Search

Loading...

Tuesday, August 31, 2010

ন্যানো ক্রেডিট: ৬


বৃষ্টির বয়স চার মাস। বৃষ্টির মা একে কোলে নিয়ে প্ল্যাটফরমে ভাত বিক্রি করেন। মাছ-ভাত। মাথাপিছু ১৫ টাকা! ভাবা যায়?

লোকজনকে দেখি আরামসে কনুই ডুবিয়ে খাচ্ছে। পূর্বের লেখায় উল্লেখ করেছিলাম, আমেরিকা প্রবাসী একজন লোকজনকে খাওয়াবার জন্য ৪০০ ডলার পাঠিয়েছিলেন যার একটা অংশ ব্যয় হয়েছে আমাদের ইশকুল: দুইয়ের ছাত্র-ছাত্রী-অভিভাবকদের মধ্যে।

এর বাইরে ক্ষুধার্ত লোকজনকে খাওয়াবার জন্য হোটেল থেকে প্যাকেট খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। 
স্টেশনে বৃষ্টির মার মত বেশ কিছু মহিলা ভাত বিক্রি করছেন দেখে এক ঢিলে কয়েকটা পাখি মারার বুদ্ধিটা মাথায় আসে। এমন একেকটা দোকানে ১০জন করে খাওয়ালেই তো দোকানগুলোর বিক্রি-বাট্টা চাঙ্গা হয়।

স্টেশনে যেসব শিশু পানি বিক্রি করে এদের সংখ্যা অন্তত ২৫/ ৩০ হবে। অন্যদের খাওয়াতে দেখে এরা মিছিল বের করে ফেলল, এককথা এক দাবি, এদের খাওয়াতে হবে। গররাজি হওয়ার কোন কারণ নেই, বাপধনরা বসে যাও কোন সমস্যা নেই- সমস্যাটা টের পাবে পরে।
মনে মনে এও বলি, রসো, বাছাধনরা! ছাই দিয়ে কেমন করে মাছ ধরতে হয় এটা আমরা শিখব! আমার মাথায় যেটা খেলা করে, এই শিশুদের দিয়ে স্টেশনের কাছাকাছি আরেকটা স্কুল খুলে দিলে কেমন হয়? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে পূর্বের স্কুলগুলো, স্কুল: এক [১], স্কুল: দুইয়ের [২] চেয়ে এদের জন্য স্কুল করাটা জরুরি।
আমি এটাও জেনে যাই, এখানকার বেশ কিছু শিশু ড্যান্ডিতে আসক্ত। ড্যান্ডি একটা ভয়াবহ ড্রাগ। যেসব আঠা রাবারে লাগানো হয় ওইসব আঠা একটা পলিথিনে কয়েক ফোঁটা দিয়ে সেই পলিথিন মুখে চেপে খুব দ্রুত নিঃশ্বাস নেয়া হয়। একটা শিশুর কিডনি, লিভার, ফুসফুস ক্রমশ নষ্ট হতে থাকে। 'খোদেজা' বইয়ে [৩] সোহাগ নামের একটা চরিত্র দাঁড় করিয়েছিলাম যার ড্যান্ডিতে আসক্তি ছিল। এটা আমি দেখেছিলাম, কমলাপুর স্টেশনে ঘুম-ঘুম চোখে মশার কামড় খেতে খেতে।

আজ বৃষ্টির মা আনন্দের শেষ নাই কারণ তার খাবার শেষ। কথায় কথায় জানা গেল, চাউল এবং আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র এই মহিলা বাকিতে ক্রয় করেন। সামান্য খোঁজ নিতেই জানা গেল, বাজারে  চেয়ে বেশি দাম ধরা হয়। বাকিতে নেয়া হয় বলে বলার কোন সুযোগ নেই।
পুঁজি খুব বেশি লাগে না, শত পাঁচেক টাকা। এই টাকাটা বৃষ্টির মাকে দেয়া হয় মাসে একশ টাকা করে শোধ হবে এই শর্তে। পাঁচ মাসে টাকাটা শোধ হবে।

এই মুহূর্তে আমি বৃষ্টির মার ন্যানো ক্রেডিট [৪] নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, এদের জন্য একটা স্কুল করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। সম্ভব হলে আগামিকালই। পরশু কে দেখেছে?

সহায়ক লিংক:
১. আমাদের ইশকুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
২. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
৩. খোদেজা: http://tinyurl.com/33xcevn
৪. ন্যানো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/39dkbhh          

Sunday, August 29, 2010

কাপুরুষ!

জামিকে, আড়ালে আবডালে আমরা তার বন্ধুরা ছোকরা-বালক ডাকতাম। ব্যাটা এমন পুতুপুতু! কখনও কখনও ওর আচরণ দেখে বিরক্ত হব কী, লজ্জা করত খুব!
একবার নিশুতি রাতে ফোন করল। সমস্যা কি? ওর ভাষায় গুরুতর সমস্যা।
কী হয়েছে? ও নাকি অকূল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছে! রাতে দাঁত ব্রাশ করে বেসিনে কুলি করতে গিয়ে দেখেন কয়েকটা কাল পিঁপড়া। ওর ভাষায়, পিঁপড়া রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা পড়ে, ওয়াকস আ মাইল... আউড়াচ্ছে আর বেদম পায়চারি করছে। এরা নাকি বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে চলে এসেছে। তো, জামি মিয়ার সমস্যা হচ্ছে, সে বেসিনে কুলি করতে পারছে না, পানি ঢেলে দিলে এরা নাকি ভেসে যাবে।


আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম, টানাটানি করে বেসিন খুলে বেসিনের পাইপে মুখ লাগিয়ে কুলি করতে। এই নিয়ে রাগ করে ক-দিন আমার এখানে আসাই ছেড়ে দিল।
পাগল-ছাগল যাই হোক জামি নামের এই মানুষটাকে আমি বিচিত্র কারণে পছন্দ করি। এর মধ্যে অদেখা এক সরলতা আছে। যেচে আমিই যাই ওর বাড়িতে। একদিনের কথা, অরি আল্লা, আজ এখানে দেখছি আরেক জটিল কাহিনী! কাকের এক বাচ্চাকে নিয়ে পড়েছে। কাকের বাচ্চাটার ডানা ভাঙ্গা, মৃতপ্রায়-মরমর অবস্থায় নাকি ছিল। একটা টুকরিতে করে কাকের বাচ্চাটাকে উঁচু একটা জায়গায় রেখেছিল, পাশে প্লাস্টিকের বাটিতে পানি। দুয়েক ফোঁটা পানি নাকি কাকের বাচ্চাটা খেয়েও ছিল। এজন্য জামিকে নাকি নানা কায়দা-কানুন করতে হয়েছিল। রাজ্যের কাক এসে কা কা করে ওর কানই কেবল ঝালাপালা করে দেয়নি, দু-চারটে ঠোকরও দিয়েছিল। লাভ হয়নি। শেষঅবধি কাকের বাচ্চাটা মরেই গেল।
জামির চোখ আর্দ্র নাকি আমার দেখার ভুল বলতে পারব না। চোখ ঘুরাবার জন্য নাকি কথা ঘুরাবার জন্য জামি হড়বড় করে বলল, চিন্তা কর, কাক কেমন বেকুব জাতি!
আমি হি হি করে বললাম, কাউয়া জাতি? আরি, বেকুব কয় কী!
জামি বিরক্ত হয়ে বলল, হাসছিস কেন? কাক বেকুব না? চিন্তা কর, মানুষ কাক খায় না তারপরও কাক মানুষকে বিশ্বাস করে না। অথচ দেখ, মানুষ কবুতর পেলেই কপ করে খেয়ে ফেলে তবুও মানুষের প্রতি কবুতরের অবিশ্বাস নাই। কেমন লেজ নেড়ে দিব্যি বাকুম-বাকুম করে।
আমি এইবার হাসি গোপন করে বললাম, আচ্ছা যা আর হাসব না, ঘাট হয়েছে। চল তোর সঙ্গে কথা আছে।
জামি বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, দাঁড়া, এইটার একটা ব্যবস্থা করি।
আমি এইবার আক্ষরিকার্থে বিরক্ত, জাস্ট ছুঁড়ে ফেল। এক মিনিটের মামলা। দে আমার কাছে, দেখ কেমন হাত ঘুরিয়ে হুই করে ছুঁড়ে ফেলি। ফুটবলের মত একটা কিক দিলেও হয়, কি বলিস?
জামি আহত চোখে তাকিয়ে রইল।


আমি বললাম, ভুল কিছু বললাম নাকি। বিষয়টা কী বল দেখি, তুই কি এইটার কবর দিবি!
না ইয়ে মানে, কবর-টবর না। অন্তত মাটি খুড়ে...।
তাহলে একটু সবুর কর, হুজুর ডেকে নিয়ে আসি।
জামি হিসহিস করে বলল, তুই যা, তোর সাথে কথা বলতে আমার ভাল লাগছে না।
আমার বিরক্তির একশেষ। তোর এখানে থাকতে আমার বয়েই গেছে। হুশ কুত্তা, হুশ।
সে-বার দুর্দান্ত রাগ নিয়ে চলে এসেছিলাম।


সুবির আর আমি আড্ডা দিচ্ছি। আড্ডা দিচ্ছি কথাটায় খানিকটা ভুল আছে। সুবির আড্ডা দিচ্ছে আমি সঙ্গ দিচ্ছি। একে জামহুরিয়াত-গণতান্ত্রিক শাসনের সময় দিব্যি দেখা যায় ক্ষমতাশীন দলের হয়ে মহড়ায় অস্ত্র ঝোলাতে। এটা শোনা কথা, যাচাই করে অবশ্য দেখা হয়নি। কিন্তু অন্য সময়-জরুরি অবস্থায় টিকিটিও চোখে পড়ে না! এমন একজন উঠতি মাস্তানকে সঙ্গ দিতে অস্বীকার করাটা মুশকিল না?
অনেক দিন পর জামিকে আমাদের বাসায় দেখে থমকালাম। এই ক-দিন যোগাযোগ করেনি। কোথায় ছিল কে জানে। জামি চুপচাপ বসে পড়ল। চশমার কাঁচ অকারণে পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে।
সুবির একমুখ হেসে বলল, কি জামি মিয়া, তুই কি কাউয়ার চল্লিশার দাওয়াত দিতে আসলি?
জামি আমার প্রতি চট করে তাকিয়ে মাথা নীচু করে নিল। তার দৃষ্টিতে বেদনা। ওর বুঝতে বাকী নাই এটা আমার কান্ড! এক্ষণ বুঝলাম কাজটা ঠিক হয়নি। সুবির এটা জনে জনে বলে বেড়াবে, অহেতুক টেনে টেনে রাবার লম্বা করবে।
জামি উত্তর না দিয়ে প্রায় নিঃশব্দে সিগারেট ধরালো।
সুবিরের মুখে ফিচেল হাসি, বললি না জামি, মুখ কি সেলাই কইরা রাখছস? তোর মা এমন একটা হিজড়া জন্ম দিল, আহারে!
জামি বিড়বিড় করে বলল, যা বলার আমাকে বল, আমার মাকে নিয়ে কিছু বলবি না, প্লিজ।
সুবির জামির সিগারেটের প্যাকেটটা চকিতে তুলে নিয়ে বলল, বললে, কি করবি হিজড়াবাবু?
কখন এরা কথা কাটাকাটির চরমে চলে গেছে এটা বুঝে উঠার আগেই সুবিরের এটা বলা শেষ, তোর মাকে আমি...। তাহলে অন্তত তোর মত হিজড়ার জন্ম হবে না এই, গ্যারান্টি দিতে পারি।
জামি ভাঙ্গা গলায় বলল, সুবির আর একটা কথা বলবি না আমার মাকে নিয়ে।
সুবির দাঁত বের করে বলল, বললে? কি করবি রে হিজড়াবাবু? তুই তো হিজড়াই। ভুল বললে প্রমাণ দে, প্যান্ট খোল।


জামি আর একটা কথাও বলল না। সুবির জামির সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ করেনি। ও ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছিল, অনবরত ভাঙ্গচুর হচ্ছিল জামির মধ্যে। চশমার পেছনে জামির যে চোখটা, এক্ষণ অবিকল মরা মানুষের চোখ! সুবির এ-ও লক্ষ করেনি, জ্বলন্ত সিগারেটটা এখন আর জামির আঙ্গুলে নাই, তালুতে চেপে রেখেছে। জামির তীব্র ক্রোধের কাছে সিগারেটের আগুন ক্রমশ পরাস্ত হচ্ছিল, একসময় হাল ছেড়ে দিল, নিবে গেল। কেবল বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকল সূক্ষ্ম চামড়া পোড়ার গন্ধ।
বেরিয়ে যেতে যেতে জামি হিম গলায় বলল, সুবির, তোর সঙ্গে আবার
আমার কথা হবে, ঠান্ডা মাথায়। তখন তোর প্রলাপ শুনব। প্রার্থনা করিস, তোর সঙ্গে আবারও দেখা হওয়ার আগেই যেন আমি মারা যাই।
সুবিরের তাচ্ছিল্যের হাসি উপেক্ষা করে জামি বেরিয়ে গেল। হাঁটার ভঙ্গিতে তার অজান্তেই একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে। দু-হাত শরীর থেকে বেশ খানিকটা দূরে দূরে থাকছে!
ক-দিন পর সুবিরের ক্ষতবিক্ষত উলঙ্গ লাশ পাওয়া গেল, ব্রীজ থেকে ঝুলন্ত, বিশেষ একটা অঙ্গ উধাও!
জামিকে ওর বাসায়ই পেলাম। ঘুম থেকে ডেকে তুলতে বেগ পেতে হল। খবরটা শুনে ও হাঁই তুলল। পারলে এখুনি শুয়ে পড়ে, শয়ালু ভাব! মুখে বলল, স্যাড, ভেরি স্যাড।
আমি উসখুস করে বললাম, জামি, তুই...?
পাগল, কাউকে মেরে ফেলার সাহস আমার আছে নাকি আমার। সুবির কি বলেছিল শুনিসনি? আমি নাকি হিজড়া!
মিথ্যা বলিস না, জামি!
জামি আড়মোড়া ভেঙ্গে বলল, আরে, তুই দেখি এইটা নিয়ে পড়লি। ওকে আমি মারিনি, বললাম তো। ওর ঠোঁটটা কেবল মাছ ধরার বড়শি দিয়ে সেলাই করে দিয়ে কেবল বলেছিলাম, আমার মাকে নিয়ে ওই কথাটা আবার বলতে। বুঝলি, এতবার করে বললাম, বাঞ্চোতটা বলতেই চাইছিল না। খুব নড়াচড়া করছিল, বুঝলি। কী আর করা. বল, ওর দু-হাতের কব্জি পেরেক দিয়ে টেবিলের সঙ্গে আটকে দিয়েছিলাম। আমার ... দেখিয়ে বললাম, এই দেখ, বিশ্বাস হয় আমি যে হিজড়া না। এইবার তোমার পালা বাপ, তোমায় যে প্রমাণ দিতে হয়। বুঝলি, ও ব্যাটা প্রমাণ দেতে চাইছিল না। এটা কি ঠিক, তুই-ই বল! ওই কথাটা আবার বলতে। বাঞ্চোত কথাই শুনে না। আমার খুব রাগ হল, বুঝলি। একটা মানুষকে কতবার অনুরোধ করা যায়। পরে ড্রিল মেশিন দিয়ে...।
স্টপ জামি, ফ’ গড সেক, স্টপ।
আচ্ছা যা, আর বলব না। তা তুই কি এটা পুলিশকে জানাবি?
আমি গুম হয়ে অধোবদনে বসে রইলাম। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলছি। জামির মত একজনের পক্ষে কেমন করে এটা সম্ভব! কিন্তু ওর পাথুরে চোখ, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বর্ণনা? নাহ, দু-হাত টেবিলে আটকে থাকলে আমি লেখব কেমন করে? জামির মত আলাভোলা ছেলেটার সহজ-সরল জেনেটিক কোডের তথ্যগুলো আবারও এলোমেলো হবে না এই দিব্যি কে দিয়েছে?

