Search

Friday, January 19, 2018

পিতা, তোমার নগ্নতায়...।

আমরা যারা বেকুব টাইপের মানুষ তারা এখনও দূর থেকে নিজের স্কুলের শিক্ষককে দেখলে রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়াই। মানুষটা যতই কাছাকাছি হতে থাকেন পাল্লা দিয়ে পা ততই দুর্বল হয়ে পড়ে। হবে না কেন, আমাদের বাবারা যখন মাঠে-আপিসে চলে যান তখন এই শিক্ষকরাই তো হাত ধরে-ধরে আমাদেরকে শেখান। এ যেন আরেক বাবা- বাবার ছায়া।

তাই আমাদের মত বেকুবদের কাছে কক্সবাজারের রামুর সংসদ সদস্য ওরফে আইনপ্রণেতার এই আচরণ বৈসাদৃশ্য ঠেকবে বৈকি। কিন্তু এতে আহত হওয়ার কিছু নাই। সাংসদ সাইমুম তার নিজের স্কুলের শিক্ষককে (যে শিক্ষকের তিনি ছাত্র ছিলেন) তুই-তোকারি করেছেন গায়ে হাত উঠিয়েছেন। যেহেতু তিনি আইনপ্রণেতা, বিস্তর আইনের বই নিয়ে ধস্তাধস্তি-কস্তাকস্তি করে কালে-কালে মহীরুহ হয়ে উঠেছেন তাই এতে দোষ ধরলে আইনের ব্যত্যয় হয় কিনা কে জানে! কথিত আছে, দানব নাকি তার মাকে খেয়ে ফেলে। এখন দেখছি কিছু মানব তার বাপকেও খেয়ে ফেলে!
...
কিন্তু বিষয়টা এখন পর্যন্ত থাকল না। সংসদ সদস্য মহোদয়ের মিডিয়ায় ইমেইল চালাচালি করাকরি নিয়ে আবারও লিখতে হলো...।

রামুর আইনপ্রণেতা সাংসদ সদস্য মহোদয়ের নিজ শিক্ষককে তুই-তোকারি করা এবং গায়ে হাত তোলার ঘটনা, এই সংবাদ পুরনো। এ সত্য, এটা অভূতপূর্ব এমন ঘটনা দেশে বিরল।
এটাও সত্য আমরা এটা আশা করে বসে নেই আর এখন সেই দিনও নেই যে ‘ডুপ্পুস’ করে কুয়ায় পড়ার শব্দ শুনব। আগেকালের বিচারে গলায় গামছা গলায় দিয়ে কারও শাস্তির রায় হলে সে লজ্জায়-অপমানে কুয়ায় ঝাঁপ দিত। পার্থক্য হচ্ছে এখন হি-হি করে বলে: গামছাডা নতুন দেইখ্যা দিয়েন। মানে সোজা গলায় গামছা দিয়ে মাফ চেয়ে নতুন গামছা নিয়ে সে বিমলানন্দে বাড়ির পথ ধরবে আর কী! 


তো, আমরা ভুলেও সাংসদ সাইমুমকে নিয়ে এমনটা দুরাশা করিনি। ওয়াল্লা, এখন দেখছি তিনি দাবি করছেন: তার শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। তিনি নাকি পাকিস্তানি হানাদারকে বাজার করে দিতেন।
আওয়ামীলীগের এই সাংসদ ইমেইলে মিডিয়ার কাছে এটাও লিখেছেন, “তার শিক্ষক সুনীল কুমার আওয়ামী লীগবিদ্বেষী এবং একাত্তরের শান্তি কমিটির সদস্য”।

কেউ এই তথ্য জানে না কিন্তু আমাদের সাংসদ কেমন করে এই তথ্য জানেন এ এক বিস্ময়! তার শিক্ষক যখন পাকবাহিনীর গোশত-টোশত বাজার করে দিতেন তখন এই সংসদ সদস্য মহোদয় বাজারের কোথায় লুকিয়ে এটা পর্যবেক্ষণ করতেন এই তথ্য অবশ্য ইমেইলে উল্লেখ নেই। এখন তো দেশে এমন মুক্তিযোদ্ধাদের নামও শোনা যায় ১৯৭১ সালে যাদের বাবা-মার বিয়েও হয়নি। তাই এটা হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক না।

এই একটা চল হয়েছে দেশে! কাউকে শুইয়ে দিতে হলে তাকে কোনও-না কোনও প্রকারে ১৯৭১ সাল জড়িয়ে দেশবিরোধী বানিয়ে দাও। ব্যস, এরপর ওই মানুষটার প্রতি করা যে-কোনও অন্যায় হিসাবের বাইরে। তখন সেই মানুষটার পক্ষে কারও দাড়াবার যো নেই। মানুষটা ঘৃণিত যে…!

