Search

Thursday, May 21, 2026

ডাক্তারের ভুলের গল্প এবং আমার অল্প গল্প!

"প্রিয় কায়সার হামিদ,

যে মানুষটার পায়ে বল এলে আনন্দে কেঁপে উঠত লাল সবুজের গ্যালারি, সে মানুষটা আজ কাঁদছেন। আপনার এই শোকের মাঝেও কালবেলাকে দেয়া সাক্ষাৎকার...অসুস্থ অবস্থায় চ্যানেল আই ও বাংলা ট্রিবিউনকে দেয়া সাক্ষাৎকারসহ অনেক মতামত  আমাদের নজরে এসেছে।

আপনি...

১. অভিযোগ করেছেন ইন্ডিয়ান ডাক্তারের ভাষ্যমতে কোনও-না-কোন ভাবে ভুল চিকিৎসা হয়েছে (সূত্র: কালবেলা, সময় টিভি)

২. আক্ষেপ করেছেন বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয় না, এটা জানতেন না। (সূত্র: চ্যানেল আই)

৩. ফ্যাটি লিভারের কারণে তিনি লিভার ফেইলর-এ আক্তান্ত হয়েছেন।(সূত্র: চ্যানেল আই)

৪. ভুল অ্যান্টিবায়োটিক বা সিডেটিভ দেয়া হয়েছে। 

সত্যি বলতে ভুল তো হয়েছে। একটা না একাধিক। আপনি যেহেতু অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন খেলোয়াড়, জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্ব সেহেতু আপনার কথার গুরুত্ব আছে। প্রতিটা কথা সমাজে মেসেজ সরবরাহ করছে।

একজন চিকিৎসক ও একজন স্বাস্থ্য সচেতন ব্যাক্তি হিসেবে আমি সেই ভুলগুলো আপনাকে ধরিয়ে দিতে চাই।

১. প্রথম ভুল, জ্বর ও জন্ডিস থাকার পরেও এক সপ্তাহের অধিক আপনি পাত্তাই দেন নাই। দশ এগারো দিন বাসাতে রেখেছেন (সুত্র: চ্যানেল আই)। হতে পারে টুকটাক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। আচ্ছা,  জ্বরে কি প্যারাসিটামল দিয়েছিলেন?

দিয়ে থাকলেই মহাবিপদ। যে মানুষটা হেপাটাইটিস-এ এবং ই তে আক্তান্ত হয়ে লিভার ফেইলর-এর দিকে যাচ্ছে তার জন্যে সামান্য প্যারাসিটামলও কিন্তু অনেক ভয়ংকর! 

২. দ্বিতীয়ত লিভার ফেইলর হলে প্রথমেই দেহ থেকে টক্সিন বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়...আক্তান্ত হয় মস্তিস্ক...শুরু হয় DIC নামক মহা জটিলতা...আক্রান্ত হয় ফুসফুস...খুব দ্রুত একে-একে সব অর্গান আক্রান্ত হয়। তাই ফুসফুস আক্তান্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। 

লাইফ সাপোর্ট কাকে বলে জানেন? ফুসফুস যখন কাজ করে না তখন কৃত্রিম ফুসফুস দিয়ে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এটাকেই ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্ট বলে।

৩. বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয় না। এটাও ভুল। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের যে ওটিতে আমি অপারেশন করি সেখানেই অতীতে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। অধ্যাপক মো. আলীর তত্ত্বাবধানে এটি হয়েছিল। পিজিতেও হয়েছে। 

কিন্তু নিয়মিত হয় না। কারণ এটা ব্যায়বহুল। এত টাকা দিয়ে রোগীরা দেশে অপারেশন করতে চায় না। 

৪. উন্নত বিশ্বে যেখানে লিভার আইসিইউ আছে সেখানেও এ রোগে মৃত্যুর হার ৯০% এর বেশি। কেন জানেন? ওই যে ফালমিনেন্ট হেপাটিক ফেইলর হওয়ার সাথে-সাথে রোগীর নানা জটিলতা শুরু হয়...তাই চাইলেও দ্রুত লিভার ট্রান্সপ্লান্ট আয়োজন করা যায় না। যেটা ইন্ডিয়াও পারে নাই।

৫. ফ্যাটি লিভারের কারণে এমন হয়েছে এই স্টেটমেন্টও ভুল। এতে করে যারা প্রাথমিক পর্যায়ের ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত তারা আতংকে আছেন। এই কদিন এসব রোগীর ভীড় চেম্বারে বেড়ে গেছে। 

এটা ঠিক যে ফ্যাটি লিভার এডভান্স হলে...অল্পতেই কাবু হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ের ফ্যাটি লিভার নিয়ম মেনে একদম ভাল অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়।

৬. সিডেটিভ বা অ্যান্টিবায়োটিক সঠিক চিকিৎসারই অংশ। আর ওনাকে প্রাথমিক নয়, টারশিয়ারি লেভেলের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। 

বাবা হিসেবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আপনার কিছু ভুল হয়েছে। মেয়েকে ফিট রাখার চেষ্টা হয়ত করেছেন, পারেননি। এলোমেলো খাবার থেকে বিরত রাখতে পারেননি!

যথাসময়ে মেয়েকে হাসপাতালে নেননি। বাসায় রেখে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় প্যারাসিটামল খাইয়েছেন। 

দ্বিতীয় ভুল, সিংগাপুর বা উন্নত বিশ্ব না করা সত্ত্বেও ওনাকে ইন্ডিয়ায় নিয়ে গেছেন। এয়ারএ্যাম্বুলেন্স এর ভাড়া দিয়েছেন ৫৫ লাখ, নিশ্চয়ই ইন্ডিয়াতেও ৩০/৪০ লাখ যাবে। বাবার মন, তাই হয়ত মিরাকলের আশায় গেছেন। যে কোন সামর্থবান পিতাই এটা করবে। সেজন্যে এটাকে ভুল বলার জন্যে আমি দু:খিত। 

আরো একটা কারণ এ কাজটা ভাল হয়েছে। দেশের হাসপাতালে মারা গেলে আরো অনেক বেশি অভিযোগ আসত। উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে যাওয়ার খবর যতবেশি মার্কেট পায়। উন্নত কফিনে বিদেশ থেকে ফিরে আসার খবর গুলো ততটা পায় না।

একটা দেশ সব কিছুতে স্বয়ং সম্পূর্ণ হয় না। কিছু বাস্তবতা থাকে। এই যেমন, বাংলাদেশের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতাল সৈয়দপুরে, ঢাকায় না কিন্তু। খোদ আমেরিকাতেও ফাইলেরিয়া ডেডিকেটেড হাসপাতাল নেই। 

আপনি তো উন্নতমানের ফুটবলার।তবুও ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থান কত আমরা কিন্তু সে প্রশ্ন করছি না। কারণ কিছু সীমাবদ্ধতা, বাস্তবতা মেনে নিতে হয়।

তাই মানসিক স্বান্তনার জন্যে মনগড়া অভিযোগ না-তুলে প্রয়োজনে সরাসরি ব্যবস্থা নিন। বিশেষজ্ঞ-এর সাহায্য নিয়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ আনুন। 

পিতা হিসেবে আজ আপনি আহত। চিকিৎসক হিসেবে আমরাও মর্মাহত। এক, একজন পিতা হিসেবে; দুই ভুল চিকিৎসার মনগড়া অভিযোগের কারণে।

তবে আপনি কিছু ভুল তুলে আনতেই পারতেন। যেমন খাদ্যে ভেজাল, দুষিত পানি কিংবা স্বাস্থ্য অসচেতনা, এই প্রজন্মের ভুল জীবনযাপন নিয়ে।

পরকালে মেয়ের সাথে আবারও দেখা হোক। বেহেস্তী বাগানের কোন এক নদীর ধারে। এক জীবনের আফসোসগুলো না-হয় সেসময় মিটিয়ে নিলেন। 

আমিন।"

লেখার এই অংশটুকু লিখেছেন, Dr Saklayen Russelhttps://www.facebook.com/share/1HvcAXzBxU/

...

একজন কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে দেশব্যাপি যে ঝড় বয়ে গেছে, পক্ষে-বিপক্ষে তা ভাবার মত! প্রচুর মতামত আমাদের সামনে এসেছে। এই ট্রেন্ড নিয়ে মাথা ঘামাবার ইচ্ছা আমার ছিল না—এখন দেশে ফেসবুক নামের কারখানানায় ভাতের চেয়ে কাক বেশি—পাঠকের চেয়ে লেখক বেশি! কোথায় 'হা-হা', কোথায় কা-কা এই পরিমিতি বোধটুকুও নেই!

কিন্তু হামিদ কায়সার যখন ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুললেন তখন খানিকটা নড়েচড়ে বসলাম!

যেহেতু চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ তাই একজন চিকিৎসা-শাস্ত্রের কারও লেখা প্র‍য়োজন ছিল! একজন ডাক্তারকে আমি লিখিত অনুরোধ করেছিলাম:

"ভাইরে, 

হালে কারিনার চিকিৎসা নিয়ে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসা হয়েছে! তা কারা বলছে, ভারত!

এমনিতেই এদেশের লোকজনেরা বাথরুম একটু শক্ত হলে ভারত দৌড় দেয়।কারিনার চিকিৎসা আসলেই কি ভুল হয়েছে, এই বিষয়ে একটা লেখা লিখবেন, প্লিজ।কারণ আমার বিশ্বাস, আপনি তথ্য দিয়ে লেখাটা লিখবেন...।"

ওই ডাক্তার কালি-কলমের খেলা খেলেননি সেটা তার ইচ্ছা কিন্তু এক শব্দের উত্তর দেওয়ার সৌজন্যতা দেখাবার অসৌজন্যতা দেখাননি!

যাই হোক, কারিনা কায়সাকে নিয়ে আলোচনার পূর্বে হামিদ কায়সারকে নিয়ে একটু বলি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ যাকে আমরা 'কর্নেল হামিদ' নামের মানুষটাকে আমি চিনি তাঁর বই পড়ে! 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান...' এবং 'পাকিস্তান থেকে পলায়ন'। 'পাকিস্তান থেকে পলায়ন', বইটি  পড়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম! একাত্তরের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য এই সত্য ঘটনা তো রগরগে মুভিকে হার মানায়!

তার স্ত্রী আরেক মহীরুহ, দাবাড়ু রানি হামিদ। তাঁদের সন্তান কায়সার হামিদ। যিনি নিজেও এই দেশকে ফুটবলে মাতিয়ে ছিলেন।

আমরা এমনটাই জানি, একজন মানুষ যত উপরে উঠে ততই ভারী হয়। ভারী বলতে গাবদা-গুবদা হয় এমন না, কথাটা রূপকার্থে! আমার কাছে হামিদ কায়সার নামের মানুষটাকে মনে হয়েছে স্রেফ একটা 'এটেনশন সিকার'! তাঁর মেয়ের মৃত্যুর পর তিনি যেভাবে ক্ষণে-ক্ষণে আপডেটের নামে যেটা করেছেন-করছেন তা একজন 'এটেনশন সিকার'-এর পক্ষেই সম্ভব।

তাঁর মেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তিনি ৪০টা পোস্ট দিয়েছেন। অন্য-কেউ হলে বলতাম, শোকে মাথা ঠিক নাই! কিন্তু বিষাদের সঙ্গে বলি, হামিদ কায়সারের বেলায় বলতে পারছি না!

ওই যে বললাম, পরিমিতি বোধের বড় অভাব। কল্পনা করা যায়, পূর্বের-এক ভিডিওতে তিনি তাঁর ইস্তারি সাহেবা সহ নাচানাচি করছেন:

তাঁর ইস্তারি সাহেবা আবার একটা নামকরা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ান! ভাবা যায়, রূচির কী পরিমাণ দুর্ভিক্ষ! 
ফেসবুককে তো নোবেল দেওয়া উচিত কারণ যে অসাধারণ কাজটা করতে পেরেছে, রাবার টেনে-টেনে যেমন লম্বা বানানো যায় তেমনি এদেরকে টেনে-টেনে 'ছাপড়ি' বানিয়ে ফেলেছে! 
জয় বাবা ফেসবুক! এত-এত স্টারের জন্ম দিয়েছে যে আমি ফেসবুকের প্রসব বেদনার প্রতি সম্মান জানাই।জুম্মা-জুম্মা সাত দিন হয় না একেকজন স্টার হয়ে আকাশে জ্বলজ্বল করে!
কারিনা কায়সার সো-কল্ড 'ফুড ভ্লগিং'-এর নামে দুনিয়ার যত আবর্জনা আছে সেগুলো প্রমোট করতেন! এই প্রজন্মের কাছে এরা আবার মোটিভেশনাল স্পিকার! কারিনা কী করতেন তার ছোট্ট একটা নমুনা:
৬টা ফ্রি গ্লাস পাওয়ার জন্য তিনি ১২ লিটার কোক কিনেছেন। বিলিয়ে দেওয়াটা জুড়ে দিয়েছেন তবে এটার খুব-একটা গুরুত্ব নেই!
কেবল ২৫০ এমএল বোতলে ৬+ (চা-চামচ) চিনি থাকে! ভাবা যায়, কারিনা কায়সারের  ৮ লক্ষ (প্রায়) ফ্যান-ফলোয়ারের কাছে তাহলে কী ম্যাসেজ গেল! কালে-কালে এভাবে তৈরি হচ্ছে, একটা অসুস্থ প্রজন্ম!
এখন কথা হচ্ছে, বাবা হিসাবে হামিদ কায়সার কি তাঁর মেয়ের লাগাম টেনেছেন। না, তিনি হয়তো আরও শাবাসি দিয়েছেন! 


No comments:

WhatsApp