Search

Saturday, November 23, 2013

জননী!


আজ স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছিআমার প্যান্টে টান পড়লে আমি ফিরে দেখি এই শিশুটিকেতার সোজাসাপটা প্রশ্ন, তোমার কাছে টেকা আছে?
আমি বললাম, থাকলে!
সে একগাল হেসে বলে, ভাত খামু
আমি বললাম, তোমার না কি?
তার ষ্পষ্ট উত্তর, রাজু মস্তান
তার বলার ভঙ্গি নামের বিশেষত্ব আমাকে চমকে দেয়আমি হাসি লুকিয়ে বলি, তুমি দেখি বিরাট মস্তান!
তার উত্তর,
আমি এইবার তাকে বললাম, তোমার মা কই?
সে একজন মহিলাকে দেখিয়ে বলে, ওইডা আমার মা
সে যে মহিলাকে দেখিয়ে দিলো একে আমি চিনিকারণ ওভারব্রিজের নীচে একে প্রায়ই শুয়ে থাকতে দেখেছিএর সঙ্গে কখনও কোনো শিশুকে দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না

যে মহিলা স্টেশনে ভাত বিক্রি করে একে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি ওই মহিলার ছেলে?
তার কাছ থেকে যেটা জানা গেলএই রাজুর গল্পটা সহজ-সরল না, নেকখানি আঁকাবাঁকারাজুর মার মাথা এলোমেলো ছিলতার জন্মের শিশুটিকে (এই মহিলার ভাষ্য অনুযায়ী) মেরে ফেলে এরপর রাজুকে ফেলে কোথায় চলে গেছে কেউ জানে না! এরপর থেকে রাজু এই মহিলার কাছে থাকে, এই মহিলাটিকেই 'মা' ডাকে

আমি চুপ করে শুনে যাইতিনি আরও কীসব বলছিলেন কিন্তু আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম নাকেবল আমার মাথায় ঘুরপাক খায়, রাজুকে এখন দেখভাল করছেন যে মহিলা তিনি নিজেই অসুস্থ! পূর্বেই বলেছি, প্রায় সময় আমি তাঁকে দেখেছি ওভারব্রিজের নীচে শুয়ে থাকতেকখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি তাঁর দিন চলে কেমন করে? অথচ কী অবলীলায় এই শিশুটিকে তিনি কোলে তুলে নিয়েছেন

আমার মত ভদ্দরনোকের ভাবাভাবি করেই দিন পার হয়- এঁর এতো ভাবার সময় কোথায়!

Friday, November 22, 2013

একজন ‘পাইপমানুষ’!

আমার এক সুহৃদ আমার লেখালেখি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন থাকেন। তার এই উদ্বেগ অনেক গুণ বেড়ে গেল যখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধ্যাদেশ-২০১৩ আইনটার অনুমোদন দেয়া হলো। ওয়ারেন্ট ছাড়াই পুলিশ গ্রেফতার করতে পারবে। একজন পুলিশ বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে এসে কাউকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলে ‘কিসসু’ করার নেই।
এটা স্রেফ একটা কালো আইন- কোনো প্রকারেই এই আইনটাকে আইন বলা চলে না, কারো হাত-পা বেঁধে সাঁতরাবার প্রয়াস মাত্র। প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য এমন আইন করা হলে এরা সবাই একাট্টা হয়ে তুলকালাম করে ফেলতেন। কিন্তু এই আইনটার বেলায় এরা ঝিম মেরে রইলেন!


কারণটা সম্ভবত এমন, ওয়েবে যারা লেখালেখি করেন এরা তাদের বাড়া ভাতে ছাই দেয়ার চেষ্টা করছেন। ওয়েবে লেখালেখি, বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়া ক্রমশ নিজেদের জন্য হুমকি মনে করছে। তাদের ‘পাছাভারী’ ভাবটা হালকা হয়ে যায় যে। এটা সত্য, ইলেকট্রনিক-প্রিন্ট মিডিয়ার কাউকে-কাউকে নিয়মিত বেতন পেতে সমস্যা হয় কিন্তু এই ভুবনেরই কাউকে-কাউকে আশি লাখ টাকার গাড়ি হাঁকাতেও দেখা যায়! একটা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রধানকে এমনিতে লম্বা-লম্বা কথা বলতে শুনি। অথচ এই মানুষটার কারণে ওখানে চাকুরিরত এক মহিলাকর্মীকে নিয়মিত মনোবিদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কারণটা সহজেই অনুমেয়...।

যাই হোক, সেই সুহৃদ, বিচিত্র কারণে আমার মত মানুষের জন্য তার বাড়াবাড়ি রকমের মমতা- এমন মমতায় মাখামাখি হয়ে অন্য ভুবনে যেতে ইচ্ছা করে না যে। তিনি আমাকে দু-দিন আগেও বলছিলেন, দেশের শক্তিমান মানুষদের নিয়ে না-লিখলেই ভাল। সেফ...।
এটা সত্য, আমি খুব দুর্বল একজন মানুষ কিন্তু লেখার সময় যা লিখতে যেটা মন সায় দিয়েছে, তাই লিখেছি। কারণ যখন লিখতে বসি তখন আমার নিজের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না- জাগতিক কোনো ভয় তখন কাজ করে না।


কিন্তু এখন কেন যেন দেশ, বড়-বড় সমস্যা নিয়ে লিখতে ইচ্ছা করে না। আমার মধ্যে এখন যে ভাবনাটা কাজ করে সেটা এমন, শত-শত টন নিউজপ্রিন্টে লিখে বা ওয়েব তথ্যের ভারে তার কাত হয়ে গেলেই বা কী? এই দেশে ‘দুইজন ভদ্রমহিলা’ যেটা চাইবেন, যা চাইবেন; সেটাই হবে- এর ব্যত্যয় হওয়ার কোনো যো নাই। এই সব নিয়ে লেখাটা এখন আমার কাছে অপচয় মনে হয়, শব্দের অপচয়! এটা আমার নিজস্ব মত। কারো অন্য মত থাকলে তার সঙ্গে আমি তর্ক করতে যাব না।

আমি বরং ছোট-ছোট বিষয় নিয়েই থাকি না কেন। এই ছেলেটির সঙ্গে পরিচয় খানিকটা অন্য ভাবে। এই মাসের ১৫ তারিখে পত্রিকা বের হলো, (যেটার সঙ্গে আমি জড়িত)। রেল-ইস্টেশনে পত্রিকা বিতরণকারীদেরকে পত্রিকা বুঝিয়ে দেয়ার পর আমার হাতে বেশ কিছু বেঁচে যাওয়া পত্রিকা। একটা ট্রেন তখন স্টেশনে দাঁড়ানো। একজন যাত্রী কিছু একটা কিনতে স্টেশনে নেমেছিলেন সম্ভবত। আমার হাতে পত্রিকা দেখে বললেন, ‘আপনি কি পত্রিকা বিক্রি করেন’?

