Search

Sunday, January 18, 2015

চোখ খুললেই...।

চালু এই দৈনিকটির দাবী, ‘চোখ খুললেই প্রথম আলো’। এটা উচুমার্গের লোকজনের জন্য হতে পারে কিন্তু আমার মত সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই বাণীটির বিশেষ যোগ নাই কারণ চোখ খুলেই আমার মত অতি সাধারণ মানুষ দৌড়াঝাঁপ শুরু করি লাগোয়া টাট্টিখানা হালের ওয়শরুমে। অতঃপর কি হয় সেটা নিয়ে বিশদ আলোচনায় যেতে চাচ্ছি না।

২০১৩ সালে একটা লেখা লিখেছিলাম ‘খবরের পেছনের খবর’ [১] শিরোনামে। অনেকটা
ছবি সূত্র: প্রথম আলো, ১৩ জানুয়ারি ২০১৫
ওরকমই একটা ছবি ছেপেছে প্রথম আলো ১৩ জানুয়ারি ২০১৫ সালে। এমন একটা ছবি যখন প্রথম আলোর মত পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয় তখন এটাকে হালকা করে দেখার কোনও সুযোগ থাকে না। গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়। গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার পূর্বে আমার কিছু ‘কুশ্চেন’ ছিল। মতিউর রহমান ওরফে মতি ভাইয়ার কাছে কিছু সওয়াল এমন:

১. যে পুলিশ স্যার বন্দুক উঁচিয়ে রেখেছেন তারা কি এভাবে বন্দুক উঁচিয়েই রওয়ানা হন? গন্তব্যস্থলে না-পৌঁছা পর্যন্ত কি বন্দুক নামাবেন না?
২. পুরো যাত্রাপথে ভঙ্গি কি অদল-বদল হয় নাকি একই, এমনই থাকে?
৩. সর্বক্ষণ কি বন্দুক সেফটি-ক্যাচ অফ করা অবস্থাতেই থাকবে?
৪. গুলি করার পূর্বে সতর্ক করার জন্য কেমনতরো হুমকি দেওয়া হয়, ‘নড়োছো কি মরেছো’? বা 'হবরদার, মাথায় আলু বানিয়ে দেব কিন্তু...'।
৫. ছবিতে বোঝা যাচ্ছে না বিধায় জানার প্রবল আগ্রহ, এটা কি ব্রিটিশ আমলের অত্যাধুনিক (!) থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, যেটা দিয়ে আদৌ গুলি বের হয় কিনা এটা একটা জটিল গবেষণার বিষয় (সরকার নিলামে তুললে যেটা এন্টিক হিসাবে সংগ্রহ করার গোপন ইচ্ছা আছে আমার)।
৬. পুলিশ স্যারের খাওয়া-দাওয়ার উপায় কি? নাকি অন্য কেউ খাইয়ে দেন?
৭. বাথরুম সমস্যার সমাধান কি? নাকি অন্য কেউ করিয়ে দেন?
মতি ভাইয়া সওয়াল-জবাব পর্ব সমাপ্ত করলে আমার আরও কিছু প্রশ্ন আছে তখন সেটা করা যাবেখন।

এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে লোকোমটিভের পাইলট ওরফে ড্রাইভার সাহেবকে। তেমন উল্লেযেযোগ্য বিশেষত্ব নেই। ছবিতে আলোর কারসাজির কারণে ভেতরটায় তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এমনতরো ছবিকে সাবানপানিতে ধোয়ার নিয়ম নেই বিধায় খানিকটা ব্রাইটনেস বাড়িয়ে দেয়া যাক।
এখন দেখা যাচ্ছে লোকোমোটিভের ভেতরে লোকজনের অভাব নেই। আরও লোকজন উঠার জন্য অপেক্ষায়মান। ঘটনা কী? বিশেষ কিছু না! এরা ড্রাইভার ওরফে পাইলট সাহেবকে মাথাপিছু টাকা দিয়েছে বিনা টিকেটে ভ্রমণ করার উদ্দেশ্যে।
রেলওয়েতে কঠিন নিরাপত্তা চলছে বটে! এদের কেউ যদি ‘ডেরাইভার’ সাহেবের চাঁদিতে দু-চার ঘা বসিয়ে অজ্ঞান করে ট্রেন থেকে ফেলে দেয় তাহলে আটকাচ্ছে কে! বা লোকেমেটিভের আগুন ধরিয়ে দেয়, ট্রেনটার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেয় অথবা ট্রেনটা দুর্ঘটনায় ফেলতে চায় তবে তাদের জন্য সেটা হবে জলবৎতরলং- পানির মত সোজা।

সহায়ক সূত্র
১. খবরের পেছনের খবর: http://www.ali-mahmed.com/2013/04/blog-post_14.html

Wednesday, January 14, 2015

ফ্লাই এওয়ে পিটার, ফ্লাই এওয়ে...।


এই মানুষটাকে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পেয়েছিলাম ঠিক এই অবস্থায়। রক্তাক্ত মুখ, মুখে না-কামানো কাচা-পাকা দাড়ি। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে আমার বোঝার বাকী রইল না খাবারের সঙ্গে বিষাক্ত কিছু একটা খাইয়ে এই মানুষটাকে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়েছে।

এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে আমি খুব একটা আরাম বোধ করি না কারণ এটা বিস্তর ঝামেলার কাজ। ইচ্ছা করলেই এই মানুষটাকে হাসপাতালে ভর্তি করা যাবে না। স্টেশন মাস্টার ‘মেমো’ দিলে রেল-পুলিশকে দিয়ে ভর্তি করতে হবে। সোজা কথা, এটা পুলিশ কেস।

বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে লম্বা-লম্বা পা ফেলে এখান থেকে হেঁটে চলে যাওয়া, শত-শত হাত দূরে। আমি বুদ্ধিমান এমন দাবী আমি অন্যের কাছে দূরের কথা নিজের কাছেও করি না। কিন্তু আমি খানিকটা আতংকিত কারণ... আমি আমার গায়ের পশুটার গন্ধটা ঠিক টের পাই যেমনটা পাচ্ছিলাম তখন। আমার ভেতরের পশুটা অনবরত বকে মরছে, সরে পড়-সরে পড়, আলগোছে সরে পড়।
পশুটা বকে মরে কিন্তু আমার চোখে ভেসে উঠে এই মানুষটা তো কেবল একটা সংখ্যা না। হয়তো এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোঁচকানো চামড়ার খকখক করে বেদম কাশতে থাকা বুড়ো-বুড়ি। নাকের নথনাড়া ঢলঢলে মুখের বধূটি। গাল ফুলিয়ে থাকা কিশোরী যার চোখের কাজল লেপ্টে যাচ্ছে এটা ভেবে ভেবে যে, বাপজানটা কেমুন অখনো আমার কাঁচের চুড়ি লয়া আইলো না।

এরপর পশুটির কথা ভাবাভাবির সময় কোথায় আমার! কত কাজ, স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে মেমো নেওয়া, একে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ভ্যান যোগাড় করা, রেলের একজন আনসারকে খুঁজে বের করা- যে মানুষটা আনুষ্ঠানিক ভাবে একে হাসপাতালে ভর্তি করাবেন। অবশ্য একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেলে আর চিন্তার কিছু নেই এটা বলতে পারলে ভাল লাগত কিন্তু হাসপাতালে কখনই ওষুধ নামের জিনিসগুলো থাকে না। সেটা অবশ্য খুব বড় একটা সমস্যা না।
রোগির সঙ্গে যে আনসার নামের মানুষটা গেছেন, পলাশ- একে দেখে মনে হচ্ছে বাংলা সিনেমায় নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করলে কেউ আপত্তি করবেন এমনটা তো আমার মনে হয় না।
যাই হোক, মানুষটা চলে গেলেন তার শেকড়ের কাছে। গুড বাই হানিফ। ফ্লাই এওয়ে পিটার, ফ্লাই এওয়ে হানিফ...।

Tuesday, January 13, 2015

পা-কাটা শিশু এবং মিডিয়ার ভোগান্তি-ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়: ২!

দিনাজপুরের ট্রেনে বেজায় ভিড় বললে কম বলা হয়! ট্রেনটা কমলাপুর স্টেশন পৌঁছার পর হুড়মুড় করে যাত্রীরা নামা শুরু করল। প্রথমে এটা ভাল করে লক্ষ করিনি- ছাদ থেকে একজনকে দেখলাম বিশাল-বিশাল বোঁচকা ফেলছেন। সেই বোঁচকা আবার দু-জন ভদ্রমহিলা নামাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন দেখে আমিও হাত বাড়ালাম। বাহে, চোখে দেখে সটকে পড়ি কেমন করে। কিন্তু ওই ভদ্রলোক যখন নামার চেষ্টা করলেন তখন দেখা দিল আসল বিপদ। অনভ্যস্ততার কারণে তিনি নামতে পারছিলেন না। তাকে নামাবারও একটা গতি হলো।

এই মানুষটাকে আমি বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি ছাদে কেন রে ভাই’? মানুষটার বিমর্ষ-ক্লান্ত উত্তর, ‘কী করব, ভিড়ের জন্য ভেতরে তো ঢুকতেই পারি নাই’। আমি আবারও বললাম, ‘আপনি কি দিনাজপুর থেকে ছাদে করে আসলেন’? তিনি একটা স্টেশনের নাম বললেন। নামটা আমি ভুলে গেছি। তাও ৬ ঘন্টার রাস্তা। আমি কেবল চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করছিলাম এই ৬ ঘন্টা এই ভদ্রলোক এই তীব্র শীতে ছাদে টিকে ছিলেন কেমন করে! এটা কী সম্ভব! শীতের সঙ্গে যোগ হয়েছে কমবেশ ৬০/৭০ মাইল বেগের হিম বাতাস।
ভদ্রলোককে একটু ধাতস্ত হওয়ার সুযোগ দিয়ে আমি আবারও জানতে চাইলাম, ‘আপনার সাথের মহিলারা ঢুকতে পারলেন আর আপনি পারলেন না’! তিনি বললেন, ‘এরাও তো ছাদে ছিল’। আমি জীবনে এমন হতভম্ব কমই হয়েছি। এই দুজন মহিলাও ৬ ঘন্টা ধরে এই তীব্র শীতে ছাদে ভ্রমণ করেছেন! এও কী সম্ভব। যেখানে ৮/১০ মাইল বাতাসে আমি জবুথবু হয়ে আছি।

হায় গণতন্ত্র! গণতন্ত্রের জন্য এই সবের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে। ট্রেনে চড়ার সময় এদের হয়তো কল্পনাতেও ছিল না যে ট্রেনটা পৌঁছার কথা দুপুর ২টায় সেটা এসে পৌঁচেছে রাত দুটোয়! এই অবর্ণনীয় কষ্ট এরা সহ্য করে গেছেন ঘন্টার-পর-ঘন্টা ধরে। আমাদের মিডিয়ার ভাষায়, যাত্রীদের ভোগান্তি বা ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়।
আমি আমার মস্তিষ্ককে পটাবার চেষ্টা করছি, দেখ বাপ, তোর নিয়ন্ত্রণে থাকা আমার শরীরের সমস্ত কলকব্জাকে এই নির্দেশ পাঠা যে এদের তীব্র শীত সহ্য করার তুলনায় আমার শীতটা কিছুই না। সম্ভবত আমার মস্তিষ্কও ঠান্ডায় জমে গেছে কারণ আমার শরীরের মধ্যে কোনও পরিবর্তন আমি লক্ষ করলাম না। যথারীতি শীতে কাবু। মাথায় ঠান্ডা লেগে প্রচন্ড মাথাব্যথাও করছে। অসহনীয়!

রাত তখন দুইটার উপর। এক বিদেশীকে দেখলাম বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে। আমি তাকে বললাম, ‘আমি কি কোনও প্রকারে তোমার কাজে আসতে পারি?
সে আমাকে বলল, ‘আমি প্যাসিফিক হোটেলে যেতে চাই’।
আমি জানতে চাইলাম, ‘প্যান-প্যাসিফিক সোনারগাঁও’?
সে আমাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল। সেটায় দেখলাম হোটেলের ঠিকানা ১২০ মতিঝিল। এখন আমি বুঝলাম এটা ‘প্যাসিফিক’ নামের অন্য একটা হোটেল। তার সমস্যাটা খানিক আঁচ করা গেল। সঙ্গে কোনও সেল-ফোন নাই বিধায় যোগাযোগ করতে পারছে না। প্যাসিফিক হোটেলে ফোন করে তার জন্য একটা কামরার ব্যবস্থা হলো, ১৫০০ টাকা ভাড়ায়। এটাই এই হোটেলের সর্বনিম্ন রুম-ট্যারিফ, তাও নন-এসি!

