Search

Tuesday, December 7, 2010

স্বপ্নের বীজ!

পূর্বের লেখায় উল্লেখ করেছিলাম [১] তাড়াহুড়োয় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। একটা স্কুলের বাচ্চাদের এই অনুষ্ঠানে আনা সম্ভব হয়নি। আমার মনে হয়েছিল দমে না-গিয়ে দুইটা স্কুল নিয়েই অনুষ্ঠানটা করে ফেলি। প্রধান অতিথির সঙ্গেও তখনও যোগাযোগ হয়নি। তিনি কি এতো স্বল্প সময়ে থাকার জন্য রাজি হবেন? মানুষটাকে ভয়ে ভয়ে দাবী নিয়ে বলি। মানুষটা সহৃদয়। আগের একটা অনুষ্ঠানেও [২] হাতে অল্প সময় নিয়ে বলেছিলাম। তখনও না করেননি, এখনও না!
আঁকার বিষয়বস্তু খানিকটা কঠিন ছিল এদের জন্য। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিস্থলের ছবি। কিন্তু...। আমার ইচ্ছা ছিল আঁকার জায়গাটা হবে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিস্থলে। ঠিক ওখানে বসে আমাদের ইশকুলের [৩] বাচ্চারা সমাধিস্থল দেখে দেখে আঁকার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। নিরুপায় হয়ে রেলস্টেশনের স্কুলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ছবি ঋণ: দুলার ঘোষ
ছবি ঋণ: দুলাল ঘোষ
ছবি ঋণ: দুলাল ঘোষ
দুই স্কুল মিলিয়ে পঞ্চাশের উপর বাচ্চারা প্রথম এমন কোন একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করল। এই প্রথম আঁকার চেষ্টা করল। সব বীজ থেকে যেমন বৃক্ষ হয় না তেমনি সব বীজই নষ্ট হয়ে যায় এটাও ঠিক না। এখানের বাচ্চারা কেউ-না-কেউ অদেখা স্বপ্ন লালন করবে। এই স্বপ্ন তাকে কেমন করে চালিত করবে এটা সময়ই ঠিক করে দেবে।

সহায়ক লিংক:
১. আখাউড়া মুক্ত দিবস: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_06.html
২. দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা, স্যালুট ম্যান: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_4596.html

৩. আমাদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_07.html

Monday, December 6, 2010

আখাউড়া মুক্ত দিবস, ৬ ডিসেম্বর

৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালে আজকের এই দিনটাতে আখাউড়া মুক্ত হয়েছিল। হঠাৎ করেই মাথায় এসেছিল, আমরা যে যেখানে আছি সেখান থেকেই যদি প্রত্যেকে ওই জায়গার মুক্ত দিবস পালন করি তাহলে লাভ যেটা হবে, এই প্রজন্ম অন্তত জানতে পারবে। এই ভাবনা থেকেই আখাউড়া মুক্ত দিবসের উদযাপন করার ভাবনাটা মাথায় আসে। আগেও অবশ্য এই দিবসটা বিক্ষিপ্ত আকারে পালন করা হয়েছে।
তো, আমি কয়েকজনের সঙ্গে এই দিনটাকে উদযাপন করার জন্য কথাও বলেছিলাম। বিস্তারিত আলোচনায় যাই না কিন্তু কোথাও থেকে আশার কথা শুনতে পাইনি।

হা হা হা। তাই বলে আমি বসে থাকব বুঝি! গতকালই মাত্র ঠিক করি, আমাদের ইশকুলের বাচ্চাদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করে ফেলি না কেন? গতকাল রবিবার, রবিবার স্কুলগুলো বন্ধ থাকে তাছাড়া এই স্বল্প সময়ে এই আয়োজন করাটা প্রায় অসম্ভব। ইশকুল: এক [১] এবং ইশকুল: তিন [২]-এর বাচ্চাদের একত্র করা যাবে কিন্তু ইশকুল: দুই-এর [৩] দূরত্বের কারণে ওই স্কুলের বাচ্চাদের এখানে আনা যাবে না। দেখা যাক...।

আখাউড়ার মুক্ত দিবস নিয়ে নৌ কমান্ডো ফজলুল হক ভূইয়ার [৪] সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু তিনি তখন আখাউড়ার ছিলেন না বলে তেমন কোন তথ্য দিতে পারেন নি। কিন্তু যে তথ্য দিয়েছেন এটা জেনে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আলী আহসান মুজাহিদ কেমন ছলনা করে ৩০ জন নৌ-কমান্ডোকে ১৯৭১ সালে হত্যা করিয়ে ছিলেন তার বর্ণনা দিলেন তিনি। পরে এই নিয়ে অন্য লেখা লিখব...।    


...

আখাউড়া মুক্ত-দিবস
১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন এস এ ভূইয়া, পরে মেজর জেনারেল হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি 'মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস' নামে তথ্যবহুল একটি বই লেখেন। ১৯৭১ সালে দুর্ধর্ষ যুদ্ধ করেও এই যোদ্ধা তাঁর যথার্থ সম্মান পাননি যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই এই লেখায় [৫]
আখাউড়া নিয়ে তাঁর লেখায় আমরা জানতে পারি:
"...নভেম্বরের ২০ তারিখের পরে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে গেল...।
... নভেম্বরের এই সময়টাতে আমরা আখাউড়ায় শক্র সৈন্যের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হই।
...এ সময় 'এস' ফোর্সের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল শফিউল্লাহর অধীনে ছিল পুরো দুই ব্যাটিলিয়ন পদাতিক সৈন্য। এ ছাড়াও ছিল কয়েকটি কোম্পানী যাকে আমরা 'সেকটর ট্রুপস' বলতাম।
...২৭ নভেম্বর কর্নেল শফিউল্লাহ মেজর মঈনকে মেরাসানী, নিরানসানী, সিঙ্গারবিল রেলওয়ে স্টেশনে, সিঙ্গারবিল ঘাটি, রাজাপুর, আজমপুর ইত্যাদি এলাকা দখল করার নির্দেশ দেন।
...কর্নেল শফিউল্লাহ মেজর মঈনকে ৩০শে নভেম্বর এবং ১লা ডিসেম্বর তারিখ রাতে এইসব এলাকা আক্রমণ চালাবার আদেশ দিয়েছিলেন।

মেজর মঈন  দ্বি-ধারা আক্রমণ চালালেন।
...এই অভিযানে আমাদের পক্ষ থেকে অংশ নিয়েছিল মুক্তিফৌজের প্রায় এক ব্যাটালিয়ন। শক্রপক্ষের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক ব্যাটালিয়নের বেশী। এই যুদ্ধে শক্রসেনারা আর্টিলারী, মর্টার, মেশিনগান ইত্যাদি ছোটবড় সব অস্ত্রশস্ত্রই ব্যবহার করে।
...আখাউড়ার এই যুদ্ধে হতোদ্যম পাকিস্তানী সেনারা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। এবং তাদের প্রচুর লোকসান স্বীকার করতে হয়। একজন শক্রসেনা জীবিত অবস্থায় বন্দী হয় এবং ২০ জন নিহত। এ ছাড়ার মুক্তিফৌজের হস্তগত হয় হানাদার বাহিনীর প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, রেশন, পোশাক-পরিচ্ছদ, ডিফেন্স স্টোর।
...পর্যুদস্ত শত্রবাহিনী সাময়িকভাবে পিছু হটলেও ২রা ডিসেম্বরের সকালে আমাদের বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং সারাদিন ধরে খন্ডযুদ্ধ চলতে থাকে। শত্রবাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে আমাদের বাহিনী পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়।
...প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির পর আমাদের বাহিনী সিঙ্গারবিলে গিয়ে জমায়েত হয়। এই যুদ্ধে শত্রু বাহিনীরও অসম্ভব ক্ষতি হয়। মুক্তিফৌজের নায়েক সুবেদার আশরাফ আলী শক্রর হাতে শাহাদাৎ বরণ করেন।
...৩রা ডিসেম্বর আমাদের বাহিনী নিজেদেরকে পুর্নগঠিত করে পাক বাহিনীর উপর পুনরায় আক্রমণ চালায়। ...এই আক্রমণে শক্রপক্ষের এগারজন সৈন্য নিহত হয়। 
...ডিসেম্বরের ৩/ ৪ তারিখে আমাদের বাহিনী পুর্নদখলকৃত এলাকাকে সুরক্ষিত করে।
...আমাদের সেক্টরে ৪ঠা ডিসেম্বরের যুদ্ধে মুক্তিফৌজের যে বীর সৈন্যরা শাহাদত বরণ করেন তারা হচ্ছেন, লেঃ বদিউজ্জামান, সিপাহী রুহূল আমিন, সিপাহী ছিদ্দিকুর রহমান।

...ডিসেম্বরের ৫ তারিখে পাকিস্তান বাহিনী আমাদের বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। কিন্তু আমাদের তীব্র আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। আখাউড়ায় তুমুল লড়াই চলে। এই লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনী ও সংযুক্ত মিত্রবাহিনী অপরিসীম বীরত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে। অবশেষে ৫ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী আখাউড়া দখল করে। ৪/ ৫ ডিসেম্বরের যুদ্ধে এই এলাকায় শক্রবাহিনীর প্রায় ১৬০ জন সৈন্য মারা যায়।
...বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে আখাউড়ার লড়াইয়ের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এখানকার যুদ্ধে উভয় পক্ষই সর্বাধিক সংখ্যক আর্টিলারী ব্যবহার করে। ...।"

(বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, সশস্ত্র সংগ্রাম, ১০ খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩২৯-৩৩৩)

সহায়ক সূত্র:
১. আমাদের ইশকুল, একhttp://tinyurl.com/3xpuov5 
২. আমাদের ইশকুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3
৩. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
৪. নৌ-কমান্ডো ফজলুল হক ভূইয়া: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_18.html
৫. পদকের পদাবলি...: http://events.amardesh.com/articles/8/1/aaaaa-aaaaaa-aaa-aaaaaa-aaaaaaaaaaa/Page1.html 

Saturday, December 4, 2010

ডিয়ার ইউনূস, এক চিলতে মাটির বড়ো প্রয়োজন

অন্য কারও কথা জানি না, ড. ইউনূসকে নিয়ে যে তোলপাড় চলছে এটা আমার ভাল লাগছে না, অন্য রকম এক কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্টের উৎস জানা নেই এমনও না!

ড. ইউনূস যে ভাবেই হোক আমাদের জন্য আন্তর্জাতিক একটা সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। শুনতে খারাপ শোনায় কিন্তু এই গ্রহে কে চেনে বাংলাদেশকে? যাও চেনে, আমাদের রাজনীতিবিদদের কারণে মুখ দেখাবার যো নেই।

ড. ইউনূস সম্মানটা নিয়ে এসেছিলেন বটে যদিও এতে আমার ঘোর আপত্তি ছিল, এখনও আছে, অপাত্রে দান! আমার আনন্দের শেষ থাকত না যদি 'আইসিডিডিআরবি'-কে এই সম্মানটা দেয়া হতো। বছরে-পর-বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ-লক্ষ শিশুর প্রাণ রক্ষা করল সেই প্রতিষ্ঠানকে না-দিয়ে দেয়া হলো কিনা এক মহা সুদখোরকে। এই দেশে একজন মেথরও ট্যাক্স দেবে, দেবেন না কেবল ড. ইউনূস [৫]
যে মানুষটার প্রতিষ্ঠান ৩০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট সুদ নেয় আবার সেই প্রতিষ্ঠান দারিদ্র বিমোচনের কথা বলে এটার চেয়ে বড়ো রসিকতা এই গ্রহে আর কী হতে পারে! মাত্র ২৪ পার্সেন্ট সুদ পরিশোধ করে প্রস্টিটিউশন-আর্মস-ড্রাগস ব্যতীত কোন বৈধ ব্যবসা করা যায় এই নিয়ে 'লাশ-বানিজ্য-পদক' [১] লেখায় আমার প্রশ্ন ছিল। সেখানে ৩০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট সুদ দিয়ে ব্যবসা? আউট অভ কোশ্চেন!