আমি হ্যাঁ-না কিছুই বললাম না। অসুখের কারণে প্রচুর ওজন কমেছে কিন্তু আমার চেহারায় যে হকার-হকার ভাব চলে এসেছে এটা জানা ছিল না। কী আর করা, কপালের ফের!
হঠাৎ আমার মনে পড়ল, ছুটির কারণে আজ সমস্ত জাতীয় পত্রিকা বন্ধ। ভাল একটা সুযোগ তো। আমি একটা ছেলেকে দাঁড়ানো দেখে তাকে বললাম, ‘তুমি কি গাড়িতে পত্রিকা বিক্রি করতে পারবা। অর্ধেক তোমার, অর্ধেক আমার’। ছেলেটা বেশ কিছু পত্রিকা বিক্রিও করে ফেলল।


তার সঙ্গে কথা হলো। আমাদের দেশের জন্য খুবই সহজ-সরল গল্প! মা মারা গেছেন। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। চট্টগ্রাম থেকে এই বাচ্চা একা-একা এখানে চলে এসেছে।
আমি যে স্কুলটা চালাই এটার টিচারকে কাল বলেছিলাম, একে যেন স্কুলে নিয়ে যায়। কাল এই বাচ্চাটার নাগাল পাওয়া গেল না। টিচার কচ্ছপের মত লেগে রইলেন। আজ একে ঠিক-ঠিক পাকড়াও করলেন। একে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার দুইটা উদ্দেশ্য ছিল আমার। স্কুলটার নিয়ম হচ্ছে, এক ঘন্টার মধ্যে আধাঘন্টা খেলা, আধাঘন্টা পড়া। এই বাচ্চাটার ভুবন এলোমেলো হয়ে আছে। খেলার ছলে খানিকটা চেষ্টা করা। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে, এর সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকা।


স্কুলে সব বাচ্চাদের ছবি রাখার চেষ্টা করি- আজ স্কুলে যখন এর ছবি উঠাচ্ছিলাম তখন একবার আমি বললাম, ‘মুখটা এমন কইরা রাখছ ক্যান, একটু হাসো’।
ও হাসে- আমি মুগ্ধ চোখে এর হাসি দেখি। আমার হাসি ক্রমশ মিলিয়ে যায় যখন জিজ্ঞেস করি, ‘দুপুরে খাইছ’?
বাচ্চাটা এমনিতে খুব কম কথা বলে। দুয়েক বার জিজ্ঞেস করার পর বলল, ‘না’। যখন জানতে চাইলাম, ‘সকালে কি খাইছ’? এ চোখ নামিয়ে বলল, ‘সকালে কিছু খাই নাই তো’।

আমার আগেও এই অনুভূতিটা কাজ করেছে- আজও এটা ফিরে এলো। মাঝে-মাঝে নিজেকে মানুষ বলে মনে হয় না। মনে হয়, আমি স্রেফ একটা ‘পাইপমানুষ’! যে পাইপের এক পাশে, যার চালু নাম খাবার- অন্য পাশে আবর্জনা! খাবার...ভদ্রতা করে বললাম বলে নইলে খাবার না ছাই- মস্তিষ্ক খাবার নামে চেনে বলে নাহলে এও এক প্রকার বর্জ্য। গোটা গ্রহ বর্জ্যময়!


আমি একটা ‘পাইপমানুষ’ এই বাচ্চাটার জন্য কী করব তাই বুঝতে পারছি না- আর আমি 'শ্লা' কিনা মাথা ঘামাব বড়-বড় সমস্যা নিয়ে...! আফসোস, আমার মৃত্যুর পর ঠিক-ঠিক এটা ছড়িয়ে পড়বে, 'একটি বর্জ্য উৎপাদনকারী যন্ত্র বিনষ্ট হলো...'।

Tuesday, November 19, 2013

দুই লক্ষ পেজ-ভিউ এবং গভীর কৃতজ্ঞতা...

ওয়েবে আমার লেখালেখির শুরু সামহোয়্যারইনব্লগে- তখন সম্ভবত ওখানে আমার হাজার খানেক পোস্ট ছিল। আমাদেরকে বাংলায় লেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য আমি ওই সাইটটির প্রতি বিভিন্ন জায়গায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি। কিন্তু নীতিগত কারণে ওখানে থেকে সরে যেতে হলো। আমার সমস্ত লেখা মুছে দিয়ে কেবল একটা পোস্ট রয়ে গেল যেটায় আমি আমার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে চলে এসেছিলাম। ওই পোস্ট এখনও ওখানে ঝুলে আছে।

এরপর আরও কিছু কম্যুনিটি ব্লগে বেশ কিছুদিন লিখলাম। কোথাও থিতু হতে পারলাম না। কারণ বিভিন্ন কারণে বনিবনা হচ্ছিল না। এর প্রধান কারণ 'দলবাজি'। এই বিষয়ে আমার সাফ কথা, ভাল লাগলে তালি, মন্দ লাগলে গালি।
তাছাড়া আমি কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণে থাকতে আরাম বোধ করি না। বা ফরমায়েসী লেখা লিখতে পারি না কারণ এই ক্ষমতাটাই না আমার। এই সব করে-করে ক্রমশ হয়ে পড়লাম দলছুট!

এরপর বেশ কিছুদিন ওয়ার্ডপ্রেসে নিজের একটা সাইট করে ওখানে লিখলাম। পরে ব্লগার (ব্লগস্পট) পছন্দ হলো, লম্বা একটা সময় ব্লগস্পটে লিখলাম। দেশে থেকে গুগলে একটা ডোমেইন কেনার অনেক হ্যাপা। পে-পলে কেনা লাগে, দেশে আবার পে-পলে কীসব ছাতাফাতা সমস্যা!
কেউ-কেউ আমাকে চমকে দেন- একেবারে হাঁ হয়ে যাই। একদিন দেখি মাহবুব সুমন, www.ali-mahmed.com নামে একটা ডোমেইন কিনে ফেললেন, ফি বছর বেচারা নিয়ম করে এটা আবার রিনিউও করেন! ভাড়া বাড়ি থেকে নিজের একটা বাড়ি হলো, বড়ই সুখের বিষয়!

