প্রাণের উৎস ৩টা জায়গা থেকে আসতে পারে:
১. ভাতের ভেতর আগে থেকেই ডিম ছিল। চাল/ভাতের মধ্যে অনেক সময় আগে থেকেই ‘রাইস উইভিল’ Sitophilus oryzae, বা মথের ডিম/লার্ভা থাকে। ধান কাটার সময় মাঠেই পোকা ডিম পাড়ে। ডিম খালি চোখে দেখা যায় না। বোয়ামে আটকে রাখলে তাপ-আর্দ্রতায় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। তখন মনে হয় ভাত থেকেই পোকা হয়েছে।
২. বোয়াম ১০০% এয়ারটাইট ছিল না। ছোট মথ, ফ্রুট ফ্লাই, বা অন্য পোকা মুখের ফাঁক, স্ক্রু থ্রেডের চিপা দিয়া ঢুকে ডিম পাড়ে। ১ মিমি ফাঁক পেলেই Indian meal moth-এর মত পোকা ঢুকতে পারে। ডিম পেড়ে চলে যায়, কয়দিন পর লার্ভা কিলবিল করে।
৩. ঢাকার সময় পোকার ডিম/বাচ্চা ঢুকছে। ভাত ঠান্ডা করার সময়, চামচ দিয়া নাড়ার সময়, বা হাত থেকে ডিম পড়তে পারে। পরে মুখ বন্ধ করলেও ভেতরে যা ছিল তাই বাড়ছে।
তাহলে প্রাণ এলো কোথা থেকে? আগের প্রাণ থেকেই। ডিম→লার্ভা→পোকা। এটাকে বলে biogenesis—জীবন, জীবন থেকেই আসে।
'স্বতঃজনন' বা Spontaneous generation ভুল! ১৭শ শতক পর্যন্ত মানুষ ভাবতো পচা মাংস থেকে মাছি, ভাত থেকে পোকা আপনা-আপনি জন্মায়। ১৬৬৮ সালে Francesco Redi প্রমাণ করেন: মাংস খোলা রাখলে মাছি ডিম পাড়ে, তাই ম্যাগট হয়। জাল দিয়ে ঢেকে দিলে ম্যাগট হয় না।
১৮৬২ সালে Louis Pasteur হাঁসের-গলা ফ্লাস্ক দিয়ে দেখান: জীবাণু-মুক্ত ঝোলে বাতাস গেলেও প্রাণ জন্মায় না, যতক্ষণ বাইরে থেকে জীবাণু না ঢোকে। বোয়ামের ক্ষেত্রে মুখবন্ধ থাকলেও ১০০% জীবাণু/ডিম-মুক্ত ছিল না। হয় ভাতে আগে থেকেই ডিম ছিল, নয়তো কোনো ফাঁক দিয়া মা-পোকা ডিম পেড়ে গেছে। ওই ডিম ফুটেই কিলবিল।
পরীক্ষা করতে চাইলে: চাল ১০ মিনিট ৬০°C+ এ গরম করে, ঠান্ডা করে, সত্যিকারের এয়ারটাইট জারে রাখলে; ডিম মরে যাবে, বাইরে থেকেও ঢুকতে পারবে না—পোকা হবে না।
তাই প্রাণের উৎস 'ভাত' না, 'আগের কোনো প্রাণের ডিম' রাখলে মোটামুটি এইটা হবে — তাপ ∼২৫-৩০°C আর ঘরের আর্দ্রতা ধরলে:
৫ দিন পর
১. গন্ধ+চেহারা: টক-টক গন্ধ শুরু। ভাতটা ভিজা-ভিজা, চটচটে লাগবে। হালকা হলুদ/ধূসর ছোপ।
২. মাইক্রোব: ব্যাকটেরিয়া আর ইস্ট বাড়া শুরু করএছে। Bacillus cereus, ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া কাজ শুরু করে দেয়।
৩. পোকা: যদি ডিম আগে থেকে থাকে, ছোট সাদা লার্ভা দেখা যেতে পারে। ১-২ মিমি সাইজ। খালি চোখে সবসময় বোঝা যায় না।
১০ দিন পর!
১. ছাতা/মোল্ড: সাদা, সবুজ, কালো বা কমলা রঙের ছাতা গজাবে। Aspergillus, Penicillium, Rhizopus জাতীয় ফাঙ্গাস। উপরে তুলার মতো লেয়ার।
২. গ্যাস + ফোলা: ফার্মেন্টেশনে CO2, অ্যালকোহল, অ্যাসিড তৈরি হয়। ঢাকনা টাইট হলে বোয়ামে চাপ বাড়বে। খুললে ‘পস’ করে গ্যাস বের হবে। গন্ধ হবে পচা-টক, ভোমিটের মত।
৩. লার্ভা বড়: রাইস উইভিল বা মথের বাচ্চা ৩-৪ মিমি। ভাতের দানা ফাঁপা করে ফেলবে। কিলবিল স্পষ্ট।
৪. তরল: নিচে হলুদ-বাদামি পানি জমবে। ভাত পচে গলে যাচ্ছে।
২০ দিন পর?