আমি প্রায়ই বেদনা নিয়ে লিখতাম, আমরা বড়ো দুর্ভাগা এই দেশে এমন মানুষের বড়ো অভাব যাকে আমরা অনুকরণীয় ভাবতে পারি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ড. ইউনূস আমার আদর্শ, আমি এই কাতারে তাঁকে ফেলতে পারলাম না যেখানে তিনি আমাদের জন্য এমন একটা সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছেন। অন্তত আমি পারিনি, রাতকে দিন ভাবতে পারি না। কারও আমার মতে আসার আবশ্যকতা নাই কিন্তু আমি মনে করি লক্ষ-লক্ষ মানুষের অভিশাপ ড.ইউনূসকে তাড়া করবে। আমি জনে-জনে এটা জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু গ্রামীন ব্যাংকের সুদের হার কত এটা কেউ জানাতে পারেননি। এমনকি গ্রামীন ব্যাংকের অনেক শাখায়ও গিয়েছি, কেউ ঝেড়ে কাশেননি! কেন? কারণ এদের স্বচ্ছতার বড়ো অভাব! এদের সুদের সঠিক হারটা আমি আজও জানি না।

আজ ড. ইউনূসকে নিয়ে যে আন্তর্জাতিক সমালোচনার ঝড় উঠেছে গোটা এই কর্মকান্ডে আমি বড়ো বিমর্ষ বোধ করছি। কী অভাগা একটা দেশ, আমার দাঁড়াবার জন্য এক চিলতে জায়গাও থাকল না! এই গ্রহের অন্য লোকজনের সামনে বুক চিতিয়ে, চোখে চোখ রেখে দাঁড়াবার মত সুযোগ থাকল না। এই কষ্ট কাকে বলি, কোথায় বলি!
এটা সত্য ড. ইউনূস আমার অপছন্দের একজন মানুষ, বিভিন্ন কারণে [২]। কিন্তু এই মানুষটা অভাগা এই দেশটার কী যে অপূরণীয় ক্ষতি করলেন এটা তিনি কল্পনাও করতে পারবেন না। একজন গুন্টার গ্রাস [৭] এবং ইউনূসের মধ্যে পার্থক্যটা সহজেই অনুমেয়। কারণ এই অভাগা দেশটার অনেকগুলো গুন্টার গ্রাস নাই।
তাঁকে নিয়ে ঠিক এই সময়টাতেই [৩] [৪] উল্লাস করার জন্য লিখেছি এমন না। আমার স্পষ্ট মনে আছে তাঁকে নিয়ে প্রথম লেখাটা লিখি ২০০৬ সালের প্রথম দিকে, 'লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস' [৫], দেশ যখন ভাসছে উচ্ছ্বাসে। তখন কঠিন একটা সময়, এমন সময়ে ড. ইউনূসকে নিয়ে লিখবে, ঘাড়ে কার কয়টা মাথা? লেখাটা যখন একটা ওয়েব সাইটে লিখি ওখানে লেখাটা লিখে তোপের মুখে পড়েছিলাম। অনেকে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, চোখ ধাঁধানো এই আলোর পেছনের অন্ধকারকে উপেক্ষা করাটা সমীচীন হবে না কারণ এই আলোর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ মানুষের দীর্ঘশ্বাস!

আসলে সত্য এবং সত্যের পেছনে মিথ্যার মধ্যে অনেক তফাত। ছোট্ট একটা নমুনা দেই। আনুমানিক ৫০ কোটি টাকা খরচ করে সাইফুর রহমান সাহেব বাইপাস রেল বসালেন সিলেটের দিকে। তৎকালীন সবাই এটা বলে বলে মুখের ফেনায় প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললেন, তাদের সঙ্গে পত্র-পত্রিকাও সুর মেলাল, এতে করে নাকি ১ ঘন্টা সময় সাশ্রয় হবে। আমি ঘড়ি ধরে দেখেছিলাম, ১ ঘন্টা না, সব মিলিয়ে আট থেকে দশ মিনিট সময় নষ্ট হতো। ৫০ কোটি টাকা জলে ফেলে সাইফুর রহমান, ব্যা হুদা ঘটা করে উদ্বোধনও করে দিয়ে গেলেন। আজমপুর নামের ছোট্ট একটা রেল স্টেশন অথচ দুই মন্ত্রীর জন্য বিশাল দুই স্তম্ভ বানানো হলো। সাইফুর রহমান সাহেব ইহলোকে নাই, ব্যা হুদাও দলে নাই, ছোট্ট এই স্টেশনটাতে যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা নাই কিন্তু এই ঢাউস আকারের স্তম্ভ ২টা আছে, পাশাপাশি। দেশব্যাপি সংঘাত কিন্তু স্তম্ভদের মধ্যে কোন সংঘাত নাই!
১ ঘন্টা সময়ের অপচয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে এ-ই!

তো, এখন গ্রামীন ব্যাংক যে ব্যাখ্যা দিয়েছে অন্যদের কথা জানি না আমার কাছে বড়ো খেলো মনে হয়েছে। আর তাদের এই সব বাতচিত, "...আমরা নোবেল পাওয়া ব্যাংক...", এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীন ব্যাংকের হেন-তেন এই সব বলা বালখিল্য আচরণ মনে হচ্ছে।

আমার বড়ো সাধ, দেশটায় একটু দাঁড়াব। এক চিলতে মাটির বড়ো প্রয়োজন...।

সহায়ক লিংক
১. লাশ-বানিজ্য-পদক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html
২. ওই আসে মহাপুরুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_04.html
৩. প্রথম আলো: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post.html
৪. ডেইলি স্টার: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_04.html
৫. লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_3333.html
৬. মামা বাড়ির আবদার: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_12.html
৭. গুন্টার গ্রাস: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_6914.html         

ইউনূস—ডেইলি স্টার, ঠাকুর ঘর, কলা, পিৎসা...

ঠাকুর ঘরে...কলা খাই না, এই সব এখন আর চলে না। যুগটা আধুনিক, বাতচিতও আধুনিক। এখন হবে, বাবুর ঘরে...পিৎসা খাই না।

'চোর কে দাড়ি মে তিনকা'- এটার আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়াবে, 'চোরের দাড়িতে শলাকা'। সহজটা মিলিয়ে করলে দাঁড়াবে 'চোরের মার বড়ো গলা'। 

ইউনূস সাহেবকে নিয়ে যে অভিযোগটা উত্থাপন করা হয়েছে এটা গতকাল প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার পত্রিকায় ছাপা হয়নি, আজ ছাপা হয়েছে। গতকাল কেন ছাপা হয়নি এই নিয়ে আমার এই লেখায় যা [১] লিখেছিলাম, এখন দেখছি এই মত পরিবর্তন করা আবশ্যক। কারণ ডেইলি স্টার এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে:
"'The Daily Star' is publishing this story a day late. For that, we owe an explanation to our readers. The news was extremely important in that it dealt with an institution and a person who brought the highest honour and accolade for Bangladesh. We seriously read the story that was released by a news agency. This newspaper wanted to verify the allegations and get an explanation from the organisation that stands accused. Moreover, this newspaper wanted to read the documents available and be sure about what has been levelled against the person and the organisation. What we have found is interesting. The allegations have been made and reported, not the answers."  [২]

ভাল-ভাল! এদের ব্যাখ্যা জেনে আমি পুরা থ! ইউনূস সাহেব নবেল লরিয়েট বলে তাঁর বিরুদ্ধে কারও কোন অভিযোগ থাকবে না! এই অভিযোগ বিষয়ে যেটা বলা চলে, এখানে এটা মূখ্য আলোচ্য বিষয় না ইউনূস সাহেব আদৌ অপরাধ করেছেন, কি করেননি।
বিষয়টা হচ্ছে, তাঁর বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে যেসব চিঠি চালাচালি করা হয়েছে তাঁর সংযুক্তিও দেয়া হয়েছে। ইউনূস সাহেব কালো, না ভালো এটা না বললেও আন্তর্জাতিক এই খবরটা পত্রিকায় আসবে এটাই সাধারণ পাঠকের প্রত্যাশা।
ডেইলি স্টার-প্রথম আলো-পিৎজা হাট-আক্কু চৌধুরী-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবগুলোই একই কারখানা থেকে বের হয়! ৮০০ পয়সা দিয়ে প্রথম আলো এই কারণে কেনা হয় না কেবল মতিউর রহমানের বাকোয়াজপনা শোনার জন্য।

আর ইউনূস সাহেব ঈশ্বর না যে তাঁর বিরুদ্ধে কোন কথা চলে না! ইউনূস কোন ছার, এই গ্রহে ঈশ্বরের বিরুদ্ধেও মামলা করা যায়! সেই মামলা কোর্ট গ্রহণও করেন। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সমনও জারী হয় কিন্তু ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয় না বলে (ঈশ্বরের কোন আবাসিক ঠিকানা নাই বিধায়) আলোচ্য মামলা অচল হয়ে পড়ে। ঘটনাটা রুমানিয়ার। পাভেল মির্চা নামের একজন ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন।
অনেকের কাছে এমন মামলা হাস্যকর-উদ্ভট মনে হতে পারে কিন্তু এখানেই হচ্ছে শেখাটুকু। কারও অভিযোগ ন্যায় কি অন্যায় সেটা পরের কথা কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার অধিকারটুকু কেড়ে নেয়ার অধিকার কারও নাই।

কেন যথাসময়ে এরা খবরটা ছাপায়নি প্রথম আলো অবশ্য এই নিয়ে কোন ব্যাখ্যায় যায়নি কিন্তু ডেইলি স্টার ব্যাখ্যা দিতে গিয়েই সব পন্ড করেছে। এরা সম্ভবত বিস্মৃত হয়েছে, এদের কাজ নিশ্চিত সূত্র উল্লেখ করে সংবাদ পরিবেশন করা, ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ করে দেয়া না। কারণ পত্রিকাওয়ালাদের কাজ জজগিরি করা না! আবার এটাও না, কারও ব্যক্তিগত বিষয়ে লম্বা নাক গলিয়ে দেয়া। 
ডেইলি স্টারের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এমন, এরা জনে-জনে, কানে-কানে ফিসফিস করে বলছে, ইয়ে বুঝলেন, এটা কাউকে বলবেন না যেন..., বুঝলেন...। 
ডেইলি স্টার কোন মানুষ হলে বলতাম, কাছে আসেন, এক কানে ফুঁ দেই, দেখবেন অন্য কান দিয়ে কেমন চমৎকার বুদ্বুদ বেরিয়ে আসছে...।

সহায়ক লিংক:
১. ল্যাজটা...: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post.html
২. ডেইলি স্টার: http://www.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=164574    

Thursday, December 2, 2010

প্রথম আলো, ল্যাজটা কায়দা করে লুকিয়ে রাখতে হয়

ব্যক্তি বিশেষকে এটা বলা চলে, আপনাকে নগ্ন দেখতে ভাল লাগে না। লিখতে কষ্ট হয়, তবুও বয়স্ক কাউকে নিয়ে লিখতেই হয়, 'একজন বয়স্ক মানুষকে অন্তত নগ্ন দেখতে ভাল লাগে না' [১]
কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠানের বেলায় এই বক্তব্যটা ঠিক মিশ খায় না। অবশ্য এটাও ঠিক, প্রতিষ্ঠানটা কে চালাচ্ছেন এটাও দেখার বিষয়। প্রতিষ্ঠান ছাই- একজন মতিউর রহমান কি চান এটাই আলোচ্য বিষয়। নইলে মতিউর রহমানের এই ধৃষ্টতা হতো না এটা বলার!
এটিএন বাংলায় মতিউর রহমান সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বেশ-বেশ! এটা আবার তিনি তার পত্রিকায় ঘটা করে ক্রোড় পত্র হিসাবে ছাপিয়েছেনও! মুন্নী সাহা অনুষ্ঠানটা শুরু করেছেন যেসব কথা বলে এটা তার গুরু মতিউর রহমানেরই শিক্ষার ফসল। যথা গুরুর তথা ছাত্র, কেবল বেচারা আনিসুল হককে নির্লজ্জ বলা কেন? সমস্যা কি এই পত্রিকার সর্বত্র আনিসুল হককে দেখলে, দাঁতসহ!
তবুও আমি মুন্নী সাহাকে টুপি খুলে সম্মান জানাই মতিউর রহমানকে কিছু তিক্ততার সম্মুখীন, বাস্তবতায় দাঁড় করাবার জন্য!

