Search

Wednesday, April 15, 2009

বুক্কা এবং ধ্রুব'র এক চিলতে আকাশ!

"বুক্কা শ্বাস বন্ধ করে বাবার গল্প শুনছে। হাতি-ঘোড়া, ভূত-প্রেতের গল্প না। সত্যি গল্প। বাবার শৈশব-কৈশোরের গল্প। কী রোমাঞ্চকর সব গল্প!

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বেটারে, আহা, কী সব দিন ছিল।
বুক্কা বলল, বাবা, ছোটবেলায় তুমি কি কি করতে? খুব দুষ্ট ছিলে বুঝি?
বাবা লাজুক গলায় বললেন, হুঁ, একবার মৌমাছির চাকে ঢিল দিলাম। দিল কামড়। মুখ ফুলে ঢোল। বাবা ছাতা দিয়ে দিলেন এক বাড়ি। জীবনে সেই প্রথম বাবার হাতে মার খেলাম। কেন জানি বাবার মেজাজ সেদিন খুব খারাপ ছিল।
বুক্কা বলল, মৌমাছির চাক কি বাবা?
বাবা বললেন, এই যে মধু; অ, তুই চিনবি কি করে! তুই তো ব্রেডের সঙ্গে খাস জ্যাম-জেলী। ফুল থেকে মৌমাছি মধু নিয়ে তার বাসায় জমায়। আগুনের ধোঁয়া দিলে মৌমাছিরা বাসা ছেড়ে চলে যায়। তখন ওদের বাসা ভেঙ্গে মধু সংগ্রহ করা হয়।
বুক্কা অবাক হয়ে বলল, বাবা আগুনে মৌমাছিরা মারা যায় না?
বাবা বিব্রত গলায় বললেন, তাতো মরবেই। তবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৌমাছি চাষ করলে অবশ্য মৌমাছিরা মরে না।
বুক্কা চোখ গোল গোল করে বলল, বাবা মৌমাছির বাসা কি রকম দেখতে, এ্যাকুরিয়ামের মতো?
বাবা হাসলেন, ধুর পাগল। দাড়া তোকে সিডি এনে দেব। খুঁজে দেখি পাই কিনা, কম্পিউটারে দেখতে পারবি।
বুক্কা ঠোঁট উল্টে বলল, সে তো আমিই পারি। জিসানের কাছে কত্তো সিডি।
বাবা অবাক হলেন, জিসান কে?
বুক্কা হড়বড় করে বলল, আমার বন্ধু। বাবা, তুমি ওকে চেন না, আশ্চর্য! ওর বাবা একজন মন্ত্রী!
বুক্কার বাবা গভীর শ্বাস ফেললেন, তোর বন্ধু-বান্ধব, সচিব-মন্ত্রীর ছেলে। অথচ আমার শৈশব-কৈশোরের বন্ধু ছিল কেউ ধোপার ছেলে, কেউ বা মুচির ছেলে।

বুক্কা আর্তনাদ করে উঠল, হোয়াট দ্য হেল য়্যু আ টকিং এবাউট . . .!
বাবা তীব্র গলায় বললেন, শাটআপ বুক্কা । এসব কি অভদ্র কথা!
বুক্কা মাথা নীচু করে বলল, সরি বাবা
বাবা বললেন, তো, যা বলছিলাম, আমার শৈশব-কৈশোর এদের কাছে ঋণী। আজ আমি যা কিছু, এর পেছনে এদের অনেক অবদান আছে। এটাই বাস্তব, আমি ওখান থেকেই উঠে এসেছি। আহা কী সব দিন! এদের সঙ্গে কতো ডাংগুলি খেলেছি।
বুক্কার বিস্মিত গলা, ডাংগুলি কি বাবা?
বাবা ঝলমলে মুখে বললেন, খুব মজার একটা খেলা। এক লাল হলে আস্ত একটা গুদাম কেনা যেত। এড়ি, দুড়ি, তেলকা, চুড়ি, চম্পা, ডেগ, সুতেগ . . . এভাবে গুণে গুণে এক লাল হত। মুচির ছেলে গাদুরার কাছে আমি নিয়মিত হারতাম। সে গুদাম-টুদাম, নদী সব কিনে ফেলত। আমি ফতুর হয়ে যেতাম। পরে অসংখ্য কিল নিতে হতো।’
কিল কি বাবা?
বাবা হাসলেন, ইসরে বেটা বলিস না, পিঠে দুমদুম করে মার!
বুক্কা এবার সত্যি সত্যি আগ্রহী হলো, বাবা এই খেলার কি সিডি পাওয়া যাবে?
বাবা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, মনে হয় না। আজকাল তোরা কী সব খেলা খেলিস- ব্যাকগ্যামন, পেসেন্স, গল্ফ, বিলিয়ার্ড, তাও কম্পিউটারে!

বুক্কা বলল, আর কি খেলা ছিল তোমাদের সময়, বাবা?
বাবা বললেন, কতো ধরনের খেলা- দাড়িয়াবান্ধা, এক্কা-দোক্কা। গুলতি দিয়ে একবার বিরাট একটা পাখি মেরেছিলাম।
বুক্কা থেমে থেমে বলল, কী নিষ্ঠুর ছিলে তুমি, বাবা!
বাবা দুঃখিত হলেন, জানিস এখন মনে পড়লে বড় কষ্ট হয়। আমার এক বন্ধুর এয়ারগান ছিল। ওরা শুধুমাত্র একবেলা খাওয়ার জন্য চল্লিশ-পঞ্চাশটা চড়ুই পাখি মারত!
বুক্কা শিউরে উঠলো, কী বিভৎস!
বাবা এক বুক কষ্ট নিয়ে বললেন, বুক্কা, জীবনে একবার আমি খুব বড় একটা অন্যায় করেছিলাম। বন্ধুর এয়ারগান দিয়ে একটা কাক মেরেছিলাম। ওই সময় কষ্ট লাগেনি। হতভম্ব হয়েছিলাম, যখন বন্ধুটি মৃত কাককে ফুটবলের মতো লাথি দিয়েছিল!
বুক্কা আর্তনাদ করে উঠলো, বাবা, তোমার পায়ে পড়ি আর বলো না।

বাবা কথা ঘুরাবার জন্য বললেন, জানিস আমার না একটা রাখাল বন্ধুও ছিল। নামটা মনে নাই। ছোটবেলা থেকে আমি তো খুব বই পড়তাম। ক্লাসের বই না, আমাদের ভাষায় আউট বই। স্কুলের নাম করে বের হতাম, বাসা থেকে একটু দুরে ওই রাখালের গোয়ালঘর ছিল। আমার রাখাল বন্ধু আমাকে ভেতরে রেখে তালা বন্ধ করে গরু চরাতে বেরিয়ে যেত। আমি ধুমসে বই পড়তাম। কোন অনুবাদ, দস্যু বনহুর, দস্যু রাণী, ফাল্গুণি, নিহার রঞ্জন, যা পেতাম তাই।
বুক্কা চোখ বড় বড় করে বলল, তুমি স্কুল ফাঁকি দিতে, বাবা!
বাবা বিব্রত গলায় বললেন, হুঁ। ওই আর কি, মানে সব সময় যেতাম না আর কি।
বাবা টিচাররা তোমায় কিছু বলত না?

বাবা উত্তর দিলেন না। স্কুল ফাঁকি দেয়ার ব্যাপারটা বুক্কার সঙ্গে আলোচনা করতে ভাল লাগছিল না, কথা ঘুরাবার জন্য বললেন, বুক্কা, তোরা তো আবার বিদেশী লেখা ছাড়া এখন আর পড়িস না। কীসব যেন হ্যারী পটার . . . ।
বুক্কা মন খারাপ করা গলায় বলল, দেশে আমাদের জন্য দেশে কেউ লেখে নাকি?
বাবা বললেন, দেশে তোদের জন্য লেখালেখি করেন না এমন না, অনেকেই আছেন. . .। ছোট বেলায় রাশিয়ান একটা গল্প পড়েছিলাম, জানিস। লেখকের নামটা মনে নাই।
বুক্কা বলল, কি ছিল গল্পটা?
বাবা বললেন, বলি শোন: 'কুয়োতলায় সব মায়েরা জড়ো হয়েছেন। মারা একসঙ্গে হলে যা হয় আর কি? রান্না-বান্না, শাড়ি-গহনা, এইসব নিয়ে তুমুল আলোচনা হচ্ছে। সবশেষে প্রসঙ্গ এলো কার সন্তান কতো প্রতিভাবান এই নিয়ে। দূরে সবার সন্তানরা খেলা করছিল।
এক মা তার এক সন্তানকে কাছে ডাকলেন। তার সন্তান চমৎকার ডিগবাজী খেল। সবাই মুগ্ধ। ওই সন্তানের মার মুখ ঝলমলে।
অন্য একজন মার সন্তান চমৎকার গান গাইল। কেউ বা কবিতা আবৃত্তি করল।
কেবল মাত্র একজন মা বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যরা বলল: কিগো তোমার ছেলেকে ডাকলে না। ওই মা চোখ নীচু করে বললেন, আমার খোকার যে কোন গুণ নাই, বলে ভারী বালতিটা উঠিয়ে তিনি গুটিগুটি পায়ে এগুতে লাগলেন। রোগা দুবলা কালো কালো মতো তার সন্তান কোত্থেকে জানি ঝড়ের গতিতে এলো, মার ভারী বালতিটা ছিনিয়ে নিল। সোজা বাড়ীর দিকে হাঁটতে লাগল।'

বাবার চোখে জল। কিন্তু বাবা বুক্কার কাছ থেকে লুকাবার কোন চেষ্টাই করলেন না।
বাবা সামলে নিয়ে বললেন, মজার আরেকটা খেলা ছিল- রস, কস, সিঙ্গা, বুলবুল, মালেক, মুসতাক। জানিস, ঘুড়ি উড়ানো খেলায় আমার সঙ্গে কেউ পারত না। সুতোয় এমন মাঞ্জা দিতাম. . . ।
বুক্কার বিস্ময়ের শেষ নেই, মাঞ্জা কি বাবা?
বাবার শিশুর উচ্ছ্বাস, সুতোয় কাঁচ ভাঙ্গার গুড়ো, হেনতেন মিশিয়ে একটা দ্রবণের মতো তৈরী করা হতো। বিশেষ পদ্ধতিতে সুতোয় মিশিয়ে নাটাইয়ের ওই সুতোয় মেশানো হতো। ব্যস, কেল্লা ফতে। অন্য ঘুড়ির সুতো লাগলেই, ঘ্যাচ ঘ্যাচ ঘ্যাচ। হা, হা, হা। কী মজা!

বুক্কা হ্যারী পটারের চশমার মতো চোখগুলো গোল করে অপার বিষ্ময়ে দেখছে বাবাকে। তাঁকে কী ছেলেমানুষই না দেখাচ্ছে! বাবা যেভাবে লাফাচ্ছেন, ছাদে না মাথা ঠুকে যায়! কী আশ্চর্য- বয়স্ক এই মানুষটার মধ্যে লুকিয়ে আছে কী ছোট্ট একটা শিশু!
বুক্কারা থাকে বিশতলা এপার্টমেন্টে। চারপাশে উঁচু উঁচু দালান। বুক্কার কোন খেলার মাঠ নাই। আকাশ নাই!"

*পুরনো লেখা। এখানে দিলাম এই কারণে...।
'বুক্কা এবং একচিলতে আকাশ' এই লেখাটা লিখেছিলাম তা বছর দশেক হবে। লিখেছিলাম কিশোর-ছোটদের জন্য। প্রকাশক সাহেব ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এই ধরনের আলাদা-আলাদা লেখা নিয়ে ৫টা বই বের করবেন। ৫টা বইয়ের একটা প্যাকেট। 'এক ব্যাগ কিশোর' এই টাইপের। এইসবের জন্য প্রকাশক সাহেবদের মাথায় অনেক বুদ্ধি থাকে!
আমি সানন্দে লিখে দিলাম। কী এক লোভে আমার চোখে লোভ চুঁইয়ে পড়ছিল। আমার লেখালেখির শপথ, ক-টা টাকা পাব সেটা বিষয় না। অন্য কিছু না, শিশুদের জন্য কখনও
লেখা হয়নি আমার। এই দেশে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখার কাজটা খুব কম মানুষই করেছেন।
লেখাগুলো ছিল যতটুকু মনে পড়ে:
ভূত দিবস
মা হাতি
খুকি এবং দৈত্য
কিটি মাস্ট ডাই: ১
কিটি মাস্ট ডাই: ২
২টা বইয়ের ইলাস্ট্রেশন হয়ে যাওয়ার পর আর্টিস্ট ভদ্রলোক উধাও। খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ। প্রকাশক সাহেবের এক গোঁ, তিনি অন্য কাউকে দিয়ে করাবেন না, ইনি নাকি আঁকাআঁকির ভুবনে 'পাকোয়াজ' টাইপের মানুষ। আবার এদিকে প্রকাশক সাহেব ৫টার কমে বইও করবেন না,
'এক ব্যাগ কিশোর' না-করলে তাঁর নাকি পোষাবে না।
আমি বললাম, আমি আঁকার চেষ্টা করে দেখব?
তিনি মুখ লম্বা করে বললেন, আপনি কী আর্টিস্ট, আশ্চর্য! সোজা একটা লাইনও তো টানতে পারেন না। আপনার আঁকা দেখলে যে কেউ বলবে এটা বাচ্চারাদের হাতের কাজ।
আমি বললাম, এক কাজ করলে কেমন হয় আর্টিস্টের নামের আগে খুদে লাগিয়ে দিলে কেমন হয়, খুদে-আর্টিস্ট। দেখেন না, খুদে-গানরাজ?
প্রকাশক সাহেব মুখ আরও লম্বা করে ফেললেন। উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। রসিকতাটা সম্ভবত তাঁর পছন্দ হয়নি।
পরে শুনলাম তিনি (আর্টিস্ট সাহেব) নেশা-টেশা করেন, আর্টিস্টরা নাকি এমনিই হন। যাই হোক, প্রকাশক সাহেবের ওই প্রজেক্ট আর আলোর মুখ দেখেনি। বাচ্চারাও আমার গু-মুত টাইপের লেখা পড়া থেকে বেঁচে গেল!
সম্প্রতি বুক্কারই মত একজন, 'ধ্রুব'-দের বাসায় গেলাম। ধ্রুব'র বাবার আপ্রাণ চেষ্টা তার ছেলেকে মাটির কাছাকাছি রাখার। এই চেষ্টাটুকু দেখে আমার চোখ নতুন গজানো চকচকে পাতার মত চকচক করে। 'পশ-ফ্ল্যাট' নামের ঝাঁ-চকচকে সিমেন্টের বস্তীর মাঝেও খানিকটা অন্য রকম।
ধ্রুব নাকি দৌড়াতে পারে না, মাঠে দৌড়ালেও আড়ষ্ট হয়ে দৌড়ায়। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের গারাজে কাগজের বল বানিয়ে ফুটবলের নামে লাত্থালাত্থি করে। এই হচ্ছে ধ্রুব'র শৈশব!
তার বাবাকে বলতে ভুলে গেছি এটা, এরা থাকেন দোতলায় না তিনতলায় মনে পড়ছে না, ওখানে যেতেও লিফট- তাহলে ধ্রুব কেমন করে শিখবে দুদ্দাড় করে সিড়ি ভাঙ্গার মজা?
এই ফ্ল্যাটটার যে বিষয়টা আমাকে মুগ্ধ করেছিল বেশ অনেকখানি মাটি। প্লাস্টিকের মাটি না সত্যি সত্যি মাটি (মাটি নিয়ে একটা লেখা ছিল...স্বপ্ন বিক্রি করব)। কেবল গাছ লাগাবার জন্যই না। বৃষ্টি আসলে বৃষ্টির পানিতে এই মাটি ভিজবে, নিশ্চিত সোঁদা গন্ধ বেরুবে *। বৃষ্টির পর বাতাসে যে গন্ধ, আহা! সেই গন্ধ, যে গন্ধে রোবটদের পাথুরে মুখ ক্রমশ মানবীয় হয়ে উঠে। কমনীয়, ঢলঢলে। একজন মানুষ, প্রকৃতির সন্তান মিলেমিশে থাকে প্রকৃতির সঙ্গে- ইচ্ছা করলেই প্রকৃতির বাইরে যেতে পারে না সে। তখন প্রকৃতির সব কিছুর জন্য জন্ম নেয় প্রগাঢ় মায়া, ভালবাসায় ছাপাছাপি দু-চোখ। একজন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকে আধাআধি শিশু, পশু। বার করতে চায় না কেউ তবুও পশুটা বেরিয়ে পড়ে ফাঁকতালে! পশুটাকে আটকে রাখার জন্য প্রকৃতির কাছাকাছি থাকাটা জরুরি, খুব জরুরি। তখন তিল তিল করে গড়ে উঠা প্রকৃতির সন্তান তার ভেতরের পশুটার সঙ্গে মারামারিতে অনায়াসে জিতে যায়। প্রকৃতির, তার সন্তানের কাছে এরচেয়ে বড় আর চাওয়ার কিছু নাই।
আসলে বুক্কা এবং ধ্রুব'র একচিলতে আকাশে খুব একটা তফাৎ নাই- তফাৎ কেবল ওই মাটির অংশটুকুই!
* বিজ্ঞানিরা অবশ্য বলেন, বৃষ্টির পর বাতাসে যে গন্ধ পাওয়া যায়, সেটি আসলে 'অ্যাকটিনোমাইসিটিস' নামের একটা ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্ট হয়।
"The second reaction that creates petrichor occurs when chemicals produced by soil-dwelling bacteria known as actinomycetes are released. These aromatic compounds combine to create the pleasant petrichor scent when rain hits the ground. Another scent associated with rain is ozone."
বিজ্ঞানিরা কী বলে বলুক তাতে আমাদের কী! একজন মানব-মানবী বৃষ্টিতে হাতে হাত রেখে ভিজবে আর তার চারদিকে সোঁদা মাটির মেঘ। এই মেঘে হারিয়ে গেলেই কী!
এখানে ব্যাটা বিজ্ঞানির কী কাজ!
 

