১. ভীম দুর্যোধনের নাভির নীচে আঘাত করেছিলেন।
সংস্কৃত মূল: মহাভারত, শল্যপর্ব, গদাযুদ্ধপর্ব, অধ্যায় ৫৮
ততো দুর্যোধনস্যোর্ভ্যাং বলেন মহতা নৃপ।
ভীমসেনো গদাং গুর্বীং পাতয়ামাস বেগিতঃ॥ ৫৮.৫৯॥
স ভগ্নসক্থিযুগলো নিপপাত মহারথঃ।
সংস্কৃত বাংলা: শল্যপর্ব, ৫৮ অধ্যায় — “অনন্তর ভীমসেন অতিশয় বেগে দুর্যোধনের ঊরুদ্বয়ে ভীষণ গদা নিক্ষেপ করিলেন। তাহাতে সেই মহারথের উরুদ্বয় ভগ্ন হইয়া ভূতলে পতিত হইলেন।”
নীতি ভঙ্গের উল্লেখ: বলরাম নিজেই বলেছিলেন, “ধর্মযুদ্ধে নাভির নিম্নে আঘাত করা নিষিদ্ধ। ভীম অন্যায় করিয়াছে।” (শল্যপর্ব ৫৯.১৩-১৪)
২. শিখণ্ডীকে সামনে রেখে ভীষ্মকে হত্যা।
সংস্কৃত মূল: মহাভারত, ভীষ্মপর্ব, অধ্যায় ১১৯
শিখণ্ডিনং পুরস্কৃত্য পাণ্ডবো জিষ্ণুরুচ্যতে।
অভ্যধাবত গাঙ্গেয়ং শরবর্ষৈঃ সমন্ততঃ॥ ১১৯.৩৮॥
ততঃ শরশতৈর্ভীষ্মঃ শিখণ্ডিপ্রমুখৈঃ শরৈঃ।
নিকৃত্তবর্মা সমরে নিপপাত মহারথঃ॥ ১১৯.৬২॥
সংস্কৃত বাংলা: ভীষ্মপর্ব, ১১৯ অধ্যায় — “অর্জুন শিখণ্ডীকে সম্মুখে রাখিয়া ভীষ্মের প্রতি ধাবমান হইলেন। ভীষ্ম শিখণ্ডীর প্রতি অস্ত্র ত্যাগ করিলেন না। কারণ শিখণ্ডী পূর্বজন্মে স্ত্রী ছিলেন। সেই সুযোগে অর্জুন শরনিকরে ভীষ্মকে শরশয্যায় শায়িত করিলেন।”
ভীষ্মের নিজের কথা: ১০৮ অধ্যায়ে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলেন, “আমি স্ত্রী, স্ত্রীপূর্ব, স্ত্রীনামা ও স্ত্রীরূপধারীর সহিত যুদ্ধ করি না।”
তাই তিনি শিখণ্ডীর সাথে যুদ্ধ করেন নাই।
৩. যুধিষ্ঠিরের মিথ্যা দিয়ে দ্রোণাচার্য হত্যা।
সংস্কৃত মূল: মহাভারত, দ্রোণপর্ব, অধ্যায় ১৯৩ (গীতা প্রেস: ১৯১)
অশ্বত্থামা হত ইতি শব্দমুচ্চৈশ্চুক্রোশ হ।
তমশ্রৌষীদ্ দ্রোণসূতঃ স্বপুত্রবধশঙ্কিতঃ॥ ১৯৩.৪৮॥
যুধিষ্ঠিরং রণে দ্রোণঃ পপ্রচ্ছাগত্য ভারত।
সত্যং ব্রূহি মহাবাহো হতঃ কিং মম পুত্রকঃ॥ ১৯৩.৫১॥
হতোঽশ্বত্থামেতি নরো নাগো বেতি বিশাম্পতে।
অব্যক্তমব্রবীদ্রাজা ভয়াত্ কৃষ্ণবচোঽনুগঃ॥ ১৯৩.৫৪॥