১. ফুল পচন: ভাত প্রায় কালো/গাঢ় বাদামি কাদা-কাদা। ছাতা পুরা ঢেকে ফেলছে। গন্ধ অসহ্য—পচা, অ্যামোনিয়া, পায়খানার মত।
২. পোকা সাইকেল: লার্ভা→পিউপা →পূর্ণ পোকা। বোয়ামের গায়ে ছোট বিটল/মথ উড়তে পারে। অনেকগুলা মরা পোকাও পড়ে থাকবে।
৩. বিপদ: ছাতা থেকে মাইকোটক্সিন বের হয়। Aspergillus flavus হলে অ্যাফ্লাটক্সিন—মারাত্মক বিষ। খোলা মাত্র স্পোর বাতাসে ছড়ায়। নাকে গেলে অ্যালার্জি/ফুসফুসে সমস্যা।
৪. চাপ: গ্যাসে ঢাকনা ফুলে যাবে। কাঁচের বোয়াম হলে ফেটেও যেতে পারে।
মূল কথা:
বোয়াম ১০০% জীবাণুমুক্ত না-থাকলে ভাত পচবেই। প্রথমে ব্যাকটেরিয়া, তারপর ফাঙ্গাস, তারপর পোকা, এই সিরিয়ালে। ২০ দিনে ওটা আর ভাত থাকে না, জৈব-আবর্জনার বায়োল্যাব হয়ে যায়।
নোট: খুলতে গেলে সাবধান। গ্যাস+স্পোরের জন্য মুখ দূরে রাখতে হবে। বাইরে খুলতে হবে, মাস্ক পরতে হবে। খাওয়ার প্রশ্নই আসে না—ফুড পয়জনিং, লিভার ড্যামেজ পর্যন্ত হতে পারে।
হ্যাঁ, জার যদি সত্যি ১০০% এয়ারটাইটও হয়, তাও ব্যাকটেরিয়া আসতে পারে। কারণ সমস্যা জারের মুখে না, ভাতের ভেতরে।
ব্যাকটেরিয়ার উৎস ৩টা:
১. ভাত রান্নার আগেই চালের মধ্যে ছিল। ধান মাঠে থাকতে, গুদামে থাকতে, চালের গায়ে Bacillus cereus, Bacillus subtilis এর স্পোর লেগে থাকে। এই স্পোর ১০০°C এ ১০-১৫ মিনিট ফুটালেও মরে না। ভাত ঠান্ডা হলে ১০°C-৫০°C এর মধ্যে স্পোর জার্মিনেট করে ব্যাকটেরিয়া হয়ে যায়। রান্না করা ভাত ফ্রিজে না-রাখলে এটাই ফুড পয়জনিং এর মূল কারণ।
২. রান্না থেকে জারে ঢালার মাঝে ঢুকেছে। চামচ, হাত, বাতাস, রান্নাঘরের ধুলা, সবখানে ব্যাকটেরিয়া আছে। Lactobacillus, Leuconostoc, ইস্ট, মোল্ড স্পোর বাতাসে ভাসে। ভাত বেড়ে জারে ঢুকানোর ৩০ সেকেন্ডেই হাজার-হাজার মাইক্রোব ঢুকে যায়। তারপর ঢাকনা আটকালেও ভেতরে যা ঢুকছে তাই বংশ বাড়ায়।
৩. মানুষের হাত/লালা/স্কিন থেকে হাতে Staphylococcus, মুখের কাছে গেলে মুখের ব্যাকটেরিয়া, ভাতের গরম ভাপে উড়ে জারে পড়তে পারে।
এয়ারটাইট জার কী আটকায়, কী আটকায় না? আটকায়: নতুন বাতাস, নতুন পোকা, নতুন স্পোর ঢোকা। আটকায় না: ভাতের ভেতর আগে থেকে থাকা স্পোর, আর ঢালার সময় যা ঢুকছে।
প্রমাণ?
ল্যাবে ‘ক্যানিং’ করে। খাবার ১২১°C এ ১৫-২০ মিনিট প্রেশার কুকারে স্টেরিলাইজ করে, তারপর এয়ারটাইট সিল করে। তখন সব স্পোর মরে। ওটা বছরের-পর-বছর নষ্ট হয় না।
বাসায় জাস্ট ভাত রেঁধে গরম-গরম জারে ভরলেও স্টেরাইল হয় না। ১২১°C এ পৌঁছায় না, আর ঢালার সময় বাতাস থেকে কন্টামিনেশন হয়ই।
তাই এয়ারটাইট জার মানে ‘জীবাণুমুক্ত’ না। মানে ‘নতুন জীবাণু ঢুকবে না’। ভেতরে আগে যা ছিল তাই ৫/১০/২০ দিনে কিলবিল করবে।
টেস্ট: চাল ধুয়ে, প্রেশার কুকারে ১২১°C এ ২০ মিনিট সিদ্ধ করে, ওভেনে স্টেরিলাইজ করে জারে ঢেলে গরম অবস্থায় সিল করতে হবে না, হাত দেওয়া যাবে না। ওটা ৬ মাসেও পোকা/পচন হবে না। কারণ সব স্পোর মৃত।
ঠিক আছে, বোয়ামের ভাত থেকে প্রথম প্রাণের প্রশ্নে আসা যাক।
সংক্ষেপে: কেউ ১০০% শিওর না। কিন্তু বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত যে ছবিটা পেয়েছে সেটা এইরকম, “abiogenesis”। মানে প্রাণহীন রসায়ন থেকে প্রথম প্রাণ।
ধাপে ধাপে যেভাবে হতে পারে:
১. পৃথিবীর অবস্থা ৪ বিলিয়ন বছর আগে। তখন O2 নাই, ওজোন লেয়ার নাই, UV রেডিয়েশন সরাসরি পড়ে। আগ্নেয়গিরি, বজ্রপাত, উল্কাপাত কমন। সমুদ্র আছে, কিন্তু পানি টগবগে গরম জায়গায়, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের 'হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট' বা অগভীর পুকুরে।
২. ‘ইট’ তৈরি হওয়া: জৈব অণু।
H2O, CH4, NH3, H2, CO2 থেকে বিদ্যুৎ, UV, তাপ পেয়ে অ্যামিনো অ্যাসিড, নিউক্লিওটাইড, শর্করা, লিপিড তৈরি হয়।
প্রমাণ: Miller-Urey এক্সপেরিমেন্ট 1953। বদ্ধ ফ্লাস্কে আদি পৃথিবীর গ্যাস + বজ্রপাতের সিমুলেশন→১ সপ্তাহে ২০+ অ্যামিনো অ্যাসিড।
উল্কাতেও এগুলা পাওয়া যায়। Murchison উল্কায় ৯০+ অ্যামিনো অ্যাসিড, DNA/RNA এর বেসও আছে। মানে ইটগুলা মহাকাশেও বানায়।
৩. ইট জোড়া লাগা: পলিমার।
অ্যামিনো অ্যাসিড→প্রোটিন। নিউক্লিওটাইড→RNA/DNA।
সমস্যা: পানিতে জোড়া লাগা কঠিন। তাই বিজ্ঞানীরা ভাবে গরম পুকুরে শুকানো-ভেজা সাইকেল, অথবা ক্লে/খনিজের সারফেস ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করছে। Montmorillonite ক্লে RNA এর চেইন বানাতে সাহায্য করে, ল্যাবে প্রমাণিত।
৪. ‘বোয়াম’ তৈরি: মেমব্রেন।
লিপিড পানিতে দিলে আপনা-আপনি গোল বাবল/ভেসিকল বানায়। এইটা কোষের মেমব্রেনের মত। ভেতরে রসায়ন আটকায়া যায়, বাইরের থেকে আলাদা হয়। একেকটা 'প্রোটোসেল'।
৫. কপি করার ক্ষমতা: RNA World। প্রথমে DNA না, RNA আসার সম্ভাবনা বেশি। কারণ RNA একাই তথ্য রাখতে পারে+ রাসায়নিক বিক্রিয়া ক্যাটালাইজ করতে পারে = 'রাইবোজাইম'।
ল্যাবে RNA নিজেই নিজেকে কপি করতে পারে এমন টুকরা বানানো গেছে। একবার কপি শুরু হলে ডারউইনিয়ান সিলেকশন শুরু: যে RNA ভাল কপি হয় সে টিকে, বাকিরা বাদ।
৬. মেটাবলিজম + কোড।
RNA-র আশেপাশে প্রোটিন বানানো শুরু হয়। পরে DNA আসে কারণ DNA বেশি স্টেবল, তথ্য রাখার হার্ডডিস্ক। প্রোটিন বানায় কাজের মেশিন। এই তিনটা—DNA, RNA, প্রোটিন—একসাথে কাজ করা প্রথম কোষ = LUCA, Last Universal Common Ancestor। ∼৩.৮-৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে।
LUCA-র প্রমাণ আছে?
হ্যাঁ। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় ৩.৪৮ বিলিয়ন বছরের স্ট্রোমাটোলাইট ফসিল। গ্রিনল্যান্ডে ৩.৭ বিলিয়ন বছরের কার্বন আইসোটোপ সিগনেচার, জীবন ছাড়া হয় না। সব আজকের জীবের DNA/RNA/ATP/রাইবোজোম এক, তাই একটাই কমন পূর্বপুরুষ ছিল।
বিকল্প হাইপোথিসিস:
১. হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট': সমুদ্রের তলায় ক্ষারীয় ভেন্টে প্রাকৃতিক প্রোটন গ্রেডিয়েন্ট আছে, এটাই প্রথম শক্তির উৎস। লোহা-সালফার খনিজ ক্যাটালিস্ট।
২. প্যানস্পার্মিয়া: জীবনের ইট বা জীবাণু উল্কা/ধূমকেতু দিয়ে এসেছে। কিন্তু তাতে প্রশ্ন শুধু জায়গা বদলায়, প্রথম জীবন কীভাবে হয়েছে সেটা থেকেই যায়।
3. উষ্ণ ছোট পুকুর: ডারউইনই বলছিল। শুকানো-ভেজা সাইকেল, UV, বজ্রপাত, পলিমার বানানোর জন্য ভালো।
তাহলে বোয়ামের ভাতের সাথে মিল কোথায়? বোয়ামে পোকা আসে কারণ আগে থেকেই ডিম ছিল= biogenesis। কিন্তু ৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে কোনো ডিম ছিল না, কোনো জীবন ছিল না। তখন রসায়ন →প্রথম কপি-করতে-পারা অণু→ কোষ। এটাই abiogenesis।
সোজা কথা:
ভাত≠আদি পৃথিবী। ভাতে আগে থেকেই জীবনের স্পোর/ডিম থাকে। আদি পৃথিবীতে ছিল শুধু গ্যাস, পানি, খনিজ, শক্তি। কয়েক কোটি বছরে ধাপে ধাপে রসায়ন→ RNA→ কোষ।
এখনো ল্যাবে 'শূন্য থেকে ফুল ব্যাকটেরিয়া' বানানো যায় নাই। কিন্তু প্রতিটা ধাপ আলাদা আলাদা করে বানানো গেছে। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করে রাস্তাটা এইরকমই ছিল।
অল্প কথায়:
১. মালমশলা জমা হলো: ৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সমুদ্রে পানি, গ্যাস, খনিজ ছিল। বজ্রপাত, UV, আগ্নেয়গিরির তাপে অ্যামিনো অ্যাসিড, শর্করা, লিপিড, জীবনের ইট তৈরি হলো।
২. 'ইট জোড়া লাগলো': গরম পুকুর বা সমুদ্রের তলার ভেন্টে ওই ইটগুলা জোড়া লেগে RNA বানাইলো। RNA এমন অণু যে নিজের কপি নিজে বানাইতে পারে।
৩. বোয়াম হলো: লিপিড আপনা-আপনি বাবল বানায়। একেকটা বাবলের ভেতর RNA আটকা পড়লো। এইটাই প্রথম ‘কোষ’।
৪. কপি আর বাছাই শুরু: যে বাবলের RNA ভালো কপি হইতো সে টিকে গেল, বাকিগুলা নষ্ট। কোটি কোটি বছরে DNA, প্রোটিন আসলো। ব্যস, রসায়ন থেকে প্রথম কোষ। সেই কোষ থেকে বিবর্তনে বাকি সব প্রাণ। শূন্য থেকে প্রাণ আসে নাই, রসায়ন থেকে এসেছে।
না, পুরাপুরি 'শূন্য থেকে প্রাণ' এখনো ল্যাবে বানানো যায় নাই। কিন্তু কী পেরেছে আর কী পারে নাই:
১. যা পেরেছে:
ইট বানানো: Miller-Urey ১৯৫৩ সালে আদি পৃথিবীর গ্যাস+বিদ্যুৎ দিয়ে অ্যামিনো অ্যাসিড বানাইছে। এখন চিনি, লিপিড, RNA-এর বেসও বানানো যায়।
RNA নিজে কপি করে: ২০০৯ সালে Jack Szostak এর ল্যাবে RNA এনজাইম বানাইছে যেটা নিজের ছোট কপি বানায়।
প্রোটোসেল বানানো: লিপিডের বাবল বানিয়ে ভেতরে RNA, রাইবোজোম ঢুকিয়ে দিয়েছে। বাবল বড় হয়, ভাগও হয়। মানে ‘খায়-বাড়ে-ভাগ হয়’ এই ৩ কাজ করে।
জিনোম লিখে ব্যাকটেরিয়া চালু করা: Craig Venter ২০১০ সালে কম্পিউটারে DNA কোড লিখে, কেমিক্যাল দিয়ে বানিয়ে, খালি কোষে ঢুকিয়ে ‘Synthia’ ব্যাকটেরিয়া চালু করেছে। কিন্তু খালি কোষটা আগে থেকেই জীবিত ব্যাকটেরিয়া থেকে নেয়া।
২. যা পারে নাই:
শূন্য থেকে, শুধু কেমিক্যাল দিয়ে, একটা নতুন কোষ বানানো যায় নাই যেটা নিজে খায়, বড় হয়, কপি করে, বিবর্তন করে।
সমস্যা: সব পার্ট আলাদা আলাদা কাজ করে, কিন্তু একসাথে ‘জোড়া’ লেগে টিকে থাকে না। RNA ভাঙে, মেমব্রেন ফুটা হয়, মেটাবলিজম চলে না।
তাই অবস্থা কী? বিজ্ঞানীরা রাস্তার প্রতিটা ইট বানাতে পেরেছে। ইট জোড়া দিয়া দেয়ালের টুকরাও বানিয়েছে। কিন্তু পুরো ঘর বানাতে, সেখানে মানুষ ঢোকাতে পারে নাই এখনো। মানে ‘abiogenesis’ ল্যাবে ১০০% প্রমাণিত না। তবে ধাপগুলা যে সম্ভব, সেটা আলাদা আলাদা প্রমাণিত।
যেটা বলা হলো, 'এই যুক্তি তোমার হজম হয়নি'! হজম না-হওয়া স্বাভাবিক। কারণ ফাইনাল প্রমাণ এখনো বাকি।
তুমি বলছো আদিতে যেভাবে প্রাণ এসেছে বলা হচ্ছে তা ল্যাব...? আসলে হিসাবটা অত সোজা না।' জানা' আর 'বানানো' এক জিনিস না।
উদাহরণ দেই:
১. আমি জানি বজ্রপাত কেমনে হয়: মেঘে চার্জ জমে, পজিটিভ-নেগেটিভ ডিসচার্জ। প্রমাণও আছে। কিন্তু আমি কি ঘরের মধ্যে আসল বজ্রপাত বানাইতে পারবো? না। কারণ স্কেল, শক্তি, কন্ডিশন মিলানো যায় না।
২. আমি জানি পাহাড় কেমনে হয়: টেকটোনিক প্লেট ধাক্কা খায়। প্রমাণ আছে, হিমালয় বাড়ছে। কিন্তু ল্যাবে হিমালয় বানাতে পারবো? না! ৫ কোটি বছর আর হাজার কিমি প্লেট লাগবে।
প্রাণের বেলায় সমস্যা ৪টা:
১. সময়: পৃথিবীতে প্রথম কোষ আসতে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি বছর লাগছে। ল্যাবে ৫০ বছর ধরে চেষ্টা চলতেছে। অনুপাত ১ কোটি : ১।
২. শর্ত জানি না: আদি পৃথিবীর গ্যাসের মিক্স কী ছিল, তাপ কত ছিল, pH কত, কোন খনিজ ক্যাটালিস্ট ছিল, সব আন্দাজ। ১০০০টা ভেরিয়েবল। কোন কম্বিনেশনে হইছিল কেউ শিওর না।
