেয়ে মজার আর কিছু নেই!

মাহবুবের ঘরটায় ঢুকে বুকে একটা ধাক্কা খেলাম- প্রায় অন্ধকার একটা ঘর। দিনের বেলায়ও অপ্রতুল আলো! আমি যখন মাহবুবের ছবি উঠাচ্ছিলাম ফ্ল্যাশের আলোও কুলাতে পারছিল না। আমার সামনে মাহবুবকে দেখে, এর চোখের দৃষ্টি তীব্র, অতি তীব্র তাকিয়ে থাকা যায় না এমন। এই অবয়বটা দেখে কেবল মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল যেন খাঁচায় আটকানো ডানা-ভাঙ্গা এক পাখি। পার্থক্য কেবল একটাই এই খাঁচাটা আট ফুট বাই দশ ফুট। তার সঙ্গে কথা বলে আমার অনুমান যে যথার্থ তার প্রমাণ পেলাম। মাহবুবের এখন যে অবস্থা হাঁটা তো দূরের কথা সে ঠিকঠাক মতো দাঁড়াতেই পারে না। এটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না যে ২৪টা ঘন্টাই সে এই ছোট্ট ঘরটায় আটকে থাকে। ঘুরে বেড়ানো নেই, মাঠ নেই, আকাশ নেই! কিচ্ছু নেই- এর ভুবনটা আট ফুট বাই দশ ফুট নামের এক খাঁচা!

কোত্থেকে দৌড়ে আসে মাহবুবের বোন তানিয়া। আমি একে দেখে বলি, ‘ওহ, তুমিই তাহলে তানিয়া। তুমিও তো ক্লাশ সিক্সেই পড়ো?
তানিয়া লাজুক হেসে বলে, ‘আমি এইবার সেভেনে উঠতাম হইলে। হের লিগ্যাই সিক্সে রয়া গেছি। হের পড়নের খুব শখ। আমি ক্লাশের পড়া বাড়িতে আইসা হেরে লেইখ্যা দেই’।

এইটুকুন ছোট্ট একটা মেয়ে, এতো মায়া-এতো মায়া! আমি এবার পূর্ণদৃষ্টিতে তানিয়াকে দেখার চেষ্টা করি। আধো অন্ধকারে ছোট্ট এই মেয়েটি প্রায় অস্পষ্ট হয়ে আসে। ঘটনাটা আমি বুঝতে পেরে চট করে চোখ সরিয়ে নেই। চশমা আমার চোখ আড়াল করে রেখেছে, তবুও। পানিতে ছাপাছাপি চোখ দেখতে পেলে সে-এক কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে। পাগল, তা যে হতে দেওয়া চলে না।

মাহবুব নামের এই ডানা-ভাঙ্গা পাখিটার জন্য দুইটা ডানা দরকার। আধুনিক মানুষেরা যেটার নাম দিয়েছে হুইল-চেয়ার। কেমন করে, কোথায় থেকে? অতসব কী আমি জানি ছাই, কেবল যেটা জানি যত দ্রুতসম্ভব একটা হুইল চেয়ার আমার প্রয়োজন...।

১. হৃদয় এক মুক্ত বিহঙ্গ: http://www.ali-mahmed.com/2013/12/blog-post_13.html

আপডেট: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহৃদয় মানুষ মাহবুবের জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে কথা দিয়েছেন। তাঁকে কেবল ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করি না। কেবল বলি, আপনারা এতো ভাল কেন? কেন-কেন-কেন!

Thursday, September 18, 2014

বেচারা হারাধন এবং জিঘৃক্ষা।

গতকালই বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পেল সংসদ। ‘খুল্লামখুল্লা’ দলীয়করণের জন্য এই একটা প্রতিষ্ঠানই অবশিষ্ট ছিল, ঘটা করে এরও সমাপ্তি হলো। হারাধনের সবগুলো ছেলের অপঘাতে মৃত্যুর পর গভীর শ্বাস ছেড়ে বলি, বেচারা, বেচারা হারাধন!
কী কাকতালীয়! আবার ঠিক ওদিনই সাঈদীর রায়। সাঈদীর রায়ের নীচে চাপা পড়ে গেল এই সংবাদ।

স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া’ পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হবে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীকে। 
…প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ বুধবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই রায় ঘোষণা করে। এর মধ্যে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা সব অভিযোগ থেকে সাঈদীকে খালাস দেন। আর বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী আসামির মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে রায় দেন।“…(সূত্র: http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article853547.bdnews)

বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা সমস্ত অভিযোগ থেকে সাঈদীকে যে পরিত্রাণ দিয়েছেন এর পেছনে নিশ্চয়ই তাঁর অকাট্য যুক্তি, আইনি বর্ণনা রয়েছে। এই বিচারকের এহেন রায়ও গ্রহণ করতে আমার কোনও আপত্তি নাই কারণ আমার জিঘৃক্ষা অতি উচ্চ স্তরের!
কেবল...সাঈদীর বিরুদ্ধে এতো সব প্রমাণ থাকার পরও কেন সাঈদী নিষ্পাপ-নিরপরাধ স্রেফ এই বিচারকের ব্যাখ্যাটাই জানতে তীব্র আগ্রহ বোধ করছি। না-জানা পর্যন্ত আরাম পাচ্ছি না!
ভবিষ্যতে আইন কলেজে যে তাঁর এই যুগান্তকারী রায় পড়ানো হবে, আইনজীবীরা অন্য মামলার যুক্তিতর্কে একে-অন্যকে এই রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে কুপোকাৎ করে ফেলবেন এতে কোনও সন্দেহ নেই।  

Saturday, September 13, 2014

অসভ্য-ইতর-পাপিষ্ঠ এবং কুত্তা...।


Danish zookeepers kill healthy baby giraffe with a bolt gun because he was 'surplus to requirements' - then feed him to the LIONS... 

...Marius’s plight had triggered worldwide outpourings of protest, including an offer to rehome him in Britain, with many saying they were sickened by a zoo killing a healthy animal.

...After announcing plans to have Marius put down, the zoo received offers of a new home – including one from Yorkshire Wildlife Park – as well as a private buyer who offered 500,000 euros (£410,000). 

... Mr Holst said the zoo didn’t give its eight giraffes contraceptives due to ‘unwanted side effects on the internal organs’ and in order to allow animals to display natural parenting behaviour ..." (www.dailymail.co.uk)

ঘটনাটা ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনের। এই শিশু জিরাফটিকে যখন মেরে ফেলার শলা করা হচ্ছিল তখন অনেকেই চেয়েছিলেন এই জিরাফটিকে অন্যত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেবেন। এমনকি চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে ৫ লক্ষ ইউরো প্রদানের বিনিময়েও! কিন্তু সমস্ত প্রম্তাব তুড়ি মেরে এরা ঠিকই প্রকাশ্যে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে শিশু জিরাফটির! পরে সিংহকে খেতে দিয়ে দেয়। এ এক অসভ্যতার চরম পরিকাষ্ঠা। কে বলে এরা সভ্য?
অথচ এই উন্নত দেশগুলোর লোকজনেরা সিরিয়াল-কিলার, শত, হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী সেই মানুষ নামের দানবকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হলে চোখের জলে অন্তর্বাস ভিজিয়ে ফেলে।

ছবি ঋণ: www.independent.co.uk
‘গ্রহবাবা’ আমেরিকা। এরা এতোটাই ব্রেনওয়ালা যে আমাদের দেশের লেখক মহোদয়গণ আমেরিকা গিয়ে লেখালেখিও শিখে আসেন। সেই আমেরিকার মিনেসোটার মেয়র সাহেব মি. ডিউক। একটা কুত্তা। ডিউক নামের এই কুত্তা মহোদয় রীতিমতো নির্বাচনে পাশ-টাশ দিয়ে মেয়র হয়েছেন। ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক প্রায় সমস্ত মিডিয়ায় ছেয়ে গেল, “Duke the dog becomes elected mayor of Minnesota town.” 

ওই এলাকার লোকজনের কঠিন যুক্তি, “Voters said Duke guards the town and makes the community safer, even ensuring cars do not break the speed limit.” 

বটে রে, বটে- কতো বুদ্ধি ঘটে! আমি একবার তিনপেয়ে একটা কুকুরকে দেখে বড়ই কাতর হয়েছিলাম, আহারে-আহারে, কুত্তাটার একটা ঠ্যাং নাই! সম্ভবত একটা পা ট্রেনে কাটা পড়েছিল। এখন দুপেয়ে অসংখ্য কুত্তা দেখেও কেন কাতর হচ্ছি না এ এক বিস্ময়!

Monday, September 8, 2014

মুক্তিযুদ্ধে এক দুর্ধর্ষ কলম-যোদ্ধা এবং জেনোসাইড।

১৯৭১ সাল। পাকিস্তানি আর্মি যখন এই দেশের লোকজনকে মেরে সাফ করে দিচ্ছে তখন বহির্দেশে এই সম্বন্ধে তেমন-কেউ বিশেষ কিছুই জানে না। সামরিক জান্তা জানার কোনও উপায়ই রাখেনি! ঠিক তখনই একজন মানুষ এগিয়ে এলেন। অ্যান্টনি মানকারেনহাস। 

এই মানুষটা সম্বন্ধে আমরা প্রখ্যাত সাহিত্যিক শওকত ওসমানের কাছ থেকে শুনি। শওকত ওসমান তখন নিয়মিত দিনলিপি লিখতেন। তাঁর সঙ্গে মাসকারেনহাসের সশরীরে দেখা হওয়ার পর তিনি ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের দিনলিপিতে লিখেছিলেন: “...বারো দিন ছিলেন টনি সাহেব একদা পূর্ব পাকিস্তানে। সামরিক কর্তৃপক্ষের অতিথি। ফলে ওদের কার্যকলাপ, মানসিক গতিবিধি অনেক কিছু নিরীক্ষণের সুযোগ পান তিনি। ...টনি মাসকারেনহাস করাচি ফিরে এলেন। সেদিন রাতে ডিনার খাওয়ার পর ছেলেমেয়ে, স্ত্রীদের নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে বসলেন। কখন ভোর হয়ে গেছে কারও খেয়াল নেই। সাংবাদিক নিজের চোখে অসহায় নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু দেখেছেন। বাইরের জগৎকে এ কথা জানাতে না পারলে তাঁর মনে আর শান্তি নেই। 

...কিন্তু সব সময় বিবেকের আদেশ পালন করা যায়? ...টনি মাসকারেহাসের সমস্যা কম নয়। প্রথমত বাইরের জগতে এই কাহিনি পাঠানোর উপায় তো নেই। দ্বিতীয়ত, তিনি বিদেশে গিয়ে এসব ফাঁস করতে পারেন। কিন্তু তা অত সহজ নয়। আরও সমস্যা স্ত্রী-পুত্র নিয়ে যদি একদম করাচি ছেড়ে চলে যেতে পারেন, তখন সব সহজ হয়ে আসে। কিন্তু আটচল্লিশ বছর বয়সে দুই লাখ টাকা দামের বাড়ি ফেলে একদম অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া কি অত সহজ? 
...স্বাস্থ্যের অজুহাতে মাসকারেনহাসের পরিবার একদিন ইংল্যান্ড অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইলেন গৃহকর্তা। পাছে কেউ সন্দেহ করে, তাই ঘরের একটা জিনিসও গৃহিণী এদিক-ওদিক বেচাকেনার পাল্লায় ফেলেননি। (দুই লাখ টাকা দামের) গোটা বাড়ি তো পড়ে রইলই। 
 ...একদিন তিনিও ইংল্যান্ড পৌঁছালেন। পাকিস্তানের সীমান্ত পেরিয়ে তিনি বোমা ছুঁড়লেন...।” 

এর পর তো ইতিহাস। ১৩ জুন সানডে টাইমসে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হলো, ‘Genocide-জেনোসাইড’। যেন একটা আগ্নেয়গিরির মুখ খুলে গেল। সমস্ত বিশ্বকে ঝাঁকিয়ে দিল, কাঁপিয়ে দিল। এরপর একের-পর-এক অমানুষিক নির্যাতনের প্রতিবেদন ছাপা হতে লাগল টামস, নিউজউইক এবং বিশ্বের বিভিন্ন অতি প্রভাবশালী পত্রিকায়।

পরবর্তীতে এই অ্যান্টনি মাসকারেনহাস অসাধারণ এক বই লিখেছিলেন, ‘Bangladesh A Legacy of Blood. যে বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, “This is a true story;
…It is based on my close personal knowledge of the main protagonists; on more than 120 separate interviews with the men and women involved in the dramatic events; and on official archives and documents which I had the privilege to inspect personally.
…I make no apology for it. The people must know the truth about their leaders; and may we all take lesson from their mistakes.

Sunday, September 7, 2014

একমেবাদ্বিতীয়ম!

আমাদের দেশে সাহিত্যের দন্ড এখন আনিসুল হক গংদের হাতে। এটা জানার জন্য আদৌ বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। ফি বছর বইমেলার সময় জোট ছাড়ে দুধের দুধ পানির পানি। গোটা দেশের খাল-বিল, নদী-নালা, সাগর সবই আনিসুল হক গংদের বইয়ের বিজ্ঞাপনে ভেসে যাবে। বানের জলে ভেসে যাবেন শওকত ওসমান, রশীদ করিম, সরদার ফজলুল করিম প্রমুখ।

আনিসুল হক যে কেবল বিখ্যাত লেখক এমনই না তিনি অসম্ভব নরোম মনের মানুষও একজন, দয়ালু। পারতপক্ষে কাউকে ক্লেশ দিতে চান না, প্রকাশককেও। তাই তো তিনি নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেই দেন [১]। তার মুদ্রিত বই প্রেস থেকে মেলায় যওয়ার যো নেই- রাজপথেই লোকজনেরা কিনে ফেলে! মুদ্রণের-পর-মুদ্রণ শ্যাষ এই জটিল আঁকটাও আনিসুল হক নিজেই কষে ফেলেন যেটা আমরা তার দেওয়া বিজ্ঞাপনেই দেখতে পাই। 

