Search

Saturday, October 26, 2013

হৃদয়ঘটিত জটিলতা এবং এক ঝাঁক কাক!


গতকাল খানিকটা ঝামেলা হয়ে গেল। আমার বুকের বাম পাশে ব্যথা! লোকজনের গ্যাস্ট্রিক-ফ্যাস্ট্রিকের কারণে এমন ব্যথা হরহামেশাই হয়ে থাকে- এটা নিয়ে গা করার তেমন কিছু থাকে না। কিন্তু আমি জানতাম এটা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা না। কারণ নিজের উপর নিজেই আমি ক্ষেপে গেলে নিজেকেই শাস্তি দেই। শাস্তিপর্বটা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। একটু আগেই সেই পর্বটা যখন সমাপ্ত হলো তখন আমি শ্বাস ফেলতে পারছিলাম না। হার্ট বাবাজি বাদ্য বাজিয়ে কূল পাচ্ছিল না। এমনিতে শরীরের উপর মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার হচ্ছিল তার উপর ওভার-টাইম করার কারণে ব্যাটা সম্ভবত ক্ষেপে গেল। এরপর থেকেই ব্যথাটা...।
যাই হোক, রামের যেমন সুমতি হয়েছিল আমারও তেমনি সুমতি হলো। আমি খানিকটা আঁচ করতে পারছিলাম বলেই একটা ইসিজি করালাম। এখানকার হাসপাতালে গিয়ে, ভাল ইসিজি বোঝেন এমন একজন ডাক্তারকে খুঁজে বের করলাম।

ডাক্তার সুমন নামের এই ডাক্তার যখন মনোযোগ সহকারে আমার ইসিজিটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন তখন সামনে বসা একজন মানুষ একের-পর-এক ছাপানো কাগজ ডাক্তারের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন এবং তোতাপাখির মত কীসব বিড়বিড় করে অনবরত বকে যাচ্ছিলেন। আমার বুঝতে সমস্যা হয় না মানুষটা কোনো একটা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি।

আমাদের দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক ডাক্তারদেরকে কি দেয় এই বেহুদা প্রশ্ন না-করে, কী দেয় না সেটা জিজ্ঞেস করলে ভাল হয়। নগদ টাকার সঙ্গে এমন কোনো জিনিস নেই যা ডাক্তার সাহেবরা পান না। টিভি-ফ্রিজ-এসি এসব তো পুরনো। এবারের কোরবানির ঈদে জবাই এবং মাংস কাটাকাটির জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলো ছুঁরিও দিয়েছে! আমি জানি না ডাক্তার সাহেবদের আন্ডারওয়্যারও ওষুধ কোম্পানিগুলো দেয় কি না? দিলে, ওষুধ কোম্পানিগুলো কেমন করে ডাক্তার সাহেবদের সাইজ নির্ধিরণের জটিল কাজটা সম্পন্ন করে থাকে?
এরা কী পূর্বেই কোনো ফর্ম পূরণ করে? যেটায় লেখা থাকে, আপনার আন্ডারওয়্যারের সাইজ কতো? আচ্ছা, ওটায় কী ওষুধ কোম্পানির লোগো-টোগো থাকে নাকি। আহা, থাকলে লাভ কী! ডাক্তার সাহেবের ওই বিশেষ ভূষণ তো বিশেষ সময়ে, বিশেষ লোকজন ব্যতীত অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না কারণ তিনি তো আর সুপারম্যান না যে প্যান্টের উপর আন্ডারওয়্যার পরবেন। আমরা আমরা দেখে পুলকিত হবো!

যাই হোক, আমি আমার বুকের ব্যথা উপেক্ষা করে শীতল গলায় ওই ওষুধ প্রতিনিধিকে বললাম, ‘আমি একটা জরুরি বিষয় নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছি, আমার কথা শেষ হোক এরপর আপনি আপনার এই সব হাবিজাবি কথা বলবেন’।
আমার অপার সৌভাগ্য যে ওই প্রতিনিধি এবং ডাক্তার সাহেবও এটা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি! করলে ঝামেলা হয়ে যেত কারণটা আমার অসুস্থতা।
তো, ডাক্তার সাহেব ইসিজি দেখে যেটা বললেন, আমার হার্টের নীচের দিকে রক্ত প্রবাহিত হতে সমস্যা হচ্ছে। একজন কার্ডিওলজিস্টকে দেখাবার জন্য।