তো, এই www.ali-mahmed.com, নিজের বাড়িতে নিজের মত করে থাকি- হাবিজাবি লিখি। আমার সুহৃদেরা আমাকে তখন কঠিন নিষেধ করেছিলেন যে এভাবে বিচ্ছিন্ন থেকে লেখালেখি করাটা বোকামী হবে। আমিও রসিকতা করে বলেছিলাম, কেউ না-পড়লে কী আর করা, মনিটরে পা তুলে, পেট ভাসিয়ে নিজের লেখা নিজেই পড়ব।

ওয়াল্লা, আজ দেখছি www.ali-mahmed.com -এর ‘পেজভিউ’ দুই লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। কী কান্ড! আমি জানি অনেক সাইটের কাছে এই সংখ্যাটা নস্যি! কিন্তু আমার যে ঘরভরা শিউলি ফুল...! সেইসব সদাশয় পাঠকদের প্রতি কেমন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব সেটাই তো বুঝতে পারছি না ছাই...।

অবশ্য কিছু-কিছু পাঠকের কাছে দুঃখ প্রকাশও করি। এরা গুগলে রগরগে লেখা দিয়ে সার্চ দিয়েছেন আর গুগল ব্যাটা আমার বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছে। যেমন, 'আমরা 'দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি' [১] শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের উপর আমার চমৎকার একটা লেখা আছে। আমি আমার পাঠককে আমার চেয়ে বুদ্ধিমান, একেকটা ক্ষুরধার ব্রেন মনে করি তাই কীসব সার্চ দিয়ে এরা এই লেখা পড়ার জন্য এসেছেন বুঝে নিন :) ...
সহায়ক সূত্র:
১. দুধ বিক্রি করে...: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_05.html

Sunday, November 17, 2013

ফাজিল, কীসে তোমার পরিচয়?

রেল-স্টেশনের ওয়েটিং রুম। মাসের-পর-মাস ধরে এর টয়লেটটা বন্ধ থাকে। কেন? এই নিয়ে কেউ ভাল সদুত্তর দিতে পারলেন না। কারো আহামরি কোনো বিকার নেই- সম্ভবত সবাই ধরে নিয়েছেন এমনটাই হওয়ার কথা। জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিকদেরও এটা চোখে পড়েছে এমনটা জানা নেই!

আমাদের দেশে ভয়ংকর এই বিষয়টা নিয়ে অধিকাংশ লোকজন কেন তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখেন এটা আমি জানি না! আগেও বলেছিলাম, কোটি টাকা খরচ করে একটা মার্কেট করবে কিন্তু একটা ওয়শরুম-টয়লেট করবে না, করলেও তালা মেরে রাখবে। এই তালার চাবি কার কাছে এটা বের করতে গিয়ে কেউ প্যান্ট নষ্ট করে ফেললে তাঁকে দোষ দেয়া চলে না।
পুরুষরা সুযোগ পেলেই রাস্তার কোথাও বসে কাজ সেরে ফেলে কিন্তু মহিলাদের পক্ষে সেটা অসম্ভব। আমার ধারণা, এই দেশে অধিকাংশ মহিলাদের ইউরিন ইনফেকশন হওয়ার এটাও অন্যতম কারণ। এই বিষয়টা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছি তাই নতুন করে আর চর্বিতচর্বণ করি না [১], [২]

যাই হোক, আমি এস.এস ওরফে স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টকে খুঁজে বের করলাম। এই বিষয়ে জানতে চাইলাম, কেন দীর্ঘ দিন ধরে তালা বন্ধ? প্রথমেই তিনি জানতে চাইলেন, আপনি কি সাংবাদিক? আমি বললাম, না। এরপর তিনি যেটা বললেন তা বিস্মিত করার জন্য যথেষ্ট। বললেন, তাহলে আপনার সমস্যা কী!
আমি বললাম, আপনার কী ধারণা কেবল সাংবাদিকদেরই সমস্যা এটা, পাবলিকের না! আমি পাবলিক আর আমার সমস্যা হচ্ছে, আমার যখন প্রয়োজন হয় তখন আমি মুত্র বিসর্জন করতে পারছি না। তা এটা বন্ধ কেন?
স্টেশন মাস্টার বললেন, এই টয়লেটে সমস্যা আছে। ব্যবহারের উপযুক্ত না।
আমি নিরীহ মুখ করে বললাম, কি সমস্যা, প্যান ভাঙ্গা। যেই সমস্যাই থাকুক আপনি শুধু একবার বলেন আমরা পাবলিকরা এটা ঠিক করে দেই।
তিনি বললেন, এটা তো বললেই হয় না। রেলের নিয়ম-কানুন মেনে এটা যথাসময়ে ঠিক করা হবে।

এটা এই সব আমলা-গামলাদের পুরনো চাল। আইনের কিতাবের দোহাই দেয়া- যেমন তদন্ত কমিটির নাম করে জটিল সমস্যা ঝুলিয়ে দেয়া। ওই তদন্ত কমিটির ফলাফল কেবল পাওয়া যাবে তাদের বাবার বুক-পকেটে।
আমি নাছোড়বান্দার মতো আবারও বললাম, মাসের-পর-মাস তো বন্ধ তা আর কবে আপনারা এই সমস্যার সমাধান করবেন বলে মনে করেন?
স্টেশন মাস্টার এবার উষ্মা প্রকাশ করেন, আরে, পাশেই তো পাবলিক টয়লেট আছে। এতো সমস্যা তো হওয়ার কথা না।
উত্তরটা আমার কাছে স্রেফ ফাজলামী মনে হয়েছে! আমি রাগ চেপে এবার জানতে চাইলাম, আমি তো জানি পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে টাকা লাগে। আপনার নাম বললে কি বিনা পয়সায় ব্যবহার করতে দেবে?
কথাবার্তার নমুনায় তিনি হয়তো আঁচ করতে পারছিলেন ট্রেন লাইন থেকে নেমে যাচ্ছে তাই তিনি বললেন, আচ্ছা, এখন আমি ব্যস্ত আছি। আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব, এখন ট্রেন ঢুকছে...।
১. http://www.ali-mahmed.com/2011/02/blog-post_09.html
২. http://www.ali-mahmed.com/2011/02/blog-post_15.html

অতুলনীয় ভাল লাগা...