৩. স্কেল: সারা সমুদ্র জুড়ে, কোটি-কোটি পুকুরে, প্রতি সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন রিঅ্যাকশন হয়েছে। কিন্তু আমরা ল্যাবে ১টা ফ্লাস্কে ১টা চেষ্টা করি। লটারির টিকিট ১টা কিনে জ্যাকপট আশা করার মত।
৪. 'রেসিপি' আছে, 'হাতের কৌশল নাই': রান্নার বই পড়ে বিরিয়ানি রান্না শেখা আর মা’র হাতের বিরিয়ানি বানানো এক না। কেমিক্যাল ইকুয়েশন জানি, কিন্তু কোন তাপমাত্রায় কতক্ষণ নাড়তে হবে, কোন স্টেপে কী ভুল হলে সব ভেস্তে যায়, ওটা জানি না।
তাই বিজ্ঞানীরা কী বলেন? 'আমরা মোটামুটি পথ জানি: ইট→পলিমার →প্রোটোসেল→কোষ। প্রতিটা ধাপ ল্যাবে আলাদা করে হয়েছে। কিন্তু সব ধাপ একসাথে, সঠিক সিকোয়েন্সে, সঠিক শর্তে এখনো জোড়া লাগানো যায় নাই।'
প্রমাণ আছে, কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রমাণ। ফসিল আছে, আইসোটোপ আছে, ল্যাবে ইট বানানো যায়। কিন্তু ভিডিও নাই। তাই 'জানি' মানে '১০০% রিপিট করতে পারি' না।
রাইট ব্রাদার্স জানতো পাখি কেমনে উড়ে, তাও প্লেন বানাইতে ৫০০০ বার ক্র্যাশ করেছে। প্রাণ বানানো তার চেয়ে ট্রিলিয়ন গুণ জটিল।
তাই তোমার 'হজম না হওয়া' যৌক্তিক। ফাইনাল প্রমাণ=ল্যাবে প্রাণ বানানো। ওটা এখনো হয় নাই।
ন্যানো স্কেলে বজ্রপাত? বানানো যায়। বানানো হয়ও। ল্যাবে 'আসল বজ্রপাত' এর ছোট ভার্সন বানায় প্রতিদিন:
১. 'স্ট্যাটিক স্পার্ক: উলের সোয়েটার খুললে যে চটাস করে, কম্বল থেকে যে শক খাও, ওটা মিনি বজ্রপাত। একই ফিজিক্স: চার্জ জমে→এয়ার ব্রেকডাউন→স্পার্ক। ভোল্টেজ ৫-২০ হাজার, দূরত্ব ১ সেমি। আসল বজ্রপাত ১০ কোটি ভোল্ট, ৫ কিমি।
২. 'টেসলা কয়েল: ইউটিউবে দেখো। টেবিলের উপর ১০-১৫ সেমি বজ্র বানায়। স্কেল ছোট, কিন্তু মেকানিজম সেম।
৩. 'ন্যানো-গ্যাপ': ল্যাবে ২টা ইলেকট্রোড ১০ ন্যানোমিটার দূরে রেখে কয়েক ভোল্ট দিলেই ভ্যাকুয়ামে ইলেকট্রন লাফায়, ফিল্ড এমিশন। এটাও 'ডিসচার্জ'। মানে বজ্রপাতের মিনি ভার্সন বানায়া দেখানো যায়। কারণ ফিজিক্সটা সহজ, স্কেল কমালেও নীতি একই থাকে।
এবার প্রাণে আসো। ন্যানো স্কেলে প্রাণ? এখানেই ধরা। প্রাণের 'ন্যানো ভার্সন' নাই। বজ্রপাত=ইলেকট্রন লাফ দিলেই হলো। ১টা ইলেকট্রন, ১০টা, ১০^২০টা—সবই বজ্রপাত। স্কেল ম্যাটার করে না।
প্রাণ=মিনিমাম ২০০-৪০০ জিন, ১০০+ প্রোটিন, মেমব্রেন, রাইবোজোম, মেটাবলিজম একসাথে কাজ করা লাগবে। এটাকে ছোট করতে গেলে কাজ করে না। Mycoplasma genitalium, সবচেয়ে ছোট স্বাধীন ব্যাকটেরিয়া — ৫২৫টা জিন, ডায়ামিটার ২০০-৩০০ ন্যানোমিটার। এর নিচে গেলে ওটা 'জীবিত' থাকে না।
ল্যাবে যা হইছে 'ন্যানো স্কেলে':
১. RNA বানানো: ১০-২০টা নিউক্লিওটাইডের RNA ল্যাবে বানায়া কপি করানো গেছে। এটা 'প্রাণ' না, কিন্তু কপি করার ক্ষমতা আছে।
২. 'লিপিড বাবল: ১০০ ন্যানোমিটার ভেসিকল বানায়া ভেতরে RNA ঢোকানো গেছে। বাবল বড় হয়, ভাগ হয়।
৩. Synthia: কম্পিউটারে ১০ লাখ বেস-পেয়ার DNA লিখে কেমিক্যাল দিয়া বানিয়ে খালি কোষে ঢুকিয়েছে। কোষটা বেঁচেছে, বংশ বেড়েছে। কিন্তু খালি কোষটা আগে থেকেই জীবিত ছিল।
মানে ইঞ্জিনের পার্টস বানিয়েছি, চাকা বানিয়েছি, পেট্রোলও আছে। কিন্তু পুরো গাড়ি স্টার্ট দেয় নাই।
তাহলে কেন দেখাইতে পারি না? কারণ 'কী-কী লাগবে এর লিস্ট এখনো কমপ্লিট না। বজ্রপাতের লিস্ট: চার্জ+এয়ার+পথ। সিম্পল।
প্রাণের লিস্ট: ৫০০ পাতার রেসিপি, তার মধ্যে ২০ পাতা ছেঁড়া। ওই ২০ পাতা না-পেলে রান্না নামানো যাবে না।