ধপধপে সাদাচুলের এই মানুষটার দেশ হচ্ছে অষ্ট্রিয়া। দিনাজপুর থেকে এইমাত্র এসে নামল। কারণ এর ভাষায় দেশে এখন কিছুই ঠিক-ঠাক চলছে না। তাই তড়িঘড়ি করে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় চলে এসেছে। অবরোধ চলাকালীন এ ঢাকাতেই থাকবে। এর এও প্রবল আশা যেটা আমাকে বলছিল, ‘আশা করছি, তোমাদের দেশের নেতারা বসে সমস্যার একটা সমাধান করবেন’।
আমি হাসি গোপন করলাম, আমাদের দেশের নেতারা বসে কথা বলেন না, বলেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ফল যা হওয়ার তাই হয়।

যাই হোক, সমস্যা দাঁড়ালো যেটা আমি আর এঁকে খুলে বলিনি যে এই গভীর রাতে এর যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমি প্যাসিফিক হোটেলে আবারও ফোন করে জানতে চাইলাম, তোমাদের কি গাড়ির ব্যবস্থা আছে? এই মানুষটাকে স্টেশন থেকে নিয়ে যেতে পারবে? উত্তরটা নেতিবাচক হলে আমি পড়লাম বিপদে। জেনেশুনে একে এখন কেমন করে ছেড়ে দেই। এ ভালই খোঁজখবর রাখে। আমাকে বারবার বলছিল, কোনও সমস্যা নেই আমি সিএনজি নিয়ে চলে যেতে পারব। যে দেশের যে চল- আমাদের মত এও স্কুটারকে ‘সিএনজি’ বলা শিখে ফেলেছে।
ভাগ্য ভাল, একটা ক্যাব পাওয়া গেল। কমলাপুর স্টেশন থেকে মতিঝিলের দুরত্ব উল্লেখযোগ্য না কিন্তু এই ট্রেনের সময় ক্যাব নামের দুর্লভ বস্তু কত টাকা চাইবে এটা আগাম বলা মুশকিল। আমি ক্যাবচালককে পটাবার চেষ্টা করছি, ‘দেখো মিয়া, এরা হইল এই দেশের মেহমান। কলঙ্ক তো তুমার-আমার হইব না, হইব দেশের’।
আমি নিজেও কম অবাক হইনি যখন মাত্র একশ টাকায় ক্যাবচালককে রাজি করিয়ে ফেললাম। কম টাকায় রাজি হওয়ার কারণে আমার চোরের মন- আমি ক্যাবের নাম্বারটা টুকে রাখলাম। কিছুক্ষণ পর যখন হোটেলে ফোন করে নিশ্চিত হলাম তাদের গেষ্ট পৌঁচেছে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

এয়ারপোর্ট স্টেশনেও দেখেছি এখন কমলাপুরেও দেখলাম ট্রেনের সময়সূচীর দেখার জন্য স্টেশনের বিভিন্ন জায়গায় মনিটার লাগিয়েছে। আমার রাতের বারোটার ট্রেনের সময় দুম করে তিনটা থেকে ছয়টা হয়ে গেল! বারোটা থেকে তিনটা, তিনটা থেকে ছয়টা, ভাল। কী করি, স্টেশনে ঘুরেফিরে দেখা ব্যতীত আর তো কোনও কাজ নাই। স্টেশনের কোনও কোনায় গিয়েও বাতাসের হাত থেকে বাঁচা যাচ্ছে না। অথচ এখানে ছিন্নমূল অনেকেই কেবল পত্রিকার কাগজ বিছিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে দিব্যি ঘুমাচ্ছে।
একটা শিশুকে দেখলাম, পৃশ্নি-দুর্বল দেহ নীচে-উপরে কিছুই নাই। তবে রক্ষা, এ জ্যাকেট টাইপের ভারী কিছু পরে আছে।

এক জায়গায় দেখা গেল বাড়তি ভিড়। ভিড়ের উৎসের কারণটা খানিক অন্য রকম। এক মেয়ে বিস্তর সাজগোজ করে আছে যেন স্বর্বেশ্যা-অপ্সরা সাজার অপচেষ্টা। তাতেও সমস্যা ছিল না কিন্তু ইনি আবার একপাশে ওড়না ফেলে রেখেছেন। এটা সম্ভবত হালের ফ্যাশন। অন্য পাশের ওড়না কবে সরাবেন লোকজন এই অপেক্ষায় কিনা কে জানে। জিজ্ঞেস করার উপায় নেই!

ভোর পাঁচটায় গোটা স্টেশনে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। রেল-পুলিশ এসে মেঝেতে ঘুমন্ত সবাইকে উঠিয়ে দিচ্ছে। সবাই গাট্টি-বোঁচকা গুটিয়ে ফেলছে। এক জায়গায় আমার চোখ আটকে গেল। আট-দশ বছরের একটা বাচ্চা। পুলিশের দাবড়ানি খেয়ে চোখ কচলাচ্ছে। ওর দুচোখে রাজ্যের ঘুম। পুলিশও নাছোড়বান্দা- শেষপর্যন্ত উঠিয়েই ছাড়ল।শিশুটির পাশেই রাখা ক্রাচ দেখে আমি ভাল করে লক্ষ করে দেখলাম এর এক পা নেই। হাফ-হাতা শার্ট গায়ে। হি হি করে কেমন কাঁপছে। অযথাই হাফ-হাতা শার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে শীত থেকে বাঁচার অর্থহীন চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এর জন্য একটা গরম কাপড়ের বড়ো প্রয়োজন। কিন্তু এই স্টেশনে পাওয়ার তো কোনও উপায় দেখি না। এক পেপারওয়ালাকে, এরও বয়স অল্প যেটা বললাম সেটাও এক ধরনের অন্যায়। তার গায়ের জ্যাকেটটা বিক্রি করতে রাজি হলো না। পা-কাটা শিশুটির জন্য কিছু করা গেল না।
নিজের গায়ের জ্যাকেটটা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ আমি মহাপুরুষ নই- কেবল মহাপুরুষরাই শীতে কাবু হন না। মনিটরের তারতম্যে শিশুটিকে হারিয়ে ফেললাম।

মনিটরে ক্রমশ সংখ্যা বদল হয়, ছ-টার জায়গার এখন দেখাচ্ছে নয়টা। এই নয়টা এক সময় হয়ে গেল বারোটা। কাঁটায়-কাঁটায় বারোটায় ট্রেন রওয়ানা হলো। পার্থক্য কেবল রাতের বারোটার স্থলে দিনের বারোটা, মাত্র বারো ঘন্টা লেট। আমাদের মিডিয়ার ভাষায়, শিডিউল বিপর্যয়।
ট্রেন যখন স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছিল তখন আবারও সেই পা-কাটা শিশুটিকে দেখলাম। ঠক-ঠক করে ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সেই সময় আমার সত্যি এমনটাই মনে হয়েছিল এই শিশুটির জন্য কোথায় যেন আমার চেষ্টার অভাব ছিল। ট্রেনের জান্তব শব্দ ছাড়িয়ে কানে বাজে ঠক-ঠক-ঠক। ঠক-ঠক শব্দ তুলে শিশুটি এগিয়ে যাচ্ছে পোকায় খাওয়া আমার গলিত শব ক্রাচে লেপ্টে...।

সহায়ক সূত্র:
পা-কাটা শিশু এবং মিডিয়ার ভোগান্তি-ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়: ১ : http://www.ali-mahmed.com/2015/01/blog-post_12.html

Monday, January 12, 2015

পা-কাটা শিশু এবং মিডিয়ার ভোগান্তি-ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়: ১!

ঢাকা যাওয়া হলো সম্ভব বছর দুয়েক পর। না-গিয়ে উপায় ছিল না কারণ আমার এক সুহৃদের ঝুঁকিপূর্ণ এক অপারেশন। এই মানুষটা সেই অল্প মানুষদের একজন, এই গ্রহে যে অতি অল্প মানুষ বিচিত্র কারণে আমাকে পছন্দ করেন ইনি তাদের একজন। এই মানুষটার কাছে আমি বিভিন্ন প্রকারে ঋণী। আজ তাঁর এই দুঃসময়ে আমার খানিকটা আয়ু দিতে পারার ব্যবস্থা থাকলে মন্দ হতো না।
কপালের ফের, এমন এক মুহূর্তে ঢাকা গেলাম যখন ‘অবরোধ’ এবং ‘বিশ্ব ইজতেমা’ চলছে। অবরোধ বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই- গণতন্ত্রের জন্য এটার প্রয়োজন ছিল, আছে, থাকবে কেয়ামতের আগ পর্যন্ত।

এমন অস্বাভাবিক অবস্থা দূরের কথা স্বাভাবিক অবস্থাতেই আমি ঢাকামুখো হতে চাই না যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ আমাকে স্টেশন থেকে নিয়ে যাবে। কারণটা আগেও বলেছি, শত-শত বার ঢাকা গেলেও আমি লোকেশন মনে রাখতে পারি না। পাঠকের মনিটর কাঁপানো হাসির ঝুঁকি নিয়েও বলি, আমি স্রেফ হারিয়ে যাই। অনেকের কাছে এটায় বিস্তর হাসির উপাদান থাকলেও আমার জন্য যে কী পরিমাণ যন্ত্রণা এটা কেবল আমি জানি।
পূর্বে বিভিন্ন প্রকারে চেষ্টা করতাম মনে রাখার জন্য, লাভ হয়নি। এখন সে চেষ্টা বাদ দিয়েছি নিজেকে এই সান্ত্বনা দিয়ে, সবার কী আর ব্রেন থাকে রে, পাগলা।

এর সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে আরেক দুর্দশা, আমার চশমা সংক্রান্ত জটিলতা। যে চক্ষু বিশেষজ্ঞ বহু বছর ধরে আমার চোখ দেখছেন সম্প্রতি দু-দুবার তার কাছে যাওয়ার পরও তার একই রা, আপনার চশমায় কোনও চেঞ্জ আনার প্রয়োজন নাই। এর সঙ্গে এটাও যোগ করেছিলেন, আপনার চোখে কোনও অসুখ নাই।
আমার চোখ যে তথ্য পাঠাচ্ছে মস্তিষ্ক খানিকটা বিভ্রান্ত হচ্ছে। যার ফল হাতে হাতে পেয়েছি ধানমন্ডি থেকে বেরুবার সময় গাড়ির নীচে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি। এই গ্রহের কোথা থেকে আমার জন্য ব্লেসিং ছিল কে জানে!
রোসো, চোখের ডাক্তার, এইবার তোমাকে চোখ দেখাতে গেলে গদাম করে এক ঘুসি মেরে তোমার এক চোখ গেলে দেব।

তো, ওখানে সবাই রোগি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত এমতাবস্থায় তো আর কাউকে এমন অন্যায্য কথা বলা চলে না। অবশ্য দয়াবান এরা, আমার ব্রেন নাই এই সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল বলেই গন্তব্য স্থান খুঁজে পাওয়ার জন্য শব্দের একটা ম্যাপ এঁকে দিয়েছেন। শব্দের এই ম্যাপ থেকে বিখ্যাত স্টার কাবাব হাউজ থেকে শুরু করে ঢাউস বিলবোর্ড কিছুই বাদ রইল না। আমি কঠিন মুখ করে স্কুটারওয়ালাকে তোতাপাখির মত শব্দের ম্যাপটা গড়গড় করে বলে গেলাম। আলাদা গাম্ভীর্য এনে রাশভারী গলায় এটাও জানাতে ভুল করলাম না, ‘চিনছ তো, তুমি ঠিক ওই জায়গায় আমাকে নামায়া দিবা’।

এর প্রয়োজন আছে নইলে এই ব্যাটা আমাকে ‘মগা’ পেয়ে কোনও একটা কূট-কৌশল করে সব সাফ করে দেবে। যাই হোক, স্কুটারওয়ালা ঠিক-ঠিক পৌঁছে দিল। একবার কেবল জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এই রাস্তা দিয়ে যামু না ওই রাস্তা দিয়া’? আমার কঠিন উত্তর, ‘যেদিক দিয়া জ্যাম কম সেই দিক দিয়া যাও’।
ব্যাটা ফাজিল, গাবতলির আগে মহাখালি নাকি মহাখালির আগে গাবতলি এই ছাতাফাতাই কী আর আমার মনে থাকে যে আমি এই রাস্তা-সেই রাস্তার বিবরণ বলে দেব!

