Search

Thursday, August 20, 2026

পরাজয়: প্রকৃতি-মানব-মানবসভ্যতা!

লেখক: Asad Abdullah (https://www.facebook.com/share/1BdDSm4diL/)

"এই ছবির সাবজেক্ট আমি না। আমি এখানে প্রেডিকেট। সাবজেক্ট হলো আমার পেছনের তিনজন ভাই, ভাবি, আপা।

লেক জর্জে আমরা পৌঁছানোর মিনিট পাঁচেক পরেই তাঁরা এসে হাজির। গাড়িটা থামল একদম বাংলা সিনেমার কায়দায়। ভাই ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলেন, প্রায় আমার গা ঘেঁষে। খানিকটা ধুলো উড়ল। যেন সেই ধুলায় বিরক্ত হয়েই টায়ারের আশপাশ থেকে বিশুদ্ধ বাতাসটুকু কোথায় যেন পালিয়ে গেল। তার জায়গা দখল করে নিল পোড়া টায়ারের গন্ধ।

ভাই নেমেই ওয়াক থু করে থুতু ফেললেন। আল্লাহ আমাকে ঠিক কী শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন জানি না, কিন্তু আমি ঠিক সেই মুহূর্তেই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, যখন তিনি ওয়াক থু করলেন। এমন একটা জায়গায় এসে, এমন একটা লেকের সামনে দাঁড়িয়ে কারো থুতু ফেলতে ইচ্ছা করতে পারে, নিজের চর্মচক্ষে না দেখলে জীবনেও বিশ্বাস করতাম না।

তারপর তিনজন মিলে খুব উঁচু গলায় কোনো এক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা শুরু করলেন। এতক্ষণ আমার কানে বাতাসের ঝিরঝির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। এখন ইচ্ছা না করলেও তাঁদের 'সুমধুর কণ্ঠস্বর'(!) কানে সিসার মতো ঢুকতে লাগল।

আল্লাহ যখন আমাদের ডিজাইন করেছিলেন, তখন একটা জায়গায় তিনি ইচ্ছা করেই একটা ত্রুটি রেখে দিয়েছেন। আহা, তিনি আমাদের চোখ বন্ধ করার ব্যবস্থা রেখেছেন, কিন্তু কান বন্ধ করার কোনো উপায় রাখেননি। তিনি তখন হয়তো খেয়াল করেননি, পৃথিবীতে কোথাও-কোথাও, কখনো-কখনো, কারো-কারো, কোনো-কোনো সময় কান বন্ধ করার ইচ্ছা জাগতে পারে। হে আল্লাহ, হে মাবুদ, তুমি যখন হিউম্যান V2.0 বানাবে, তখন এই ফিচারটা দয়া করে যোগ করে দিও। এটা আসাদ আব্দুল্লাহ'র হাম্বল রিকোয়েস্ট!

যাই হোক, ঘটনায় ফেরা যাক। তাঁরা মহা উৎসাহে বিভিন্ন পোজে ছবি তোলা শুরু করলেন। আগে ভাবি একা অজুত-নিজুত ছবি তুললেন। কিন্তু ভাই যেই ফ্রেমে ঢুকলেন, ভাবি সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় মনে করিয়ে দিলেন যে ভাই গাড়ি থেকে ক্যাপ নিয়ে আসেননি। ফলে ছবিতে ভাইয়ের মাথার যে অঞ্চলটা একটু অনুর্বর, সেটা দেখা যাবে।

ভাই সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোনটা আনুম, নীলটা নাকি সাদাটা'?

ভাবি বললেন, 'সাদাটাই লইয়া আইয়েন, আসমানে দেখেন না ক্যামন কালা-কালা মেঘ জমছে'।

ভাই তা-ই করলেন। এবার ছবি তোলার পালা। ভাই ফ্রেমে, আমিও তুমুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি, নাটকের বাকি অংশ দেখার অপেক্ষায়। ভাই ক্যামেরার দিকে হিরো লুক দিলেন। কিন্তু ভাবি কড়া গলায় বললেন, 'আরে ক্যামেরার দিকে না, আঁর দিকে চাও, রুমান্টিক একটা লুক দেও'।

ভাই তা-ই করলেন।

ওদিকে আপা ছবি তুলতে-তুলতে একটু অস্থির। সম্ভবত এই পজিশনে বিশ-পঁচিশটা ছবি তিনি এর মধ্যেই তুলে ফেলেছেন। এবার তিনি তাগাদা দিলেন, একই আঞ্চলিক ভাষায়: 'তোঁরার হইলে অক্করে আঁর ছবিডা তুইলা দে'।

কিন্তু ভাবির খায়েশ তখনো মেটেনি। ভাইকে নিয়ে তিনি এবার নতুন পোজে শুরু করলেন। আমি তুমুল উত্তেজিত। মনে হলো ছবির ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেছি। অপেক্ষা করছি এটা ভেবে, দেখি, এটা হলিউডের সিনেমা হবে (যেখানে দুই ঠোঁট এক হয়), নাকি বাংলা সিনেমা হবে (যেখানে কাহিনী হওয়ার আগেই সামনে একটা ফুল চলে আসে!)।

কিন্তু হলো পর্বতের মূষিক প্রসব। আপা নিজেই রাগ করে এবার নিজের সেলফি তোলা শুরু করলেন। একটু পরে দেখি ভাবিও সেলফি তুলছেন। ভাই বেচারার জন্য খারাপই লাগল। তাঁকে দেখতে অনেকটা ওই স্তন্যপায়ী প্রাণীর তিন নম্বর বাচ্চার মতো লাগছিল!

ভেবে দেখলাম, আমি এখানে এসেছিলাম লেক দেখতে। লেক দেখা হলো, তার সাথে বিনা টিকিটে, বিনা অ্যাডে, বিনা সাবস্ক্রিপশনে একটা আস্ত বাংলা নাটক দেখে ফেললাম। এই যুগে ফ্রি জিনিস পাওয়া বড় মুশকিল।

তিনজন মানুষ একসঙ্গে পৃথিবীর এত সুন্দর একটা জায়গায় এলো, শেষে তিনজনই যে যার ফোনের ভেতর একা-একা ঢুকে গেল। বেচারা লেক জর্জ, চুপচাপ তাকিয়ে রইল, হাজার বছর ধরে যেভাবে তাকিয়ে আছে। আজকাল কেউ আর ওভাবে ফিরেও লেকটার দিকে তাকায় না। সে সেজেগুজে বসে থাকে অথচ তার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই নিজের নিজের মুখ দেখছে ফোনের স্ক্রিনে। এই গ্রহের অসম্ভব সব সুন্দরের একই গতি। এখন আর কেউ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না—ফট করে একটা ছবি তুলে ফেললেই হয়! দেখা শেষ!

এই একবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে অবহেলিত জিনিস সম্ভবত প্রকৃতি নিজেই। সে যতই সুন্দর, অপরূপ  হোক, একটা ফ্রন্ট ক্যামেরা, সেল-ফোন ক্যামেরার সামনে সে পরাজিত হয়। আসলে পরাজয় হয় মানব, মানবসভ্যতার! 

গ্রিক মিথের সেই নার্সিসাসের কথা মনে পড়ল। ছেলেটা পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে এমন প্রেমে পড়েছিল যে, সেখান থেকে আর নড়তে পারেনি, শেষে ওখানেই মরে গিয়েছিল। আজকাল আমরা সবাই একটু-একটু নার্সিসাস। তফাত শুধু এই, নার্সিসাসের অন্তত একটা লেক লাগত। আমাদের কিছুই লাগে না, পকেটে একটা ফ্রন্ট ক্যামেরা-দেল ক্যামেরা থাকলেই চলে।"

— লেখক: Asad Abdullah (https://www.facebook.com/share/1BdDSm4diL/)

No comments:

WhatsApp