Tuesday, January 13, 2015

পা-কাটা শিশু এবং মিডিয়ার ভোগান্তি-ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়: ২!

দিনাজপুরের ট্রেনে বেজায় ভিড় বললে কম বলা হয়! ট্রেনটা কমলাপুর স্টেশন পৌঁছার পর হুড়মুড় করে যাত্রীরা নামা শুরু করল। প্রথমে এটা ভাল করে লক্ষ করিনি- ছাদ থেকে একজনকে দেখলাম বিশাল-বিশাল বোঁচকা ফেলছেন। সেই বোঁচকা আবার দু-জন ভদ্রমহিলা নামাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন দেখে আমিও হাত বাড়ালাম। বাহে, চোখে দেখে সটকে পড়ি কেমন করে। কিন্তু ওই ভদ্রলোক যখন নামার চেষ্টা করলেন তখন দেখা দিল আসল বিপদ। অনভ্যস্ততার কারণে তিনি নামতে পারছিলেন না। তাকে নামাবারও একটা গতি হলো।

এই মানুষটাকে আমি বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি ছাদে কেন রে ভাই’? মানুষটার বিমর্ষ-ক্লান্ত উত্তর, ‘কী করব, ভিড়ের জন্য ভেতরে তো ঢুকতেই পারি নাই’। আমি আবারও বললাম, ‘আপনি কি দিনাজপুর থেকে ছাদে করে আসলেন’? তিনি একটা স্টেশনের নাম বললেন। নামটা আমি ভুলে গেছি। তাও ৬ ঘন্টার রাস্তা। আমি কেবল চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করছিলাম এই ৬ ঘন্টা এই ভদ্রলোক এই তীব্র শীতে ছাদে টিকে ছিলেন কেমন করে! এটা কী সম্ভব! শীতের সঙ্গে যোগ হয়েছে কমবেশ ৬০/৭০ মাইল বেগের হিম বাতাস।
ভদ্রলোককে একটু ধাতস্ত হওয়ার সুযোগ দিয়ে আমি আবারও জানতে চাইলাম, ‘আপনার সাথের মহিলারা ঢুকতে পারলেন আর আপনি পারলেন না’! তিনি বললেন, ‘এরাও তো ছাদে ছিল’। আমি জীবনে এমন হতভম্ব কমই হয়েছি। এই দুজন মহিলাও ৬ ঘন্টা ধরে এই তীব্র শীতে ছাদে ভ্রমণ করেছেন! এও কী সম্ভব। যেখানে ৮/১০ মাইল বাতাসে আমি জবুথবু হয়ে আছি।

হায় গণতন্ত্র! গণতন্ত্রের জন্য এই সবের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে। ট্রেনে চড়ার সময় এদের হয়তো কল্পনাতেও ছিল না যে ট্রেনটা পৌঁছার কথা দুপুর ২টায় সেটা এসে পৌঁচেছে রাত দুটোয়! এই অবর্ণনীয় কষ্ট এরা সহ্য করে গেছেন ঘন্টার-পর-ঘন্টা ধরে। আমাদের মিডিয়ার ভাষায়, যাত্রীদের ভোগান্তি বা ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়।
আমি আমার মস্তিষ্ককে পটাবার চেষ্টা করছি, দেখ বাপ, তোর নিয়ন্ত্রণে থাকা আমার শরীরের সমস্ত কলকব্জাকে এই নির্দেশ পাঠা যে এদের তীব্র শীত সহ্য করার তুলনায় আমার শীতটা কিছুই না। সম্ভবত আমার মস্তিষ্কও ঠান্ডায় জমে গেছে কারণ আমার শরীরের মধ্যে কোনও পরিবর্তন আমি লক্ষ করলাম না। যথারীতি শীতে কাবু। মাথায় ঠান্ডা লেগে প্রচন্ড মাথাব্যথাও করছে। অসহনীয়!