হার্ট নিয়ে নাড়াচাড়া করেন এমন একজন মানুষকে ফোনে বিস্তারিত বলামাত্র তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি অতি দ্রুত একটা ওষুধের দোকানে যান। নাইট্রোগ্লিসারিন জিহ্বার নিচে দু-বার স্প্রে করে এরপর আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তখন আমি আপনাকে আরও কিছু ওষুধের নাম বলব। আর আমি পৌঁছে আপনাকে দেখে ওষুধ দেব’।
এরপর যথারীতি চিকিৎসা শুরু হয়ে গেল- ওষুধ চলার পাশাপাশি আমাকে দু-সপ্তাহ বেড-রেস্টও দেয়া হয়েছে যদিও বেডের সঙ্গে আমার যোগাযোগ তেমন বিশেষ হচ্ছে না। আরে, আমার যে হাবিজাবি কতো অকাজ! তবে সাবধানে থাকছি কারণ এটা আমার বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা না যে হার্ট বাবাজি আমার জন্য একটা সংকেত দিয়েছে, পাগল, তোকে ছুঁয়ে দিলাম। শ্লা, তিনি ভারী একটা 'সংকেতবাজ' হয়েছেন!
যাগ গে, লেখা প্রসঙ্গে এই সব চলে এলো। আমি যেটা বলতে চেয়েছিলাম, কারো-কারো কাছে আমরা কী কেবল একটা সংখ্যা, একটা গিনিপিগ? ডাক্তার সুমনের কাছে আমি অশেষ কৃতজ্ঞ কারণ তাঁর পর্যবেক্ষণ সঠিক ছিল, কিন্তু...। এই ইসিজিটা পর্যবেক্ষণের সময় ডাক্তারের যে পূর্ণ মনোযোগ থাকা প্রয়োজন ছিল সেটায় ওষুধ কোম্পানির ওই প্রতিনিধি অনবরত ব্যঘাত ঘটিয়েই যাচ্ছিলেন- এটা এরা হরহামেশাই করে থাকেন। যেটায় সায় আছে এই ডাক্তারের এবং এই হাসপাতালের প্রধানেরও।
অথচ মনোযোগের কারণে ওই ডাক্তারের এই পর্যবেক্ষণ ভুল হলে আজ আমার এই লেখাটা লেখার কথা না। আমি লিখতাম না- কে জানে, তখন হয়তো কেউ-না-কেউ আমাকে নিয়ে শোকগাথা লিখতেন। লিখতেনই এটা বলছি না, হয়তো লিখতেন, আলী মাহমেদের জন্য এলিজি। তবে আমার সেটা আর পড়া হতো না, বেচারা আমি...!
*পোস্টের সঙ্গে এই ছবিটা বছর দুয়েক আগের। আমার মা তখন যে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন সেই হাসপাতালের নীচের দৃশ্য এটা। এখানে যে সমস্ত মোটর সাইকেল দেখা যাচ্ছে (ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সবগুলোকে একই ফ্রেমে আনা সম্ভব হয়নি!) প্রায় সবগুলোই ওষুধ কোম্পানি।
যেন এক ঝাঁক কাক, আর এদের কাছে হাসপাতাল হচ্ছে একটা ভাগাড়...।   

Monday, October 21, 2013

আসল খল-নায়ক!

ক-দিন আগে, গেছি ইলেকট্রিক বিল জমা দিতে, আল আরাফাহ ইসলামি ব্যাংকে। লম্বা লাইন। অবশ্য মহিলাদের লাইনটা ছোটো। দুই লাইনের মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা। বিল জমা দিয়ে মহিলারা ফাঁকা এই সরু ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
এই ফাঁকা জায়গাটায় ব্যাংকেরই একজন পা লম্বা করে বসে আছেন- মানুষটার খোলতাই চেহারা, পেল্লায় একটা গোঁফও আছে। একে তো এর বসার ভঙ্গিটা অশোভন- বেতমিজ টাইপের, তার উপর মহিলারা যখন যাচ্ছেন তখন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এই মানুষটাকে আমি বললাম, ‘আপনি এভাবে পা লম্বা করে বসে আছেন কেন? পা-টা টেনে বসুন’।

তিনি গা করলেন না। আমি আবারও আগের কথাটাই বললাম। এবার তিনি দয়া করে মুখ খুললেন। তিনি বললেন, ‘আপনের কী সমস্যা, আপনের কি কোনো সমস্যা হইতাছে’?
আমি বললাম, ‘আমার সমস্যা হচ্ছে কী হচ্ছে না এটার চেয়ে জরুরি হচ্ছে আপনি অন্যদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছেন। আর আপনার এমন বসার ভঙ্গিটাও দেখতে ভাল লাগছে না’।
মানুষটা ফট করে বলে বসলেন, ‘আপনের ভালা না-লাগলে ব্যাংক থিক্যা চইলা যান’।
আমি দুর্দান্ত রাগ চেপে জানতে চাইলাম, ‘এই ব্যাংকে আপনার পদবি কি’? তিনি সরোষে বললেন, ’আপনের কাছে আমার পদবি বলতে হইব নাকি’।