সংস্কৃত বাংলা: দ্রোণপর্ব, ১৯৩ অধ্যায় — “ভীম ‘অশ্বত্থামা’ নামক এক হস্তীকে বধ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন, ‘অশ্বত্থামা হত’। দ্রোণ পুত্রশোকে যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন।
কৃষ্ণের উপদেশে যুধিষ্ঠির বলিলেন, ‘অশ্বত্থামা হত’, এই বলিয়া অস্ফুট স্বরে কহিলেন ‘ইতি নরো নাগো বা’ — মানুষ না হাতি। তখনই শঙ্খধ্বনিতে শেষ কথাটা চাপা পড়িল।”
ফল: দ্রোণ অস্ত্র ত্যাগ করলে ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁর শিরশ্ছেদ করেন। ১৯৩.৬৭
৪. রথের চাকা তোলার সময় কর্ণকে হত্যা।
সংস্কৃত মূল: মহাভারত, কর্ণপর্ব, অধ্যায় ৯১ (গীতা প্রেস ৯০)
ভূমৌ নিমগ্নং তচ্চক্রং সমুদ্ধর্তুমভিদ্রুতঃ।
কর্ণো রথাদবপ্লুত্য হস্তেন ধরণীং স্পৃশন্॥ ৯১.৩১॥
তাবৎ প্রহর্তুমর্হোঽস্মি ন মাং ত্বং হন্তুমর্হসি।
ধর্মযুদ্ধমনুস্মৃত্য মুহূর্তং ক্ষম পার্থ মে॥ ৯১.৩৮॥
তমব্রবীত্ততঃ কৃষ্ণঃ প্রহরৈতদ্ ধনঞ্জয়।
নৈষ কালোহস্তি কৌন্তেয় কর্ণস্যাস্য বিচারণে॥ ৯১.৫২॥
সংস্কৃত বাংলা: কর্ণপর্ব, ৯১ অধ্যায় — “কর্ণের রথচক্র ভূমিতে পুঁতিয়া গেল। কর্ণ রথ হইতে লাফাইয়া চাকা তুলিতে লাগিলেন এবং কহিলেন, ‘হে অর্জুন, আমি নিরস্ত্র, মুহূর্তকাল ক্ষমা কর, ধর্মযুদ্ধ স্মরণ কর’।
তখন কৃষ্ণ অর্জুনকে বলিলেন, ‘এই সময়, মারো। কর্ণের বিচারের সময় নাই’। অর্জুন অঞ্জলিক বাণে কর্ণের শিরশ্ছেদ করিলেন।”
৫. জয়দ্রথ বধ — সূর্যাস্তের ছল।
ঘটনা: অর্জুন প্রতিজ্ঞা করছিলেন সূর্যাস্তের আগে জয়দ্রথকে মারতে না-পারলে আগুনে পুড়ে মরবেন। কৌরবরা জয়দ্রথকে লুকায় রাখে।
কৃষ্ণ যোগমায়া দিয়ে অন্ধকার করে সূর্যকে ঢেকে দেন। সবাই ভাবে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। জয়দ্রথ বের হয়ে আসেন। তখনই কৃষ্ণ যোগমায়া সরিয়ে নেন, সূর্য বের হয়। অর্জুন জয়দ্রথকে মারেন।
সংস্কৃত: দ্রোণপর্ব, অধ্যায় ১৪৬
ততঃ কৃষ্ণো মহাবাহুঃ চক্রেণামিত্রকর্ষণঃ।
আচ্ছাদয়ামাস রবিং যোগমাস্থায় বীর্যবান্॥ ১৪৬.৮৫॥
