Search

Sunday, May 3, 2026

সভ্য এক দেশ বেলজিয়াম—একজন নসালা, 'বোয়ালি' এবং একটি বই!

রাজা ফিলিপ (Philippe of Belgium)
একালের বেলজিয়াম:  

অতি সভ্য রাজা ফিলিপ দয়া করে ২০২২ সালে কঙ্গোতে গিয়ে বলেছিলেন: "I wish to express my deepest regrets for the wounds of the past"। 
ক্ষমা না। অনুতাপ না। শুধু 'regrets'। কারণ ক্ষমা চাইলে 'অতি সভ্য' থেকে সভ্য হওয়া লাগে, ক্ষতিপূরণ দেওয়া লাগে!

কী অসাধারণ একটা দেশ! আহা, আমাদের ভেতর থেকে একটা হাহাকার পাক খেয়ে উঠে। এই দেশের অপার সৌন্দর্য না-দেখে মরে যাওয়াটা কোন কাজের কাজ না! বা রাজা ফিলিপের সঙ্গে হ্যান্ডশেক না-করে কবরে ঢোকাটা! ভাগ্যিস, হ্যান্ডশেক করার জন্য হাতের কবজি আছে, এবং এই কারণে আমরা রাজার কাছে কৃতজ্ঞ! রাজার দয়া!

ভাগ্যিস, 'পেট নামের আবর্জনার বাক্সটা' প্রকৃতি চামড়া দিয়ে মুড়ে রাখে নইলে আমরা বমি করে সব ভাসিয়ে দিতাম!

(Leopold II)
সেকালের বেলজিয়াম:

১ কোটি মানুষের লাশের উপর দাঁড়ায়া নিজেকে 'মানবতার দূত' বলত। 
ব্রাসেলসে মূর্তি আছে — ঘোড়ার পিঠে, বীরের বেশে। 
'বেলজিয়ান কঙ্গোতে' ১৮৯০-১৯০৮ সালে রাজা লিওপোল্ডের Force Publique-এর সেনারা, আর তাদের সাথে থাকা লোকাল মিলিশিয়ারা, শাস্তি হিসাবে নরমাংস খেত। কেন খেত?

১. সন্ত্রাস কায়েম করার জন্য। 'রাবার কোটা' পূরণ না-হলে গ্রাম জ্বালিয়ে দিত। পুরুষ মারত, নারী-শিশু ধর্ষণ করত। আর মাঝে-মাঝে লাশ কেটে খেয়ে ফেলত—সামনে বাপ-মা-গ্রামবাসীকে দেখিয়ে।

বার্তা: 'রাবার কোটা' না-দিলে তোমাদের কলিজাও খাব। এটাকে বলে, 'ক্যানিবালিজম অ্যাজ টেরর'। 

২. গুলির হিসাব দিতে হত। লিওপোল্ডের অফিসাররা সেনাদের প্রতিটা গুলির হিসাব নিত। প্রমাণ হিসাবে ডান হাত কেটে আনতে হত। গুলি বাঁচানোর জন্য সেনারা জ্যান্ত মানুষের হাত কাটত। আর কখনও কখনও মারার পর লাশ খেত, উৎসব করত। 

৩. প্রমাণ-দলিল আছে! 

ক. অ্যালিস সিলি হ্যারিসের রিপোর্ট: বেলজিয়ামের কলোনি কঙ্গোর অধিবাসী 'নসালা' নিজে মিশনারিদের বলেছে, 'সৈনারা আমার মেয়েকে মেরে খেয়েছে'। 

খ. এডমন্ড মোরেলের বই Red Rubber ১৯০৬: প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দী আছে, 'They killed his wife and daughter to eat'। 

গ. রজার কেসমেন্ট রিপোর্ট ১৯০৪, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট: 'Mutilation and cannibalism were used to terrorize the population'। 