এখানকার পর্ব শেষ হলে আমার হাতে বিস্তর সময়। ফেরার ট্রেন রাত বারোটায়। আরেকজন সুহৃদের সঙ্গে দেখা করার কথা। কাজের ওই মানুষটা ফেরার সময় আমাকে নিয়ে যাবেন এমনটাই আশা করে বসে ছিলাম। কিন্তু ‘কাজের মানুষ’ এই মানুষটার সেই সুযোগ আর হয় না। তিনি আমাকে মহাখালি ডিওএইচএস-এর একটা ঠিকানায় তাঁর অফিসে চলে আসতে বললে আমি পড়লাম বিপাকে।
হাসপাতাল থেকেই একজন ফিরবেন উত্তরায়। তাকে পটিয়ে-পাটিয়ে রাজি করালাম আমাকে মহাখালির গন্তব্যে নামিয়ে দিতে। এখানে নেমে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম কারণ এখন আর চিন্তার কিছু নেই। আমার দায়-দায়িত্ব এখন এই ভদ্রলোকটার উপর বর্তাবে। তাঁর ওখানে রাতের খাওয়ার পর তিনি আমাকে অন্যান্য বারের মতই স্টেশনে পৌঁছে দেবেন। বারোটার পূর্বে ঠিক-ঠিক আমাকে এয়ারপোর্ট স্টেশনে রেখে যাওয়ার সময় পইপই করে এটাও বলে গেলেন, ‘ট্রেন লেট হলে আমাকে একটা একটা ফোন দিয়েন আমি এসে নিয়ে যাবো। পরদিন যাবেন’।

অলক্ষ্যে আমি হাসি গোপন করলাম। ট্রেন আর কতক্ষণ লেট হবে? পাগল, আমার বুড়ো বাড়িটা, আমার পরিচিত বিছানাটা, আমার লাগানো গাছগুলো যে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। স্টেশনে এসে পড়েছি এখন আর আমাকে পায় কে! কপাল, ট্রেন তিন-চার ঘন্টা লেট। স্টেশনে কেবল মাথা আর মাথা- লোকে গিজগিজ করছে। হঠাৎ করে শীতও পড়েছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র বাতাস। শীত তেমন ছিল না বলে আমি যথেষ্ঠ গরম কাপড় আনিনি। পাতলা একটা জ্যাকেট যেটা থাকা না-থাকা সমান। শীতে আমি হি হি করে কাঁপছি। এয়ারপোর্ট স্টেশনে বসার জায়গা দূরের কথা দাঁড়াবার জায়গাও নেই। দাঁড়াতে হচ্ছে গিয়ে প্রায় খোলা একটা জায়গায়। তীব্র শীত আমাকে কাবু করে ফেলছে। এই তিন-চার ঘন্টা সময়ে কি করব?
সঙ্গে করে আনা মার্সেল মোরিং-এর ‘দ্য ড্রিম রুম’ বইটা পড়ার চেষ্টা করছি। পড়ব কী, ছাই- শীতে কাঁপছি আমি, সঙ্গে বইয়ের অক্ষরগুলোও!

আমার ব্রেন নাই এটা সত্য কিন্তু খুলির ভেতর দুয়েক ফোঁটা সমান যে মগজ আটকে আছে তারই ফল হবে সম্ভবত। মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। আরে, কমলাপুর স্টেশনে চলে গেলেই তো হয়। ওখানে ভিড় কম থাকবে খানিকটা উষ্ণতাও হয়তো পাওয়া যাবে। যাওয়াটা কঠিন কিছু না ঢাকামুখো যে কোনও ট্রেনে উঠে পড়লেই হয়। দিনাজপুর থেকে আসা ঢাকাগামী একটা ট্রেনে উঠে পড়লাম, বাছাধনের কমলাপুর স্টেশনে না-গিয়ে উপায় নেই...।

সহায়ক সূত্র:
পরের পর্ব, 'পা-কাটা শিশু এবং মিডিয়ার ভোগান্তি-ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়: ২! ': http://www.ali-mahmed.com/2015/01/blog-post_13.html

Thursday, January 1, 2015

ওয়েটিং ফর গডো- ‘ওয়েটিং ফর বাংলার বেকেট’!

Samuel Beckett-এর Waiting for Godot, বাংলায় অনুবাদ করেছেন, আসাদুল ইসলাম। অনুবাদ করা এই বইটির প্রকাশক হচ্ছে ঐতিহ্য। প্রকাশক জানাচ্ছেন ‘ওয়েটিং ফর গডো, এই বইটি অনুবাদ করা হয়েছে, ‘WEATING FOR GODO by Samuyel barkle beket’ থেকে। ‘WEATING FOR GODO’ নামের কোন বই এই গ্রহে আছে বলে অন্তত আমার জানা নাই!
যেটা পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে, ‘Waiting for Godot’। বা Samuyel barkle beket নামের কেউ ‘WEATING FOR GODO’ লিখেছেন এমনটাও হদিস মেলে না। যে লেখককে পাওয়া যায় তিনি হচ্ছেন, Samuel Barclay Beckett কিন্তু Samuyel barkle beket না।
কেউ-কেউ বলবেন এটা ছাপাখানার ভূত। বেশ-বেশ, মেনে নিলুম...।

এই বইটির অনুবাদক আসাদুল ইসলাম সম্বন্ধে ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে, “...এই ধারার নাট্যকারদের শেষ উত্তরাধিকারের তালিকায় আছেন হ্যারল্ড পিন্টার, ডেভিড ম্যামেট, টম স্টপ্পার্ড আর বাংলাদেশের আসাদুল ইসলাম...।“
অতি উত্তম! 'ঐতিহ্য' নামের প্রকাশনী থেকে 'পরকাশিত'! কোনও প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হলেই সেই ছাপার অক্ষর জরিনা থেকে ক্যাটরিনা হয়ে যায় আর এ তো 'ঐতিহ্য'- যারা ২৫০০০ হাজার টাকায় বই বিক্রি করেছে এই দেশে। ইমাজিন, ২৫০০০ টাকা, তাও বাংলাদেশে! তো, এই নিয়ে আমার মত সাধারণ মানুষদের অমত থাকা সমীচীন না আসলে। দ্বিমত করাটা তো অসমীচীন। কারণ আমাদের দেশের প্রকাশকরাই ঠিক করে দেন কে লেখক, কে লেখক নন। এই দুরূহ কাজটা এরা কোন যন্ত্রপাতি দিয়ে নির্ধারণ করেন এটা আজও আমার কাছে বিস্ময়!

যাই হোক, এই বইটির লেখক-অনুবাদক আসাদুল ইসলামের কিছু বাণীর সঙ্গে আমরা পরিচিত হই। তিনি বইটির ভূমিকায় লিখেছেন:
...তখন আমার সাধ জাগে সংলাপের সাথে একটু রসের মিশ্রণ ঘটালে জিনিসটা রসালো হয়ে উঠতেও পারে। সেই সাধ থেকেই রসের আমদানি।
...কিছু জায়গায় বাংলাদেশ ঢুকিয়ে দিয়েছি...। মহান কীর্তিকে ছেলের হাতের মোয়া বানাবার দায় আমি অস্বীকার করছি না।
...কলম হাতে মনে হয় আমিই বাংলার স্যামুয়েল বেকেট। ...”

...আমিই বাংলার স্যামুয়েল বেকেট”। জ্বী, স্যার, 'বাংলার বেকেটের' জন্য আমরাও অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি, ‘ওয়েটিং ফর বাংলার বেকেট’। আসাদুল ইসলাম কেমন করে বাংলার বেকেটের স্থলে ‘বাকেট’ ওরফে ‘শূন্য বাকেট’ ওরফে খালি বালতি হয়ে উঠেন সেটা পরে আলোচনা করছি।
ইশ-শ, আসাদুল ইসলাম মহোদয়, আপনি কেমন করে বাংলাদেশকে এনে এখানে ঢুকিয়েছেন, রসের আমদানী করে কেমন রসে মাখামাখি করেছেন যে আমার কী-বোর্ডও রসে চটচট করছে। কী যন্ত্রণা, এখন কী করি বলেন তো- টাইপ করাটাই অমায়িক যন্ত্রণা হয়ে দাড়িয়েছে দেখি!

যাই হোক, আসাদুল ইসলাম যে অনুবাদ করেছেন তা মূল ইংরাজির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাক। এ সত্য, অনুবাদক অনুবাদের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করেন। কিন্তু এরও সীমা আছে। কেউ যদি অনুবাদ করতে গিয়ে ‘শেষের কবিতা’র ‘অমিত-লাবণ্যের’ মুখে বসিয়ে দেন, ‘ধুম মাচা দে-ধুম মাচা দে-ধুম, ধুম, ধুম...’ তাহলে তো সর্বনাশ!
ভাগ্যিস, Samuel Barclay Beckett মরে বেঁচে গেছেন নইলে এই অনুবাদ দেখে নির্ঘাত তিনি নিজেই নিজেকে খুন করে ফেলতেন। পরে আত্মহত্যা করার জন্য তাঁর নামে মামলা রুজু হত! পুরো বইটি থেকে অসংখ্য অসঙ্গতি তুলে ধরাটা আমার কাছে কেবল ক্লান্তিকরই না শব্দের অপচয়ও মনে হচ্ছে। বিভিন্ন পৃষ্ঠা থেকে আমি কেবল কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি:
‘Waiting for Godot’ থেকে:
VLADIMIR: " Hand in hand from the top of the Eiffel Tower, among the first. We were respectable in those days. Now it's too late. They wouldn't even let us up. (Estragon tears at his boot.) What are you doing?"
এটার আসাদুল ইসলামের অনুবাদ করেছেন:
ভ্লাডিমির: "একটা সময় ছিল যখন আমাদের পায়ে কোনো যন্ত্রণা ছিল না। সংসদ ভবনের লেকের পাড়ে আমরা হাত ধরাধরি করে হাঁটতাম। ঝুলন্ত ব্রিজের উপর পা ঝুলিয়ে, জলের আয়নায় আমরা মুখ দেখতাম। এখন কোনো কোনো মহল পায়ের যন্ত্রণায় অস্থির। আর সংসদ ভবনের দিকে গেলে তো কথাই নেই, পরিকল্পিত নাশকতাসৃষ্টিকারী হিসাবে পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে, কোর্টে চালান করে দেবে। (এস্ট্রাগন জুতো নিয়ে টানাটানি করতে থাকে) তুমি এখনও পা নিয়ে আছ?"

ESTRAGON: "(pointing). You might button it all the same.
 VLADIMIR: (stooping). True. (He buttons his fly.) Never neglect the little things of life."
আসাদুল ইসলামের অনুবাদ:
এস্ট্রাগন: "(আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে) তোমার প্যান্টের জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকছে। ছোট্টসোনার ঠান্ডা লাগবে যে!"
ভ্লাডিমির: "(হকচকিত হয়ে) না, না, ঠিক আছে। (প্যান্টের বোতাম লাগায়) কিন্তু জিনিস ছোট্ট হলেই তার শক্তিকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। সময় অসময়ে সেও ভীষণ শক্তিশালী হয়ে উঠে।"

ESTRAGON: "Repented what?
VLADIMIR: "Oh . . . (He reflects.) We wouldn't have to go into the details."
আসাদুল ইসলামের অনুবাদ:
এস্ট্রাগন: "কিসের পাপ?"
ভ্লাডিমির: "আরে বাপ, এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিনাটি নাড়িভুঁড়ি তো বলা যাবে না।"

ESTRAGON: "(timidly, to Pozzo). You're not Mr. Godot, Sir?" 
 POZZO: "(terrifying voice). I am Pozzo! (Silence.) Pozzo! (Silence.) Does that name mean nothing to you? (Silence.) I say does that name mean nothing to you? "
অনুবাদ:
এস্ট্রাগন: "(ভয়ে ভয়ে) স্যার, আপনি কি গডো নন?"
পজো: "(ভারী গলায়) আমি পজো। পজো। নাম শুনে কিছু বুঝতে পারছ না তোমরা? আজব, বলছি যে নাম শুনে কিছুই কি বোঝা যাচ্ছে না?"
এস্ট্রগন: "ধ্বজো, ধ্বজো-ভঙ্গ"।

POZZO: "(peremptory). Who is Godot?"
ESTRAGON: "Godot?"
আসাদুল ইসলাম স্যারের অনুবাদ:
পজো: "গডো মালাউনটা কে?"
এস্ট্রাগন: "গডো?"

ESTRAGON: "Excuse me, Mister, the bones, you won't be wanting the bones? "  
মহোদয় আসাদুল ইসলামের অনুবাদ:
এস্ট্রাগন: "মাননীয় সংসদ সদস্য, আপনার সমীপে একটি তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন উত্থাপন করা হচ্ছে। মাননীয় সংসদ সদস্য, এই হাড়গুলোর প্রতি আপনার কোনো বিশেষ দাবী আছে কি না, এর পক্ষে থাকলে- হ্যাঁ বলুন, বিপক্ষে থাকলে- না বলুন।"

অন্যত্র আসাদুল ইসলাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন, “...মাল তো এবার হাঁপাচ্ছে...”। “...খানিকটা হাফলেডিস টাইপের...”। “...মামা তো মনে হয় শ্যাষ, সোনার বাংলা দ্যাশ...”। “...চ্যানেল আই সেরা কন্ঠ, গাও বাংলাদেশ গাও...”।
আমার কাছে অনুবাদকের এইসব সংলাপ পড়ে মনে হচ্ছিল বটতলার উপন্যাস টাইপের কোনও একটা লেখা পড়ছি! তর্কের খাতিরে এইসবও না হয় মেনে নিলুম, অনুবাদক বলে কথা। কিন্তু এস্ট্রগননের সংলাপে ‘ধ্বজো-ভঙ্গ’ ব্যবহার করা বা বিশেষ করে পজোর সংলাপে অহেতুক ‘গডো মালাউনটা কে?’ ব্যবহার করাটা আমার কাছে স্রেফ একটা ফাজিলের একটা কর্মকান্ড মনে হয়েছে। স্রেফ অপদার্থগিরি!

মহামতি আসাদুল ইসলাম, আপনি যে জিনিস প্রসব করেছেন, আপনার প্রসব যন্ত্রণার প্রতি আমি ব্যথিত! ওয়েটিং ফর গডোর একটা চরিত্র ‘লাকি’ যাকে দাস হিসাবে দেখানো হয়েছে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আরেকটি চরিত্র ‘পজো’ চাবুক ব্যবহার করে। কথায় কথায় সাঁই সাঁই করে চাবুক চালায়। সেই চাবুকের কয়েক ঘা অনুবাদক আসাদুল ইসলামের পিঠে পড়লে অন্তত আমি পজোকে আটকাবার চেষ্টা করে পাপের ভাগিদার হব না।

কেউ আমাকে এ কথা বলতে বিশ্বাস করবেন না দয়া করে, যারা এই দেশে রবীন্দ্র রচনাবলীর নামে ২৫০০০ টাকার একটা লেখকেরই বই বিক্রি করে তাদের এডিটর প্যানেল নাই তারা আসাদুল ইসলামের এই আবর্জনা পড়ে দেখেনি! আর ওয়েটিং ফর গডোর ‘পজো’ সে আসাদুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে চাবকা-চাবকি পর্ব শেষ করে ডিয়ার ঐতিহ্য'র খোঁজ করলে আমি আনন্দের সঙ্গে ঐতিহ্য'র ঠিকানাটা বাতলে দেব। 

Monday, December 22, 2014

Howdy radish



Friday, December 19, 2014

একজন ‘নুলা মুসা’ এবং আমাদের মিডিয়া।

মুসা বিন শমসেরকে নিয়ে প্রথম লিখেছিলাম, সালটা সম্ভবত ২০০৬ হবে। তখন অমি রহমান পিয়াল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখির সহযোদ্ধা। পিয়াল আমাকে সতর্ক করেছিলেন, ‘শুভ, এই পাবলিক কিন্তু খতরনাক। তাকে নিয়ে যারা লেখালেখি করেছেন তারাই ভয়াবহ বিপদে পড়েছেন’
প্রমাণিত না কিন্তু ফরিদপুরের যুদ্ধাপরাধিদের নিয়ে লেখালেখি করার কারণে প্রবীর শিকদার [১] বিপদে পড়েছিলেন। আমাদের মুসাও ফরিদপুরের! প্রবীর শিকদার এখনও বেঁচে আছেন কিন্তু বোমায় তার এক পা, চাপাতির আঘাতে এক হাত উড়ে গেছে।

তো, মুসা আবারও সামনে চলে এসেছেন দুদকে হাজিরা দিতে গিয়ে। দুদক অফিসে তিনি হাজিরা দিয়েছেন রাজা-বাদশার মত। একপাল দেহরক্ষী এবং চেলা-চামুন্ডা নিয়ে। এরমধ্যে অধিকাংশ মিডিয়া আবার খুব মজা পেয়েছে নারী দেহরক্ষী নিয়ে। কোথাও ছাপা হয়েছে, “মহিলা বডিগার্ড নিয়ে দুদকে সেই মুসা বিন শমসের”। বা কোথাও “সুন্দরী দেহরক্ষী নিয়ে...।”
বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে মুসা কোন রঙের ব্লেজার পরেছেন, কোন ঘড়ি, কোন ব্রান্ডের গাড়ি ইত্যাদি। ভাগ্যিস, গাড়ির কয়টা চাকা বা মুসার কোন ব্রান্ডের আন্ডারওয়্যার পরেছেন ওই দিকে আর মিডিয়া দৃষ্টিপাত করেনি।

এখনকার মিডিয়া পারে না এইসবও দিয়ে দিতে। যেমন আজকের ‘দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে’ ছাপা হয়েছে, শোবিজের হ্যাপী এবং ক্রিকেট খোলোয়াড় রুবেলের ফোনালাপ। আমারা ছোট্ট একটা অনুসন্ধান ছিল। ফোনের এই কথোপকথনের উৎস কি? এই দুইজনের কেউ একজন কি কথোপকথন রেকর্ড করে রেখেছিল নাকি ফোন কোম্পানি এই অডিও ট্র্যাক সরবরাহ করেছে। নাকি কোনও গোয়েন্দা সংস্থা? একজন পাঠক এটা জানার অধিকার ফলাতেই পারে। আর সরবরাহ করলেই মিডিয়া ছেপে দেবে? “একদম ঠোঁট কামড়াইয়া ধরব কিন্তু...” এটা ছাপিয়ে পাঠকের কাছে চুতিয়া মিডিয়ার এটাই কী দায়? আবার ঢং করে লিখেছে, “[প্রকাশ অযোগ্য শব্দ।]”
এদের “[প্রকাশ অযোগ্য শব্দ।]”, এটা পড়ে দুষ্ট ছেলেদের কথাটাই মনে হলো, ‘মুহাহা, যেন সানি লিওন বলছে, আমি ভার্জিন’।

আচ্ছা, মিডিয়া কি এখন টাট্টিখানা হালের ওয়শরুমেও ক্যামেরা তাক করে ‘বুম’ ধরে রাখবে? ভাল, তাহলে এই পত্রিকার সম্পাদক নঈম নিজামকে দিয়েই শুরু হোক। পরে পত্রিকার প্রথম পাতায় ছবিটা ছেপে দিয়ে মোহনীয় একটা ক্যাপশন দেওয়া যেতে পারে, একদলা হলুদ ফুল বা এক টাল হলুদ ফুলের মাঝখানে নঈম ভাইয়া।

যাই হোক, মুসাকে নিয়ে আমার বেশ কিছু লেখার মধ্যে একটা ছিল যাত্রার প্রিন্স [২]। ওখান থেকে কিছু অংশ শেয়ার করা যাক:
"ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার মেয়ে কমলা ঘোষ। সবে বিয়ে হয়েছে তার। বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে আটকা পড়ে যান কমলা! একদিন পাকিস্তানি মেজর কোরায়শী ও তিন জন সৈন্যসহ কমলাদের বাড়িতে আসে নুলা মুসা। এরপর যা হওয়ার তাই হয়, পাকিস্তানি সৈন্যরা চরম শারিরীক নির্যাতন করে কমলাকে। ...পরে কমলার স্বামী কমলাকে আর কখনই ঘরে ফিরিয়ে নেয়নি।

...ফরিদপুর শহরের মহিম স্কুলের সঙ্গে এক ধর্মশালা দেখাশোনা করতেন কেষ্টমন্ডল। কেষ্টমন্ডলের চার মেয়ে: ননী, বেলী, সোহাগী ও লতা। নুলা মুসার তত্ত্বাবধানে এই বেলী ও ননী মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোরঞ্জনে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে এই চার বোন এবং তাদের মা-র ঠাঁই হয়েছিল ফরিদপুরের পতিতাপল্লীতে।
...কেবল ননী, বেলীই নয় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে অর্ধশতাধিক বাঙালি মা-বোনের সন্ভ্রম লুটের প্রধান নায়ক এই নুলা মুসা।

এখন তার নাম ড. মুসা বিন শমশের হলেও সার্টিফিকেটের নাম এডিএম মুসা। কিন্তু একটা হাত খানিকটা বিকলাঙ্গ থাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল, 'নুলা মুসা' হিসাবেই। নিজেকে ডক্টর বলে দাবী করলেও, ১৯৬৮ সালে ঈশান স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হয়েছিল মুসা। ১৯৮৬ সালে মুসার নামের আগে ডক্টর যুক্ত হলেও উচ্চ-মাধ্যমিক পাসের কোনো প্রমাণ মেলেনি কোথাও!

অভিযোগ আছে, একাত্তরের ২১ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যদের ফরিদপুরে ঢোকার ব্যাপারে মানচিত্র এবং পথনির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা করেছে এই মুসা। মেজর আকরাম কোরায়শীর সঙ্গে মুসার গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল! ফরিদপুরে পাকিস্তানি সৈন্য ঢোকার পরদিনই (একাত্তরের ২২ এপ্রিল) ফরিদপুর সার্কিট হাউজে মুসা এবং মেজর কোরায়শীকে খুবই অন্তরঙ্গ পরিবেশে দেখেন, মুক্তিযোদ্ধা একেএম আবু ইউসুফ সিদ্দিক পাখী।
একাত্তরে মুসা ছিল ফরিদপুরের এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য মানুষকে হত্যা, নারী নির্যাতন একং লুটতরাজ করেছে। ফরিদপুরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ শহরের সমস্ত শহীদ মিনার মুসা পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় ভেঙ্গে ফেলে! মেজর কোরায়শীসহ অনেক পাকিস্তানি সেনা-সদস্যের অবাধ যাতায়াত ছিল মুসার বাড়িতে।
মুসার পিতা তথাকথিত পীর শমসের মোল্লা পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল বাড়াতে তাদের গায়ে ফুঁ দিত আর বলত, 'ইন্ডিয়া পাকিস্তান বন যায়েগা'

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডিসেম্বরেই মুসা মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে ফরিদপুর থেকে পালিয়ে চলে যায় পাবনায়। সেখানে বড় ভাইয়ের শ্যালিকাকে বিয়ে করে ঢাকা-চট্টগ্রামে ছুটাছুটি করে। ঢাকার এক অবাঙ্গালিকে পাকিস্তানে পাঠাবার নাম করে তাঁর সহায়সম্পত্তি আত্মসাতের মাধ্যমে একপর্যায়ে ঢাকায় 'শাহবাজ ইন্টারন্যাশনাল' নামে আদম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলে। এরপর বিদেশে লোক পাঠাবার নাম করে উত্তরবঙ্গের কয়েকশ' লোকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে উধাও হয়ে যায়। বছর তিনেক পর ঢাকায় ফিরে 'ড্যাটকো' নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে আবারও শুরু করে আদম ব্যবসা! এরশাদ আমলে শুরু হয় তার উত্থান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি মুসাকে...।" 

সেই মুসা আজ দম্ভের সঙ্গে বলেন, “...আমার বিষয়ে যা বলা হয়, আমি সাত বিলিয়ন ডলার বা ৫১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছি। কেউ কোনো দিন এতো টাকা দেশে আয় করতে পারেনি, পারবেও না। আমি এই টাকা বিদেশে উপার্জন করেছি...। ...সুইস ব্যাংকে আটকে থাকা ওই টাকা উদ্ধার করা গেলে পদ্মা সেতু, দুস্থ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী, শিক্ষকসহ সামাজিক গঠনমূলক কর্মকান্ডে অবদান রাখব।...