একজন স্বার্থপর মানুষ এবং পলায়ন স্পৃহা

দুলাল মিয়াকে [১] নিয়ে বড়ো পেরেশানিতে ছিলাম। রাতে ঘুমে খানিকটা সমস্যাও হচ্ছিল। রাতে দরোজায় শব্দ হলেই মনে হতো: পুলিশ না তো? ঠাক-ঠাক, ধাম-ধাম। কর্কশ গলা, আমরা পুলিশের লোক, দরোজা খুলেন নইলে দরোজা ভেঙ্গে ফেলব। খুলতে দেরি হলেই অশ্রাব্য ভাষায়...।
হতে পারে না এমনটা, বেশ পারে। এই দেশে সবই সম্ভব। শাহআলমের মতো লোকগুলোর পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান জনাব ফজলে নূর তাপসের মত দুঁদে ল-অফিসার। আর আমাদের জন্য কলিমুল্লা-ছলিমুল্লা।

কারণ আছে এমনটা ভাবার। দুলাল মিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় আমার নাম-ঠিকানা বিস্তারিত দিতে হয়েছে, আমার কাঁধে অযাচিত দায়িত্ব বর্তেছে! তখন ডাক্তারসহ সবাই আমার বোকামি দেখে বিস্তর হাসাহাসি করেছেন। তাদের হাসির উৎস, এই মানুষটার উনিশ-বিশ হয়ে গেলে, তাকে যমে নিয়ে যাবে আর আমাকে পুলিশ।
আমি কোনো দল করি না। আমি ব্যতীত দল করে না এমন বেকুব আর কেউ এই দেশে নাই! আমার ধারণা, এই দেশে কাক-পক্ষী-গাছ-নদী-পুকুর কেউ বাদ নাই, সবারই কোনো-না-কোনো দলের সঙ্গে মাখামাখি আছে। এই দেশে যারা দল করেন না এদের মতো অভাগা আর কেউ নাই। না ঘার কা, না ঘাট কা। আরাফ, স্বর্গ-নরকের মাঝামাঝি ঝুলে থাকা। ঝুলাঝুলিই সার!
আহা, কার দায় পড়বে আমার মত সাধারণ একজন দলহীন মানুষের জন্য নড়াচড়া করার।

আজ সকালে ডাক্তার জানিয়ে দিলেন, এই রোগীকে এখানে রেখে খুব একটা লাভ হবে না কারণ ড্রেসিং করার সময় দুলাল মিয়ার পায়ের মাংস খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। মানুষটাকে বাঁচাবার একটাই উপায় হাঁটু থেকে পাটা ফেলে দিতে হবে। এটা জন্য জেলার সদর হাসপাতালে যেতে হবে। 
আমার নিজের অনুমানটাও এমনটাই ছিল।
কারণ দুলাল মিয়ার কাছে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না মাংস গলার অসহনীয় গন্ধে, টিস্যুগুলো ক্রমশ নষ্ট হচ্ছে। আমার নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসত। সঙ্গে মাস্ক নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু লাগাতে পারিনি। কেন যেন আমার মনে হতো, মানুষটা আহত হবেন। কিন্তু কী তীব্র, মাথা খারাপকরা গন্ধ! আমি নতজানু হই তাঁদের প্রতি যারা নিঃস্বার্থভাবে দুলাল মিয়ার মত মানুষদের নিয়ে কাজ করে যান।

সব কিছু মিলিয়ে ঠিক হয়, দুলাল মিয়াকে ব্রাক্ষণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। যেহেতু এই মানুষটার কোন অভিভাবক নাই তাই আমার উপর কঠিন একটা দায়িত্ব পড়েছে দুলাল মিয়ার সম্মতি নেয়ার জন্য, চিকিৎসা না-করে সরে পড়বে না তো আবার? পাটা ফেলে দিতে হবে এটাও জানানোর জন্য।
তখন পর্যন্ত আমি কিছুই বলিনি কিন্তু আমাকে দেখামাত্র মানুষটা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। আমি দুর্বলচিত্তের একজন মানুষ, বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি; আমি বৃষ্টি দেখতে থাকি।
আমি চেষ্টাকৃত খানিকটা কঠিন গলায় বলি, এখানে আপনার আর চিকিৎসা হবে না। জেলা শহরে পাঠাতে হবে, এটা অনেক ঝামেলার কাজ; অ্যামবুলেন্স ঠিক করতে হবে, ওখানকার ডাক্তারকে ধরাধরি করতে হবে। আপনি কি চিকিৎসা করাবেন নাকি ওখানে নেয়ার পর পালিয়ে যাবেন। পালিয়ে গেলে ওখানে গিয়ে লাভ নাই, এখান থেকেই চলে যান।
মানুষটা ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘুরেফিরে একটা কথাই বলতে থাকেন, আপনে যেইটা ভালা মনে করেন।
আমি মাথা নাড়ি, না। আমি ভাল মনে করলে তো হবে না। চিকিৎসা করতে গিয়ে আপনার অপারেশন লাগতে পারে, পায়ের কিছুটা ফেলে দিতে হতে পারে।
দুলাল মিয়া নিস্তেজ গলা, কতডা কাটব?
আমি বলি, তা তো এখন বলা সম্ভব না। এখানে গেলে ডাক্তার দেখে-বুঝে ঠিক করবেন।
দুলাল মিয়ার ঘুরেফিরে একটাই কথা, আপনে...। আমি সময় নিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করতে থাকি, দেখেন, শরীর আপনার। সিদ্ধান্তটা আপনাকেই নিতে হবে।

পরিশেষে ঠিক হয়, আগামীকাল দুলাল মিয়াকে ব্রাক্ষণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হবে। আমি চেপে রাখা শ্বাস ছাড়ি। আমি নিজেকে বিলক্ষণ চিনি- একজন পলায়নপর মানুষ। যাক বাবা, বাঁচা গেল, এখানেই আমার কাজ শেষ। আমার এলাকাটা তো পরিষ্কার হল। এরপর এটা ওই শহরের লোকজনের সমস্যা-মাথাব্যথা। আমি স্বার্থপর টাইপের মানুষ, নিজের সমস্যার সমাধান হয়েছে এতেই আমি আনন্দিত। অন্যদের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাবার অহেতুক আগ্রহ বোধ করি না। এখন ব্রাক্ষণবাড়িয়া শহরের লোকজন তাদের সমস্যা নিয়ে অস্থির হবে, কি হবে না এতে আমার কী!
...
যারা একটা গল্প-উপন্যাসের শেষ লাইনটি পড়ে ফেলার পর জানতে চান, 'হেষে কি হইল'- তারপর কি হলো? তাঁদের জন্যই সম্ভবত পরিশিষ্ট শব্দটা চালু করা হয়েছে। এই লেখার পরিশিষ্ট হচ্ছে, যাদের চোখ আমাদের মত ঘোলাটে না, ঝাঁ চকচকে এদের পক্ষেই সম্ভব আমরা যেটা করতে পারি না। অতীতে আমি এর অনেক উদাহরণ দেখেছি [২] । দুলা মিয়া নামের অসমসাহসী মুক্তিযোদ্ধার সমাধি এরা বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে এই বেড়া এরা বয়ে নিয়ে গেছে!

এই মানুষটার চিকিৎসা নিয়ে ফাঁকিবাজি করবে এই নিয়ে জেলা সদরের ডাক্তারদের আনন্দিত হওয়ার কিছু নাই কারণ ওখানে থাকে এমন এক ঝাঁক তরুণকে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছি। যেখানে আমার কাজ শেষ ওখান থেকেই ওই তরুণদের কাজ শুরু।

সহায়ক লিংক:
১. দুলাল মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_27.html
২. দুলা মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_04.html 

Friday, August 27, 2010

ধন্যবাদ প্রথম আলো

৬ আগস্ট যখন প্রথম আলোয় যখন এই সংবাদটা পড়ি তখন যথারীতি মেজাজের কাঁটা উর্ধ্বগতি। মনে মনে কষ্টের শ্বাস গোপন করি, কেউ কেউ কখনও বদলায় না, কেবল অন্যদেরকেই বদলাবার জন্যই আদাজল খেয়ে নামে! শেষের পাতায় খবরটা এক কলাম ইঞ্চি ছাপা হয়েছিল, "সম্পদের অর্ধেক দান করার ঘোষণা ৪০ ধনকুবেরের"।
আমি অহেতুক ভেবে ভেবে সারা, এটা কেন ফলাও করে প্রথম পাতায় এলো না? কেন এই খবরটা নিয়ে সম্পাদকীয় ছাপা হবে না? কেন এই খবরটা নিয়ে আমাদের দেশের দুধর্র্ষ কলামবাজরা ঝাপিয়ে পড়বেন না, কলাম লিখে লিখে পাতা ভরিয়ে ফেলবেন না?

এই খবরটা গুরুত্ব কী অপরিসীম এটা কেন আমরা অনুধাবন করতে পারলাম না? আমার সুযোগ থাকলে এঁদের ছবি বাঁধিয়ে প্রত্যহ ধূপ-ধুনা দিতাম। এঁদের এই একটা অভাবনীয় সিদ্ধান্ত, কোটি-কোটি মানবসন্তানের কল্যাণে ব্যয় হবে- এই গ্রহে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে!
এই উদ্যোগটা নিয়ে ফলাও করে লিখলে যদি আমাদের দেশের কেবল একজন মাত্র ধনকুবেরের মত পরিবর্তন হয় সেটা কী এক অসাধারণ বিষয় হবে এটা আমার কল্পনাতেই আসে না। কেন আমি এটা আশা করতে পারব না, আমাদের দেশের একজন ধনকুবেরের ওদের মত মাথা এলোমেলো হবে না?

একজন ধনকুবের লাগে না, সামান্য একটা উদ্যোগ কেমন পরিবর্তন নিয়ে আসে এর ছোট্ট একটা উদাহরণ। 
সুদূর আমেরিকা থেকে একজন ৪০০ ডলার পাঠিয়েছেন। টাকাটা হাত ঘুরে আমার কাছে এসেছে। আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু খানিকটা বিমর্ষ হয়ে গেলাম! এই টাকাটা আমাদের দেশের হতদরিদ্র মানুষদের জন্য ব্যয় হবে। শর্ত আছে, টাকাটা ব্যয় হবে মুসলমানদের জন্য, খাবার-দাবারের পেছনে এবং রমযানের মধ্যেই টাকাটা ব্যয় করতে হবে। আমার জন্য এটা একটা কঠিন শর্ত এবং অপছন্দের। যদি বলা হতো ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য তাহলে আমার আপত্তির কারণ ছিল না। ক্ষুধার্ত তো ক্ষুধার্ত, হিন্দু-মুসলিম-খ্রীস্টান কী! একবার মনে হয়েছিল, না করে দেই কারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করে আমি আরাম পাই না। অনেক ভেবে দেখলাম, কাজটা আমার অপছন্দের হলেও আমার কারণে কিছু মানুষ কেন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে?

যিনি মাধ্যম, তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হয় এর অধিকাংশ টাকা ব্যয় হবে 'ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের স্কুলের' [৩] পরিবারে লোকজনের মধ্যে। এঁরা এমন না যে দু-বেলা খেতে পান না। তাই আমরা ভেবে ঠিক করলাম, প্রত্যেক পরিবারে জন্য পর্যায়ক্রমে মাংশের (গোশত লেখার নিয়ম সম্ভবত, মাংশ নাকি মুরতাদের শব্দ!) ব্যবস্থা করা হবে। এই মাংশের কল্যাণে এঁদের এবং এঁদের বাচ্চা-কাচ্চাদের শরীরে খানিকটা প্রোটিন যোগ হবে। মন্দ কী!
আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, সেই সুদূর আমেরিকা প্রবাসী একজনের টাকায় কেনা মাংশ খাচ্ছে দূর্গম এক এলাকার কিছু মানুষ!

ধরে নিলাম নিরুপায়, এরা লক্ষ-লক্ষ উট গুলি করে মেরে ফেলবে [৪] কিন্তু আমাদের দেবে না। হারামজাদারা, কেবল মুখ ফুটে একবার বললেই হতো আমরা এদের পোতাশ্রয় থেকে নিজ খরচে জাহাজ ভরে ভরে নিয়ে আসতাম। আমার জানার খুব আগ্রহ, অস্টেলিয়ায় আমাদের দূতাবাসের স্যাররা কি একবারও এদের বলে দেখেছিলেন, নাকি বড়ো বড়ো সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন?  

তো, সর্বদা পত্রিকাওয়ালাদের অন্ধকার দিক নিয়ে লিখতে ভাল লাগে না। আমি অপেক্ষায় থাকি, এই নিয়ে এই পত্রিকায় সুদীর্ঘ লেখা ছাপা হবে। আমাদের দেশেরও কোন ধনকুবেরকে এমন পাগলামি করতে প্ররোচিত করা হবে। আমার অপেক্ষা আর ফুরায় না।
অবশেষে আজ (২৭ আগস্ট, ২০২০), অন্যআলোয় ফলাও করে ছাপানো হয়েছে, "বিশ্বের ছয় ধনীর অর্ধেক সম্পদ এখন গরিবের"। প্রথম আলো, বিশেষ করে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এটার লেখক নাইর ইকবালকে।

সহায়ক লিংক: 
১. সম্পদের অর্ধেক দান করার ঘোষণা ৪০ ধনকুবেরের, : http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=24&date=2010-08-06
২. বিশ্বের ছয় ধনীর অর্ধেক সম্পদ এখন গরিবের: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=27&date=2010-08-27
৩. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: http://tinyurl.com/2fs9j4p
৪. সভ্যতার কাকে বলে: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_9297.html 

মরবে না কিন্তু, খবরদার!