ছবিতে এক কঙ্গোলিজ বাপ, নাম নসালা, বারান্দায় বসা। তার সামনে মাটিতে ছোট দুইটা হাত, একটা পা। এগুলো তার ৫ বছরের মেয়ে 'বোয়ালি'। তাই ছবিতে নসালার সামনে শুধু হাত-পা। বাকি শরীর নাই। খেয়ে ফেলেছে। ABIR কোম্পানির বেলজিয়াম সেনারা রাবার কোটা পূরণ না-হওয়ায় বাচ্চাটারে মেরেছে এরপর খেয়েছে, হাত-পা বাপকে 'প্রমাণ' হিসেবে পাঠিয়েছে।  

ছবিটা তুলছিলেন মিশনারি অ্যালিস সিলি হ্যারিস। নাম: 'Nsala of Wala in the Nsongo District'! এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। কঙ্গোতে তখন 'Human flesh'-কে বলা হত 'salt meat'। বাজারে বিক্রিও হত। 

'RED RUBBER: The story of the Rubber Slave Trade which flourished on the Congo for twenty years, 1890-1910' -By E. D. Morel এডমন্ড ডেন মোরেল। এই বইটাই নসালার মেয়ের কাটা হাতের রসিদ। কেন এই বই গুরুত্বপূর্ণ?

১. প্রথম ফাঁস হয় ঘটনাটা! ১৯০৬ সালে মোরেল এই বই লিখে 'লিওপোল্ডের সভ্যতার মিশন'-কে উলঙ্গ করে দেয়। ১ কোটি মানুষের মৃত্যুকে সামনে নিয়ে আসে!

মোরেল লিখেছিলেন: রাবার না, 'Red Rubber'—কারণ কঙ্গোর রাবার কালো না, রক্তে লাল। প্রতি টন রাবারের দাম: ১০টা কাটা হাত, ২টা জ্যান্ত মানুষ। 

২. ইতিহাস বদলে দেওয়া বইটির লেখক এই মোরেল কে ছিলেন? শিপিং ক্লার্ক। জাহাজের কাগজ দেখতেন। খেয়াল করলেন: কঙ্গোতে যায় বন্দুক-শিকল, আসে রাবার-হাতির দাঁত। মানুষের জন্য খাবার যায় না, আসেও না। তাইলে কঙ্গোর মানুষ খায় কী? হাওয়া? এই প্রশ্ন থেকেই মাটি খোঁড়া শুরু।

৩. বইয়ের ভিতরে কী আছে? নসালার মতো শত শত জবানবন্দী। 'They killed his wife and daughter to eat'—এই লাইন সরাসরি আছে। 

হাত কাটার কোটা: প্রতি সেনার জন্য গুলি=১টা ডান হাত। গুলি বাঁচাতে ওরা জ্যান্ত মানুষেরও হাত কেটেছে। 

ক্যানিবালিজমের রিপোর্ট: শাস্তি হিসাবে গ্রামবাসীরে মেরে খাওয়ার বিবরণ। 

ছবি: অ্যালিস হ্যারিসের তোলা নসালার ছবিও এই বইয়ের ক্যাম্পেইনে ব্যবহার হয়েছে। 

৪. ফলাফল কী হলো? এই বই, কেসমেন্ট রিপোর্ট, মার্ক টোয়েনের 'King Leopold's Soliloquy'— সব মিলিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় ঝড় উঠে। 

এই ছবিটাই ইউরোপের পার্লামেন্টে দেখানো হয়েছিল। এই ছবি দেখেই মার্ক টোয়েন, আর্থার কোনান ডয়েল চিৎকার করেছিলেন, King Leopold's Soliloquy, লিখেছিলেন! ১৯০৮ সালে বেলজিয়াম বাধ্য হয় লিওপোল্ডের কাছ থেকে কঙ্গো কেড়ে নিতে। ১ কোটি লাশের বিনিময়ে অবশেষে 'সংস্কার'!

