Friday, February 13, 2009

কিটি মাস্ট ডাই:২

­কিটি নামের মশাটি হঠাৎ পাগলের মতো আচরণ শুরু করল। বুক্কা হাহাকার করে উঠল, ‘কিটি-কিটি, এমন করছ কেন?’
কিটি ভীত গলায় বলল,‘এদিকেই তোমার বাবা আসছেন।’
বুক্কা অবাক হলো, ‘তাতে কি হয়েছে, বাবা কি বাঘ না ভল্লুক!
কিটি মনে মনে বলল: তারচেয়েও বেশি, ভয়ংকর দৈত্য!

বুক্কার বাবা এগিয়ে আসছেন। নির্ঘাত তার হাতে থাকবে ভয়াবহ মারণাস্ত্র। এখনি হাসতে হাসতে তরল ওষুধ ছিটিয়ে দেবেন। ক্রমশ কিটির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। এক সময় মা’র মতো সেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। আহা, দৈত্যরা এত নিষ্ঠুর কেন! বুক্কার ঘরে সারাদিন সারারাত গুডনাইট ইলেকট্রিক কয়েল জ্বলে। মাগো কী কষ্ট!
বুক্কা বলল, ‘কিটি, ভয় পেয়ো না। বলেছি না বাবা খুব ভাল। আমি এ রুমে থাকলে তিনি ওষুধ ছিটাবেন না, কারণ আমার ক্ষতি হবে। তুমি এক কাজ করো, আমার ফতুয়ার পকেটে ঢুকে পড়ো। বুক্কা যেখানে, ওষুধ নাই সেখানে। হি, হি, হি। দেখেছ আমার কী বুদ্ধি!’
কিটি পরম নিশ্চিনে- বুক্কার ফতুয়ার পকেটে ঢুকে পড়ল।
বাবা দরজা ফাঁক করে উঁচুস্বরে সুর করে বললেন, ‘বুক্কা ব্যাটা, টুক্কা ব্যাটা! কই-রে আ-মা-র পুক্কা ব্যাটা, কইরে আমার হিউয়ার্ড ব্যাটা।’

বুক্কা দেখল, বাবার হাতে মশা মারার ওষুধ না, আজকের খবরের কাগজ। বুক্কার এক জায়গায় চোখ আটকে গেল, ওর বয়সের একটা শিশুর ছবি। কিন্তু এমন কেন, ভাঙ্গাচোরা ভঙ্গি!
বুক্কা অবাক হয়ে বাবাকে বলল, ‘বাবা, ছবিটা এমন কেন?’
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ব্যাটা, বাচ্চাটা মরে গেছে, এটা একটা ফিলিস্তানি শিশুর ছবি!’
বুক্কা বলল, ‘মরে যাওয়া কি, বাবা?’
বাবা মাথা চুলকে বললেন, ‘মরে যাওয়া মানে হচ্ছে মরে যাওয়া, কিভাবে যে তোকে বোঝাই! উম-ম, ইয়ে তোর, বিষয়টা এমন, একবার মরে গেলে আর ফিরে আসা যায় না!’
বুক্কা মন খারাপ করা গলায় বলল, ‘মরে গেলে ওর বাবা মা কান্না করবে না? আমি মরে গেলে তোমার কি মন খারাপ হবে, বাবা?’
বাবা হাহাকার করে বললেন, ‘বুক্কা, আর কখখনো এমন কথা বলবে না। তোর বদলে বাবা মরবে, একশোবার।’
বুক্কা কান্না চেপে বলল, ‘তাহলে কেন একে মেরে ফেলা হলো, এ কার কি ক্ষতি করেছিল!’
বাবা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, ‘আহা-আহা, ওই শিশুটি কার কি ক্ষতি করবে! ব্যাটা, এ সব বড়োদের ব্যাপার তুমি বুঝবে না- বড়োরা অনেক সময় অন্যায় করে, বিভিন্ন অজুহাতে।’
বুক্কা তীব্র রোষ নিয়ে বলল, ‘কেউ এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না, তুমিও না!’
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘ব্যাটা, আমার ক্ষমতা আর কতোটুকু, একটা মশার সমান!’