Saturday, January 6, 2018

তাঁদের না-বলা কথা...।

লেখাটি লিখেছেন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর [১] সন্তান Tanvir Haider Chaudhury:
"না, তাঁরা 'হাসিমুখে' মৃত্যুকে বরণ করেননি। কয়েকদিন ধরে দেখছি ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ ছাড়া হচ্ছে ইন্টারনেটে। তার একটায় দেখানো হচ্ছে একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তিকে অপহরণের দৃশ্য। ভদ্রলোকের চোখ বেঁধে, তাঁকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুললো কিছু উর্দিপরা সৈনিক, এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায়। প্রথমে হকচকিয়ে গেলেন ভদ্রলোক, কিন্তু গাড়িতে বসে একসময়ে তাঁর মুখে ফুটে উঠলো হাসির রেখা।
আরেকটাতে দেখানো হয় এলোমেলো চুলের, অবিন্যস্ত কাপড়ের এক যুবককে। বোঝাই যাচ্ছে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তার সামনের টেবিলে একটা পিস্তল রাখে এক মিলিটারি অফিসার। সে চোখ তুলে তাকায়, আর তার মুখ জুড়ে ফুটে ওঠে তাচ্ছিল্যের হাসি।

এক টেলিকম অপারেটরের উদ্যোগে নির্মিত এই ভিডিও ক্লিপগুলো। বারবার করে এগুলোয় যা বলা হয়েছে তার সারমর্ম হলো এই: একাত্তরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং বুদ্ধিজীবীরা হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন, যাতে আমরা একটা সুন্দর দেশ পাই। যাতে বাংলাদেশ ভালো থাকে।
প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু 'হাসিমুখে' মৃত্যু বরণের কথা কেন বলা হলো? এই অতিকথনে কি তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা কিছু বাড়িয়ে দেওয়া হয়? আমার বাবার নাম, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। তাঁকে উনিশশো একাত্তর সনের চোদ্দই ডিসেম্বর ঠিক যেমন দেখানো হয়েছে ভিডিওতে, তেমনিভাবে চোখ বেঁধে অপহরণ করা হয়েছিল। এরপর আর তাঁর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। অমিল শুধু এক জায়গায়: আমাদের জানা মতে এই শেষ যাত্রার পথে তাঁর মুখে হাসি ছিল না। আমাদের এই সুপ্রিয় স্বাধীন দেশের বয়স এ বছর ছেচল্লিশ হলো। একই সাথে আমরা যারা একাত্তরের শহীদদের সন্তান, তাদের বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই, কোনক্ষেত্রে পেরিয়েছে। আমরা ভুলে যাই যে যখন আমাদের মা-বাবাদের নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা করা হয়, তখন তাঁদের বয়স ছিলো আমাদের চাইতে কম।

মৃত্যু কী খুব সহজ ব্যাপার? এইরকম বীভৎস মৃত্যু? সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে আমার বাবা মাত্র সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছিলেন। একাত্তরে তিনি পঁয়তাল্লিশে বছর বয়সে পা রেখেছিলেন; তাঁর দুই শিশুপুত্রের বয়স ছিলো সাড়ে সাত এবং চার। তাদেরকে ছেড়ে, তাঁর প্রিয় সহধর্মিণীকে রেখে, কতটা অতৃপ্তি, ক্ষোভ আর কষ্ট নিয়ে তিনি চলে গেলেন? তাঁর সতীর্থদের বেলায়ও পরিস্থিতি তো একই রকম ছিল। প্রায় সবারই শিশুসন্তান ছিল, সবার বয়স চল্লিশের কোঠায়- তাঁরা কেউ কি মৃত্যুর মুখে যেতে পেরেছেন প্রশান্তির অনুভূতি নিয়ে?
অথচ তাঁদের মুখেই আমরা ওই শেষ যাত্রায় হাসি জুড়ে দিচ্ছি? এ এক অন্যায়, গুরুতর অন্যায়। চিরদিন তাঁরা স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। এক উদার, অসাম্প্রদায়িক, সংস্কৃতিমনা দেশের। শেষ মুহূর্তে এটাও বুঝেছিলেন যে সেই দেশের দর্শন তাঁদের কোনদিন মিলবে না। কতটা হাহাকার বুকে নিয়ে তাঁরা জীবনের মায়া ছেড়ে গেছেন?

আমার আপনার মতো রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন তাঁরা। আকাঙ্খা ছিল তাঁদের, অনুরাগ ছিল, এই পৃথিবীর প্রতি মায়া ছিল। সব মোহ-মমতার উর্ধ্বে স্থান দেওয়া হলে তাঁদের প্রতি অসম্মানই করা হবে। মহামানবের আসনে বসিয়ে এই অসামান্য মানুষদের অবদানকে ছোট করার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।"

* উপরে উল্লেখিত লেখাটা লিখেছেন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সন্তান Tanvir Haider Chaudhury। তাঁর অনুমতিক্রমে লেখাটি হুবহু ছাপা হলো। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে [১] নিয়ে লিখেছিলাম ২০১০ সালে। ওই লেখার অংশবিশেষ, "...স্বজনদের চোখে চোখ রাখার সময়ও কী তিনি ভাবতে পেরেছিলেন এটা তাঁর শেষ যাত্রা- ওয়ান ওয়ে জার্নি, যেখান থেকে মানুষ আর ফিরে আসে না! পেছনে পড়ে থাকে সন্তানদের গায়ের গন্ধ-থেকে যায় কেবল কিছু স্মৃতি! মানুষটার  অন্য ভুবনের কষ্টের কথা আমাদের আর জানা হবে না। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে মস্তিষ্ক খানিকটাও সচল থাকলে তাঁর সন্তানদের গায়ের গন্ধ তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণা কী অনেকখানি লাঘব করেছিল? জানা হবে না, জানা হবে না আর..."!