'পড়শী ফাউন্ডেশন' থেকে কুরিয়ারে আমার নামে অনেকগুলো ক্রাচ পাঠানো হয়েছে। আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু শনৈঃ শনৈঃ মেজাজ খারাপ হচ্ছে কারণ এই কুরিয়ার সার্ভিস এখানে পৌঁছে দেবে না, ২০ কিলোমিটার দূর থেকে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। এই বেঢপ সাইজের জিনিস স্কুটারে আঁটবে না। এদের ভাবখানা এমন, আমার গাড়ি আছে। শো-ও-ও করে নিয়ে আসব!
ভাগ্যিস নিয়ে এসেছিলাম।
দীর্ঘ দিনের অভ্যাসের কারণে আমার হাঁটা হয় প্রচুর। পরিচিত লোকজনরা বিস্ময় প্রকাশ করেন, হুদাহুদি হাঁটেন ক্যান? মেজাজ খারাপ থাকলে আমি বলি, রঙ্গে!
নিয়ম করে স্টেশনটা একটা চক্কর না-দিলে আমি আরাম পাই না। শিকার খোঁজার জন্য স্টেশনটা একটা উত্তম স্থান। যেদিন কাউকে পাই না সেদিন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

কাল এখানেই পেয়ে যাই দুলাল মিয়াকে। পায়ে কাপড় জড়িয়ে রেখেছেন বলে আমি জিজ্ঞেস করি, পায়ে কি হইছে?
মানুষটা মাথা নাড়ে, কিছু না। 
তার পায়ের কাছে প্রচুর মাছি ভনভন করছে দেখে খানিকটা আঁচ করতে পারি, মানুষটার পায়ে সমস্যা আছে। নাকে ভেসে আসে তীব্র গন্ধ। আমি ডাক্তার না কিন্তু তবুও বোঝার বাকী থাকে না এর পায়ে পচন ধরেছে। গ্যাংরিন!
এর কাহিনী খানিকটা বিচিত্র! বউ এবং শাশুড়ি মিলে পায়ে এসিড ঢেলে দিয়েছে। এত দিন জানতাম এসিড ছুঁড়ে মারে পুরুষ, কাপুরুষ; এখন দেখছি মহিলারাও পিছিয়ে নেই!
আমি বলি, হাঁটেন কেমন করে?
নিস্তেজ উত্তর, লেছড়াইয়া-লেছড়াইয়া।
ক্রাচটা দিয়ে আমি বলি, এটা দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করে দেখেন। মানুষটা চেষ্টা করে কিন্তু নিষ্ফল চেষ্টা। এইবার মানুষটা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে, আমি আর বাঁচতাম না।
আমি বানিয়ে বানিয়ে কিছু কথাবার্তা বলি। মনে মনে দুঃখিত হই, মানুষটার সময় ফুরিয়ে আসছে। কারণ মানুষটা হাল ছেড়ে দিয়েছে। তাঁর এই নিরাশা আমার মধ্যেও খানিকটা প্রভাব ফেলেনি এমন না। ঢাকা থেকে যে ডাক্তার আসেন, তিনি আসবেন আগামীকাল।
আমি বলি, আগামীকাল ডাক্তার আপনাকে দেখে দেবে। দেখি, ডাক্তার কি বলেন। তা আপনার সঙ্গে কেউ নাই?
মানুষটা এইবার বলেন, আমার তিন কূলে কেককো নাই। তয় আমার ধর্মবাপ আছে।
আমি বলি, উত্তম। কোথায় আপনার ধর্মবাপ? সাদা চুলের একজন মানুষ এগিয়ে আসেন। ওই মানুষটার কাছে ডাক্তারের ঠিকানা লিখে দশ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে বলে আসি আগামীকাল সন্ধ্যায় চলে আসতে।


সেই আগামীকালটা আজ। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয় সেই মানুষটার পাত্তা নেই। আমার বিরক্তির শেষ নেই কারণ সময়টা আমার ছাতাফাতা লেখালেখির। আমার ছাতাফাতা লেখালেখির কী হবে! লেখালেখি গেল চুলায়। রাগে চিড়বিড় করতে করতে হাঁটা ধরি। মানুষটাকে সেই পুর্বের স্থানেই পেয়ে যাই। আমি রাগ চেপে বলি, ঘটনা কি, আপনি গেলেন না কেন?
মানুষটা অসহায় উক্তি, আমার ধর্মবাপ আহে নাই। যাওনের শক্তি নাই।
এটা শুনে মানুষটার উপর রাগ করা কঠিন। তবুও আমার রাগ কমে না, আপনি কেমন মানুষরে ধর্মবাপ বানান! আপনার আর কয়টা ধর্মবাপ আছে?
আমার মাথায় ধর্মবাপ কেমন হওয়া প্রয়োজন তারচেয়ে এখন যেটা ঘুরপাক খাচ্ছিল, বয়স্ক মানুষটা মাত্র দশ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেল, ফিনফিনে দাড়িসহ!

কী যন্ত্রণা, মানুষটাকে নিয়ে যাব কেমন করে? কে স্ট্রেচার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! আমি কি মাদার তেরেসার অনুসারী যে মানুষটাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাব? পাগল!
এক রিকশাচালককে অনেক বলে-কয়ে রাজী করাতে হয়েছে, দেখো মিয়া, টাকা-পয়সাই সব না; রাস্তা-ঘাটে চললে কিছু মানুষের দোয়াও নিতে হয়। আমার বুদ্ধির সঙ্গে রিকশাচালক পারবে কেন, এ কি ব্লগস্ফিয়ারের লোকজন? সে রাজী হলে আমি বলি, বাপ, খালি তুমি একে অমুক জায়গায় নিয়ে যাবে।
ডাক্তার একে দেখেই নিরাশ করলেন, এর তো এভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব হবে না। আমি তো এখানে থাকব না। প্রতিদিন নিয়ম করে প্রতিদিন দুবার করে এর ডেসিং করতে হবে। ভাল হয়, হাসপাতালে ভর্তি করে দেন।
আমি চোখে অন্ধকার দেখি, হাসপাতাল, এই দেশের সরকারী হাসপাতাল! এমনিতেই খবিরনকে [১] নিয়ে আমার দুর্দান্ত ক্ষোভ এখনও প্রশমিত হয়নি। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যদি এমন হয়, দুম করে হাসপাতালওয়ালাদের নাকে একটা ঘুষি বসিয়ে দিলাম তখন কেলেঙ্কারীর একশেষ হবে। তকে মাথার দিব্যি দিয়েছে যারা দুকলম লেখার চেষ্টা করে এরা রেগে কারও নাকে ঘুষি বসিয়ে দিতে পারে না।

ভাগ্য ভাল, সেই ডাক্তারকে পেয়ে যাই। এই ডাক্তারের কাছে আমি ঋণী। একবার একটা কুত্তাকে [২] নিয়ে ঝামেলায় পড়েছিলাম, তাঁর কল্যাণে উদ্ধার পেয়েছিলাম। যাই হোক, তার বদৌলতে আমাকে অবাক করে দিয়ে হাসপাতালওয়ালা দুলাল মিয়া নামের মানুষটাকে ভর্তি করে নেয়। তবে তিনি আমাকে এটা বলেও সতর্ক করে দেন, ভর্তির কাগজে আপনার নাম যাচ্ছে এই রোগীর কিছু একটা হয়ে গেলে পুলিশী ঝামেলায় পড়বেন।
আইনগুলো বড়ো চিত্র-বিচিত্র! রক্তে ভাসতে ভাসতে একজন মারা যাবে কিন্তু পুলিশ না-আসা পর্যন্ত কেউ ওই অভাগাকে স্পর্শও করবে না, ডাক্তারও না।
আমি হতভাগার এটা বলা ব্যতীত উপায় কী! দুলাল মিয়া, মরবে না কিন্তু, খবরদার!

সহায়ক লিংক:
১. কুত্তা জহির: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_15.html
২. খবিরন: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_24.html

Wednesday, August 25, 2010

কত বুদ্ধি ঘটে!

কখনও কখনও বুদ্ধির খেলা দেখে হতভম্ব হয়ে যাই। মনে মনে কষ্টের শ্বাস ফেলি, আহা, আমারও যদি এমন দুর্ধর্ষ বুদ্ধি থাকত!
ব্যানারে লেখা, 'রেলওয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড অফিস'। বাস্তবে দেখলাম, এটা একটা চার দোকান। মাহে রমজানের কারণে ঝাঁপ ফেলা।



প্ল্যাটফরমের ভেতরে এই স্টেশনারি দোকান বসাবার পর আমজনতা হইচই শুরু করেন এই বলে এটা প্ল্যাটফরমের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে, ক্ষমতাবহির্ভুতভাবে দোকানটা বসানো হয়েছে। এরপর থেকে এটায় লিখে দেয়া হয়েছে, 'তথ্য ও অনুসন্ধান কেন্দ্র'।
কেউ পান-সিগারেট-কোক ক্রয় করবেন, এই সব আছে কি না এটার অনুসন্ধানে এখানে আসতেই পারেন! বাড়িয়ে তো আর কিছু লিখেনি!



এই টং নামের জিনিসটাকে দেখতাম স্টেশন থেকে খানিক দূরে পরিত্যক্ত অবস্থায়। আজ দেখি এটা হেঁটে হেঁটে স্টেশনে কেবল ঢুকেই পড়েনি, স্টেশনের নামটাও ঢেকে ফেলেছে।

Tuesday, August 24, 2010

সারদায় কি এই সব শেখায়?

ঘটনাস্থল কুমিল্লা। কুমিল্লা টাউন হল। বস্ত্রমেলায় একটা স্টল দিয়েছিলেন চীনা এক দম্পত্তি। মিস্টার থা এবং তাঁর স্ত্রী ইয়েনগি। কিছু বখাটে যুবক ইয়েনগিকে উত্যক্ত করলে তাঁর স্বামী প্রতিবাদ করতে গেলে, মিস্টার থা'র মাথা ফাটিয়ে ফেলা হয়। দরদর করে রক্তে তার সমস্ত শরীর ভিজে যায়।
এই পর্যন্ত এটা একটা ঘটনা। কিন্তু মিস্টার থা এই মেলার আয়েজকদের কাছে কোন ধরনের সাহায্য পাননি। পুলিশের ডিআইও ওয়ান যেটা বলেন এরপর কথা চলে না! তিনি বলেছেন, "এটি ছোট ঘটনা, বিষয়টা আমরা দেখছি।"
এটা ছোট ঘটনা তো বটেই! অন্তত আমি নিশ্চিত, এই চীনা দম্পত্তি দেশে ফিরে আমাদের এমন সুনাম করবেন, ব্যবসায়িক দ্বার উম্মোচনের কথা বলবেন; প্লেন বোঝাই করে চীনারা সব দলে দলে এই দেশে ভিড় করবে। প্লেনে বসার টিকেট না পেলেও কে জানে, দাঁড়িয়েও চলে আসতে পারে।

আমার জানা মতে, এইসব পুলিশ নামের অফিসারদের সারদা পুলিশ একাডেমিতে ট্রেনিং দেয়া হয়। আমার খুব জানার ইচ্ছা, ওখানে কী কেবল ঘোড়ায় চড়া শেখানো হয়?
সমাজপতিরা বিচারের নামে বাবাকে দিয়ে ছেলের চোখ উঠাতে বাধ্য করে। ঈশ্বর, কোন সভ্য দেশে এমনটা সম্ভব? এ ব্যাপারে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন প্রথম আলোর কাছে বলেন, "ঘটনাটা শুনেছি। আমার কাছে ছেলের বাবা এসেছিলেন। আমি তাঁকে বলেছি আগে চিকিৎসা করান। তারপর অভিযোগ দিয়েন।"

ভাল-ভাল! এই অফিসারের মনে দেখি অ-নে-ক মায়া! চোখের চিকিৎসা যখন শেষ হবে তখন পর্যন্ত দোষীরা বসে বসে ছা ফুটাবে।

আমাদের দেশের পুলিশ মহোদয়দের মনে কী মায়া এটা বোঝার জন্য এই ক্লিপিংসটাই যথেষ্ট। প্রকাশ্যে কোন দায়িত্বশীল মানুষ এমন একটা বেদনার ঘটনা নিয়ে এমন কুশ্রাব্য-কুৎসিত কথা বলতে পারেন এটা আমার কল্পনাতেও আসে না। আজ কেবল মনে হচ্ছে, সাদাত হাসান মান্টোর কথা "একশত জন...মারা গেলে একজন পুলিশম্যানের জন্ম হয়"।
এটা দেখে আমার কেবল মনে হচ্ছিল পুলিশ নামের এই মানুষটা অন্য গ্রহ থেকে এসেছেন। তাকে কেউ জন্ম দেয়নি, তিনি কাউকে জন্ম দেননি। তাই হবে! নইলে এই বাচ্চাগুলোর কষ্টটা তার চোখে ধরা পড়েনি।
কে জানে, একদিন দেখব এই অফিসারের শাস্তি দূরের কথা প্রমোশন দেয়া হয়েছে। সম্ভব, এই দেশে সবই সম্ভব...।



*ঋণ: ইউটিউবের এই ক্লিপিংসটা নেয়া হয়েছে: http://www.konfusias.blogspot.com
থেকে

ডাক্তার নামের খুনিটার বিচার হবে না?

আজকের প্রথম আলোয় [১] (২৪ আগস্ট, ২০১০) খবরটা পড়ে কেবল মাথায় যেটা ঘুরপাক খাচ্ছে, আমাদের দেশে প্রাণ কত শস্তা! এরচেয়ে শস্তা সম্ভবত আর কিছু নাই, এক বোতল পানির দামও নিদেনপক্ষে ১০ টাকা। প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানাই, এই নিউজটা ছাপাবার জন্য, পাশাপাশি আমার এই ক্ষোভও আছে, এই খবরটাই আরও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন ছিল। প্রকারান্তরে একটা অন্যায়ও করা হয়েছে, যে ডাক্তারের বক্তব্য ছাপা হয়েছে এটা একটা বিকলাঙ্গ তথ্য!

কসম লেখালেখির, আমার মনে হচ্ছে হাঁটুর নীচে জোর নাই। এই খবরটা আমার চোখ এড়িয়ে গেলেই ভাল হতো, কেন চোখে পড়ল! এটা পড়ার পর থেকে আমার ভুবনটা এলোমেলো হয়ে আছে। কোন একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার সুতীব্র ইচ্ছা। হাতের নাগালে কাউকে না-পেলে আমি নিজে আছি কী করতে! স্বয়ংক্রিয় চাবুক পাওয়া যায় না বাজারে? যেটার কাছে গিয়ে নিজের পিঠ পেতে দিলেই শপাং শপাং; ব্যস, দুর্দম রাগ অনেকটা কমে এলো। এমন একটা জিনিস সহজলভ্য হলে মন্দ হতো না...।

সাভার উপজেলা হাসপাতালে 'খবিরন' নামের এক ছিন্নমূল অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রসব ব্যথা নিয়ে গেলে ওখানকার ডাক্তার তাঁকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিদায় করে দেন। খবিরন ওই সময় তীব্র ব্যথায় বারবার ডাক্তারকে অনুরোধ করেও কোন লাভ হয়নি। 
গত রোববার রাতে খবিরন অসহ্য প্রসবযন্ত্রণা সহ্য করতে না-পেরে ফুটওভারব্রীজ থেকে লাফিয়ে পড়েন। তাঁর সঙ্গে মৃত্যু হয় তাঁর অদেখা সন্তানেরও []। 
কত্তো সহজ!
আবার কী অবলীলায়ই না ওই সাভার হাসপাতালের ডাক্তার নিখিল কুমার সাহা এটা বলে পার পেয়ে যান, "...এই নারীর পেটের বাচ্চার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাই তাকে ঢাকা মেডিকাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়"।
গুড-গুড! অতি উত্তম।
তা আমাদের সাংবাদিক মহোদয় এটুকু জিগেস করেই ক্ষান্ত দিলেন কেন? তিনি কেন জানতে চাইলেন না, কখন, কেমন করে খবিরনকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে? ঢাকা মেডিকালে এই বিষয়ে খোঁজ নিলেন না কেন? নাকি তিনি এই তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, অফিস ছাপায়নি?
আমরা সবাই যার যার গা বাঁচাচ্ছি। আরে, এটা তো আমার সমস্যা না, খবিরন নামের এই মহিলা তো আমাদের কেউ না। হিস্ট্রি রিপিট। আমাদের সঙ্গে এমনটা ঘটলে তখন আমরা গা ঝাড়া দিয়ে উঠব, আমরা কি এই অপেক্ষায় আছি? ভাল-ভাল, এই মনস্কামনা পূর্ণ হোক।

এখানে অবশ্য আমার কিছু জানার ছিল। আমি জানতে চাই, খবিরনকে কিসে করে ঢাকা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল, হেলিকপ্টারে, নাকি অ্যামবুলেন্সে করে? হেলিকপ্টারে করে করা হয়ে থাকলে আমি জানতে চাই, কাদের হেলিকপ্টারে করে? সেনাবাহিনীর, নাকি ভিভিআইপিদের যেটায় বহন করা হয়, সেটায়?
হেলিকপ্টার না-হয়ে অ্যামবুলেন্স হলে নিশ্চয়ই এটা হাসপাতালের? তাহলে অবশ্যই এই রেকর্ড থাকার কথা কখন, কটায় খবিরনকে ঢাকা মেডিকাল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আর যদি এটা প্রমাণিত না-হয় তাহলে খবিরনকে যে ডাক্তার দেখেছিলেন বা যিনি দায়ি তাকে কেন দুইজন মানুষ খুনের জন্য শাস্তি দেয়া হবে না? প্রচলিত আইনে দুইজন মানুষকে খুন করলে যে শাস্তি হয় এই শাস্তি কেন এই ডাক্তারকে দেয়া যাবে না।

এটা আমরা বেশ জানি, খবিরনের কাছে যদি বিস্তর টাকা-পয়সা থাকত তাহলে তাঁকে এটা অসহ্য প্রসববেদনায় আত্মহত্যা করতে হতো না। এই ডাক্তারই খবিরনকে নিয়ে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করে দিতেন। কারণ অন্তঃসত্ত্বা কাউকে কোন ক্লিনিকে পাঠালেই ডাক্তার সাহেবের পকেটে শুধুশুধুই অন্তত পাঁচ হাজার টাকা চলে আসে।
আমি পূর্বেও বলেছি, এই দেশে সরকারী চাকুরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরাধ করে থাকেন আমাদের দেশের ডাক্তার। পুলিশ এদের কাছে কোন ছার! পুলিশ অপরাধ করে পেটের জন্যে।
অথচ এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার বেতন, সুযোগ-সুবিধার পরও প্রাইভেট প্র্যাকটিসের পরও হেন কোন অন্যায় নাই যেটা করেন না। ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাত- ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে নগদ টাকার বাইরেও এমন কোন জিনিস নাই এরা পান না, অন্তর্বাস ব্যতীত, নাকি এটাও আজকাল ওষুধ কোম্পানিগুলো দেয়া শুরু করেছে! যে ক্লিনিকে অযথা হাজার-হাজার টাকার টেস্ট পাঠান, টেস্টের টাকার অন্তত ফিফটি পার্সেন্টের বিনিময়ে। যে মার স্বাভাবিক বাচ্চা হওয়ার কথা তাঁর পেট কাটার জন্য ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেন টাকার বিনিময়ে। কয়টার কথা বলব?

খবিরন যে শহরে আত্মহত্যা করেছেন সেই শহরে ক-লক্ষ মানুষ বসবাস করেন আমি জানি না। কেবল জানি ওই শহরের লোকজন মানবতার বড় বড় কথা বলেন, নিয়ম করে নামায-রোজা-হজ পালন করেন; সেই শহরেই যখন খবিরন আত্মহত্যা করেন, হাত-পা ছড়িয়ে মধ্য-রাস্তায় পড়ে থাকেন, তাঁর পেট ফেটে অদেখা বাবুটাও মরে পড়ে থাকে তখন সেই শহরের সমস্ত মানুষ নগ্ন হয়ে পড়েন।
খবিরন যে একটা মা এটা কারও মাথায় আসল না? এই গ্রহের সব মার আদল যে এক, সে 'মাছ-মা' [৩] হোক আর খবিরন, পার্থক্য কী! খবিরন নিশ্চয়ই এই শহরের এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাগলের মত ছুটাছুটি করেছেন, একে-ওকে ধরেছেন, বাবুটাকে-নিজেকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কেন পারলেন না?
আমরা জানি, অদেখা বাবুদের আত্মিক যোগ থাকে কেবল মার সঙ্গেই- কেবল আমরা এটা জানি না, বাবুটা কি কোন প্রকারে মাকে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেছিল? নাকি সেও হাল ছেড়ে দিয়েছিল, একগাদা থুথু ফেলে উল্টো আরও মাকে প্ররোচিত করছিল। থুথু! অনেকে চেঁচিয়ে উঠবেন, ভুল-ভুল! অ, আচ্ছা, অদেখা সন্তানরা থুথু ফেলতে পারে না, না? তাই হবে!
আমি কেবল ভাবি, সেই শহরের দালান-কোঠাগুলো এখনও দাঁড়িয়ে থাকে কেমন করে? কেন এখানে রোদ, কেন বৃষ্টি?

নপুংসক আমরা, আমরা আর কিছু না পারলে খবিরনের বিরুদ্ধে একটা মামলা ঠুকে দিতে পারি। কারণ আত্মহত্যা প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা কলমের মাধ্যমে অনলবর্ষন করতে পারেন, কলামলেখক লিখতে পারেন দেড় হাত লম্বা কলাম, 'কী নিষ্ঠুর মা' এই শিরোনামে:
"খবিরন ভয়ংকর একটা অন্যায় করিয়াছে। সে নিজেকে মারিয়া ফেলিয়াছে। কেবল তাহাই নহে, এই পাষন্ডী মা তাহার গর্ভের সন্তানকেও মারিয়া ফেলিয়াছে। আমরা ভাবিয়া ভাবিয়া কূল পাইতেছি না, একজন মা হইয়া কেমন করিয়া তাহার গর্ভের সন্তানকে হত্যা করিতে পারে? ইহা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বটে। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবী করিতেছি, এই পাপিষ্ঠাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হউক।"

অভাগা খবিরন- ইহকাল গেল, পরকালও!

সহায়ক লিংক:
১. প্রথম আলো: http://www.eprothomalo.com/?opt=view&page=4&date=2010-08-24
২. মা এবং তার অদেখা সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_10.html
৩. মাছ-মা: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_6002.html

Monday, August 23, 2010

কনক পুরুষ: ৯

জয় ভাসা-ভাসা জানত তন্ময়ের বাবার অফিস সেনাকল্যাণ ভবনে। ঠিক কোথায় এটা জানা ছিল নেই। কেয়ারটেকার গোছের একজনকে জিজ্ঞেস করতেই সমীহের একটা ভাব ফুটিয়ে তুলল আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘ষোলো তলায় চলে যান।’
‘ষোলো তলা মানে, ঠিক কোন পাশে?’
‘অ, জানেন না বুঝি, পুরোটাই তো।’

লিফট থেকে নেমে ওর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তন্ময়ের বাবা সাজসজ্জার পেছনে কী বিপুল অর্থই না ব্যয় করেছেন!
রিসেপশনিস্ট মেয়েটার মুখে মহিলা-ড্রাকুলার হাসি, ‘বলুন, আপনার জন্যে কি করতে পারি?’
‘আমি ফারুকী সাহেবের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাচ্ছিলাম।’
‘স্যার, কি আসার জন্য বলেছেন?

জ্বী না।
তাহলে দেখা হবে না।’
‘ব্যাপারটা খুব জরুরী।’
‘সরি, সম্ভব হচ্ছে না।’
‘প্লীজ, অন্তত ওনাকে বলে দেখুন।’
‘আচ্ছা, দেখি ওনার পি.এ-র সঙ্গে কথা বলে। মনে হয় না কিছু হবে। আপনার বিজনেস কার্ডটা দিন।’
‘আমার কার্ড নেই। আপনি বলুন, তন্ময়ের একজন বন্ধু দেখা করবে।’
মেয়েটি এবার টকটকে লাল ঠোঁট লম্বা করে চোখ অসম্ভব ছোট করে বলল, ‘চাকরির ব্যাপার নাকি?’
জয় সাপের দৃষ্টি নিয়ে বলল, ‘বলেছি আপনাকে চাকরির ব্যাপার?’
‘না, মানে।’
‘দয়া করে আজেবাজে কথা বলবেন না।’
মেয়েটির অপমানিত গলা,
ওখানে অপেক্ষা করুন।’

এসব কথা হচ্ছিল বারোটায়। এখন বাজে দুইটা। এই দুই ঘন্টায় কেউ কিছু জিজ্ঞেস করা দূরে থাক, তাকাল না পর্যন্ত। যেন ও একটা ফার্নিচার। এরা সবাই প্রচুর সময় নিয়ে চা খাচ্ছে, হেসে একজন অন্যজনের গায়ে ঢলে পড়ছে। ওকে চা অফার করার মত অভদ্রতা এখন পর্যন্ত কেউ দেখায়নি। চরম অপমানিত হবার মত ব্যাপার, গায়ে না মেখে উপায় নেই তবুও জয় তন্ময়ের কথা ভেবে দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল। মানুষকে হেয় করে এরা কি মজা পায় কে জানে!
জয় আকাশ পাতাল রাগ নিয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘কথা বলে দেখলেন?’
‘মানে!’
‘দুই ঘন্টা আগে বললেন না কথা বলে দেখবেন। আমি জানতে চাচ্ছিলাম, এই জটিল কাজটায় আপনার কি পরিমাণ সময় লাগবে?’
‘এমন করে কথা বলছেন কেন? স্যারকে আপনার কথা বলা হয়েছে, অপেক্ষা করতে বলেছেন।’
‘তন্ময়ের বন্ধু দেখা করবে এটা বলেননি?’

মেয়েটি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘জ্বী-ই-ই।’
জয় ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল। সোফায় মূর্তির মতো বসে রইল। বিশ মিনিট পর একজন এসে বলল,
ভেতরে যান, স্যার আপনাকে পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছেন। মনে রাখবেন, জাস্ট পাঁচ মিনিট।’

বার্মা টিকের ভারী দরজা ঠেলে জয় ভেতরে ঢুকল । ঘর অন্ধকার, কোথাও আলো নেই। শুধুমাত্র নিচু একটা টেবিল ল্যাম্প উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। রিভলভিং চেয়ারে বসা ছায়া ছায়া মানুষটাকে ঠিক চিনতে পারছে না। ফারুকী সাহেবের সঙ্গ ওর দেখা হয়েছে দু’একবার। তা-ও দূর থেকে।
রাশভারী গলায় ভেসে এল, ‘তুমি তন্ময়ের বন্ধু?’
‘জ্বী’।
‘তোমাকে পাঁচ মিনিট সময় দেখা হয়েছে, ওরা বলেছে তো?’
‘জ্বী’।
‘কি জন্যে এসেছ চট করে বলে ফেলো।’
‘আমি কি এই পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলব?’
ফারুকী সাহেব অসম্ভব গম্ভীর গলায় বললেন, সিট ডাউন।’
‘ধন্যবাদ।
‘কাজের কথা বলো।’
‘আমি আপনাকে কিছু জরুরী কথা বলতে চাই। দয়া করে উত্তেজিত হবেন না।’
‘তোমার হাতে আর মাত্র চার মিনিট আছে।’
‘মনে করিয়ে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। খুব একটা সময় লাগবে না। যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, আমি যতটুকু জানি তন্ময় আপনার একমাত্র সন্তান। নিকট আত্মীয় বলতে তেমন কেউ নেই। ঠিক বলছি তো?’
‘গো অ্যাহেড।’
‘আমি জানতে চাচ্ছিলাম,
আপনি এত টাকা আয় করছেন কার জন্যে?’
ফারুকী সাহেব হিসহিস করে বললেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার জন্যে না!’
‘এটা কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর হলো না।’
‘এনাফ। তোমার প্রশ্নের উত্তর হলো, এবার আসতে পারো। এতক্ষণ সহ্য করেছি তুমি তন্ময়ের বন্ধু বলে।’
‘জ্বী, আমি তন্ময়ের বন্ধু বলেই, ওর কথা ভেবে বাইরে দুই ঘন্টা লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে মত ভিক্ষুকের মত বসে থেকেছি। আপনি দয়া করে পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছেন। কেন জানেন? শুধুমাত্র এ কথাটা বলার জন্যে, তন্ময় মাত্রাতিরিক্ত ড্রাগ নিচ্ছে, ওর আয়ু  ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। আমার ধারণা ছিল এটা সম্ভবত আপনার জানা নেই। এটা ছিল আমার ভুল ধারণা। আমি এবার যাব।’
ফারুকী সাহেব জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, ‘কি-কি‌, কি বললে তুমি! তন্ময় ড্রাগ-’ জয় পুরোটা শোনার আগেই গায়ের জোরে দরজা খুলে বেরিয়ে এল।


মেয়েটা জয়ের ঝড়ো কাকের মত অবস্থা দেখে অবজ্ঞার হাসি হাসতে গিয়ে ভুলে গেল। বড় সাহেব যে ভঙ্গিতে ছুটে আসছেন এই অভূতপূর্ব দৃশ্য আগে কখনও এ অফিসে দেখা যায়নি। মনে হচ্ছে চকলেটের লোভে ছোট্ট একটা শিশু দৌড়ে আসছে। ফারুকী সাহেব জয়ের হাত আঁকড়ে প্রায় শোনা যায় না এমন গলায় বললেন, ‘প্লিজ, আমার রূমে একটু আসো।’
চেয়ারে জয়কে বসিয়ে ঘুরে নিজের চেয়ারে বসতে দিয়ে টেবিলের কোনায় হোঁচট খেলেন। রিভলভিং চেয়ারে হাত পা ছড়িয়ে এলিয়ে পড়লেন। হাই কুল এসিতেও কপালে সাদা বালুর মত ঘাম জমছে। থেমে থেমে বললেন, ‘ও কখন থেকে ড্রাগ নিচ্ছে?’
‘ঠিক জানি না, আজই জানলাম।’
‘গড-গড! একি শুনছি! আহ-আহ!’
এমুহূর্তে জয়ের এই মানুষটার জন্য কী মায়াই না লাগছে। কোমল গলায় বলল, ‘আপনি কখনও টের পাননি?’
‘নাহ। এটা আমার কল্পনাতেও আসে না!’
‘এখন সবচে’  জরুরী যেটা, ব্যাপারটা খুব ভেবেচিন্তে হ্যান্ডল করতে হবে। বাড়াবাড়ি করলে হিতে বিপরীত হবে।’
‘ওহ গড, আমি এখন কি করব?