কিছু-কিছু ভাল লাগা আছে যার সঙ্গে কীসের তুলনা চলে এটা আমি জানি না। মনটা কী কেবল অন্য রকম হয়! আহা, ভাল লাগার ফেনায় যে মাখামাখি হয়ে থাকা- কেবল মনে হয় এমন ফেনায় কেবল গা ভাসিয়ে থাকা।

রিকশাচালক লিটনকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, যিনি ৫০ হাজার টাকা পেয়েও টাকার মালিকের কাছে ঠিক-ঠিক ফেরত দিয়েছিলেন। [১]
ওই মানুষটার একটা স্বপ্ন ছিল, নিজস্ব একটা সেলুনের। আমি ওই লেখায় লিখেছিলাম, ‘...লিটন মিয়া কেবল আমাদেরকে স্বপ্নই দেখান না নিজেও স্বপ্ন দেখেন, নিজের একটা সেলুনের স্বপ্ন। লিটন মিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমিই-বা কেন এই স্বপ্নটা দেখতে পারব না যে, কোনো-না-কোনো একজন হৃদয়বান মানুষ ঠিকই এগিয়ে এসেছেন লিটন মিয়ার স্বপ্ন পূরণে। লিটন মিয়ার একটা নিজস্ব সেলুন, একটা অদেখা স্বপ্ন...’!
ওই লেখার মন্তব্যের এক জায়গায় এটাও লিখেছিলাম, ‘...স্বার্থপর আমি, আমি তো এখন আর লিটন মিয়ার স্বপ্ন নিয়ে কাতর না। আমি আছি আমার স্বপ্ন নিয়ে। আহ, সেই অদেখা স্বপ্ন! লিটন মিয়ার একটা সেলুন হয়েছে। আমি সেই সেলুনে বসে চুল কাটছি। লিটন মিয়া আমার কানের কাছে অনবরত কীসব যেন বকে যাচ্ছেন। লিটন মিয়ার বিজবিজ করে বলা কথাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে! আহা, আমার চোখে যে রাজ্যের ঘুম!...”

অবশেষে লিটনের মিয়ার একটা সেলুন হচ্ছে! একজন ঠিকই এগিয়ে এসেছেন! যে মানুষটা একজন নামহীন- কারণ নাম প্রকাশে তাঁর তীব্র অনীহা।
লিটনের সেলুনের কাজ আজ থেকে শুরু হলো। যে দোকান-ঘরটা সেলুনের জন্য তিনি পছন্দ করেছেন সেই দোকান-ঘরের মালিকের সঙ্গে দোকানের জামানত এবং ভাড়ার বিষয়টা চুড়ান্ত হলো। এখন বাকী থাকছে দোকান সাজানোর কাজ। সেটাও সহসাই শেষ হবে এমনটাই আশা করছি।

খবরের খোঁজে পত্রিকায় এই সেলুন হওয়ার ঘোষণাটা আমরা এবারই দিয়ে দিয়েছি [২]। আশা করছি, পরের সংখ্যয় এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারব...। 



সহায়ক সূত্র:
১. লিটন, স্যালুট...: http://www.ali-mahmed.com/2013/10/blog-post_7.html
২. খবরের খোঁজে: http://www.khoborer-khoje.com/2013/11/blog-post_15.html   

Wednesday, November 13, 2013

অপেক্ষা!

গতকালের লেখাটার পর [১] ইনবক্সে আলাদা করে অনেকে জানতে চেয়েছেন, ‘ওল্ড হোম’ সম্বন্ধে। কেউ-কেউ সদাশয় কিছু কথাও বলেছেন...।
অন্যত্র এটা নিয়ে বলেছি তবুও একটু বলি এই বিষয়ে। আজ থেকে ৫ বছর আগে ‘ওল্ড হোম’ করার চিন্তাটা এসেছিল মাথায়। ওসময় কিছু টাকাও ছিল আমার হাতে। কিন্তু ছোট্ট একটা ‘ওল্ড হোম’ চালাতে প্রতি মাসে যে টাকা লাগে ওই হিসাবে অন্তত দু-তিন বছরের টাকা হাতে না-নিয়ে এটা আমি শুরু করতে চাইনি।
আমার যুক্তিটা ছিল এমন, তীব্র আবেগ নিয়ে শুরু করলাম কিন্তু কয়েক মাস চলার পর টাকার অভাবে এটা বন্ধ করে দিতে হলো। তখন? কিছু মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়ে আবারও দুঃস্বপ্নের মাঝে ঠেলে দেয়া। এ তো অন্যায়, মহা অন্যায়!
‘ওল্ড হোম’ করাটা যতটা সহজ মনে হয় আমার কাছে কিন্তু ততোটা না। নিয়মিত টাকার যোগানটা মূখ্য একটা বিষয় তো বটেই তাছাড়া লোকের ব্যাকআপটাও জরুরি। একটা উদাহরণ দেই। ধরা যাক, আমি একটা হোম চালাই। আমি মারা গেলাম- তো, হোম কী বন্ধ হয়ে যাবে? না- বিকল্প একজনকে অবশ্যই থাকতে হবে যে নিমিষেই আমার জায়গায় চলে আসবে।

যাই হোক, পরে সাদিক আলম বললেন, চলেন, আমরা আপাতত একটা স্কুল করি- পরে টাকা হলে নাহয় ‘ওল্ড হোম’ করা যাবে। পরামর্শটা আমার মনে ধরল। তো স্কুল শুরু করা হলো। প্রথম স্কুলটা খোলা হয়েছিল মেথরপট্টিতে, পরেরটা অন্ধপল্লীতে, এর পরেরটা স্টেশনে। যাক, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ...।

কিন্তু সেই টাকার যোগানও আর হলো না আর ওল্ড হোমও হলো না। অদেখা এই স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে গেল। আমি জানি, আমৃত্যু এই স্বপ্নটা তাড়া করবে। ভুলে যাই কিন্তু প্রায়শ এই না-করতে পারার বেদনাটা পাক খেয়ে উঠে। যখন ওই বয়স্ক মহিলাকে দেখেছিলাম, [২] তখন। এমন ঘটনাগুলোর যখন মুখোমুখি হই তখনই পুরনো ক্ষতগুলো দগদগে হয়ে উঠে।

আজ আবারও কষ্টটা ফিরে আসে। একটা মানুষকে প্রায়ই দেখতাম স্টেশনে শুয়ে থাকতে। আমার ধারণা ছিল মানুষটা অলস টাইপের তাই শুয়ে থাকেন। আমি একটা আস্ত নির্বোধ- আমার ধারণাটা ভুল ছিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এই মানুষটা কয়েক মাস ধরেই এভাবে পড়ে আছেন। জানা গেল, অসুখ। অসুখটা কি এটা কেউ গুছিয়ে বলতে পারলেন না।