আমরা এখন বড় চেতনাবাজ হয়ে গেছি!  এই তো সেদিন মাইকিং শুনছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে হাউজির (জুয়া) আয়োজন। কেকা ফেরদৌসি 'মুক্তিযোদ্ধাদের খিচুড়ি' রান্নার অনুষ্ঠানে ভাইয়ের ইলেকট্রনিক মিডিয়া খিচুড়ি লেপে ফাটিয়ে ফেলেন। অশ্লীলতার সংজ্ঞা ব্যাপক। কে বলে কেবল নগ্ন গাত্রই অশ্লীল? আমার চোখে এইসবই অশ্লীলতা। কালে-কালে আমরা আমাদের খুব আবেগের জায়গাটাকে বানিয়ে ফেলছি একটা পণ্য রূপে। আমাদের অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ (!) এখন একটা বিক্রয়যোগ্য পণ্য [২]

সহায়ক সূত্র:
১. নিধন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী: http://1971-bangladesh.blogspot.com/search?q=%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A6%AB%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%B2+%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0+%E0%A6%9A%E0%A7%8C%E0%A6%A7%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%80
২. বিক্রয়যোগ্য পণ্য: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_07.html

Thursday, January 4, 2018

নায়ক!

বুকের ব্যাজ পড়ে জানা গেল এই মানুষটার নাম প্রাণকৃষ্ণ, জনাব প্রাণকৃষ্ণ। আমাকে যখন বললেন, একটা মানুষ পড়ে আছে একটু যদি দেখতেন…। আমি অনেকখানি বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। কারণ...। নিরাপত্তা চৌকির সামনে যে মানুষটাকে চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখলাম তার জ্ঞান আছে কিনা তখন বোঝা যাচ্ছিল না।
আমি খানিকটা হকচকিয়ে গেলাম এই কারণে সচরাচর অজ্ঞাত এইসব মানুষদেরকে বিষাক্ত কিছু খাইয়ে সঙ্গের সবকিছু ছিনিয়ে নেয়া হয়। এদেরকে নিয়ে আমার মত ব্যাজহীন মানুষদের কাজ করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। ‘খোদা-না-খাস্তা’ খোদার কাছে চলে গেলে বেচারা আমাকে নিয়ে টানাটানি। হাসপাতালে ইচ্ছা করলেই ভর্তি করা যায় না। স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট মেমো ইস্যু করবেন সেই মেমোসহ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। নইলে হাসপাতালের স্যার মহোদয়গণ ভর্তিই করবেন না। এটা তো গেল আমার মত ব্যাজহীন মানুষদের সমস্যা- ব্যাজঅলা মানুষদের তো সমস্যা নেই। প্রাণকৃষ্ণ কেন ভয়ে সিটিয়ে ছিলেন সেটা পরে জানা গেল কারণ তাঁর চিফ স্টেশনে ছিলেন না, ছুটিতে ছিলেন। দায়দায়িত্বের একটা বিষয় থেকেই যায়।

যাই হোক, এরপর প্রাণকৃষ্ণ নামের মানুষটা ঝড়ের গতিতে কাজ করা শুরু করে দিলেন। চিৎ হয়ে পড়ে থাকা মানুষটার ঘোর খানিকটা কাটলে তার হাতে লিখে রাখা একটা ফোন নাম্বার দেখিয়ে জানাল, এটা তার বউয়ের নাম্বার। প্রাণকৃষ্ণ অনবরত এখানে-ওখানে ফোন করতে থাকেন। ফোনের মাধ্যমে মানুষটার ছবি পাঠালে ওপাশ থেকে নিশ্চিত করা হলো যে এই মানুষটাই তাদের হারিয়ে যাওয়া মানুষ। ততক্ষণে ওরা গাড়ি নিয়ে রওয়ানা দিয়ে দিয়েছেন।
চিৎ হয়ে পড়ে থাকা মানুষটা থেমে-থেমে আমাকে যখন বলছিলেন, কিছু লোক তাকে পুলিশ পরিচয়ে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে একটা ঘরে আটক করে রাখে। এবং ওখানে আরও অনেক মানুষ ছিল। আমি মির হোসেন নামের এই মানুষটার সন্ধাভাষা-দুর্বোধ্য ভাষার খুব একটা গুরুত্ব দিলাম না কারণ এর ঘোর তখনও পুরোপুরি কাটেনি। এইসব ক্ষেত্রে অন্তত ৪৮ ঘন্টার পূর্বে পুরোপুরি সচেতন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সলাজে বলি, আমি ভুল করেছিলাম! নিজেকে চাবুক মারার পদ্ধতি থাকলে দুয়েক ঘা নিজেকেই চাবুকপেটা করতাম। কারণটা পরে বলছি।

স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট সাহেবকে পাওয়া গেল না তাছাড়া মির হোসেনের লোকজনেরাও চলে আসছে। ফোনে একজন ডাক্তারের পরামর্শ খুব কাজে লেগেছিল। এদিকে নুর মোহাম্মদ নামের মানুষটার এই ভয় ভাঙ্গাতে খুব বেগ পেতে হয়েছিল যে তার পরিবারের লোকজন আসার পূর্বেই এখান থেকে অন্য-কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। প্রাণকৃষ্ণ এবং তাঁর সহকর্মীরা যেভাবে মানুষটাকে আগলে রেখেছিলেন তাতে কার সাধ্য একে এখান থেকে নিয়ে যাবে!
আমার আসলে এখানে ভাল দর্শক হওয়া ব্যতীত করার কিছুই ছিল না। প্রাণকৃষ্ণ এরা ঠিক-ঠিক এর স্বজনদের কাছে একে বুঝিয়ে দেবেন এই নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