মহা মুসিবত! আমি লাইন ছেড়ে বেরিয়ে সেকেন্ড অফিসারকে খুঁজে বের করলাম। তার কাছে প্রথমেই জানতে চাইলাম, এই মানুষটার পদবি কি? কারণ এই মানুষটা সাদা-পোশাকে, সাফারি টাইপের একটা জিনিস গায়ে। একে এই ব্যাংকের চেয়ারম্যন হিসাবে চালিয়ে দিলে কেউ কুতর্ক জুড়ে দেবেন বলে মনে হয় না। কে বলতে পারে, হয়তো ছদ্মবেশে ব্যাংকের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করছেন!
তো, জানা গেল এই মানুষটা এই ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড। ওহো, সহজ বাংলা করলে, দারোয়ান। এ তো দেখি, আমার নিজস্ব ভাষায় বললে, ‘এক কাপ চায়ে দু’কাপ চিনি’!
সেকেন্ড অফিসারকে আমি বললাম, ‘আমি এই ব্যাংকের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে চাই’। জানা গেল, ম্যানেজার ব্যাংকের বাইরে আছেন। এবার আমি সেকেন্ড অফিসার এবং অন্যান্য অফিসারদের কাছে জানতে চাইলাম, একজন গার্ড একজন গ্রাহককে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলার এমন দুঃসাহস পান কোত্থেকে- এই ব্যাংকের চেয়ারম্যানেরও কী এই ক্ষমতাটা আছে?
যখন সমস্ত অফিসারদের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল তখন আবারও এই দারোয়ানের দাম্ভিক বক্তব্য, ‘আপনে ব্যাংক থিক্যা বাইর হন’।

এই বার বিষয়টা মাত্রা ছাড়িয়ে গেল- গোটা ব্যাপারটা অন্য এক রূপ ধারণ করল! আমি জানি না এই ব্যাংকে সুইপারের কোনো পোস্ট আছে কি না। না-থেকে থাকলে, এখানকার সবাই এই দারোয়ানের সিনিয়র। এই ব্যাংকের চেইন অভ কমান্ড নামের কোনো জিনিস আছে বলে তো আমার মনে হলো না!
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, এই ব্যাংকের একজন অফিসারও এই দারোয়ানকে চুপ করার জন্য বললেন না। বরং আমাকে যেন লাইনে না-দাঁড়িয়ে সহজে বিলটা জমা দেয়া যেতে পারে সেই জন্য সবাই অস্থির হয়ে গেলেন। ভাবখানা এমন, লম্বা লাইনে না-দাঁড়িয়ে চট করে বিল দিতে পেরে আমি যেন আনন্দে বিগলিত হয়ে মাখনের মত গলে যাব।

আমি শান্ত মুখে বললাম, ‘সবাই যেভাবে দিচ্ছে, আমিও সেভাবেই লাইনে দাঁড়িয়েই বিল দেব কিন্তু আমি


এই দারোয়ানের এই আচরণের ব্যাখ্যা চাই। আর আপনারা এই দারোয়ানকে এতোই ক্ষমতাবান মনে করলে একে এই ব্যাংকের ম্যানেজার বানিয়ে দিচ্ছেন না কেন’?
লাইনে দাঁড়িয়ে আমি যখন বিল দেয়ার অপেক্ষায় আছি তখন দেখলাম, এবার দারোয়ান বাবাজি একটা বন্দুক বাগিয়ে বসে আছেন। ব্যাটা বন্দুকের ভয় দেখাচ্ছিল কিনা কে জানে!

যাই হোক, সবাই যেমন নায়ক হতে পারে না, তেমনি খলনায়কও! বিষয়টা এখানে দারোয়ান না- ছুঁরি কোন কোম্পানির সেটা বিবেচ্য বিষয় না, ছুঁরিটা কার হাতে সেটাই আলোচ্য বিষয়! এই দারোয়ান ব্যাটাকে আমি খলনায়ক বলতে নারাজ। খলনায়ক হচ্ছেন এই ব্যাংকের সমস্ত সিনিয়র অফিসাররা, যাদের একটা দারোয়ানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা, ন্যূনতম যোগ্যতাও নাই। অযোগ্য, অথর্ব এরা, একটা দারোয়ানকে সামলাতে পারে না, ব্যাংক সামলাবে কী!
আর যদি শুনি এই দারোয়ান ব্যাটাই কোনো দিন এই ব্যাংকের কোনো অফিসারকে দুম করে গুলি করে বসেছে অন্তত আমি মোটেও অবাক হবো না...।
     
WhatsApp