রাত তখন দুইটার উপর। এক বিদেশীকে দেখলাম বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে। আমি তাকে বললাম, ‘আমি কি কোনও প্রকারে তোমার কাজে আসতে পারি?
সে আমাকে বলল, ‘আমি প্যাসিফিক হোটেলে যেতে চাই’।
আমি জানতে চাইলাম, ‘প্যান-প্যাসিফিক সোনারগাঁও’?
সে আমাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল। সেটায় দেখলাম হোটেলের ঠিকানা ১২০ মতিঝিল। এখন আমি বুঝলাম এটা ‘প্যাসিফিক’ নামের অন্য একটা হোটেল। তার সমস্যাটা খানিক আঁচ করা গেল। সঙ্গে কোনও সেল-ফোন নাই বিধায় যোগাযোগ করতে পারছে না। প্যাসিফিক হোটেলে ফোন করে তার জন্য একটা কামরার ব্যবস্থা হলো, ১৫০০ টাকা ভাড়ায়। এটাই এই হোটেলের সর্বনিম্ন রুম-ট্যারিফ, তাও নন-এসি!

ধপধপে সাদাচুলের এই মানুষটার দেশ হচ্ছে অষ্ট্রিয়া। দিনাজপুর থেকে এইমাত্র এসে নামল। কারণ এর ভাষায় দেশে এখন কিছুই ঠিক-ঠাক চলছে না। তাই তড়িঘড়ি করে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় চলে এসেছে। অবরোধ চলাকালীন এ ঢাকাতেই থাকবে। এর এও প্রবল আশা যেটা আমাকে বলছিল, ‘আশা করছি, তোমাদের দেশের নেতারা বসে সমস্যার একটা সমাধান করবেন’।
আমি হাসি গোপন করলাম, আমাদের দেশের নেতারা বসে কথা বলেন না, বলেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ফল যা হওয়ার তাই হয়।

যাই হোক, সমস্যা দাঁড়ালো যেটা আমি আর এঁকে খুলে বলিনি যে এই গভীর রাতে এর যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমি প্যাসিফিক হোটেলে আবারও ফোন করে জানতে চাইলাম, তোমাদের কি গাড়ির ব্যবস্থা আছে? এই মানুষটাকে স্টেশন থেকে নিয়ে যেতে পারবে? উত্তরটা নেতিবাচক হলে আমি পড়লাম বিপদে। জেনেশুনে একে এখন কেমন করে ছেড়ে দেই। এ ভালই খোঁজখবর রাখে। আমাকে বারবার বলছিল, কোনও সমস্যা নেই আমি সিএনজি নিয়ে চলে যেতে পারব। যে দেশের যে চল- আমাদের মত এও স্কুটারকে ‘সিএনজি’ বলা শিখে ফেলেছে।
ভাগ্য ভাল, একটা ক্যাব পাওয়া গেল। কমলাপুর স্টেশন থেকে মতিঝিলের দুরত্ব উল্লেখযোগ্য না কিন্তু এই ট্রেনের সময় ক্যাব নামের দুর্লভ বস্তু কত টাকা চাইবে এটা আগাম বলা মুশকিল। আমি ক্যাবচালককে পটাবার চেষ্টা করছি, ‘দেখো মিয়া, এরা হইল এই দেশের মেহমান। কলঙ্ক তো তুমার-আমার হইব না, হইব দেশের’।
আমি নিজেও কম অবাক হইনি যখন মাত্র একশ টাকায় ক্যাবচালককে রাজি করিয়ে ফেললাম। কম টাকায় রাজি হওয়ার কারণে আমার চোরের মন- আমি ক্যাবের নাম্বারটা টুকে রাখলাম। কিছুক্ষণ পর যখন হোটেলে ফোন করে নিশ্চিত হলাম তাদের গেষ্ট পৌঁচেছে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

এয়ারপোর্ট স্টেশনেও দেখেছি এখন কমলাপুরেও দেখলাম ট্রেনের সময়সূচীর দেখার জন্য স্টেশনের বিভিন্ন জায়গায় মনিটার লাগিয়েছে। আমার রাতের বারোটার ট্রেনের সময় দুম করে তিনটা থেকে ছয়টা হয়ে গেল! বারোটা থেকে তিনটা, তিনটা থেকে ছয়টা, ভাল। কী করি, স্টেশনে ঘুরেফিরে দেখা ব্যতীত আর তো কোনও কাজ নাই। স্টেশনের কোনও কোনায় গিয়েও বাতাসের হাত থেকে বাঁচা যাচ্ছে না। অথচ এখানে ছিন্নমূল অনেকেই কেবল পত্রিকার কাগজ বিছিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে দিব্যি ঘুমাচ্ছে।
একটা শিশুকে দেখলাম, পৃশ্নি-দুর্বল দেহ নীচে-উপরে কিছুই নাই। তবে রক্ষা, এ জ্যাকেট টাইপের ভারী কিছু পরে আছে।