'তুমি বেকুব না'। প্রশ্নটা ভ্যালিড। বিজ্ঞানীরাও এই খোঁচা নিজেদেরকে দেয় প্রতিদিন। যেদিন ন্যানো স্কেলে হোক, মাইক্রো স্কেলে হোক—একটা ফ্লাস্কে কেমিক্যাল ঢেলে জীবিত কোষ বের হবে, ওইদিন 'হজম' হবে।
এখন পর্যন্ত উত্তর: পারি নাই। হ্যাঁ, তোমার কথায় পয়েন্ট আছে। বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত যা করছে তা 'প্রকৃতির নকল'ই।
১. Synthia ব্যাকটেরিয়া: DNA কম্পিউটারে লিখছি, হাতে বানাইছি। কিন্তু ডিজাইনটা আমরা নিয়েছি Mycoplasma থেকে। খালি কোষটাও আরেক ব্যাকটেরিয়া থেকে। মানে ইঞ্জিনের নকশা চুরি করে, পুরান চেসিসে নতুন ইঞ্জিন বসিয়েছি।
২. 'প্রোটোসেল': লিপিড বাবল বানাই, RNA ঢোকাই। কিন্তু লিপিড প্রকৃতি থেকেই নেয়া, RNA এর সিকোয়েন্সও প্রাকৃতিক RNA দেখে কপি করা।
৩. 'Miller-Urey: অ্যামিনো অ্যাসিড বানিয়েছি, কিন্তু পরিবেশটা আদি পৃথিবীর নকল।
মানে 'শূন্য থেকে' কিছু হয় নাই। সবখানেই প্রকৃতির রেফারেন্স আছে।
কেন? কারণ :নিজ থিকা বানানো' মানে ২টা জিনিস লাগবে:
১. 'নতুন ফিজিক্স: প্রাণের জন্য কার্বন, পানি, DNA লাগবেই, এই নিয়ম ভাঙতে হবে। নতুন কোনো কেমিস্ট্রি, নতুন কোনো ইনফরমেশন স্টোরেজ বানাতে হবে যেটা প্রকৃতিতে নাই। ওটা এখনো কেউ জানে না।
২. 'উদ্দেশ্য ছাড়া কমপ্লেক্সিটি': প্রকৃতিতে প্রাণ আসছে এলোমেলো ট্রায়াল-এরর এ, ১০০ কোটি বছর ধরে। ল্যাবে আমরা টার্গেট সেট কইরা কাজ করি। 'এলোমেলোভাবে কিছু বানাও, দেখো প্রাণ হয় নাকি', এই এক্সপেরিমেন্ট করার সময় বা পয়সা কারো নাই।
তাহলে কি বিজ্ঞান ফেল? না। বিজ্ঞান দাবি করে না, 'আমরা সৃষ্টিকর্তা:। বিজ্ঞান বলে: 'প্রকৃতি কীভাবে কাজ করে সেটা বুঝছি, টুকরা টুকরা নকল করতে পারছি'।
আমরা প্লেন বানিয়েছি, কিন্তু পাখির মত পালক গজিয়ে উড়তে পারি না। কম্পিউটার বানিয়েছি, কিন্তু তা ব্রেইনের মত ২০ ওয়াটে চলে না। সবই নকল, আর নকলটা আসলের চেয়ে খারাপ।
তোমার আসল কথা: শেপ বদলাইছো কেবল! নিজ থেকে কিছু বানাইতে পারো নাই, এইটা ১০০% সত্য।
যেদিন ল্যাবে ৫টা গ্যাস ঢুকিয়ে, কোনো DNA/RNA/কোষের হেল্প ছাড়া, একদম নতুন কেমিস্ট্রির একটা জিনিস বানানো যাবে; যেটা খায়, বড় হয়, বাচ্চা দেয়, মরে! ওইদিন আমরা বলতে পারবো 'নিজ থেকে বানিয়েছি'। ওই দিন এখনো আসে নাই। তাই তোমার 'হজম না হওয়া' একদম লজিক্যাল।
আমি খালি এটুকুই দেখাতে পারি: প্রকৃতি কী করছে তার টুকরা টুকরা নকল। পুরাটা না। হ্যাঁ, 'লাখ-কোটি বছর' শুনলেই মাথা ঘুরায়। আমাদের ব্রেইন ১০০ বছরই ঠিকমত বোঝে না, কোটি বছর তো দূর। তাই হজমে সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক।
ওয়েল, উল্কাপিন্ড দিয়ে প্রাণের উপাদান আসছে? আমি কী মনে করি: হ্যাঁ, উপাদান আসছে, এটা প্রমাণিত। প্রাণ আসছে, এটা প্রমাণিত না।
১. কী আসছে উল্কাপিন্ডে?
অ্যামিনো অ্যাসিড: Murchison উল্কায় ৯০+ ধরনের পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ১৯টা পৃথিবীর প্রাণে ইউজ হয়।
নিউক্লিওবেস: DNA/RNA এর A, G, U, C সবগুলাই পাওয়া গেছে। ২০২২ সালে Ryugu উল্কাতেও পাইছে।
শর্করা: Ribose, যেটা RNA এর মেরুদণ্ড।
লিপিড: মেমব্রেন বানানোর ফ্যাটি অ্যাসিড।
পানি: কার্বনেসিয়াস কন্ড্রাইট উল্কায় ১০-২০% পানি থাকে। পৃথিবীর সাগরের পানির একটা অংশ মহাকাশ থেকে আসা। মানে প্রাণের 'ইট, সিমেন্ট, রড', সবই উল্কা ডেলিভারি দিয়েছে।
২. কিন্তু 'প্রাণ' নিজে এসেছে?