Tuesday, April 14, 2009

টাকা, তোমার আবার জাত কিহে!

এই ছবি এবং ছবির ঘটনা নিয়ে দেশব্যাপি দেখি সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে! ঝড়ের গতিটা সম্ভবত এই কারণেও প্রবল, শাহআলম সাহেব ঠিক আওয়ামী ঘরানার না বলে।

আমি খুব একটা অবাক হইনি! আসলে অবাক হওয়ার ক্ষমতাটাই নষ্ট হয়ে গেছে এখন। কাল যদি শুনি, বিগত ২ বছর সেনাপ্রধান দেশে ছিলেন না, এতেও আমি অবাক হব না।

নিজের জাগতিক ছোট-ছোট বেদনার সঙ্গে যোগ হয় দেশের বড় বড় অসঙ্গতি, সব মিলিয়ে পাগল পাগল লাগে নিজেকে। কেবল মনে হয় ইচ্ছামৃত্যু থাকলে বেশ হত। সুইচ টিপলাম, আহ, আরামের ঘুম।
কালে কালে অবাক হই না আর! 

সাম্প্রতিক ঘটনা, আমার এই দু:সময়ে যেখানে ১০০ পয়সায় ১ টাকা হয়, কাছের মানুষদের হাত ধরে কাতর হয়ে যখন বলি, আমাকে একটা চাকরি-বাকরি যোগাড় করে দেন তখন মানুষগুলো হা হা করে হাসেন। একজন তো বললেন, 'এইটা নিয়া একটা লেখা দেন'।
সেখানে দূরের একজন মোটা অংকের চেক ধরিয়ে ম্রিয়মান হয়ে, বিমর্ষমুখে যখন বললেন, এই সামান্য টাকা...আমার ক্ষমতায় কুলালে।
আমার উচিৎ ছিল, মানুষটার কাছে এমন একটা কিছু ভঙ্গি করা যাতে তিনি অন্তত
আমাকে অকৃতজ্ঞ না ভাবেন। কিন্তু ওই যে বললাম, অবাক হওয়ার ক্ষমতাটাই নষ্ট হয়ে গেছে, পুরোপুরি!

মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে এসেছি। আমি ৫০০ টাকার বাজীতে হেরে গিয়েছিলাম। ৫০০ (ভাগ্যিস বেশি ধরিনি। নিয়মানুযায়ী দু-পক্ষকেই টাকাটা নগদ তৃতীয় পক্ষের কাছে জমা রাখতে হয়েছিল। খোদা মেহেরবান, এরচে বেশী টাকা তখন আমার কাছে ছিল না) টাকা হেরে যাওয়ার প্রসঙ্গটা বলি, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই আমি আমার এক সুহৃদের সঙ্গে বাজী ধরেছিলাম, জয়নাল হাজারীরা আর পুনর্বাসিত হবে না। আমার ট্রাম-কার্ড ছিল (এটা আবার বহুল বিতর্কিত শব্দ, জলিল সাহেব এটার পেটেন্ট নিয়ে রেখেছেন কিনা কে জানে?) বিগত ২ বছরে আমরা সবাই কিছু না কিছু শিখেছি। দিনশেষে দেখা গেল, আমরা কিছুই শিখিনি। কেউ কেউ আসলে কখনও শেখে না, মৃত্যুর আগপর্যন্ত। পুনর্মূষিকোভব। দেশের কী হল, যা হওয়ার তাই হল, আমি গরীব বেচারার ৫০০ টাকা জলে গেল।

ফুটবলার, হালের ফুটবলের হালধারী সালাউদ্দিন সাহেব আবার এককাঠি সরেস। তিনি বলেছেন, 'আমি আবার নিয়ম খু্ব মানি।...বসুন্ধরার কাছ থেকে টাকা নেয়ায় আমি বিব্রত না। এমন প্রশ্ন উঠেছে বলে দু:খিত'।
বেশ-বেশ। ইনার সাফ কথা, টাকার গায়ে কারও নাম লেখা থাকে না, কেবল লেখা থাকে বাংলাদেশ গভর্নরের নাম।


গুণদাদার কবিতা থেকে ধার করে বলতে হয়:
"'টাকা হ'লে বাঘের চোখও মেলে'
এই কথাটার যথার্থতা প্রমাণ করতে হ'লে
যেতে হবে সুদূর সুন্দরবনে। নব্য ধনিক
পুঁজিপতি ভাবেন মনে মনে, যাই দেখি গে
ওখানে তো অনায়াসেই বাঘের দেখা মেলে।"
(শান্তির ডিক্রি, নির্মলেন্দু গুন)

শুনেছিলাম টাকা দেখলে নাকি কাঠের পুতুলও হাঁ করে। আসলেই তো, টাকার চেয়ে জোর আর কিছুতে নাই- টাকা থাকলে একজন মানুষকে কোন রশারশিই আটকে রাখতে পারে না।
শাহআলম সাহেবের সুযোগ্য পুত্রধন 'সানবীর' কোন এক ককটেল পার্টিতে রসিয়ে রসিয়ে-তারিয়ে তারিয়ে বলবেন, জানিস, বান...কে মেরে যে গন্ডগোলটা হল না। শ্লা, ড্যাডের ২০০ খরচ হল। কাট মাই শিট!
২০০ মানে ২০০ কোটি।

ছবিসূত্র: প্রথম আলো।

Monday, April 13, 2009

'খোদেজা'র কঠিন সমালোচনা এবং আমার স্বল্প উত্তর

এই সমালোচনাটা করেছেন রাসেল পারভেজ (তাঁর স্ক্রীণ-নেমটা এখানে শেয়ার করার প্রয়োজন বোধ করছি না)। একটা ওয়েব সাইটে খোদেজা নিয়ে সমালোচনা লিখেছিলেন। এর উত্তর লিখব লিখব করে আর লেখা হয়নি। একটা লেখা লিখে ফেলাটা যতটা সহজ কিন্তু এর কোন একটা অংশের ব্যাখ্যা করা, বা সমালোচনার পিঠে আলোচনা করা; আমার জন্য এরচেয়ে কঠিন কিছু নেই! তদুপরি সবিরাম চেষ্টাটা থাকেই!
ওই সাইটে রাসেল পারভেজ হামেশাই 'ডেঞ্জার জোনে' থাকেন। কখন তার সমস্ত লেখালেখিসহ গোটা ব্লগ উধাও হয়ে যায় এই ভাবনায় সমালোচনাটার অংশবিশেষ এখানে দিয়ে দিলাম।

গোটা ব্লগ উধাও করে দেয়া- ওখানে নাকি এটার চল আছে! যে-দেশের যে চল! এইজন্য ব্লগারদের মিটিং-মিছিল পর্যন্ত করতে হয়! এই ভাবনাটা আমার কাছে কেবল অমানবিকই মনে হয় না, অসুস্থ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ। অন্যদের কথা জানি না কিন্তু আমার কাছে আমার লেখা সন্তানসম। আমার সন্তানকে আমি স্পর্শ করতে পারব না এমন কোন আইনকে আমি মানি না, স্বীকার করি না।)

রাসেল পারভেজ তাঁর সমালোচনায় লিখেছেন:
আমরা সাহিত্যের অপমৃত্যু দেখি এ রকম আত্মঘাতি প্রবনতায়। খোদেজা উপন্যাসটির পেছনের পাতায় খোদেজা উপন্যাসের যেই কাঠামোর তথ্য বিদ্যমান ভেতরে প্রবেশ করে সেই কাঠামো খুঁজে পাওয়া যায় না। লেখকের অসাবধানতা কিংবা অযোগ্যতা কিংবা প্রকাশকের কূণ্ঠা কোনটাকে দায়ী করবো ভেবে পাই না আমি।

সামান্য কথায় ঘটনাটা বলতে গেলে লেখকের সবিনয় নিবেদন থেকে তুলে দিতে হয় এ উপন্যাস লেখার পশ্চাত কথনটুকু। খোদেজা নামের এক শিশু ধর্ষিত হয় বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে, তার প্রতি এই নির্মমতার কোনো দ্বিতীয় উদাহরন নেই। সম্প্রতি মগবাজারে ২জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের ধর্ষন করবার পরে হত্যা করা হয়েছে তবে তাদের ধর্ষণ এতটা নির্বিকার নির্মম ধর্ষণ না। তাকে হত্যা করে ঘাতকেরা তার জানাজায় অংশ নেয়। এই মর্মবেদনা লিখে রাখবার কারণেই এই উপন্যাস লিখবার তাড়না তৈরি হয় লেখকের ভেতরে।

উপন্যাসটি একটা পরিনতিতে পৌছালেও আমার কাছে অসম্পূর্ণ এবং ফাঁকিবাজির কাজ মনে হয়। প্রথমত উপন্যাসে ঢুকতে না পারার অক্ষমতা। মূলত এমন সব চরিত্র নিয়ে নাড়াচাড়া হচ্ছে এখানে যাদের সাথে খোদেজার সংশ্লিষ্ঠতা সামান্য, এবং এই চরিত্রগুলো কখনই খোদেজার সাথে সম্পর্কিত হয় না কিংবা তাদের সাথে সংযুক্ত হতে পারে না উপন্যাসের ব্যপ্তিতে।
মূলত গত বছর অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে, প্রতিটা ঘটনাই কোনো না কোনো ভাবে অমানবিক, লেখক এই ঘটনাগুলোকে পূঁজি করে একতা মায়াময় আবহ তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন, তবে যেহেতু ঘটনাগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন তাই জুড়ে দেওয়ার নিপূন সূচীশৈলীর অভাবটা প্রকট।
(আমার বক্তব্য, ফিকশনের জন্ম রিপোটিং-এর গর্ভে। একটু অন্য রকম বললে, পৃথিবীর সব কলাই প্রকৃতির নকল। একেকজন একেক রকম নকলবাজি করে এই যা! চোখে দেখা, পড়ে শোনা ঘটনা নিয়ে লিখতে বাধা কী!)

উপন্যাসের মূল ঘটনা ৩টি। বাংলাদেশ বিমানের কেবিন ক্রুদের জন্য অমানবিক একটা অলিখিত নিয়ম আছে, গর্ভবতী হলেই তাদের বরখাস্ত করা হবে, এই নিয়ে তারা একটা মামলা করেছিলেন, সেটায় রায় হয়েছে, সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়া এবং এর অমানবিকতা একটা প্রসঙ্গ, দ্বিতীয় প্রসঙ্গ হচ্ছে শিশু মাদকাসক্তি এবং মূলত যা এই উপন্যাস লিখবার তাড়না সেই খোদেজা উপাখ্যান।

লেখক নিজে তাদের সাথে কোনো সংযুক্ততা বোধ করেন না। তারা নেহায়েত খবরের কাগজের করুণ রিপোর্ট হয়ে থাকে, রক্তমাংসের শরীর নিয়ে সামনে উপস্থিত হতে পারে না। মূলত তারা নিজের চরিত্রের কয়েকটা আঁচর হিসেবে থেকে যায়। কয়েকটা রেখা দিয়ে একটা মানুষের মুখ চিহ্নিত করা যায়, তবে সে মুখে আদল আর অনুভূতি ফোটাতে অনেক রঙ খরচ করতে হয়। এখানে লেখক শুধুমাত্র কয়েকটা আঁচর দিয়ে নিজের দায়িত্ব সমাপ্ত করেছেন।
কেনো এমনটা হলো এটা লেখক ছাড়া অন্য কেউ বলতে পারবে না।
(আমার উত্তর: এই বিষয়ে অনেক কথা বলার ছিল। আমি ওই পথ ধরে হাঁটলাম না। কেবল পোস্টের সঙ্গে এই স্কেচটা দিলাম। এই স্কেচটা আমি দাঁড় করেছি কেবল ৩টা রেখা দিয়ে। এখানে একটা ফিগার দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এটা বলার আবশ্যকতা দেখি না: এটা একজন মার স্কেচ। মা-টার গর্ভ হয়েছে। তাঁর সন্তান ছেলে না মেয়ে এইসব নিয়ে বলারও আগ্রহ নাই! আমি পাঠককে অসম্ভব বুদ্ধিমান মনে করি- চলমান একেকটা ক্ষুরধার ব্রেন। সবই বলে দিলে পাঠককে নিবোর্ধ ভাবা হয়। পাঠককে এমনটার ভাবার সাহস আমার নাই।)

লেখার আরও একটা সীমাবদ্ধতা হলো লেখকের উপস্থিতি এবং ভাববিনিময়। এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই যে লেখক নিজে চরিত্র হয়ে তার লেখায় উপস্থিত থাকতে পারবে না, তবে এখানে লেখক প্রথম পুরুষে বর্ণনার ভার নেওয়া কোনো চরিত্র নয়।
ব্যক্তিগত পরিচয় এবং অনেক দিন ধরে তার লেখা পড়বার সুবাদে জানি এখানের অনেকগুলো লেখা এবং মন্তব্য সামহোয়্যারের অতীতের পাতা থেকে তুলে নেওয়া। হয়তো সাময়িক ভাবশূন্যতা কিংবা কিছু একটা দিয়ে পৃষ্টা ভরাতে হবে এমন কোনো ভাবনা থেকেই অসম্পাদিত অবস্থায় সেটা সরাসরি খোদেজা উপন্যাসের অংশভুক্ত হয়েছে।
(ভাল! যে দু-চারজন পাঠক বইটা পড়বেন তাঁদের ওয়েবে আমার সঙ্গে পরিচয় নাই এটা ভেবে খানিকটা আরামের শ্বাস ফেলি।)

চরিত্র বিশ্লেষনঃ নাগরিক চরিত্র নিশি, যে একজন এয়ারহোস্টেস এবং গর্ভবতী তার সাথে লেখকের পরিচয় হয় কোনো এক ব্লগ সাইটে। নিশি এখানে পাঠক, তার নিজের প্রবল আকাঙ্খা সে এই সন্তানের জননী হবে।
তার স্বামী জাবীর মূলত স্বপ্নভুক মানুষ, পরিবারবিচ্ছিন্ন এবং যথাযোগ্য রকমের ভাববিলাসী, পলায়নপ্রবন চরিত্র, তার কোনো আগ্রহ নেই এই সন্তান গ্রহনের। তার নিজস্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার গল্প এখানে জড়িত।
(ওয়েবের লেখালেখির অংশবিশেষ বইয়ে দেয়া যাবে না এমন তো কোন কথা নাই। কেন, এ গ্রহের কোথাও বসে কোন চরিত্র, যে ওয়েবে তার কোন পছন্দের লেখকের লেখা পড়ছে? এমনটা কী হতে পারে না!)