‘শান্ত হন, আপনার সহযোগিতা সবচে জরুরি। আরেকটা কথা, আমি যে আপনাকে এসব বলেছি এটা যেন ও ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে। জানলে আমার সঙ্গে হয়তো যোগাযোগ বন্ধ করে দেবে। এটা খুবই খারাপ হবে।’
‘কি ড্রাগ নিচ্ছে, জানো?’
‘খারাপটাই। পেথেডিন-হেরোইন, ঠিক নেই। যখন যেটা পায়। আর আপনি তো জানেন হেরোইন পর পর তিনবার নিলে চিকিৎসা ছাড়া এটা বন্ধ করা সম্ভব না।’
ফারুকী সাহেব চশমাটা নামিয়ে রাখলেন। ঝাপসা হয়ে আছে, লাগিয়ে রাখার কোন মানে হয় না! কপালের দু’পাশ চেপে বললেন, ‘কিছু মনে করো না, তোমার নামটা?’
‘জয়’।
‘জানো, জয়, ওর মা না থাকাতে এ অবস্থা হয়েছে। স্বীকার করি আমি ভাল বাবা হতে পারিনি। হয়ে গেছি টাকা বানানোর মেশিন। আজও টাকাই বানিয়ে যাচ্ছি। কি লাভ বলো, আমি আর ক’দিন, এসব তো ওর জন্যেই। ও কেন এমন করল, কিসের অভাব ওর? যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছি। কোন সাধ অপূর্ণ রাখিনি। একবার বলল বাবা আমি আর লেখাপড়া করব না। আমি বিরক্ত হলাম। খুব ঝুলাঝুলি করাতে বললাম, ঠিক আছে যা, করিস না। একদিন বলল, বাবা বাইক চালাতে ভাল লাগছে না, টাকা দাও গাড়ি কিনব। আমি বললাম আমাদের তো বেশ কটাই গাড়ি, একটা নিয়ে নে। ও বলল, না আমি লেটেস্টটা কিনব। ওই গাড়ি ক’দিন চালাল। এখন গারাজে পড়ে থাকে। কোন সাধটা ওর অপূর্ণ রেখেছি!’
জয় থেমে থেমে বলল, ‘আসলে ড্রাগ নেয়ার জন্যে নির্দিষ্ট কোন কারণ থাকে না। পারিবারিক জটিলতা ছাড়াও অনেকে সঙ্গ দোষে নেয়া শুরু করে। কেউবা নতুন একটা কিছু করতে গিয়ে ফান হিসেবে শুরু করে। ওর ব্যাপারটা আসলে ঠিক বুঝতে পারছি না। ওর সঙ্গে বহুদিন পর কাল আমার বিয়েতে দেখা হলো তো। এরপর আজ সকালে এলো।’
ফারুকী সাহেব ভাঙা গলায় বললেন, ‘এখন
আমি কি করব?’
‘ড্রাগ অ্যাডিক্টদের কোথায় ভাল চিকিৎসা হয় খোঁজখবর নেন। ওকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ভর্তি করাতে হবে। ভর্তি না করালে বাইরে থেকে ড্রাগ নেবে, লাভ হবে না কিছু।’
‘বাসায় আছে কি না কে জানে।’
‘দুপুরে আমার ওখানে খাওয়ার কথা ছিল। ড্রাগ যোগাড় করবে বলে চলে গেল। খুব তাড়াহুড়ো করবেন না। দেখি বিকেলে ওর সঙ্গে দেখা করে। আমি আপনাদের বাড়িতে গেলে কিছু মনে করবেন না তো?’


ফারুকী সাহেবের চোখ ভেজা। অসমবয়সী এক যুবকের কাছে এ লজ্জা তাঁকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করল না। চেয়ার ছেড়ে জয়ের হাত ধরে আর্দ্র গলায় বললেন, ‘নো মাই সান, আমি খুব খুশি হব। তুমি আমার এই একটা মাত্র ছেলেকে বাঁচাও।’
‘প্লীজ, শান্ত হন। আমি আমার সাধ্যাতীত করব। তন্ময় আমার পছন্দের মানুষদের একজন। আমি ওকে খুব পছন্দ করি। আপনার মত নিশ্চয়ই মমতা-আমি, মানে-।’
‘ইটস, ইটস অলরাইট, মনটা শক্ত করো। আমরা ভেঙ্গে পড়লে ওর ক্ষতি হবে যে।’
‘আমি তাহলে এখন যাই।’
‘জয়, তুমি যদি দুপুরে আমার সঙ্গে খাও আমার খুব ভাল লাগবে। তাছাড়া তোমার সম্বন্ধে কিছুই জানি না। জানতে ইচ্ছে করছে।’
‘আজ না, অন্য কোনদিন।’
‘জরুরী কোন কাজ আছে?’
‘জ্বী, জরুরী কাজ ঠিক না, মানে-।’
‘তাহলে চলো, একসঙ্গে লাঞ্চ করি।’
‘ইয়ে মানে, ইভা-।’
‘ইভা, ইভা কে?’
‘কাল বিয়ে হলো তো, ও অপেক্ষা করবে।’
‘ওহ হো, তোমার ওয়াইফ, সরি-সরি। তা আগে বলবে তো! তুমি দেখি আচ্ছা ছেলে হে।

‘আচ্ছা, যাই তাহলে।’
‘ও, শোনো শোনে, এক মিনিট। তোমার বাসার ঠিকানাটা বলো তো?’
‘বাসাবোর একদম ভেতরে, আগমন সিনেমা হলের পেছনে। পেঁচানো রাস্তা।’
‘আহ, একটা কাগজে লিখে দাও না।’
‘একদম ভেতরে, মানে ঠিক খুঁজে-।’
ভয় পাচ্ছ, হুট করে হাজির হয়ে যাব?’
‘না-না, কি যে বলেন, ইয়্যু আ মোস্ট ওয়েলকাম।’

জয় অনেক চেষ্টা করল, লাভ হলো না। ফারুকী সাহেব কেবল এগিয়েই দিলেন না, জয়কে প্রায় ঘাড় ধরে গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে ড্রাইভারকে বলে দিলেন জয়কে যেন তার বাড়িয়ে পৌঁছে দেয়।

আগের পর্ব: কনক পুরুষ, ৮: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_22.html 

কনক পুরুষ: http://tinyurl.com/29uf4s    

Sunday, August 22, 2010

কনক পুরুষ: ৮

পাথর চাপা হৃৎপিন্ড নিয়ে জয় বাসায় ফিরল। এখানে আরেক নাটক হচ্ছে। খালা ইভাকে নিয়ে পড়েছেন। ও বিব্রত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে আছে। খালার দাঁত যেমন উঁচু, মনটা তেমনি নিচু। বিশ্রী ভঙ্গি করে কি সব জিজ্ঞেস করছেন, ‘অ্যাই, অ্যাই মেয়ে তোমার হাত-গা খালি, তোমার গহনা কই?’
জয় ঠান্ডা গলায় বলল, ‘এই মেয়ে, এই মেয়ে করছ কেন, ওর নাম নাই?’
‘তুই এভাবে কথা বলছিস যে! মুরুব্বীর সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে?

‘কিভাবে কথা বলছি?’

‘কিভাবে বলছিস জানিস না?
‘না, জানি না। বলে দাও।’
‘গহনার কথা জিজ্ঞেস করাতে দোষ হয়েছে, লিস্ট করতে হবে না?’
‘লিস্ট দিয়ে কি হবে?’
‘কি বলছিস তুই! কি কি এল খোঁজ নিবি না?’
‘কি করব খোঁজ নিয়ে, ধুয়ে খাব? ওর জিনিসের খোঁজ ও রাখবে, তুমি আমি কে?’
‘আমি কেউ না! বাড়িতে ডেকে এনে অপমান করছিস?’
‘তুমি যা ভাল মনে করো।’


এ মুহুর্তে খালাকে দেখে মনে হচ্ছে অসহ্য রাগে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন। কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, ‘ওই দিন মাত্র তোকে লেংটা দেখলাম, আজ আমাকে তুই-তোকারি করছিস!’
‘খালা, শুধু শুধু কথা বাড়াচ্ছ। কখন তোমাকে তুই করে বললাম।’
‘বলিসনি, বলবি।

আচ্ছা, যখন বলব তখন চড় দিও। 
বলে ফেললে কি করব? কলস ভেঙ্গে ফেললে চড় দিয়ে লাভ কী!’
‘খালা, দয়া করে চুপ করো।’
‘বাইরের একটা মেয়ের জন্যে আমাকে চুপ করতে বলছিস?’
‘এ বাইরের মেয়ে না, একে কলেমা পড়ে বিয়ে করেছি। তুমি যেমন, এ-ও তেমন।’
‘এ আর আমি সমান হলাম! কোথায় আগরতলা কোথায় চৌকির তলা!’


জয় চুপ করে রইল, এ মহিলার সঙ্গে কথা বলা বৃথা। ইভার মুখ সাদা হয়ে গেছে। খালা পাগলের মত হয়ে গেলেন, ‘তুই আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করলি, তোর খালু আজ পর্যন্ত এমন করার সাহস পায়নি!’
জয়ের ধৈর্য্যর বাঁধ ভেঙ্গে গেল। চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘খালু ভাল মানুষটার মাথা তো রাতদিন চিবিয়ে খাচ্ছ। লোকটার পাগল হতে বাকি আছে।

খালা একছুটে রান্নাঘর থেকে জয়ের মাকে নিয়ে এসে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বললেন, ‘জাহানারা, দেখ, দেখ তোর ছেলে কিসব বলছে, আমার স্বামী নাকি পাগল। আল্লাগো, এ দিনও দেখার ছিল! অনেক হয়েছে আর না, বানের জলে ভেসে তো আর আসি নাই। ভেবেছিলাম ক’দিন থেকে এর সংসার গুছিয়ে দিয়ে যাব। ঠিক হয়েছে, মুখে ঝাঁটা মরে তাড়িয়ে দিচ্ছে। এই মুহুর্তে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। এক মুহুর্ত না... জানুরে, একটা ট্যাক্সি ডেকে দে।’


জয়ের মা, বলে কয়েও বোনকে রাখতে পারলেন না। খালা যাওয়ার আগে দীর্ঘক্ষণ খালুর সঙ্গে ফোনে কথা বললেন। প্রত্যেকটা শব্দের সঙ্গে খন্ড খন্ড করে কাঁদলেন। জয় ভয়ে ভয়ে ছিল, খালা না আবার মত বদলে ফেলেন।
ইভা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘তুমি কেন এমন করলে, খালাকে কাঁদিয়ে দিলে।’
‘বেশ করেছি। এ মহিলার মন আবলূস কাঠের মত।’
‘ছি, তুমি আমার জন্যে এমন করলে, মা খালা এরা কি ভাবলেন বলো তো!’
‘খালা কি ভাবলেন এতে কিছুই যায় আসে না। মা কিছু মনে করবেন না। নিজের বোনকে ভালই চেনেন।’
‘ছি, তুমি কিসব করো!’
‘আচ্ছা, এসব বাদ দাও। তন্ময় কিন্তু দুপুরে খাবে না, চলে গেছে।’
‘তুমি আটকালে না, আমি না কত করে বললাম।’
‘বলেছিলাম, শুনল না। ও নিয়মিত ড্রাগ নিচ্ছে, জোগাড় করতে গেছে।’
‘কি-ক-ক্কি বলছ!’
‘হুঁ। খুব খারাপ অবস্থা ওর।’


ইভার অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে এটা ভাবতে যে, এই আমুদে ছেলেটা ড্রাগ নিচ্ছে। জয় এবার গাঢ় স্বরে বলল, ‘যাওয়ার সময় খুব ঘটা করে বলে গেল তোকে অসম্ভব পছন্দ করি। কথাটা বলেই ফেললাম, আর যদি সুযোগ না হয় কোনদিন।’
ইভা এগিয়ে এসে নিঃসঙ্কোচে জয়ের হাত ধরল, ‘তন্ময় ভাইকে একটু বলবে আমার সঙ্গে দেখা করতে?
‘তন্ময়, তুই এটা কি করলি, কিসের অভাব তোর? তুই কী জানিস টাকা-পয়সার কি কষ্ট, তুই কী জানিস! এই আমি, আমি জানি। গত বছর পর্যন্ত কি কষ্টই না করেছি। মাস্টার্স করে ঘরে বসে আছি। চাকরি নেই, বাবার পেনশনের টাকায় চলছে না। এ বছর ছোট ভাইকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়াতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছি। জানো ইভা, আমার এই ভাই তার জীবনের সেরা সময় কাটাচ্ছে বিদেশে, নি:সঙ্গ-একাকী। বড় ভাই হয়ে এ লজ্জা কোথায় রাখি বলো? মুহুর্তের জন্যেও ভুলতে পারি না, দায়িত্ব পালনে আমি অসফল হয়েছি। ওর যাওয়ার সময় আমি হাসিমুখে বললাম, যা দীপু যা, তোকে কোরবানি দিলাম। হাসি হাসি মুখে বলেছিলাম কিন্তু বুক ফেটে যাচ্ছিল।’


জয়ের এতক্ষণে খেয়াল হলো ইভা ওর হাত ধরে আছে। কী কোমল ওর হাত! জয় লজ্জায় লাল-নীল হতে থাকল, হাত ছাড়াবার জন্যে টানাটানি করতে লাগল। ইভা হাত ছেড়ে নিঃশব্দে হাসল। কর্কশ শব্দে টেলিফোন বাজছে। জয় বেঁচে গেল। দ্রুত গিয়ে ফোন উঠালো। ওপাশ থেকে খালুর আমুদে গলা ভেসে এল, ‘লায়েক হয়েছিস, তোর খালাকে কি বলেছিস? টান মেরে আলাজিব ছিঁড়ে ফেলব।’
‘সরি, খালু। আমার না আজ মনটা ভাল নেই।’
‘তোর মন ভাল নেই মানে, ওই জিনিসটা আছে নাকি তোর!’
‘সরি, খালু। ভুল হয়ে গেছে।’
‘আ: ক্যাঁচরম্যাচর বন্ধ কর। এই দজ্জাল মহিলাকে কাবু করলি কি করে?’
‘ইয়ে খালু, খালা খুব রেগেছে নাকি?’
‘রেগেছে মানে, গুন্ডা লাগিয়ে তোকে খুনও করে ফেলতে পারে, বিচিত্র কিছু না। আমাকে বলেছে তোকে ল্যাংটা করে পিটাতে, হা হা হা’
‘বিতিকিচ্চি ব্যাপার হয়ে গেল, খালু।’
জয় রিসিভারটা কানে আরও চেপে ধরল, কেমন শোঁ-শোঁ শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে সাগর তীরে বসে আছে। চিৎকার করে বলল, ‘হ্যালো, খালু, হ্যালো, লাইন ডিসটার্ব করছে, জোরে বলো শুনতে পাচ্ছি না।’
খালূর অস্পষ্ট গলা ভেসে এল, ‘এই শোন, কি কি বলে এই ভদ্র মহিলাকে কাবু করলি সব কাগজে লিখে রাখ। পরে তোর কাছ থেকে জেনে নেব নে।’


লাইন কেটে যেতেই জয় টেলিফোন রেখে হাসল। খালু যে কী ছেলেমানুষ!
‘জানো ইভা, খালুর মত মানুষ হয় না, অথচ এই ভদ্রলোককে খালা যে কি মানসিক অত্যাচার করেন এটা বলে শেষ করা যাবে না। এই সেদিন চাকরানির সাথে খালুকে জড়িয়ে বিশ্রী হইচই করলেন। একদিন কি ভালমানুষের মত মুখ করে বললেন, জয়, তোর খালু আজকাল দেরি করে বাসায় ফিরছে। আমার মনে হয় কোন মেয়ের পাল্লায় পড়েছে। তই একটু খোঁজ খবর নে তো, টাকা পয়সার কথা চিন্তা করিস না। চিন্তা করো, কী ছোট এই মহিলার মন।’
‘তুমি কি চা খাবে?’
‘নাহ, একটু বেরুব। তন্ময়ের ব্যাপারে কি করব বুঝতে পারছি না। দেখি ওর বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারি কি না।’


*কনক পুরুষ, ৯: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_23.html 
**কনক পুরুষ: http://tinyurl.com/29uf4s

Saturday, August 21, 2010

চোর-চোট্টায় বিদেশটাও ভরে যাচ্ছে।


চালু একটা কথা আছে, চোর-চোট্টায় দেশটা ভরে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হবে চোর-চোট্টায় বিদেশটাও ভরে যাচ্ছে। আক্ষরিক অর্থে দেশের সবাই যেমন চোর না, তেমনি বিদেশেরও; এই নিয়ে কুতর্ক করার অবকাশ নাই।
আমাদের দেশে জায়গা কম, লোক বেশি। যা হওয়ার তাই হয়, দলে দলে আমাদের দেশের লোকজনেরা বিদেশে পাড়ি জমান। কে জানে, একদিন এমন আসবে এই দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা দেশে থাকবেন, অর্ধেক ছড়িয়ে ছিটিয়ে অন্য দেশগুলোয়। আর বিদেশের লোকজনেরা? এরা তখন কিছু নিজের দেশে থাকবেন, কিছু মহাশূণ্যে।

আমরা যেখানেই যাই সেখানেই আমাদের ছাপ থেকে যায়। খাসলত যাবে কোথায়! অবশ্য আমরা যারা দেশে থাকি প্রবাসীদের প্রতি সমীহের দৃষ্টিতে তাকাই কারণ এঁরা বিদেশে থাকেন, বিদেশিদের কাছ থেকে রাশি রাশি জ্ঞানগর্ভ বিষয় দেখে শেখেন। নিয়ন্ত্রিত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, রেড ওয়াইন-হোয়াইট ওয়াইন এঁদের বুদ্ধি খোলতাই করে। আমরা হাঁ করে থাকি এদের কাছ থেকে শেখার জন্য।

'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' নামে নীলিমা ইব্রাহিমের অসাধারণ একটা বই আছে। মুক্তিযুদ্ধের বই 'ফ্রিডম' যখন লিখি তখন এই বই থেকে অল্প কিছু রেফারেন্সও ব্যবহার করেছিলাম, কারণটা ছিল ভিন্ন। যেখানেই সুযোগ এসেছে আমি বলার চেষ্টা করেছি, এই প্রজন্ম যেন অন্তত এই বইটা পড়ার চেষ্টা করে। কারণ এখানে আমাদের যুদ্ধের এমন কিছু অন্ধকার দিক এসেছে আজকাল যা চোখে পড়ে না। আমাদের যা অভ্যেস, সব কিছুতে আমরা কিছু-না-কিছু মিশিয়ে দিচ্ছি। ফল যা হওয়ার তাই হয়, জানতে পারি আমরা সত্য-অসত্যের মিশেলে ভাসা-ভাসা এক অবয়ব, বিকলাঙ্গ এক শিশু !

১৯৯৭ সালে 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইটির ভূমিকায় নীলিমা ইব্রাহিম লিখেছিলেন, "...সম্প্রতি আমার তরুণ প্রকাশক প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড নিয়ে 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' গ্রন্থের অখন্ড সংস্করণ প্রকাশ করতে যাচ্ছেন..."।
'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইয়ের প্রকাশক, জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবাদে এটাও আমার জানা, তিনি যখন বইটি প্রকাশ করেন তখন এই বইটি নামকরা প্রকাশনীর কেউই ছাপতে রাজি হননি! ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তিনি বইটি প্রকাশ করেছিলেন। এখানে ব্যবসায়িক চিন্তা খুব একটা কাজ করেছে বলে আমার মনে হয় না। আজ তিনি কতটা বদলেছেন আমি জানি না কিন্তু এটা সেই সময়কার কথা যখন নীলিমা ইব্রাহিমের ভাষায় তিনি 'তরুণ প্রকাশক'। তরুণ? কতটা তরুণ? অনুমান করি, বাইশ-চব্বিশ। এমন একটা বয়স যখন একজন যুবকের দু-চোখে থাকে কেবলই স্বপ্ন।

আমার জানামতে, জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক শয়ে-শয়ে বই বের করেছেন কিন্তু আমি নিশ্চিত, 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' প্রকাশের স্বপ্ন তাঁকে এখনও তাড়া করে।
আর ব্যবসায়িক চিন্তা থাকলে দোষ কী! একজন প্রকাশককেও বই ছাপাবার ব্যয় বহন করতে হয়, পরিবার চালাতে হয়; লাভের টাকায় অন্য আরেকটা বই ছাপাবার উদ্যোগ নিতে হয়।
'সৃষ্টি সুখের উল্লাসে...' শুনতে চমৎকার লাগে কিন্তু লেখকদের কৌপিন পরে কেবল উবু হয়ে লিখলেই চলে না, পেটে দানাপানি দিতে হয়। কারণ লেখক রোবট না- কেবল রোবটেরই খাওয়ার এবং বাথরুমের চিন্তা নাই।

কানাডা প্রবাসী কিছু লোকজন এই বইটির নাট্যরূপ দিচ্ছেন। শুনলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। তবে একটা কিন্তু থেকেই যায়। জানা গেছে, এঁরা এই বইটির প্রকাশক এবং লেখকের অনুমতি নেননি। লেখক প্রয়াত কিন্তু তাঁর পরিবারের লোকজন রয়ে গেছেন, তাঁদের সঙ্গেও কোন ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি, অনুমতিও নেয়া হয়নি।
কেবল তাই না, এঁরা অনুমতির তোয়াক্কা করছেন না। প্রকাশকের লিখিত আপত্তি এবং লেখকের পরিবারের অনীহা থাকার পরও এই নিয়ে গা করছেন না! তাঁদের এই গা-ছাড়া ভাবের উৎস কি?

কানাডার মত একটা দেশে থেকে এটা তো আমাদের চেয়ে ভাল জানার কথা, কপিরাইট বলতে একটা বিষয় আছে। কারও অনুমতি ব্যতীত তাঁর লেখা ছাপানো যায় না, নাট্যরূপের তো প্রশ্নই আসে না। কারণ নাট্যরূপ হচ্ছে সেই বিষয়, কখনও কখনও প্লাস্টিক সর্জারির মত লেখার গোটা আদলটাই বদলে যায়।
এখন কেউ কারও মুখ প্লাস্টিক সার্জারি করবে সেই মানুষটার অগোচরে, মানুষটাকে অজ্ঞান করে। এ কেবল অপরাধ না, এটা জঘন্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। প্রচলিত আইন এই অপরাধ করতে অনুমতি দেয় না। তারচেয়ে আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, এটা তো রগরগে প্রেমের উপন্যাস না, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অসাধারণ দলিল। যখন যার খুশি এটার নাট্যরূপ দিয়ে মহড়া শুরু করে দেবেন। ইচ্ছা হলেই রক্ত চাই-রক্ত চাই টাইপের সংলাপ বসিয়ে দেবেন!

আইন, আইনের জায়গায় থাকুক। এই 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইটির ১৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, "...বঙ্গবন্ধুকে যখন বলেছিলাম উনি বল্লেন, 'না আপা, পিতৃপরিচয় যাদের নেই সবাইকে পাঠিয়ে দেন। মানুষের সন্তান মানুষের মত বড় হোক। তাছাড়া ওই দূষিত রক্ত আমি এদেশে রাখতে চাই না...'।"
হা ঈশ্বর, দূষিত রক্ত! এখন কি আর এই সব সত্যগুলো অবিকল থাকবে? খানিকটা যে পরিবর্তন হয়ে যাবে না, কে মাথার দিব্যি দিয়েছে?
যারা এই বইগুলোর নাট্যরূপ দেবেন, এরা যে এদের পছন্দমতো সংলাপ জুড়ে দেবেন না এর নিশ্চয়তাই বা কোথায়!

'নতুন দেশ' [১], এই সাইটে গিয়ে আমি একটা ধাক্কার মত খেলাম।

এখানে চমৎকার (!) একটা ছবি দেয়া আছে। গুরুতর মহড়াও চলছে। ড্রয়ংরুমে কী দুর্ধর্ষ মহড়া! যা হোক, মহড়া বলে কথা! সমস্যটা অন্যখানে। হতভম্ব হলাম যেটা দেখে, ওখানে লেখার শিরোনাম হচ্ছে,  মঞ্জুলী-ফেরদৌসের আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। বাহ, নীলিমা ইব্রাহিম থেকে মঞ্জুলী ফেরদৌস হয়ে গেছে! "মঞ্জুলী ফেরদৌসের 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি'!"
ব্রাভো!
কালে কালে দেখব, লোকজন রবীন্দ্রসঙ্গীতও রচনা করা শুরু করে দিয়েছে। তাদের রচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবার সুরও দেয়া হচ্ছে। আবার একজন মাথা দুলিয়ে দরদ দিয়ে গাইছেনও। হতে পারে না এমনটা, বেশ পারে।
সত্যি বলছি, অন্যদের কথা জানি না, এমনটা হলে আমি খুব একটা অবাক হবো না।   

নিয়ম করে এই সব চলেই আসছে।

ক-দিন আগে অমিত কুমার সরকার নামের একজন আমার একটা লেখা 'আমি কেউ না, আমি কিছু না' [২] একটা ওয়েবসাইটে নিজের নামে হুবহু ছাপিয়ে দিলেন, দাঁড়ি-কমাসহ!

একজন পাঠক চ্যালেঞ্জ করলে তিনি আবার জাঁক করে উত্তরও দিয়েছেন, তার সোর্স নাকি ডিসকভারি এবং নিজস্ব ডায়েরি। আমি ক্রোধ সংবরণ করে ওখানে সুবোধ বালকের মত একটা মন্তব্য করেছিলাম, 'আপনাকে এই লেখা লিখতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে, না'?

অমিত কুমার সরকার নামের মানুষটা চোখের নিমিষে আমার যে লেখাটা কপি-পেস্ট করে দিলেন, তিনি কি কল্পনা করতে পারবেন, এই লেখাটা লিখতে আমাকে কী বিপুল তথ্য নাড়াচাড়া করতে হয়েছে? কত অসংখ্য বই পড়তে হয়েছে, কত বিনিদ্র রজনী কেটেছে?
একটা মানুষ অন্য একজন মানুষের এই কষ্টার্জিত অর্জন এক নিমিষে নিয়ে নেবেন? কিচ্ছু বলার নেই? একজন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সম্পদ অর্জন করবেন, অন্য একজন মানুষ গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবেন; ইচ্ছা হলেই ওই মানুষটার অর্জিত সম্পদ অবলীলায় নিয়ে নেবেন? আর আমরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখব! বাস্তবে কি এটা সম্ভব?

এদের দোষ দিয়ে লাভ কি, আমরা দেখে দেখে শিখি। নামকরা প্রিন্ট মিডিয়াগুলো আমাদেরকে হাত ধরে শেখায়। ওয়েব সাইট থেকে একটা লেখা পত্রিকায় হুবহু ছাপিয়ে লিখে দেয়, 'ওয়েবসাইট অবলম্বনে'। ভাবখানা এমন, ওয়েব সাইটের লেখা হচ্ছে গণিমতের মাল! গ্রামীন ফোন কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে [৩] চুরি শেখায়, শেখান হানিফ সংকেত [৪], আনিসুল হক [৫] গং। বেচারা আমাদের চুরি না-শিখে উপায় কী!

আইনের বাইরেও কথা থেকেই যায়। আমি মনে করি, এটা আমি পূর্বেও বলেছি, আমার কাছে আমার সমস্ত লেখালেখি হচ্ছে সন্তানসম। আমি কখনই চাইব না, আমার সন্তান অন্যের কোলে বড় হোক। সে কোলটা কতটা চকচকে, কতটা তুলতুলে তাতে আমার কী আসে যায়! আমি কখনই চাইব না আমাকে না-জানিয়ে আমার সন্তানকে কাটাছেঁড়া করা হোক, তাকে সো-কলড সুদর্শন বানানো হোক। নিজের দুবলা, কালো লিকলিকে সন্তান আমার কাছে দেবশিশু তুল্য।
আমি এটাও মনে করি, একজন লেখক একের পর এক শব্দের ইট বসিয়ে তাঁর নিজস্ব এক ভুবন সৃষ্টি করেন। পেছনে পড়ে থাকে তাঁর প্রিয়জনদের চোখের জল, বাচ্চার দুধ কিনতে না-পারার যন্ত্রণা, বিনিদ্র রজনী-রাত জাগা ভোর। 

'এই শব্দগুলো' নামের তাঁর সন্তানকে যখন কেউ ছিনিয়ে নেয়, আমি তাকে স্রেফ চোর বলব। ভুল বললাম, চোর না, ছিনতাইকারী বলব। শব্দের ছিনতাইকারী।
...   ...   ...
সেরীন ফেরদৌস, যিনি আবার 'নতুন দেশ' ই-পত্রিকার হর্তাকর্তা, ফেসবুকে তাঁর একটা মন্তব্য দেখলাম। তিনি বলতে চাচ্ছেন, বইয়ে স্বত্বের বিষয়টি বইয়ে লেখা নেই বিধায় এই চৌর্যবৃত্তিকে চৌর্যবৃত্তির পর্যায়ে ফেলার কোন অবকাশ নাই। তেমনি প্রয়োজন নাই অনুমতি নেয়ার।
হাস্যকর, অতি হাস্যকর! বইয়ে স্বত্বের বিষয়টি উল্লেখ না-থাকলে সমস্যা হবে প্রকাশক এবং লেখকের মধ্যে, অন্যদের কী! সেরিন ফেরদৌসের কি?
সন্তান কার এটা নিয়ে স্বামী-স্ত্রী লড়বেন, কার ভাগে পড়বে এটাই বিচার্য বিষয়। নাকি জজ সাহেব এই সন্তানকে হিড়হিড় করে টেনে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাবেন?
আর শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরীর পুত্রবধু কাজটি করছেন বলেই যে চৌর্যবৃত্তিটা আইনসম্মত হবে এটা কে বলল? স্বয়ং মুনির চৌধুরীও এই কাজটা করলে একই অপরাধে অভিযুক্ত হতেন। কী অদ্ভুত যুক্তি, একজন মুক্তিযোদ্ধা হলেই তাঁকে কোন অন্যায়ের জন্য অভিযুক্ত করা যাবে না, নাকি? একজন কাদের সিদ্দিকী মুক্তিযোদ্ধা বলে কি তাঁর অজস্র অপরাধ, সাত খুন মাফ? আমাদের টাকায়, যে ব্রীজগুলো অর্ধসমাপ্ত রেখে অনায়াসে বিপুল টাকা বাগিয়ে নিলেন এই জঘন্য অপরাধ কী লঘু হয়ে যাবে?

*স্ক্রীনশট:
১. নতুন দেশ
২. সামহোয়্যারইন ব্লগ ডট নেট, অমিত কুমার সরকার
৩. আরিফ জেবতিকের ফেসবুক

**অমিত কুমার সরকারের বিষয়টা জানতে পারি ব্লগার শয়তানের 'এরম কৈরা লেখা চুরি করন ঠিক্না ঠিক্না' পোস্ট থেকে। এটা উল্লেখ করতে ভুলে গেছি, এই কারণে এই ব্লগার নামের লেখকের কাছে আমি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করি। 

সহায়ক লিংক:
১. নতুন দেশ: http://www.notundesh.com/binodon.html 
২. আমি কেউ না, আমি কিছু না: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_07.html 
৩. গ্রামীন ফোন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_06.html 
৪. হানিফ সংকেত: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_02.html 
৫. আনিসুল হক: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_27.html   

Friday, August 20, 2010

তিতলি তুমিও: ১

কল্লোল অসময়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। দুপুরে ঘুমানোর তেমন অভ্যাস নেই। কেমন গাছাড়া ভাব। বিকট হাই তুলে খানিকটা লজ্জিত হল, অবিকল কুকুরের ঘেউ শব্দের মত শোনাল। হাই উঠলে কেমন দেখায় আয়নায় দেখতে পারলে বেশ হত। এ ঘরে কোন আয়না নেই।

সাড়ে পাঁচটা বাজে। বাইরে আলো মরে আসছে। আশ্চর্য, এতটা সময় ঘুমিয়েছে! এমন সময়ের অপচয় উন্নত দেশের লোকজনরা সম্ভবত কল্পনাও করতে পারে না। দূর সম্পর্কের ফুফাত ভাই সেবার সুইডেন থেকে দেশে এসেছিলেন বেড়াতে। তিনি বাইরে থেকে আমদানী করা লাল মুখ আরও লাল করে বলেছিলেন: ডিসগামটিং, এইসবের মানে কী বল দেখি!
কি ব্যাপার, অলি ভাই?
দুপুরে কী এ দেশের পনেরো কোটি লোক ঘুমায়! যাকেই ফোন করি, ঘুমাচ্ছে। অফিসে করলে, সাহেব নাই কই? বাসায়। আরে এই দেশে কোন শালা সাহেব রে! বাসায় খোঁজ করলে সাহেব ঘুমুচ্ছেন, ডেকে দেয়ার নাকি প্রশ্নই আসে না। এইসব কী, হোয়াট ইজ দিস? সময়ের কোন দাম নাই, সময় কী বাদামের খোসা! এ দেশের পাবলিকের কবে জ্ঞান হবে, টাইম ইজ টাইম, নট ইয়্যুর মাইন। এমন জানলে দেশেই আসতাম না, শ্লা।


কল্লোল অলি ভাইয়ের ইংরাজী জ্ঞান দেখে চমৎকৃত। অনেক ক’টা বছর বাইরে থেকে এই অবস্থা! এই লোকের ইংরাজী জ্ঞান দেখি একটা দেশের প্রাইম মিনিস্টারের প্রায় সমান। আগে প্রাইম মিনিস্টার ইংরাজিতে ভাষণ দিলে, কী এক বিচিত্র কারণে ইংরাজীটা হিব্রু হয়ে যেত। ইদানিং অবশ্য তাঁর উন্নতি হয়েছে।
কল্লোল মনে মনে অসম্ভব বিরক্ত হচ্ছিল, লাল্লু খুব লেকচার দিচ্ছ দেশে ফিরে। বাইরে যাওয়ার পূর্বে মাথায় লুঙ্গি বেধে ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকতে, ভুলে গেছ।
কল্লোল বিরক্তি চেপে বলেছিল: অলি ভাই, দেশের লোকজন সব ঘুমিয়ে থাকলে কি আর করা।

গাধা- গাধা, গাধারাই কেবল দুপুরে ঘুমায়, অলি ভাই বললেন অপ্রসন্ন গলায়।
কি বলছেন অলি ভাই, এই তো সেদিন চিড়িয়াখানায় গেলাম। অনেকক্ষণ ছিলাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। কই, দেখলাম না তো গাধা বাবাজীরা ঘুমুচ্ছে। খাচ্ছে-দাচ্ছে, দিব্যি লেজ নাড়াচ্ছে। অলি ভাই, লেজ মানে বুঝতে পারছেন তো? ইয়ে, আপনি তো আবার দেশের অনেক কিছুই ভুলে গেছেন। লেজের ভাল বাংলা হচ্ছে গিয়ে পুচ্ছ-লাঙ্গুল। সরি, আপনার তো আবার বাংলার চেয়ে ইংরেজি জ্ঞান ভাল। ইংরাজিতে হচ্ছে, টেইল।
অলি ভাই লাল মুখের সঙ্গে মিলিয়ে বিচিত্র উপায়ে চোখও টকটকে লাল করে ফেললেন।
কল্লোল ভয় চেপে বলেছিল: সরি অলি ভাই, ঠাট্টা করলাম।
ইউ ব্লাডি রিলেটিভ, আই শ্যুট য়্যু, আনটিল য়্যু নেভার ডেড।
যাওয়ার বেলায় অলি ভাই একদিন বিদায় নিতে আসলেন। বিষণ্ন হয়ে বললেন, কল্লোল রে, ওদিনের ব্যাপারে মনে কষ্ট রাখিস না। চলে যাচ্ছি। কবে না কবে আবার তোর সঙ্গে দেখা হয়। বুঝলি, মানুষের তো রাগ হতেই পারে। আমি তো আর মহামানব না।
জ্বী, অলি ভাই, মানব, গুহা মানবের রাগ-টাগ তো হতেই পারে কিন্তু মহামানবের রাগ জিনিসটা ঠিক মিশ খাচ্ছে না।
বুঝলাম না, কী বললি।
সহজ কথাটা বুঝলেন না। বাংলা অভিধান মতে, মহামানব অর্থ হচ্ছে,  সমগ্র মনুষ্য জাতি। আপনি বললেন, আমি তো আর মহামানব না কি দাঁড়াল আমি তো আর 'সমগ্র মনুষ্য জাতি' না।
অলি ভাই নিমিষে লাফিয়ে উঠলেন, ইউ ব্লাডি রিলেটিভ ...।


মৌ ঠক করে চা’র কাপ নামিয়ে কানের পাশে প্রাণপণে চেঁচিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, চা-আ।’
কল্লোল উল্টিয়ে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। কঠিন করে ধমক দিল, ‘ফাজিল ছোকরি, আমি কী বেটোভেন, না কালা! এই মহিলা উল্লুক, এইসব কী শকার-বকার।’
‘ইশ-শ, ফুল সাউন্ডে যখন গান শুনিস, তখন বুঝি কিছু  হয় না। তোর কান তো আবার গন্ডারের চামড়ার। কিসব জঘন্য গান, 'অ-য়ে অয়ে'। ছি, এইসব ইংরেজি গান কেউ শোনে, শুধু তুই শুনিস।’
‘খুব যে বুড়ির মত কথা বলছিস। তোর ভবিষ্যৎ একেবারেই ঝরঝরে, অকালে পেকে টসটস করার ফল।’
‘আ-চ্ছা। তোর চা ঠান্ডা হচ্ছে। আচ্ছা ভাইয়া, ফ্রিজ থেকে বরফ ঠান্ডা কোক কাউকে এনে দিলে; ধর, সে খেতে দেরি করছে। তখন কি বলতে হবে, নিন ভাইসাব, আপনার কোক গরম হচ্ছে?’


কল্লোল চায়ে চুমুক দিয়ে থু থু করে মুখ আঁধার করে ফেলল। মা চায়ে চিনি দিয়ে শরবত বানিয়ে ফেলেছেন। লক্ষবার বলার পরও মা যন্ত্রের মত ওর চায়ে একগাদা চিনি ঢেলে দেন। মা কেন এমন করেন, এটা কী ইচ্ছা করে করেন! ওদের এই টানাটানির সংসারে দিনের পর দিন চিনির এই অপচয়, এর কোন অর্থ হয়! ওর গা কেমন গুলাচ্ছে, ক’চামচ চিনি দিয়েছেন কে জানে! সম্ভবত চার-পাঁচ চামচের কম না। বমি এসে যাচ্ছে।
‘ভাইয়া, চা খাবি না, ওরকম করছিস যে?
‘চা খাব কিরে, বল শরবত খাব কি না!’
‘মাকে আবার চা বানাতে বললে খুব রাগ করবেন। আমি বানিয়ে নিয়ে আসি?’
‘পাগল, তুই বানাবি কিরে, তুই কি চা করতে পারিস!’
‘পারি না, তাতে কি, মাকে কতবার দেখেছি চা করতে।’
‘খবরদার, চুলোর কাছে গেলে এক কিকে দাঁত ফেলে দিব।’
‘কোন দাঁতটা, যেটা নড়ছে?’
‘আরে তুই দেখি মহা অভদ্র রে।’
মৌ এ মুহূর্তে কোন শ্রেনীর ভদ্র এ নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাচ্ছে না। নডনড়ে দাঁতটা এক চোখ বন্ধ করে বেদম নাড়াচ্ছে। দাঁতে জিব ছুঁয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, ‘ভাইয়া, দেখ-দেখ, জিহ্বা দিয়ে কেমন এপাশ ওপাশ করছি। তুই পারবি?’
‘কী কান্ড, বিনে পয়সায় মারাত্নক সার্কাস। তুই এক কাজ কর, জুয়েল আইচের সহকারী হযে যা।’
‘জানিস, ওদিন না টিভিতে দেখে চিনতেই পারছিলাম না। চমৎকার গোঁফ কেটে ফেলায় কী বিশ্রী দেখাচ্ছিল।’
‘ইয়ে মৌ, সিগারেট ফুরিয়ে গেছে; কি করি বল তো। বাবা কি বাসায়?’
‘একটু আগে তো দেখলাম।’
‘মাই লিটল সুইট হার্ট, বাবাকে লুকিয়ে চট করে একটা সিগারেট এনে দে।’
মৌ রেশমের মত চুল সবেগে এপাশ ওপাশ করে বলল, ‘না- না, আমি চুরি করতে পারব না।’
‘ধুর,বাবার প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট আনলে চুরি হয় বুঝি।’
‘না-না।’
‘ইস, এ দেখি মাদার তেরেসা। আরে তুই তো আস্ত চোর।’
‘ভাইয়া, আজে-বাজে কথা বললে ভাল হবে না কিন্তু, আমি কিন্তু ...।’
‘কি, কি করবি তুই।’
‘আমি কিন্তু শেষে কেঁদে ফেলব।’
কল্লোল হাসি গোপন করে বলল, ‘মিথ্যা বললাম? এই তো সেদিন তুই আমার শার্টের পকেটে হাত দিলি।’
‘যা, মিথ্যুক কোথাকার।’


মৌ আজকাল ছড়া লেখে। প্রায় সবগুলোই কল্লোলকে নিয়ে। দিয়ে দিলেই হয় কিন্তু তা করবে না। চুপিসারে মানিব্যাগে ঢুকিয়ে দেবে। ওদিনের ছড়াটা ছিল এরকম:
              “ ভাইয়ার সাতদিন গোসল নাই 
তা ধিন ধিন-
 মাগো, কী গন্ধ কী গন্ধ
 মাথা চিনচিন।”
কল্লোল মৌ’র দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘আবারও ছড়া লিখেছিস?’
মৌ’র মুখ নিচু হতে হতে হাঁটুতে ঠেকল। লাল-নীল হয়ে বলল,‘হুঁ।’
‘মাইগড, তুই দেখি মহিলা ছড়াকার হয়ে যাচ্ছিস রে। বল-বল, শুনি কি লিখেছিস। ভাল হলে পুরস্কার পাবি। নগদ আট আনা দেব।’
‘উহুঁ,’ মৌ গা দুলিয়ে বলল।
‘আহা বল না, লজ্জা কি।’
‘এখন বলব না।’
‘না বললে নাই, তোর মুখে ছাই। আমিও তোকে নিয়ে একটা ছড়া লিখেছি:

“ মৌ একদিন সকালে
 ঘুম থেকে উঠে দেখে,
 পেকে গেছে অকালে।
নড়বড়ে দাঁত তার করে ঝনঝন-
 পচা সব ছড়া লেখে
 বুদ্ধিতে ঠনঠন।”
মৌ নিখুঁত ভঙ্গিতে বালিশ ছুড়ে আধ হাত জিব দেখিয়ে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে গেল। কল্লোলের সিগারেটের জন্য সুতীব্র ইচ্ছা হচ্ছে। জঘন্য এ জিনিসটার জন্য এ আকুতির কোন মানে হয়! ড. জনসন নামের ভদ্রলোক, সিগারেট নিয়ে চমৎকার লিখেছেন: সিগারেট হচ্ছে তামাক, চমৎকার কাগজে এটাকে মুড়িয়ে দেয়া হয়। এর একপাশে থাকে ধোঁয়া, অন্যপাশে নির্ঘাত এক নির্বোধ।
নিজেকে সেরা নির্বোধ মনে হয়। কাজটা অর্থহীন জানার পরও বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে গেলে, না মনে করে উপায় কী!
কল্লোল বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞা করল, আগামীকাল থেকে সিগারেট ছেড়ে দেবে। ভুরু কুচঁকে ভাবল, আগামীকাল, আজ নয় কেন? কল্লোল মহা ভারতের সিরিয়ালে দেখা ভীস্ম ( দেবব্রত)-এর মত দু’হাত উপরে তুলে জলদ গম্ভীর গলায় প্রতিজ্ঞা করল: সিগ্রেট নেহি ছু’ঙ্গা, ইয়ে মেরা আখন্ড প্রাতিজ্ঞা হ্যায়, এ- এ-এ। প্রতিজ্ঞা শেষ হওয়ামাত্র মৌ চোখ বড় বড় করে বলল, ‘অমা, ওভাবে আঁ আঁ করছিস যে, ভাইয়া তুই কি টারজান হয়ে গেলি!’
কল্লোল অহংকার অহংকার ভাব নিয়ে বলল, ‘আরে যা যা, টারজান-ফারজান। প্রতিজ্ঞা করলাম একটা, মারাত্নক প্রতিজ্ঞা।’
‘কি প্রতিজ্ঞা করেছিস?’
‘সব কথা শোন চাই। ভাগ এখান থেকে, ষ্টুপিড।’


মৌ কানের পাশে হাত নিয়ে পরীদের পাখা নাড়ানো ভঙ্গি করল। জিবও বেরিয়ে এসেছে অনেকটা। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, ‘কে শোনে তোর কথা। বাবাকে লুকিয়ে একটা সিগারেট এনেছি। নিবি, না ফেলে দেব। আমার সময় নেই, তাড়াতাড়ি বল।’
‘আরে না না, ফেলে দিবি কি, মাথা খারাপ। দে-দে।’
মৌ সিগারেট দিয়ে বলল, ‘বাবা তোকে দেখা করতে বলেছেন। একটু পর যেতে বললেন।’
‘বাবা কি জন্য ডেকেছেন, জানিস কিছু?’
‘আমি কি জানি, আমি কি বাবা!’
‘আহা-হা, রেগে যাচ্ছিস কেন। মানে বলছিলাম কি, বাবার মুখটা এখন কেমন। এই ধর, দাঁত বের করে রেখেছেন, নাকি খুব রেগে আছেন।’
‘এত সব জানি না। কী কথা, বাবা কি দাঁত বের করে রেখেছেন!’
‘ভাগ এখান থেকে সিগারেট চোর। আবার বড় বড় কথা।’
মৌ বেরিয়ে যেতে যেতে কাঠ-কাঠ গলায় বলল, ‘দাঁড়া, সব বাবাকে বলে দিচ্ছি।’