মানুষটার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁর ডান পাশটা অবশ- প্যরালাইসিস। মানুষটার মধ্যে আলাদা একটা মর্যাদা বোধ আমার চোখ এড়ায়নি! কারো সঙ্গে কথা বলতে তাঁর বিশেষ তেমন আগ্রহ নেই। কেউ দিলে খান, না-দিলে উপোস পড়ে থাকেন। আমি আমার সাধ্যমত এটা-সেটা বলে মানুষটাকে খানিক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করি। তিনি কথার ফাঁকে এমন কিছু ইংরাজি শব্দ বলছিলেন যাতে মনে হয় মানুষটা বেশ শিক্ষিত। আজ কেবল অল্পই জানা গেল। বাড়ি কোথাও বলতে চান না কিন্তু কথায় সিলেটের ভাষার টান। একবার কেবল বললেন, তাঁর ৩ ছেলে, ছেলেরা সবাই লন্ডনে থাকে- সন্তানের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলেই রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেন: তাদের আমি ত্যাজ্য করছি।

আমি তাঁকে বলি, আপনার ছেলেদের কাছে ফিরে যেতে চান না? তাঁর উত্তর, না। আমি আবারও বলি, কিন্তু এভাবে... তাহলে আপনি...কীসের অপেক্ষায়...মানে আপনি...? তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মৃত্যুর...।

১. https://www.facebook.com/ali.mahmed1971?ref=tn_tnmn
২. http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_26.html

আলোর মশাল হাতে মানুষটা

ফি রোজ নিয়ম করে স্টেশনে যাওয়া এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমার কাজের অনেক উপকরণ পেয়ে যাই এখানে। অবশ্য ’আমার কাজ’ কথাটা খানিকটা ভুল বললাম, লোকজনের ভাষায়, অকাজ। অবশ্য আমি যে কাজের লোক এমনটা আমি নিজেও মনে করি না- অকাজের লোক হয়েই যে আমার আনন্দের শেষ নাই। আহা, এই দুনিয়ায় সবাই কাজের লোক হয়ে গেলে তো ভারী মুশকিল!

প্ল্যাটফরমে একজন বয়স্ক মহিলাকে পড়ে থাকতে দেখতাম। চারপাশে শত-শত মাছি ভনভন করছে, হাঁ করে থাকা মুখেও! কারণটা অনুমান করতে পেরেছিলাম, এই মানুষটার উঠে বাথরুমে যাওয়ার শক্তি ছিল না।
পূর্বে এমন দৃশ্য দেখিনি এমন না কিন্তু তবুও এই দৃশ্য আমাকে বড়ো অপরাধী করে দেয়। সে সময় মাথায় সব জট পাকিয়ে যায়। তখন নিজের মাথার উপর ছাদটাকে একজন স্বার্থপর মানুষের ছাদ মনে হয়। নিজেকে স্রেফ একটা পোকা মনে হয়। ছোট্ট একটা ওল্ড হোম করতে কোটি-কোটি টাকা লাগে না। অথচ একটা ওল্ড হোম করার স্বপ্ন দেখে দেখেই এই জীবনটা পার করে দেব- একদা অবসান হবে অর্থহীন এ জীবনের...!

এই মানুষটার যে তীব্র শ্বাসকষ্ট এটা একটা ছোট্ট বাচ্চা দেখলেও বুঝবে। এই বয়স্ক মানুষটার সঙ্গেও কেউ নাই যে হাসপাতালে ভর্তি করার চেষ্টা করা হবে। এর পূর্বে একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করে বিস্তর ঝামেলার মুখোমুখি হয়েছিলাম যার রেশ এখনও কাটেনি! জনে-জনে আমাকে জবাবদিহি করতে হয়েছিল।
যাই হোক, একজন ডাক্তারকে বলেকয়ে শ্বাসকষ্টের ওষুধের ব্যবস্থা করা গেল। কিন্তু এমন অবস্থার একজন মানুষকে ওষুধ, ভাতের ব্যবস্থা করে দিলে, নিয়ম করে খাওয়াবেটা কে? একজন দয়ার্দ্র মহিলাকে পাওয়া গেল যিনি পরম মমতায় এই মানুষটাকে ওষুধ খাওয়াতেন, ভাত মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন। এই ব্যবস্থার পর খানিকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গিয়েছিল।


যথারীতি কাল গেছি স্টেশনে। যে জায়গাটায় ওই বয়স্ক মহিলাটি পড়ে থাকতেন সেই জায়গাটা শূন্য! এর আগের দিন একজন চালবাজ হকারের মুখে শুনেছিলাম, এই মানুষটাকে নাকি শ্রীমঙ্গলের ট্রেনে তুলে দেয়ার শলা করা হচ্ছে। আমি রাগি গলায় বলেছিলাম, এঁর তো পরিবারের কেউ আছে এমনটা শুনিনি, তা শ্রীমঙ্গলে এর দায়িত্ব কে নেবে, তুমি?
তো, আমার মনে হলো কেউ ট্রেনে তুলে দায় সেরেছে। কিন্তু খানিক দূরেই দেখলাম একটা মানুষের শরীর, মুখসহ ঢাকা। আমার বুকটা ধক করে উঠে! অন্য একজন মহিলাকে বললাম, মুখের চাদরটা সরান তো। আমার অনুমান নির্ভূল। এটা সেই মহিলাই! মরে গেছেন, নিজেকে এবং আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়ে।

সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়- কী করব এখন? এর পরের অংশটা যে অসম্ভব জটিল। এখন এখান থেকে অতি দ্রুত সরে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু আমার মস্তিষ্কের একটা অংশ হা হা করে হেসে বলছে: পালাবি কোথায়? বটে, বটে রে, তোকে কে বলল তুইও কোথাও-না-কোথাও এমন করে পড়ে থাকবি না, বেওয়ারিশ লাশ হয়ে।
আহা, বেচারা মস্তিষ্ককে কেমন করে বোঝাই আমার মত দু-পাতা ’ল্যাকাপড়া’ জানা মানুষদের এই সব ক্ষেত্রে চট করে সরে পড়ারই নিয়ম। আর কার সহায়তাই-বা চাইব? ওরাও যে আমার মতই ’ল্যাকাপড়া’ জানা মানুষ- ওরা যে আমার নির্বুদ্ধিতায় ভারী বিরক্ত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই! হলোও তাই! আমার পরিচিত একজন পত্রিকা পড়ছিলেন, তাকে বলার পর তিনি মুখ না-তুলেই বললেন, আরে, এইটা তো জিআরপির দায়িত্ব।
দেখো দিকি কান্ড, জাতীয় ’পরতিকায়’ যে দেশ নিয়ে কত্তো বড়ো বড়ো সংবাদ- এই ছোট্ট সংবাদে মাথা ঘামাবার সময় কোথায় তার!
একজন সহৃদয় জিআরপি বললেন, আপনি এমনিতে কিছুই করতে পারবেন না। স্টেশন মাস্টার মেমো না-দিলে কেউ এই লাশ ছোঁবে না। কারণ নিয়মমাফিক কাজ শুরু করতে হবে, পোস্টমর্টেম হবে...। আমি স্টেশন মাস্টারের খোঁজে গেলাম, অফিসে পাওয়া গেল না। এখানে-ওখানে স্টেশন মাস্টারকে খুঁজছি...!
 

যেখানে মৃতদেহটা রাখা ওখানে ফিরে এসে আমি হতবাক-বাক্যহারা! একজন মানুষ কাফনের কাপড় এবং আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র বগলে চেপে ডোমের সঙ্গে বেদম হইচই করছেন: ’এক্ষণ গিয়া কবর খুঁড়বি, এক্ষণ, এই নে টেকা’।
মানুষটা পাগলের মত এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছেন। একবার একে ধরছেন, আরেকবার ওকে। মানুষটার কর্মকান্ড দেখছি, দু-চোখ ভরে।

এরিমধ্যে এই মানুষটাই মৃতদেহকে গোসল করাবার জন্য কিছু মহিলাকেও যোগাড় করে ফেলেছেন। মানুষটার অফুরন্ত প্রাণশক্তি- তাঁর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে আমার ঘাম ছুটে যায়। মানুষটা ণিকের জন্যও স্থির থাকছেন না! পানি লাগবে, পর্দার জন্য কাপড় লাগবে সবই এই মানুষটার কণ্যাণে নিমিষেই হাজির হচ্ছে। কেবল চোখ দিয়ে দেখা ব্যতীত আমার কোনো কিছুই করার অবকাশ নেই।

যখন একটা পর্দা ঘিরে রেললাইনের পাশে শেষ গোসল করানো হচ্ছে ঠিক তখনই সেই লাইনেই একটা গাড়ি আসার সময় হয়ে গেছে। ভারী বিপদ! কিন্তু এই মানুষটার দেখি সবই নখদর্পণে, কিছুই চোখ এড়ায় না। মানুষটার আবার দৌড়, মাস্টারকে বলে, মাইকিং করে, গাড়ি আসার লাইনটা বদলে দিলেন। এই লাইনে গাড়ি না-এসে অন্য একটা খালি লাইনে আসবে।
আমি ঘোর লাগা চোখে কেবল দেখে যাই। এক ফাঁকে আমি মানুষটাকে বলি, ’আসেন, একটু চা খাই’। আসলে চা খাওয়াটা মূখ্য না, দু-মিনিটের জন্য হলেও এই মানুষটাকে কথা বলার জন্য পাওয়াটা আমার জন্য বড়ো জরুরি। কারণ আমার বোঝা প্রয়োজন এই মানুষটার সমস্যাটা কোথায়? ভিড়ের মাঝে অন্য রকম মানুষ দেখলে বিভ্রান্তি লাগে, অস্বস্তি হয়; নিজেকে বোকা-বোকা মনে হয়।


চা খেতে খেতে কথা হয়, হৃদয় খান নামের এই মানুষটার সঙ্গে। চার বছর ধরে তিনি স্টেশনের পাবলিক টয়লেট চালান অথচ আমি মানুষটাকে চিনি না। আহা, চিনব কেমন করে? আমি যে দু-পাতা ’ল্যাকাপড়া করা’ মানুষ!
এই বেচারি মহিলাকে কাটাছেঁড়া করে কী আর হবে তাই তিনি জিআরপির সেকেন্ড অফিসার মুখলেছুর রহমানকে বলেকয়ে রাজি করিয়েছেন পোস্টমর্টেম না-করেই যেন দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। আরও কীসব যেন বলছিলেন আমি আসলে মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছিলাম না।
ক্ষণিকের জন্য আমি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম। কেবল মনে হচ্ছিল, চারদিকে নিকষ অন্ধকার- আমি যে আমাকেই দেখতে পাচ্ছিলাম না! কেবল দৃশ্যমান হয় মশাল হাতে একটা মানুষ দাঁড়িয়ে। ভাগ্যিস, মশালের আলো ছিল নইলে চিনতেই পারতাম না যে মশাল হাতের মানুষটা, হৃদয় খান...।

Wednesday, November 6, 2013

ধন্যবাদ শফিক রেহমান, আপনার পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য


...১৭ ও ১৮ জুলাই ২০১০-এ নিউ ইয়র্কে আমেরিকা-বাংলাদেশ-কানাডা কনভেনশন (সংক্ষেপে এবিসি কনভেনশন):
'প্রথমেই আমি এবিসি কনভেনশনের আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাতে চাই এই রকম একটি বিরাট আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের এক নেড়িকুকুরকে নিমন্ত্রণ করার জন্য থ্যাংক ইউঘেউ ঘেউ...।" -শফিক রেহমান



বিশ্বের বিখ্যাত-আলোচিত-ক্ল্যাসিক, মুভি, গান, বই, লেখা সম্বন্ধে যারা খোঁজ রাখেন তাদের অন্যতম শফিক রেহমান। যার রস বোধ তীব্র, প্রখর, অতুলনীয়...।
এ দেশে যে অল্প ক-জন আছেন, লেখক বানাবার মেশিন—তাঁদের মধ্যে অন্যতম, শফিক রেহমান! এমন একটা মানুষ নিজেকে নেড়ি কুত্তা বলে দাবী করলেই মেনে নেয়াটা কতটা যৌক্তিক হয় এ প্রশ্নটা থেকেই যায়?
অবশ্য এও সত্য, এই মানুষটাই যখন যাযাদিন সাপ্তাহিকে ভিনসেন্ট পিউরিফিকেশনের নামে তিনি অতি কুৎসিত রসিকতা করতেন [] তখন মানুষটার রুচিবোধ নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দিত। রসিকতা যখন একটা সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন সেটা হয়ে উঠে নিতান্তই অরুচিকর, অন্যায়!
এখানে অবশ্য তার জোকার-মার্কা পোশাকের আলোচনায় গেলাম না কারণ কখনও তিনি যদি দু-পায়ে দু-রঙের মোজা পরেন তাহলে আটকাচ্ছে কে! বা কিছু পোশাকে তাকে যে বুড়া শকুনের মতো দেখায় সেটাও এখানে বলাটা জরুরি না।  

