Search

Saturday, December 7, 2013

এ নিতল আনন্দ রাখি কোথায়!

সুরুযকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম [১]। ক্লাশ সিক্সে পড়ুয়া, যার হাঁটুর উপর থেকে দুইটিই পা-ই নেই! দরিদ্র বাবার সন্তান, যে সীমাহীন কষ্টে রেললাইন পার হয়ে নিয়মিত স্কুলে যায়।
তার প্রয়োজন কৃত্রিম পা। অন্তত হাঁটাচলা করতে পারবে। কিন্তু কৃত্রিম পা, কেমন করে? বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে যেটা জানা গেল ন্যূনতম ২২ হাজার টাকা করে হলেও দুইটা পা-র জন্য প্রয়োজন অন্তত ৪৪ হাজার টাকা। তার একজন অভিভাবক সহ বেশ কিছু দিন তাকে ওখানে থাকতে হবে। ৪৪ হাজার টাকার সঙ্গে আনুষাঙ্গিক সমস্ত খরচ মিলিয়ে সে যে বিশাল এক অংক!

আমি পূর্বের লেখায় বলেছিলাম, “...কৃত্রিম পা নিয়ে সুরুয নড়বড়ে করে হলেও হাঁটছে। আহ, এই দৃশ্য দেখার চেয়ে তাজমহল দেখাটা আমার কাছে তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ...”। কিন্তু এই তীব্র আনন্দের খোঁজ পাবো কোথায়?
একজন আমাকে জানালেন, তিনি যখন দেশে ফিরবেন তখন একটা ব্যবস্থা করবেন। সবিনয়ে বলি, আমার কাছে এটার খুব একটা গুরুত্ব নেই। কারণ আমার ভাবনা অনেকের চেয়ে ভিন্ন। আমি মোটা বুদ্ধির মানুষ, ভাবনাও তেমন। আমার সাফ কথা, কে দেখেছে নেক্সট সামার, নেক্সট উইন্টার? আমার কাছে তো মনে হয় প্রতিটা দিনই আমার শেষ দিন!

যাই হোক, প্রায় অসম্ভব এই কাজকে সম্ভব করে দেন, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী, @প্রদীপ সাহা। তিনি তাঁর বন্ধুদের কাছে ২০ ডলার করে আর্থিক সহায়তা চান। তাঁর এই আবেদনে সাড়া দেন অধিকাংশ সহৃদয় মানুষ। তাঁদের কল্যাণে সুরুযের কৃত্রিম দুইটা পা-র জন্য যাবতীয় খরচের ব্যবস্থা হয়েছে। আমার ক্ষমতায় কুলালে প্রত্যেকটা মানুষের গা ছুঁয়ে বলতাম, এতো মায়া কেন গো আপনাদের মনে!

এখন কেবল অপেক্ষা কারণ সুরুযের বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। সুরুযের বাবার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। পরীক্ষার শেষ হলেই তাদের যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হবে। অবশ্য দুজন ভদ্রমহিলা যদি তাদের যাওয়ার সুযোগ দেন তাহলে আর কী!

আমি অপেক্ষায় আছি, সুরুয হাঁটছে, নড়বড় করে হলেও! এমন একটা দৃশ্য না-দেখে মরে যাওয়াটা কোনো কাজের কাজ হবে না...।

* ১. সুরুয: https://www.facebook.com/photo.php?fbid=10151695707087335&set=a.10151298132117335.465193.723002334&type=1

Friday, December 6, 2013

ওহ হৃদয়...


আমাকে একজন বলেছিলেন, ক্লাস সিক্সে একটা ছেলে পড়ে- যার স্কুলে যেতে এক ঘন্টা লাগে! মা ধরে-ধরে স্কুলে দিয়ে আসেন। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার যে বর্ণনা দিয়েছিলেন তা আমার কাছে অতিশয়োক্তি মনে হয়েছিল। তাছাড়া যে দূরত্ব আমার তো ৫ মিনিটের বেশি লাগার কথা না। তাহলে?