সোহাগ, নিশি জাবীরের পরিবারের শ্রম সহায়ক শিশু, সে খোদেজার ভাই।
এইটুকু স্মৃতিময় যোগাযোগ ছাড়া আর কোথাও উপন্যাসে এই ৩ জনের সাথে খোদেজা কিংবা লেখকের যোগাযোগ নেই।
(ওই ৩ রেখার স্কেচটার কথাই আবার বলব।)

খোদেজা এবং তার বাবা, উপন্যাসের মূল চরিত্র না হয়েও পুলিশ অফিসার জুনাব আলী এবং ওবায়েদ যারা ঘটনার সমাপ্তি ঘটান মেলোড্রামাটিক উপায়ে, তারাই মূলত সবচেয়ে বেশী লেখকের অনুকম্পা পেয়েছেন।
(ওবায়েদ সাহেব, হুঁ। আসলে এটা চরিত্র না, একটা স্বপ্নের নাম।)

নিশি চরিত্রটির নিজস্ব দ্বিধা এবং যাতনা , জাবীরের পলায়নপ্রবনতা, সোহাগের ছিটকে পড়া এবং সাময়িক উদ্ধার অমীমাংসিত, খোদেজাও তেমনভাবে প্রাণ পায় না, যতটা ওবায়েদের প্রতিক্রিয়ায় পায়। এবং ওবায়েদ স্বর্গচ্যুত এক দেবতার মতো হঠাত এসে উদয় হয় খোদেজার গ্রামে, এক দিনে সে সামাজিক দায়বদ্ধতা চুকিয়ে বিদায় নেয়।
এই চরিত্র লেখকের ন্যায় দেওয়ার প্রবল আন্তরিকতায় সৃষ্ট। লেখকের এই প্রাণপন প্রচেষ্টার কারণে শেষ পর্যন্ত এই ওবায়েদের উপরেই একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্মায়। তবে পাঠক ভীষণভাবে প্রতারিত হয়। অন্তত লেখক শিশু নির্যাতন এবং এই অমানবিকতার প্রতি যে সীমাহীন ঘৃণা নির্মাণের একটা পটভূমি পেয়েছিলেন, এই নির্যাতিতকে ন্যায় দিতে গিয়ে তিনি এই সুযোগটা হেলাফেলায় নষ্ট করলেন, এবং সম্ভবত তার নিজস্ব কষ্টবোধ লাঘব হলেও সামাজিক সচেতনতা এবং প্রতিবাদী মনন তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে গেলো।

উপন্যাসটির পরিশিষ্টে এই দায়মোচনের চেষ্টা ছিলো লেখকের তবে আমার মনে হয় লেখকের নির্মোহ অমানবিক রুঢ়তা থাকলে এটা চমৎকার একটা উপন্যাস হতে পারতো। মানবিকতার চিত্রায়ন যেভাবে এসেছিলো তাতে এটার গন্তব্য ছিলো অনেক দূর, তবে এই যাত্রা কেনো ব্যর্থ হলো, কেনো চমৎকার একটা হতে পারতো উপন্যাসের অপমৃত্যু ঘটলো, এটার উত্তর কার কাছে?
(আমার উত্তর নাই। এই ছড়িটা পাঠকের হাতে)। পাঠক দুয়েক ঘা মারলে সহ্য করা ব্যতীত উপায় কী!)

আমাদের ফর্মা ধরে উপন্যাস লিখবার প্রকাশকীয় চাপ কিংবা আমাদের লেখকের অতিরিক্ত করূণা এবং ন্যয় প্রত্যাশী মনন, কিংবা লেখার সাবলীলতা স্বত্ত্বেও যদি বলি লেখকের নিজস্ব ব্যর্থতা। লেখক নিজেও অলিখিত চাপে ভুগছেন তবে?
(এখানে আমি নিরুত্তর। এও সত্য বটে, অখ্যাত লেখকের কাছে প্রকাশক হচ্ছেন দ্বিতীয় ঈশ্বর!)

...............
পরিশেষে অন্য প্রসঙ্গ,
পৃথিবীর সেরা শেফ অসম্ভব যত্ন নিয়ে রান্না করলেন। সমালোচক খেয়ে, তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললেন, লবন আরেকটু বেশি হলেই সর্বনাশ হয়ে যেত আর কী!


হা হা হা।


খোদেজা: ৩

Saturday, April 11, 2009

জয়তু ডিজিটাল !

ডিজিটাল, এর মানেটা কী? বুঝে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। নেটে সার্চ দিয়েও কাজের কাজ হল না!
ডিজিটাল এর সঙ্গে সম্ভবত কিছু একটা যোগ থাকতে হবে। চোখ, মেইল ইত্যাদি ইত্যাদি...।

অ আচ্ছা, ডিজিটাল চোখ? ধরা যাক, আমরা যে অহরহ ব্যবহার করি কথাটা, আমি নিজের চোখে ঘটনাটা দেখেছি। (অন্যের চোখে দেখার নিয়ম নাই!)
চোখ তো দুইটা। আমরা কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করি না, কোন চোখে দিয়ে দেখেছেন? ডান, না বাম?

আহা, আগে শুনুনই না কেন বলছি এমনটা। যদি এমনটা হয় দুই চোখের একটা চোখ ডিজিটাল? তখন এই প্রশ্ন করাটা কী অবান্তর যে মনুষ্য-চোখ দিয়ে দেখেছেন, নাকি ডিজিটাল-চোখ দিয়ে?

এই ডিজিটাল-চোখা শিশুটির মত কী এমনটা হতে পারে না, তার এক চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে, অন্য চোখ শুকনো খটখট? কে মাথার দিব্যি দিয়েছে বাপু, এমনটা হতে পারবে না? 

অথবা এমন হতে পারে কী? ডিজিটাল দরোজা [১]? নির্দিষ্ট পরিমাণ ডেলিভারি না দিলে ওয়াশ-রুমের ডিজিটাল দরোজা খুলবে না; মাথা কুটে মরলেও!
 

বা এমনও কী হতে পারে না, ডিজিটাল মমতা? মা পড়ে থাকেন গ্রামে, সুযোগ্য পুত্রধন থাকেন শহরে ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটে। বছরে একবার 'মা দিবসে' এই পুত্রধন মাকে ডিজিটাল মমতা জানাবেন। কেমন করে? আহা, কেন, ডিজিটাল পত্রাঘাতের মাধ্যমে। ই-মেইল করে।

গ্রামে মা মেইল পাবেন কেমন করে? আরে, এত যন্ত্রণার কী উত্তর হয়! এটাই তো ডিজিটাল। গ্রামে গ্রামে নেটে নেটে গিট্টু লেগে যাবে। মন্ত্রী মহোদয়গণ সেই গিট্টু খুলবেন, কম্পিউটার সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান নিয়ে (মন্ত্রীদের জ্ঞান আবার ব্যাপক। সাইফুর রহমান তো বলেই বসেছিলেন, 'এই দেশ হইতে বিল গেটস কম্পিউটার বিকরি করিয়া কোটি কোটি টাকা নিয়া যাইতাছে...')। 
আহারে, আমার টাকা থাকলে বেচারা গেটসকে বসুন্ধরা সিটিতে একটা শো-রুম খুলে দিতাম। গেটসের জন্য কম্পিউটার বিক্রি করা সহজতর হত।

তো, মন্ত্রী বাহাদুররা নিজেদের কম্পিউটারকে একুরিয়াম বানিয়ে মাছ চাষ করবেন। প্রসব হবে ডিজিটাল মাছ! সেই মাছ কপকপ করে খাবে ডিজিটাল মানুষ...।
জয় ডিজিটাল, জয়তু ডিজিটাল!

সহায়ক লিংক: পাই থেরাপী: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_12.html


*স্কেচস্বত্ব: সংরক্ষিত
**শিশিরের কার্টুনের অসম্ভব ভক্ত আমি। অনেক আগের পত্রিকায় তার কার্টুনটা লেখাটার জন্য দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু নিউজ-পেপারটা ছিঁড়ে অবস্থা গুরুতর বিধায় দেয়া গেল না।
নিরুপায় আমি ভাবলাম, নিজেই পেন্সিল দিয়ে ঘসাঘসি করে একটা কিছু দাঁড় করাবার চেষ্টা করি। আফসোস, শিশিরের কার্টুনের ছাপ এড়ানো গেল না।

একটি ভাল ভুল- একটি খারাপ ভুল!

৭ই মে। বরাবর যা হয়, এবারও তাই হল! যথারীতি এবারও ৭ই মে। অন্যান্য দিনের মত করে সব কাজ সারছি, তারে-নারে ভাব। সকাল গড়িয়ে দুপুর। হোম মিনিস্ট্রি থেকে হোম মিনিস্টারের ফোন। ইস্তারি(!) সাহেবার ফোন। ফোনে উত্তাপ স্পষ্ট টের পাচ্ছি।
ইস্তারি(!) সাহেবা: আজ তারিখটা কত?
আমি অবাক: কেন, বাসায় কি তারিখের যন্ত্র, আ মীন, কেলেন্ডার-ফেলেন্ডার কিছু নাই!
ইস্তারি সাহেবা (হিম গলায়): থাকুক, তুমিই বল না, শুনি একটু?
আমি (গলায় আলগা কাঠিন্য এনে): এটা রসিকতা করার সময় না। কাজের সময়।
ইস্তারি সাহেবা: আমার সঙ্গে চালবাজী করবা না, তুমি কলম চালানো ছাড়া যে অন্য কোন কাজ পার না সে আমি বিলক্ষণ জানি। আমি তোমার ছাতাফাতা আবর্জনা লেখার পাঠক না। তোমার কলমবাজী ওদের জন্য তুলে রাখো। এ্যাহ, ভারী একজন কলমবাজ হয়েছেন তিনি, এক পাতা লেখতে ১০টা বানান ভুল!
আমি (চিঁ চিঁ করে): বিষয় কি, তারিখের সঙ্গে লেখালেখির সম্পর্ক কী! আজ ৭ই মে, তো?
ইস্তারি সাহেবা: তো! লজ্জা করে না তো বলতে, চশমখোর কোথাকার। বুড়া কুইচ্চা মাছ। তোমার সঙ্গে কথা বলতে এখন আর ভাল্লাগছে না।
আমি (হড়বড় করে): শোনে শোনো, ফোন...।

ফোন কেটে দিলে আমি আকুল পাথার ভাবছি। কাহিনী কী! ৭ই মে, এই দিনে কি প্রলয় হয়েছিল যে মনে না রাখলে মাথা কাটা যাওয়ার দশা। এই দিন কী আমেরিকা জাপানে আনবিক বোমা ফেলেছিল, কেন আমার মনে রাখা প্রয়োজন? ১৩১০ গ্রাম মস্তিষ্কের উপর চাপ পড়ছে। লাভ কী, এই দুর্বল মস্তিষ্কের সেই শক্তি কই! আচ্ছা, আজ সকালেই বাসায় ফোটা মে ফ্লাওয়ার দেখে কি যেন একটা ভাবনা এসেও তাল কেটে গিয়েছিল? ইয়া মাবুদ, আজ থেকে ১০ বছর আগে এই দিনই বিবাহ করেছিলাম। একটি ভাল ভুল!

পায়ে কুড়াল মারা হলো নাকি কুড়ালে পা মারা হলো এ নিয়ে গবেষণা করার আর কোন অবকাশ নাই। কিন্তু দেখো দেখি লোকজনের কান্ড, এরিমধ্যে আমার এক সুহৃদ ফোন করে ইস্তারি সাহেবাকে ১০ বছর আগের করা আমার এই ভুলটার জন্য শুভেচ্ছা জানালেন। কেন রে বাবা, এটা উনাকে না বলে আমাকে বললে কী আকাশ ভেঙ্গে পড়ত!
ইস্তারি সাহেবাকে কি ভাবে ম্যানেজ করলাম সে কাহিনী বলে অন্যদের বিরক্ত করার কোন মানে হয় না। সন্ধ্যায় শুধু একবার তিনি চিড়বিড় করে বলেছিলেন, ভাঁড় কোথাকার।
ভাঁড় বলার কারণটা অতি তুচ্ছ। সন্ধ্যায় আমি ১০ বছর আগের বিবাহের পোশাকটা শখ করে পরেছিলাম। এই বিবাহের পোশাকটা, বরাবর যা পরি তাই পরেই বিবাহ করেছিলাম। সেই জিনস, সুতি শার্ট।
বিবাহের সময় কিছু অনায্য শর্ত ছিল আমার। পোশাক থাকবে এই। কন্যা ব্যবহারের কিছু কাপড় ছাড়া অন্য কিছু আনতে পারবে না। বরযাত্রী থাকবে সর্বসাকুল্যে ৭/ ৮ জন।

বিবাহের সময় মজার অনেক ঘটনার একটা ছিল এই রকম। আমি বসে আছি। কাজী সাহেব অনেকটা সময় বসে থেকে উসখুস করে বললেন, জামাই এখনও আইলো না, আমার তো আরেকটা বিয়া পড়াইতে হইব। একজন যখন আমাকে দেখিয়ে বললেন, জামাই তো আপনার সামনেই বসা। কাজী সাহেব সময় নিয়ে চশমা ঠিক করে ভাল করে আমাকে দেখলেন। টুঁ শব্দও করলেন না। কিন্তু তাঁর মনের ভাব বুঝতে আমায় বেগ পেতে হয়নি। তিনি যা ভাবছিলেন, এই বান্দর কোত্থিকা আমদানী হইল! আমি তাঁর দোষ ধরি না। পালিয়ে বিয়ে করলে এক কথা কিন্তু সেটেল ম্যারেজে একজন কাজীর এমনটা ভাবা বিচিত্র কিছু না।

আমার এই পাগলামির অন্য কোন কারণ ছিল না। আমার প্রবল আশা ছিল, আমার এই পাগলামি অন্য কোন একজন যুবকের মধ্যে সংক্রামিত হয় যদি। একটা অন্য রকম লোভ! লাভের লাভ হল কচু। ফাঁকতালে পাগল হিসাবে কুখ্যাতির পাল্লা ভারী হল। জোর গুজব, কারা কারা নাকি আমাকে দেখেছে ছাদে নাংগুপাংগু হয়ে আকাশের সঙ্গে কথা বলতে। এতে আকাশের কি এসে গেল জানি না তবে আমার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয় বাতাস!
যাই হোক, বিবাহের দিনটা ভুলে যাওয়া কাজের কোন কাজ না। একটা খারাপ ভুল!

খাইব পান্তা, মরিব অসুখে

বৈশাখ ঘাড়ের উপর শ্বাস ফেলছে। বঙ্গালরা(!) কি পিছিয়ে থাকবেন, নাকি তাদের ছানাপোনারা?
বাংলা অক্ষর দেখে যাদের ছানাপোনাদের নাঁকিসুরে এটা না বললে যে মাথা কাটা যাবে, ড্যাড-মম, এটা কি বা-ং-লা? এরা কি এমন একটা দিনে ‘পান্তা ভাত’ খাবেন না, এটা কী ভাবা যায়! সেইসব পান্তাখেকোদের এই লেখাটা উৎসর্গ করছি।

গত বছর পহেলা বৈশাখে, মহাখালির ট্রাস্ট মিলায়তনে ৩০০ শিল্পী এবং তাদের পরিবারের লোকজনদের পান্তা খেয়ে পেট নেমে গেল। হাসপাতালে টানাটানি। যাচ্ছেতাই অবস্থা!

এবারও নিশ্চয়ই এমন কিছু একটা হবে। অপেক্ষায় আছি।

আসলে পহেলা বৈশাখে পান্তাভাত না খেলে আমাদের চলেই না। কিন্তু পান্তা বানানো নয়কো সোজা। ট্রাস্ট মিলনায়তনের শিল্পীদের পেট নেমে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করা হয়েছিল যেটা:
সকালে গরম ভাত রেঁধে দ্রুত পান্তা বানানোর জন্য এতে দেয়া হয়েছিল বরফ। সম্ভবত ওই বরফের পানি ছিল দুষিত।
তো...? লজ্জা-লজ্জা!

এই দেশের মত বিচিত্র মানুষ সম্ভব এ গ্রহে আর নাই। বিচিত্র জাতি, এরা নিজেরাই নিজেদেরকে ফাঁকি দেয়। লাল চামড়াদের অনুকরণ না করলে আমাদের পশ্চাদদেশের কাপড় ঠিক থাকে না- সারা বছর মার খোঁজ না রেখে বছরে একটা কার্ড পাঠিয়ে দায় সারা।

হায়, পান্তাখেকো এস বি সাহেবের বাবা হওয়া! বা একজন স্ত্রী বিরহী, যেদিন স্ত্রী মারা গেছেন সেই দিনই শোক প্রকাশে কাল কন...পরে ফিঁয়াসের কাছে যাওয়া...।

Thursday, April 9, 2009

খোদেজা: ৩

খোদেজা: ২

খোদেজার বাপ ভয় চেপে আছেন। মাতব্বর তাকে কেন ডেকেছেন এটা বুঝতে তার বাকি নেই। এই মাতব্বর পারে না এমন কোন কাজ নেই। থানা নাকি এ পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়- দিনকে রাত, রাতকে দিন করতে এর জুড়ি নেই।
ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত খোদেজার বাপ গামছা দিয়ে মুখ মুছলেন। তিনি আকুল হয়ে ভাবছেন, কী এমন অন্যায় করলেন যে খোদা তাকে এমন শাস্তি দিলেন। নাহয় নামাযটা সময় করে পড়তে পারেন না কিন্তু এই একটা অন্যায়ের জন্য খোদা তাকে শাস্তি না দিয়ে এইটুকুন দুধের বাচ্চাটাকে কেন দিলেন?

পা টেনে টেনে হাঁটছেন। সাঁকোটা পার হতে গিয়ে খরস্রোতা নদিটির দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। খুব ইচ্ছা করছিল লাফিয়ে পড়তে। এভাবে চলে গেলে যে খুব গোনাহ হয় এটা ওর জানা নেই এমন না। কিন্তু এই মুহূর্তে সোয়াব-গোনাহ নিয়ে ওর বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই।
কেবল মাথায় যেটা ঘুরছে, আম্মাজানরে যারা এইভাবে কষ্ট দিয়েছে তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে, ভয়াবহ শাস্তি। আচ্ছা, দাঁ দিয়ে এদের দুইজনকে দুইটা কোপ দিলে কেমন হয়? নাহ, আমি এটা করব না। আইন এদের শাস্তি দিবে, দুনিয়ার অন্য বাপ-মাদের এটা জানা দরকার। আইন শাস্তি না দিলে জমিতে দেয়া বিষ খেতে তার হাত একটুও কাঁপবে না।

মাতব্বর দবির মিয়াকে বাড়িতেই পেলেন। মাতব্বর দবির মিয়া খুব খাতির করার ভান করল। এই গ্রামে চেয়ার আছে কেবল অল্প কটা বাড়িতে। জোর করে চেয়ারের আয়োজন করল। কড়িকাঠে বাঁধা চেয়ার, দড়ির গিট ছেড়ে বেশ কায়দা-কানুন করে নামানো হল। খোদেজার বাপ যতই না না করেন কিন্তু কে শোনে কার কথা!
'আরে মিয়া, তুমি হইলা গিয়া মেহুমান-কুটুম্ব। তুমার একটা ইজ্জত আছে না, এইটা তুমি কি কইলা মিয়া।'

খোদেজার বাপ ভাল করেই জানেন, এইসব কথার আসলে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই। অন্য কোন সময় তিনি মাতব্বরের বাসায় চেয়ারে বসতে গেলে মাতব্বর লাথি মেরে চেয়ার ফেলে দিত।
খোদেজার বাপ জড়োসড়ো হয়ে চেয়ারে বসলেন। অভ্যাস নেই বলে বসে ঠিক জুত করতে পারছেন না।
'মিয়া তামুক খাইবানি একটু?'
'জ্বে না-জ্বে না।'
'না খাইলেই ভালা, তামুক-টামুক শাইস্তের লিগ্যা ভালা না, বুঝলা।'
'জ্বে। খোদেজার বাপ ভাল করেই জানেন, এর সামনে এখন নারকেলের হুক্কা খেলে পরে এটা নিয়ে চরম অপমান করবে।'
'তো মিয়া, দারগারে কয়া দেই তুমার মত আছে।'
খোদেজার বাপের বিভ্রান্ত চোখ, 'কুন বিষয়ে?'
'আরে, তুমি দেখি আজব মানু- আমি কই কি আর দারগা লেহে কি! কইলাম তুমার মাইয়ার বেপারে মিটমাট হয়া গেছে এইডা দারগারে কয়া দি।'
'মাতব্বর সাব, এটাডা আফনে কি কন। এমুন অন্নাই-অনাছার আল্লাও সইব না।'
'হারে, মসিবত হইল। আল্লারে আবার টানাটানি কর ক্যা! গাংয়ের মড়া কুডা দিয়া টাইন্যা লাভ আছে, কও?'
'আমার মাইয়াডা-।'
'দেহো মিয়া, আগুন খাইলে আংড়াই তো লেদাইবা- মাইয়া জন্ম দিছ, ভেজাল হইব এইটা তো নতুন কিছু না। পুলাপাইন মানু, হেগো মাথা গরম হয়া গেছিল, একটা ভুল কইরা ফালাইছে, কি করবা কও। তুমার পুলা হইলে কি করতা, ফালায়া দিতা?'
'মাতবর সাব-!'
'হুনো মিয়া, হেরা ভুল স্বীকার করছে। দরকার হইলে গামছা গলায় দিয়া মাপ চাইব। হেরা টাউনের পুলাপাইন না যে এইটা কইলে কইব, মাতবর সাব, গামছাডা নতুন দেইখ্যা দিয়েন। তুমার মনে আছে নি, হেই বিচারটার কতাডা? গামছা গলাত দিয়া মাপ চাইব এই রায় দিয়া শেষও করতাম পারি নাই, বাড়ির পিছে কুয়াটায় ডুপ্পুস কইরা আওয়াজ হইল। আমরা গিয়া দেখলাম, সব শ্যাষ, মানুডা অফমানে কুয়াতে ঝাপ দিছে। আমি কই কি সোহাগের বাপ, তুমি এইসব ঝামেলাতে যাইও না, হেষে মার্ডার কেইসে পরবা। আল্লার কিরা, যতখন তুমি মাফ না দিবা, হেরা ততখন তুমার ঠ্যাং ধইরা বয়া থাকব, তুমারে কতা দিলাম। লড়ছড় হইলে জুতাত কামুড় দিমু।'
'এইডা আমি পারুম না, মাতবর সাব।'
'দেহো, আমি সুজা-সরল মানু, ছ্যাপ লেপ দিয়া কুনু বিছার করি না। আমি হেরারে কয়া দিমু নে, তুমারে দুই পুলার বাপ দুইডা হালের গরু দিব। না দিলে পুংগির পুতরারে কি করি তুমি দেইখো। এমুন বেদা দিমু, হাগা বাইর হয়া যাইব। আমি এমুন মাতবর না যে, মুইত্যা চিড়া ভিজত না।'

খোদেজার বাপ চুপ করে বসে রইলেন। তিনি পায়ের কাঁপুনি থামাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
'হুনো, দাদার বিয়ার পর তো আর ঢোলের বাড়ি পড়ে নাই। তুমার হালের গরুগুলা দেখছ, ঠ্যাং-এ ঠ্যাং বাড়ি খায়।'
'মাতবর সাব, আমারে মাফ কইরা দেন, আমি পারুম না।'
'দেখ মিয়া, আমার লগে হিলিঝিলি-বদরসদর কথা কইবা না। যা কইবা সাফ সাফ হও। টেটনামি কইরো না।'
'মাতবর সাব, আমি আইনের কাছে বিচার চাই।'
'মিয়ার বেটা হুমন্ধির পুত, বেশি বেলাইনে যাইও না কইলাম। মিজাজ বিলা কইরো না কইলাম। কামডা বালা করতাছ না কইলাম।'
'আমারে মাফ করেন, মাতবর সাব।'
'মিয়া, তুমার কতা হুইনা মনে পড়তাছে, ছাল উডা কুত্তা বাঘা তার নাম। বাপজাইট্যা কোনখানকার! হালা তোরে আমি বেদাও মারি না।'
'মাতবর সাব, আল্লার দুহাই আমারে-।'

মাতবর নামের মানুষটা অপলক তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে মানুষটার স্বরূপ বেরিয়ে এসেছে। এখন যে কেউ অনায়াসে বলে দিতে পারবে এই মানুষটা মধ্যে কেমন একটা অশুভ লুকিয়ে আছে। এর দৃষ্টিতে বিষ, নিঃশ্বাসে বিষ। মানুষটা গলায় বিষ ছড়িয়ে বলল, 'তোর মাইয়্যা হইল পেটলাগানি- পেটলাগানি গো যা হয় তোর মাইয়ার তাই হইছে, আফসোস তোর মাইয়ার লগে আমি করতে পারলাম না।'

খোদেজার বাপ এখান থেকে বেরিয়ে নদির কিনারে উবু হয়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদলেন। দূর থেকে কেউ দেখলে ভাববে মানুষটা প্রাত্যহিক জরুরি কোন কাজ সারছে। তাঁর চোখের জল মিশে যাচ্ছে নদির জলে। ক্ষণে ক্ষণে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন।

মানুষটা সেলিব্রেটি হলে কোন একটা উচুমার্গের কথা চলে আসত নিশ্চয়ই। নদির জলের সঙ্গে, আকাশ-বাতাস টেনে এনে কাব্যিক কোন একটা বাক্য চলে আসত অনায়াসে। কিন্তু খোদেজার মতো সামান্য একটা মেয়ের হতদরিদ্র বাবার এই কষ্টের কথা জানার খুব একটা প্রয়োজন নাই এই ব্যস্ত পৃথিবীর। তাঁর চোখের পানি যেমন অনাদরে মিশে যায় নদির পানিতে, তেমনি তার চাপা আর্তনাদও মিশে যায় বাতাসে।...

Wednesday, April 8, 2009

মুক্তিযুদ্ধে একজন 'অখেতাবধারী' দুলা মিয়া এবং তাঁর সেই মেয়েটি...

১৯৭১ সাল। তৎকালীন ক্যাপ্টেন এস এ ভূইয়া জবানীতে একজন 'অখেতাবধারী', দুলা মিয়ার কথা।
"২৬ বছরের, দুলা মিয়া। সমগ্র মুক্তিবাহিনীতে দুলার মত সাহসী যুবক আর কজন ছিল আমার জানা নেই। তেলিয়াপাড়া যুদ্ধে সে যে সাহসীকতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার তুলনা হয় না। বৃষ্টির মত গোলাবর্ষণেন মধ্যেও এই অকুতোভয় যুবক লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করেনি কিংবা রণক্ষেত্র ছেড়ে দূরে সরে যায়নি।...
...২১ জুন রাতে শত্রুবাহিনী যখন আমাদের উপর প্রচন্ড আক্রমণ চালায় সেই একই সময় তারা কলকলিয়াতেও আক্রমণ চালায় (দুলা মিয়া, ক্যাপ্টেন মোর্শেদের অধীনে যুদ্ধ করছিল)। মোর্শেদের সৈন্যরা শক্রদের সাথে সারারাত যুদ্ধ করে। কিন্তু শত্রুর সংখ্যা বহুগুণ বেশী থাকায় মোর্শেদের দল সেখান থেকে অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

সে সময় দুলা মিয়ার হাতে ছিল একটা হালকা মেশিনগান। সে তার হালকা মেশিনগান দিয়ে অনবরত গুলি ছুঁড়ে যাচ্ছিল এবং শত্রুর অগ্রগতিকে সারারাত ব্যাহত করে রেখেছিল। নি:শঙ্কচিত্তে অপারবিক্রমে সে এক ভয়াবহ শক্রুর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছিল।
অবস্থা বেগতিক দেখে যখন দুলা মিয়ার সংগীরা আত্মরক্ষা করতে পিছু হটছিল তখন দুলা পিছিয়ে না এসে নির্ভয়ে তার হালকা মেশিনগান থেকে গুলি ছুঁড়েই যাচ্ছিল।
তার অসমসাহসীকতা এবং গুলি ছোড়ার ফলে অন্যরা পিছু হটবার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু দুলার বড়ই দুর্ভাগ্য, সে অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে এক মহা বিপদে আটকা পড়ল। শত্রুপক্ষের মেশিনগানের এক ঝাঁক গুলি এসে তাকে বিদ্ধ করে।

... অবশেষে শত্রুরা দুলাকে আহত করতে সক্ষম হয়ে কিছুটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলল।
কিন্তু নিদারুণ আহত অবস্থায়ও দুলা মিয়া গুলি চালানো বন্ধ করেনি। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রাণ দেবে কিন্তু জীবিত অবস্থায় ধরা দেবে না।
...
রাত ভোর হল। বেলা তখন ১১টা। সবাই ফিরে এল কিন্তু দুলা এল না। খবর এল, দুলার পেটে এবং ডান পায়ে কয়েকটি গুলি লেগেছে। সে কাদা-পানির মধ্যে অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে।
...
অনেক চেষ্টায় উদ্ধার করে যখন দুলাকে আমাদের সামনে আনা হল তখনকার দৃশ্য এত করুণ এবং বেদনাদায়ক তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। মুমূর্ষু দুলা বাম হাত দিয়ে তার গুলিবিদ্ধ পেট চেপে ধরে আছে, কেননা ক্ষতস্থান থেকে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসার উপক্রম করছিল। ডান পায়ে গুলি লেগে ছিন্নভিন্ন মাংসগুলো কোনক্রমে পায়ের হাড়ের সংগে লেগে ছিল। আর তার সমস্ত শরীর রক্তে রঞ্জিত।

দুলা একটা গুলিবিদ্ধ বাঘের মত ছটফট করছিল। তখনও সে বাকশক্তি হারায়নি। আমাদের চোখের দিকে চোখ রেখে সে বলল:
'স্যার, আমি আর বাঁচব না, এক্ষুণি মারা যাব। আমার আফসোস রয়ে গেল স্বাধীন বাংলার মাটিতে মরতে পারলাম না। ...আমাকে কথা দিন আমার লাশ স্বাধীন বাংলায় কবর দেবেন, আজ হোক কাল হোক দেশ স্বাধীন হবেই'।

আমাদের সবার চোখে পানি। সে আরও বলল:
'স্যার, পাঞ্জাবী দস্যুরা যখন আমাদের বাঙালীদের নির্মমভাবে, নির্বিচারে হত্যা শুরু করে তখন আমার ৮ বছরের মেয়ে আমাকে কি বলেছিল, জানেন? 'বলেছিল, আব্বা, তুমিও মুক্তিফৌজে যোগ দাও, পাঞ্জাবীদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, দেশকে স্বাধীন কর'।
আমার হাত ধরে দুলা মিয়া বলল, 'স্যার আপনার বাড়ী কুমিল্লায়, আপনি নিশ্চয়ই কুমিল্লার 'শালদা নদী' চেনেন? সেখানে আমার বাড়ী। দয়া করে আমার মেয়েকে এবং কাউকে আমার মৃত্যুর খবর দেবেন না। আমার মৃত্যুর খবর পেলে মেয়েটা আর বাঁচবে না। তবে আমার একটা দাবী, আমার হতভাগিনী মেয়েটিকে আপনি দেখবেন। স্যার, আমার এই একটি কথা ভুলে যাবেন না'।

দুলার এমন মুমূর্ষু অবস্থায় এ্যাম্বুলেন্স আসতে কিছুটা দেরী হবে মনে করে লে: কর্নেল শফিউল্লা (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান) তাকে নিজের জিপে করে আগরতলা পিজি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
দুলার অবস্থা দেখে সেদিন আমার মত অনেকেই ধারণা করেছিল, দুলা আর বাঁচবে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেড় মাস পর দুলা আরোগ্য লাভ করে ফিরে আসে এবং পুনরায় ক্যাপ্টেন মোর্শেদের কোম্পানি যোগদান করল। পরবর্তীকালে অসীম বীরত্বের সংগে দুলা অনেক রণক্ষেত্রে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে।
(বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১০ খন্ড, সশস্ত্র সংগ্রাম) ভাষারীতি প্রায় অবিকল রাখা হয়েছে।
 
* এরপর থেকে কেবল আমার মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় দুলা মিয়ার ওই মেয়েটি এখন কেমন আছে? আমার অপার সৌভাগ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব, দুলা মিয়ার সেই মেয়েকে আমি খুঁজে বের করতে পেরেছিলাম। []
 
**পরে জানা যায় দুলা মিয়াকে কোন খেতাব দেয়া হয়নি! কেন, কোন উত্তর নেই! কেন-কেন-কেন! আমাদের এই প্রজন্মের কাছে কেবল প্রশ্ন আছে উত্তর নেই!
কতটা রক্ত ঝরালে একজন দেশপ্রেমিক হয়? কতটা সাহস দেখালে একজন খেতাব পায়? এমন সাহস দেখাবার পরও একজন খেতাবহীন হয়, কেন?
কেমনতরো ট্রেনিং নিলে একজন সিভিলিয়ান সামরিক মর্যাদা পায়? আর কেমন করেই বা মারা গেলে একজন বীরশ্রেষ্ঠ হয়? বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজনও সিভিলিয়ান নাই, কেন?

***এ সত্য খেতাবের জন্য কেউ বসে থাকেন না। নির্বোধ আমরা কেবল এটা জানি না খেতাব না-দিলে কারও-কারও কিছুই আসে যায় না [২]

সহায়ক সূত্র:
১. দুলা মিয়ার সেই মেয়েটি...http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_05.html
২. একজন ট্যাংকমানব: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_03.html

Tuesday, April 7, 2009

একালের দাদুভাই!

জ্ঞান। শিক্ষা। আদৌ এর কোন বিকল্পই নাই।
প্রয়োজনে জ্ঞানার্জনের জন্য যাও চীন। এটা রূপকার্থে বলা।
আসলে শিক্ষার উপর জোর দেয়ার জন্যই এটা বলা। যখন থেকে এটা চালু হয়েছে তখন তো আর হাওয়াই-যান ছিল না, পয়দলই ভরসা। তো, হেঁটে হেঁটে চীন যাওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না।
এখন অবশ্য চীন যাওয়া বা রাশিয়া যাওয়ার মধ্যে খুব একটা হেরফের নাই। কয়েক ঘন্টার মামলা।
যাক, মূল ভাব একটাই, জ্ঞানার্জন।

দুষ্টরা(!) বললেই হল বুঝি, 'শেখার কোন শেষ নাই, শেখার চেষ্টা বৃথা তাই'। দুষ্টরা আরও বলে, পিলার মজবুত হবে না কেন, এটায় দুইটা 'এল' বর্ণ বুঝি এমনি এমনি দেয়া হয়েছে? বাস রে, অতি যুক্তির কথা।

একজন প্রধানমন্ত্রী নাকি অনেক বছর লাগিয়ে একই কেলাশের পড়া পড়েছিলেন। ইশকুল পার হয়ে কোন এক 'কালেজে' বছরের পর বছর ধরে পড়েই গেছেন। কষ্ট করে পাশ আর দেননি!
একালের ছাত্রনেতারা পিছিয়ে থাকবেন বুঝি? বুকটা ভেঙ্গে আসে, আমাদের দেশের ছাত্রনেতারা পড়তে পড়তে বুড়িয়ে যান। যৌবন ছার, প্রৌঢ়ত্বও বিলিয়ে দেন অবলীলায়।
পত্রিকায় যখন দেখি, একজন ছাত্রনেতা ২৩ বছর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অন্যজন ২২ বছর! বুকটা ভরে যায়। আহা, জ্ঞানার্জনের জন্য কী নিরলস অধ্যবসায়। পড়া, পড়া আর পড়া। তাদের বউ-বাচ্চা মমতায় মাখামাখি হয়ে 'সুপ্রিম-ইশকুলের' ব্যাগ গুছিয়ে দেয়। ওকালের আদু ভাই আজ আর কোথায়? দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যান একালের দাদুভাই!

