Thursday, April 9, 2009

খোদেজা: ৩

খোদেজা: ২

খোদেজার বাপ ভয় চেপে আছেন। মাতব্বর তাকে কেন ডেকেছেন এটা বুঝতে তার বাকি নেই। এই মাতব্বর পারে না এমন কোন কাজ নেই। থানা নাকি এ পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়- দিনকে রাত, রাতকে দিন করতে এর জুড়ি নেই।
ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত খোদেজার বাপ গামছা দিয়ে মুখ মুছলেন। তিনি আকুল হয়ে ভাবছেন, কী এমন অন্যায় করলেন যে খোদা তাকে এমন শাস্তি দিলেন। নাহয় নামাযটা সময় করে পড়তে পারেন না কিন্তু এই একটা অন্যায়ের জন্য খোদা তাকে শাস্তি না দিয়ে এইটুকুন দুধের বাচ্চাটাকে কেন দিলেন?

পা টেনে টেনে হাঁটছেন। সাঁকোটা পার হতে গিয়ে খরস্রোতা নদিটির দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। খুব ইচ্ছা করছিল লাফিয়ে পড়তে। এভাবে চলে গেলে যে খুব গোনাহ হয় এটা ওর জানা নেই এমন না। কিন্তু এই মুহূর্তে সোয়াব-গোনাহ নিয়ে ওর বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই।
কেবল মাথায় যেটা ঘুরছে, আম্মাজানরে যারা এইভাবে কষ্ট দিয়েছে তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে, ভয়াবহ শাস্তি। আচ্ছা, দাঁ দিয়ে এদের দুইজনকে দুইটা কোপ দিলে কেমন হয়? নাহ, আমি এটা করব না। আইন এদের শাস্তি দিবে, দুনিয়ার অন্য বাপ-মাদের এটা জানা দরকার। আইন শাস্তি না দিলে জমিতে দেয়া বিষ খেতে তার হাত একটুও কাঁপবে না।

মাতব্বর দবির মিয়াকে বাড়িতেই পেলেন। মাতব্বর দবির মিয়া খুব খাতির করার ভান করল। এই গ্রামে চেয়ার আছে কেবল অল্প কটা বাড়িতে। জোর করে চেয়ারের আয়োজন করল। কড়িকাঠে বাঁধা চেয়ার, দড়ির গিট ছেড়ে বেশ কায়দা-কানুন করে নামানো হল। খোদেজার বাপ যতই না না করেন কিন্তু কে শোনে কার কথা!
'আরে মিয়া, তুমি হইলা গিয়া মেহুমান-কুটুম্ব। তুমার একটা ইজ্জত আছে না, এইটা তুমি কি কইলা মিয়া।'

খোদেজার বাপ ভাল করেই জানেন, এইসব কথার আসলে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই। অন্য কোন সময় তিনি মাতব্বরের বাসায় চেয়ারে বসতে গেলে মাতব্বর লাথি মেরে চেয়ার ফেলে দিত।
খোদেজার বাপ জড়োসড়ো হয়ে চেয়ারে বসলেন। অভ্যাস নেই বলে বসে ঠিক জুত করতে পারছেন না।
'মিয়া তামুক খাইবানি একটু?'
'জ্বে না-জ্বে না।'
'না খাইলেই ভালা, তামুক-টামুক শাইস্তের লিগ্যা ভালা না, বুঝলা।'
'জ্বে। খোদেজার বাপ ভাল করেই জানেন, এর সামনে এখন নারকেলের হুক্কা খেলে পরে এটা নিয়ে চরম অপমান করবে।'
'তো মিয়া, দারগারে কয়া দেই তুমার মত আছে।'
খোদেজার বাপের বিভ্রান্ত চোখ, 'কুন বিষয়ে?'
'আরে, তুমি দেখি আজব মানু- আমি কই কি আর দারগা লেহে কি! কইলাম তুমার মাইয়ার বেপারে মিটমাট হয়া গেছে এইডা দারগারে কয়া দি।'
'মাতব্বর সাব, এটাডা আফনে কি কন। এমুন অন্নাই-অনাছার আল্লাও সইব না।'
'হারে, মসিবত হইল। আল্লারে আবার টানাটানি কর ক্যা! গাংয়ের মড়া কুডা দিয়া টাইন্যা লাভ আছে, কও?'
'আমার মাইয়াডা-।'
'দেহো মিয়া, আগুন খাইলে আংড়াই তো লেদাইবা- মাইয়া জন্ম দিছ, ভেজাল হইব এইটা তো নতুন কিছু না। পুলাপাইন মানু, হেগো মাথা গরম হয়া গেছিল, একটা ভুল কইরা ফালাইছে, কি করবা কও। তুমার পুলা হইলে কি করতা, ফালায়া দিতা?'
'মাতবর সাব-!'
'হুনো মিয়া, হেরা ভুল স্বীকার করছে। দরকার হইলে গামছা গলায় দিয়া মাপ চাইব। হেরা টাউনের পুলাপাইন না যে এইটা কইলে কইব, মাতবর সাব, গামছাডা নতুন দেইখ্যা দিয়েন। তুমার মনে আছে নি, হেই বিচারটার কতাডা? গামছা গলাত দিয়া মাপ চাইব এই রায় দিয়া শেষও করতাম পারি নাই, বাড়ির পিছে কুয়াটায় ডুপ্পুস কইরা আওয়াজ হইল। আমরা গিয়া দেখলাম, সব শ্যাষ, মানুডা অফমানে কুয়াতে ঝাপ দিছে। আমি কই কি সোহাগের বাপ, তুমি এইসব ঝামেলাতে যাইও না, হেষে মার্ডার কেইসে পরবা। আল্লার কিরা, যতখন তুমি মাফ না দিবা, হেরা ততখন তুমার ঠ্যাং ধইরা বয়া থাকব, তুমারে কতা দিলাম। লড়ছড় হইলে জুতাত কামুড় দিমু।'
'এইডা আমি পারুম না, মাতবর সাব।'
'দেহো, আমি সুজা-সরল মানু, ছ্যাপ লেপ দিয়া কুনু বিছার করি না। আমি হেরারে কয়া দিমু নে, তুমারে দুই পুলার বাপ দুইডা হালের গরু দিব। না দিলে পুংগির পুতরারে কি করি তুমি দেইখো। এমুন বেদা দিমু, হাগা বাইর হয়া যাইব। আমি এমুন মাতবর না যে, মুইত্যা চিড়া ভিজত না।'