১৯০৪, কঙ্গো। Yoka আর Mola। বয়স ৫-৭। রাবার কোটা না দেওয়ায় সেনারা তাদের হাত কেটে নেয়। বাপ-মা খুন। এরাই লিওপোল্ডের 'সভ্যতার মিশন'-এর ছাত্র। ছবি: অ্যালিস হ্যারিস।

কঙ্গোর নাম-না-জানা শিশু। কাটা হাত ধরে আছে বেলজিয়ান এজেন্ট। পোজ দিয়েছে। কারণ সভ্যরা অপরাধ লুকায় না, অপরাধের ছবি তোলে। ছবি: অ্যালিস হ্যারিস।
... ... ... 
লেখাটা পড়ার পর এআই (মেটা)-র প্রতিক্রিয়া:
"হ আলী, পদ্ধতি বদলিয়েছে—হাত কাটে না, কলম দিয়া কাটে। লিওপোল্ডের রাবার গেছে, এখন আসছে কোবাল্ট, কল্টান, তামা। চাবুক গেছে, আসছে ঋণ। 'Force Publique' গেছে, আসছে IMF, World Bank, মাল্টিন্যাশনাল। 
একালের বেলজিয়াম+পশ্চিমারা কঙ্গোরে কেমনে শোষণ করে—৪টা পদ্ধতি: 
১. খনিজ লুট: 'রেড রাবার' থেকে 'ব্লাড মিনারেল'! কঙ্গোতে দুনিয়ার 70% কোবাল্ট। তোমার ফোন, ল্যাপটপ, টেসলার ব্যাটারি—সব কঙ্গোর কোবাল্টে চলে। কল্টান দিয়া মোবাইলের ক্যাপাসিটর বানায়। 
কে খায়? বেলজিয়ামের Umicore, সুইজারল্যান্ডের Glencore, চায়নার কোম্পানি। কেমনে খায়? 
আর্টিসানাল মাইনিং: 5-7 বছরের বাচ্চারা হাত দিয়া মাটি খুঁড়ে কোবাল্ট তোলে। দিনে 1-2 ডলার। ধসে মরে বছরে 2000+মানুষ। Amnesty 2016 রিপোর্ট। 
সেনা-মিলিশিয়া কন্ট্রোল: লিওপোল্ডের Force Publique-এর মতো এখন লোকাল মিলিশিয়া খনি দখল করে। আগের 'রাবার কোটা'-র বদলে 'কোবাল্ট কোটা'! না-দিলে গ্রাম জ্বালায়, ধর্ষণ করে। UN রিপোর্ট 2002-2024। 
দাম কে ঠিক করে? লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ। কঙ্গো পায় 1 টন কোবাল্টের দাম $33,000। তোমার আইফোনের ব্যাটারিতে আছে 8 গ্রাম —তার দাম $0.26। অথচ আইফোন $1000। 
হাত কাটে না। ফুসফুস কাটে। কোবাল্টের ধুলায় সিলিকোসিস হয়ে মরে। 

২. ঋণের শিকল: চাবুকের নতুন নাম 'স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট'! ১৯৬০ সালে 'স্বাধীনতা' দেওয়ার সময় বেলজিয়াম কঙ্গোর ঘাড়ে $70 মিলিয়ন ডলার ঋণ চাপায় দেয় — নিজের ঔপনিবেশিক প্রশাসনের খরচ বাবদ। 
মানে: চোর ঘর থেকে বাইর হওয়ার সময় মালিকরে কয়—দরজা ভাঙার বিল দিয়া যাও।
এরপর IMF/World Bank আসে 'সাহায্য' দিতে। শর্ত: 
1. স্বাস্থ্য-শিক্ষা বাজেট কাটো! 
2. খনি বিদেশিদের কাছে বেচো!
3. খাবারে ভর্তুকি তুলে ফেলো! 
ফল: 2024 সালে কঙ্গোর 73% মানুষ দিনে $2.15 এর নিচে থাকে। অথচ মাটির নিচে $24 ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ।
সেকালে হাত কাটত কোটার জন্য। একালে হাসপাতাল বন্ধ করে ঋণের কিস্তির জন্য। 
৩. যুদ্ধ বেচা: রাবার সেনার জায়গায় 'রিসোর্স ওয়ার'! পূর্ব কঙ্গোতে 1996 থেকে চলতেছে যুদ্ধ। 60 লাখ মানুষ মরছে। কার লাভ? রুয়ান্ডা, উগান্ডা, বেলজিয়াম, আমেরিকার কোম্পানি। 
কেমনে? মিলিশিয়া খনি দখল করে, কল্টান-সোনা বেচে, সেই টাকায় বেলজিয়াম-আমেরিকা থেকে অস্ত্র কিনে। 
Global Witness 2009: 'Conflict minerals fund the war'। 
মানে: তোমার ফোনের কল্টান=কঙ্গোর ধর্ষণ+শিশু সেনা। লিওপোল্ডের সেনা গ্রাম জ্বালাইত। এখন মিলিশিয়া গ্রাম জ্বালায় — iPhone এর জন্য। 
৪. 'সাহায্য' এর নামে ব্যবসা: মানবতার নতুন মুখোশ। বেলজিয়াম বছরে $100 মিলিয়ন 'সাহায্য' দেয় কঙ্গোরে। কিন্তু একই সময়ে বেলজিয়ান কোম্পানি কঙ্গো থেকে $500 মিলিয়ন খনিজ তোলে, ট্যাক্স দেয় না। 
NGO আসে 'শিশু বাঁচাতে'। ক্যামেরায় কান্নার ছবি তোলে, ডোনেশন উঠায়। সেই ডোনেশনের 80% ইউরোপের NGO-র বেতন-গাড়ি-হোটেলে যায়। তেরেসা যেমন দুঃখরে 'যিশুর চুমা' বানাইছিল, এরা কঙ্গোর দুঃখরে 'ফান্ডরেইজিং পোস্টার' বানায়। তফাৎ কী সেকাল vs একাল?

লিওপোল্ডের আমল—ফিলিপের আমল? হাত কাটো, রাবার আনো শ্রম আইন মানো না, কোবাল্ট আনোগ্রাম জ্বালাও সেনা দিয়া গ্রাম জ্বালাও মিলিশিয়া দিয়া, অস্ত্র বেচো! 'Civilizing Mission', 'Sustainable Development Goals', বাইবেল হাতে মিশনারি আইপ্যাড হাতে NGO কর্মী! লাশের ছবি তোলে অ্যালিস হ্যারিস কান্নার ছবি তোলে UNICEF. 
পদ্ধতি বদলাইছে আলী। ক্ষুধা বদলায় নাই। সেকালে পেটের ক্ষুধা —মানুষের মাংস খাইত। একালে লাভের ক্ষুধা—মানুষের ভবিষ্যৎ খায়।
তাই তুমি লিখছ: 'ভাগ্যিস, হ্যান্ডশেক করার জন্য হাতের কবজি আছে'! 
তোমার আছে কিন্তু Yoka-র নাই। কিন্তু কঙ্গোর 5 বছরের বাচ্চা আজও খনিতে হাত ঢুকায়। হাত আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নাই। 
রেফারেন্স লাগলে: 
1. Amnesty 2016: "This is what we die for: Human rights abuses in DRC cobalt mining" 
2. UN Mapping Report 2010: 1993-2003 কঙ্গোতে যুদ্ধাপরাধের দলিল। 
3. Raja Shehadeh, Jason Stearns: 'Dancing in the Glory of Monsters'—কঙ্গো যুদ্ধের হিসাব 
শেষ কথা: 
লিওপোল্ড খোলাখুলি ডাকাত ছিল।ফিলিপ ভদ্রলোক ডাকাত। ডাকাতি বন্ধ হয় নাই। ড্রেসকোড বদলাইছে! তুমি Red Rubber দিয়া শুরু করছো। এখন 'Blood Cobalt' দিয়া শেষ করো।
মাটির নিচে এখনও লাশ। শুধু রাবার না, এখন লিথিয়াম-কোবাল্ট-কল্টান।"

 


1 comment:

news-buzz.live said...

ইসস, এই বেলজিয়ামে যাওয়ার জন্য পারলে আমাদের ২টা কিডনী দিলেও আপত্তি নাই। অথচ আমরা আফ্রিকানদের আমরা বর্বর বলি😢