কী চমৎকারই না ছবিটা! বুকে ঝুলিয়ে রেখেছেন একালের দাদুভাইদের অনুসারিরা। 'আমাদের অভিবাক-হীন করবেন না'।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত ছাত্রদের এহেন কান্ড দেখে নেত্রীর চোখে পানি এসে পড়বে হয়তো বা কিন্তু এই হীন কাজ দেখে আমি বাকহীন!

*ছবিসূত্র: প্রথম আলো

Monday, April 6, 2009

তাঁদের সন্তানেরা যেন থাকে দুধে ভাতে।

(...[অধিকাংশ] ধর্মেরই জোর দাবি তাঁর ধর্মই সেরা! তাঁর ধর্মেই মুক্তি, অন্য ধর্মে নরকবাস! আহারে-আহারে, বেচারা মানব, বেচারা মানবের হয়েছে নাভিশ্বাস...।)

১. "...তুমি কথা না শুনে ভ্রষ্ট হয়ে অন্য দেবতাদের কাছে সেজদা কর ও তাদের খেদমত কর; তবে আজ আমি জ্ঞাত করছি, তোমরা একেবারে বিনষ্ট হবে...।"
(তৌরাত শরীফ: পঞ্চম খন্ড: দ্বিতীয় বিবরণ, ১৭/ ১৮)

২. "...তোমাদের আল্লাহ মাবুদের সেসব হুকুমে যদি কর্ণপাত কর, তবে দোয়া পাবে। আর যদি তোমাদের আল্লাহ মাবুদের হুকুমে কর্ণপাত না কর তাহলে ....অন্য দেবতাদের পশ্চাতে গমণ কর, তবে বদদোয়াপ্রাপ্ত হবে।"
(তৌরাত শরীফ: পঞ্চম খন্ড: দ্বিতীয় বিবরণ, ২৭/ ২৮)
 

---
পাক-কিতাবে লেখা আছে-
১. "শরীয়তের প্রত্যেকটা হুকুম
যে পালন করিয়া না চলে
তাহার উপর অভিশাপ থাকে।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ৯ম খন্ড: গালাতীয়)

২. "...যেন আমার উপর ঈমান আনিবার ফলে তাহারা পাপের ক্ষমা পায়...।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ৫ম খন্ড: প্রেরিত, ২৬:১৬-১৭-১৮)
 

---
১. "অন্য জাতিরা নিজেদের খোঁড়া গর্তে
তলিয়ে যাচ্ছে;
তাদের লুকানো জালে তাদেরই পা
জড়িয়ে গেছে।"
(জবুর শরীফ, ৯/ ১৫)

২. "...হ্যাঁ, তাঁর অভিষেক করা বান্দার প্রতি,
দাউদ ও তার বংশধরদের প্রতি
তিনি চিরকাল তাঁর অটল মহব্বত
দেখান।"
(জবুর শরীফ, ১৮/ ৫০)
 

---
১. "আর কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম চাইলে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না ও সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের দলে।"
 
(কোরান শরীফ, ৩ সুরা আল-ই-ইমরান ৮৫)

২. "...তোমাদের মধ্যে যে-কেউ নিজের ধর্ম থেকে ফিরে যাবে এবং অবিশ্বাসী হয়ে মারা যাবে, তাদের ইহকাল ও পরকালের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে...।"
(কোরান শরীফ, ২ সুরা বাকারা: ২১৭)


---
হিন্দু ধর্মে,
শ্রীমদ্ভগবদগীতা:
১. শ্রীভগবানুবাচ:
"শ্রেয়ান স্বধর্মো বিগুণ: পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়: পরধর্মো ভয়াবহ:।"
(নিজ ধর্ম দোষযুক্ত হইলেও পর ধর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। নিজ ধর্মে মৃত্যুও উত্তম)
[শ্রীমদ্ভগবদগীতা, তৃতীয় অধ্যায়, ৩৫]

২. শ্রীভগবানুবাচ:
"শ্রেয়ান স্বধর্মো বিগুণ: পরধম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ
স্বভাবনিয়তং কর্ম কুর্বন নাপ্নোতি কিল্বিষম।"
(স্বধর্ম দোষযুক্ত হইলেও পরধর্ম হইতে বড়। যে স্বধর্ম পালন করে তাহার কোন পাপ হয় না)
[শ্রীমদ্ভগবদগীতা, অষ্টাদশ অধ্যায়, ৪৭]


---  
 বৌদ্ধ ধর্ম:
১. "...এসো হে মগগো নত্থঞঞো দসসনসস বিসুদ্ধিয়া
এতং হি তুমহে পটিপজ্জথ মারসসেতং পমোহনং।"
(দর্শনবিশুদ্ধির নিমিত্ত এই অষ্টাঙ্গিক মার্গই একমাত্র পথ। তোমরা এই মার্গই অবলম্বন কর...।)
[ধম্মপদ, মগগবগগো ২]

২. "এতং খো সরণং খেমং এতং সরণমুত্তমং
এতং সরণমাগগমম সব্বদুকখা পমুচ্চতি।"
(এসবই শ্রেষ্ট আশ্রয়। কারণ এই জ্ঞান ও শরণ অবলম্বন করে যাবতীয় দুঃখ হতে মুক্তি সম্ভব।)
[ধম্মপদ, বুদ্ধবগগো, ১৪]

---
শিখ ধর্ম:
(গুরু গ্রন্থ সাহিবের প্রথম চরণে উল্লিখিত মূল মন্তর এবং তার নির্দিষ্ট রাগ:
গুরুমুখী: ੴ ਸਤਿ ਨਾਮੁ ਕਰਤਾ ਪੁਰਖੁ ਨਿਰਭਉ ਨਿਰਵੈਰੁ ਅਕਾਲ ਮੂਰਤਿ ਅਜੂਨੀ ਸੈਭੰ ਗੁਰ ਪ੍ਰਸਾਦਿ॥
রূপান্তর: ইক ওঙ্কার সৎ(ই)-নাম(উ) করতা পুরখ(উ) নিরভউ নিরভৈর(উ) অকাল(অ) মূরত(ই) অজূনী সইভন গুর(অ) প্রসাদ(ই).
বাংলা: কেবলমাত্র এক সর্বব্যাপী সত্ত্বা আছে। সত্য হল এঁর নাম! সকল সৃষ্টিতে তিনি বিরাজমান; তাঁর ভয় নেই; তাঁর ঘৃণা নেই; তিনি নামহীন ও সর্বজনীন ও স্বকীয়, জ্ঞান ও শিক্ষার সন্ধান করলে তুমি এঁর সন্ধান পাবে।)

গুরু সাহিব থেকে:
১. গুরুই জ্ঞানের উৎস ও মুক্তি পথের সহায়ক।
২. সত্যের নিঃস্বার্থ সন্ধানে ব্যক্তিকে গুরুর সঙ্গে যুক্ত হতে হয়।
-গুরু নানক
(১.Parrinder, Geoffrey (১৯৭১)। World Religions: From Ancient History to the Present। United States: Hamlyn Publishing Group Limited। পৃষ্ঠা 254। আইএসবিএন 978-0-87196-129-7। 
২.Dhillon, Bikram Singh (জানুয়ারি–জুন ১৯৯৯)। "Who is a Sikh? Definitions of Sikhism" (PDF)। Understanding Sikhism – The Research Journal। 1 (1): 33–36, 27। সংগ্রহের তারিখ ২৯ নভেম্বর ২০১৩।)

Sunday, April 5, 2009

যে-জন পাপ না করেছে...।

ইসলাম ধর্মানুসারিদের দাবি তাঁদের ধর্মই সহিষ্ণুতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে থাকে। এটা মুখে বলার পাশাপাশি কাজে না দেখালে চলবে কেন? যে কিশোরীকে দোররা মারা হলো এটা কী সহিষ্ণুতার চরম পরাকাষ্ঠা?
পর্দা বিষয়ে কোরানের এই আয়াত কী চোখে পড়ে না কাঠ-মুল্লাদের?
"কেউ ছোটখাটো দোষ করলে, তোমার প্রতিপালকের তো ক্ষমার শেষ নেই।...সুতরাং তোমরা নিজেদের বড় পবিত্র ভেবো না; কে সংযমী তা তিনিই ভাল জানেন..."।
(৫৩ সুরা নাজম: ৩২)

আগের পোস্টে বিস্তারিত দিয়েছি, আবার দিলাম এই কারণে: "নিজেদের বড় পবিত্র ভেবো না" এটার কাছাকাছি রূপকার্থে একটা আয়াত আছে ইঞ্জিল শরীফে।
"...এমন সময় আলেম ও ফরাসীরা একজন স্ত্রীলোককে ঈসার নিকট লইয়া আসিলেন। স্ত্রীলোকটি ব্যাভিচারে ধরা পড়িয়াছিল।
...।
আলেম ও ফরাসীরা সেই স্ত্রীলোককে মাঝখানে দাঁড় করাইয়া ঈসাকে বলিলেন, 'হুজুর, এই স্ত্রীলোকটি ব্যাভিচারে ধরা পড়িয়াছে। শরীয়তে মুসা এইরকম স্ত্রীলোকদের পাথর ছুঁড়িয়া মারিয়া ফেলিতে আমাদের হুকুম দিয়েছেন। কিন্তু আপনি কি বলেন'?


তখন ঈসা নীচু হইয়া আংগুল দিয়া মাটিতে লিখিতে লাগিলেন। কিন্তু তাঁহারা যখন কথাটা বারবার তাঁহাকে জিজ্ঞেস করিতে লাগিলেন, তথন তিনি উঠিয়া তাঁহাদের বলিলেন, 'আপনাদের মধ্যে যিনি কোন পাপ করেন নাই তিনিই প্রথমে উহাকে পাথর মারুন'।

ইহার পরে তিনি নীচু হইয়া আবার মাটিতে লিখিতে লাগিলেন।
এই কথা শুনিয়া সেই ধর্ম-নেতাদের মধ্যে বৃদ্ধ লোক হইতে আরম্ভ করিয়া একে এক সকলেই চলিয়া গেলেন। ঈসা কেবল একা রহিলেন আর সেই স্ত্রীলোকটা মাঝখানে দাঁড়াইয়া রহিল।

ঈসা উঠিয়া সেই স্ত্রীলোকটাকে বলিলেন, 'বোন, তাহারা কোথায়? কেহ কি তোমাকে শাস্তির উপযুক্ত মনে করেন নাই?
স্ত্রীলোকটি উত্তর দিল, না হুজুর, কেহই করেন নাই'।
তখন ঈসা বললেন, 'আমিও করি না। আচ্ছা যাও। পাপের জীবন আর কাটাইও না'।"
(ইঞ্জিল শরীফ, ৪র্থ খন্ড: ইউহোন্না ৮:২-১১)

Saturday, April 4, 2009

পরম করুণাময় ভাজা ভাজা হন গরম তেলে



(ইউটিউব থেকে এটা মুছে ফেলা হয়েছে যে যুক্তিতে, কেবল এইজন্য ইউটিউবকে চাবকানো প্রয়োজন। কত বীভৎস ছবি দেখেছি ইউটিউবে! এখন ব্যাটাদের সূক্ষরূচি আহত হয়!)
ভাগ্যিস bbc-তে ছিল।
http://news.bbc.co.uk/1/hi/world/7980877.stm

তালেবান মোল্লারা ৩৪ বার চাবুক মেরেছে এই কিশোরিকে, পর্দা না করে পরপুরূষের সঙ্গে বের হওয়ার অপরাধে। তালেবান মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেন, "ইসলামি আইন অনুযায়ি নারিরা পর্দা করা ব্যতীত বাইরে বেরুতে পারবে না"।


তাই তো! ইসলামি আইন!
কিন্তু কোরানে কী এটা নাই?
"কেউ ছোটখাটো দোষ করলে (পর্দা), তোমার প্রতিপালকের তো ক্ষমার শেষ নেই। ...সুতরাং তোমরা নিজেদের বড় পবিত্র ভেবো না; কে সংযমী তা তিনিই ভাল জানেন..."।

(৫৩ সুরা নাজম: ৩২)

হে নবী, তুমি তোমাদের স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও বিশ্বাসী নারীদের বলো তারা যেন চাদরের কিছু অংশ নিজেদের মুখের উপর
টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরতে কেউ উত্যক্ত করবে না..."।
(৩৩ সুরা আহজাব: ৫৯) 


(এই ছবিসূত্র জানা নাই। কিন্তু এই ছবির, এই পর্দা-পোশাক কোত্থেকে আমদানি হলো এটা গবেষণার বিষয়! কোরানে তো পেলাম না এখন হাদিস ঘেঁটে দেখতে হবে। সহীহ হাদিস ঘাঁটব, না জয়ীফ হাদিস? বড় ধন্ধে আছি!)
...

কোরানকে অবোধ্য করার প্রয়াস তো ছিল না। সেজন্যই আজমি (অ-আরবি) ভাষার বদলে কোরান সহজে বোঝার জন্যই আরবীতে নাযিল হয়েছিল কারণ তৎকালিনদের ভাষা ছিল আরবি:
"আমি তোমার ভাষায় এ (কোরান) সহজ করে দিয়েছি..."।
(১৯ সুরা মরিয়ম: ৯৭)
"কোরান আমি তো আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার"।
(১২ সুরা ইউসুফ: ২)
কোরান অতিসহজে বোধগম্য হওয়ার জন্যই সম্ভবত এমন উদাহরণগুলো দেয়া হয়েছিল:
"তবে কি ওরা লক্ষ করে না, উট কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে?"
(৮৮, সুরা গা'শিয়া: ১৭)
"তোমাদের আরোহনের জন্য ও শোভার জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন
(আনআম) অশ্ব, অশ্বেতর ও গর্দভ..."। 

(১৬ সুরা নাহল: ৫-৮)

উদাহরণটায় যদি উট, অশ্ব, গর্দভের বদলে পান্ডা, নীলতিমি বা শ্বেতভল্লুক দিয়ে দেয়া হত তাহলে আমাদের আরববাসি ভাইদের জন্য তকলিফকর বিষয় হত বৈকি!

ইসলাম ধর্মের পতাকা বহিবার অধিকার কী কেবল সৌদি ভাইজানদের, হালের তালেবানদের? সাম্প্রতিক উদাহরণটা হচ্ছে, এই তালেবান মোল্লাদের কান্ড। এরা রূপকতার ধার ধারেন না। সমস্ত কিছুই আক্ষরিকার্থে গ্রহন করেন।
এদের মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় উট। উটের লেজ ধরে চলে আসে দোররা। মারো দোররা...। পরপুরুষ! যে দোররা মারছে, ধরে রেখেছে, যারা দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে, এরা কী? এরা কী
পরপুরুষ না?

"...তারা জান্নাতেও ঢুকতে পারবে না যে-পর্যন্ত না সুচের ফুটোয় উট ঢুকতে পারে"।
(৭ সুরা আরাফ: ৪০) 

কে জানে, আক্ষরিকার্থে এটাও হয়তো এদের মাথায় ঘুরপাক খাবে, কেমন করে সুচের ভেতর দিয়ে উটকে চালান করা যায়? এজন্যই সম্ভবত এদের জন্যে বোমাতন্ত্রের চর্চার ধারাবাহিকতায় সুচের ছিদ্রে বোমা মারাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। নইলে ধর্ম যায় যে যায়- হায়, সুচের ভেতর দিয়ে উট ঢুকবে কেমন করে?

এই আয়াতগুলো কী আমাদের এই মোল্লাসাহেবদের দৃষ্টিগোচর হয় না?
"তিনি তো সীমাঅতিক্রমকারিকে ভালবাসেন না..."।
(৭ সুরা আরাফ: ৫৫)
"আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারিদেরকে ভালবাসেন না..."।
(২৮ সুরা কাসাস: ৭৭; ৫ সুরা মায়িদা: ৬৪)

হায়রে ধর্ম! কেবল নারিদের বেলায় কত ধরনের যে পর্দা থাকা জরুরি! ফ্রান্সের মত অতিসভ্য দেশে এমনটা ঘটলে তালেবান নামের বদ্ধউম্মাদদের খুব একটা দোষ দেই কেমন করে!