যাই হোক, দৈনিক নয়া দিগন্তে (১ নভেম্বর ২০১৩) শফিক রেহমান ১০ ওভারে হাসিনা-খালেদার টেলিম্যাচের ধারাবিবরণী নামে দু-পৃষ্ঠাব্যাপি দীর্ঘ এক লেখা লিখেছেন।
হাসিনা-খালেদার টেলিফোন সংলাপ নিয়ে টান-টান উত্তেজনায় ছিল সমগ্র দেশ। তবে পত্রিকায় তাঁদের যে আলাপচারিতা পড়লাম এই বিষয়ে আমার নিজস্ব মত হচ্ছে, কার পাল্লা ভারী-হালকা সেই প্রসঙ্গে আমি যাব না। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, এই দুজন বছরের-পর-বছর ধরে এই দেশটার অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বিধায় তাঁদের উপস্থাপনা, কথার ধাঁচ, সহিষ্ণুতা, প্রজ্ঞার উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই চোখে পড়েনি বরং অর্থহীন-খেলো বিষয় নিয়ে অধিকাংশ মূল্যবান সময়ের অপচয় হয়েছে। যেসব নিয়ে লেখাটা আমার কাছে কেবশব্দের অপচয়!

কিন্তু শফিক রেহমান লিখেছেন, দু-হাতে, দু-পৃষ্ঠায়! এই নিয়ে আমার গাত্রদাহ হওয়ার কারণ ছিল না কিন্তু যে হরতাল নিয়ে বারবার এখানে প্রসঙ্গ এসেছে সেটা নিয়ে তিনি টুঁশব্দও করেননি! আহ, হরতাল! বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন আওয়ামীলীগ শত-শত হরতাল দিয়েছে কিন্তু বিএনপি এক সেকেন্ড আগেও ক্ষমতা ছাড়েনি। এবার বিএনপিও যখন হরতালের-পর-হরতাল দিয়েছে আওয়ামীলীগও ক্ষমতা থেকে সরে আসেনি! তাহলে এই হরতাল, এই অসংখ্য প্রাণহানি, এই বিপুল অর্থের অপচয় কী ফল বয়ে আনল?
এই শফিক রেহমানই আমাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, ...যাযাদি (ওরফে শফিক রেহমান) সবসময়ই হরতালের বিরুদ্ধে ছিল এবং আছে... []।
অথচ এখানে এসে গণেশ উল্টে গেল! তখন শফিক রেহমানের কাছে হরতাল হয়ে গেল করতাল! রেহমানের রহমতে খাদ্য গ্রহণ এবং বর্জন-মুখ একাকার হয়ে যায়...।

এবার তার লেখার মূল প্রসঙ্গ, ওই লেখায় তিনি কেবল একজনেরই দোষ খুঁজে পেয়েছেন—পাশাপাশি অন্যজনের কোনো দোষই খুঁজে পাননি! এবং শফিক রেহমানের কেবল একজনেরই এই যে দোষ খুঁজে পাওয়া এবং অন্যজনকে মহান বানাবার অতি হাস্যকর ভঙ্গি এতোটাই স্থুল যে এ নিয়ে আলোচনা করাটাও পন্ডশ্রম। দলের প্রতি দলবাজিরওএকটা সীমা থাকে- এই মানুষটা সেটাও অবলীলায় ছাড়িয়ে গেছেন।

এই মানুষটার 'গ্রে মেটার' ক্রমশ 'ইয়েলো মেটার'-এ পরিণত হয়! ইয়েলো মেটারে মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকা শফিক রেহমানের মত অসম্ভব প্রতিভাবান মানুষটাকে দেখে আমার মন সত্যি সত্যি বিষাদে ভরে উঠে।
বিষাদের সঙ্গে এও বলি, তার অদৃশ্য লেজ দৃশ্যমান হয়! তার নিজের সম্বন্ধে তার জোরালো দাবী (ঘেউ-ঘেউ) নিয়ে যে সন্দেহটা আমার মনে ছিল সেই সন্দেহের অবসান ঘটাবার জন্য একটা ধন্যবাদ অবশ্য শফিক রেহমান (https://www.facebook.com/ShafikRehmanPresents) পাওনা হন...।

*সেকালের পন্ডিত এবং একালের বুদ্ধিজীবী, মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এরাই শাসনের চোখ, কান! কিন্তু এরা যখন অনাবশ্যক লেজ নাড়াতে শুরু করেন তখন সেই শাসক হন অন্ধ এবং বধির। ফল যা হওয়ার তাই হয়।
আর সেই মানুষটা শফিক রেহমান নাকি গাফফার চৌধুরী তাতে কী আসে যায়!
"সুজীবং অহিরিকেন কাকসূরেন ধংসিনা,
পকখন্দিনা পগবভেন সঙকিলিটঠেন জীবিতং।"(ধম্মপদ, মলবগগো: ১০, ২৪৪)
বাংলাটা হচ্ছে, যে খাদ্যসংগ্রহে নির্লজ্জ কাকের ন্যায় ধূর্ত, পরের অনিষ্টকারী, দুঃসাহসী, প্রগলভ এবং কলঙ্কিত জীবন-যাপন করে; তার পক্ষে জীবিকা নির্বাহ অতি সহজ।

শফিক রেহমান নিজেকে নেড়িকুকুর হিসাবে দাবী না-করে ধূর্ত কাক হিসাবে দাবী করলেই সমীচীন হতো কারণ এই বুদ্ধবাণীর সঙ্গে অনেকাংশেই এই বুদ্ধিজীবীর মিল আছে। কেউ-কেউ বিক্রি হন ক্ষুধার জ্বালায় কিন্তু রেহমানদের মত মানুষ বিক্রি হন কুৎসিত কালো লকলকে জিবের কারণে- অতি লোভের ক্ষিধা, কেবল চোখের ক্ষিধা...।
  
সহায়ক সূত্র:

Monday, November 4, 2013

আমার ছায়া আমায় ছাড়িয়ে যায়!