সম্প্রতি প্রথম আলোর ঈদসংখ্য্যায় আনিসুল হকের দুর্ধর্ষ প্রেমের উপন্যাস পড়ার বিরল সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পত্রিকায় চাকরি করার সুবাদে এখানে লেখা আপনাআপনি ছাপা হয়ে যায়—বেচারা লেখককে আর তকলীফ করতে হয় না! আর পাঠক বেচারার না-পড়েও উপায় থাকে না! আনিসুল হকের প্রেমের উপন্যাসটার নাম হচ্ছে, ‘বিক্ষোভের দিনগুলোতে প্রেম’।

সময়টা এরশাদের। ‘আবীর’ বুয়েটে পড়ে। ‘শানু’ নামের একটা মেয়ের সঙ্গে কঠিন পত্রমিতালি চালিয়ে যায়। এখনকার ছেলেপেলে অবশ্য পত্রমিতালি বিষয়টা খুব ভাল একটা বুঝবে না, এখন হচ্ছে এসএমএস-ফোন-ভিডিও কলের যুগ। এই শানু মেয়েটির সঙ্গে আবীরের অবশ্য হলের ল্যান্ডফোনেও কথা হয়।

শানু মেয়েটি একদিন দেখা করার জন্য আবীরের হলে চলে আসে। তাহাদের প্রথম সাক্ষাৎ। আমরা আনিসুল হকের মুখেই শুনি:
...ঈর্ষাম্বিত অনেকগুলো চোখের সামনে দিয়ে শানুকে নিয়ে আবীর অতিথিকক্ষে প্রবেশ করে। শহীদ স্মৃতি হলের অতিথিকক্ষটা ছোট।
... শানু বলে, ব্রেক ফাস্ট করেছ? 
(আবীর) না। ঘুম থেকে তো ডেকে তুলল। করিনি। 
...আবীর উঠে গেস্ট রুমের দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। শানু উঠে দাঁড়িয়েছে। আবীর তাকে আলিঙ্গনে বাঁধে। 
শানু বলে, নাও, তোমার ব্রেক ফাস্ট। খাও। 
শানু তার ঠোঁট বাড়িয়ে দেয়।...” 
প্রথম সাক্ষাতেই শানুর এহেন আচরণে অনেকে বিভ্রান্ত হবেন। আমার মত সাধারণ পাঠক বিড়বিড় করবে, ‘নিমফোম্যানিয়াক’! কিন্তু যারা আনিসুল হকের অন্যান্য অতুলনীয় সাহিত্য পাঠ করেছেন তারা গা দুলিয়ে বলবেন, এমনটা হতেই পারে, আলবত।
যেমন ‘আমারও একটি প্রেমকাহিনি আছে' পুস্তক ওরফে কিতাব ওরফে গ্রন্থে আনিসুল হকের গল্পের মেয়েটির একটি ছেলেকে দেখে প্রতিক্রিয়া এমন:
"আমার বুক কাঁপছে। পেটের ভেতরে গুড়গুড় করছে...।"
কেন মেয়েটির পেটের ভেতরে গুড়গুড় করছে এটা আমাকে জিজ্ঞেস করা অবান্তর। এটা ডাক্তার ভাল বলতে পারবেন অথবা আনিসুল হক। তাকে কি এসএমসির স্যালাইন খাওয়াতে হবে নাকি 'পাতলা ইয়ে', সে ভিন্ন আলোচনা! 

যাই হোক, আমরা ফিরে যাই ‘বিক্ষোভের দিনগুলোতে প্রেম’ নামের লেখাটায়। আবীরের সঙ্গে শানুর দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। আনিসুল হক লিখেছেন:
...শানুকে রুমে নিয়ে এল আবীর। পুরো হলে আর কেউ নেই। শুধু একটা বন্ধ কক্ষে শানু আর আবীর। 
...শানু তাকে (আবীর) জড়িয়ে ধরে বলল, আমাকে আদর করো, অ্যাবস।
...আবীর বলল, জামাটা নষ্ট হচ্ছে। খুলে রাখো। 
শানু জামা খুলল। 
আবীর বলল, তোমার তলপেটে এটা কিসের দাগ? 
(শানু) সেলাইয়ের। সিজারিয়ান বেবি হয়েছে আমার। 
...আবীর কী করবে বুঝতে পারে না। 
শানু বলে, কাম অন ডারলিং...সে (শানু) নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। "
এভাবেই শানু ‘ইয়ের’, নেতৃত্ব তুলে নেয় নিজের হাতে। যেমনটা এই দেশের সাহিত্যের নেতৃত্ব তুলে নেন আনিসুল হক নিজের হাতে। অন্যের হাতে দিয়ে ভরসা পান না...! 

১. আনিসুল হক: একজন আদর্শ সাহিত্যিক: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_07.html
WhatsApp