খোদেজার বাপ চুপ করে বসে রইলেন। তিনি পায়ের কাঁপুনি থামাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
'হুনো, দাদার বিয়ার পর তো আর ঢোলের বাড়ি পড়ে নাই। তুমার হালের গরুগুলা দেখছ, ঠ্যাং-এ ঠ্যাং বাড়ি খায়।'
'মাতবর সাব, আমারে মাফ কইরা দেন, আমি পারুম না।'
'দেখ মিয়া, আমার লগে হিলিঝিলি-বদরসদর কথা কইবা না। যা কইবা সাফ সাফ হও। টেটনামি কইরো না।'
'মাতবর সাব, আমি আইনের কাছে বিচার চাই।'
'মিয়ার বেটা হুমন্ধির পুত, বেশি বেলাইনে যাইও না কইলাম। মিজাজ বিলা কইরো না কইলাম। কামডা বালা করতাছ না কইলাম।'
'আমারে মাফ করেন, মাতবর সাব।'
'মিয়া, তুমার কতা হুইনা মনে পড়তাছে, ছাল উডা কুত্তা বাঘা তার নাম। বাপজাইট্যা কোনখানকার! হালা তোরে আমি বেদাও মারি না।'
'মাতবর সাব, আল্লার দুহাই আমারে-।'

মাতবর নামের মানুষটা অপলক তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে মানুষটার স্বরূপ বেরিয়ে এসেছে। এখন যে কেউ অনায়াসে বলে দিতে পারবে এই মানুষটা মধ্যে কেমন একটা অশুভ লুকিয়ে আছে। এর দৃষ্টিতে বিষ, নিঃশ্বাসে বিষ। মানুষটা গলায় বিষ ছড়িয়ে বলল, 'তোর মাইয়্যা হইল পেটলাগানি- পেটলাগানি গো যা হয় তোর মাইয়ার তাই হইছে, আফসোস তোর মাইয়ার লগে আমি করতে পারলাম না।'

খোদেজার বাপ এখান থেকে বেরিয়ে নদির কিনারে উবু হয়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদলেন। দূর থেকে কেউ দেখলে ভাববে মানুষটা প্রাত্যহিক জরুরি কোন কাজ সারছে। তাঁর চোখের জল মিশে যাচ্ছে নদির জলে। ক্ষণে ক্ষণে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন।

মানুষটা সেলিব্রেটি হলে কোন একটা উচুমার্গের কথা চলে আসত নিশ্চয়ই। নদির জলের সঙ্গে, আকাশ-বাতাস টেনে এনে কাব্যিক কোন একটা বাক্য চলে আসত অনায়াসে। কিন্তু খোদেজার মতো সামান্য একটা মেয়ের হতদরিদ্র বাবার এই কষ্টের কথা জানার খুব একটা প্রয়োজন নাই এই ব্যস্ত পৃথিবীর। তাঁর চোখের পানি যেমন অনাদরে মিশে যায় নদির পানিতে, তেমনি তার চাপা আর্তনাদও মিশে যায় বাতাসে।...

No comments: