পবিত্র কোরানে মসজিদ শব্দটা ২৮ বার এসেছে (২৯টি আয়াতে) কিন্তু মাদ্রাসা নিয়ে একটি শব্দও নেই! তবে শিক্ষার কথা বলা আছে:
১. সুরা বাকারা ২:১১৪
"...যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম স্মরণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলো ধ্বংসের চেষ্টা করে তার চেয়ে বড় জালেম আর কে?..."
২. সুরা বাকারা ২:১৪৪:
"...অতএব তুমি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরাও..."
৩. সুরা বাকারা ২:১৪৯:
"...তুমি যেখান থেকেই বের হও না কেন মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরাও..."
৪. সুরা বাকারা ২:১৫০:
"...তোমরা যেখানেই থাক না কেন মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরাও..."
৫. সুরা বাকারা ২:১৮৭:
"...আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না..."
৬. সুরা বাকারা ২:১৯১:
"...আর মসজিদুল হারামের কাছে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো না যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে..."
৭. সুরা বাকারা ২:১৯৬:
"...এটা তার জন্য যে তার পরিবার মসজিদুল হারামের বাসিন্দা নয়..."
৮. সুরা বাকারা ২:২১৭:
"...আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেওয়া ও মসজিদুল হারাম থেকে বাধা দেওয়া..."
৯. সুরা মায়েদা ৫:২:
"...মসজিদুল হারামে যেতে বাধা দেওয়ায় কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে..."
১০. সুরা আরাফ ৭:২৯:
"...বলো, আমার রব ন্যায়বিচারের আদেশ দিয়েছেন এবং প্রত্যেক মসজিদে তোমরা নিজেদের লক্ষ্য স্থির কর..."
১১. সুরা আরাফ ৭:৩১:
"...হে আদম সন্তান, প্রত্যেক মসজিদে তোমাদের সাজসজ্জা গ্রহণ কর..."
১২. সুরা আনফাল ৮:৩৪:
"...অথচ তারা মসজিদুল হারাম থেকে বাধা দেয়, যদিও তারা এর রক্ষক নয়..."
১৩. সুরা তওবা ৯:৭:
"...তবে যাদের সাথে তোমরা মসজিদুল হারামের কাছে চুক্তি করেছ..."
১৪. সুরা তওবা ৯:১৭:
"...মুশরিকদের জন্য শোভা পায় না যে তারা আল্লাহর মসজিদসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ করবে..."
১৫. সুরা তওবা ৯:১৮:
"...নিশ্চয় আল্লাহর মসজিদসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ করবে তারাই যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে..."
১৬. সুরা তওবা ৯:১৯:
"...তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো ও মসজিদুল হারাম রক্ষণাবেক্ষণ করাকে...সমান মনে কর?"
১৭. সুরা তওবা ৯:২৮:
"...হে মুমিনগণ, মুশরিকরা অপবিত্র, তাই এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল হারামের কাছে না আসে..."
১৮. সুরা তওবা ৯:১০৭:
"...আর যারা মসজিদ বানিয়েছে ক্ষতিসাধন, কুফরি ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য..."
১৯. সুরা তওবা ৯:১০৮:
"...যে মসজিদ প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত সেটাই তোমার সালাতের জন্য বেশি যোগ্য..."
২০. সুরা তওবা ৯:১১০:
"...তাদের নির্মিত মসজিদ সর্বদা তাদের অন্তরে সন্দেহের কারণ হয়ে থাকবে..."
২১. সুরা বনী ইসরাইল ১৭:১:
"...পবিত্র সেই সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে..."
২২. সুরা বনী ইসরাইল ১৭:১:
"...মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছি..."
২৩. সুরা বনী ইসরাইল ১৭:৭:
"...যাতে তারা মসজিদে প্রবেশ করে যেমন প্রথমবার প্রবেশ করেছিল..."
২৪. সুরা কাহফ ১৮:২১:
"...তারা বলল, তাদের উপর একটি মসজিদ নির্মাণ কর..."
২৫. সুরা হজ ২২:২৫:
"...নিশ্চয় যারা কুফরি করে এবং মসজিদুল হারাম থেকে বাধা দেয়..."
২৬. সুরা হজ ২২:৪০:
"...আর যদি আল্লাহ একদলকে অন্যদল দ্বারা প্রতিহত না করতেন তবে ...মসজিদসমূহ ধ্বংস হয়ে যেত যেখানে আল্লাহর নাম বেশি স্মরণ করা হয়..."
২৭. সুরা ফাতহ ৪৮:২৫:
"...তারাই কুফরি করেছে এবং তোমাদেরকে মসজিদুল হারাম থেকে বাধা দিয়েছে..."
২৮. সুরা ফাতহ ৪৮:২৭:
"...আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন...তোমরা অবশ্যই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে..."
২৯. সুরা জিন ৭২:১৮:
"...আর মসজিদসমূহ আল্লাহরই, সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না..."
* মসজিদে যে শিক্ষা দেওয়া হতো তার কিছু নমুনা পাওয়া যাবে এই আয়াতে। যে আয়াতগুলোতে মসজিদ শব্দ আছে, সেগুলোর মধ্যে শিক্ষার সাথে সবচেয়ে কাছাকাছি ৩ টা আয়াতকেই মুফাসসিররা শিক্ষার দলিল হিসেবে ধরেন, কারণ 'জিকির/তাকওয়া' মানেই শিক্ষা।
১. বাকারা ২:১১৪
"...যে আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম স্মরণ করতে বাধা দেয়..."
তাফসীর ইবনে কাসির: 'আল্লাহর নাম স্মরণ', এর মধ্যে কোরান তেলাওয়াত, কোরান শিক্ষা, ওয়াজ —সবই পড়ে'।
মসজিদে শিক্ষা বন্ধ করাই এই আয়াতে জুলুম বলা হয়েছে।
২. তওবা ৯:১৮
"...আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে তারাই যারা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান আনে..."
এখানে 'আবাদ করা'-র ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী লিখেছেন: আবাদ মানে দুইটা। ১. বিল্ডিং বানানো। ২.সেখানে বসে ঈমান ও কোরানের শিক্ষা দেওয়া। এটাই মসজিদে শিক্ষার মূল আয়াত।
৩. জিন ৭২:১৮
"আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই, সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না"
এটা তাওহিদের শিক্ষার আয়াত। মসজিদে শুধু আল্লাহর শিক্ষাই চলবে — অন্য কোনো মতবাদের না।
এই তিনটার বাইরে কোরানে মসজিদ শব্দ আছে এমন আর কোনো আয়াতে সরাসরি 'ইলম/ তালিম/ দারস' শব্দ নেই।
কোরানে মসজিদে শিক্ষা নিষেধ নয়, বরং জিকির ও তাকওয়ার নামে শিক্ষাই অনুমোদিত। আর রাসূলের সুন্নতে মসজিদে নববীর সুফফাই ছিল প্রথম মাদ্রাসা।
+ হাদিসে মসজিদে শিক্ষার বিষয়:
১. সহিহ আল-বুখারী ৬৬
আবু ওয়াকিদ আল-লাইসি (রা.) থেকে বর্ণিত: একবার আল্লাহর রাসূল ﷺ মসজিদে বসে লোকদের সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় তিনজন লোক এলো। দুজন এগিয়ে এলো, একজন চলে গেল। একজন হালাকার (জ্ঞানের মজলিস) মধ্যে ফাঁকা জায়গা পেয়ে বসে পড়ল, দ্বিতীয়জন পেছনে বসল, তৃতীয়জন ফিরে গেল। রাসূল ﷺ বললেন, "আমি কি তোমাদের এই তিনজনের কথা বলব? একজন আল্লাহর দিকে ঝুঁকেছে, আল্লাহ তাকেও আশ্রয় দিয়েছেন। দ্বিতীয়জন লজ্জা পেয়েছে, আল্লাহও তাকে লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছেন। তৃতীয়জন মুখ ফিরিয়েছে, আল্লাহও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।"
—Sunnah.com: Sahih al-Bukhari 66
ইমাম বুখারী এই হাদিসের উপর অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন—'মসজিদে ইলম ও ফতোয়া আলোচনার অধ্যায়'।
২. সহিহ আল-বুখারী ১৩৩
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে: এক ব্যক্তি মসজিদে দাঁড়িয়ে বলল, "হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কোথা থেকে ইহরাম বাঁধতে আদেশ করেন?" রাসূল ﷺ বললেন, "মদিনাবাসী যুল-হুলাইফা থেকে, শামবাসী জুহফা থেকে..."
—Sunnah.com: Sahih al-Bukhari 133 — بَابُ ذِكْرِ الْعِلْمِ وَالْفُتْيَا فِي الْمَسْجِدِ
এটাই প্রমাণ যে, সাহাবীরা মসজিদের ভেতরেই মাসআলা শিখতেন, কোনো আলাদা মাদ্রাসায় না।
৩. সহিহ মুসলিম ৭৮৮b
আয়িশা (রা.) বলেন: নবী ﷺ মসজিদে এক ব্যক্তির কোরান তেলাওয়াত শুনছিলেন। তিনি বললেন, "আল্লাহ তার উপর রহম করুন, সে আমাকে এমন একটি আয়াত মনে করিয়ে দিয়েছে যা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।"
—Sunnah.com: Sahih Muslim 788b
মসজিদে কোরান শেখা-শেখানো চলত।
৪. সহিহ মুসলিম ২৬৯৯ (মসজিদে জিকিরের হালাকা)
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে: রাসূল ﷺ বলেছেন, "যখন কোনো দল আল্লাহর কোনো ঘরে (মসজিদে) একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে এবং একে অপরকে শিক্ষা দেয়, তখন তাদের উপর সাকিনা নাজিল হয়, রহমত তাদের ঢেকে ফেলে..."
—Sunnah.com: Sahih Muslim 2699a — The Book of Dhikr
++ মাদ্রাসার উত্থান:
১. নববী যুগ (৬২২-৬৩২):
কোন মাদ্রাসা ছিল না! মসজিদে নববীর বারান্দা, আস-সুফফা। ৭০ জন সাহাবী ওখানে থেকেই ফুলটাইম ছাত্র। শিক্ষক স্বয়ং রাসূল ﷺ।
২. সাহাবা-তাবেয়ী যুগ (৬৩২-৭৫০):
কুত্তাব এবং মসজিদের হালাকা! বাচ্চাদের জন্য কুত্তাব/মক্তব, লেখা শেখানো হতো।
বড়দের সব ইলম তাফসির, ফিকহ, হাদিস, সব মসজিদের হালাকায়। উমাইয়া আমলেও আলাদা স্থাপনা ছিল না।
৩. প্রাথমিক প্রচেষ্টা (৯০০-১০৬০)
খোরাসান (নিশাপুর) এলাকায় ধনী ব্যক্তিরা মসজিদের পাশে ছাত্রদের থাকার ঘর বানাতেন, একে বলত মাদ্রাসা (দারাসা থেকে পড়ার জায়গা)। কিন্তু এটা তখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি!
৪. অফিসিয়াল শুরু, ১০৬৫ খ্রি.
নিজামিয়া মাদ্রাসা, বাগদাদ। সেলজুক উজির 'নিজামুল মুলক' বানান।
এটাই প্রথম সরকারি সিলেবাস, বেতনভুক্ত শিক্ষক, হোস্টেল, ডিগ্রি সহ মাদ্রাসা। ইমাম গাজ্জালী এখানে পড়াতেন।
৫. মাদ্রাসার প্রসার (১০৬৫-১২০০)
নিজামুল মুলক একাই ৩০+ নিজামিয়া বানান—নিশাপুর, মসুল, দামেস্ক, বাগদাদ।
এর দেখাদেখি ফাতেমিরা কায়রোতে আল-আজহার (৯৭০-এ মসজিদ হিসেবে শুরু, পরে ৯৮৮ সালে মাদ্রাসা)-কে বিশ্ববিদ্যালয় বানায়।
৬. ভারত উপমহাদেশে (১১৯১- )
মুহাম্মদ ঘোরি দিল্লি জয়ের পর মসজিদ-ভিত্তিক মাদ্রাসা শুরু। ১৪৪০ এ বাংলায় মাহমুদ শাহের আমলে প্রথম বড় মাদ্রাসা।
সারকথা এক লাইনে:
রাসূলের ৪৩৩ বছর পর ১০৬৫ সালে বাগদাদে প্রথম মাদ্রাসা বিল্ডিং করা হয়!
এর আগে ৪ শতাব্দী ইসলামের সব জ্ঞান মসজিদেই চর্চা হয়েছে।
এখন অবশ্য মসজিদে নামাজের পর পরই ইয়া বড় একটা তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। টাইলস-এসির নীচে চাপা পড়ে যায় ইসলামি শিক্ষা, মুসাফিরদের ক্ষণিকের আশ্রয়, মুত্র-বিসর্জনের শারীরিক তীব্র যন্ত্রণার আবসান...!
ফল যা হওয়ার তাই হয়! ব্যাঙের ছাতার মত পাল্লা দিয়ে গজিয়ে উঠে এক-দুই রুম বিশিষ্ট মাদ্রাসা। ছোট-ছোট বাচ্চাদের উপর নির্বিচারে চলে অমানুষিক যৌন নির্যাতন যার চালু নাম বলাৎকার [১]। পয়সার বিনিময়ে (যেটাকে পবিত্র কোরানে আগুন-খাওয়া বলা হয়েছে [—]) মসজিদের বয়ান ছড়িয়ে পড়ে মাঠে-ঘাটে-তেপান্তরে, যার চালু নাম ওয়াজ [২]!
সূত্র:
১.বলাৎকার:
২. ওয়াজ:
—




No comments:
Post a Comment