ডিয়ার স্যার, বলেন কী! 'ভূতের মুখে রাম নাম'- পূর্বে কখনও এই দেশের জন্য একটি আধুলিও খরচ করেছেন এমনটা তো জানি না! নুলা মুসা মহোদয়ের কাছে আরও জিজ্ঞাসা বিদেশে উপার্জন করেছেন, বেশ; তা কোন ব্যবসায় এই টাকা উপার্জন করেছেন? আর আপনি এই দেশে অবদান রাখবেন জেনে ভাল লাগছে। সবই তো বললেন কিন্তু আপনি ১৯৭১ সালে যে পাপগুলো করেছেন সেই পাপের বিষয়ে মুখ খোলেননি কিন্তু!
যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার পাপের শাস্তি না-হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই দেশের ঝুলেপড়া কাঁধের পাপমোচন হবে না।

সহায়ক সূত্র:
১. প্রবীর শিকদার: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_4.html  
২. যাত্রার প্রিন্স: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_2395.html

Thursday, December 18, 2014

মহাপুরুষ-‘মহাউলুস’!

মহাপুরুষরা আজকাল ‘মহাউলুস’ হয়ে গেছেন। ‘উলুস’ অভিধানে কেবল পাওয়া যেতে পারে জীবিত হলে। আঞ্চলিক ভাষায় ‘উলুস’ হরদম বলা হলেও এর ভাল নাম ছারপোকা।
বসুন্ধরা গ্রুপের পত্রিকায় ঢাউস যে ছবিটা আমরা দেখতে পাচ্ছি এটায় বসুন্ধরার মালিকপক্ষ। এরা দুস্হদের মাঝে কম্বল বিতরণ করছেন। সাধু-সাধু! ওই আসে মহাপুরুষ...।
ছবি সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪
চমৎকার একটা একটা ছবি বটে! বাংলা সিনেমায় যেমন পুলিশের লম্বা চুল দেখে আমরা হাসি চাপি তেমনি এই ছবিটা দেখেও হাসি চাপা মুশকিল হয়ে পড়ে। হোয়াট আ পোজ! কই হাত কই মাথা! ভাব দেখে মনে হচ্ছে, ক্যামেরাবন্দি না-হওয়া পর্যন্ত কম্বল ছাড়াছাড়ি নাই। মহতরমা কম্বল ছেড়ে দিলে কী হবে কম্বল তো ছাড়ে না! আহা, ছবির সঙ্গে তথ্যগুলো মিলিয়েও পাঠক যদি বুঝতে না পারেন ঠিক কে কম্বল দিল তখন কী উপায় হবে গো। পাঠক বেচারাকে তো আর এই তকলিফ দেওয়া চলে না।

যাই হোক, কম্বল বিতরণ করছেন আহমেদ সোকহানের সহধর্মিণী আফরোজা বেগম তার সঙ্গে আছেন ওগো বিদেশীনি পুত্রবধু বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাফায়েত সোবহান সানভিরের ইস্তারি সাহেবা এভলিনা সোবহান। সাফায়েত সোবহান সানভির সাহেবও আছেন।
ওহো, আমার স্মৃতিবিভ্রম না-হয়ে থাকলে ইনিই তো সেই সানবির যিনি সাব্বির খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন?
...২০০৬ সালের ৪ জুলাই রাতে গুলশানের একটি বাড়িতে সাব্বির খুন হন। সানবীর এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত প্রধান আসামি ছিল। একপর্যায়ে সানবীর বিদেশে পালিয়ে যান। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর তাঁকে দেশত্যাগে সহায়তা করেছিলেন । সানবীরকে মামলা থেকে রক্ষা করতে বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে বাবরকে ২১ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি গ্রেপ্তারের পর স্বীকার করেছিলেন।...

ভাল কথা, তা এই সানবীর মহোদয় কি খুনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন? উত্তর যদি না হয় তাহলে এই দেশের তো উফর-ফাঁফর, দমবন্ধ অবস্থা। বেচারা দেশ, শ্বাস নেয় কেমন করে?

Wednesday, December 17, 2014

আমাদের ইশকুল- আমাদের মুক্তিযুদ্ধ- আমাদের মুক্তিযোদ্ধা।

পথশিশু সংগঠনের সঙ্গে জড়িত একজনের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানতে চাইলেন স্কুলে (আমাদের ইশকুল) আমি পড়াবার জন্য কোন পদ্ধতি অনুসরণ করি। তিনি এটাও জানালেন তারা ‘ইব্রাহিম মেথড’ (দুর্বল স্মৃতি থেকে লিখছি ইব্রাহিম নামটা ভুল হওয়ারা সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না) অনুসরণ করেন।
আমি সলাজে বললাম, আমি তো কোন পদ্ধতি অনুসরণ করি না। ধারণা করি, তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি গোপন করেছিলেন।

যে শিক্ষক এই স্কুলে পড়ান তাকে আমি আগেভাগেই বলে দিয়েছিলাম, এই বাচ্চাদেরকে প্রচলিত পদ্ধতিতে আমি পড়াতে চাই না। স্কুলে আধ-ঘন্টা এরা বিভিন্ন খেলা খেলবে এরপর আধ-ঘন্টা পড়া। পড়ার সময়টা আমি খুব বেশি সময় রাখতে চাইনি। কারণ তাহলে এরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে না।
স্টেশনের অধিকাংশ বাচ্চাকে আমি হাতের তালুর মত চিনি- আমি জানি কে আজ দুপুরে খেয়ে আসেনি, কে ড্যান্ডিতে আসক্ত! অভুক্ত, স্বপ্নহীন বাচ্চাদের মনোযোগ ধরে রাখা কতোটা কঠিন এটা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারি।

একদিন এদেরকে বাংলা পড়ানো হয় তো অন্যদিন ইংরাজি। একদিন কেবল গল্প। শিক্ষামূলক কিছু গল্পের সঙ্গে ছোট্ট একটা গল্প আমি এদেরকে শিখিয়েছি। বড়ো সহজ-সরল একটা গল্প:
এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার ছেলে রাজকুমার। রাজকুমার খুব দুষ্ট ছিল। সে চুরি করত, মিথ্যা কথা বলত। মা-বাবার কথা শুনত না। স্কুলের যেত না। আল্লাহ একদিন তাকে শাস্তি দিলেন। তার গায়ের রঙ কালো হতে থাকত। কালো হতে হতে সে একদিন কাক হয়ে গেল। সে আর মানুষ হতে পারল না। 
গল্পের যে জায়গাটায় কাকের কথা আসে তখন বাচ্চারা কা-কা করে চিৎকার জুড়ে দেয়। এ বলার অপেক্ষা রাখে না এই গল্পটা এদের শেখাবার পেছনে আমার বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। 

ওহ, একদিন ধর্ম পড়ানো হয়। একজন স্কুল দেখতে এসে আমাকে নাহক কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি শ্লেষভরা কন্ঠে বলছিলেন, 'মিয়া, তুমি তো বিশেষ ধর্মকর্ম পালন করো না তাহলে আরবি পড়াবার ব্যবস্থা রেখেছো কেন'?
আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, 'আরবি না, একদিন ধর্ম পড়াবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখানে মুসলমান ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের শিশু নাই থাকলে সে ধর্ম পড়াবারও ব্যবস্থা থাকত'।
ওরে শ্লা...শোনো কথা, এই গ্রহের সবচেয়ে বড়ো নির্বোধ আমি [১]- আমি স্মোক করি বলে কী এদেরকেও স্মোক করা শেখাব!

তো, একদিন থাকে আঁকাআঁকি। আমি দেখেছি বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহ আঁকাআঁকিতে। ওদিন স্কুলে উপস্থিতির হারও থাকে বেশি। আঁকাআঁকির কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নেই। যার যেটা খুশি আঁকে। স্কুলে আমি উপস্থিত থাকলে বলি, ভূতের ছবি আঁকো। বাচ্চারা ভূতের ছবি আঁকে। বাচ্চারা অবলীলায় হাস্যকর ভূতের ছবি আঁকে। কারণ একদিন এদেরকে বলে দিয়েছিলাম, ভূত বলে কিছু নেই।

এখানকার শিশুরা হাবিজাবি অনেক কিছুর সঙ্গে এটাও জানে পৃথিবী গোল, তিন ভাগ পানি এক ভাগ মাটি। পৃথিবী স্থির না, কেমন করে দিন-রাত হয়। এরা এটাও জানে কলার খোসার ভেতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে জুতা চমৎকার পরিষ্কার হয়, চকচক করে। কলার খোসার ভেতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে নিমিষেই দাঁতও পরিষ্কার, ঝকঝক হয়।

স্কুলে মাস্টার মশাইয়ের জন্য আমার তৈরি করা একটা তালিকা আছে। এই তালিকা ধরে-ধরে এদেরকে শেখানো হয়। পড়ান মাস্টার সাহেব- কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই হুটহাট করে আমি হাজির হয়ে যাই। অল্প সময়ে হাবিজাবি বলে আমি উধাও।
দু-দিন পূর্বে মাস্টার মশাই পড়াচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় দিবস নিয়ে। আমাদের কাছে শুনতে যত সহজ মনে হোক বিষয়টা এদের কাছে অতি কঠিন। যে বাচ্চাগুলো তীব্র শীতে ঘুমায় স্টেশনে অধিকাংশ সময় অভুক্ত থাকে এদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা খুব একটা বোধগম্য বিষয় এটা আমি বিশ্বাস করি না। তো, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা বোঝাতে গিয়ে মাস্টার মশাইকে দেখলাম শীতেও গলদঘর্ম হতে। শিক্ষক-ছাত্র কাউকে দোষ দেওয়া চলে না।

আমি অন্য পথ ধরলাম। এদেরকে বললাম, দেখো, স্বাধীনতা মানে হচ্ছে, অনেকটা নিজের বাড়ি আর পরের বাড়ির মত। তুমি তোমার নিজের বাড়িতে যা খুশি করতে পারবে কিন্তু পরের বাড়িতে পারবে না। যেমন ধরো, তোমাদের অনেকেই স্টেশনে থাকো। সরকারি লোকজন যখন খুশি তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে পারবে কিন্তু নিজের বাড়িতে কেউ তোমাকে কিচ্ছু বলতে পারবে না। আলাপচারিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গ আসল কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে কোন প্রকারেই এদেরকে ভাল করে বোঝানো গেল না।

পরের দিন। স্কুলের বাচ্চারা খেলছে। একজন খর্বাকৃতি মানুষ আসলেন বগলে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কান পরিষ্কার করব কি না। আমি বিরক্ত। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে গিয়ে জমে গেলাম। মানুষটার বুকে ছোট্ট একটা ব্যাজ- আমার বোঝার বাকী রইল না মানুষটা একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি সটান দাঁড়িয়ে গেলাম। বাচ্চাদেরকে বললাম, 'সবাই দাঁড়াও। আমাদের মাঝে একজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা বসে থাকতে পারি না। যিনি অস্ত্র হাতে প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন বলেই আমরা একটা পতাকা পেয়েছি, একটা দেশ পেয়েছি। আমাদের মা যে ভাষায় কথা বলেন আমরা সেই ভাষায় অনায়াসে কথা বলতে পারি'। তোমরা মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলে। ইনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
স্কুল থেকে বেরিয়ে আলি আহমেদ নামের এই মানুষটার সঙ্গে কথা হয়। খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে যখন তিনি যুদ্ধে ছিলেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯! যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পূর্বে মোজাহিদ ছিলেন। তাঁর এলাকা ছিল সালদানদী, কসবা। ছোটখাটো এই মানুষটাই অবলীলায় গুলি ছুড়েছেন ২০ রাউন্ডের এসএলআর দিয়ে। যুদ্ধে তিনি ভয়ংকর রকমের আহত হন। আর্টিলারি শেল দিয়ে সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। এখনও তিনি বহন করে চলেছেন শরীরে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত। মানুষটাকে নিয়ে অন্য একদিন বিশদ লেখা ইচ্ছা রইল। তাঁর তাড়া, আমারও।

কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, বাচ্চাদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বারবার সংকোচের সঙ্গে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। না-কামানো দাঁড়িভরা মুখটা নেড়ে নেড়ে বলছিলেন, 'আরে না, কী বলেন, আমি কেন'!
আমার অনুরোধ ফেলতে না-পেরে বড়ো সংকোচ নিয়ে দাঁড়ালেন।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই হয়ে গেছে সেই কবেই, দলবাজির বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে। তাই কী, এঁর মতো মুক্তিযোদ্ধা তুচ্ছ সম্মান পেয়ে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর চোখ ভরে আসে...!

সহায়ক সূত্র:
১. নিবোর্ধ মানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2014/12/blog-post_7.html 

ম্টেশনে বাচ্চা আর কয়জন পড়বে এটা ভেবে ছোট্ট একটা কামরা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান ভুল ছিল। এমনিতে সবাই একই দিনে উপস্থিত থাকে না কিন্তু তারপরও জায়গার সংকুলান হয় না। এর উপর যেদিন আঁকাআঁকি থাকে সেদিন আমরা বিপদে পড়ে যাই কারণ তখন অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হয়। তখন আমাদের দাঁড়াবার জায়গা থাকে না। তবুও সুখ রে সুখ...!
  

Saturday, December 13, 2014

‘যৌবনযাত্রা’ নামের কারখানা!

একদা ‘যৌবনযাত্রা’ নামের অতি চালু একটা সাইট, হুড়মুড়, হঠাৎ করেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হইচই করা শুরু করল।
এমনিতে এই ধরনের একটা সাইট ‘এডাল্ট সাইট’ হিসাবে চালু থাকবে কি থাকবে না সেটা ভিন্ন তর্কের বিষয়! কিন্তু হিডেন ক্যামেরায় ধারণকৃত বা অনুমতি ব্যতীত কারও ভিডিও কোনও সাইটে আপলোড করে দেয়াটা যে চরম অনৈতিক কাজ এটা এই সমস্ত ইতরদের কে বোঝাবে। এতে করে একজন মানুষের জীবনে কেমন বিপর্যয় নেমে আসতে পারে এটা বোঝার ক্ষমতা ডায়াপারপরা এই ইতরদের নাই। তাদের অনৈতিক আচরণের কারণে কেউ যদি তার প্রাণ নষ্ট করে ফেলে তাহলে আমি এদের বিরুদ্ধে পরোক্ষ খুনের অভিযোগ আনতে চাই।

মজার ছলে কত প্রকারের যে চরম অন্যায় হয় তার ছোট্ট একটা নমুনা দেই: একজন ডাক্তার, একজন ভদ্রমহিলা আমাকে বেদনার সঙ্গে বলছিলেন, ‘দেখেন, বিভিন্ন নাম্বার থেকে আমার কাছে এন্তার কল দিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, আমার রেট কত’?
পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা সাইট পওয়া গেল যেখানে একটা মেয়ের নামে এই নাম্বারটা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমি কলগার্ল, আমাকে কল করুন’। এখন একজন ডাক্তারের ফোন নাম্বার পাওয়া তো জটিল কিছু না। প্রেসক্রিপশনে, চেম্বারে, সাইনবোর্ডে থাকে। যে এই নাম্বারটা এমন করে ছড়িয়ে দিল সেই কাপুরুষটা নিজেকে বড়ো বীরপুরুষ ভাবল!

যাই হোক, ‘যৌবনযাত্রায় ‘বাণী’ লিখে-টিখে কেউ-কেউ আবার মুক্তিযুদ্ধের দুর্ধর্ষ গবেষকও বনে গেলেন! মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হওযার মত যোগ্যতা আমার ছিল না কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখির কারণেই কিনা জানি না অন্য উপায়ে ‘যৌবনযাত্রা’ আমাকেও তাদের সাইটে লেখার সুযোগ করে দিল। সুযোগ করে দিল মানে আমার লেখা ছাপিয়ে দিল। আমার লেখা ছাপিয়ে দিল, আমার অনুমতি না-নিয়ে! এই বিরল সৌভাগ্যে আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু নিরানন্দ আমি আমার সাইটে একটা লেখা লিখলাম, ‘অন-লাইনে লেখালেখি হচ্ছে গণিমতের মাল।‘ [১]
বিনা অনুমতিতে আমার লেখাটা যৌবনযাত্রায় ছাপা হওয়ার করণে ‘বাঘমামা’ নামের একজন এসে আমার ওই পোস্টে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। বাঘমামা সম্ভবত যৌবনযাত্রার কর্তাগোছের কেউ হবেন। কারণ যৌবন যাত্রায় যে আমার লেখাটা পোস্ট করেছিল তাকে আচ্ছা করে বকা দিয়েছিলেন এবং এর একটা সদুত্তর চেয়েছিলেন। পোস্টদাতা বেচারা একটা টুঁশব্দও করেনি। করার কথা না। এই দেশে দুঃখপ্রকাশের চল নাই বিধায় আমি মুগ্ধ হয়ে ছিলাম।

বিনা অনুতিতে লেখাটা প্রকাশ করা ব্যতীত এখানে অন্য একটি বিষয় আমাকে প্রচন্ড ক্রদ্ধ করেছিল। সেটা হচ্ছে, ‘খোদাজার অংশবিশেষ‘, লেখাটি আমার একটা উপন্যাস ‘খোদেজা’ থেকে নেওয়া। মূল ঘটনা সত্য। খোদেজা নামের একটা শিশুর প্রতি চরম শারীরিক অন্যায় করা হয়েছিল। যে দু-জন যুবক এর জন্য দায়ী তারা যে কেবল খোদেজাকে চরম শারীরিক অত্যাচার করেছিল এই না; খোদেজা যখন চিৎকার করছিল তখন তার মুখে মুঠো মুঠো বালি গুঁজে দিয়েছিল। খোদেজার মৃত্যুর পর এই দু-জন আবার খোদেজার জানাজায়ও অংশগ্রহণ করেছিল। জানাজায় অংশগ্রহণের বিষয়টি আমাকে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছিল কারণ এমনটা আমি পূর্বে কখনও শুনিনি! ‘খোদেজা’ উপন্যাসটা লেখার পেছনের কথা এটাই।

ওই ইতরামির পর সেটা নিয়ে আরেকটি লেখা লিখেছিলাম, ‘হাজামের হাতে সার্জনের ছুঁরি [২]। ওই লেখায় যেটা লিখেছিলাম:
...যৌবনযাত্রায় ওই লেখাটা পড়তে গিয়ে মজার এই বিষয়টা লক্ষ করলাম। আমার লেখাটার সবটুকুই হুবহু কপি-পেস্ট করা হয়েছে কিন্তু এই প্যারায় এসে গালিগুলো সেন্সর করা হয়েছে।...
‘খোদেজা’ উপন্যাসে কেন গালির প্রসঙ্গ এসেছিল সেটা আমি পূর্বের লেখায় ব্যাখ্যা করেছি আবারও চর্বিতচর্বণ করি না।

তো, ‘যৌবনযাত্রা’ লেখাটা পাবলিশ হয়ে যে অন্যায়টা হয়েছে সেটা হচ্ছে খোদেজা উপন্যাসের অতি কষ্টের দিকটাকে রগরগে করে পাঠকের কাছে তুলে দেওয়া। এরা এবং এখানে পাঠকও যুক্ত, একটা শিশুর জান্তব চিৎকারকে উপভোগ করার চেষ্টা করেছে! খোদেজার উপর ঝাঁপিয়েপড়া ওই দুজন যুবকের সঙ্গে এদের খুব একটা তফাত নেই। কেবল সুযোগের অপেক্ষা।

এই সমস্ত ঘটনা ২০০৯ সালের। সব চুকেবুকে যাওয়ার পর এই প্রসঙ্গ নিয়ে আবারও কেন লিখছি? হালে একজন পাঠক আমাকে মেইল করলেন। ইনি আমার খুব পছন্দের মানুষ কিন্তু ভারী দুষ্ট। মেইলে লিখলেন, “...আপনাকে যৌবনযাত্রায় দেখা গেছে...”। সঙ্গে আবার ফিচেল হাসির ইমো। আমি আতংকিত হলাম, কী সর্বনাশ! এরা কী আমার কোনও ভিডিও আপলোড করে দিল না তো আবার!
যাই হোক, যৌবনযাত্রার কোনও অদলবদল হয়েছে কিনা আমি জানি না কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম আমার ওই লেখাটা আবারও পোস্ট করা হয়েছে, হুবহু [৩]। কেবল পোস্টদাতা অন্য একজন। আবার ঘটা করে লিখেছে, “অরিজিনালি পোস্টেট বাই অমুক”। এবারের কাজটা আরও গর্হিত কারণ এই পোস্টদাতা যৌবনযাত্রার যেখান থেকে এটা কপি পোস্ট করেছে সেখানে আমার আপত্তির প্রেক্ষিতে বাঘমামার বিরক্তিভরা উক্তি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছে। তারপরও লেখাটা রি-পোস্ট করেছে।
এই মানুষটা যে একটা অমায়িক চুতিয়া এতে অন্তত আমার কোনও সন্দেহ নাই।

সহায়ক সূত্র:
১. অন-লাইনে লেখালেখি হচ্ছে গণিমতের মাল: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_9376.html
২. হাজামের হাতে সার্জনের ছুরি: http://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_9089.html
৩. যৌবনযাত্রার লেখাটা:

Thursday, December 11, 2014

মিডিয়ার মুখে ছাই...।

‘শত্রুর মুখে ছাই’, বাংলা ভাষায় চালু একটা বাক্য। এই বাক্যটা ধার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। তবে খানিকটা বদলে, মিডিয়ার মুখে ছাই...
সুরুয মিয়া মৃত্যুর অপেক্ষায় নামের লেখাটায় [১] আমি লিখেছিলাম: “...এই দীর্ঘ এক মাস পার হওয়ার পরও পত্রিকার লোকজন কোনও প্রকারেই এটা নিয়ে কাজ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করেননি। কেন? তারা কী সুরুযের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন? আচ্ছা,সুরুযের মৃত্যু কি তাকে পত্রিকায় স্থান দেবে? আশা করছি দেবে। তাহলে এটা হবে সুরুযের জন্য অতি আনন্দের একটা সংবাদ নিঃসন্দেহে। সুরুয মরিয়া প্রমাণ করিল সে পত্রিকায় চেহারা দেখাবার যোগ্য।...”

কিন্তু আজ আমি অতি দুঃখের সঙ্গে মিডিয়াকে জানাচ্ছি যে সুরুয বাঁচিয়া প্রমাণ করিলেন তিনি মরেন নাই। আফসোস, না-মরে তিনি মিডিয়াকে অনেকখানি বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন। ছি! সুরুয নামের লোকটার বিবেক বলে কিছু আছে বলে তো মনে হয় না! কেননা, সুরুয মিয়া না-মরা পর্যন্ত তো তাকে নিয়ে নিউজ করার কোনও সুযোগ নাই। আর সেটা তো মারা য্ওয়ার পরই কেবল সম্ভব। তখন নিউজ মানে লাইনেজ হিসাবে টাকা। পাল্লা দিয়ে নিউজের লাইন বাড়বে টাকাও বাড়বে। আর যদি অফিস ছবি ধরে ফেলে তাহলে ছবির জন্য আলাদ থোক টাকা।

এ সত্য, সুরুয মিয়ার মৃতদেহের ছবি ছাপাবার কোনও সুযোগ এখানে নাই, এটা তো অপঘাতে মৃত্যু না। এখানে ভিন্ন পথ ধরতে হবে। ক্যামেরা তাক করে রাখতে হবে সুরুয মিয়ার স্ত্রী এবং মার দিকে। মার ছবি তুলতে হয়তো অনেকে আগ্রহ বোধ করবেন না কারণ কোঁচকানো চামড়ার ছবি ভাল আসবে না। ওহো, ক্যামেরা তাক করে বসে থাকলেই তো হবে না বুকফাটা কান্নার ছবি যে বড়ো প্রয়োজন। না-হলে তো পাবলিক খাবে না। কী উপায় তাহলে? মহিলাকে কাঁদাবার চেষ্টা করতে হবে, সবিরাম। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দিতে হবে। চালু প্রশ্ন, ‘স্বামী হারিয়ে আপনার অনুভূতি কি এখন’? এই সব।

পূর্বের লেখায় আমি লিখেছিলাম [১], বিনাকারণে পুলিশ নির্যাতন করে সুরুযের কেল হাড়ই (কলার বৌণ) ভেঙ্গে দেয়নি, কিছুদিন পূর্বে অপারেশনের জায়গাটার পেছনে অমানুষিক শক্তিতে মারার কারণে সুরুয মিয়ার মলদ্বার দিয়ে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। রক্তশূণ্যতায় তার মারা যাওয়ার উপক্রম।
সুরুয মিয়াকে পাঠানো হয়েছিল জেলার নামকরা সার্জন আমানুল্লাহ আমানের কাছে। প্রেসক্রিপশনে একগাদা ওষুধের সঙ্গে তিনি পরিষ্কার লিখে দিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করতে হবে। এর কোনও বিকল্প নাই। ডাক্তার তো বলে খালাস কিন্তু অপারেশনের টাকা আসবে কোত্থেকে?
এই নিয়ে আমি লেখা দিতে গিয়েও দিলাম না কারণ এখন পাঠক আমার লেখা নিয়ে আতংকে থাকেন। এই রে, ব্যাটা বুঝি আবার ‘ট্যাকাটুকা’ চাইবে।

যাই হোক, দু-দিন পূর্বে সফল ভাবে আমানুল্লাহ আমান সুরুয মিয়ার অপারেশন করেন। এই সার্জনের কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি কারণ তিনি সুরুযের প্রতি মমতার হাত অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছেন। অপারেশনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, ওষুধে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমি গভঅর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি এই প্রজন্মের একজন জহরলাল সাহার প্রতি যে যুবকটি না-থাকলে হয়তো সুরুযকে বাঁচানো যেত না।

সব কিছুর শেষে সুরুয এখন ভাল আছেন। হায়, ভাল নেই যে মিডিয়া- ওরে, সব আয়োজন যে মাঠে মারা গেল! মিডিয়ার জন্য আমার অমায়িক সমবেদনা রইল।

সহায়ক সূত্র:
১. সুরুয মিয়ার মৃত্যুর অপেক্ষা: http://www.ali-mahmed.com/2014/12/blog-post.html
...
আপডেট (১২.১২.১৪)
সফল অপারেশনের পর আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন সুরুয মিয়া। তার কর্মস্থলের সামনে...।
 

Tuesday, December 9, 2014

গুন্ডামি!