এক জায়গায় দেখা গেল বাড়তি ভিড়। ভিড়ের উৎসের কারণটা খানিক অন্য রকম। এক মেয়ে বিস্তর সাজগোজ করে আছে যেন স্বর্বেশ্যা-অপ্সরা সাজার অপচেষ্টা। তাতেও সমস্যা ছিল না কিন্তু ইনি আবার একপাশে ওড়না ফেলে রেখেছেন। এটা সম্ভবত হালের ফ্যাশন। অন্য পাশের ওড়না কবে সরাবেন লোকজন এই অপেক্ষায় কিনা কে জানে। জিজ্ঞেস করার উপায় নেই!

ভোর পাঁচটায় গোটা স্টেশনে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। রেল-পুলিশ এসে মেঝেতে ঘুমন্ত সবাইকে উঠিয়ে দিচ্ছে। সবাই গাট্টি-বোঁচকা গুটিয়ে ফেলছে। এক জায়গায় আমার চোখ আটকে গেল। আট-দশ বছরের একটা বাচ্চা। পুলিশের দাবড়ানি খেয়ে চোখ কচলাচ্ছে। ওর দুচোখে রাজ্যের ঘুম। পুলিশও নাছোড়বান্দা- শেষপর্যন্ত উঠিয়েই ছাড়ল।শিশুটির পাশেই রাখা ক্রাচ দেখে আমি ভাল করে লক্ষ করে দেখলাম এর এক পা নেই। হাফ-হাতা শার্ট গায়ে। হি হি করে কেমন কাঁপছে। অযথাই হাফ-হাতা শার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে শীত থেকে বাঁচার অর্থহীন চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এর জন্য একটা গরম কাপড়ের বড়ো প্রয়োজন। কিন্তু এই স্টেশনে পাওয়ার তো কোনও উপায় দেখি না। এক পেপারওয়ালাকে, এরও বয়স অল্প যেটা বললাম সেটাও এক ধরনের অন্যায়। তার গায়ের জ্যাকেটটা বিক্রি করতে রাজি হলো না। পা-কাটা শিশুটির জন্য কিছু করা গেল না।
নিজের গায়ের জ্যাকেটটা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ আমি মহাপুরুষ নই- কেবল মহাপুরুষরাই শীতে কাবু হন না। মনিটরের তারতম্যে শিশুটিকে হারিয়ে ফেললাম।

মনিটরে ক্রমশ সংখ্যা বদল হয়, ছ-টার জায়গার এখন দেখাচ্ছে নয়টা। এই নয়টা এক সময় হয়ে গেল বারোটা। কাঁটায়-কাঁটায় বারোটায় ট্রেন রওয়ানা হলো। পার্থক্য কেবল রাতের বারোটার স্থলে দিনের বারোটা, মাত্র বারো ঘন্টা লেট। আমাদের মিডিয়ার ভাষায়, শিডিউল বিপর্যয়।
ট্রেন যখন স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছিল তখন আবারও সেই পা-কাটা শিশুটিকে দেখলাম। ঠক-ঠক করে ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সেই সময় আমার সত্যি এমনটাই মনে হয়েছিল এই শিশুটির জন্য কোথায় যেন আমার চেষ্টার অভাব ছিল। ট্রেনের জান্তব শব্দ ছাড়িয়ে কানে বাজে ঠক-ঠক-ঠক। ঠক-ঠক শব্দ তুলে শিশুটি এগিয়ে যাচ্ছে পোকায় খাওয়া আমার গলিত শব ক্রাচে লেপ্টে...।

সহায়ক সূত্র:
পা-কাটা শিশু এবং মিডিয়ার ভোগান্তি-ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়: ১ : http://www.ali-mahmed.com/2015/01/blog-post_12.html

No comments: