Monday, December 1, 2014

সুরুয মিয়ার মৃত্যুর অপেক্ষা!

সুরুয মিয়া অতি তুচ্ছ (!) একজন মানুষ। চাকরি করেন টেকনিকাল মাদ্রাসায় নৈশ প্রহরীর। এই সব মানুষদের ক-পয়সাই বা দাম আর এই সমস্ত মানুষদের নিয়ে যারা লেখেন তাদেরই বা ক-টাকা দাম?

৩ নভেম্বর রাত। সুরুয মিয়া মাদ্রসায় দায়িত্বরত। গভীর রাতে মাদ্রাসার দেয়াল টপকে সাদা পোশাকে কয়েকজন প্রবেশ করে জোর করে সুরুয মিয়াকে কলাপসিবল গেট খুলতে বাধ্য করে। বাইরে দাঁড়ানো একজন এস, আইয়ের সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ। শুরু হয় সুরুয মিয়াকে বেধড়ক মার। পুলিশের বক্তব্য সুরুয মিয়া চুরি করেছে। যেটা পরে প্রমাণিত হয় সবুজ নামের অন্য একজন চুরি করেছে। এদিকে সবুজের সঙ্গে সুরুয নাম গুলিয়ে সুরুযকে পুলিশ ধরেছে।

সুরুযকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় সুরুযের মোবাইল ফোন, ৪৮০ টাকা এবং তার তার ছোট্ট মেয়ে পায়ের নুপুর! নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকার লোকজন বাধা দিলে পুলিশ গুলি করারও হুমকি দেয়। থানায় সুরুযকে নির্মম ভাবে প্রহার করে ভেঙ্গে দেওয়া হয় তার ‘কলার-বৌন’। সুরুযকে যখন নিতম্বে মারা হচ্ছিল তখন সুরুয কাতর কন্ঠে অনুরোধ করেছিলেন এটা জানিয়ে যে মাত্র অল্প দিন পূর্বে তার পাইলসের অপারেশন হয়েছে। পুলিশ শোনেনি তার অনুরোধ। সুরুযের এই অনুরোধের পরও তার নিতম্বে প্রচন্ড শক্তিতে প্রহার করা হয়।

এই মাদ্রসার অধ্যক্ষকে পুলিশ জামাতের সঙ্গে জড়িয়ে বিদায় করে দেয়। অবশেষে প্রভাবশালী সহৃদয় একজন মানুষের কারণে সকালে সুরুযকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কারণ ছেড়ে না-দিয়ে পুলিশের উপায় ছিল না। যে চোর ধরা পড়েছিল সে এবং মামলার বাদিও একবাক্যে বলে যে এই চুরির সঙ্গে সুরুয জড়িত না, চুরি করেছে সবুজ। ছেড়ে দেওয়ার সময় সুরুযের মা যখন সুরুযকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন তখন পুলিশ সুরুযের মাকে বলে, তুমি একটা চোরের জন্য কাঁদছ!
(এই ঘটনার সমস্ত তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হয়েছে সুরুয মিয়া এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের লিখিত এবং ধারণকৃত বক্তব্য থেকে। )

সহজ-সরল একটা ঘটনা কারণ এটা আমাদের দেশে অভূতপূর্ব কোনও ঘটনা না। কিন্তু ঘটনা যেটা সেটা হচেছ এখানে প্রায় সমস্ত পত্রিকার সংবাদদাতারা রয়েছেন কিন্তু কেউই এই বিষয়ে গা করেননি। প্রভাবশালী একটি পত্রিকার প্রতিনিধি আমাকে জানালেন, এরইমধ্যে চার-পাঁচ দিন চলে গেছে এখন তো আর পত্রিকা এ নিউজ ধরবে না। সঙ্গে মাগনা এই তথ্যও দিলেন যে সুরুয লোক হিসাবে মন্দ।
বেশ-বেশ, অতি উত্তম। তা এই দেশে কে কতটা ভাল? শ্লা, আমিই কী ভাল মানুষ! তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম সুরুয লোক ভাল না, তো? দেখার বিষয় এই ঘটনায় সুরুয সম্পৃক্ত কি না এবং তার প্রতি অন্যায় হয়েছে কি না? উত্তরটা যদি হ্যাঁ হয় তাহলে সুরুয মন্দ নাকি গন্ধ সেটা এখানে আলোচ্য বিষয় না।

যাই হোক, সুরুয মিয়া তিন-তিনবার হাসপাতালে ভর্তি হন। ৩ নভেম্বরে ২০১৪-এ একবার। অবস্থার অবনতি হলে এই মাসেরই ১৬ নভেম্বরে আরেকবার। সর্বশেষ হাসপাতালে ভর্তি হলেন ২৭ নভেম্বর। শেষবার তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন মুমূর্ষু অবস্থায় কারণ পাইলসের অপারেশনের পরই তার নিতম্বে অমানুষিক শক্তিতে আঘাত করার কারণে তার মলদ্বার দিয়ে অনবরত রক্ত পড়া শুরু হয়। রক্তশূন্যতার কারণে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয়।
 
এই দীর্ঘ এক মাস পার হওয়ার পরও পত্রিকার লোকজন কোনও প্রকারেই এটা নিয়ে কাজ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করেননি। কেন? তারা কী সুরুযের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন? আচ্ছা,সুরুযের মৃত্যু কি তাকে পত্রিকায় স্থান দেবে? আশা করছি দেবে। তাহলে এটা হবে সুরুযের জন্য অতি আনন্দের একটা সংবাদ নিঃসন্দেহে। সুরুয মরিয়া প্রমাণ করিল সে পত্রিকায় চেহারা দেখাবার যোগ্য।

এই দেশটা এখন হয়ে গেছে একটা মগের মুল্লুক! আমিও মগের মুল্লুকেরই অধিবাসী একজন ‘মগা’ বিধায় অপেক্ষা করছি সুরুযের মৃত্যুর জন্য। তখন হয়তো একটা রগরগে, অতি আবেগপ্রবণ একটা লেখা লিখে ফেলব...।
...
04.12.14: আপডেট
অনবরত রক্তক্ষরণ বন্ধ না-হওয়ার কারণে সুরুয মিয়া ২রা ডিসেম্বর আবারও হাসপাতালে দারস্থ হন কিন্তু তাকে এখানে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
 

1 comment:

limon hasan said...

ধন্যবাদ, এমন একটি তথ্য আমাদের সাথে ভাগ কারার জন্য।