তো, এই সাক্ষাৎকারে মতিউর রহমানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "...মানুষের ডাকনাম আপনি ছেঁটে দিচ্ছেন- এ প্রসঙ্গে আপনার মত কি"?
মতিউর রহমান বলছেন, "একটি ডাকনাম মা-বাবা দেন তাঁর পরিবারের ভেতর ব্যবহার করার জন্য। সেই ডাকনামটি বাইরে সবার মধ্যে প্রচার করা আমাদের কাছে পছন্দনীয় নয়।...আমরা মনে করি, এই ডাকনাম ছেঁটে ফেলার মাধ্যমে একটি মানদন্ড নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে...।" (প্রথম আলো, ২১ নভেম্বর, ২০১০)
মতিউর রহমান কায়দা করে আমাদের-আমরা শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন, বাস্তবে হবে আমি। মতিউর রহমানের এই বক্তব্য আমার কাছে স্রেফ ধৃষ্টতা মনে হচ্ছে। কারও নাম নিয়ে জাগলিং করার অধিকার মতিউর রহমান নামের মানুষটাকে কে দিয়েছে? গোটা দেশের লোকজনকে আপনি আপনার পত্রিকার কর্মচারী ভাবছেন বুঝি? নাকি গোটা দেশের লোকজন আপনাকে তাদের নামের আকিকা দেয়ার সোল এজেন্সি দিয়েছে? আপনার পত্রিকার সার্কুলেশনই কি ফাজলামির দোকান খুলতে প্ররোচিত করে, নাকি? এরা এখনই হাঁটেন পা ফাঁক করে, পত্রিকার সার্কুলেশন ৩০/ ৩৫ লাখ হলে তখন কি করবেন? পাঠককে বাথরুমে পত্রিকা পড়া নিষিদ্ধ করে দেবেন নাকি নেংটি পড়ে পত্রিকা পড়তে বাধ্য করবেন?

যাগ গে, মতিউর রহমানকে একপাশে সরিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কথা বলা যাক। করপোরেট নামের যে ধারালো ছুঁরি দিয়ে দেশটাকে ফালা ফালা করা হয় সেই করপোরেট ছুঁরি লুকানো থাকে মতিউর রহমান, ইউনূস সাহেবদের কোমরে। এঁদের ভঙ্গিটা যে প্রায় অবিকল এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই- এই নিয়ে যে লেখাটা লেখা হয়েছিল, 'রতনে রতন চেনে' [২]
ইউনূস সাহেবের বিরুদ্ধে যে কঠিন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে তা অন্যান্য পত্রিকায় মিডিয়ায় আসলেও প্রথম আলোয় একটি শব্দও ছাপা হয়নি। কেন? এটা মতিউর রহমান ভাল বলতে পারবেন। কাক কাকের মাংস খায় না- একজন ছুঁরিবাজ আরেকজন ছুঁরিবাজের ছুঁরির ঝনঝনানি শুনতে চান না।

ইউনূস সাহেবের প্রতি যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে এর পেছনে কতটুকু সত্যতা আছে সেটা পরের বিষয় কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কঠিন এই অভিযোগটা এসেছে যা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় জোর আলোচিত হচ্ছে। তা প্রথম আলোতে না-আসার পেছনে যে যুক্তিই থাকুক আমার কাছে কেবল মনে হচ্ছে, এদের ধারণা পাঠকের মাথায় কেবল সাবানের ফেনা। আসলে সাবানের ফেনা এদের মাথায় কারণ এরা তো নিজের ল্যাজটা কেমন করে লুকিয়ে রাখতে হয় এটাই এখনও ভাল করে রপ্ত করেনি।

(প্রথম আলোকে নিয়ে লেখা [৩], এখন আমার কাছে মনে হয় স্রেফ শব্দের অপচয়! আফসোস, জেনেশুনে হয়েছি একজন অপচয়কারী...!)

সহায়ক লিংক:
১. বয়স্ক মানুষদের নগ্নতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_09.html
২. ইউনূস সাহেব...: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_28.html
৩. প্রথম আলো: http://tinyurl.com/3yadh4k

Tuesday, November 30, 2010

ক্রাচের রাজনীতিবিদ!

ছবি ঋণ: যুগান্তর
হরতাল বিষয়টা আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে বলেই সম্ভবত কথায় কথায় একজন বলছিলেন, আরে, হরতাল মান্ধাতার আমল থেকেই চলে আসছে।

মান্ধাতার আমল? আচ্ছা, মান্ধাতাটা কে আর এর আমলটা আবার কবে থেকে শুরু হলো?
খোঁজ করতে গিয়ে মজার তথ্য পাওয়া গেল। হিন্দু পুরাণ মতে, মান্ধাতা ছিলেন ভারতবর্ষের সূর্যবংশের রাজা, রাজা যুবনাশ্বের পুত্র। যুবনাশ্বের বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছিল না। অনেক তপস্যার পর সাধুরা যুবনাশ্বরের স্ত্রীর জন্য বিশেষ পানি দেন, যা পান করলে বাচ্চা হবে। কিন্তু মন্ত্রপূত পানিটা ভুলে রানীর বদলে রাজা খেয়ে ফেললে রাজা নিজেই গর্ভধারণ করেন এবং তার সন্তানও হয়! কিন্তু এই শিশুর জন্য মায়ের দুধের কোন ব্যবস্থা ছিল না বলে দেবরাজ ইন্দ্র এর সমাধান দেন; 'ধাস্যতি মাময়'- এখান থেকেই এই শিশুর নাম, মান্ধাতার উৎপত্তি।

যাই হোক, আমি পূর্বের একটা লেখায় লিখেছিলাম, হরতাল মেনে নিতে আমার কোন আপত্তি নাই যদি আমাদের রাজনীতিবিদরা ছবির ওই মহিলার মত খানিকটা কষ্ট করে দেখান [১]। এই বক্তব্যটা ছিল দেলোয়ার সাহেবের প্রতি।
এখন দেখছি সৈয়দ আশরাফ সাহেবের বেলায়ও এটা প্রযোজ্য। আশরাফুল ইসলাম মানুষটা ভারী সজ্জন কিন্তু আমাদের দেশে দেশের চেয়ে দল বড়ো! মিডিয়ায় আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, "...হরতাল আমাদের সংবিধানের একটা অংশ।...আইন করে হরতাল বন্ধের ইচ্ছা সরকারের নেই। শান্তিপূর্ণ হরতাল...।" 

একজন দুর্বল পায়ের মানুষ যেমন ক্রাচ জিনিসটায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন তেমনি আমাদের রাজনীতিবিদরা হরতাল নামের ক্রাচ ব্যতীত ভাবতেই পারেন না। এমনকি আগাম ক্রাচ কিনে রাখেন কখন কাজে লাগবে বলে। তাই এঁরা আইন করে এটা বন্ধ করবেন না কারণ এঁরা জানেন অতীতে এই ক্রাচটা এঁরা অবলীলায় ব্যবহার করেছেন, ভবিষ্যতেও লাগার সমূহ সম্ভাবনা। তাই অতি প্রয়োজনীয় অস্ত্রটা, হরতাল নামের ক্রাচ হাতছাড়া করা যাবে না।

সৈয়দ আশরাফের এটা অজানা থাকার কথা না। 'শান্তিপূর্ণ হরতাল' এটা কেবল আপনাদের সু-বচন, শুনতে ভাল শোনায়। বাস্তবে কি হয় এটা জানার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না। হরতালের নামে একটা মানুষকে খুন করে ফেললে তাকে কেউ খুনি বলবে না, একটা গাড়ির গ্লাস ভেঙ্গে ফেললে, আগুন ধরিয়ে দিলে কোন জবাবদিহি করতে হবে না। উল্টো পুলিশ আরও ধমকাবে, মিয়া, জানেন না হরতাল; আবার গাড়ি নিয়ে বের হইছেন।
এমন সময়ে পুলিশও অপরাধ করলে তাকেও জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না বরং 'সাবাসি' পাওয়া যায়। হরতালের পূর্বে যে ধড়পাকড় শুরু হয়, কোমরে দড়ি বেঁধে দলে দলে লোকজনকে সিএমএম কোর্টে হাজির করা হয়, এরা সবাই কি অপরাধি?

এঁদের মধ্যে থেকে নিরপরাধ কাউকে কি পাওয়া যাবে না যে নিরীহ মানুষটা মাত্র গ্রাম থেকে ঢাকা এসেছেন, পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। আহা, পুলিশের বুঝি লক্ষ্যমাত্রা নেই? দেখা গেল, প্রতি থানার ভাগে পড়েছে ৫০ জন অথচ থানার লোকজনরা ধরতে পেরেছেন মাত্র বিশ-পঁচিশ জন। ওসি সাহেবের চেয়ার থাকবে বুঝি! হয়তো এদের নিজেদের মধ্যে কথা চালাচালি হয়, বস, অবস্থা কেরোসিন। ১০টা শর্ট আছে। পারলে এদিকে চালান কইরা দিয়েন।

তো, মান্ধাতার আমল থেকে কিনা জানি না তবে হরতাল ছিল, আছে, থাকবে। নতুন মাত্র যোগ হলো, 'শান্তিপূর্ণ হরতাল'।
হরতালে যখন গুলি করা হবে তখন আমাদের বলতে হবে, ভাই, আস্তে গুলি কইরেন। বা গাড়ির কাঁচ গুড়িয়ে দেয়ার সময় আগেভাগে জানিয়ে দিতে হবে, কারণ নইলে চুলে কাঁচের গুড়ো আটকে থাকবে যে

*জনাব আশরাফ, আপনাকে কি মনে করিয়ে দেব আপনার নেত্রী হরতাল প্রসঙ্গে কি বলেছিলেন? "I am giving announcement to shun the politics of hartal both as prime Minister and the president of Awami League in the greater interest of the country," the Prime Minister declared while exchanging views with editors of different national dailies and news agencies at her office. (The Bangladesh Observer, November 16, 1998)

ফিরোজ গাজী, কালের কন্ঠ
হরতাল নামের দানব কেমন করে সমস্ত বিবেচনা বোধ খেয়ে ফেলে তার একটা নমুনা।

হা ইশ্বর, এরা নাকি আমাদের পুলিশ বাহিনীর লোকজন!  

সহায়ক লিংক:
১. হরতাল...: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_23.html

Sunday, November 28, 2010

রতনে রতন চেনে, ইউনূস চেনে...!

ইউনূস সাহেবকে নিয়ে যখন এই লেখাটা লিখেছিলাম, 'ওই আসে মহাপুরুষ' [১] তখন থেকে অপেক্ষায় ছিলাম, কখন সেই অপেক্ষার ক্ষণের অবসান হবে? আজ সেই দিন। আমার অপেক্ষা শেষ হলো। ইউনূস সাহেব সামাজিক ব্যবসার নামে আমাদের উদ্ধার করছেন আর এখানে আমাদের আলোচ্য মিডিয়া প্রথম আলো থাকবে না তা কী হয়!

সামাজিক ব্যবসার আড়ালে 'শক্তি' দই এসেছে, 'ভেওলিয়া' পানি এসেছে, 'এডিডাস' জুতা আসছে, আগামীতে 'জ্যাকসনিয়া' বাতাস আসবে। আশা করছি, এই সামাজিক জুতা না খেয়ে পায়ে দিলে ক্ষুধা কম লাগবে।
হরলিকস বেচারারা এখন নামকরা স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ধরে এনে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ঘটা করে বলাচ্ছে, প্রকারান্তরে কেমন করে হরলিকস গেলাতে হবে। হরলিকস খেলে পাঁচ ফুটের বঙ্গালের আট ফুট 'টলার' সন্তান হবে কেমন করে! 

বেচারা হরলিকস, এরা সম্ভবত ইউনূস সাহেবের খোঁজ পায়নি! করপোরেট বন্দুক রাখতে ইউনূস সাহেবের প্রশস্ত কাঁধ আছে কোন দিনের জন্যে!
কালে কালে এই সব কোম্পানির জন্য মামা আবদার করবেন [২], তখন আমরা তাঁর ভাগিনারা সেই আবদার রক্ষা না করে উপায় কী!
ছবি ঋণ: প্রথম আলো
আজকের প্রথম আলোয় ইউনূস সাহেবের সামাজিক ব্যবসা নিয়ে ঢাউস লেখা ছাপানো হয়েছে।
তিনি আমাদের গ্রামের বাচ্চাদের শক্তি দধি খাইয়ে খাইয়ে দেশময় পুষ্টির মহোদধি বানিয়ে দেন। হাভাতে বাচ্চাদের কেমন তন্দুরস্ত-নীরোগ করে দিচ্ছেন তার নমুনা আমরা দেখতে পাই এই ছবিতে।

সুলতান সাহেব এদের হৃষ্টপুষ্ট দেখার স্বপ্ন দেখতেন আর আমাদের ইউনূস সাহেব বাস্তবে তা করে দেখিয়ে দিয়েছেন!
মিডিয়া ইউনূস সাহেবের মুখ থেকে কি শোনাচ্ছে তা আমরা একটু শুনি:
"...দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামর্থ্যের কথা ভেবে প্রতিটি ৬০ গ্রাম ওজনের কাপের দাম রাখা হয়েছে সাত টাকা...।" (প্রথম আলো, ২৭ নভেম্বর, ২০১০)

আরেক প্রিন্ট মিডিয়া যা বলছে:
"একটি শক্তি দইয়ের দাম ছয় টাকা...।" (কালের কন্ঠ, ৩১ অক্টোবর, ২০১০)
এ পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে ইউনূস সাহেব বলছেন, "...তিনি এখন এককাপ দই বিক্রি করেন ছয় টাকায়। প্রতি কাপে এক টাকা ত্রিশ পয়সা কমিশন পান...।"
ইউনূস সাহেবের সুদের হার যেমন আজও আমার বোধগম্য হয়নি তেমনি তাঁর কথাও! তিনি বলছেন, এককাপ দই বিক্রি হয় ছয় টাকায়। কমিশন এক টাকা ত্রিশ পয়সা। মানে কী! কাপের দাম কি চার টাকা সত্তর পয়সা?

শুনতে তো ভালই লাগে। যাক, দুই চুমুক দইয়ের দাম তাহলে ছয় টাকা। অবশ্য এই কুতর্কে আমি যাব না ছয় টাকা এই দই খাওয়ালে শিশুরা এই ছবির মত হৃষ্টপুষ্ট হবে, কি হবে না! কারণ ইউনুস সাহেব বলেই দিচ্ছেন, "...সপ্তাহে দুই কাপ খাওয়ালেই তার পুষ্টির চাহিদা মিটে যাবে...।"
অবশ্যই মিটে যাবে। অবশ্য এটা এই দেশের পুষ্টিবিদরা ভাল বলতে পারবেন, এই দই সপ্তাহে দুবার খেলেই পুষ্টির 'পু' কোথায় থাকবে আর 'ষ্টি' কোথায় থাকবে। এই বিষয়ে আমার কোন মতামত দেয়াটা সমীচীন হবে না।









.



আমাদের মিডিয়ার এই বোধ, দায়িত্ব, এই ইচ্ছাটাই নাই, ইউনূস সাহেব নামের মানুষটার সব কথাই আকাশলোকের বাণী না যে কথায় কথায় কেবল অদৃশ্য ল্যাজ নাড়াতে হবে।

এক চুমুক যেখানে দইয়ের কাপ বিক্রি হয় দশ টাকায় সেখানে মিডিয়ার পক্ষে ছয় টাকা-সাত টাকা বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলার অর্থ কী!
সব বাদ দিলেও এদের দইয়ের কাপের গায়েই লেখা আছে আট টাকা! যেখানে এরা নিজেরাই লিখে রেখেছে আট টাকা সেখানে ছয় টাকা-সাত টাকা বলে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করার অর্থ কী!
নাকি আকাশলোকের বাসিন্দা মুখ হাঁ করলে 'হর্স মাউথ' মনে না-হয়ে বেদবাক্য মনে হয়? তাই বুঝি, না? আ-হা, রতনে যে রতন চেনে...।

*আমাদের ইউনূস সাহেব চড়া সুদে নিম্নবিত্ত মহিলাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছেন এটা আর যেই বিশ্বাস করুক আমি করতাম না। এই বিশ্বাসটা দৃঢ় হয়েছিল ন্যানো ক্রেডিট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে [৮]
ন্যানো ক্রেডিট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, জিরো ইন্টারেস্টেই এরা টাকা শোধ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যান সেখানে চড়া সুদ দিয়ে? এই সুদ দিয়ে ঈশ্বর ব্যবসা করলেও সম্ভবত মুখ থুবড়ে পড়তেন!

সুফিয়া খাতুন নামের যে মহিলাকে দিয়ে ইউনূস সাহেবের জোবরা গ্রাম থেকে জোব্বা গায়ে দিয়ে যাত্রা শুরু সেই ভদ্রমহিলা মারা গেছেন। তাঁর সন্তান বলেন,
"গ্রামীণ ব্যাংকের স্থানীয় কর্মকর্তারা ঘরের পাশের দোতলা পাকা দালান দেখিয়ে দিয়ে ছবি তোলায়। ...চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকা কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হয়েছিলো। গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি শোধ করতে আম্মাকে অন্যজনের কাছ থেকে আবার ঋণ নিতে হয়েছিলো।"
(bdnews24.com)
**ইউনূস সাহেব দরিদ্র হটাবার নাম করে কেমন করে টাকা-পয়সা নয়-ছয় করেছেন তার খানিকটা নমুনা পাওয়া যাবে এখানে:
দরিদ্রদের ইউনূসফাঁদ: http://bdnews24.com/bangla/details.php?cid=2&id=143014&hb=top 
         
সহায়ক লিংক:
১. ওই আসে মহাপুরুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_04.html
২. মামা বাড়ির আবদার: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_12.html
৩. bdnews24.com: http://www.bdnews24.com/bangla/details.php?id=143190&cid=2 

Friday, November 26, 2010

ফিরে দেখা: ২

কল্লোলের চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছে।
ওপাশ থেকে জামির উৎফুল্ল গলা, আচ্ছা শোন, যে জন্য ইনফ্যাক্ট ফোন করেছি। মহা সমস্যায় পড়েছি। রুমে দাঁত মাজছি। বুঝলি! রাত তখন পৌনে-।’
‘আ, জিলাপী বানাচ্ছিস কেন!’
‘কী মুশকিল, বলতে দিবি তো! বেসিনে বেশ কটা পিঁপড়া ডিনার সেরে হাঁটাহাঁটি করছে, পায়চারী-টায়চারী গোছের কিছু একটা আর কী! শালার পিঁপড়ারা সম্ভবত রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা-টবিতা পড়ে...ওয়াকস আ ন্যানো মাইল বিফোর আ স্লীপ।
‘আচ্ছা-আচ্ছা, বুঝলাম, রবার্ট ফ্রস্ট এদের কবিতা পড়ার জন্য পাঠিয়েছে। হুঁ, তারপর,’ ঘুমে কল্লোলের চোখ ভারী হয়ে আসছে। নিঃশব্দে হাই তুলল। পাগলটা কতক্ষণ জ্বালাবে কে জানে! অসাধারণ লোকগুলো আধপাগলা হয় কেন কে জানে!


জামি মহা উৎসাহে আবারও শুরু করল, ‘তুই ব্যাটা দেখি  থ্রি স্টুজেসকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিস। তো, পিঁপড়াদের সরাতে বেশ ক’বার চেষ্টা করেছি। এরা গা করছে না। এদের কাছে আমি কি, বল কি, দৈত্য না? কান্ড দেখ, আমার মত দৈত্যকে মোটেই পাত্তা দিচ্ছে না। শালা সব আহাম্মক তো, শরীরের চেয়ে চল্লিশ গুণ বেশি ওজন অনায়াসে হাসতে হাসতে টেনে নিয়ে যায়। কুলি করতে পারছি না, পেস্ট শুকিয়ে চটচট করছে। কী অবস্থা, বল দেখি।’
‘বিরাট সমস্যা,’ ঘুমে কল্লোলের দু'চোখ বন্ধ হয়ে এসেছে, হাত থেকে রিসিভার গড়িয়ে পড়তে চাইছে। চোখের পাতা জোর করে সিকিভাগ খুলে বলল, ‘এক কাজ কর, টানাটানি করে বেসিনটা খুলে ফেল। সমস্যা হলে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুড়িয়ে দে। এইবার বেসিনের পাইপে মুখ লাগিয়ে কুলি কর, আরাম পাবি।’
এই প্রথম জামি খানিকটা রেগে গেল, ‘আমি সিরিয়াস, আর তুই কী না ফাজলামো করছিস!’
‘আচ্ছা, তুই সিরিয়াস তাহলে, আই সী! এক কাজ কর, পানি ঢেলে দে।’
‘কী বলছিস, সব ভেসে যাবে
যে।’
‘ভেসে গেলে ভেসে যাবে, পিঁপড়াই তো! পিঁপড়া খাওয়ার চল এদেশে এখনও চালু হয়নি। চল থাকলে, কোটি কোটি পিঁপড়া ভাজি করে খেয়ে ফেলতি, মচ্ছব হয়ে যেত। অথবা ধর, ভাতের বদলে পিঁপড়া সেদ্ধ করে খাওয়া শুরু হল। নাম হল, 'পিঁপড়া ভাত'।’
‘এই, এই সব কী বলছিস,’ জামির আহত গলা।
‘জেনেশুনেই বলছি। মিঞা রসিক লাল, রস করার আর জায়গা পাও না! কুলি করার জায়গা পাচ্ছ না, হুপ। দুর্গের মত বাড়িতে আর বেসিন-টয়লেট নেই, নিদেনপক্ষে একটা ডিব্বাও নেই!’
জামি কিছুক্ষণ চুপ থেকে ক্ষীণ গলায় বলল, ‘আমার রুমে এ্যাটাচ বাথ নাই। এটা তুই জানিস, জানিস না? সরি, তোকে ডিস্টার্ব করলাম। বাই।’


কল্লোল কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল, ওপাশ থেকে যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ও কী রাগ করল? আধ ঘন্টা ধরে চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল! ওপাশ থেকে কেউ টেলিফোন উঠাল না! সম্ভবত টেলিফোনের প্লাগ খুলে ফেলেছে। এই আধ ঘন্টায় কল্লোল জামির তিন চৌদ্দ বেয়াল্লিশ গুষ্টি উদ্ধার করল।
কল্লোল নিজের রুমে ঢুকে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কাছাকাছি কোথাও ওয়াজ হচ্ছে। নিশুতি এ রাতে কিসের ওয়াজ! ফুল ভল্যুমে মাইক। ওর প্রচন্ড ইচ্ছা করছে, উঠে দেখে আসে, এই মধ্য রাতে ক’জনের ধর্ম উদ্ধার হচ্ছে। সংখ্যা গরিষ্ট এই ধর্মের লোকজনের কথা উপেক্ষা করলেও অন্য ধর্মের লোকজনকে যন্ত্রণা দেয়া কেন?


পূর্বে ওরা যে বাসায় থাকত, পাশেই মসজিদ ছিল। মসজিদের ছাদের সমস্ত পানি ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল রাস্তার উপর, মসজিদের অন্য পাশগুলো ফাঁকা। বর্ষাকালে রাস্তায় পানি পড়ে প্যাচপ্যাচে কাদা হয়ে যেত। লোকজন ভিজে জবজবা। বৃষ্টি থামার অনেকক্ষণ পরও চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ত।
ওই মসজিদের চারপাশে জানালা ছিল। অধিকাংশ সময় রাস্তার দিকে জানালাগুলো খোলা থাকত। মুসুল্লী সাহেবানগণ প্রচুর সময় নিয়ে গলা পরিস্কার করে, কফসহ থুথু সজোরে রাস্তার উপর ফেলতেন। একবার কল্লোলের উপর থুথু পড়ল। সর্তক হয়ে থুথু ফেলার জন্য ও কেন বলল, এ নিয়ে মুসল্লীরা বাজার জমিয়ে ফেললেন। প্রায় সবারই বক্তব্য অভিন্ন। মসজিদ থাকলে জানালা থাকবে, জানালা থাকলে থুথু ফেলা হবেই, থুথু ফেললে কারও না কারও গায়ে পড়বে, এ তো বিচিত্র কিছু না।
পরে একসময় এ মসজিদের ইমাম সাহেবকে ব্যাপারটা জানাল। ইমাম সাহেব অমায়িক ভঙ্গিতে জানালেন, নামাজীদের মত থুথুও পবিত্র। এইসব নিয়ে হইচই করায় খানিকটা ভৎর্সনাও করলেন। কল্লোল কেবল নির্বোধ চোখে তাকিয়ে ছিল, একটা কথও না-বলে ওখান থেকে সরে এসেছিল।

আগুনে সিগারেটের ছ্যাকা লাগতেই তাড়াহুড়ো করে এ্যাসট্রেতে সিগারেট ফেলল। উঠে জানালা বন্ধ করেও খুব একটা লাভ হল না। এ ঘরের ফ্যানটা নস্ট, গরমে সেদ্ধ হতে হবে। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে জামির কথা ভাবল, ছেলেটা হুটহাট করে এমন সব পাগলামী করে। বেশ ক’বছর আগের কথা। বই মেলায় এক লেখিকাকে দেখে ফট করে বলে বসল: ম্যাডাম, আপনার কি জ্যাক দ্য রিপার-এর সঙ্গে পরিচয় আছে?
ঐ ভদ্রমহিলা সম্ভবত কোন বান্ধবী-টান্ধবীর সঙ্গে গল্প করছিলেন। থতমত খেয়ে গেলেন: কি বলছেন, কে আপনি?
ম্যাম, আমি কে এটা তো আপনার জেনে কাজ নেই। আপনার গদ্য লেখার হাত পছন্দ করি, অবশ্য সব লেখা না। ওদিন লিখলেন, আপনার প্রতিভা বুঝতে পারে এমন কোন পুরুষ এ শহরে নেই। আপনার যোগ্য কোন পুরুষ নেই। ঘুরিয়ে বললে, কোন পুরুষ আপনার নখের যোগ্য না, এইসব আজেবাজে কথা। এই জন্যই জানতে চাইছিলাম, জ্যাক দ্য রিপারের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে কি না, ওই ভদ্রলোক পরম যত্নে নেইল কাটার দিয়ে আপনার পায়ের নখগুলো কেটে দিত।
লেখিকার ডাগর চোখে আগুন, শাটআপ, ইয়্যু রাস্কেল!
ইজি ম্যাম। লেখেন তো শুধু এইসব অথচ তুচ্ছ, অমানুষ পুরুষদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মাখামাখি করতে বিন্দুমাত্র সঙ্কোচবোধ করেন না। কী অসাধারণ একটা উপায়ই না বের করেছেন। অসংখ্য মূর্খ লোকজন, সরকার আপনাকে নিয়ে লাফাতে থাকবে, অজান্তেই অসম্ভব নাম করে ফেলবেন। নোবেল-টোবেল পেয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না।
কল্লোল জামিকে জোর করে সরিয়ে নিয়ে এসেছিল। জামি অসহ্য রাগে ওকে খামচে দিয়েছিল। চোখ লাল করে বলেছিল: আহাম্মক, আগ বাড়িয়ে দিলি তো পন্ড করে।
কল্লোলও সমান তেজে বলেছিল: এনাফ, যথেষ্ট পাগলামী হয়েছে।
হোয়াইট ডু য়্যু মীন বাই পাগলামী, জামি দুর্দান্ত রাগে কাঁপছিল বলেই ওর কথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। সমানে চেঁচাচ্ছিল, নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতা এইসব নিয়ে এত হল্লা করার কী প্রয়োজন। নারীরা আজ পাইলট হচ্ছে, মহাশূন্যে যাচ্ছে, বডি বিল্ডিং করছে। কাজের ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে ওদের একাগ্রতা বেশি, অনেক ক্ষেত্রে আই কিউও বেশি। নারী পুরুষে পার্থক্যটা কী? নারীদের গর্ভধারন করতে হয়, মাসের বিশেষ কিছু দিনে অনেকে কাবু হয়ে পড়ে, এই-ই তো! এটা তো কাঠামোগত পার্থক্য। একজন প্রাচীন লোকের শরীলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, যুবকের বেশি, সো। লড়াই করা উচিত মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে। নারী স্বাধীনতা কি আবার , বা...।


কল্লোল ভারী বিব্রত হচ্ছিল। কী লজ্জা, চারপাশে লোকজন জমে গিয়েছিল। আসলে জামি রেখে ঢেকে কথা বলতে জানে না। ভান জিনিসটা ওর মধ্যে একেবারেই নেই। ওদের এক বন্ধু সুবির, মহা গল্পবাজ। দুনিয়ার যতসব গায়ে জ্বালা ধরানো কথা কল্লোলরা সহ্য করে যেত। কিন্তু জামি থাকলেই সেরেছে, মহা ভজঘট। একদিন সুবির চোখ মুখ আলো করে বলছিল: জানিস, আমার মামার না ডেইলি দশ হাজার টাকার ফ্রুটস লাগে।
জামি তক্কে তক্কে ছিল, কথাটা মাটিতে পড়তে দিল না। দু’কান লম্বা হাসি নিয়ে বলল: তোর কোন মামা?
আরে ওই যে, চিনিস না, গোল্ড মার্চেন্ট।
ওয়াও, ওদের টয়লেট কটা রে, জামির নিরীহ মুখ।
সুবির চোখ ছোট করে বলল: ওদের টয়লেট কটা এ খবর জানতে চাচ্ছিস কেন!
জামি গৃহপালিত জন্তুর মত মুখ করে বলল: না মানে জানতে চাচ্ছিলাম এজন্যে, ডেইলি দশ হাজার টাকার ফ্রুটস, আঙ্গুরই পাওয়া যাবে আনুমানিক দেড় মণ। তা, দু-চারটা টয়লেটে তো কুলাবে না।
জামি, খবরদার, খবরদার বলছি, সুবির রাগে দিশেহারা।
আরে যা-যা, মামদোবাজি আর কী। শালা চাপাবাজ, আমরা ডুডু খাই না।
কল্লোলের চোখের পাতা ভারী হয়ে গেল। জামির কথা, ওয়াজের কথা সব মিলিয়ে গেল।


সহায়ক লিংক:
*ফিরে দেখা, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_24.html

Thursday, November 25, 2010

এই তালার চাবি আপনার কাছে, প্রধান বিচারপতি

প্রধান বিচারপতির বিষয়ে লিখেছিলাম, হাতের নাগালে পেলেই তাঁকে কদমবুসি করব [১]। কিন্তু এখন যেটা মনে আসছে সেটা হচ্ছে, কিছু দূর্লভ তালা আছে যে চাবির হদিস জানেন এমন মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত অল্প। প্রধান বিচারপতি সেই অল্প মানুষদের একজন!

অনুমান করি, ক্রসফায়ারের নামে কিছু মানুষ মেরেছেন (যদিও এটা তিনি স্বীকার করেন না, আমিও সরাসরি জিজ্ঞেস করি না) এমন একজনের সঙ্গে একবার কথা হচ্ছিল। আমি আমার বক্তব্যে অটল ছিলাম, কোন অবস্থাতেই ক্রসফায়ার নামের বিচার বহির্ভূত অন্যায় আমি মানি না [২]
তিনি দুঃখিত গলায় বলছিলেন, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমরা একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ধরি। আপনি কি জানেন, কখনও কখনও কতোটা ঝুঁকি নিতে হয়? আজকাল এদের কাছে যেসব অস্ত্র থাকে এসবের অনেকগুলো আমরা চোখেও দেখিনি! আর এই অবস্থায় আমি মারা গেলে আমার পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে, বলেন? কেন আমি প্রাণের ঝুঁকি নেব, দেশের জন্য? শুনতে ভাল লাগে কিন্তু আমার বউ-বাচ্চা রাস্তায় ভেসে যাবে এটা ভেবে আমার ভাল লাগে না। জানেন, আমি তো কোন উৎসাহ পাই না। আগে এই ভুলটা প্রায়ই করতাম। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে একেকজন দানবকে ধরতাম, এক সপ্তাহের মধ্যে জামিন নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসত। কী লাভ, বলেন!

ছবি ঋণ: এম সাদেক, প্রথম আলো
আমাদের বিচার ব্যবস্থার অবস্থা কী ভয়াবহ এর কতটুকুই বা আমরা জানি? এই একটা নমুনাই কি যথেষ্ঠ না। এরপর এই দেশে আর কোথাও দাঁড়াবার জায়গা আছে বলে তো আমার মনে হয় না! আজ কেউ আমাকে মেরে ফেললে আমি নিশ্চিত এক দিনের মধ্যে সেই মানুষটা জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসে পরদিনই আমার সন্তানকে মারবে। এমনটাই হবে। তাহলে আর গণতন্ত্র-গণতন্ত্র বলে চেঁচিয়ে লাভ নাই, স্রেফ জঙ্গলতন্ত্র! জঙ্গলের আইন।

টিটুর বেরিয়ে আসতে লেগেছে দেড় মাস, আমার খুনি বিটু-ফিটুর লাগবে এক দিন। কারণ প্রিন্ট মিডিয়ায় অজস্র প্রমাণ থাকার পরও টিটু জামি পেয়েছে আর আমার মত অখ্যাত মানুষের অখ্যাত খুনির খবর কে রাখবে?
মিডিয়ায় অজস্র প্রমাণ থাকার পরও এবং জামিন দেয়া প্রসঙ্গে সরকারি ল-অফিসার (পিপি) মজিবুর রহমান বলেন, "কুমিল্লার অস্ত্রবাজির ঘটনা সারা দেশে আলোচিত হয়েছে। আলোচনা হয়েছে জাতীয় সংসদেও। এ রকম ঘটনার সঙ্গে জড়িত একজন আসামি জামিন পেয়েছেন। আমার আপত্তি সত্ত্বেও মহামান্য আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আমরা তো কোনো মন্তব্য করতে পারি না।" (প্রথম আলো, ২৫ নভেম্বর ২০১০)

মহামান্য আদালতের বিরুদ্ধে কেউই কোন মন্তব্য করতে পারছেন না কিন্তু মহামান্য আদালত তো ঈশ্বর না যে কোন ভুল করতে পারেন না। মহামান্য আদালত কেন এই সন্ত্রাসীকে জামিন দিলেন এই নিয়ে আমার জানার কৌতুহল হচ্ছে। কেউ এই কৌতুহল মেটাতে পারবেন এমন ভরসা নাই। পারলে পারবেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর কাছে আমার অনুরোধ, এই মামলার বিস্তারিত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখুন। এমন একটা বহুল আলোচিত চরিত্রকে কেন জামিন দেয়া হলো সরকারি উকিলের তীব্র আপত্তি থাকার পরও! যিনি জামিন দিয়েছেন সেই বিচারককে জিজ্ঞেস করুন, লিখিত আকারে বিচার বিভাগকে অবগত করানোর জন্য আপনি উদ্যোগ নিন। এটা আপনিই পারেন, এই তালার চাবি কেবল আপনার কাছে। এই তালাবদ্ধ ঘরটা খোলা বড্ডো প্রয়োজন। সমস্ত আলো আটকে আছে ওই তালাবদ্ধ ঘরে...।

সহায়ক লিংক:
১. প্রধান বিচারপতি: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_13.html
২. ক্রসফায়ার: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_29.html   

Wednesday, November 24, 2010

ফিরে দেখা: ১

জামির মেজাজ ফরটি নাইনের জায়গায় নাইনটি ফোর হয়ে আছে। রাত বাজে একটা দশ। চার পেগ হুইস্কি গিলে ফুরফুরে ভাব নিয়ে দাঁত ব্রাশ করে কুলি করতে বেসিনে যখন দাঁড়াল, ঘড়ির কাঁটা তখন বারটা চল্লিশ, ছুঁইছুঁই। এখনও জামি ঘোড়ার মত দাঁড়িয়ে আছে। বেসিনে বেশ ক’টা কালো পিপড়া। কুলি করতে পারছে না, পানি ঢেলে দিলেই সব ভেসে যাবে।
কে যেন বলতেন এটা, দাদি? যে কাল পিঁপড়া মুসলমান। তাহলে লাল পিঁপড়া কী হিন্দু! এ মুহূর্তে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। বেসিনে বেশ ক’বার টুথব্রাস দিয়ে ঠুকঠুক করল, বিশেষ কোন হেরফের হল না। শালার পিঁপড়া করছে কী, পায়চারি-টায়চারি করছে নাকি! আগুন চোখে তাকিয়ে রইল, ভস্ম করে দিলে বেশ হত। সমস্যা হচ্ছে, এই ক্ষমতা কেবল সাধু-টাধুদের দেয়া হত। কী যন্ত্রণা, ওর এই রুমটা আবার অ্যাটাচ বাথ না। এটাও সম্ভবত মন্তাজ মিয়ার কোন চাল। এই লোকটার কি ধারণা অ্যাটাচ বাথ হলে ওই কাজটা বেশি বেশি করা হবে। পুরনো ধাঁচের এ বাড়িটা কী বুদ্ধিতে কিনেছে কে জানে!

জামি পিঁপড়া এড়িয়ে মুখ ভরে পেস্ট ফেলল। পেস্ট শুকিয়ে মুখ কেমন চটচট করছে। বিরস মুখে সিগারেট ধরাল। কেমন ঝাল ঝাল লাগছে। তিতলি যে মোর সিগারেট খায় অনেকটা ওরকম। মেয়েটা কেমন যেন বদলে গেছে। খুবই সূক্ষ্ণ পরিবর্তন কিন্তু ওর চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি! এই তো সেদিন পর্যন্ত, সারাটা দিন, নিশুত রাত অবধি টো টো করে ঘুরত। ঢাকা শহর ভাজাভাজা করে ফেলছিল। ওদিন তো জামির মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার দশা, তিতলিকে পড়ার বই ঘাঁটতে দেখে। জামি কপালে ভাঁজ ফেলে বলতে বাধ্য হয়েছিল: কি তিতলি, ওরফে প্রজাপতি, কাম ফ্রম শুঁয়োপোকা, বিষয় কি!
ভাইয়া, ভাবছি অনার্সটা দিয়ে দেব।
হাহ, আপনার সংখ্যা বয়ফ্রেন্ডদের কী গতিটা হবে তাহলে!
তিতলি মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে নখের কোন খুঁটতে লাগল। জামির আর কিছু বলতে ইচ্ছে করেনি। নিঃশব্দে ওখান থেকে সরে এসেছিল। জামি উঠে এসে বেসিনে উঁকি দিল। মাথা ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, হারামজাদা পিঁপড়া, ব্লাডি সফটিজ, লাইফ ইজ গোয়িং টু বি হেল।


পিঁপড়ার সংখ্যা আরও বেড়েছে। হারামজাদারা বাচ্চাকাচ্চা-কাচ্চাবাচ্চা সব নিয়ে এসেছে। জামি দাঁতে দাঁত ঘষল, ভাই পিঁপড়া সকল, বিষয় কী, ঘুম নাই! যান ভাইসব, ঘুমান গিয়া। সকাল সকাল উঠিয়া বলিবেন, সকালে উঠিয়া আমি পিঁপড়া মনে মনে বলি...।
মহা মুসিবত। কি করা যায়, আচ্ছা, টেলিফোন করে কল্লোল ব্যাটার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলে কেমন হয়। ওদের কি ফোন আছে এখনও, না কেটে দিয়েছে? অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো হেঁড়ে গলা ভেসে এলো, ‘কে-কে?’
‘কে কথা বলছেন, প্লিজ?

‘আপনি কাকে চান?’
‘এটা কি ২৪০৪১...?’
ওপাশ থেকে টেলিফোনের রিসিভার সম্ভবত সশব্দে নামিয়ে রাখা হল। শালার রঙ নাম্বার। জামি আবার চেষ্টা করল। ওপাশ থেকে যে কান ফাটানো শব্দ ভেসে এলো, তা জোড়া দিলে হবে, ‘কে-এ-এ-এ?’
জামি কানের পাশ থেকে রিসিভার ইঞ্চি তিনেক সরিয়ে বলল, ‘এটা কি ২৪০-?’
‘হারামজাদা, এত রাতে ফাজলামি করার জায়গা পাস না। কুত্তার ছাও! ফোন তোর হো...।’
জামি স্তম্ভিত, এ কী কথা! চট করে সামলে নিয়ে যথাসম্ভব মোলায়েম গলায় বলল, ‘ভাইয়া প্লিজ, আমার কথা শুনুন। ভাইয়া কসম, আমি তো আর আপনার নাম্বার জানি না। অন্য নাম্বারে করছি, আপনার নাম্বারে চলে যাচ্ছে। এতে আমার কি দোষ বলুন ভাইয়া, আপনি অযথা রাগ করছেন। বড় ভাই, এক্সকিউজ করে দেন।’
ভদ্রলোক সম্ভবত খানিক লজ্জিত হলেন। প্রায় শোনা যায় না এরকম গলায় বললেন, ‘আপনার নাম্বার কত?’
জামি এবার অসম্ভব অমায়িক স্বরে বলল, ‘বড় ভাইয়া, আমার উপর রাগ নাই তো?’
‘আরে না, কী যে বলেন, হে হে হে!’
‘ভাই অনুমতি দিলে একটা কথা বলি?’
‘জ্বী-জ্বী, বলেন।’
জামি শান্ত গলায় বলল, ‘য়্যু ব্লাডি ফাকিন গাই, য়্যু ব্লাডি শিট অভ আ মিউল, নাউ বাজ অফ...।’
ওপাশে কবরের নিস্তব্ধতা।
‘ভাইজান রাখি?’
লাইন কেটে গেল। ও চোয়াল শক্ত করে আবারও চেষ্টা করল। রিং যাচ্ছে কেউ উঠাচ্ছে না। রেখে দেবে ভাবছে, মেয়েলি চিকন গলা ভেসে এলো, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘আপনি কে বলছেন, প্লিজ?’
‘আমি মৌ।’
‘জিস, রাত বাজে দেড়টা, তুমি টেলিফোন ধরেছ! সরি মৌ, তোমার কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলাম।’
‘জামি ভাই! না-না, আমি তো পানি খেতে উঠেছিলাম।’
‘কী অবস্থা, তোমার গলা একদম বুঝতে পারিনি!’
‘ঘুম থেকে উঠেছি তো, তাই।’
‘ইয়ে মৌ, কল্লোল কি জেগে আছে?’
‘জামি ভাই, কী যে বলেন আপনি, এতরাতে জেগে থাকবে ভাইয়া! ও হল কুম্ভকর্ন, ঘুমের রাজা। আমি না রাতে ভাইয়ার খাটের পাশে একজগ পানি রেখে দেই। সকালে ওর মাথায় ঢেলে দেই। জামি ভাই, তখন যদি ভাইয়াকে দেখতেন। হি হি হি।’

তোমাদের টেলিফোন লাইন চালু আছে। গুড-গুড।

‘টেলিফোনের কথা কেন বললেন, জামি ভাই।
‘এমনি-এমনি। অ্যাঁ মৌ, তোমাকে টেলিফোন চালু আছে কিনা এটা জিজ্ঞেস করেছি, এটা কিন্তু তোমার ভাইয়াকে বলো না, ঠিক আছে?’
‘কেন, জামি ভাই?’
‘এমনি-এমনি, কোন কারণ নেই। তোমার ভাইয়ার সঙ্গে একটা বাজি ধরেছি, এই আর কী। তুমি কিন্তু বলো না, এ্যাঁ। কাল তোমার স্কুল আছে না, শুয়ে পড়ো। ইয়ে, কল্লোলকে একটু ডেকে দাও, বলবে আমি ফোন করেছি। খুব জরুরি দরকার।’


দীর্ঘ সময় পর কল্লোলের রাগী গলা ভেসে এলো, ‘আপনার কি সব গ্রে মেটারই আউট হয়ে গেছে। গেছে না, ঠিক ধরেছি। এবার টেলিফোনটা শক্ত করে ধরে নিজের মাথায় বাড়ি দেন।’
‘খুব মৌজে আছি রে, ফুরফুরে ভাব। খানিকটা অলিপান, আ মীন মদ্যপান করেছি। বেশি না, চার পেগ। হা হা হা। ভাবলাম তোর সঙ্গে শেয়ার করা যাক।’

তুই আবার কি ছাতাফাতা শেয়ার করবি!
আরে শুনলে তুই পাগল হয়ে যাবি।
কল্লোল রাগ চেপে বলল, ‘আজ পর্যন্ত কোন পাগল কাউকে পাগল বানাতে পেরেছে বলে অন্তত আমার জানা নাই। তা টেলিফোন করেছিস কেন?’
‘দেখলাম তুই জেগে আছিস কিনা। তুই ঘুমুচ্ছিলি নাকি? আচ্ছা যা, শুয়ে পড়।’
‘ঘুম ভাঙ্গিয়ে এখন এটা বলছিস, তুই দেখি বিরাট ফাজিল! আর আমি কি তোর মত নিশাচর ড্রাকুলা রে, যে এই মধ্যরাতে জেগে থাকব!’
‘শোন, কাল তোকে জরুরী একটা কথা বলতে ভুলে গেছি-’ এটুকু বলে জামি হাসি একান ওকান করে চুপ মেরে গেল।
‘জরুরি কথাটা কি, অবশ্য আমার ধারণা জরুরী কথাটার অর্থ আপনার জানা নেই।’
‘তোর লাল চশমাটা দেখে ভাবছিলাম এই জঘন্য জিনিস কোত্থেকে জোগাড় করলি। জিজ্ঞেস করতে পরে আর মনে ছিল না। তা, কোম্পানী কি এই একটাই মাল বাজারে ছেড়েছে, বাপ!’
‘জামি, তোর মাথাটা জোরে ঝাঁকা তো, ঝাঁকিয়েছিস? শব্দ হচ্ছে না, হচ্ছে? ঠিক ধরেছিস, কয়েকটা নাট-বল্টু ছুটে গেছে। কাল ওগুলো টাইট দিয়ে ফোন করিস।’
জামি গলা ফাটিয়ে গা দুলিয়ে হাসতে লাগল। কল্লোলের কানের পর্দা, সম্ভবত টেলিফোনের তারও কাঁপিয়ে। কল্লোল চট করে রিসিভারের কাছ থেকে কান সরিয়ে নিল। বদমাশটা দিয়েছিল কানের বারোটা বাজিয়ে। হিসহিস করে বলল, ‘জামি, এমন জঘন্য করে হাসতে আজ অবধি কাউকে দেখিনি।’
‘বাঁচা গেল-আজ তো দেখলি। অ, দেখবি কি করে, টেলিফোনে তো সে উপায় নেই! ইয়ে, বিশ্বকাপের খেলা দেখছিস না?’
‘না।’
‘আশ্চর্য, তুই একটা মানুষ!’
‘ব্যাটা গর্দভ, বিশ্বকাপের খেলা কী দেয়ালে দেখায়, টিভি থাকলে না দেখব!’
‘বলিস কী, তোদের টিভি কি হয়েছে?’
‘অ্যাকুরিয়াম বানিয়ে ফেলেছি। রং বেরং-এর মাছ ছেড়েছি।’
‘অ,’ জামি একটা জোর ধাক্কা খেল। টিভি বিক্রি করে ফেলেছে! এদের তাহলে চরম দুঃসময় যাচ্ছে। গলার ভাব গোপন করে বলল, ‘সৌদি আরব-হল্যান্ডের খেলা দেখছিলাম, বুঝলি। ক্যামেল টু ক্যাডিলাক ভাইজানরা কেমন খেলে এটাই ছিল কৌতুহল। খেলা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। তুই তো জানিস, খেলা-টেলায় আমার তেমন আগ্রহ নাই। আমি খেলা দেখা শুরু করলাম এখান থেকে, সৌদি এক, হল্যান্ড শূণ্য। আমার মনে হচ্ছিল সৌদি ভাইজানরা এক গোল খেয়ে ফেলছে। কিছুক্ষণ পর ভুল ভাঙ্গল, হল্যান্ড এক গোলে পিছিয়ে আছে। চিন্তা কর, কী বোকা আমি, ব্রেন হয়ে গেছে হালুয়া। হা হা হা।’
‘এই সত্যটা জানতে তোর এতটা সময় লাগল! তোর খুলির ভেতর বাতাস হুহু করে বয়, এটা সবাই জানে; কল্লোল রাগে গরগর করে উঠল। পাগলটার কতক্ষণে পাগলামি থামবে কে জানে! কল্লোলের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে।


সহায়ক লিংক:
* তিতলি তুমিও: http://tinyurl.com/3y93om8

Tuesday, November 23, 2010

হরতাল মানি, তবে...

যা বলেছিলাম, হরতাল নামের পশুটা এগিয়ে আসছে গুটিগুটি পায়ে [১]। এটা টের পাওয়ার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না, পশুটার গায়ের গন্ধই বিলক্ষণ বলে দেয়!
তবলার ঠুকঠাক শেষ হয়েছে, যথারীতি ৩০ নভেম্বর হরতাল ডাকা হয়েছে। না দিয়ে উপায় কি, জনগণ নাকি চাচ্ছে! জনগণ নাকি স্বইচ্ছায় হরতাল কামনা করেন, নিজেরাই নিজেদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন, মহা আনন্দে সাধের গাড়িটা গুড়িয়ে দেন।
কালে কালে এই হরতাল দেয়া হবে বৃহস্পতিবারে কারণ শুক্র-শনি এমনিতেই সরকারী ছুটি। হরতালের লম্বা ছুটিতে অনেকে যেন চুটিয়ে দেদারসে বাচ্চা পয়দা করে দেশ উদ্ধার করতে পারেন এই জন্যে। দেশের জন্য কী ভাবনা আমাদের ন্যাতাদের!

তদুপরি আমি নির্বোধ পূর্বের লেখায় লিখেছিলাম, হরতাল আমি মানি না। এই কারণে গণতন্ত্রের কি বেহাল দশা হলো এই নিয়ে নতুন করে আলোচনায় যেতেও চাচ্ছি না।
আমি এও লিখেছিলাম, হরতাল এই দেশের সমস্ত মানুষ মেনে নিলেও এই ভয়াবহ অন্যায়, ন্যায় হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি না।
এই দেশের সুশীলদের স্বর এই একটা জায়গায় এসে এমন নিম্নে ধাবিত হয় যে তাদের হর্স-মাউথ চিঁ-হিহি রব থেকে ইঁদুরের চিঁচি রব হয়ে যায়। সম্ভবত এদের মস্তিষ্কও নিম্নে ধাবিত হয়- নিম্নে না পেছনে সেই আলোচনায় গিয়ে মূল প্রসঙ্গ থেকে এখন আর সরে যাই না।
তো, এই দেশের সাদা গোঁফঅলা সুশীলরা সবাই মেনে গেলে আমার মত কুশীল না মানলে কী আসে যায়! স্রোতের প্রতিকূলে গিয়ে তো লাভ নাই তাছাড়া এই সব সুশীলরা আমাদের ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করেন আমাদেরকে ভাবান। তিন টাকা দামের কলমবাজ, আমারও না ভেবে উপায় কি?