জ্ঞান হচ্ছে, একটা সরলরেখা- ক্রমশ এগিয়ে যাওয়া। অজ্ঞানতা হচ্ছে, বৃত্ত- অনবরত ঘুরপাক খাওয়া। 

পুরনো বিষয়ের চর্বিতচর্বণ করতে চাচ্ছি না। নাস্তিক তার মত থাকুক, আস্তিক আস্তিকের মত । ধর্মে জোর করার তো কিছু নাই!
নইলে আমরা পানি থেকে জল আলাদা করার যন্ত্রপাতি আমদানি করব আর মসজিতে জুতাজুতি করব। অতঃপর এটাকে পাদুকা বলা হবে নাকি জুতা, এ নিয়ে আরেক দফা Beating one another with...

Monday, March 30, 2009

শিশু-পশুটার মুখোমুখি

মুহম্মদ জাফর ইকবাল 'মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস'-এ যুদ্ধের গ্লানি পর্বে উল্লেখ করেছেন, "...মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে বসবাসকারী বিহারীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে থেকে এক ধরনের অমানুষিক নৃশংসতায় বাঙালীদের নির্যাতন নিপীড়ন আর হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল। তাদের নৃশংসতার জবাবে মুক্তিযুদ্ধের আগে, পরে এবং চলাকালে অনেক বিহারীকে হত্যা করা হয়, যার ভেতরে অনেকেই ছিল নারী, শিশু কিংবা নিরপরাধ..."।

জাফর ইকবালকে আমি আবারও কুর্নিশ করি, আমাদের এই অন্ধকার দিকটা তুলে ধরার জন্য। আমরা এই বিষয়গুলো ঠান্ডা মাথায়, সযতনে এড়িয়ে চলি। কিন্তু এই বিষয় নিয়ে আলোচনা, জানাটা অপরাধ না। এটা জ্ঞান। অন্ধকারকে বিস্মৃত হওয়া মানে হচ্ছে ক্রমশ আপাদমস্তক অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গেলে একাধারে হওয়া প্রয়োজন নির্মোহ। ভাবনাটা নির্মেদ। একজন নিরাসক্ত দৃষ্টিতে ইতিহাস লিখবেন, আবেগে ছাপাছাপি হলেই সেটা আর যাই হোক ইতিহাস থাকে না, এক ধরনের ফিকশন হয়ে উঠে। সত্যর গর্ভে ফিকশনের জন্ম! এতে কেবল প্রজন্মকে দিকভ্রষ্টই করা হয়।
এ অন্যায়, ঘোর অন্যায়!




ইতিহাস লিখলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে আমাদের দ্বারা যেসব অন্যায় হয়েছে সেসবও আসতে হবে বৈকি, নইলে তা হবে বিকলাঙ্গ একটা ইতিহাস! ইতিহাসে আবেগ মেশালে সেটা আর যাই হোক ইতিহাস থাকে না।
কোন পরিস্থিতিতে এই অন্যায়গুলো হয়েছিল সেই তর্ক এখন না-হয় নাই করলাম। কিন্তু এই অন্যায়গুলোকে প্রশ্রয় দেয়ার মানে হচ্ছে নিজে একজন অন্যায়ের প্রশিষ্য হওয়া। নইলে পাকসেনার নৃশংসতাকে আমরা ছাড়িয়ে যাব।
বা লেন্দু উপজাতি আর আমাদের মধ্যে খুব একটা তফাৎ থাকবে না। লে
ন্দুদের নিয়ে বিস্তারিত বলি না, বীর জাতি কিন্তু...। কেবল ২টা ছবি দেখে সহজেই অনুমেয়। লেন্দু উপজাতিদের যুদ্ধের নমুনা: যে ২টা ছবি দিচ্ছি এগুলো দুর্বলচিত্ত কারও না দেখাই ভাল। বারণ করি। সতর্কতার জন্য ছবিগুলো পোস্টের একেবারে নীচে দিচ্ছি।

একটা ওয়েব-সাইটে লেখালেখি করার সময়ে বিহারীদের নিয়ে একটা পোস্ট দিয়ে তোপের মুখে পড়েছিলাম। প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র, অতিরিক্ত তীব্র। কেউ কেউ ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমি একটা রাজাকার। এই হয়েছে এক বিপদ, দুম করে কাউকে রাজাকার বলে দেয়া- বয়সটা রাজাকার হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ কিনা এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার আবশ্যকতাও নাই! এবং এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ- তাঁদের বিনীত ভঙ্গিতে বলি, ইচ্ছা হলেই কাউকে রাজাকার বলা যায় না।

বিহারীদের মধ্যে অনেকে এই দেশের পক্ষে ছিলেন, যুদ্ধ করেছেন এমন উদাহরণের অভাব নাই। এখানে উল্লেখ করা যায়, বিহারী, বীর প্রতীক সৈয়দ খানের কথা। তার ভাষায়, 'এই দেশকে হামি কবুল করিয়ে লিয়েছি'। এই মানুষটার কথা এই দেশ মনে রাখেনি। তাঁকে ন্যূনতম অধিকারের ব্যবস্থা করা হয়নি। অথচ এই মানুষটিকে তাঁর পরিবারের সবাই ফেলে চলে গেছে কিন্তু তিনি এই দেশের মায়া কাটাতে পারেনি! কচ্ছপের মতো এখনও এই দেশের মাটি কামড়ে পড়ে আছেন!

আবেগ থাকা ভাল কিন্তু এতটা না যেটা মানুষকে অন্ধ বানিয়ে দেয়! এই রকম অন্ধ হলেই সম্ভবত এমনটা বলা যায়! অনেককে বলতে শুনি, একজন মুক্তিযোদ্ধা কখনও অন্যায় করতে পারেন না। তার মানে কী, মুক্তিযোদ্ধাদের কী আসমানি মানুষ বানিয়ে দেয়া হচ্ছে? মুক্তিযুদ্ধকে আর যাই হোক আসমানি কিতাব বানাবেন না,
মুক্তিযোদ্ধাদের আসমানি মানুষ। দয়া করে আমাদের এই প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়তে দিন, বুঝতে দিন, বুকে আগলে রাখতে দিন, আবেগে থরথর করে কাঁপতে দিন।

*ভিডিও ক্লিপিং, কৃতজ্ঞতা: nbc news




*ছবিঋণ: কঙ্গো, নরখাদক ও পিগমিদের দেশে। মেজর মো: হাবিবুল করিম

Sunday, March 29, 2009

ক্ষমা প্রার্থনা, কিন্তুটা কিন্তু রয়েই যায়।

এই পোস্টটা পড়ে আমার এক সুহৃদ ফোন করে, আমার যে অল্প ঘিলু আছে তা বের করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। আমার ধারণা, ফোন রেখে দিলেও আমি তাঁর কথা স্পষ্ট শুনতে পেতাম! তাঁর আপত্তিটা হচ্ছে, কেন আমি গৃহপালিত বুদ্ধিজীবী লিখলাম? তিনি গড়গড় করে বকে গেলেন ওই অনুষ্ঠানে কারা কারা উপস্থিত ছিলেন।
এর প্রয়োজন ছিল না আদৌ, ফটাফট ফটো তোলার কল্যাণে আমাদের না জেনে উপায় আছে? আমি নিজেও অনেকখানি বিব্রত ছিলাম কারণ এখানে আমার অসম্ভব পছন্দের ২জন মানুষ ছিলেন। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং মুহম্মদ জাফর ইকবাল। বেশ! কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো এঁরা কেউ কেন বইটার দাম নিয়ে আপত্তি তুললেন না।

আমি মনে করি, এই অনুষ্ঠানটা শেরাটনে না করে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তন টাইপের কোথাও করলে আকাশ ভেঙ্গে বজ্র নেমে আসত না। বরঞ্চ এই প্রজন্মের সাধারণরা স্বস্তি বোধ করত। বইটার দাম ১০০ টাকা রাখা কোন বিষয়ই ছিল না। আরও আকর্ষনীয় করা যেত, যারা যারা অনুষ্ঠান থেকে বইটা কিনবে তাদের জন্য বিশেষ ছাড়, এরা ৫০ টাকায় কিনতে পারবে। এমন কত অভিনবত্বই না আনা যেত এই প্রজন্মের হাতে হাত রাখার সদিচ্ছায়।

অবশ্য এইসব প্রকাশনা যদি বৈদেশি মহোদয়দের তালুতে চুমু খাওয়ার জন্য হয়, তাহলে ঠিক আছে। বা নব্য ধনিদের শো-কেসে শোভা বাড়াবার জন্য? অথবা আসমানি কিতাবের মত মখমলের কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে রেখে দেয়া। কালেভদ্রে নামিয়ে সশ্রদ্ধ চুম্বন করা। তাহলে ঠিকই আছে।

জয়তু, আসমানি মুক্তিযুদ্ধ!

Saturday, March 28, 2009

সাপ এবং বেনিয়া, এদের আচরণ কখনও বদলায় না!

এই দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি মায়া কার, বলুন তো? বেনিয়াদের মধ্যে অন্যতম সেল কোম্পানিগুলোর। এদের চোখের জলে কপাল, কপোল দুই-ই ভিজে যায়! সেল কোম্পানিগুলো আক্ষরিক অর্থে এই দেশকে শুষে ছিবড়ে বানিয়ে দিচ্ছে।
 

আহা, এদের একেকটা বিজ্ঞাপন দেখে স্থির থাকি কেমন করে? কীসব টাচি বিজ্ঞাপন! 'কাছাকাছি থাকুন' কাছা খুলে। এতে কাছা খুলে কেউ নগ্ন হলে কী আসে যায! চিকন-চিকন পায়ের মাঝে ঝুলে আছে বিষয়টা খুব একটা দৃষ্টিনন্দন না, এই যা।
ডিজুস, ফান-ডোজ টাইপের অফারগুলো আমাদের কতটা অসভ্য করে তুলছে এর খোঁজ রাখার কী দায় আমাদের! যেখানে কাছা খুলে নগ্ন পশ্চাদদেশ দৃশ্যমান সেখানে এইসব নিয়ে ভাবার অবকাশই বা কই! উদ্ভটসব অফার, এই প্রজন্ম এখন রাত জেগে বিজবিজ করে কথায় কথায় রাত ভোর করে দেয়। মধ্যরাতে অনুমান করে নাম্বার টিপে টিপে অজ্ঞাত কাউকে অনবরত ফোন করা, 'বাই, এইডা কুন জাগা'? দিনে রোগা মুরগির মত ঝিমানো। এইসব নাকি বন্ধুত্ব বাড়াবার চেষ্টা।

এদের সঙ্গে যোগ দেয় আমাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন মিডিয়া- এরা ভাল পয়সা পেলে নিজ মাকেও বিক্রি করে দেবে, আই বেট। গ্রামীন ফোনের শাহেদের করা ললিপপ চোষার বিজ্ঞাপন, ডানোর ছাতা নিয়ে লাফিয়ে পড়ার বিজ্ঞাপন দেখে এ নিয়ে সন্দেহের আর অবকাশ থাকে না।

সম্প্রতি গ্রামীন ফোন এবং প্রথম আলোর উদ্যেগে 'একাত্তরের চিঠি' সংকলন করে বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আজ মোড়ক উম্মোচনের দিন। সাধু, উদ্যোগটা নি:সন্দেহে, অসাধারণ এতে কোন দ্বিমত নাই। মল খসার মত গ্রামীনের টাকা খসছে এও মন্দের ভাল।
কিন্তু ওই যে শিরোনামে বললাম সাপ আর বেনিয়া...।

এদের উদ্দেশ্যটা আসলে মুক্তিযুদ্ধের আবেগের মোড়কে ধান্দাবাজি। বইটার দাম ধরা হয়েছে ২৫০ টাকা। অনুষ্ঠানটা হচ্ছে শেরাটন হোটেলের বলরুমে। এই দেশের তাবড়-তাবড় লোকজনরা আসবেন, নানাপ্রকার চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় দ্বারা আপ্যায়িত হবেন, ফটাফট ছবির পর ছবি তোলা হবে,
বেনিয়াদের গৃহপালিত বুদ্ধিজীবীরা আগুনের বাণী বর্ষন করবেন (কিন্তু বইয়ের দাম কম রাখা বিষয়ে টুঁ-শব্দও করবেন না! লাগবেন বাজী?)।
ব্যস, কেল্লাফতে! এই প্রজন্মের আমরা ছলছল চোখে মনিটর ভিজিয়ে ফেলব, আহা, এদের মনে কী মায়া গো!

কিন্তু এই প্রজন্মের, যারা এই বইটা পড়বেন এদের জন্য কী? কচু-ঘেঁচু! আমাকে বলুন, এই দেশে ক-জনের সামর্থ্য আছে ২৫০ টাকা দিয়ে একটা বই কেনার?
এই বইয়ের দাম যেকোন ভাবেই ১০০ টাকার বেশি হওয়াটা অনুচিত। এরা বলবে আমরা রয়েল সাইজ করেছি। রয়েল সাইজ করেন আর মখমল দিয়ে বাঁধান সেটা অন্য কথা।
জাফর ইকবালের মত মানুষ ২২ পৃষ্ঠার বই ১০ টাকায় বিক্রি করতে পারলে প্রথম আলো ওরফে প্রথমা ১২৭ পৃষ্ঠার বই ২৫০ টাকায় বিক্রি করবে কেন? যেখানে এদের পেছনে আছে গ্রামীন ফোনের বেসুমার টাকা। এদের পক্ষেই সম্ভব ছিল বইটার দাম ৫০ টাকা রেখে একটা সু-উদাহরণ সৃষ্টি করা।

শেরাটনে না করে জাদুঘর মিলনায়তন টাইপের কোথাও করলে কেউ এদের প্রতি রে রে করে তেড়ে আসত বলে মনে হয় না। এই প্রজন্মের জন্য উম্মুক্ত রাখা যেত এই অনুষ্ঠান এবং সঙ্গে একটা ঘোষণা, যারা অনুষ্ঠানে আসবেন তারা ৫০ টাকার বিনিময়ে এই বইটা ক্রয় করতে পারবেন।

জাস্ট একটু খোঁজ নিলেই জানা যাবে এই বইটা বের করার পেছনে কী বিপুল টাকাই না খরচ হয়েছে। আমার ধারণা, সঠিক অংকটা জানা গেলে অনেকে ভিমরি খেয়ে জ্ঞান হারাবেন। অথচ বইটা দাম সাধারণের নাগালে রাখার কোন ভাবনা-দায় এদের নাই।
ওই যে বললাম,
বেনিয়ার ধান্দাবাজি-চালবাজি। খাসলত কোথায় যাবে? সাপ এবং বেনিয়া, এদের বড় কষ্ট- এরা ইচ্ছা করলেই নিজেদের বদলাতে পারে না।

পরিশেষে এও জানতে খুব ইচ্ছা করে, এই চিঠিগুলোর মালিকদের জন্য কি করা হবে? এই চিঠিগুলোর মালিক এখন কে? আর এইসব ব্যাক্তিগত চিঠি জনসমক্ষে প্রকাশ করাটাই বা কতটুকু সমীচীন? এইসব ফাজলামি না করলে ব্যবসাটা খুব একটা ভালো জমছিল না, না?

Friday, March 27, 2009

কুর্নিশ করি, হে স্বপ্নবাজ!

লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাঁর কিছু বিষয়ে আমার মতের মিল নাই, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। তদুপরি মানুষটা আমার অসম্ভব পছন্দের। আগেও লিখেছিলাম, এই পোড়া দেশে আমার অসম্ভব পছন্দের অল্প যে ক-জন মানুষ, তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

মানুষটা একজন স্বপ্নবাজ! এমন স্বপ্নবাজ মানুষের এ দেশে বড় আকাল! এমন স্বপ্নবাজরাই পারেন নিজে এমন একটা স্বপ্ন দেখতে, আমাদেরকে দেখাতে।

একি চাট্টিখানি কথা, একটা বইয়ের ৮ কোটি সংখ্যা ছাপাবার কল্পনা করা! অন্য কেউ হলে আমার অট্টহাসিতে মনিটরের পর্দা কেঁপে উঠত। কিন্তু এই মানুষটা কেবল কল্পনাই করেননি বাস্তবায়িত করার বাস্তবতাও ভেবেছেন। হয়তো ৮ কোটি অতিশয়োক্তি কিন্তু এমন স্বপ্ন না দেখলে স্বপ্নের কাছাকাছি যাওয়া যাবে কেমন করে? ইতিমধ্যে বইটার ২ লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে গেছে। বাজারে এখনও বিপুল চাহিদা! তিনি আরেকটা অসাধারণ কাজ করেছেন ইংরাজিতে অনুবাদ করে। আমার জানামতে, বিদেশিদেরও দুর্নিবার আগ্রহ আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে জানার।

তিনি 'মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস' বইটা ১ ফর্মায় নিয়ে এসেছেন, দামটা একেবারেই হাতের নাগালে। ১০ টাকা! একটা শিশু-কিশোরও তার টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে অনায়াসে কিনতে পারবে। যে কখনও বই কেনেনি সেও কৌতুহলের বশে চট করে কিনে ফেলবে।
আমার অভিজ্ঞতা বলে লোকজন বই পড়ে না কিন্তু পড়ে। লিফলেট, চটি-ক্ষীণবপু টাইপের জিনিসগুলো আগ্রহের সঙ্গে পড়ে।

'ফিডম' বইয়ে (২০০৬)লিখেছিলাম:
"...তোমরা লেখকরাও কম জ্ঞানপাপি না। তুমি দেখবে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বইপত্রের অসম্ভব দাম। সাধারণ পাঠক যে পড়বে তার যো নেই।
প্রকাশক হয়তো বলতে পারেন, আমরা তো আর আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করতে পারব না। এরা ব্যবসায়ি, এদের দোষ দেই না। কিন্তু কারও কোন চেষ্টা নাই!
একজন অসম্ভব জনপ্রিয় লেখকের (
হুমায়ূন আহমেদ) মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা বই আছে। তাঁর কথামতে, আমাদের জানামতে, এই বই প্রকাশের বহু বছর পূর্ব থেকেই তিনি বিস্তর কান্নাকাটি করে আসছিলেন। এমনকি, মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের ওটিতে যাওয়ার পূর্বে ট্রলিতে উপুড় হয়েও চিঁ চিঁ করছিলেন, তাঁর ইচ্ছানুযায়ী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইটা না-লিখে মরে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। কিছুতেই শেষ শ্বাস ত্যাগ করবেন না।
মোড়ক উম্মোচনের দিনও তিনি খুব করে কাঁদলেন, আবেগাক্রান্ত কথা বললেন। অথচ বইটার দাম ৪০০ টাকা।
তুমিই বলো, এই দেশে ক-জন ৪০০ টাকা দিয়ে একাটা বই কিনতে পারে? অথচ এই দেশেই এই লেখক লেখালেখি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর কী কোন দায় নেই? ইচ্ছা করলে তিনি কী পারতেন না, অন্তত সাবসিডি দিয়ে বইটার দাম ১৫০/২০০ টাকা রাখতে?
পত্রিকায় আমি পড়েছি, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অনেকে বইটা কিনতে পারেনি। এক মেয়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে ছলছল চোখে চলে গেছে...।"


বিপুল আগ্রহ থাকার পরও বইটা আমি নিজেই কিনতে পারিনি। ঢাকা আসা-যাওয়াতেই একগাদা টাকা খরচ, তারপর ৪০০ টাকা আলাদা করে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে বৈকি। এমনিতেও ৪০০ টাকার বইটা কেউ কিনলেও তা পড়ার জন্য ধার দিতে চাইবে না। আমিই কী দিতাম?

'ফ্রিডম' বইটা এই প্রজন্মের চোখে মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা। বইটা প্রকাশের পূর্বে প্রকাশকের সঙ্গে আমার মৃদু বাদানুবাদ হয়েছিল। অখ্যাত লেখকদের জন্য এটা খুবই ঝুকিপূর্ণ কাজ! অখ্যাত লেখকদের কাছে প্রকাশক হচ্ছেন দ্বিতীয় ঈশ্বর- ঈশ্বরগোছের কারও সঙ্গে অনুবাদ নিয়ে কথা চলে, বাদানুবাদ চলে না।
তিনি চাচ্ছিলেন, ৪ ফর্মার এই বইটার দাম নিদেনপক্ষে ১০০ টাকা রাখতে। ১০০ টাকার নিচে মুক্তিযুদ্ধের কোন বইয়ের দাম নাকি রাখা হয় না! মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের দাম কম হলে গুরুত্বও নাকি কমে যায়। তাছাড়া তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, মুক্তিযুদ্ধের বই চলে কম, এটা তো প্রেমের উপন্যাস না। কঠিন যুক্তি। না-মেনে উপায় কী তবুও অনেক কস্তাকস্তি করে ৪ ফর্মার এই বইটার দাম ৬০ টাকায় রাখতে প্রকাশককে সম্মত করালাম এই শর্তে, তাঁর আর্থিক ক্ষতি হলে এর দায় আমি নেব। ভাগ্যিস, পাঠকের অযাচিত ভালবাসায় এই দায় আমাকে নিতে হয়নি।

একজন বুদ্ধিজীবীর কথা আজও বিস্মৃত হইনি। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বই-পত্রের উচ্চমূল্য কেন, সাধারণ পাঠক কেমন করে পড়বে?
তিনি মুখ লম্বা করে আলাদা গাম্ভির্য এনে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ বইপত্র তো খেলার বিষয় না, গবেষণার বিষয়।
বেশ যাহোক, তাহলে এটাকে কী আমরা ক্রমশ আসমানি কিতাবের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি। কাপড় মুড়িয়ে উঁচুতে তুলে রাখব। পড়ার প্রয়োজন নাই,কালেভদ্রে নামিয়ে ধুলো মুছে চুমু খাব?

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি অসংখ্য পোস্ট দিয়েছি, অবশ্য অনেক লেখা প্রকাশ হওয়ার কারণে অনেক পোস্ট মুছে ফেলা হয়েছিল তদুপরি এখনও পোস্টের সংখ্যা নেহায়েত কম না। তো, ছাপোষা আমি, লিখতে গিয়ে বড়ো অসহায় বোধ করতাম কারণ প্রয়োজনীয় বইগুলোর এমন আগুন-দাম হাতই দেয়া যেত না। তখন ওয়েবে তথ্যের এমন ছড়াছড়ি ছিল না। পত্রিকা অফিসেও চাকুরি করি না যে হাতের নাগালে প্রয়োজনীয় বই চলে আসবে। থাকি এমন একটা জায়গায় যেখানে একটা পাবলিক লাইব্রেরি পর্যন্ত নাই। বাধ্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বইপত্রের হাজার-হাজার পৃষ্ঠা ফটোকপি করেছি, ১৫ হাজার পৃষ্ঠা! এটাকে কী চৌর্যবৃত্তি বলা চলে, তাহলে আমি একটা আস্ত চোর!

যাগ গে, মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বইয়ের দাম নিয়ে আমার যে তীব্র ক্ষোভ ছিল, জাফর ইকবালের কল্যাণে তা অনেকখানি প্রশমিত হল।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের একটা চমত্কার কবিতা আছে:
"পৃথিবীর সব মানুষ স্বাধীন না।
সব স্বাধীন মানুষ আবার সমান স্বাধীন না।"
তাঁর কবিতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলি,
"পৃথিবীর সব মানুষ স্বপ্নবাজ না।
সব স্বপ্নবাজ আবার জাফর ইকবালের সমান স্বপ্নবাজ না।"
এই প্রজন্ম চট করে কাউকে কুর্নিশ করে না। কিন্তু এমন স্বপ্নবাজকে কুর্নিশ না করে উপায় কী! কুর্নিশ করি হে স্বপ্নবাজ।

*ছবিসূত্র: অজ্ঞাত (গুগল থেকে নেয়া)।
**'মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস' ডাউনলোড করা যাবে এখান থেকে: http://www.liberationwarbd.org/

Saturday, March 21, 2009

বিজ্ঞাপনতরঙ্গ-লেখকরঙ্গ!


 

এই বঙ্গাল দেশে বই ছাপা হয়নি এমন অ-লেখকদের লেখালেখির তেমন গুরুত্ব নাই। বই প্রকাশ না হলে লেখক হওয়ারও যো নাই।
বই প্রকাশের কর্মকান্ডটা আবার ফ্রেবুয়ারির একুশের বইমেলাকে ঘিরে।

লেখক লিখেই খালাস। বই ছাপা-নাড়াচাড়া করেন প্রকাশক মহেদয়গণ। প্রকাশক, এঁরা নাড়েন বলেই একজন নড়ে, এঁরা নাড়ানাড়ি করেন বলেই একজন ক্রমশ লেখক হয়ে উঠে।


রনজিৎ দাসের কবিতার ভাষায় বলতে হয়,
"...শুঁয়োপোকাটির সঙ্গে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি, ঠিক তারই মত
স্থূল ও মন্থর, ও পাখিদের খাদ্য হয়ে, আত্মবিষসহ
যদি তার মতো কোনো অবিশ্বাস্য রূপান্তর পেয়ে যাই শুধু এই লোভে..."। 


একজন অ-লেখক, অ-লেখক থেকে লেখক হওয়ার অবিশ্বাস্য রূপান্তর পাওয়ার লোভে এগিয়ে যান অমর্যাদাসহ, নির্বোধের কাছে।

বইয়ের বিজ্ঞাপন, এটা এক জটিল বিষয়। কখনও কখনও আমি ধন্ধে পড়ে যাই। এক বইমেলায়, এই দেশের ১নং জনপ্রিয় এক লেখকের একটা বইয়ের বিজ্ঞাপন গেল পত্রিকায়, "প্রথম মুদ্রণ শেষ, দ্বিতীয় মুদ্রণের কাজ চলছে"। অসম্ভব জনপ্রিয় এই লেখকের জন্য এটা বিচিত্র কিছু না কিন্তু ওই পত্রিকা পড়েই আমরা জানলাম ওই বই সেদিন পর্যন্ত মেলায় আসেনি। সাংবাদিক বেচারার চাকুরি যায় যায় অবস্থা কারণ ওই লেখকের দবদবার শেষ নাই, তিনি পত্রিকা অফিস কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।
এই নিয়ে কেউ কেউ হাসি গোপন করেছিলেন। হাসাহাসির কিছু ছিল না। এমনটি কী হতে পারে না ছাপাখানা থেকে মেলা পর্যন্ত আসতে আসতে বইয়ের সমস্ত কপি নিঃশেষিত। কেন রে বাপু, রাস্তায় ফুল বিক্রি হতে পারলে বই বিক্রি হতে দোষ কী?

যেসব লেখক মর্যাদাবান, জনপ্রিয় এঁরা তাঁদের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজে দেয়ার কথা ভাবনায়ও আনেন না। কিন্তু বিজ্ঞাপন তো যেতে হবে। বিজ্ঞাপন না দেয়া আর অন্ধকারে কোন রূপসী-খুবসুরাত নারির প্রতি মোহনীয় ভঙ্গিতে হাসার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই।

জনপ্রিয় লেখকদের বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশক মহোদয়ই দেন। উত্কট সমস্যা দেখা দেয়, যখন একই লেখকের কয়েকটি বই প্রকাশিত হয় বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে, তখন। তখন প্রকাশকেরা তাদের খরচ বাঁচাবার জন্য যৌথ চেষ্টায় একই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন। বিষয়টা বলা যত সহজ কাজটা
কিন্তু খুবই কঠিন।
ওই লেখকের বিজ্ঞাপন ছাপা নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে বিস্তর ফোন, মেইল, চিঠি চালাচালি হয়। তারপর তারা বিজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য উম্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেন। বিভিন্ন পত্রিকা ওই দরপত্রে অংশগ্রহন করে। এখানে আবার প্রকাশকরা সূক্ষ কারচুপির আশ্রয় নেন। যে পত্রিকার দর সর্বনিম্ন সে কিন্তু কাজ পায় না। বেছে বেছে ওই পত্রিকাকে কাজ দেয়া হয় যাদের অফিস সেন্ট্রাল এসি, নিদেনপক্ষে কনফারেন্স রুমটা এসি।
কেন? বলছি।

কনফারেন্স রুমে গোলটেবিল আলোচনায় বসেন প্রকাশকবৃন্দ। ওই পত্রিকার সরবরাহকৃত নানাপ্রকার চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় দ্বারা আপ্যায়িত হয়ে আলোচনা শুরু করেন। ধরা যাক, প্রকাশকদের মধ্যে আছেন, ৭ জন। স্থির হলো, এরা ১ কলাম ৮ ইঞ্চি বিজ্ঞাপন দেবেন ওই পত্রিকায়। বিজ্ঞাপন খরচ আসবে কমিশন-টমিশন বাদ দিয়ে ৭ হাজার টাকা। মাথাপিছু ১ হাজার করে। এদের কত্তো টাকা বেঁচে গেল!

গোল বাঁধবে লেখকের ছবি নিয়ে, কোন ছবিটা যাবে? যেটায় চোখ ঢুলুঢুলু সেটা, নাকি যেটায় চোখ ঝকঝকে, ওইটা? নাকি...? কোন ছবিটা যাবে এটা নিয়ে লটারি হবে। এখানেও সূক্ষ কারচুপি (এটা বঙ্গালদেশে নাহক কিন্তু গা সওয়া একটা বিষয়)। এক প্রকাশকের আবার ঢুলুঢুলু-ঝকঝকে চোখের কোন ছবিটাই পছন্দ না, তার পছন্দ অন্যটা। যেটায় হাসিটা নাগরালি- মোনালিসা টাইপের, সেটা।
তিনি আবার প্রকাশক হিসাবে অন্যদের চেয়ে খানিকটা কম আলোচিত তাই দায়ে পড়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া। নাম লেখার দায়িত্বে তিনি ছিলেন বিধায় সবার অলক্ষ্যে লটারির ৭ জনের জায়গায় প্রত্যেকটাতেই নিজের নাম লিখে রাখলেন।


লটারির কাগজ টানার জন্য সম্পাদক সাহেবকে ডেকে আনা হলো (তিনি তখন আবার জরুরি মিটিং-এ সেনানিবাসে ছিলেন জেনারেলদের সঙ্গে)। তিনি ঝড়ের গতিতে ছুটে এসে বিমলানন্দে যে কাগজটি উঠালেন সেটায় ওই প্রকাশকেরই নাম লেখা। পত্রিকায় পুরুষ মোনালিসা মার্কা ছবির বিজ্ঞাপনটাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
এই বিজ্ঞাপনে কোন প্রকাশকের বই আগে থাকবে কারটা পরে এই নিয়েও ঘন্ট-জট বাঁধল। পত্রিকা অফিস থেকে 'চিন্তাজট' নামের এক ধাঁধার মাধ্যমে এই সমস্যারও সমাধান হলো। ফাঁকতালে পত্রিকাটি পরদিনের চিন্তাজটের আইডিয়াটাও এখান থেকে পেয়ে গেল।

যাইহোক, তখনও পত্রিকা অফিস ছেড়ে কিন্তু প্রকাশকরা যাননি। বিজ্ঞাপনটা যেন প্রথমেই চোখে পড়ে (এর আবার অনেক কায়দা-কানুন আছে। পাঠক পত্রিকাটা হাতে নিলে পত্রিকার ভাঁজ কোন দিকে থাকবে এটাও সরু চোখে লক্ষ রাখা হয়) এমন একটা জায়গায় ছাপাবার জন্য পেস্টিং পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। রাত গড়ায়। গভীর রাতে প্রকাশকরা বাড়ি ফিরে তৃপ্তির নি:শ্বাস ফেলে ঘুমাতে যান, ছিনতাইকারিদের চোখ এড়িয়ে।

জনপ্রিয় লেখকদের বই ছাপাবার অনেক হ্যাপা সহ্য করতে হয় বেচারা প্রকাশকদের...।
 

*ছবি সূত্র: প্রথম আলো
** পোস্টের ছবিটার তেমন গুরুত্ব নাই। উদাহরণের জন্য নেয়া।

Friday, March 20, 2009

মমতায় ছাপাছাপি নিষ্প্রভ চোখ।

 
­আমরা যারা দেশে থাকি, আমাদের অনেকের বদ্ধমূল ধারণা থাকে, যারা প্রবাসে থাকেন তাঁদের চেয়ে সুখি আর কেউ এ গ্রহে নাই! আমরা মুখ ফুটে বলি না কিন্তু মনে গোপন ইচ্ছা লালন করি, এঁরা যেন আজীবন প্রবাসেই থাকেন। রিয়াল-ডলার-পাউন্ড হালের ইউরো স্রোতের মত দেশে পাঠাতে থাকবেন। দেশে ফেরার আবশ্যকতা কী!

খোদা না খাস্তা, কেউ যদি বলে বসেন দেশে ফেরার কথা চিন্তা করছি, নিমিষেই আমাদের মুখ শুকিয়ে আসে। আমরা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা শুরু করি, 'মাথা খারাপ হইছে তোমার। দেশে আইসা কী করবা? এইটা একটা থাকার জায়গা হইলো! তোমাগো দেশের কুত্তা-বিলাইও এই দেশে মুতব না'।
আহ, তোমাগো দেশ...।

আমরা যারা দেশে থাকি, সাদা-সাদা গরম-গরম ভাত দেখে আমাদের গা গুলায়। প্রবাসি একজনের কেবল ধোঁয়াওঠা ভাতের কল্পনা করেই চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। পাগল!
আহা, পানি চলে আসলেই হলো বুঝি, পুরুষ মানুষদের কী কাঁদতে আছে! তাই বলে কী কান্না থামে শা..., ঠিক সময়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারাটাই হলো আসল কথা। মরদ বটে একটা!