ছবি সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো
কাল (৮ ডিসেম্বর ২০১৪) প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত ) হাবিল হোসেন বিক্ষোভরত এক ছাত্রীকে পেছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছেন।

এমন কিছু দৃশ্য পূর্বে যে দেখিনি এমন না কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কনস্টেবল টাইপের লোকজনকেই দেখতাম। অল্প শিক্ষিত ওই সমস্ত লোকজনের শিক্ষায় বিস্তর গলদ থাকে কেবল এই-ই না এদের আরও অনেক সমস্যাও আছে। আমি এদের দোষ কাটাবার চেষ্টা করছি না- কনস্টেবলদের অনেককে ১৮ ঘন্টা ডিউটিও করতে হয় তারপর অনেকে ঘুমাবার জায়গা নিয়েও সমস্যায় ভোগেন। একজন ঘুম থেকে উঠলে সেই জায়গা খালি হলে অন্যজন ঘুমাবে। তো, মেজাজ থাকে টং- ব্যস, সুযোগ পেলাম সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিলাম।

কিন্তু আমাদের এই অফিসার সাহেবকে দেখে তো মনে হচ্ছে অভিজাত টাইপের একজন মানুষ! এমন একজন মানুষ গুন্ডামি-মাস্তানি করবেন এটা তার পেশা, চেহারার সঙ্গে মোটেও মিশ খায় না। আমি কেবল চোখ বন্ধ করে কল্পনা করার চেষ্টা করে শিউরে উঠি; শত-শত মানুষ, অসংখ্য মিডিয়ার সামনে দিনের বেলায় যদি পুলিশ এমন আচরণ করতে পারে তাহলে লোকচক্ষুর অন্তরালে, রাতের অন্ধকারে পুলিশ কী না করতে পারে! 

ওয়েল, এমন এটা অসভ্য আচরণ করার পরও এই মানুষটাকে চাকুরিচ্যুত করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সমস্যা কোথায়? হুমম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারি হলে সমস্যা নেই কিন্তু দলীয় লোক হলে সমস্যা আছে।
ছবি সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ
যেমনটা আমরা দেখেছি, গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি এ কে এম নাসির উল্লাহ-এর বেলায়। তিনি পোশাক পরেছেন বাংলাদেশ সরকারের কিন্তু শ্লোগান দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের।

Sunday, December 7, 2014

এই গ্রহের সবচেয়ে নির্বোধ যে মানুষটা...।

কখনও-কখনও আমাকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, নিজের সম্বন্ধে আপনার কি ধারণা?
যেটা সত্য আমি সেটাই বলি, এই গ্রহের সবচেয়ে নির্বোধ মানুষটা আমি নিজে। কারণ আমি স্মোক করি।

Saturday, December 6, 2014

চিংগুরা দেশের শিক্ষামন্ত্রী!!

‘চিংগুরা’ দেশ নিয়ে পূর্বেও কিছু লেখা লিখেছিলাম। চিংগুরা দেশটা ঠিক কোথায় এটা কেউ-কেউ জানতে চেয়েছিলেন। আগেও বলেছি ম্যাপটা জরাজীর্ণ হএয়ার কারণে স্পষ্ট করে বলতে পারিনি তবে যতটুকু মনে পড়ে এটা ‘বাংগুরা’ দেশের পাশেই।
চিংগুরা দেশটা জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে অনেকটা এগিয়ে ছিল। না, ভুল বললাম। সমস্ত দিক দিয়ে গোটা গ্রহের সমস্ত দেশ মিলিয়েও চিংগুরার ধারেকাছেও ছিল না।

আর চিংগুরা দেশের একেকটা আইডিয়া- আহা, কী অতুলনীয়, অভূতপূর্ব! কেবল শিক্ষাব্যবস্থার কথাই যদি বলি...। ১০০ জন পরীক্ষা দিলে ১০২ জন পাশ করত! পাশ দিতে দিতে চিংগুরা দেশে পাশ দেওয়ার ছেলেপেলের বিকট অভাব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। ওই দেশের শিক্ষামন্ত্রীর মন্ত্রীত্ব যায় যায় অবস্থা। না-গিয়ে উপায় কী! শিক্ষা দেওয়ার মত ছেলেপেলে না-থাকলে মন্ত্রী কোন কাজের? চিন্তায়-চিন্তায় কেশ হয় পগারপার! অনেক মাথা খাটিয়ে জটিল আঁক কষে শিক্ষামন্ত্রী একটা উপায় বের করলেন। পরীক্ষার সময় মোবাইল ফোন এবং ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়া সিদ্ধান্ত নিলেন।
পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে মোবাইল ফোন এবং ফেসবুক শব্দটা ব্যবহার করেছি। সত্যি বলতে কি, চিংগুরা দেশে মোবাইল ফোন নামের কোনও জিনিস ছিল না- মোবাইল ফোনের বদলে ‘কবুতরফোন’ ব্যবহার করা হতো। কবুতরের পায়ে একটা জমাট দুধের খালি চোঙা বেঁধে দেওয়া হতো। কবুতর প্রেরকের ওই চোঙা নিয়ে প্রাপকের কাছে উড়ে যেত। এরপর প্রাপক ওই চোঙায় মুখ লাগিয়ে...। এটা একটা জটিল প্রক্রিয়া এর বিশদ বুঝিয়ে বলার সাধ্য আমার নাই। আর সেদেশে ফেসবুকও ছিল না। রোদে বসে একজন অন্যজনের মাথার উকুন বাছতে বাছতে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করত। ওটারনাম ছিল ‘ফ্রেসমুখ’।

যাই হোক, এ তো কেবল তবলার ঠুকঠাক, কেবল শুরু। ক্রমশ যে পরীক্ষার সময় আপিস-আদালত বন্ধই না কারফিউ ঘোষণা করা হবে এ তো আর সাধারণ মানুষের জানার কথা না। পরীক্ষা চলাকালীন ক্রমশ কারফিউ ঘোষণা করা হবে, কারও ঘর থেকে বেরুবার যো থাকবে না। তখন কেবল একটাই কাজ...।

কেন এই সমস্ত উদ্যোগ? এই নিয়ে চিংগুরা দেশের লোকজনেরা একে অপরের মাথার উকুন বাছার সময় সামাজিক আলোচনায় মগ্ন হয়ে চুল ছিঁড়বে কিন্তু কোনও সমাধানে পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু কোনও এক বিচিত্র কারণে সেই দেশের জনসংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। নিয়ম করে পরীক্ষা দেওয়ার চেলেপেলেদের অভাব আর থাকবে না। সেই দেশে আনন্দই আনন্দ।

Thursday, December 4, 2014

হ্যাপি ফ্যামেলি।

মাহবুবকে হুইল -চেয়ার [১], [২] দেওয়ার পর-পরই একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সহৃদয় মানুষ, মাহবুব এবং তার বোন তানিয়ার জন্য এক বছরের পড়ার খরচ পাঠিয়েছিলেন। অতি সুখের বিষয় আজকাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে :) ।
তানিয়ার ঘটনাটা পূর্বের লেখায় বলেছিলাম ওর এক ক্লাস উপরে থাকার কথা কিন্তু ভাইয়ের জন্য সে একই ক্লাসে রয়ে গেছে!

যাই হোক, ওই সহৃদয় মানুষের কাছে আমি বড়ই সরমিন্দা কারণ পুরো প্রক্রিয়াটা শেষ করতে সময় লেগে গেল। আমি টাকাটা এই পরিবারের হাতে দিতে চাচ্ছিলাম না কারণ এদের অভাবের সংসার, দেখা গেল টাকাটা খরচ হয়ে গেল। এদিকে স্কুলের আবার নিয়ম বার্ষিক পরীক্ষার পূর্বে এরা সমস্ত হিসেব-নিকেষ করতে বসে। ডিসেম্বরের জন্য অপেক্ষা করা ব্যতীত উপায় রইল না। তো, এই ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষার পূর্বে স্কুলের যাবতীয় খরচ পরিশোধ করার পর মাহবুব এবং তানিয়ার আর পরীক্ষা দিতে কোনও সমস্যা রইল না। পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সুখের বিষয় মাহবুব এবং তানিয়া পরীক্ষা দিচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই মানুষটার প্রতি কেমন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি?
‘হ্যাপি ফ্যামেলি’ নামটা সম্ভবত ঠিক মানানসই হলো না। কারণ ছবিতে এই পরিবারের বাবাটাকে দেখে মনে হবে ভারী বিষণ্ণ, বুকে পাথর চেপে আছেন। বা ছেলে-মেয়েরা পরীক্ষা দিতে পারছে এটা তার কাছে বড়ই নিরানন্দ ঘটনা! খবরের পেছনে যেমন খবর থাকে তেমনি ঘটনার পেছনে ঘটনা। সেই ঘটনাটা বলাটা আমার জন্য খানিকটা বিব্রতকর। অসমীচীন ও অন্যায়ও বটে। জীবনে কতো বড়-বড় অন্যায় করে ফেলেছি ছোট্ট একটা অন্যায় নাহয় করলামই।
ভদ্রলোকের সামনের পাটির দাঁত নাই...।

সহায়ক সূত্র:
১. ডানা-ভাঙ্গা পাখি: http://www.ali-mahmed.com/2014/09/blog-post_20.html
২. আলোর পথে গুহামানব: http://www.ali-mahmed.com/2014/09/blog-post_24.html  

Monday, December 1, 2014

সুরুয মিয়ার মৃত্যুর অপেক্ষা!

সুরুয মিয়া অতি তুচ্ছ (!) একজন মানুষ। চাকরি করেন টেকনিকাল মাদ্রাসায় নৈশ প্রহরীর। এই সব মানুষদের ক-পয়সাই বা দাম আর এই সমস্ত মানুষদের নিয়ে যারা লেখেন তাদেরই বা ক-টাকা দাম?

৩ নভেম্বর রাত। সুরুয মিয়া মাদ্রসায় দায়িত্বরত। গভীর রাতে মাদ্রাসার দেয়াল টপকে সাদা পোশাকে কয়েকজন প্রবেশ করে জোর করে সুরুয মিয়াকে কলাপসিবল গেট খুলতে বাধ্য করে। বাইরে দাঁড়ানো একজন এস, আইয়ের সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ। শুরু হয় সুরুয মিয়াকে বেধড়ক মার। পুলিশের বক্তব্য সুরুয মিয়া চুরি করেছে। যেটা পরে প্রমাণিত হয় সবুজ নামের অন্য একজন চুরি করেছে। এদিকে সবুজের সঙ্গে সুরুয নাম গুলিয়ে সুরুযকে পুলিশ ধরেছে।

সুরুযকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় সুরুযের মোবাইল ফোন, ৪৮০ টাকা এবং তার তার ছোট্ট মেয়ে পায়ের নুপুর! নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকার লোকজন বাধা দিলে পুলিশ গুলি করারও হুমকি দেয়। থানায় সুরুযকে নির্মম ভাবে প্রহার করে ভেঙ্গে দেওয়া হয় তার ‘কলার-বৌন’। সুরুযকে যখন নিতম্বে মারা হচ্ছিল তখন সুরুয কাতর কন্ঠে অনুরোধ করেছিলেন এটা জানিয়ে যে মাত্র অল্প দিন পূর্বে তার পাইলসের অপারেশন হয়েছে। পুলিশ শোনেনি তার অনুরোধ। সুরুযের এই অনুরোধের পরও তার নিতম্বে প্রচন্ড শক্তিতে প্রহার করা হয়।

এই মাদ্রসার অধ্যক্ষকে পুলিশ জামাতের সঙ্গে জড়িয়ে বিদায় করে দেয়। অবশেষে প্রভাবশালী সহৃদয় একজন মানুষের কারণে সকালে সুরুযকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কারণ ছেড়ে না-দিয়ে পুলিশের উপায় ছিল না। যে চোর ধরা পড়েছিল সে এবং মামলার বাদিও একবাক্যে বলে যে এই চুরির সঙ্গে সুরুয জড়িত না, চুরি করেছে সবুজ। ছেড়ে দেওয়ার সময় সুরুযের মা যখন সুরুযকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন তখন পুলিশ সুরুযের মাকে বলে, তুমি একটা চোরের জন্য কাঁদছ!
(এই ঘটনার সমস্ত তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হয়েছে সুরুয মিয়া এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের লিখিত এবং ধারণকৃত বক্তব্য থেকে। )

সহজ-সরল একটা ঘটনা কারণ এটা আমাদের দেশে অভূতপূর্ব কোনও ঘটনা না। কিন্তু ঘটনা যেটা সেটা হচেছ এখানে প্রায় সমস্ত পত্রিকার সংবাদদাতারা রয়েছেন কিন্তু কেউই এই বিষয়ে গা করেননি। প্রভাবশালী একটি পত্রিকার প্রতিনিধি আমাকে জানালেন, এরইমধ্যে চার-পাঁচ দিন চলে গেছে এখন তো আর পত্রিকা এ নিউজ ধরবে না। সঙ্গে মাগনা এই তথ্যও দিলেন যে সুরুয লোক হিসাবে মন্দ।
বেশ-বেশ, অতি উত্তম। তা এই দেশে কে কতটা ভাল? শ্লা, আমিই কী ভাল মানুষ! তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম সুরুয লোক ভাল না, তো? দেখার বিষয় এই ঘটনায় সুরুয সম্পৃক্ত কি না এবং তার প্রতি অন্যায় হয়েছে কি না? উত্তরটা যদি হ্যাঁ হয় তাহলে সুরুয মন্দ নাকি গন্ধ সেটা এখানে আলোচ্য বিষয় না।

যাই হোক, সুরুয মিয়া তিন-তিনবার হাসপাতালে ভর্তি হন। ৩ নভেম্বরে ২০১৪-এ একবার। অবস্থার অবনতি হলে এই মাসেরই ১৬ নভেম্বরে আরেকবার। সর্বশেষ হাসপাতালে ভর্তি হলেন ২৭ নভেম্বর। শেষবার তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন মুমূর্ষু অবস্থায় কারণ পাইলসের অপারেশনের পরই তার নিতম্বে অমানুষিক শক্তিতে আঘাত করার কারণে তার মলদ্বার দিয়ে অনবরত রক্ত পড়া শুরু হয়। রক্তশূন্যতার কারণে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয়।
 
এই দীর্ঘ এক মাস পার হওয়ার পরও পত্রিকার লোকজন কোনও প্রকারেই এটা নিয়ে কাজ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করেননি। কেন? তারা কী সুরুযের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন? আচ্ছা,সুরুযের মৃত্যু কি তাকে পত্রিকায় স্থান দেবে? আশা করছি দেবে। তাহলে এটা হবে সুরুযের জন্য অতি আনন্দের একটা সংবাদ নিঃসন্দেহে। সুরুয মরিয়া প্রমাণ করিল সে পত্রিকায় চেহারা দেখাবার যোগ্য।

এই দেশটা এখন হয়ে গেছে একটা মগের মুল্লুক! আমিও মগের মুল্লুকেরই অধিবাসী একজন ‘মগা’ বিধায় অপেক্ষা করছি সুরুযের মৃত্যুর জন্য। তখন হয়তো একটা রগরগে, অতি আবেগপ্রবণ একটা লেখা লিখে ফেলব...।
...
04.12.14: আপডেট
অনবরত রক্তক্ষরণ বন্ধ না-হওয়ার কারণে সুরুয মিয়া ২রা ডিসেম্বর আবারও হাসপাতালে দারস্থ হন কিন্তু তাকে এখানে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
 

Sunday, November 30, 2014

সব্ই পণ্য, বিক্রির জন্য।

‘জননী’ [১] লেখাটায় লিখেছিলাম, “...আর এই মহিলাটির কথাও ঘুরে ঘুরে আসে, তার এই মমতার উৎস কী? এই মহিলার সঙ্গে কখনও বাচ্চাকাচ্চা দেখিনি-তবে কী অদেখা সন্তানের মায়া ঝপ করে নেমে আসে!।”

মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে আজ আমাকে এই লেখাটা লিখতে হবে এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না! আমার জন্য এ বেদনার, বড় কষ্টের। কখনও-কখনও বাস্তবতাকে মেনে নিতে মন সায় দেয় না। চোখের দেখা তথ্য গ্রহণে মস্তিষ্ক আগ্রহ দেখায় না। এটাও মনে হয়েছিল, থাক, এই বেদনার কথা পাঠককে জানিয়ে কাজ নেই। কিন্তু এই ভাবনা থেকে সরে আসতে হলো কারণ আনন্দের গল্প শেয়ার করলে বেদনার কেন নয়?

‘জননী’ লেখাটা যাকে নিয়ে সেই মহিলাকে আজ দেখা গেল অতি ব্যস্ত রাস্তায় চট বিছিয়ে রোদে এই শিশুটিকে ফেলে রেখে চিকিৎসার নাম করে টাকা উঠাতে। ভঙ্গি একই কেবল লোক বদলেছে! আসলে শারীরিক অসুবিধাসম্পন্ন এই শিশুটি কেবল একটা লাভজনক পণ্য। মানুষ বদলায় কিন্তু শিশুটির নিয়তির কোনও হেরফের হয় না।
এবার জরুরি আলাপটা সারি, এই শিশুটির জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন, ‘শেল্টার হোম’ টাইপের কিছু একটা। এই বিষয়ে সহায়তা চাচ্ছি। কারও কি জানা আছে এমন কোনও শেল্টার হোমের খোঁজ। দয়া করে কোনও একটা ব্যবস্থা কি করে দিতে পারেন কেউ?

১. জননী: http://www.ali-mahmed.com/2014/11/blog-post_45.html 

Saturday, November 29, 2014

জননী।

স্টেশনে শারীরিক অসুবিধাসম্পন্ন এই শিশুটিকে পূর্বে কখনও দেখেছিলাম সম্ভবত, খুব ভাল খেয়াল নেই! এর সঙ্গের লোকজন চিকিৎসার নাম করে টাকাপয়সা উঠাতো। চিকিৎসার নাম করে টাকাপয়সা উঠিয়ে কারও-কারও রুজিরোজগার মন্দ হয় না।
সোজা কথায় শিশুটি একটি পণ্য, লাভজনক পণ্য। সবই পণ্য, বিক্রির জন্য।

আজ একে দেখলাম প্ল্যাটফর্মে পড়ে আছে, গায়ে একটা সুতোও নেই। ভাতবিক্রেতা মহিলাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন এই শিশুটির বাবা একে ফেলে গেছে, উধাও! স্টেশনেরই একজন রোগা-রোগা কালোমতন মহিলা নাকি একে গোসল করিয়েছেন, ভাত খাইয়েছেন। আমার বিস্ময়ের শেষ নেই কারণ এই মহিলাকে আমি প্রায়ই দেখি, এর তো নিজেরই থাকা-খাওয়ার ঠিকঠিকানা নেই। অথচ এই মানুষটাই শিশুটির দায়িত্ব নিয়েছেন এটা সমস্ত অংক এলোমেলো করে দেয়। এই মহিলা আমাকে বারবার এটা বলতে লাগলেন এর দায়িত্ব নিয়ে তিনি না কোনো প্রকারের ঝামেলায় পড়েন।

স্টেশনে তখন আমি একজন দায়িত্বশীল মানুষের দেখা পেয়ে গেলাম। রেলওয়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তা। মানুষটা অন্য একজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যেখানটায় চা খাচ্ছেন, এই শিশুটির কাছ থেকে সামান্যই দূরে। আমি তাকে বললাম একটু এসে এই শিশুটিকে দেখে যেতে। বিস্তর চাপাচাপি করেও এই ভদ্রলোকটার (!) পা ফাঁক করানো গেল না! যদি শিশুটিকে দেখে ফেললে বাড়তি কোনও দায়িত্ব চাপে, তাই। আমাকে পরামর্শ দিলেন জিআরপি ওসির কাছে লিখিত আকারে জানাতে। এই বিষয়ে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা বড়ই তিক্ত। একবার ও-রাস্তা মাড়ালে জীবনটা ভাজা-ভাজা হয়ে যাবে। এমন সব প্রশ্ন করা হবে যেটা আমি তো দূরের কথা শিশুটির বাপও জানে কিনা সন্দেহ।
এই গোয়েন্দাপ্রবরকে দেখে কেবল এই ভাবনাটাই কাজ করছিল রেলওয়ে এদের পোষে কোন কাজে? এরপর আমি অন্য রাস্তা ধরলাম। সেই রাস্তার অলিগলির খোঁজ দিতে চাই না, ‘অসুবিদা’ আছে।

এই সমস্যা সমাধানের পর চটজলদি এই শিশুটির জন্য কিছু গরম কাপড়-টাপড়ের প্রয়োজন দেখা দিল। এহ রে, খানিক ঝামেলা হয়ে গেল। মাসের শেষ, টানাটানি চলছে। উপায় একটা বের হয়, কাজ তো থেমে থাকে না। নাদুসনুদুস একজনকে গড়িয়ে গড়িয়ে আসতে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেললাম। এই মানুষটার সঙ্গে আমার হৃদ্যতা আছে এবং পূর্বের কিছু ঘটনাও আছে, সে অন্য প্রসঙ্গ।
আমি ঝলমলে মুখে বললাম, ‘আরে-আরে, কি খবর- আমি তো আপনাকেই খুঁজছি’। মানুষটা মুখ একহাত লম্বা করে কষ্টার্জিত হাসি হাসলেন কারণ তিনি এটা বিলক্ষণ জানেন তাকে খোঁজাখুঁজি করার পেছনে আমার কোনও-না-কোনও একটা ঝামেলা জড়িয়ে আছে। আমি আবারও বললাম, ‘আরে-আরে, কী কান্ড, আপনার স্বাস্থ্য যেহারে বাড়ছে...’।
তিনি আমাকে কথা শেষ করতে দিলেন না হাত তুলে থামিয়ে বিরস মুখে বললেন, ‘ব্যস-ব্যস, আর বলতে হবে না। রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে চট করে সরতে পরব না, কোনও একটা গাড়ি চাপা দিয়ে চলে যাবে, এইসব তো। তা আপনার কত টাকা দরকার’?

আমি বিষম চিন্তায় পড়ে গেলাম। জনে-জনে লোকজন যেভাবে আমার চাল বুঝে ফেলছে এ তো বিরাট সমস্যা,ভবিষ্যৎ অন্ধকার! যাই হোক, মানুষটার কল্যাণে এই শিশুটির জন্য কম্বল, গরম কাপড়ের ব্যবস্থা হয়। স্টেশনে যে মহিলা ভাত বিক্রি করেন তাকে বলে নিয়মিত ভাত খাওয়ার একটা ব্যবস্থাও হলো। ফিরে আসতে আসতে আমার মাথায় যেটা ঘুরপাক খাচ্ছিল সব মিলিয়ে নড়বড়ে একটা ব্যবস্থা হলো বটে কিন্তু এটা তো কোনও স্থায়ী সমাধান না। আর এই মহিলাটির কথাও ঘুরে ঘুরে আসে, তার এই মমতার উৎস কী?
এই মহিলার সঙ্গে কখনও বাচ্চাকাচ্চা দেখিনি-তবে কী অদেখা সন্তানের মায়া ঝপ করে নেমে আসে!।
WhatsApp