কল্লোল কিছুক্ষণ সিগারেট না ধরিয়ে হাতে রেখে নাড়াচাড়া করল। অন্যমনস্ক এমন একটা কপট ভাব করে, মুখে না লাগিয়ে হাতে ধরেই সিগারেট জ্বালাল। সাপ ভঙ্গিতে ক্রমশ উঠে যাওয়া ধোঁয়া নাকে যেতেই, ফুসফুস কেমন হু হু করছে, শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। জাষ্ট এক টান দিয়ে ফেলে দিলেই তো হয়? এরপর না খেলেই হবে। মুখ ভরে ধোঁয়া ছাড়ার পরপরই মনে হল, মহাপুরুষ বা পাগল ব্যতীত অন্য কেউ ধরানোর পর আস্ত সিগারেট ফেলে দিতে পারে না। কি যেন নাম ভদ্রলোকের? ওঁকে জিজ্ঞোস করা হয়েছিল: পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ কোনটা? ইনি নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিলেন, সিগারেট ছেড়ে দেয়া। পাল্টা প্রশ্ন হল, আপনি তো চেইন স্মোকার, ছাড়ছেন না কেন? ভদ্রলোক ভারী অবাক হলেন, ছাড়িনি কে বলল, কয়েকশো বার ছেড়েছি।
কল্লোল বাবার ঘরে উঁকি দিল। বাবা মহা আনন্দে পা নাচাচ্ছেন। ‘বাবা ডেকেছ?’
‘হু, বস।’
কল্লোল আর্দ্র দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল। বাবার শরীর দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে। গাল-টাল ভেঙে কী অবস্থা! গোটা শরীরটাই কেমন ভাঙাচোরা দেখাচ্ছে।
কল্লোল গলার হাহাকার ভাব লুকাতে পারল না, ‘বাবা, কী অবস্থা হয়েছে তোমার শরীরের!’
‘পাগল, বয়স হয়েছে না। আংগুর আর আংগুর নাই রে, শুকিয়ে কিসমিস। হা হা হা।’
‘বাবা, তুমি থরো-চেকআপ করাও। হেলাফেলা করা ঠিক হচ্ছে না।’
‘ধুর, শুধু শুধু একগাদা টাকা খরচ। অসুখ-টসুখ হলে দেখা যাবে।’
‘না বাবা, না, কালই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।’
‘এখন না, পরে দেখা যাবেখন। তা তোর পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?’
এ প্রসঙ্গ কল্লোলের একদম ভাল লাগে না। এদেশে পড়াশোনার কোন মানে হয় না, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের অপচয়। থেমে থেমে বলল, ‘হাহ, আর লেখাপড়া। এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে পাশ করে কি করব? এদেশে কোটি কোটি লোক বেকার।
‘আহাম্মক, তাই বলে মূর্খ থাকবি!’
‘অঘাচন্ডী হলে মন্দ হত না। রিকশা চালিয়ে অনায়াসে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় করতে পারতাম। বেকার থাকার চেয়ে এটা অনেক ভাল।’
‘তুই নাকি টিউশনী করছিস কোথায়?’
‘এই আর কি, করছি একটা।’
‘কতদিন হল?’
‘কই আর, মাস দুয়েক হবে।’
নঈম সাহেব এবার করুন ভঙ্গিতে বললেন, ‘এই বুড়োকে এটা বলার প্রয়োজন মনে করলি না!’
‘সরি বাবা, ইচ্ছে করেই বলি নি। আমার মনে হচ্ছিল, তুমি নিষেধ করবে। এটা ভেবে আর বলি নি। তাছাড়া ছাত্রের বাবা একটা চামার। এমন একটা ভাব দেখায়, আমাকে যে টাকাগুলো দিচ্ছে, এগুলো জলে ফেলছে। প্রথম মাসে আমার ধারণা হল, শেষ পর্যন্ত পড়ানো হবে না।’
‘কী বলিস, নিষেধ করব কেন। টাকা আয় করছিস। তোর হাত খরচ চলে যাচ্ছে। বেশ তো, মন্দ কি।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাঈম সাহেব গলা নামিয়ে বললেন, ‘খবরদার, ওখান থেকে এক পয়সাও ঐ মহিলাকে দিবি না।’
কল্লোল বাবার ষড়যন্ত্র দেখে হাসি গোপন করল। বাবা বড্ড দেরি করে ফেলেছেন। পড়ানোর প্রায় সব টাকাই মাকে দিয়ে দিয়েছে। মাও ইতস্তত করে খাটো গলায় বলেছিলেন: এই কল্লোল, শোন, তুই যে আমাকে টাকা দিলি, সাবধান, তোর বাবা যেন টের না পায়।
কেন মা, কল্লোল হকচকিয়ে গিয়েছিল।
বলিস কি, যন্ত্রণার একশেষ। তুই নিজ থেকেই টাকা দিলি কিন্তু তোর বাবা এমন এক ভাব দেখাবে আমি ছিনিয়ে নিয়েছি। মুখে কিন্তু কিছুই বলবে না। ভেতরে ভেতরে লোকটা আস্ত একটা মিচকে শয়তান। নিজের অজান্তেই কল্লোলের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল: মা তুমি বাবাকে নিয়ে অযথা এসব বলছ, বাবার মন এত ছোট না।
মা ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন: দু’পয়সা রোজগার করে খুব লায়েক হয়েছিস।


কল্লোল নিঃশব্দে সরে পড়েছিল। মা যেভাবে রাগে চিড়বিড় করছিলেন, কী ভঙ্গিতেই না তাকাচ্ছিলেন!
নঈম সাহেব এবার আমুদে ভঙ্গিতে বললেন, ‘কী আশ্চর্য, যে জন্য তোকে ডেকেছি। ভুলেই বসে ছিলাম। মৌ আমার প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিল।’
কল্লোল সশব্দে গলা পরিস্কার করে মিনমিন করল, ‘বাবা, থুথু ফেলে আসি।’
‘চুপ করে বসে থাক।’
‘বাবা থুথু-। ’
‘চোপ রাও, তো যেটা বলছিলাম, মৌ-।’
কল্লোল দাঁত পিষে বলল, ‘মৌ বলেছে না, দাঁড়াও, ওকে দেখাচ্ছি মজা। হাত পায়ের সব নাট-বল্টু খুলে ফেলব, ও টেরটিও পাবে না।’
‘ও বলবে কি, আমি তো আর শিশু না। ওকে ঘুরঘুর করতে দেখে আমার সন্দেহ হল। সেটা কথা না, তোকে ডেকেছি অন্য কারণে। তুই স্রেফ বিষ খাচ্ছিস। আর ওকে পাঠিয়ে এভাবে সিগারেট নেয়াটাও ঠিক না। এতে ওর উপর খারাপ প্রভাব পড়বে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে, অজান্তেই ও মিথ্যা বলা শিখবে। খুব জরুরি হলে তুই নিজে-।' বাবা অনাবশ্যক কাশি কাশতে লাগলেন।
‘সরি বাবা, মৌকে আর পাঠাব না। আচ্ছা আমি তাহলে উঠি। ইয়ে বাবা, বাইরে বৃষ্টি, ইয়ে, ইয়ে একটা নিয়ে যাই।’
তিনি হুংকার দিলেন, ‘কী! গণতন্ত্রের অপব্যবহার। তুই দেখি মহা সুযোগ সন্ধানী রে। খবরদার-খবরদার, তাই বলে স্টিম ইঞ্জিনের মত ভক ভক করে...একদম মেরে হাড্ডি গুড়িয়ে করে ফেলব।'
নঈম সাহেবের এই নিমিষেই অগ্নিমূর্তি ধারণ, শরীরের একটা অংশ এ ছলনা উন্মুক্ত করে দিল, চোখ হাসি-হাসি।

সহায়ক লিংক:
১. তিতলি তুমিও: http://tinyurl.com/3y93om8

Thursday, August 19, 2010

হাজার বছর ধরে...

(কি যেন একটা গান ছিল, "হাজার মনের কাছে প্রশ্ন করে..."। হাজার মন আর হাজার বছর এর মধ্যে ফারাক দেখি খুব বেশি না।)

বইয়ের মোড়ক উম্মোচনের বিষয়টা আজও আমার বোধগম্য হয় না। অবশ্য আমার না-বোঝার জন্য কিছুই যায় আসে না, হয়তো এর প্রয়োজন আছে। লেখকদের এই কান্ড নিয়ে আমি একটা লেখা দিয়েছিলাম [১]
কিন্তু যখন কেউ কারও জীবনী লেখেন তখন হয়তো বইয়ের মোড়ক উম্মোচন জরুরি হয়ে পড়ে। সিদ্ধেশ্বর মজুমদার (আমার পড়াশোনা কম, নামটা আগে শুনিনি) লিখেছেন 'হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ', বইটার মোড়ক উম্মোচন করা হয়েছে। এটা এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু পুরস্কার-২০০৯ নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম।

মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন (প্রথম আলো, ১৪ আগস্ট ২০১০), "...বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমান বাঙালির গৌরব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্যসহ যাবতীয় কৃষ্টির ধারক ও বাহক। আর সহস্র বছরের বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাঙালির ইতিহাস অলীক, অবাস্তব..."।

প্রধান বিচারপতি এমন একটা পদ যেখানে চোখ বুজে আস্থা রাখা চলে। আমাদের শেষ ভরসাস্থল। তিনি যখন বলেছেন তখন এই নিয়ে বিতর্ক চলে না।
তবে সবিনয়ে বলি, এমন অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতির উপস্থিত থাকাটা কী অতি জরুরি? প্রধান বিচারপতি যখন চাইছেন তখন ধরে নিলাম জরুরি। কিন্তু যেখানে সমস্যাটা দাঁড়ায়, যাকে নিয়ে তিনি বক্তব্যটা দিচ্ছেন তাঁর দল এখন ক্ষমতায়। প্রধান বিচারপতি যখন এমন বক্তব্য রাখেন তখন জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের শংকা কাজ করে, এতে জনগণকে কতটা দোষ দেয়া চলে সেটা ভাবার বিষয়। বিভিন্ন অফিসে ছবি ঝোলাবার নিয়ম চালু হয়েছে; খোদা-না-খাস্তা, এই নিয়মটা যদি আদালতেও চালু হয়? তখন আমাদের মত সাধারণ মানুষদের দোষ দিলে লাভ কী!

আরেকটা কথা। এখানে তিনি বলেছেন, "...আর সহস্র বছরের বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান"। এটা তিনি কোন সূত্রে বলেছেন, বিবিসির সূত্রে? তাহলে ঠিক আছে। এটা সত্য, বিবিসি নামের একটা বিতর্কিত [২] মিডিয়া এই সংক্রান্ত একটা জরিপ করেছিল। জরিপটা আমরা জানি তবে তাদের গবেষণাটা পদ্ধতিটা জানি না। হাজার বছরের তথ্য উপাত্ত ঘেঁটে এরা কেমন করে বের করেছিল! এখন কালই যদি বিবিসি একটা নতুন জিনিস চালু করে ৫০ বছরের শ্রেষ্ঠ অন-লাইন লেখক। বিবিসি বলে কথা, কার দায় পড়েছে বিবিসির সঙ্গে এই কু-তর্ক করার তখন লোকজন কম্পিউটারে লিখত, নাকি স্লেটে?
বেশ, ওই সব হুজ্জতে গেলাম না। কিন্তু যখনই এই বাক্যটা ব্যবহার করা হয় তখন কোথাও এটা কেন উল্লেখ করা হয় না, এটা বিবিসির জরিপের ফল! তাহলেই তো আর সমস্যা থাকে না।

সৈয়দ শামসুল হকরা যখন এটা বলেন তখন আমরা গা করি না কারণ আমরা জানি তাঁরা এমনটাই বলবেন, কেন বলেন এটাও অবোধ্য না। কিন্তু মাননীয় প্রধান বিচারপতিও যখন এমনটা বলেন তখন আমাদের আর দাঁড়াবার জায়গা থাকে না, আমরা বড়ো অসহায় হয়ে পড়ি...।

সহায়ক লিংক:
১. মোড়ক উম্মোচন: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_18.html
২. বিবিসি: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_6509.html 

Wednesday, August 18, 2010

২০০ স্কয়ার ফিটের স্বপ্ন

ছোট্ট একটা টিনের ঘর। দশ ফিট বাই ২০ ফিট। ২০০ স্কয়ার ফিট। এটা কেবল ২০০ স্কয়ার ফিটের একটা টিনের ঘরই না। আনুমানিক ২৫টা পরিবার, প্রায় ২০০ মানুষের স্বপ্ন।

আমি পূর্বের লেখায় [১] উল্লেখ করেছিলাম, ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, যারা চোখে দেখতে পান না (অবশ্য এঁদের সন্তানদের অধিকাংশই চোখে দেখতে পায়)। এঁরা দীর্ঘ দিন ধরে যে স্বপ্নটা লালন করছিলেন, একটা ছোট্ট ঘরের জন্য, যেটা দশ ফিট বাই বিশ ফিটের। সেই ঘরটার মাধ্যমে এটার সমাপ্তি হলো। ঘরের কাজ প্রায় শেষ, মাটি দিয়ে মেঝে করা এবং টুকটাক কাজ এঁরা নিজেরাই শেষ করতে পারবেন।

এটা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম কারণ কথা দেয়া হয়ে গিয়েছিল, কাজও শুরু করে দেয়া হয়েছিল কিন্ত এটার জন্য যথেষ্ঠ ফান্ড ছিল না। এ এক বিচিত্র, অন্যদের জন্য আমার প্লাসিবো বিষয়টা ভালই কাজ করে- শেষঅবধি কেমন কেমন করে যেন হয়েই যায়! বা হতে পারে শহীদ কাদরীর কথাই ঠিক:
"আমার মতো ভীরু সাঁতারু- না জানা লোক
পার হ'লো নদী-
এটাই নিয়তি।
অন্যরকম পরিণামও যে দেখিনি এমন নয়
সাঁতারু জাঁদরেল ক্যাপ্টেন এক
জাহাজ শুদ্ধ ডুবে গেলো
ঊর্ধ্বকাশ থেকে বোয়িং- ৭০৭ অজগ্রাম পুকুরে তলালো।"
(একবার দূর বাল্যকালে/ শহীদ কাদরী) 

কাজটা শেষ করতে পারার পেছনের গল্পটা না বললে অন্যায় হয়। সিংহভাগ টাকার যোগান দিয়েছেন জাপান প্রবাসী একজন মানুষ, নাম প্রকাশে যার রয়েছে তীব্র অনীহা। তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
এবং কৃতজ্ঞতা পড়শী ফাউন্ডেশনের প্রতিও। বাকী অর্থের যোগান দিতে গিয়ে এদের নিয়মিত কার্যক্রমের ব্যাঘাত ঘটেছে। এই জন্য দুঃখ প্রকাশ করা ব্যতীত বলার কিছুই নাই।

সহায়ক লিংক:
১. অদেখা এক স্বপ্ন: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_15.html 

*আমার দেশ: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/08/22/40362