আমি রেল-স্টেশনে যে স্কুলটা চালাতাম, ওটায় শিক্ষার্থীরা যে কেবল বিনে-পয়সার পড়ার সুযোগ পেত এমনটাই না এরা এখানে চেপে রাখা শ্বাস ফেলতে পারত। ওটার ছাত্র-ছাত্রী ছিল ওরাই যাদের কারো-কারো বাবা-মা নেই, যাদের অধিকাংশই স্টেশনে পানি বিক্রি করত এবং রাতে ঘুমাত ওভারব্রিজে।
ওই স্কুলটার শিক্ষক ছিলেন তাহমিনা- যিনি এই দস্যু, বিচ্ছু বাহিনীর সমস্ত আবদার হাসিমুখে সহ্য করতেন! আমার দেখা সেরা শিক্ষকদের একজন!
আমি যতগুলো স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি এর মধ্যে এই স্কুলটার জন্য আমার ছিল আলাদা একটা টান, এখানটার পরিবেশ খুব উপভোগ করতাম। কারণ এটার কল্যাণে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছিলাম, শিখতে পেরেছিলাম। আমার মুখস্ত ছিল কোন বাচ্চাটা কোন দিন খায়নি, কোন বাচ্চাটা ড্যান্ডিতে-নেশায় আসক্ত!

তো, রেলের জায়গায় উদীচীর একটা অফিস অব্যবহৃত পড়ে ছিল। ওখানে অসংখ্য মাকড়সা তাদের সমস্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছিল। ওটাকে সাফসুতরো করে ওটাতেই স্কুলের কাজ শুরু করা হয়েছিল। এই বদান্যতার জন্য উদীচীর লোকজনের প্রতি আজও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কিন্তু...। কিন্তু, এক সময় এরা বড়ো যন্ত্রণা দেয়া শুরু করলেন। এদেরই এক কর্তা হুটহাট করে মিটিং-এর নামে স্কুলের বাচ্চাদেরকে যখন-তখন বের করে দিতেন। সেদিনের জন্য স্কুলের সমস্ত কার্যক্রম পন্ড! লেখাপড়ার সুরটাই কেটে যেত...।

আমি বিকল্প একটা জায়গা খুঁজছিলাম অথচ রেলওয়ের কতো জায়গা অব্যবহৃত পড়ে ছিল, লোকজন অবলীলায় দখল করে নিচ্ছিল কিন্তু স্কুলের জন্য এক চিলতে জায়গারও ব্যবস্থা হচ্ছিল না। এমন না, বাইরে ভাড়ার কোনো ঘর পাওয়া যেত না কিন্তু এটা আমি বিলক্ষণ জানতাম, বাইরে স্কুলের জন্য ঘর পাওয়া যাবে কিন্তু স্টেশনের এই সমস্ত বাচ্চাদেরকে আর পাওয়া যাবে না- ওদেরকে ওখানে নেয়া সম্ভব হবে না। কারণ এরা স্টেশন ছেড়ে ওখানে যেতে চাইবে না।

পরবর্তীতে আমার অনুমান সত্য হয়েছিল। তিতিবিরক্ত হয়ে আমি যখন এখান থেকে স্কুলটা সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে গিয়েছিলাম

দু-এক জন ব্যতীত তখন এখানকার কাউকে আর পাওয়া যায়নি। এই দুয়েক জনের মধ্যে অন্যতম ‘পলাশ’ নামের একটি ছেলে। যে গায়ে-গতরে অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। (প্রথম ছবিটায় যার মাথা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে!) কখনও-কখনও তাকে শিক্ষক হিসাবেও ভ্রম হতো। ছোট-ছোট বাচ্চাদের মাঝে পলাশকে বড়ো বেমানান দেখাত। আমি মাঝে-মাঝে তার জড়তা কাটাবার চেষ্টা করতাম, ’বুজঝ, পলাশ, ল্যাকাপড়ার কুনু বয়স নাই’।
পলাশ কথা খুব কমই বলত। মাথা দুলিয়ে তার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, জ্বে।

যাই হোক, এই পলাশ এই স্কুলে বেশ অনেক দিন পড়ল। তারপর একটা দোকানে বেচাবিক্রির কাজে লেগে গেল। সারা রাত দোকানদারি করে, সকালে ঘুম। একদিন স্টেশনে গেছি কি এক কাজে। পলাশকে দেখি ঘুম-ঘুম চোখে দোকান থেকে নেমে আসতে। এর টকটকে লাল চোখ দেখে আমার বুঝতে সমস্যা হয় না এ সারাটা রাত এক ফোঁটাও ঘুমায়নি!

এমনিতে প্রায়ই লক্ষ করতাম কিন্তু ভুলে যেতাম- রেলেরই করা, এই স্টেশনে পানির চমৎকার একটা ব্যবস্থা আছে, যেখানে অসংখ্য লোকজনকে হাত-মুখ ধুতে এমনকি পানি খেতেও দেখেছি। টাইলস লাগানো কিন্তু জায়গাটা ভারী নোংরা, অপরিচ্ছন্ন থাকে- খুব চোখে লাগে! আমি এমন কোনো ব্যক্তি না যে বললাম আর রেলের লোকজনেরা এটা সাফসুতরো করার আগ্রহ দেখাবে! নিরুপায় আমি, একজন কাউকে খুঁজছিলাম এটাকে ঘষেমেজে খানিকটা সাফ করার জন্য।
হাতের কাছে পলাশকে পেয়ে বললাম, ’যখন কাজ থাকব না, অবসর পাইলে এইটা একটু...’। পলাশ ছেলেটা স্বল্পভাষী, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ’আইচ্ছা’।
কী আশ্চর্য, একটু পরই স্টেশনের কাজ শেষ করে আমি যখন ফিরে আসছি তখন চোখ বড় বড় করে দেখতে পাই সঙ্গে আরেকজনকে নিয়ে পলাশ মিয়া পূর্ণ উদ্যমে জায়গাটা ঘষাঘষি করে চকচকে করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে! ওর চোখে তখন ঘুমের লেশমাত্রও নেই! পেছন থেকে আমি যে কখন ওর ছবি তুলেছি এটা ও টেরটিও পায়নি...।

আমি প্রত্যেকটা বিষয় আমার নিজেকে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। যেমন, আমি যখন লিখি তখন এটা মাথায় থাকে আমার লেখাটা যিনি পড়ছেন তার জায়গায় আমি হলে কেমন লেখা পড়তে চাইতাম? তেমনি আমি ভাবার চেষ্টা করি, পলাশের জায়গায় আমি হলে কি করতাম? সারা রাত না-ঘুমিয়ে এক্ষণই কী এই কাজটা করতাম? উত্তরটা অনেককে, এমনকি আমার নিজেকেও আহত করবে। আমি সলাজে স্বীকার যাই, না।
এখানেই পলাশ আমাকে অসম্ভব লজ্জিত করে অবলীলায় ছাড়িয়ে যায়!

আমি থাকব না, কিন্তু এই পলাশরা থেকে যাবে। আমার শবের চেয়ে তমোময় ছায়া হবে অনেক, অনেক দীর্ঘ...!
WhatsApp