প্রয়োজন ছিল না তবুও পরদিন খোঁজ নিতে গিয়ে যে তথ্য জানলাম তা ভয়াবহ। মির হোসেন নামের মানুষটা তার স্বজনদের কাছে ফিরে গেছেন ঠিকই কিন্তু এই মানুষটার হারিয়ে যাওয়ার জিডি লক্ষীপুর থানায় করা হয়েছিল প্রায় ১ মাস পূর্বে! এই ১ মাস তিনি ছিলেন কোথায়? তাকে এবং অন্য আরও অনেককে একটা ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল এই তথ্যটা সত্য তাহলে! কেন আটকে রাখা হয়েছিল? এর উত্তর আপাতত জানা নেই কারও। লোকজনকে অহেতুক আটকে রাখবে কেন? মুক্তিপণ তো চায়নি, তাহলে?
এই সব জটিল বিষয় আপাতত থাকুক মাথায় যেমন ঘুরপাক খায় আলোকিত দিক প্রাণকৃষ্ণদের অসাধারণ মানবিকতা তেমনি অন্ধকার দিকও আছে। নুর মোহাম্মদের স্বজনদের কাছ থেকে জানা গিয়েছিল সোস্যাল মিডিয়ায় হারিয়ে যাওয়া তথ্য শেয়ার করার পর অন্য থানা থেকে ‘আপনাদের লোক পাওয়া গেছে’ এই মিথ্যাচার করে বিকাশের মাধ্যমে বিস্তর টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই ১ মাসে ।
সব ছাড়িয়ে যায় প্রাণকৃষ্ণ যখন আমাকে বলেন, ’জানেন, কেমন একটা শান্তি-শান্তি লাগতাছে’। আমি একজন ভাল দর্শক বিধায় শান্তি-শান্তি মুখ দেখেও সুখ…।

Saturday, December 16, 2017

একজন মুক্তিযোদ্ধা, একটা বিস্ময়...!

তাঁর সন্তান হাজার মাইল দূর থেকে উড়ে চলে এসেছে। সন্তানের জন্য তার বাবার হিমশীতল শরীরের চেয়েও অন্য রকমের এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। বাবাকে গোরস্থানে শুইয়ে দিয়ে এসে কিছু-একটা খুঁজতে গিয়ে বাবার ব্যক্তিগত কাগজপত্র থেকে একে-একে বের হয়ে এলো…!
ওয়াল্লা, বাবা তাহলে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন?! কই, বাবা তো কখনও কোনও প্রসঙ্গেও এর উল্লেখ করেননি!
তিনি। তাঁর মৃত্যু হয় ৮৩ বছর বয়সে। এ বছরই, বিজয়ের মাসের মাত্র কিছু দিন পূর্বে। আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলেই তিনি ৪৭তম বিজয় দিবস দেখে যেতে পারতেন।
অথচ এই মানুষটার সন্তানের সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্র অন্যায় করেছিল, ঘোরতর অন্যায়। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যে মানুষটা এই দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্র যখন তাঁর নিরপরাধ সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তখনও তিনি অসহ্য কষ্ট সহ্য করেছেন কিন্তু নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা এই পরিচয় প্রকাশ করে কোনও সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেননি। এমনকি মৃত্যুর আগপর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে এক পয়সা সম্মানী-ভাতা গ্রহণ করা দূরে থাক কাউকে বলেননি পর্যন্ত! কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর জানা হবে না কখনও কারণ এই প্রশ্নের উত্তর যিনি দিতে পারতেন তিনি এখন অন্য ভুবনে। এই ভুবনের আনন্দবেদনায় এখন আর তাঁর কিছুই যায় আসে না। তবে এঁদের মতো মানুষ [১] কেন ঠিক ১৬ ডিসেম্বরেই ফাঁস দেন বেদনার জায়গাটা এখন খানিকটা বুঝি।

পরিতাপের সঙ্গে বলি এখন এই মানুষটাকে নিয়ে লিখে আমি একপ্রকারের অন্যায় করছি, জেনেশুনে। কারণ মানুষটা জীবিতবস্থায় কখনও চাননি তাঁর এই পরিচয় প্রকাশ করা হোক। এমনকি এখন তাঁর সন্তানও চান না তাঁর বাবার কোনও তথ্য আমি শেয়ার করি। কিন্তু আমি জ্ঞাতসারে এই অন্যায়টা করছি...।
যে দেশে শূন্য বয়সের মুক্তিযোদ্ধা, মার গর্ভে থেকেই যুদ্ধ করে এমনকি ১৯৭১ সালে যার বাবার বিয়েও হয়নি (একজন মুক্তিযোদ্ধার বাবার বিয়ে হয়েছে ১৯৭৮ সালে) এরা সবাই এখন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এতো বীর এই দেশ ধারণ করবে কেমন করে…!

সহায়ক সূত্র:
১. সুরুয মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_21.html

Saturday, December 9, 2017

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে...।

সৌদি নাগরিক মহতরমা সোফিয়া আমাদের দেশে তশরিফ এনেছেন। আমি প্রথমে ভেবেছিলুম তিনি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। কিন্তু না, আমার ধারণা ভুল।

এনবিআর চেয়ারম্যান নিজের গাঁটের পয়সা(!) খরচ করে (কেউ কেউ বলছেন টাকার অংকটা কোটির কাছাকাছি আমি সেই কুতর্কে গেলাম না) দেশের অধিকাংশ চালু দৈনিকে ঢাউস আকারের বিজ্ঞাপন দেয়ার ফলে আমার এই ভুল ভেঙ্গেছে। এনবিআর চেয়ারম্যান মহোদয়কে দিলখোলা ধন্যবাদ জানাই।

তাঁর বিজ্ঞাপনের কল্যাণে আমরা জানলাম: ‘সৌদি নাগরিক মহতরমা সোফিয়া লাগেজে করে এসেছেন বলে মহতরমার ইমিগ্রেশন লাগেনি এমনকি পাসপোর্ট-ভিসাও’!
এই ব্যবস্থাটাই যদি উন্নত দেশ চালু করে তাহলে মন্দ হয় না কারণ তাহলে আমরা ইয়া বড় একটা লাগেজে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে বিনা পাসপোর্ট-ভিসায় হেথায় চলে গেলুম আর কী। তিন উল্লাস! 
যমুনা টেলিভিশনে মহতরমা সোফিয়ার একটা সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। ওখানে উপস্থাপক জিজ্ঞেস করলেন: সোফিয়ার পছন্দের রঙ কি? মহতরমা সোফিয়া এর উত্তর দিতে পারেননি কারণ তার ‘দম্পিউটার’(!) ওরফে মেমরিতে এই তথ্য যোগ করা হয়নি।
আমার ধারণা মহতরমা সোফিয়ার মেমরিতে ‘ইয়ে’ (আমি এই ‘ইয়ে’ ওরফে চুতিয়া শব্দটা লিখতে চাই না। কারণ আজকাল পোলাপানরা অবলীলায় এটা লিখে আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়। ‘ইয়ে’ শব্দটা লিখে এর সঙ্গে যোগ করে দেয় ‘কপিরাইট আলী মাহমেদ’। মরণ! ) ইনপুট দিলে সে চোখ টিপে এটাও বলে দেবে।
(গুগলের স্ক্রিণশট)
নর্তিত মিডিয়া মহতরমা সোফিয়াকে নিয়ে যে নাচানাচি করছে তা ভারী আনন্দদায়ক! ইলেকট্রনিক মিডিয়া মহতরমা সোফিয়াকে জিজ্ঞেস করছে, ‘তুমি কি জানো, বাংলাদেশের অনেক ছেলে তোমার প্রতি ‘ক্রাশ’ খেয়ে বসে আছে। আচ্ছা, এমকি কি সম্ভাবনা আছে যে তুমি এদের মাঝ থেকে কাউকে জীবনসঙ্গি বেছে নেবে’?

‘ইয়ে’, ইয়ের মিডিয়া বলে কথা…!

Thursday, November 30, 2017

কাল-নটেশ কালবৈশাখী এক লেখক!

ব্রাত্য রাইসু নামের এক কাল-নটেশ কালবৈশাখী লেখক, যাকে কবি-কোবির বলয়ে আটকে রাখার দুঃসাহস না-করাই শ্রেয়। যেমন ধরুন, 'দোরা কাউয়া পেয়ারা গাছে', রাইসুর এই রচনাটা। এটাকে কি বলা যাবে? গোয়ানিজ শিশুর চোখ দিয়ে দেখলে অবলীলায় এটা ছররা থেকে ছড়া হয়ে উঠে। আবার এটাই কবির খদ্দরের চাদরের ফাঁক গলে হুঁকোর জল গড়িয়ে হুক্কাহুয়া রবে প্রসব হয় জলজ্যান্ত কিলবিলে দুঁদে আস্ত এক কবিতায়।

দেখো দিকি কান্ড, ‘ডাকদর’ মাহফুজুর রহমান যখন এই রচনাটা গুনগুন করেন তখন এটা আবার হয়ে উঠে অসাধারণ একটা গান। সেই গানে ধরাশায়ী হয় অজস্র প্রাণ। আবার ধরুন, আগাম জানিয়ে রাখি ধরাধরি পর্বটার বেশ খানিকটা বাহুল্যই থাকবে। তো, ধরুন এই রচনাটাই আবার 'ছাল ওঠা কুত্তা বাঘা তার নাম'-কেও ছাড়িয়ে গজিয়ে উঠবে ‘কা-কা-ই ডো’ এক উপন্যাসে। এই রচনাটাই শতবার পাঠ করলে ওটা হয়ে উঠবে কালের ছাল ছড়ানো দগদগে আস্ত এক উপন্যাস, 'কেন্ডাসট্যাং'। কালে-কালে উপন্যাস থেকে হাজারবার পাঠে এক মহাকাব্য।