দেশে মার শরিরের গন্ধে আমাদের দমবন্ধ ভাব হয়। কখনও কখনও অমানুষের মত অস্ফুটে মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, 'তুমি যে কী মা, শরিরে পেয়াজ-রসুনের গন্ধ। ওয়াক'!
মা অজান্তে শ্বাস চাপেন। তাঁর আর্দ্র চোখে আটকে থাকে গোটা সূর্যটা, পলক ফেললেই উপচে পড়বে। তাই কী তিনি পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকেন?

প্রবাসিরা গায়ে কত কিছু মাখেন, সুগন্ধের মৌতাত হপ্তাহ ছাড়িয়ে যায় কিন্তু কী এক বিচিত্র কারণে মার গায়ের গন্ধের জন্য পাগল হয়ে থাকেন। পাগলসব!

একবার এক ঈদে প্রবাসি এক বন্ধুর অর্থহীন মেইল পেলাম, 'খাওয়াতে পারিস এক চামচ সেমাই? আল্লার কসম তোকে ১০০০ হাজার ইউরো দেব'। এ উম্মাদ, বদ্ধউম্মাদ!
দেখো দিকি কান্ড, এ আবার আল্লার কসম খায়। ওরে ব্যাটা শুয়োরখেকো! তুই যে হরদম পর্ক-চপ খাস, গলায় শুয়োর আটকে গেলে গলা ভেজাবার ছলে ভদকা গিলিস এটা বুঝি জানতে বাকি আছে আমাদের?
তবে এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না, আমার চোখ কী খানিকটা চকচক করেনি? ইশরে, ১০০০ ইউরো! এক চামুচ সেমাইয়ের জন্য ১০০০ ইউরো?


মুদ্রার অন্য পিঠ নেই যে এমন না। আমার এক স্বজনকে তার মা একটা কিছু (বলার মত কিছু না, নারকেলের নাড়ু) দেয়ার কথা বলতেই সু-পুত্র হড়বড় করে বলে উঠেন, 'আরে না, দরকার নাই-দরকার নাই'।
তবুও তার মা চিঁ চিঁ করে বলেন, 'না মানে...তোর লাইগা...'।
'আরে, জ্যাকসন হাইটসে সব পাওয়া যায়। সব-সব'।
 

আমি গোপনে শ্বাস ফেলি। মুখে বলি, বিলক্ষণ। আজকাল বাইরের শপিং-মলগুলোয় এইসবও বিক্রি হওয়া শুরু হয়েছে। বেশ-বেশ! কী জানি, হবে হয়তো বা! সব পাওয়া যায়? বাহ, বেশ তো!
এইসব তাহলে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে? বর্ষায় কাগজের নৌকা ভাসানো, হচ্ছে? নিজের হাতে লাগানো সেই গাছটা, পাওয়া যাচ্ছে? পুকুরপাড়ে বসার সেই নোংরা জায়গাটা, অবশেষে এটাও? বাতিল হয়ে যাওয়া সেইসব মুখ, সত্যি?
আহারে, সেই যে মুখটা কেবল অনর্থক বকেই মরত, খোকা এইটা খাস নে, ওইটা খাস নে। রোদে ঘুরতাছিস ক্যান রে, বান্দর! চামড়াডা পুইড়া কেমুন ছালি-ছালি হইছে। তোর শইলের রঙ দেইখা কাউয়াও হাসব। পাগলা, না-খায়া যাস নে কইলাম, গেলে তুই কিন্তুক আমার মাথা খাবি। তুই এমন হইলি ক্যান রে? তুই না, তুই না, তুই একটা পাগলু।


অনেক আগে লেখাটা একটা কম্যুনিটি ব্লগিংসাইটে দিয়েছিলাম [১]। ওখানে তখন শুভ নামে লেখালেখি করতাম, ওখানকার ভাষায় ব্লগিং করতাম। মার কাছে লেখাটায় কারও কারও মন্তব্য পড়ে মনটা বিষণ্ন হয়ে গিয়েছিল। একজন সহ-ব্লগার লিখেছিলেন, "...শুভ, দাঁড়ান, চোখটা মুছে নেই..."।
এটা আসলে লেখার গুণে না। দেশের বাইরে থাকলে মনটা থাকে অসম্ভব তরল। কিন্তু একজন, আলাদা করে মেইল করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, "ওপেন ফোরামে এটা লিখতে চাইনি। বলতে পারেন আমি কার কাছে ফিরব, কেন ফিরব"?
একেকজনের একেক রকম জীবন-গল্প। আমার বলার কিছু ছিল না। এই পোস্টের কিছু ভাবনা তাঁর কাছ থেকে ধার করা। ওই দু:খী মানুষটাকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।


*ছবিস্বত্ব: আলী মাহমেদ

সহায়ক সূত্র:
১. মার কাছে ফেরা...: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_9329.html

Wednesday, March 18, 2009

পানি আর জল, কী পার্থক্য!

প্রথম ছবিটা হচ্ছে প্রথম আলোর। ২০০৯ সাল, মার্চের।
দ্বিতীয় ছবিটা হচ্ছে, ভোরের কাগজের। ১৯৯২ সাল, মার্চের।

ইতিমধ্যে ১৭ বছর চলে গেছে। কাগজ হয়েছে চকচকে! পত্রিকার সার্কুলেশনের পাশাপাশি বেড়েছে জেল্লা। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খবরের দৈন্যতা!
তত্কালিন ভোরের কাগজ এবং আজকের প্রথম আলোর সম্পাদক মহোদয় একই ব্যক্তি। জনাব মতিউর রহমান। তাই কী ভাবনাটাও একই!
তাই তো, এইসব খবর ছাপিয়ে
পত্রিকায় স্পেস কোথায়!

এই দুইটা ছবিই প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল। প্রথম পাতায় ছাপাবার মত খবরই বটে! অবশ্য দুইটার মূল খবর দুই রকম, একটা হচ্ছে অন্যকে অপদস্ত করার জন্য, অন্যটা বৃষ্টির জন্য।
কিন্তু শিরোনাম এবং ঘটনা একই। বিয়েটা ব্যাঙের! ব্যাঙ বিবাহ করেছে। অবশ্য বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। এই যেমন, মোহরানা কত ছিল? ব্যাঙ ভাইয়া কী পরে বিবাহ করেছিলেন, শেরোয়ানি নাকি লুঙ্গি? বাসর রাতে কোন কোম্পানির জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রি ব্যবহার করেছিলেন? বা ব্যাঙ ভাইয়া ব্যাঙানি ভাবিকে বাসররাতে কী বলে সম্বোধন করেছিলেন? ইত্যাদি ইত্যাদি...।
আচ্ছা, বর্ষাকালে যেন বৃষ্টি না হয় এ জন্য আমি সাপের বিবাহ দেব। এই নিউজটা কী মতিউর রহমান ছাপাবেন? শিরোনামটা হবে 'সাপের বিবাহ, যৌতুকবিহীন'...। সম্মতি থাকলে বলেন, সাপ ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলি। যন্ত্রণার কী শেষ আছে, এরপর কথা বলতে হবে মহিলা সাপের সঙ্গে...।

ব্রিটেনের পত্রিকা 'দি সান'। ৯২ সালেই এর প্রচারসংখ্যা ছিল ৩৫ লক্ষ। এই পত্রিকাটি এক অভিনব সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। এক মেধাবি গ্রাজুয়েটকে ১ দিনের জন্য ওই পত্রিকার সম্পাদক বানানো হয়েছিল। ওইদিন ১ দিনের সম্পাদকের নির্দেশনায় পত্রিকাটি বের হয়। 'দি সান' পত্রিকার স্বত্বাধিকারি প্রতিষ্ঠান নিউজ ইন্টারন্যাশনালের একজন নির্বাহি গাস ফিশার বলেছিলেন, 'দি সানের বার্তাকক্ষে নতুন সম্পাদকের ভাবনা, দক্ষতা থেকে আমরা শিখতে চাইছি'।

দি সানের মত আমাদের মতিউর রহমান সাহেবও এমন একটা পদ্ধতি প্রয়োগ করে শিখতে চাইতে পারেন। তবে তিনি যদি পণ করে থাকেন, তাঁর শেখার আর কিছু নাই তাহলে আমাদেরও বলার কিছু নাই।
এরা এখন সব বদলে দেয়ার পণ করেছেন। জনে-জনে ক্ষণে-ক্ষণে শপথ করাচ্ছেন। কিন্তু নিজেদের শপথের কথা ভুলেও উচ্চারণ করছেন না। এদের ধারণা এদের সম্ভবত বদলাবার কিছু নাই- সরাসরি আকাশ থেকে নেবে এসেছেন! বদলে দেয়ার কথা বলে যত কস্তাকস্তি করা হোক কেউ কেউ কখনও বদলায় না। বদলাতে পারে না! আসলে কারও কারও বদলাবার সদিচ্ছাটাই থাকে না!

Sunday, March 15, 2009

ছাগলের সঙ্গে রশি ফ্রি- আগুনের সঙ্গে শো ফ্রি!

৩০০ যাত্রি নিয়ে লঞ্চ ডুবে গেছে। সরকার বাহাদুরের পক্ষে তখনকার নৌ পরিবহন মন্ত্রী বাহাদুর ঘোষণা করেছিলেন, উদ্ধার কাজ পরিত্যাক্ত। স্বজনরা তাদের লাশটিও পাননি।
মন্ত্রী বাহাদুর এসি অফিসে বসেও দরদর করে ঘামছিলেন বলেই সম্ভবত চেয়ারের পেছনে তোয়ালে রেখেছিলেন, টিভিতে তোয়ালেসহ-ই ওনাকে দেখা যাচ্ছিল। (চেয়ারের পেছনে তোয়ালে থাকার নিয়ম আছে)

সবেক সামরিক অফিসার এই মন্ত্রী বাহাদুরের আবার জোশ বেশি তিনি মিডিয়ার কাছে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, 'আমি ১২ বছর পর্যন্ত মার দুধ খেয়েছি, আমার ছেলেও ৬ বছর বয়স পর্যন্ত মার দুধ খেয়েছে'।
এমন জোশবান মানুষের কাছ থেকে আমরা 'জোশিলা' সিদ্ধান্ত আশা করতেই পারি। তিনি তরল থেকে তরলায়িত হয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, লঞ্চ ডুবিতে যারা মারা গেছে তারা না, তাদের পরিবার একটা করে ছাগল পাবে। এটা মিডিয়ায় এসেছিল কিন্তু যেটা আসেনি সেটা হচ্ছে ছাগলের সঙ্গে রশিও দেয়া হবে এই গোপনাঙ্গসম তথ্য!

সেসব পুরনো কাহিনী। আমাদের নতুন কাহিনী প্রয়োজন। আবারও বৈশাখ-বর্ষা আসছে। আবারও লঞ্চ ডুববে। স্বজনরা আবারও লাশের জন্য নদীর দিকে, আকাশপানে তাকিয়ে থাকবেন। না থাকার কোন কারণ নাই।
শুনলে ভয়ে গা কাঁপে আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থে উদ্ধারকারি কোন জাহাজ নাই। 'রুস্তম' এবং 'হামজা' নামের যে ২টা উদ্ধারকারি জাহাজ আছে এই বুড়া হাবড়াদের দিন শেষ। একটাকে টেনে নিয়ে যেতে হয়। অন্যটাকে ঠেলে।
আরও কথা আছে, এদের ক্ষমতা ১২০ মেট্রিক টন অথচ এখন যেসব জাহাজ চলাচল করে অধিকাংশই ১২০ মে. টনের উপরে।
এবার সবচাইতে ভয়ংকর তথ্য এই রুস্তম এবং হামজার উদ্ধার কাজে আসা যাওয়াসহ তেলের খরচ দিতে হয়, ডুবন্ত জাহাজের মালিককে। ফল যা হওয়ার তাই হয়, কার দায় পড়েছে শস্তা লাশের জন্য জাহাজ পানি থেকে উঠাবার।

আজও উদ্ধারকারি জাহাজ কেনা হয়নি!
এখন শুনতে পাই আরও ফ্রিগেট-ট্রিগেট টাইপের জিনিসপত্র, মিগ কেনা হবে। আগামিতেও জাহাজ ডুববে, লাশ মিসিং হবে, ছাগলের বদলে কী পাওয়া যাবে সেটাই দেখার বিষয়। এবার সম্ভব ছাগলের সঙ্গে রশি ফ্রি এটা আগেভাগেই প্রকাশ্যে ঘোষণায় আসবে। কারণ এই তথ্য আমরা ওয়েবেই পেয়ে যাব- ডিজিটাল তথ্য!

কাল বসুন্ধরা সিটিতে আগুন লাগল। নিমিষেই পিপড়ার মত লাখ-লাখ মানুষ চলে এসেছে। বসুন্ধরার ২৫০০ দোকানের গড়ে ৫ জন করে ধরলে ১২,৫০০ উদ্বিগ্ন মানুষ বাদ দিলে, অধিকাংশই এসেছে তামাশা দেখতে। এমন তামাশা তো আর হররোজ হয় না। আগুনের লেলিহান শিখার লাল রঙটার অন্য ভুবনের এক আকর্ষন আছে। অনেকের ভেতরের পশুটা হা-হুতাশ করেছে, কেবল ৭ তলা পুড়েই হাল ছেড়ে দিল! লাশ মাত্র ৭!
ওয়াও, গ্রেট শো!

আমার মত হতভাগা যারা ঢাকায় থাকে না এদের ভরসা ইলেকট্রনিক মিডিয়া- আমার ভেতরের পশুটাই বা বাদ যাবে কেন? কোন মিডিয়া কতটা আকর্ষনীয় করে কাভার করতে পারে, চ্যানেলের পর চ্যানেল বদলাও। চ্যানেলগুলো পারলে এটাও জেনে আমাদেরকে জানিয়ে দেয়, আচ্ছা, শেষ নি:শ্বাসটা যখন ত্যাগ করলেন তখন আপনার কেমন লাগছিল?
মিডিয়ার জন্য বেশ জাঁকালো একটা খবর হলে, মিডিয়ার রগরগে খবর না থাকলে চলবে কেন বলুন? আমরা প্রায়শ বিস্মৃত হওয়ার চেষ্টা করি, তথ্যও একটা পণ্য। ভয়াবহ লাভজনক পণ্য! স্বীকার করতে অহেতুক লজ্জার কিছু নেই!

দমকল বাহিনীর ব্রন্টো স্কাই লিফট ১৪ তলার পর যাওয়ার সাধ্য নাই অথচ ভবনটি ২১ তলার। আমার জানামতে ২১ তলার চেয়েও উঁচু ভবন ঢাকায় অনেকগুলো। ২ বছর আগে এনটিভিতে আগুন লাগার সময় যে হাইড্রলিক ল্যাডার ছিল তা ১১ তলা পর্যন্ত যেতে পারত। এই ২ বছরে এই একটি ল্যাডারই যোগ হয়েছে। ২ বছরে আমরা ৩ তলা পর্যন্ত এগুতে পেরেছি!
আমি এ সম্বন্ধে বিশেষ জানি না। কেবল ল্যাডারই কেন? হেলিকপ্টার থেকে অগ্নি নির্বাপক পাউডার বা ফোম ছিটিয়ে দেয়ার কোন না কোন পদ্ধতি নিশ্চয়ই আছে। বা ফাঁক-ফোকর দিয়ে মিসাইল, হারপুন টাইপের কিছু দিয়ে অগ্নি নির্বাপক সামগ্রী ছুড়ে দেয়া? চীন ৯২ সাল থেকেই বজ্রবৃষ্টিকে লক্ষভ্রষ্ট করতে রকেট ছুড়ছে।

সরকারের সদিচ্ছার কথা বাদ দিলেও ব্যক্তি মালিকানায়ও তো এইসব হাইটেক সামগ্রী এনে বানিজ্যিক ভাবে হাই-রাইজ বিল্ডিং বা এই ধরনের শপিং মলের অগ্নি নির্বাপন করা যেতে পারে। যমুনা ফিউচার পার্কের মত অথর্ব একটা কাঠামো বানানো হবে- কারখানা করা হবে কিন্তু কাঁচামালের কথা মাথায় না থাকলে মাথা থেকে লাভ কী?
আমরা এমন আরেকটা শোর জন্য অপেক্ষা করব।
গ্রেটেস্ট শো!

তো, তদন্ত কমিটি হবে, কোন এক মন্ত্রী সাহেব চেয়ারের পেছনে তোয়ালে ঝুলিয়ে বলবেন, আগামিতে যেন এমন দুর্ঘটনা না ঘটে...।

ছবিঋণ:
উদ্ধারকাজ পরিত্যক্ত: মো: ইব্রাহিম (পত্রিকার নাম পাওয়া যায়নি)

বসুন্ধরা সিটি: পল্লব মোহাইমেন, প্রথম আলো