আইন করে হরতাল বন্ধ করা হবে না কারণ বর্তমান সরকার এই অস্ত্রটা রেখে দেবে। বর্তমান সরকার যখন বিরোধী দলে থাকবেন তখন তাঁদেরও এই হরতাল নামের ক্রাচের প্রয়োজন হবে। আমাদের রাজনীতিবিদদের পা বড়ো দুর্বল-বিকলাঙ্গ, ক্রাচ ব্যতীত হাঁটার কথা ভাবাই যায় না।
এখন নিরুপায় আমিও ভাবছি, হরতাল মেনে নেব। তবে ছোট্ট একটা শর্ত আছে, খুব ছোট্ট...।
ছবি ঋণ: প্রথম আলো
এই ছবিটা প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছিল। ছবিটা উঠিয়েছেন সম্ভবত মতি ভাইয়া নিজেই। মানুষটা লাজুক, নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখতে চান না বিধায় আলোকচিত্রির জায়গায় ছাপা হয়েছে কেবল প্রথম আলো। এরা নিজেরা বদলাবে না। এই নিয়ে বিস্তর লিখেছি [২] আর শব্দের অপচয় করার কোন মানে হয় না। এই অহংকারী মিডিয়া ভুলে যায় এই গ্রহে ডায়নোসর নাই, রাশিয়া নাই...।

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। গত হরতালের পরের ছবি এটা। এই ছবিটায় যে ভদ্রমহিলা ছাদে উঠার চেষ্টা করছেন তা খুব সহজই তো মনে হচ্ছে। আমার ছোট্ট আবদার হচ্ছে, যারা হরতাল দেবেন তাঁরা এভাবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ট্রেনে ভ্রমণ করবেন, এরপর ফিরে এসে হরতাল ঘোষণা করবেন। খালেদা জিয়ার পায়ে সমস্যা আছে এই দোহাই দিয়ে হয়তো তিনি ছাদে উঠা থেকে পার পেয়ে যাবেন কিন্তু দেলোয়ার সাহেব? তাকে তো খানিকটা কষ্ট করে এভাবে ট্রেনের ছাদে উঠে দেখাতে হবে। এই বয়স্ক ভদ্রমহিলা পারলে তিনি পারবেন না কেন? দেলোয়ার সাহেব পারবেন বলেই আমার প্রবল আশা।
আর না পারলে আমি আগের কথাতেই অটল, হরতাল আমি মানি না। হরতালে আমি ঘুরে বেড়াব, পারলে ঠেকান।

সহায়ক লিংক:
১. হরতাল নামের পশুটা: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_20.html
২. প-তে পাকস্থলী, প-তে প্রথম আলো: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_07.html

Monday, November 22, 2010

মৃত্যু-ব্যবসা-তাচ্ছিল্য-অপরাধ

ক-দিন আগের কথা।
গোল হয়ে যেখানে লোকজন দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে সচরাচর ওখানে আমি ফাঁকা মাথা গলাই না। কারণ কিছু বিষয়ে আমার কৌতুহল বাড়াবাড়ি রকম কম। বাংলাদেশে ওয়ান, টু, থ্রি  বললেই বিশ-ত্রিশজন লোক জমে যায়। কিন্তু এখানে আগ্রহ হলো এই কারণে, রেল-স্টেশনের মাটিতে একজন মানুষ লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। প্রথমে আমি ধারণা করেছিলাম, হয়ত কোন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে।

খানিক পর বুঝতে পারলাম মানুষটা মৃত। মৃত মানুষ আমার কাছ থেকে খুব একট দেখা হয়নি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত অবশ্য আমি বলার চেষ্টা করি না:
"আমার একটুও ভাল লাগে না
তবু শবানুগমনে
মাঝে মাঝে আমাকে যেতেই হয়-
নেহাত মুখরক্ষার জন্যে।"

পারতপক্ষে আমি যাই না, গেলেও সেসব ক্ষেত্রে চেনা মানুষগুলো নামের লাশগুলো কেমন অচেনা মনে হতো। হয়তো নাকে তুলো গুঁজে দেয়ার কারণে বা আরও অন্যান্য কারণ থাকতে পারে কিন্তু এখন যে মানুষটাকে দেখছি এঁকে দেখে মনে হচ্ছে, মানুষটা অনেককাল পর প্রশান্তির ঘুম ঘুমিয়েছেন। যেন ঘুমাতে পেরে বেঁচে গেছেন! জানি না, এটা হয়তো আমার দেখার ভুল কিন্তু তখন তেমনটাই মনে হয়েছিল।
এই সব অহেতুক ভাবনা একপাশে সরিয়ে কাজের ভাবনা আসে, এই লাশ নামের মানুষটা প্ল্যাটফরমে এভাবে পড়ে আছে কেন? আমার অন্য রকম আগ্রহ দেখে দু-জন মানুষ এগিয়ে আসে।
আমি বলি, ঘটনা কি? আপনারা কারা?

দু-জনের মধ্যে একজনের চোখে দেখি আবার সুরমা টাইপের কিছু একটা দেয়া, এ বলে, আমরা এই লাশ দাফনাইবার দায়িত্বে আছি।
আমি অনুমান করি, এরা ডোম। আমি আবারও বলি, দাফনাইবেন কিন্তু এর পরিবার -পরিজন কই?
সুরমা চোখের ডোম, পরিবার-পরিজন কই এইটা কেমনে কমু, কারও খোঁজ নাই? বেনামে দাফন হইব।
আমি এবার অবাক হই, মানে! আপনাকে কি স্টেশন কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিয়েছে?
মানুষটা অবজ্ঞার হাসি হাসে, হে-হে, হেরার এই ময়লা ঘাঁটাঘাঁটি করার সময় নাই।
আমি বলি, বেশ। বেনামে যে দাফন হবে, তা এই মানুষটার কাছে কোন ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি?
এবার অন্য ডোমটা কিছু কাগজ এগিয়ে দেয়। কাগজে কিছু ফোন নাম্বার। আমি ফোন নাম্বারগুলোতে একের পর এক ফোন করতে থাকি। কোন হদিস বের করা গেল না। অন্য পাশ থেকে এই নাম্বারগুলো থেকে যেটা বলা হলো, এই মানুষটা তাদের এখানে বিভিন্ন সময় শ্রমিকের কাজ করেছেন কিন্তু মানুষটার বাড়ি কোথায় স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারলেন না! নামটা পর্যন্ত না!
আমি ডোমদের কাছে জানতে চাই, তা এখন আপনারা কি করছেন?
সুরমা চোখের ডোম, লাশ দাফনে খরচ আছে না! টেকা দিব কেডা? পাবলিক থিক্যা টেকা তুলতে হইব।
এ আমাকে একটা হিসাব দেয়, এদের দুজনের খরচসহ সব মিলিয়ে ১২০০ টাকা লাগবে।

আমি একজনকে বললাম, আচ্ছা, এভাবে একটা লাশ ফেলে দু-পাঁচ টাকা উঠানো কেমন কুৎসিত দেখায়। এরা তো ১২০০ টাকা না-উঠা পর্যন্ত ছাড়বে না। তাছাড়া স্টেশনে আসা শিশুরাও এটা দেখছে। দাফনে ঠিক যে টাকা খরচ হবে এটা দিলে এবং এদের দুজনের ন্যূনতম মজুরি দেয়া হলে কেউ কি এর দায়িত্ব নেবে?
কেউ দায়িত্ব নেয়া দূরের কথা। উত্তরটা আমাকে হতভম্ব করল, লাভ নাই। আপনার দেয়াটা টাকাটাই মার যাবে। আর এটাই নিয়ম। বেওয়ারিশ লাশের এভাবেই দাফন হয়।

আমার মনে পড়ে গেল পূর্বের একটা ঘটনা। আমার সিনিয়র একজন, বন্ধু মানুষ। সব মিলিয়ে চমৎকার রুচিশীল একজন মানুষ। বিদেশে থেকে এসেছেন অনেকটা সময়। এদের সন্তানাদি নাই এই কারণেও মানুষটার প্রতি আমার আলাদা মমতা ছিল। বানিয়ে বানিয়ে অনেক আশার কথা শোনাতাম। কখনও কখনও বানিয়ে নিজেকেও জড়িয়ে ফেলতাম, এই দেখেন না আমার নিজেরও এই সমস্যা ছিল...ইত্যাদি ইত্যাদি।
মানুষটা হাতে স্বর্নের বাড়াবাড়ি রকম মোটা একটা ব্রেসলেট পরতেন। একদিন আমি তাকে বললাম, আপনার পোশাক-আশাক সবই ভাল লাগে কিন্তু এই মোটা ব্রেসলেটটা চোখে লাগে। উত্তরে সবাই যা বলে তিনিও তাই বলতে পারতেন, আমার তো ভাল লাগে, তাই পরি। তাহলে কথা এখানেই শেষ হয়ে যেত।

কিন্তু তার উত্তরটা আমার ভাবনায় জট পাকিয়ে দিল। তিনি বললেন, আমি এটা পরি এই জন্যে যেন অজ্ঞাত জায়গায় মৃত্যু হলে আমার মৃত্যু পর এই ব্রেসলেট দিয়ে আমার মৃত্যু পরবর্তী খরচ চলবে।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম, মিয়া, তোমার দাফন হবে হয়তো কিন্তু কব্জী ব্যতীত কারণ কব্জী কেটে ব্রেসলেটটা যে হাপিস করে দেবে এতে কোন সন্দেহ নাই।  আমি বলব-না-বলব-না করেও বললাম, আপনার মৃত্যুর পর আপনার লাশ পাওয়া যাবে এটাই বা আপনি নিশ্চিত হলেন কেমন করে?
মানুষটা আমার উপর প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়েছিলেন এটা পরে জানতে পারি কারণ তিনি বিভিন্ন জনের কাছে আমার বিস্তর দুর্নাম করেছিলেন।

আমি একদা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, মানুষটা আর ব্রেসলেট পরছেন না। আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু ঘটনার পেছনের ঘটনা জেনে আমার মনটা বিষণ্ন হলো। এই মানুষটাকে এক মসজিদের হুজুর নিষেধ করেছেন বলে তিনি এটা এখন আর পরছেন না। হুজুর নামের এই মানুষটার দৌড় আমার জানা আছে। অশিক্ষিত একজন মানুষ। মাদ্রাসায় কেবল দু-পাতা আরবি পড়েছেন, ব্যস। পেপার পড়েন না, রেডিও শোনেন না। এই মানুষটাকে আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আচ্ছা, বাচ্চারা তো নিষ্পাপ-ফেরেশতা। তো, অন্য ধর্মের দুধের শিশু মারা গেলে তার কি গতি হবে? সে তো কোন পাপ করেনি তাহলে কেন সে বেহেশতে যাবে না'?
তিনি অনেক ভেবে টেবে বললেন, 'হ, বেহেশতে যাইব তবে ওইখানে চাকর হইব'।
আমার বন্ধুসম সেই সিনিয়র মানুষটাকে আর বলা হয়ে উঠেনি, একজন অশিক্ষিত মানুষের কথা আপনাকে বড়ই আমোদিত করল অথচ অন্তত আপনি আমার যুক্তিটাও শুনতে চাইলেন না!