মশা প্রসঙ্গে বুক্কার কিটির কথা এতোক্ষণে মনে পড়লো। বুক্কা এবার বাবার গলা ধরে ঝুলে পড়ল। গাঢ়স্বরে বলল, ‘বাবা আমার একটা কথা রাখবে, প্লিজ।’
সুর করে বাবা বললেন, ‘ব-লো, আ-মা-র হুক্কা ব্যাটা।’
বুক্কা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘উহুঁ, তুমি আমাকে ছুঁয়ে বলো।’
বাবা হাসতে হাসতে বললেন, ‘তিনবার ছুঁয়ে বললাম, যা বলবে তাই হবে, হলো।’
বুক্কা থেমে থেমে বলল, ‘বাবা, আমার না একটা বন্ধু আছে। কিটি। তুমি প্লিজ ওকে মেরো না। আমি কখনো তোমার অবাধ্য হবো না। যা বলবে তাই শুনব। প্লিজ, প্লিজ, বাবা। ওকে মেরো না!’
বাবা এতক্ষণ সুর করে কথা বলছিলেন। এইবার গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘কী আশ্চর্য, তোমার বন্ধুকে আমি কেন মরাব, এইসব কী কথা!’
বুক্কা ইতস্তত করে বলল, ‘বাবা, কিটি না একটা মশা।’

বাবা বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন।
বুক্কা ঝলমলে মুখে বলল, ‘বাবা, এই দেখ আমার ফতুয়ার পকেটে। প্লিজ বাবা, প্লিজ, তোমার পায়ে পড়ি ওকে মারবে না। ও খুব ভাল, অনেক জ্ঞানী। বাবা তুমি কী বিশ্বাস করছ না? এই কিটি, ফতুয়ার পকেট থেকে বের হয়ে আমার নাকে বসে বাবাকে দেখাও তো। দেখেছ দেখেছ বাবা, দেখো, আমার নাকে বসে আছে! এই তো বেশ হয়েছে। কিটি, এইবার বাবার গোঁফে বসো তো, বাহ চমৎকার। আহ, কিটি নড়বে না, বাবার বুঝি সুড়সুড়ি লাগে না!’
বাবা অবিশ্বাসের চোখে কিটি নামের ক্ষুদ্র প্রাণীটির কান্ড কারখানা দেখছিলেন। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বিড়বিড় করলেন, কিটি মাষ্ট ডাই!
কিন্তু মুখে তাচ্ছিল্য করে বললেন, ‘ধুর বুক্কা, তুমি আমার সঙ্গে ফাজলামো করছ। কই, তোমার বন্ধুকে বলো তো আমার শার্টের পকেটে ঢুকতে।’
কিটি ইতস্তত করছে দেখে বুক্কা পরম নির্ভাবনায় বলল, ‘কিটি, ভয় নেই। বাবা আমাকে কথা দিয়েছেন, তোমার কিচ্ছু হবে না!’
কিটি বুক্কার বাবার পকেটে ঢোকামাত্র বাবা নিমিষেই কিটিকে পকেটসহ আটকে ফেললেন।
কিটির সমগ্র বিশ্ব আধার হয়ে এলো।
আহ, এত বাতাস, কিটির ছোট্ট বুকটা সামান্য একটু বাতাসের জন্য ছটফট করছে! আটকে রাখা বাতাসের সঙ্গে, প্রায় শোনা যায় না কাটা কাটা কিছু শব্দ ছিটকে বের হলো, ‘বুক্কা, বড়ো কষ্ট!’



*কিটি মাস্ট ডাই, ১: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_03.html

No comments: