Monday, September 9, 2019

শাড়ি নিয়ে সায়ীদিয় ভ্রান্ত থিওরি ও বাড়াবাড়ি!

"সায়ীদ স্যারের 'শাড়ি' নিয়ে ফেসবুকে নারীদের ক্ষোভ কমে এসেছে। কিন্তু এখন গর্ত থেকে বের হয়েছেন তাঁর কিছু সাগরেদ। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করছেন স্যার সুশীল সাহিত্যসেবী। তার রচনাতে কোনো অশ্লীলতা নেই, জাতিবিদ্বেষ নেই, নারীকে হীন করে কিছু বলা হয়নি। সবই সাহিত্য। এসব জায়েজ ছিল, জায়েজ আছে।
এদেরকে বেশি দোষ দিতেও বাধে। কারণ স্যারের আলোয় তারা আলোকিত হয়েছেন। স্যার যে বই পড়তে বলেননি সে বইয়ের হদিস তারা জানেন না। সময়ের নতুন চিন্তা-ভাবনার সাথেও তারা নিজেদের পরিচিত করে তুলতে পারেননি, কিছুক্ষেত্রে চানও না। বর্তমান সময়, প্রজন্ম ও তাদের ভাবনাকেও এককথায় তারা নাকচ করে দেন, না তলিয়েই। যেসব নারী এই লেখা পড়ে আহত হয়েছেন তারা যেখানে নিজেরাই অভিযোগ করছেন সেখানে সাগরেদরা সেই অভিযোগকে নাক সিঁটকাচ্ছেন তাদের স্বভাবসুলভ উন্নাসিকতায়। বাংলাদেশে কয়েকটা গল্পের বই পড়লে লোকে গ্রামের বাকি সবাইকে মূর্খ ভাবে। তাদের মোটা মস্তিষ্ক নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। সেসব থাক। ফিরে আসি সায়ীদ স্যারের শাড়িতে।

প্রথমেই বলি লেখাটা কেন একটা গুরুত্বহীন ও অপ্রয়োজনীয় লেখা। শুরুতে যথারীতি ফেনানোর পর স্যার লেখার শেষ বাক্যে এসে তাঁর তত্ত্ব দান করেছেন। সেখানে লেখা: 'আমার মনে হয়, এ রকম একটা অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাঙালি মেয়েরা সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি'।
এই হচ্ছে ওনার থিসিস। প্রশ্ন হচ্ছে, কখন কবে বাঙালি মেয়েরা শাড়িকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করলো যে তিনি মরহুমা শাড়ির কুলখানির দোয়াদরুদ পড়তে বসলেন প্রথম আলোয়। কারা এসব বাঙালি মেয়েরা? তার কাছে আমি পরিসংখ্যান আশা করি না যে তিনি বলবেন শতকরা কতভাগ শাড়ি পরা কমে গেছে বা শাড়ির দোকানিরা মার্কেটে মার্কেটে দোকান বন্ধ করে দিচ্ছে শাড়ি বিক্রি করতে না পেরে, বা কোথায় তাঁতীরা তাদের শাড়ি বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় শাড়ি পুড়িয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। তিনি সাহিত্যের কারবারি, কল্পনায় তিনি দু:খবিলাস করতেই পারেন। সমস্যা হলো কথাটা তিনি তুলেছেন বাস্তব সমাজের। দায়ী করছেন বাঙালি মেয়েদেরকে। যে সমাজদর্শন তিনি বয়ান করছেন তার ভিত্তিটাই অবাস্তব। এরকম কোনো সমস্যা বা সংকট এ সমাজে নেই।

যে সমস্যার অস্তিত্বই নেই তার সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করতে গেলে কথাবার্তায় তালগোল পাকিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তাকে এর জবাব দিতেই বোধহয় ফেসবুক জুড়ে বাঙালি মেয়েরা শাড়ি পরে প্রোফাইল পিকের বন্যা তৈরি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সায়ীদ স্যার তার এলিটিস্ট বক্তব্যের কারণে কিছুদিন আগেই একবার রোষের শিকার হয়েছিলেন। প্রবাসী শ্রমিকদের বিমানভ্রমণের ত্রুটি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তিনি যে রস বের করছিলেন তার শ্রোতাদের অট্টহাসির জন্য সেটার প্রতিবাদ করেছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। এবার লোকে তার ব্র্যান্ডিং নিয়ে টান দিয়েছে। তারা বলছে আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরের নিজের আলোতেই ভেজাল। এটা একটা বিরাট অভিযোগ। অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা। যারা আরেকটু সহানুভূতিশীল তারা পরামর্শ দিয়েছেন বুদ্ধিজীবিদেরও অবসরে যাওয়া সঙ্গত।

কোথায় আলো হারিয়েছেন সায়ীদ স্যার? আবার ফিরে যাই তার লেখায়। তিনি লিখছেন, ‘বাঙালি সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: আমার ধারণা ‘উচ্চতা’। সবচেয়ে কম যে উচ্চতা থাকলে মানুষকে সহজে সুন্দর মনে হয়—যেমন পুরুষের ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি ও মেয়েদের ৫ ফুট ৫ বা ৬ ইঞ্চি—আমাদের গড় উচ্চতা তার চেয়ে অন্তত ২–৩ ইঞ্চি কম’।

আসলে আমি নিশ্চিত তিনি বা তাঁর সাগরেদরা এই আলোর সন্ধান পাননি। উল্লেখ্য অংশে তিনি যে কম উচ্চতাকে সৌন্দর্য্যের দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছেন এবং এটি যে একটা দোষ এটা তার জানার বা জ্ঞানের আওতায় আসেনি। বর্তমানে এরকম বক্তব্যকে হাইট ডিস্ক্রিমিনেশন বা হাইটিজম বলে। আমেরিকার কিছু রাষ্ট্রে, কানাডাতে ও অস্ট্রেলিয়াতে এর বিরুদ্ধে আইন পাশ হয়েছে। তিনি মেয়েদেরকে ৫ ফুট ৫/৬ এর নীচে হলে ‘সহজে সুন্দর মনে হয় না’ বলে যে ভুল করেছেন, ওইসব দেশে হলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতো। তাকে মাফ চাইতে হতো।
উপমহাদেশের উত্তরাংশের নারীদের ‘উন্নত দেহসৌষ্ঠব’ নিয়ে বলেই তিনি জানান দিচ্ছেন, ‘ওই অঞ্চলের মেয়েদের তুলনায় বাঙালী মেয়েদের আরও একটা জায়গায় ঘাটতি আছে’। এই বাক্যই স্পষ্ট করে দেয় তার মন-মানসিকতায় লুকিয়ে আছে জাতিবিদ্বেষ। কাকে বলে জাতিবিদ্বেষ?

উদাহরণ দেই একটা। বুদ্ধিজীবি হত্যার নেপথ্য ঘাতক রাও ফরমান আলী তার বইতে স্বীকার করেছিলেন: '...সারা হাতে ভাত মেখে খায় কালো দুর্বল বাঙালি জাতিকে আমরা ঘৃণাই করতাম'। সেই ঘৃণা আমরা ১৯৭১ এ দেখেছি। বাঙালি নারীদেরকে ধর্ষণ করে জাতির রক্ত শুদ্ধ করে দেয়ার মত প্রকল্পের কথাও আমরা শুনেছি।
সায়ীদ স্যারের কথায় যে জাতিবিদ্বেষ আছে এটা যারা বুঝতে চাইছেন না তাদেরকে রেসিজমের সংজ্ঞায় আবার চোখ বুলাতে অনুরোধ করি। সহজলভ্য একটা রেফারেন্স দেই উইকিপিডিয়া থেকে: Racism is the belief in the superiority of one race over another. Modern variants of racism are often based in social perceptions of biological differences between peoples. তর্জমায় পড়ুন বাক্য দুটি: এক জাতি থেকে অন্য জাতি উন্নত এই বিশ্বাসকে রেসিজম বলে। বর্ণবাদের আধুনিক একটা রূপের ভিত্তি হচ্ছে বিভিন্ন মানুষের দৈহিক পার্থক্য নিয়ে তৈরি সামাজিক ধারণা।

এই যে সায়ীদ স্যার বাঙালি মেয়ের শারীরিক বৈশিষ্ঠ্যে ঘাটতি দেখছেন এবং উত্তরভারতের মেয়েদের উন্নত ভাবছেন এটা পরিষ্কার রেসিজম প্রসূত। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তার পরিচয় বা জাতিও এক। কিন্তু তার মগজে যে বাঙালি জাতির ঘাটতির ধারণা বাসা বেঁধে আছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর অন্যান্য লেখায় প্রমাণ আছে। টিভিতে নানা অনুষ্ঠানে তিনি সেসব নিয়ে মশকরা করেছেন।