না। কোনো উল্কায় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, বা জীবিত কোষ পাওয়া যায় নাই। ALH84001 নামে মঙ্গলের উল্কায় 'ন্যানো-ব্যাকটেরিয়ার ফসিল' দাবি উঠছিল ১৯৯৬ সালে। পরে প্রমাণ হয়েছে ওইগুলো খনিজ ক্রিস্টাল, প্রাণ না।
৩. তাহলে থিওরিটা কী? প্যানস্পার্মিয়া ২ রকম:
ক. লিথো-প্যানস্পার্মিয়া: অন্য গ্রহে প্রাণ ছিল, উল্কার ধাক্কায় পাথরের টুকরার সাথে স্পোর ছিটকে এসেছে। সমস্যা: মহাকাশের রেডিয়েশন, ভ্যাকুয়াম, পৃথিবীতে ঢোকার সময় ২০০০°C তাপ, স্পোর বাঁচবে না। Tardigrade-ও মরে যাবে। তাই সম্ভাবনা কম।
খ. সিউডো-প্যানস্পার্মিয়া: এটা মেইনস্ট্রিম বিজ্ঞান মানে। প্রাণ না, প্রাণের কাঁচামাল এসেছে। উল্কা, ধূমকেতু ৪ বিলিয়ন বছর আগে বোমাবর্ষণ করে কার্বন, পানি, অ্যামিনো অ্যাসিড ঢেলেছে। পৃথিবীর 'স্যুপ' ঘন করছে। তারপর এখানেই রসায়ন হয়ে প্রাণ হয়েছে।
আমি কী মনে করি?
ডেটা যেটা বলে: উপাদান ১০০% এসেছে। উল্কা ছাড়া পৃথিবীতে এত কার্বন, পানি আসতো না। প্রাণ নিজে এসেছে কিনা, কোনো প্রমাণ নাই। Occam's Razor: সহজ ব্যাখ্যা হলো 'এখানেই হয়েছে, কাঁচামাল বাইরে থেকে এসেছে'।
লাখ-কোটি বছরের হজমের টোটকা:
১ সেমি করে আগাইলে ১ কিমি যেতে ১ লাখ স্টেপ লাগে। প্রতিটা স্টেপ সিম্পল। কিন্তু ১ লাখ স্টেপ একসাথে চিন্তা করলে মাথা ঘোরায়। বিবর্তন/abiogenesis ওইরকম, প্রতি স্টেপ ছোট, সময় বিশাল। তাই 'উল্কায় প্রাণ এসেছে', না। 'উল্কায় মালমশলা এসেছে', হ্যাঁ।
এটা হজম হয়? হাহা, বেকুবের পেট হলেও খাঁটি কথা বলো তুমি।
১. তুমি বললে, 'সমস্ত উল্কার সন্ধান পেয়েছো'? না ভাই, পাই নাই। ১০০% গ্যারান্টি। এখন পর্যন্ত ∼৭০ হাজার উল্কা কুড়িয়ে ল্যাবে আনা হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন ৫০ টনের মত মহাজাগতিক ধুলো আর উল্কা পৃথিবীতে পড়ে। ৪.৫ বিলিয়ন বছরে কত ট্রিলিয়ন টন পড়েছে হিসাব নাই। অ্যান্টার্কটিকা আর সাহারা বালু থেকে যা পাই, ওটা সাগরে/জঙ্গলে পড়া ৯৯.৯৯% এর তুলনায় নস্যি।
তাই 'উল্কায় প্রাণের উপাদান আছে' এইটা স্যাম্পল দেখে বলি। সব উল্কা চেক করি যায়নি। কালকেই হয়তো এমন উল্কা পড়বে যেটায় ব্যাকটেরিয়ার ফসিল আছে। পাওয়া যায়নি মানে 'নাই' না।
২. 'অন্য গ্রহ থেকে কেউ ডাম্প করে নাই? এটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না'! একদমই ঠিক। এটার নাম Directed Panspermia।
ক্রিক-ওরগেল, মানে DNA ডাবল হেলিক্সের আবিষ্কারক ফ্রান্সিস ক্রিক নিজেই এই হাইপোথিসিস দিছিলেন ১৯৭৩ সালে। উনার কথা:
'পৃথিবীর প্রাণ এত ইউনিফর্ম, এত কমপ্লেক্স, মনে হয় কোনো উন্নত সভ্যতা ইচ্ছা করে বীজ ছড়ায়া দিছে। আনম্যানড স্পেসশিপে ব্যাকটেরিয়া ভরে পাঠিয়ে দিয়েছে'।
এটা উড়িয়ে দেই না কেন? কারণ প্রমাণও নাই, অপ্রমাণও নাই। বিজ্ঞান বলে :Extraordinary claims require extraordinary evidence'। এলিয়েন ডাম্প করেছে দাবি করতে হলে এলিয়েনের ডাস্টবিন, স্পেসশিপের টুকরা, বা DNA তে 'Made in Andromeda' সিগনেচার লাগবে। ওটা নাই।
কিন্তু লজিক্যালি অসম্ভব না। মানুষই তো মঙ্গলে রোভার পাঠায়। ১০০ বছর পর আমরাই হয়তো অন্য গ্রহে ব্যাকটেরিয়া 'ডাম্প' করবো টেরাফর্মিং এর জন্য।
তাহলে বিজ্ঞান কী করে? সবচেয়ে সিম্পল ব্যাখ্যা দিয়া শুরু করে যেটার প্রমাণ আছে। এখন পর্যন্ত প্রমাণ:
১. উল্কায় কাঁচামাল আছে ✓
২. পৃথিবীতে রসায়ন থেকে কমপ্লেক্স অণু হয় ✓
৩. এলিয়েন ✓ — প্রমাণ নাই
তাই বইয়ে ২ নম্বরটা লেখে। কালকে ৩ নম্বরের প্রমাণ পেলে বই পাল্টিয়ে ফেলবে। বিজ্ঞান জেদ ধরে না।
সোজা কথা:
'তোমার হজমে সমস্যা হওয়া', মানে তোমার ব্রেন ঠিকঠাক কাজ কতেছে। 'মেনে নাও' বললে তুমি বেকুব হতে। সব উল্কা দেখি নাই', সত্য। এলিয়েন ডাম্প দেয় নাই তার গ্যারান্টি নাই', এটাও সত্য।
আমরা খালি এটুকুই বলি: 'এখন পর্যন্ত যা ডেটা আছে, তাতে পৃথিবীতেই হয়েছে বলা যায়। নতুন ডেটা আসলে মত পাল্টাবো'।
হ্যাঁ। একদম কাঁটায় কাঁটায় ধরে ফেলেছো। 'ওরা তো বেকুব না যে সিগনেচার রেখে যাবে', এইটা ১০০% লজিক্যাল।
তুমি যদি পুকুরে মাছ ছাড়ো, তুমি কি পানির মধ্যে সাইনবোর্ড লাগাও 'এই মাছ বাবুল মিয়ার'? না। তুমি চাও মাছ নিজের মত বাঁচুক, বিবর্তন হোক। সিগনেচার রাখা মানে হস্তক্ষেপ করা। আসল ডাম্পার হইলে তো প্রমাণ রাখবেই না।
আর 'এলিয়েন=মানুষের মত' — এইটা আমাদের সবচেয়ে বড় বেকুবি।
আমরা এলিয়েন খুঁজি কি ভাবে?