যেমন আমি কায়মনে চাই। মৃত্যুর পর আমার শব নিয়ে কি করা হবে এই নিয়ে আমার কাতরতা নাই বরং এরচেয়ে আমি কাতর যে কারণে আমার মৃত্যুটা আমি যেখানে জন্মেছি, নড়বড়ে পড়ো বাড়ি নামের আমার বাসাটায়, সেখানেই যেন হয়। আমার ধারণা, এতে আমার মৃত্যুযন্ত্রণা কম হবে। এটাই আমার সুতীব্র ইচ্ছা।
বাস্তবে ফিরে আসতে হয়। আমি প্রিন্ট মিডিয়ার কারও কারও কাছে সহায়তা চাইলাম কিন্তু এদের এরচেয়ে অনেক জরুরি কাজ রয়ে গেছে। ভাবখানা এমন, বয়েই গেছে এই সামান্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে। অথচ এদের কাজই এটা, প্রয়োজনীয় সমস্ত ধরনের সুবিধা এদের হাতের নাগালে। আফসোস, এদের এখন তথ্যের পেছনে ছুটতে হয় না, তথ্য এদের পেছনে ছোটে।

একটা মানুষ আর ফিরে আসবে না এই নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যথা নাই! কে নিশ্চিত করে বলতে পারবে এই মানুষটার কেউ-ই নাই। অন্তত জড়িয়ে ধরে রাখার মত কেউ ছিল না! কে মাথার দিব্যি দিয়ে বলতে পারবে, এই মানুষটা কাজ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাঁর কিশোরী মেয়েটি গলা ধরে ঝুলে বলেনি: বাজান, ফির‌্যা আসার সময় আমার লিগ্যা লাল রেশমি চুড়ি নিয়া আইবা কিন্তুক।
মানুষটির পরিবার, এই কিশোরিটি কখনও জানবেই না- মৃত্যুর আগ অবধি বাবার অপেক্ষায় থাকবে। বাজান, এমুন করল ক্যান? মানুডা আর আসল না, রেশমি চুড়িও নিয়া আইলো না...কেন-কেন-কেন?  
কী অভাগা একটা দেশ! কত শস্তা একটা প্রাণ! কী তাচ্ছিল্য একটা মানুষের শেকড় খোঁজার চেষ্টায়...।

*আমার লেখার প্রয়োজনে আমি চাচ্ছি, লাশ নামের এই মানুষটার ছবি এখানে থাক। তবে এই লেখার একেবারে নীচে ছবিটা রাখছি। শবের ছবি দেখতে যাদের সমস্যা আছে তাঁরা দয়া করে এখান থেকেই বিদায় নিন।


.
..
...
....
.....
......
.......

   

Saturday, November 20, 2010

গুটিগুটি পায়ে এগুচ্ছে 'হরতাল' নামের পশুটা

এটা পুরনো লেখা, রি-পোস্ট! এই লেখাটা গত বছর [০] যখন লিখেছিলাম তখন ওখানে লিখেছিলাম: "কে জানে, বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি [০১] করে হয়তো হরতালের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করা হবে"। আসলে এটা জানার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। দেশ জাহান্নামে যাক দলবাজী ঠিক থাকুক [১]। ফল যা হওয়ার তাই হয়!
শীতের যেমন না এসে উপায় নেই- শীত যেমন আসি আসি করছে, হরতাল নামের পশুটাও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসবে এতে সন্দেহ কী! প্রবল আশা, হরতালের পদ্ধতি বদলাবে- ডিজিটাল [৪] হরতাল নামের নতুন কোন জিনিস প্রসব হবে। 

"শুভ'র ব্লগিং" থেকে পুরনো লেখাটা আবারও দেয়ার কারণ হচ্ছে, এখন আবার দেখছি আমাদের মহান রাজনীতিবিদরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হরতালের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের কথা বলে গলাবাজি করছেন। আমাদের রাজনীতিবিদ- একেকজনের ত্যাগের নমুনা দেখে [২] কাঁদব না হাসব বুঝে উঠতে পারি না! আমাদের রাজনীতিবিদ মহোদয়গণ অপচয়ে কেমন অভ্যস্ত এর একটা নমুনাই যথেষ্ঠ [৩]
আগেও একটা লেখায় লিখেছিলাম, এমনিতে এয়ারপোর্ট-টেয়ারপোর্টের নাম না বদলে একবারে দেশের নাম পাঁচ বছরের জন্য বদলে ফেললেই তো ঝামেলা চুকে যায়। নাম রাখা যেতে পারে 'আওয়ামী বাংলাদেশ' বা 'জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ'।

হরতাল নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখলাম নতুন করে আসলে লেখার কিছু নাই। ভঙ্গি একই, কেবল জলিল সাহেবের জায়গায় দেলোয়ার সাহেব। আর আমরা হচ্ছি দাবার গুটি। এঁরা 'হরতাল হও' বলবেন আর গোটা দেশ থেমে যাবে। আমাদের দেশের লোকজনরা এই অন্যায় মানেন কেমন করে এটাই আমার বোধগম্য হয় না। এ তো অন্যায়, ভয়াবহ অন্যায়!
গোটা দেশের লোকজন মেনে নিক, আমি মানি না। গোটা দেশের লোকজন এটাকে ন্যায় মনে করলেই অন্যায় ন্যায় হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি না।   
... ... ... ...
"...এ গ্রহের সবচেয়ে বড়ো কারাগার- কয়েদী সংখ্যা আনুমানিক ১৬ কোটি! অবশ্য কারাগারটা ৩৬৫ দিন চালু থাকে না, এটাই আমাদের জন্যে ভারী বেদনার! পৃথিবীতে ফাইভ স্টার সুবিধাসহ, বেশ কিছু বিচিত্র কারাগার আছে, ওইসব নিয়ে না হয় অন্য দিন কথা বলা যাবে। আমি যেটার কথা বলছি, এখানে আপনি যা খুশি তা করতে পারবেন না, ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলে কিছু থাকবে না।

কারাগারটা হচ্ছে বাংলাদেশ, আমাদের সোনার বাংলাদেশ- গোটা দেশটাই সোনার হয়ে গেছে, মাটি কোথায়- আফসোস, কাউকে কবর দেয়ার জায়গাটুকুও নাই! 

তিনি [৫] যেমন বলেছিলেন হও, আর হয়ে গেল, তেমনি বিরোধীদল (যখন তাঁরা ক্ষমতায় থাকেন না, বিরোধীদল বা যাহার জন্য প্রযোজ্য) বললেন, হরতালের নামে কারাগার হও- ব্যস, হয়ে গেল! এবং আপনার জীবনের দাম যাই থাকুক, এ দিন আপনার জীবন রক্ষার দায়িত্ব ঈশ্বর ব্যতীত আর কারও না। কী এক কারণে যেন এদিন ঈশ্বরের ভারী ঘুম পায়!
এদিন বড়ো মজা, অনেক চাকুরীজীবীকে অফিস করতে হয় না। এদের অহরহ প্রার্থনা থাকে, কেন যে সারাটা বছর হরতাল থাকে না। মাস শেষে খালি গিয়ে বেতনটা উঠিয়ে আনা। হরতালে আর কিছু না হোক আমরা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেই যাচ্ছি, জনশক্তি বড় শক্তি! ইনশাল্লা, হরতালের কারণে জনশক্তি বিষয়ে আমরা যথেষ্ঠ অবদান রাখব। ১৬ কোটি একদিন ৬১ কোটি হবে...।

এদিন ইচ্ছা করলেই গান পাউডার দিয়ে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া যায়। আমাদের অনেকের বাড়ীর চুলায় বিড়াল ঘুমায় কিন্তু এমন একটা দিনে আমাদের পায়ের শব্দে রাজপথ থরথর কাঁপে। ইচ্ছা করলেই গাড়ি ভেঙ্গে ফেলা যায়, ইচ্ছা করলেই পেট্রোল ঢেলে কারও গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া যায়, আগুনের লেলিহান শিখায় আমাদের রক্তের কথা মনে পড়ে যায়। চড়চড় শব্দ করে যখন মানুষের চামড়া পুড়তে থাকে, শরীরে ঝনঝন করে একটা ভাল লাগা ছড়িয়ে পড়ে! মানুষের চামড়া পোড়ার গন্ধে আমাদের এখন আর গা গুলায় না!
ঈশ্বর নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখেন!

এদিন ইচ্ছা করলেই আমরা বাবার বয়সী একজন অফিসযাত্রীর গায়ের কাপড় এক এক করে খুলে নগ্ন করে ফেলতে পারি [৬] এক সময় তিনি অবিকল ভিক্ষুকের গলায় ভারী কাতর হয়ে হাহাকার করে বলবেন, '...আমাকে কেউ আল্লারওয়াস্তে একটা কাপড় দেন'। আমরা সবাই গোল হয়ে তামাশা দেখি- আহা, তার সন্তানকেও যদি এনে এ তামাশাটা দেখাতে পারতাম [৭]! অন্তত বিটিভিতে উপস্থাপক হয়ে লম্বা লম্বা বুলি কপচানো যায়।
ঈশ্বর অন্য দিকে তাকিয়ে থাকেন!


হরতাল, এ গ্রহের সবচেয়ে কুৎসিত বেশ্যার গর্ভে যার জন্ম। হরতাল নামের গা ঘিনঘিনে জন্তুটা জন্ম দিচ্ছে অসংখ্য দানবের। যে আমাদের, এক ফোঁটা রক্ত দেখলে গা গুলাতো আজ সেই রক্তের স্রোত মাড়িয়ে নির্বিকারচিত্তে আমরা হেঁটে যাই। গণতন্ত্রের জন্য গরম গরম রক্তের স্রোতের উপরে হাঁটাটা আমাদের জন্য খুব জরুরি!
ঈশ্বর গালে হাত দিয়ে ভাবনায় তলিয়ে যান!
 

হরতাল নামের এ দানবটা ক্রমশ আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে, আমরা নপুংসকরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। এ দেশের সেরা সন্তানরা তাঁদের মস্তিষ্ক ...-এ জমা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। টনকে টন কাঁচামাল পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। বিদেশীদের মাথায় গন্ডগোল না থাকলে এ দেশে বিনোয়োগ করার কথা না [৮], কেন করে আল্লা মালুম! হয়তো আর অন্য কোন দেশে আমাদের দেশের মতো শোষণ করার সুযোগ অপ্রতুল!
ঈশ্বর থুথু ফেলেন!


হরতালে একটা লাশ আমাদের বড়ো প্রয়োজন। যে হরতালে অন্তত একটা লাশ পড়বে না ওই হরতাল সম্বন্ধে মিডিয়া বলবে বা মিডিয়ায় লেখা হবে, ঢিলেঢালা হরতাল পালিত হইয়াছে।
একটা লাশ পেলে নেতাদের আনন্দ-আমোদের শেষ নাই। ঝড়ের গতিতে ছুটে যাবেন লাশের পরিবারের বাসায়, কোন একজনকে ধরে কান্না কান্না ভাব করবেন, মিডিয়া ফটাফট ছবি তুলবে। সেই ছবি আমরা পরের দিন পত্রিকায় বিশাল আকারে দেখি। নিউজপ্রিন্ট ভিজে যায়।

...
আমি আইন সম্বন্ধে খুবই অল্প জ্ঞান রাখি, তবুও আমার অল্প জ্ঞান নিয়ে বলি, টর্র্ট আইনের মাধ্যমে অনায়াসে মামলা করতে পারার কথা। কিন্তু এ পর্যন্ত কয়টা মামলা হয়েছে? হরতাল-অবরোধে, আমাদের ক্ষতির একশোটা কারণ থাকতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, কে বাঁধবে বেড়ালের গলায় ঘন্টা- এটা খুব চমৎকার একটা পাশ কাটানোর অপবুদ্ধি, গণতন্ত্রের অপ-মহাযন্ত্র।
আমাদের এ প্রজন্মই পারবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে। ইচ্ছা করলেই এটা সম্ভব, প্রয়োজন হলে চাঁদা তুলে মামলা করা যায়, প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার।
ঈশ্বর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন...।"


এটা অনেক পুরনো লেখা। পূর্বে একটা লেখায় লিখেছিলাম: "...বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন আওয়ামী লীগ সম্ভবত ১৭৩ দিন হরতাল দিয়েছিল কিন্তু ১৭৩ সেকেন্ড আগেও বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে হটাতে পারেনি। এই হচ্ছে ন-মু-না" [৯]! তাহলে এই সব ফাজলামি করার মানে কী!
এখন আমার স্পষ্ট বক্তব্য, আইন করে হরতাল বন্ধ করা হোক। যিনি হরতাল ডাকবেন তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক। হাইকোর্ট কত সুয়োমটো রুল জারি করেন, পারেন না আর একটা জারি করতে যেন কোন ইস্যুতে কেউ কখনও হরতাল করতে না পারে।

সহায়ক লিংক:
০. পুরনো লেখা: http://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_26.html
০১. বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_24.html
১. দলবাজী: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_09.html
২. মহান রাজনীতিবিদ: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_12.html
৩  অপচয়: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_16.html
৪. ডিজিটাল: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_8733.html 
৫. তিনি: http://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_18.html 
৬. গণতন্ত্রের বলি: http://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_22.html
৭. গণতন্ত্রের শিশু: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_18.html
৮. বায়ার: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_5073.html
৯. অসভ্যতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_16.html