বাংলা: দ্রোণপর্ব, ১৪৬ অধ্যায় — “তখন মহাবাহু কৃষ্ণ যোগবলে সূর্যকে আচ্ছাদিত করিলেন। অন্ধকার দেখিয়া জয়দ্রথ বাহির হইলেন।”
৬. ঘটোৎকচকে দিয়া কর্ণের ‘একঘ্নী’ অস্ত্র নষ্ট করানো।
ঘটনা: কর্ণের কাছে ইন্দ্রের দেওয়া ‘বাসবী শক্তি’ ছিল। এটা দিয়ে তিনি অর্জুনকে মারবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। এই অস্ত্র একবারই ব্যবহার করা যায়।
কৃষ্ণের কাজ: রাতের যুদ্ধে কৃষ্ণ ঘটোৎকচকে নামিয়ে দেন। ঘটোৎকচ রাক্ষস, রাতে অজেয়। কৌরব সৈন্য মরতে থাকে। দুর্যোধন বাধ্য হয়ে কর্ণকে বলেন, ওই অস্ত্র ঘটোৎকচের উপর মারতে। কর্ণ মারেন, ঘটোৎকচ মরেন, অস্ত্র নষ্ট হয়। অর্জুন বেঁচে যান।
সংস্কৃত: দ্রোণপর্ব, অধ্যায় ১৭৯
ততো দুর্যোধনো রাজা কর্ণং বৈকর্তনং ব্রুবৎ।
এষ হন্তি রণে সেনাং পাতয়ৈনং মহাবলম্॥ ১৭৯.১৯॥
হতে হৈডিম্বে পার্থস্তু প্রহৃষ্টঃ কেশবোঽব্রবীৎ।
দিষ্ট্যা ত্বং জীবসে পার্থ মুক্তঃ কর্ণাদ্ ভয়ঙ্করাত্॥ ১৭৯.৩২॥
বাংলা: দ্রোণপর্ব, ১৭৯ অধ্যায় — “ঘটোৎকচ নিহত হইলে কৃষ্ণ আনন্দে অর্জুনকে কহিলেন, ‘ভাগ্যিস তুমি বাঁচিয়া গেলে। কর্ণের হাত হইতে রক্ষা পাইলে।’
অর্জুন বলিল, ‘আমার জন্য রাক্ষস মরল!’ কৃষ্ণ বলিলেন, ‘ওর জন্যই তুমি বাঁচলে।’”
৭. বলরামকে মিথ্যা বলে দুর্যোধন-ভীমের গদাযুদ্ধ থেকে সরানো।
ঘটনা: বলরাম তীর্থ করে ফিরে এসে দেখেন, ভীম-দুর্যোধনের গদাযুদ্ধ চলতেছে। বলরাম দুর্যোধনের গুরু, তিনি নীতি ভঙ্গ দেখলে ভীমকে মারতেন।
কৃষ্ণের কাজ: কৃষ্ণ বলরামকে বলেন দ্বারকায় উৎপাত হচ্ছে। বলরাম চলে যান। যুদ্ধে থাকলে ভীমকে মারতেন।
সংস্কৃত: শল্যপর্ব, অধ্যায় ৫৮ (গীতা প্রেস: ৩৪)
দ্বারবত্যাং মহোৎপাতঃ সংজাত ইতি শুশ্রুম।
তত্র গচ্ছাম ভদ্রং তে দ্রষ্টুং তৎ কারণং বল॥ ৫৮.৮॥
বাংলা: শল্যপর্ব, ৫৮ অধ্যায় — “কৃষ্ণ বলিলেন, ‘দাদা, শুনিতেছি দ্বারকায় মহা উৎপাত হইয়াছে। চলো দেখি।’ এই বলিয়া বলরামকে সরাইয়া দিলেন।”
৮. শাল্ব রাজার মায়া-যুদ্ধে বসুদেবের কাটা মাথা দেখানো।
ঘটনা: শাল্ব কৃষ্ণের সাথে যুদ্ধের সময় মায়া দিয়া আকাশে কৃষ্ণের বাপ বসুদেবের কাটা মাথা দেখায়। কৃষ্ণ মুহূর্তের জন্য বিহ্বল হন। পরে বুঝেন এইটা মায়া।
কৃষ্ণের পাল্টা কাজ: কৃষ্ণও মায়া দিয়া শাল্বকে বিভ্রান্ত করেন।
সংস্কৃত: বনপর্ব, অধ্যায় ২২
স শাল্বো মায়য়াবিষ্টঃ শিরো দাশার্হযোষিতঃ।
পাতয়ামাস কৃষ্ণস্য সমীপে ব্যোমচারিণঃ॥ ২২.৩১॥
৯. শিশুপাল বধ — প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের ছল।
ঘটনা: কৃষ্ণের পিসি শিশুপালের মা কৃষ্ণকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন, “আমার ছেলের ১০০ অপরাধ ক্ষমা করবা।” রাজসূয় যজ্ঞে শিশুপাল ১০১টা গালি দেয়।
কৃষ্ণের কাজ: ১০০টা গোনার পর ১০১ নম্বরে কৃষ্ণ সুদর্শন দিয়া শিশুপালের মাথা কাটেন। বলেন, “প্রতিজ্ঞা শেষ।”
সংস্কৃত: সভাপর্ব, অধ্যায় ৪৫
ততঃ শতং ক্ষমিষ্যামি তবাপরাধানিতি।
প্রতিশ্রুতং ময়া তুভ্যং তচ্চ পূর্ণং তবানঘে॥ ৪৫.২৫॥
অতঃ পরং ন মর্ষেঽহমিত্যুক্ত্বা মাধবস্তদা।
চক্রেণ শির উৎকৃত্য পাতয়ামাস ভূতলে॥ ৪৫.২৬॥
বাংলা: সভাপর্ব, ৪৫ অধ্যায় — “কৃষ্ণ বলিলেন, ‘পিসি, তোমাকে কথা দিয়াছিলাম ১০০ অপরাধ ক্ষমা করিব। তাহা পূর্ণ হইয়াছে। এখন আর ক্ষমা করিব না।’
এই বলিয়া চক্র দিয়া শিশুপালের মস্তক ছেদন করিলেন।”
১০. নারায়ণী সেনা দেওয়ার কূটনীতি।
ঘটনা: যুদ্ধের আগে দুর্যোধন আর অর্জুন দুইজনেই কৃষ্ণের কাছে সাহায্য চাইতে যায়।
কৃষ্ণের কাজ: কৃষ্ণ বলেন, “একদিকে আমার ১ অক্ষৌহিণী নারায়ণী সেনা, যারা মহাযোদ্ধা। আরেকদিকে নিরস্ত্র আমি, শুধু পরামর্শ দিব। অর্জুন আগে আসছো, তুমি বাছো।”
অর্জুন নিরস্ত্র কৃষ্ণকে নেয়। দুর্যোধন খুশি হয়ে সেনা নেয়।
সংস্কৃত: উদ্যোগপর্ব, অধ্যায় ৭
একতোঽহমযুদ্ধ্যমানঃ সাংখ্যে নিবিষ্টঃ।
একতঃ সর্বসৈন্যং মে নারায়ণী চমূর্যুধি॥ ৭.১৯॥
বাংলা: উদ্যোগপর্ব, ৭ অধ্যায় — “কৃষ্ণ বলিলেন, ‘একদিকে আমি যুদ্ধ করিব না, শুধু মন্ত্রণা দিব। অন্যদিকে আমার নারায়ণী সেনা। তুমি কোনটা চাও?’”
১১. ভূরিশ্রবাকে অন্যায়ভাবে বধ করানো।
ঘটনা: সাত্যকি আর ভূরিশ্রবার যুদ্ধ চলতেছে। অর্জুন এসে ভূরিশ্রবার অস্ত্রধরা ডান হাত কেটে দেন। ভূরিশ্রবা যুদ্ধ ছেড়ে যোগে বসেন।
কৃষ্ণের কাজ: কৃষ্ণ চুপ করে থাকেন। সাত্যকি তখন নিরস্ত্র, যোগে বসা ভূরিশ্রবার মাথা কাটে।
সংস্কৃত: দ্রোণপর্ব, অধ্যায় ১৪৩
ততোঽর্জুনো মহাবাহুঃ ক্ষুরপ্রেণ শিতেন হ।
ভূরিশ্রবসো বাহুং চিচ্ছেদ ভরতর্ষভ॥ ১৪৩.৩৮॥
প্রায়োপবিষ্টং তং দৃষ্ট্বা সাত্যকিঃ ক্রোধমূর্চ্ছিতঃ।
শিরঃ প্রচিচ্ছেদ তদা খড়্গেনামিত্রঘাতিনা॥ ১৪৩.৫১॥
বাংলা: দ্রোণপর্ব, ১৪৩ অধ্যায় — “অর্জুন ক্ষুরপ্র দিয়া ভূরিশ্রবার দক্ষিণ বাহু ছেদন করিলেন। ভূরিশ্রবা প্রায়োপবেশনে বসিলেন। তখন সাত্যকি খড়্গ দিয়া তাঁর শিরশ্ছেদ করিলেন। কৃষ্ণ নিষেধ করিলেন না।”
নীতি ভঙ্গ: নিরস্ত্র, যোগে বসা লোককে মারা ধর্মযুদ্ধের নিয়মে নিষেধ।
১২. একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে নেওয়া — পরোক্ষ ছল।
ঘটনা: একলব্য দ্রোণের মূর্তি সামনে রেখে ধনুর্বিদ্যায় অর্জুনের চেয়ে ভালো হয়ে যায়।
কৃষ্ণের ভূমিকা: সরাসরি না। কিন্তু সভাপর্বে কৃষ্ণ নিজেই একলব্যকে মারেন, কারণ একলব্য জরাসন্ধের পক্ষে ছিল। তবে আঙুল কাটার পিছনে দ্রোণের দাবি ছিল অর্জুনকে শ্রেষ্ঠ রাখা। আঙুল কাটার পিছনে কৃষ্ণ-এর সরাসরি ভূমিকা নাই।
সংস্কৃত: হরিবংশ বিষ্ণুপর্ব ৯১
একলব্যং ততো হত্বা রুক্মিণীহরণে কৃষ্ণঃ।
বাংলা: হরিবংশ বিষ্ণুপর্ব ৯১, “রুক্মিণী হরণের সময় কৃষ্ণ একলব্যকে বধ করেন।”
ছল: গুরুদক্ষিণার নামে প্রতিভা নষ্ট করা। কৃষ্ণ এর বিরোধিতা করেন নাই।
১৩. বর্বরিকের মাথা চেয়ে নেওয়া।
ঘটনা: ভীমের নাতি বর্বরিক। তার কাছে ৩টা বাণ ছিল, যুদ্ধ একদিনে শেষ করতে পারত। সে প্রতিজ্ঞা করে “যে পক্ষ দুর্বল তার হয়ে লড়ব।”
কৃষ্ণের কাজ: কৃষ্ণ ব্রাহ্মণ সেজে গিয়া বলেন, “গুরুদক্ষিণা দাও। তোমার মাথা দাও।” বর্বরিক মাথা দেয়। শুধু মাথাটা যুদ্ধ দেখে।
সংস্কৃত: স্কন্দপুরাণ, মাহেশ্বর খণ্ড, কুমারিকা খণ্ড, অধ্যায় ৬০— মহাভারতে সরাসরি নাই, লোকপুরাণে আছে। কিন্তু রাজস্থানি ‘খাটু শ্যাম’ মন্দির এই কাহিনির উপর। মূল মহাভারতে নাই বলে ‘অপ্রধান সোর্স’
(মূল মহাভারতে বর্বরিকের গল্প নাই।)
১৪. জরাসন্ধ বধ — মল্লযুদ্ধের ছল।
ঘটনা: জরাসন্ধকে অস্ত্রে মারা যায় না। বর মতে তার শরীর জোড়া লাগানো, আলাদা করলে মরে।
কৃষ্ণের কাজ: ভীমকে ইশারা দেন। ভীম জরাসন্ধকে মল্লযুদ্ধে দুই ভাগ করে দুই দিকে ফেলে দেন। জোড়া না লাগতে পেরে মরে।
সংস্কৃত: সভাপর্ব, অধ্যায় ২৪
ততো ভীমো মহাবাহুর্গৃহীত্বা তং মহাবলম্।
দ্বিধা চকার তং মধ্যে পশ্যতাং সর্বধন্বিনাম্॥ ২৪.১৭॥
কৃষ্ণস্য মতে ভীমঃ চকারৈবং মহাবলঃ।
একং পাদং সমাক্রম্য দ্বিধা ভিত্ত্বা নরাধিপম্॥ ২৪.১৮॥
বাংলা: সভাপর্ব, ২৪ অধ্যায় — “কৃষ্ণের মতে ভীম জরাসন্ধকে ধরে মাঝখান দিয়ে চিরে দুই ভাগ করলেন। এক পা চেপে ধরে দুই খণ্ড করে দুই দিকে ফেলে দিলেন, যাতে জোড়া না লাগে।”
ছল: সরাসরি যুদ্ধে হারানো যাচ্ছিল না, তাই শরীরের গোপন দুর্বলতা কাজে লাগানো।
১৫. নরকাসুর বধ — সত্যভামাকে দিয়ে মারানো।
ঘটনা: নরকাসুরকে বর দেওয়া ছিল শুধু মা ভূদেবী মারতে পারবে।
কৃষ্ণের কাজ: কৃষ্ণ যুদ্ধ করেন, কিন্তু শেষ আঘাত সত্যভামাকে দিয়ে দেওয়ান। সত্যভামা ভূদেবীর অবতার।
সংস্কৃত: হরিবংশ, বিষ্ণুপর্ব, অধ্যায় ৬৩
ততঃ সত্যভামা দেবী জঘান দানবং শরৈঃ।
নারায়ণস্য বাক্যেন ভূমেঃ পুত্রং মহাবলম্॥ ৬৩.৫২॥
বাংলা: হরিবংশ, ৬৩ অধ্যায় — “নারায়ণের কথায় সত্যভামা দেবী বাণ দিয়ে ভূমিপুত্র নরকাসুরকে বধ করিলেন।”
ছল: নিজে না-মেরে বরের ফাঁকফোকর ব্যবহার করা।
১৬. রুক্মিণী হরণ — কন্যাপক্ষের অমতে তুলে নেওয়া।
ঘটনা: রুক্মিণীর বিয়ে শিশুপালের সাথে ঠিক। রুক্মিণী কৃষ্ণকে চিঠি লেখেন “আমাকে হরণ করো”।
কৃষ্ণের কাজ: বিয়ের দিন রুক্মিণী গৌরীপূজা দিতে মন্দিরে গেলে কৃষ্ণ রথে তুলে নিয়ে যান। রুক্মী বাধা দিলে তাকে হারিয়ে মুণ্ডন করে ছেড়ে দেন।
সংস্কৃত: হরিবংশ, বিষ্ণুপর্ব, অধ্যায় ৬০
ততঃ কন্যাং সমারোপ্য রথং গরুড়লক্ষণম্।
প্রযয়ৌ পুণ্ডরীকাক্ষঃ পশ্যতাং সর্বধন্বিনাম্॥ ৬০.৩৪॥
বাংলা: হরিবংশ, ৬০ অধ্যায় — “পুণ্ডরীকাক্ষ কৃষ্ণ সকল যোদ্ধার সামনে রুক্মিণীকে রথে তুলিয়া লইয়া প্রস্থান করিলেন।”
অন্যায় কোথায়: রাজকন্যা হরণ তখনকার নিয়মে ‘রাক্ষস বিবাহ’। ক্ষত্রিয়ের জন্য বৈধ, কিন্তু কন্যাপক্ষের সম্মতি নাই। শিশুপাল-জরাসন্ধের দল এটাকে ‘চুরি’ বলছে।
১৭. অশ্বত্থামার মণি কেড়ে নেওয়া ও অভিশাপ।
ঘটনা: যুদ্ধ শেষে অশ্বত্থামা ব্রহ্মশির অস্ত্র ছাড়ে। উত্তরা-গর্ভের সন্তান পরীক্ষিৎ মরে যায়। অর্জুনও ব্রহ্মশির ছাড়ে, পরে ফিরিয়ে নেয়। অশ্বত্থামা পারেন না।
কৃষ্ণের কাজ: কৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে বলেন, “তোমার মাথার মণি দাও, প্রাণে বাঁচবা।” মণি নিয়ে তাকে অভিশাপ দেন — “৩০০০ বছর একা ঘুরবা, রক্ত-পুঁজ গন্ধ হবে, লোকালয়ে ঢুকতে পারবা না।”
সংস্কৃত: সৌপ্তিকপর্ব, অধ্যায় ১৬
মণিং গৃহাণ ভদ্রং তে শিরসস্ত্বং মহাব্রত।
চরস্ব বিপ্র দুর্ধর্ষস্ত্রীণি বর্ষসহস্রকম্॥ ১৬.২৮॥
নিরাশ্রয়ো নির্জনে চ স্রবৎপূয়স্রবঃ ক্ষরন্॥ ১৬.২৯॥
বাংলা: সৌপ্তিকপর্ব, ১৬ অধ্যায় — “কৃষ্ণ বলিলেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, তোমার মাথার মণি দাও। তুমি ৩০০০ বছর একা ঘুরবে, শরীর থেকে পুঁজ-রক্ত ঝরবে, জনপদে আশ্রয় পাবে না।’”
ছল: অশ্বত্থামা ব্রাহ্মণ, চিরঞ্জীব। মেরে ফেলা যাবে না। তাই মণি কেড়ে চিরকালের জন্য পঙ্গু করে দেওয়া।
* গান্ধারীর অভিশাপ: স্ত্রীপর্ব, ২৫ অধ্যায় — গান্ধারী সরাসরি কৃষ্ণকে বলে:
জনার্দন, তুমি ইচ্ছা করলে যুদ্ধ থামাইতে পারতা। তুমি কুরুকুল ধ্বংস দেখছো, আত্মীয় মরছে, তুমি চুপ ছিলা। তুমিও ৩৬ বছর পর নিজের বংশ ধ্বংস হয়ে মরবা।”
কৃষ্ণ হাসে। বলে, “জানি। যাদবরা এমনিতেই ক্ষয় হবে। তুমি নিমিত্ত হইলা।”
মানে সে নিজের অন্যায় মানতেছে, কিন্তু বলতেছে ‘এটাই হওয়ার ছিল’।
** অর্জুনের খটকা: কর্ণপর্বে কর্ণ যখন ‘ধর্ম ধর্ম’ করে চেঁচায়, কৃষ্ণ অর্জুনকে বলে:
“কই ছিল তোমার ধর্ম যখন দ্রৌপদীকে টানছিল? কই ছিল যখন অভিমন্যুকে ৭ জনে মারল? এখন ধর্ম দেখাও?” কর্ণপর্ব ৯১.৫৮-৬৩
মানে ‘ওরা আগে ভাঙছে, তাই আমরাও ভাঙব’ — এই যুক্তি।
*** যুধিষ্ঠিরের গ্লানি: যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠির বলে — “ছল দিয়া রাজ্য নিলাম, আমার নরক হবে।” শান্তিপর্ব ৮।
কৃষ্ণ-ব্যাস তখন ‘আপদ্ধর্ম’ বুঝায় — “বিপদে ছোট পাপে বড় পুণ্য বাঁচে।”
No comments:
Post a Comment