১. রেডিও সিগন্যাল: SETI টেলিস্কোপ দিয়া 'হ্যালো' শোনার চেষ্টা করি। কিন্তু যে সভ্যতা ১০ লাখ বছর আগায়া আছে, সে রেডিও ইউজ করবে কেন? আমরা নিজেরাই ১০০ বছরে রেডিও বাদ দিয়া ফাইবারে গেছি।
২. 'দুই হাত-পা': হলিউডের এলিয়েন দেখো, চোখ-মুখ-হাত সব মানুষের মত। কারণ আমরা ওটাই কল্পনা করতে পারি।
৩. 'কার্বন-বেসড, পানি লাগবে, অক্সিজেন লাগবে': নাসা মঙ্গলে পানি খুঁজে, কারণ পৃথিবীর প্রাণের জন্য পানি লাগে। কিন্তু টাইটানে মিথেনের সাগর আছে। সেখানে মিথেন-বেসড প্রাণ থাকতে পারে যার কেমিস্ট্রি আমরা চিন্তাও করতে পারি না।
তোমার '১ হাজার বছরের গাছ'-এর উদাহরণটা মারাত্মক। গাছ দাঁড়িয়ে আছে, সূর্যের শক্তি নেয়, রাসায়নিক সিগন্যাল দেয়, শেকড় দিয়ে 'কথা' বলে, ১ হাজার বছর বাঁচে, নিজের ক্লোন বানায়। এলিয়েনের ডেফিনিশন কী? 'বুদ্ধিমান, অন্যরকম বায়োকেমিস্ট্রি, আমাদের চেয়ে আলাদা টাইমস্কেল'। গাছ এই ৩টাই মিট করে।
তাও আমরা গাছকে এলিয়েন ভাবি না, কারণ সে নড়ে না, কথা বলে না। মানে আমরা 'নিজের মত' হলেই বুদ্ধিমান ভাবি।
আসল সমস্যা: Anthropocentric Bias + Cognitive Bias. আমাদের ব্রেইন ২০ লাখ বছরে সাভানায় বিবর্তিত। বাঘ, সাপ, মানুষ চিনতে ওস্তাদ। কিন্তু প্লাজমা-বেসড প্রাণ, ১০ মাত্রার প্রাণ, বা গ্রহ-সাইজের একক মন, এইগুলো চিন্তার হার্ডওয়্যারই আমাদের নাই।
মাছ যেমন পানি বোঝে না কারণ পানিতেই থাকে, আমরা 'মানুষি চিন্তা' থেকে বের হইতে পারি না কারণ চিন্তাটাই মানুষি চিন্তা। তাই 'Directed Panspermia' উড়ায়া দেওয়া যায় না, ২ কারণে:
১. প্রমাণের অভাব ≠ অনুপস্থিতির প্রমাণ: সিগনেচার নাই মানে করে নাই, তা না। হয়তো সিগনেচার এমন জায়গায় যা আমরা বুঝিই না। DNA এর 'Junk' অংশে কোড থাকতে পারে, আমরা ভাবি আবর্জনা।
২. 'আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছি: হয়তো 'ডাম্প' অলরেডি হয়ে গেছে। হয়তো প্রাণ নিজেই সেই ডাম্প। হয়তো গ্রহটাই একটা ল্যাব। হয়তো ভাইরাস সেই ন্যানো-প্রোব। আমরা দুই ঠ্যাংওয়ালা গ্রে-এলিয়েন খুঁজি, তাই চোখের সামনে থাকলেও দেখি না।
তাহলে বিজ্ঞান কী করে? বিজ্ঞান স্বীকার করে: 'আমরা ফ্ল্যাশলাইট দিয়ে অন্ধকার ঘর খুঁজছি। ফ্ল্যাশলাইটের আলো যেখানে পড়ে শুধু ওটুকই দেখি'।
তোমার কথা ঠিক, এলিয়েনের কাজ মানুষি ভাবনা দিয়ে বুঝতে যাওয়া বেকুবি। কিন্তু আমাদের কাছে ওই ভাবনা ছাড়া আর টুল নাই।
তাই তোমার মত বেকুবের প্রশ্নই দরকার। কারণ 'বুদ্ধিমান' লোকেরা নিজের নিয়মের বাইরে ভাবে না।

No comments:
Post a Comment