নারী পাঠকরা জাতিবিদ্বেষ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছে সেটা হচ্ছে বডি শেইমিংএর। সায়ীদ স্যার তার আলোর সলতেকে নিয়মিত কতটা নবায়ন করেন সে বিতর্কে না গিয়ে বলা যায় তিনি এই নতুন ধারণা সম্পর্কে অবহিত না। এই বডিশেইমিং সায়ীদ স্যারের গুরুরা করে গেছেন সে যুক্তিতে তিনি পার পাবেন না। ধারণাটা নতুন, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে মোটা, খাটো বলে খোঁচানোকে বা বডিশেইমিংকে এখন নারীরা নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করছেন। সায়ীদ স্যার ব্যক্তি নয় পুরো বাঙালি নারী গোষ্ঠীর শরীর যে তাঁর মাপকাঠি অনুযায়ী সৌন্দর্যের তালিকায় পড়ে না এই কথা বার বার বলেছেন এই লেখায়।
সায়ীদ স্যারকে আমিও স্যার বলি। কিন্তু শিক্ষক বলে তার ভুলশুদ্ধ সবকথা বিনা প্রশ্নে মেনে নেই না। সামনাসামনিও তাঁর অনেক কথার ত্রুটি ধরিয়ে দিয়েছি (সে উদাহরণ অন্যসময় দেবো, দরকার হলে)। সেই সূত্রে বলবো বডিশেইমিং বিষয়টা তিনি ঠিক বাংলা উপন্যাস পড়ে বুঝতে পারবেন না। একটু ইন্টারনেট ঘেঁটে সাম্প্রতিক দলিলপত্র পড়ে তাকে এটা জেনে নিতে হবে।

আর কি আছে তাঁর লেখায়? তিনি ক্রমাগত এই দুটি দোষ করে গেছেন তার লেখায়। কিছু উদাহরণ দিয়ে দিচ্ছি এখানে, ত্রুটিপূর্ণ বাক্যাংশগুলোর নীচে লাইন টেনে দিচ্ছি। সচেতন পাঠকরা পড়লে এরকম আরো ত্রুটি দেখতে পাবেন:
১. ‘কিছুটা অবিন্যস্তভাবে, তাই বাঙালি মেয়েদের দেহ গঠন উপমহাদেশের উত্তরাংশের মেয়েদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অসম’।
২. ‘শারীরিক অসমতার এত ঘাটতি থাকার পরও অন্যান্য মেকআপের মতো রূপকে নিটোলতা দেওয়ার মতো এক অনন্য সাধারণ মেকআপ রয়েছে বাঙালি মেয়েদের ভাঁড়ারে'।
৩. ‘কিন্তু ওই কাম্য উচ্চতার অভাবে বাঙালি মেয়েদের শাড়ি ছাড়া আর যেন কোনো গতিই নেই’।
৪. ‘আজকাল শাড়ি ছাড়া অনেক রকম কাপড় পরছে তারা ... এবং পরার পর ইউরোপ বা ভারতের ওই সব পোশাক পরা সুন্দরীদের সমকক্ষ ভেবে হয়তো কিছুটা হাস্যকর আত্মতৃপ্তিও পাচ্ছে’।
৫. ‘এসব পোশাক বাঙালি মেয়েদের দেহ গঠনের একেবারেই অনুকূল নয়’।
৬. ‘বাঙালি মেয়েদের উচ্চতার অভাবকে আড়াল করে তাদের প্রীতিময় ও কিছুটা তন্বী করে তুলতে পারে একমাত্র শাড়ি’।

এরকম বাক্যের বাঁকে-বাঁকে তিনি তার মতামতকে সত্য বানিয়ে বাঙালি মেয়েদের উচ্চতা ও দেহসৌষ্ঠব নিয়ে বুলিইয়িং করে গেছেন। এই কাজটা চলচ্চিত্রের জোকার দিলদার করলে লোকে উপেক্ষা করতো। কিন্তু ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ করলে লোকে ক্ষুব্ধ হবেই। 
আমি মনে করি, সায়ীদ স্যারের ভুল স্বীকার করা উচিত। তাতে তাঁর মান কমবে না, বাড়বে। লেখা আর বড় না করি। তাঁর লেখার থিসিসে ফিরে ক্ষ্যামা দেই। কেন বাঙালি মেয়েদের অন্য পোষাক নয় শাড়িই পড়া উচিত বলে তিনি যে যুক্তি জোগাড় করেছেন সেটা ঠিক দাঁড়ায় নাই। শাড়ি যারা পরেন তারা তাদের প্রয়োজন ও ইচ্ছা অনুযায়ীই তা পরেন, নিজের শরীর সম্পর্কে কোনো দ্বিধায় না থেকেই। যুগ যুগ ধরে শহরে গ্রামে বিত্তশালী দরিদ্র নারীরা শাড়ি পরে আসছেন, আরো অনাদি কাল পরবেন।

স্যারের যে মূল থিসিস বাঙালি মেয়েরা শাড়িকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন, এটা ত্রুটিপূর্ণ। এরকম অদ্ভুত দাবীর সাথে তুলনা করা যায় প্রেসক্লাবে জনৈক নাসিমের আসল বিএনপির দাবীর সাথে। বাঙালি মেয়ে শুধু উত্তরা, গুলশান, বারিধারায় থাকে না, তারা আছে রাজধানীর বাইরে এমনকি বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমানার বাইরেও। তারা শাড়ি পরছেন। স্যার কেন দেখতে পাচ্ছেন না সেটা তদন্তের বিষয়।"