হৃদয়ের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় হৃদয়ের মার সঙ্গে। হৃদয়ের সমস্যা জন্মের পর থেকেই। হৃদয়দের বাড়ির সামনের ফাঁকা সামান্য জায়গাটুকুও দেখলাম ও একা-একা হাঁটতে পারে না, ওল্টে পড়ে যায়- কিছু একটা ধরে ধরে অতি কষ্টে তাকে হাঁটতে হয়। অধিকাংশ সময় ওর মা-ই হৃদয়কে স্কুলে নিয়ে যান। কারণ হৃদয়ের বাবা বাড়িতে থাকেন না। যোগালির কাজ করেন। এদের নিজেদের ভিটেমাটি ছিল। কিন্তু হৃদয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ওই বাড়ি বিক্রি করে এরা এখন অন্যের দয়ায় মাটির একটা ঘর তুলে থাকেন।

আমি বড়ো বিভ্রান্ত ছিলাম এটা শুনে যে হৃদয় নিয়মিত স্কুলে যায়। ওর সুতীব্র ইচ্ছা, পড়ালেখা করে একটা চাকরি করবে।
আমি খানিকটা অনুমান করতে পারছিলাম হৃদয়ের পায়ের চিকিৎসা করাটা এই পরিবারের জন্য অসাধ্য, অসম্ভব একটা ব্যাপার। কিন্তু ওর স্কুল যাওয়াটা নিয়ে কি করা যায় এটাই ছিল আমার মূল চিন্তা।
হৃদয়ের স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটা আমি হেঁটে আসি। সম্ভব, এই রাস্তা দিয়ে হুইল-চেয়ার নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু, স্কুলের সিঁড়ি? স্কুলের হেড টিচারের সঙ্গে কথা বললাম, আমরা যদি ওর জন্য একটা হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করে দেই তাহলে তিনি কি সিঁড়ির একটা অংশকে র‌্যাম্প বানিয়ে দিতে পারবেন?

এখানে আশার কথা শুনি। হৃদয় এখন ক্লাশ সিক্সে- এখন ওর বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। ক-দিন পরই ও যখন ক্লাশ সেভেনে উঠবে তখন স্কুল নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হবে। ওই আধুনিক ভবনটা আমি ঘুরে দেখেছি। এই ভবনে চমৎকার একটা র‌্যাম্প করে রাখা হয়েছে। হৃদয় হুইল-চেয়ার নিয়ে সোজা ক্লাশে চলে যেতে পারবে। ওটায় বসেই তার পক্ষে ক্লাশ করা সম্ভব। হৃদয়ের একটা হুইল চেয়ারের প্রয়োজন, বড়ো প্রয়োজন...।
ওহ, হৃদয়, তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার নিজের পা দুটো আমাকে বড়ো অপরাধি করে দেয়...।


ছবি ১: নিজের বাড়ির মাটির দেয়াল ধরে হাঁটার চেষ্টা
ছবি ২: হৃদয়ের মা তাকে ধরে ধরে হাঁটাবার চেষ্টা করছেন।
ছবি ৩: স্কুলে হৃদয় পরীক্ষা দিচ্ছে।
ছবি ৪: স্কুলের নতুন ভবনের র‌্যাম্প।

Thursday, December 5, 2013

১৬০০০০০০০=২

শামসুর রাহমানের একটা কবিতা আছে:
"যেদিন মরব আমি, সেদিন কী বার হবে
বলা মুশকিল।
শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?
যে বারই হোক,
সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর, যেন ঘিনঘিনে কাদা
না জমে গলির মোড়ে। সেদিন ভাসলে পথ-ঘাট,
পূণ্যবান শবানুগামীরা বড়ো বিরক্ত হবেন।"
(শামসুর রাহমান/ নিজ বাসভূমে)

এই কবির মনটা ছিল শিশুর মত:

যাই হোক, 
GulzarHossain Ujjal 
তার এফ, বি স্ট্যাটাসে লিখেছেন,
“...তবে আগুনে পুড়ে মরতে চাই না। অনেক সমস্যা আছে। আমি আগুনে পুড়ে মরলে ঝামেলায় পড়বে শবদেহের সৎকারকারীরা। পোড়া মাংসের গন্ধে তাদের অস্সস্তি হবে। বমিও আসতে পারে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ভাল লাগবে না প্রিয়জনদের...।”
আহা, আজ শামসুর রাহমার বেঁচে থাকলে এই কবিতাটাই লিখতেন এমন করে:
“কীভাবে মরব আমি, আগুনে পুড়ে
নাকি ট্রেন উল্টে...[১]
...পূণ্যবান শবানুগামীরা বড়ো বিরক্ত হবেন।
মাংস-পোড়া গন্ধে...”

আমি এই লেখার সঙ্গে আগুনেপোড়া মানুষের ছবি দিতে চাই না...।
আর এটা আমাদের দেশেই সম্ভব একপাল মিডিয়া এবং রাজনৈতিক নেতাদের লোকজন গরুর পালের মত বার্ন-ইউনিটে ঢুকে রোগীর মাঝে ইনফেকশনের ছড়িয়ে রোগিকে দ্রুত মরার সুযোগ করে দেয়া। তারচেয়ে বিষাক্ত বড়ি খাইয়ে মেরে ফেললে হয় না?

আজকাল পত্রিকা পড়তে ইচ্ছা করে না, খবর দেখতেও। কী লাভ? কেবল কষ্টের মাঝে ডুবে যাওয়া! অক্ষম ক্ষোভে নিজেকে হিজড়া ভাবা। কারণ আমি এখন এটা বিলক্ষণ জানি, আমাদের কিছুই করার নেই। এই-ই নিয়তি আমাদের।
আমি পূর্বের এক লেখায় লিখেছিলাম, শত-শত টন নিউজপ্রিন্ট ছাপা হলে বা হাজার-হাজার ঘন্টা টক-শো হলে অথবা ওয়েবে লিখে ওয়েবের তার ঝুলে পড়লেও কোনো লাভ নাই। এই দেশে তাই হবে যা এই দু'জন ভদ্রমহিলা চাইবেন।
শিরোনামটা এমনটা দিয়েছি এই কারণেই। কেউ-কউ প্রশ্ন করতে পারেন, দু-দল না বলে আমি কেন কেবল দু-জন বললাম? দল কী আবার! কোনো দলে কি এমন কেউ আছেন যিনি তার তার নেত্রীর চোখে চোখ রেখে এটা বলার সাহস রাখেন যে, আপনি ভুল করছেন। মানুষটা ব্যারিস্টার নাকি ডক্টর, না সাবেক সেনাপ্রধান তাতে কী। শিরদাঁড়ার পাশাপাশি তাদের নীচের অংশটা দুর্বল হয়ে যায় যে।
অবশ্য সোহেল তাজের ঘটনাটা একটা উদাহরণ বটে!

আমার জানায় ভুল না-হয়ে থাকলে বড়ো গাড়িতে আগুন দিলে পাওয়া যায় পাঁচ হাজার টাকা। কেউ গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হলে অন্তত বিশ হাজার টাকা। এটা এখন চালু লাভজনক একটা ব্যবসা। এই বেসুমার টাকা কে দিচ্ছে? কেউ-না-কেউ তো অবশ্যই। কেন দিচ্ছে? কারণ এর সঙ্গে বিরাট স্বার্থ জড়িত যে।
আহা, আর কেনই-বা দেবে না?
আমাদের গণতন্ত্রের লাড্ডু, যখন হরতাল-অবরোধ ডাকা হয় তখন সেটাকে সফল করার আবশ্যকতাও দেখা দেয়। নইলে চুতিয়া মিডিয়া যে ঘটা করে লিখবে, ‘ঢিলেঢালা হরতাল’। কী লজ্জা-কী লজ্জা! যারা হরতাল ডাকবেন তাদের মুখ দেখাবার যো আছে? সহিংসতা না-হয়ে উপায় কী!
সম্প্রতি নাশকতার কারণে চট্টগ্রাম লাইনে একটা ট্রেন উল্টে পড়েছিল- আহত প্রচুর কিন্তু নিহত নাই। ছি-ছি-ছি, এটা একটা কথা হলো। ওখানে কেউ মারা যায়নি তাই সবাই আগ্রহ হারিয়ে  ফেলছিল, মিডিয়াও। কিন্তু একজন যাত্রীর শিরদাঁড়া ভেঙে গিয়েছিল তার কথা জানার আগ্রহ আমাদের নাই!

তো, এখন যোগ হয়েছে ট্রেনের ফিসপ্লেট খুলে ফেলা। এক দুই ফুট না, শত-শত ফুট। রেললাইন যেন পাটখড়ি আর-কী, টান দিলেই খুলে আসে! অনুমান করি, এর সঙ্গে রেলের লোকজনরা জড়িত যারা রেললাইন মেরামত করে থাকেন। কারণ এদের কাছেই এই যন্ত্রপাতি, বুদ্ধি থাকার কথা। চাকরির মায়া কাটিয়ে রেলের নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারিরা এই কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে থাকলে অবশ্যই এর সঙ্গেও বিশাল অংকের টাকার লেনদেন থাকবে। আবারও সেই প্রশ্ন, কারা দেন এই বিপুল টাকা?

এখানে এই কুতর্কে আমি কারো সঙ্গে যাব না। প্রায় একই ভঙ্গি আমরা দেখেছি বর্তমান ক্ষমতাশীন দল যখন বিরোধিদলে ছিল, তখনও। আওয়ামীলীগের নেত্রী এয়ারপোর্ট থেকে হরতাল ডেকে বিদেশ চলে গেছেন। রাত বারোটায়ও হরতাল ঘোষণা এসেছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ তখন ঘুমে। ভোরে-সকালে বাচ্চারা স্কুলে চলে গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন জানা গেল আজ হরতাল তখন ওই সমস্ত বাচ্চাদের বাবা-মাদের কী অবস্থা হয়েছিল এটা এখানে লেখাটা জরুরি না!

আমি পুর্বে অনেক বার লিখে এটা, গত টার্মে আওয়ামিলীগ ১৭৩ (সংখ্যাটা কমবেশি হতে পারে) দিন হরতাল করেছিল কিন্তু বিএনপি কী এক সেকেন্ড আগেও ক্ষমতা ছেড়েছিল? এবার বিএনপি শতের কাছাকাছি হরতাল করেছে আওয়ামীলীগ কী এক মিনিট আগেও ক্ষমতা ছাড়বে? তাহলে এই সমস্ত হরতাল দিয়ে কী ইয়েটা হয়েছে?
ওহো, ভুলে গেছি, আমাদের দেশের সব পেকে যাওয়া বুদ্ধিজীবীরা আবার ‘মাইন্ট’ করে বসবেন যে অমায়িক একটা গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে।
আমি বলি কি, আমাদের নানা, হানা কি বললেন এটা শোনেন। ইইউর পক্ষে উইলিয়াম হানা বলেছেন, ‘একতরফা নির্বাচনে আসবেন না পর্যবেক্ষকরা...’। লাশ গুণে লাভ নাই প্রভুদের আচরণের প্রতি লক্ষ রাখেন।

আচ্ছা, বাসে গানপাডার-পেট্রল ছিটায় কারা এটা আমরা জানি, একদল ব্যবসায়ি (অবশ্য এদের কাউকে আমাদের চৌকশ গোয়েন্দা বাহিনী ধরতে পারেন না)। এদের টাকা দেয় কারা এটাও আমরা অনুমান করতে পারি। কিন্তু জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠিটা ছুঁড়ে দেন কারা?
ওই যে বললাম, সব পেকে যাওয়া বুদ্ধিজীবীরা। কেউ-কেউ আবার একধাপ এগিয়ে থাকেন, তারা রঙিন চশমা লাগিয়ে রাখেন! আমাদের আলোর মশাল জাফর ইকবাল তার হড়হড় বমিটাকে আটকে বললেন, শিক্ষাবিভাগকে হরতালের আওতামুক্ত রাখা হোক। বেশ-বেশ, তা শিক্ষার্থী চলাচল করবে কেমন করে, আকাশপথে? বরং স্কুল-কলেজে না-গিয়ে বাসায় থাকলে অন্তত কাবাব হওয়া থেকে বাঁচবে!
আর তিনি প্রকারান্তরে কেবল হরতালকে বৈধতাই দিলেন না, গানপাডার-পেট্রলে জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠিটা ছুঁড়ে দিলেন...।

১. শফিক রেহমান, দানব বানাবার মেশিন: https://www.ali-mahmed.com/2014/01/blog-post_7.html?m=1


WhatsApp