আমি মানসনেত্রে দেখতে পাই হোমার এই লেখাটা পেলে হুম-হাম আওয়াজ তুলে লোফালুফি খেলে-খেলে ক্লান্ত হয়ে ‘কুতকুত’ না-খেলে 'হুদহুদ' খেলতেন। বানভট্ট একচোখে জল একচোখে পানি নিয়ে সজল চোখে পানি-জলের বান বইয়ে দিতেন। বেচারার কপাল না-ভিজে কপোল ভিজে যেত কারণ তাঁর ঠ্যাং বাঁধা আছে কলাগাছে!
তাঁদের বুকের ভেতর থেকে অদেখা এক বেদনা পাক খেয়ে উঠত, আহা-আহা, আমরাও পেয়ারাগাছ ওরফে একটা 'গয়ামগাছ' পেলুম না ক্যান রে-এ? আহারে-আহারে, গয়াম গাছের সঙ্গে গ… মারামারি করলুম না কেন রে-এ-এ? ওরে-ওরে, জীবনগাছটা এতো ছোটগাছ কেন রে-এ-এ-এ!
আসলে রাইসুর মত এই ধরনের 'ল্যাকক' ওরফে লেখকের জন্মদিন-মৃত্যুদিন বলে আলাদা করে কিছু নেই…।

ব্রাত্য রাইসুর 'অমড়' সৃষ্টি।

*  ইমেজ আকারে কবিতা ঋণ: ব্রাত্য রাইসু
...
০৫.০৩.২০২২
'বুদ্ধা রইস' মানে বুদ্ধিজীবী রাইসু একটা 'এসটাটাস' প্রসব করেছেন, হালে:
কিন্তু আজকালকার পোলাপানরা মানি লুকের মান রাখতে জানে না। সুকান্ত ধর পাপ্পুর এহেন কর্মকান্ডে নিন্দা জানাই :)
 
 

Sunday, November 19, 2017

দেশপ্রেম এবং 'ভোটঘুম'!

আমাদের দেশে দাদারা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র করেন এতে ইউনেসকোর গাত্রদাহ হয়। ইউনেসকো পাজি নচ্ছার একটা!
আমাদের দেশেরও অনেকের গা জ্বলে। দাদাদের দোষ ধরে।

দাদারা রেল সুবিধা চান। এই কারণে পাকিস্তান আমলেই আজমপুর নামক স্থানে রেলওয়ে বিপুল জায়গা অধিগ্রহণ করে রেখেছিল কিন্তু দাদারা সেপথ মাড়ান না কারণ এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের এয়ারপোর্ট, শহর।
এখন নতুন করে আবারও অধিগ্রহণ। এতে করে প্রয়োজন ১৫ কিলোমিটার জায়গা। জনগণের বিস্তর খতকিতাবত-পত্র চালাচালি করেও ফল ‘প্রায় একটা লাড্ডু’।
যাই হোক, এই ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১০ কিলোমিটার আমাদের দেশে হওয়ার কারণে নষ্ট হবে একরের-পর-একর জমি। এতে অবশ্য খুব একটা সমস্যা নেই আমরা বাসা বাঁধব বঙ্গোপসাগরে। আরও বিলীন হবে আমাদের বুকে জাপটে ধরে রাখা বুড়ো-বুড়িদের হাড়, ঐতিহ্যবাহি স্থাপনা, মন্দির-মসজিদ।
ওদিকে দাদাদের কেবল ৫ কিলোমিটার! এরমধ্যে কেবল ১ কিলোমিটার ধানক্ষেত আর ৪ কিলোমিটার শহরের উপর দিয়ে উড়ালরেল।
একারণেও অনেকের গা জ্বলে। দাদাদের দোষ ধরে।


লক্ষ-লক্ষ রোহিঙ্গা দিয়ে আমাদের দেশ ভরে যায়। আমরা দুম করে বলি প্রয়োজনে একবেলা খাব। বাহ, বেশ তো!
তো, মিয়ানমারকে রেহিঙ্গাদেরকে ফিরিয়ে নিতে এবং নাগরিকত্ব দিতে জাতিসংঘে ওআইসির প্রস্তাবে ভোট দেওয়ার সময় দাদারা পেট ভাসিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন বিধায় ভোট দিতে পারেননি, আফসোস। হায় ঘুম, হায়!
দাদাদের এই ঘুমের কারণেও অনেকের গা জ্বলে। ঘুমকাতুরে দাদাদের দোষ ধরে।

কিন্তু আমি দোষ ধরা দূরে থাক দাদাদের দোষই দেখি না কারণ দেশপ্রেমিক হওয়া দোষের কিছু না।

Tuesday, October 3, 2017

নায়ক নায়িকাগণ।

এই মানুষটাকে নিয়ে পূর্বে যে লেখাটা লিখেছিলাম [১], ‘এই মানুষটাকে নিয়ে বিপদে আছি’। বিপদ তো আর একা আসে না সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে আসে। এই মানুষটা যেখানে বসে থাকত, একনাগাড়ে একে ৩০ ঘন্টাও বসে থাকতে দেখেছি! বসা মানে বসা, নড়চড় নেই- কাউকে বিরক্ত করা নেই।

কিন্তু প্রভাবশালী এক ‘ভদ্দরনোক’ আপত্তি করলেন, আপত্তির ভঙ্গিটা খুবই আপত্তিকর। কিছুই করার নেই, এখন সবই এদের দখলে। যতদিন পর্যন্ত একটা ‘হোম’ না-করতে পারব ততদিন এদের তামাশা দেখা ব্যতীত আমার উপায় নেই। একে এখান থেকে সরাতে হবে, দ্রুত। কিন্তু কোথায়? খুব অস্থির লাগে।
ওহো, চুলবুল পান্ডেদের মুখ চুলচুল করছে বুঝি, আরে বাহে, আফনের ঘরে লয়া যান না। বললেই হয়! বাপুরে, আমিও তো নাগরিক মানুষদের একজন!


যাই হোক, মনে পড়ে আরে, স্কুল ঘরটা তো খালি। ওখানে একে রাখলে কারও কিচ্ছুটি বলার যো নেই। জরাজীর্ণ একটা ঘরে স্কুল। এটার দর্শনে অনেকের হাসি-কাশি মিশে একাকার হয়ে যাবে কিন্তু জরাজীর্ণ একটা ঘরও বিপদে কী কাজে লাগে এটা এখন হাড়ে হাড়ে বুঝি। (রেলওয়ের সম্প্রসারণের কারণে এই ঘরও এখন যায়-যায় অবস্থা)

ক-দিন ধরে এই মানুষটা এখানেই। সমস্যা একটাই, এ ঘরের ভেতরে থাকতে চায় না তবে বারান্দায় হলে সমস্যা নেই। আমরা আর এটা নিয়ে হুজ্জতে গেলাম না। বাপ, তোমার যেভাবে আরাম হয় সেভাবেই থাকো।
বরাবরের মতই অযাচিত সহায়তা করতে যে লোকগুলো এগিয়ে আসে এবারও তাই হল। এরা আমার মত ‘নেকাপড়া’ করা লোক না।
সুমন নামের যে ছেলেটা একে গোসল করিয়েছে গু-মুত পরিষ্কার করেছে, সেলুনে নিয়ে

চুল কাটিয়েছে এটা চোখে না-দেখলে বিশ্বাস হবে না। ওয়াল্লা, সুমনের সঙ্গে দেখলাম এর ভাল খাতির। এক পর্যায়ে দেখলাম চুকচুক করে চা-ও খাচ্ছে! ভাল-ভাল!


এর ভোলই দেখি পাল্টে গেছে।










আর চা দোকানদারের বউটা, এই মমতাময়ী তো দেখি মমতার ঝাঁপিটা উপুড় করে দেন। এদের পাশে কী ক্ষুদ্রই না মনে হয়, নিজেকে…!

সহায়ক সূত্র: 

Monday, September 25, 2017

বিপদ!



এই মানুষটাকে নিয়ে বড় বিপদে আছি। অতীতে এহেন সমস্যার সম্মুখিন যে হইনি এমন না কিন্তু এবারের বিষয়টা ভিন্ন!
আজ  ক-দিন ধরে একে দেখছি।এই মানুষটা কিছুই চেনে না। না খাবার, না পানি! এক জায়গায় একে আমি টানা সাত ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। পা ফুলে ঢোল তাতেও এর কোনও বিকার নেই। 

অতীতে এমন বাহ্যজ্ঞানহীন মানুষকে নিয়ে কাজ করার সুবাদে এটা বিলক্ষণ জানি শুকনো খাবারই ভরসা। কিন্তু শুকনো খাবার তো আর দিনের-পর-দিন বাথরুম আটকে রাখতে পারে না। কোন এক ফাঁকে লাগোয়া স্কুলের রাস্তার সামনে বাথরুম সারার কারণে স্কুলের দপ্তরি একে বেধড়ক পিটিয়েছে।
ওই দপ্তরি মানুষটার শাস্তির ব্যবস্থা করা গেছে, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আলোকিত প্রসঙ্গ হচ্ছে সেই দপ্তরি নামের মানুষটা তার ভুল বুঝতে পেরেছে। কেউ বলে দেয়নি কিন্তু এই মানুষটার কাছে নাকি ক্ষমা চেয়েছে। হায়, এই মানুষটা যে ক্ষমা করারও ঊর্ধ্বে! 

যাই হোক, এখানে প্রকট যে সমস্যাটা এই ক-দিনে এই মানুষটার মুখে একটা কথাও শুনিনি। একটা টুঁশব্দও না! অসহায় এই মানুষটার চেয়ে নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে- মানুষটা স্বজনের কাছে ফেরত পাঠাবার কোনও উপায় নেই। কোথায় যাই কার কাছে যাই- এই মানুষটার একটা গতি হওয়া যে বড়ো প্রয়োজন। একটা মানুষ তার স্বজনের কাছ থেকে, তার শেকড়ের কাছ থেকে এমন করে হারিয়ে যাবে এটা কী করে হয়! 

টানেলের শেষ মাথায় কোথাও-না-কোথাও আলো থাকে, থাকতেই হয়। আমি আশাবাদী মানুষ- আমার এটা আশা করতে দোষ কি তার স্বজনের কেউ-না-কেউ তার ছবি দেখে জলভরা চোখে বুকে জাপটে ধরে তাকে তার শেকড়ের কাছে নিয়ে যাবে। এমন অসাধারণ একটা দৃশ্য কেবল কল্পনা করতেই অদেখা এক ভাললাগা পাক খেয়ে উঠে   

Wednesday, May 3, 2017

আপনার জন্য, কেবল আপনারই জন্য...।

আপনি আপনার ব্যক্তিগত কারণে স্কুলের জন্য আর টাকা পাঠাতে পারছেন না, এটার উত্তর লিখব-লিখব করে আর লেখা হয়ে উঠছে না- অমানুষ একটা, আমি, বুঝলেন!
ভাইরে, দেরিতে উত্তর লেখার জন্য সলাজে ক্ষমা চাচ্ছি্- হাঁটু ভেঙে। অন্তত দুঃখের একটা চিহ্ন :( লিখে দিয়েও দায় এড়াতে পারতাম- আসলে আপনাকে কেবল এক লাইনে লিখে দিলে বড়ো অন্যায় হয়।

যে মানুষটা বছরের-পর-বছর ধরে পরম মমতায় স্কুলের খরচ চালিয়ে গেছেন তাঁকে দু-চার লাইনে কেবল এটা লিখে দিলাম, ’ওকে বা না ভাই, কোনও সমস্যা নাই, আচ্ছা…’ বলে হাঁই তুললাম। এ হয় না। কিন্তু কী করব বলেন, এখন যে লিখতে বড়ো আলসেমী লাগে রে, ভাই।
আপনি হয়তো লক্ষ করেছেন কয়েক মাস ধরে কিছুই লেখা হয়ে উঠেনি! যে আমি এক রাতে ‘কনকপুরুষ’ নামে গোটা একটা উপন্যাস লিখে ফেলেছিলাম সেই আমার এক লাইনও লিখতে ইচ্ছা করে না, কী আজব যন্ত্রণা একটা! নষ্ট স্রোতের নষ্ট আঙ্গুল! আমার সম্ভবত আঙ্গুলে পচন ধরেছে। বলা হয়ে থাকে মানুষের পচন শুরু হয় মস্তিষ্ক থেকে আর লেখকের আঙ্গুল থেকে।

আচ্ছা থাকুক এইসব হাবিজাবি কথা…। এটা কিন্তু ঠিক আপনার সহৃদয়তা ব্যতীত সামনের দিনগুলোতে বিকট সমস্যা হবে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি টানেলের কোথাও-না-কোথাও আলো থাকে, থাকতেই হয়; এর বিকল্প নেই। এই সংকটেরও একটা সমাধান হবে। নইলে এই ‘হতভাগা’ (!) বাচ্চাগুলোর গতি কী!
আচ্ছা বলেন তো এই দীর্ঘ সময় আপনার মমতার কথা কেমন করে বিস্মৃত হই! স্কুলের নাম করে আপনি যে টাকা পাঠাতেন কেবল কী স্কুলের খরচেরই যোগান হতো? ওখান থেকেই খানিকটা এদিক-ওদিক করে কত কিছুই না করা হতো। আপনি কখনও নাম প্রকাশ করার অনুমতি দেননি আজও আমি সেপথ মাড়ালাম না। কিন্তু আজ এই সব আপনার খানিকটা জানা প্রয়োজন।
ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। এই ছেলেটার নাম আকাশ। বাহ, কী চমৎকার নাম, না? 
এক হাত এক পা নাই এই ছেলেটাকে যখন আমি স্টেশনে পাই তখন এ ভাত খাচ্ছিল।
নিরাপদ দুরত্বে থেকে এর খাওয়া দেখি। কিন্তু খাওয়া শেষ করে এই ছেলেটি যখন প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছিল তখন আমি কাতর হয়ে এর কাছে জানতে চাই, ‘তুমি ক্রাচ দিয়ে হাঁটতে পারো না’? ছেলেটি উদাস হয়ে বলে, ‘ক্রাচ পামু কই’?

আপনার পাঠানো স্কুলের টাকা থেকে কষ্টেসৃষ্টে বাঁচিয়ে কিছু ক্রাচ আমার কাছে সবসময়ই মজুত থাকে। তাই আমি অনায়াসেই তাকে বলি, ‘আচ্ছা, আমি তোমাকে ক্রাচ যোগাড় করে দেব’।
আপনি জেনে অবাক হবেন আকাশ নামের এই ছেলেটার কিন্তু এক জোড়া না কেবল একটাই ক্রাচেরই প্রয়োজন, যার দাম মাত্র দুশো টাকা! একজোড়া ক্রাচের দাম ৪০০ হলে একটার দাম তাই হয়। কিন্তু এখানেও খানিকটা গল্প আছে। আজ গল্পের ঝাঁপিটা খানিকটা উপুড় করে দেই। ঢাকা ব্যতীত ক্রাচ নামের এই জিনিসটা পাওয়া যায় না, ঢাকার আবার সব জায়গায় না। নির্দিষ্ট জায়গা থেকে কিনতে হয়। অথচ আমার তেমন-একটা ঢাকা যাওয়া পড়ে না- শেষ আমি ঢাকা গেছি বছর দুয়েক পূর্বে! তাহলে? উপায়!

আসলে এটা একটা টিম-ওয়র্ক, আমার ভূমিকা এখানে একেবারেই গৌণ। এখানে আমি কেউ না, কিছু না- মিছরির পুতুল। সব তো আপনারাই করে ফেলেন! যেমন একজন অ্যাম্বুলেন্সচালক আছেন। কালো-কালো মায়াভরা দুবলাপাতলা এই মানুষটাকে বলে দিলেই তিনি ঢাকা থেকে ক্রাচ নিয়ে আসেন। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়ার সময় যন্ত্রণাকাতর রোগী নিয়ে যান শুইয়ে আর আসার সময় শুয়ে থাকে ক্রাচ, চুপচাপ, পাশাপাশি। এখানে চারশো টাকায়ই হয়ে যায় বাড়তি কোনো টাকার প্রয়োজনই হয় না!

যাই হোক, টাকা না-পাঠাবার কারণে আপনি মনোকষ্টে ভুগবেন না অস্থির হবেন না, প্লিজ। আমি ঠিক-ঠিক কোনও-না-কোনও একটা উপায় বের করব। এবং এটাও আমার প্রবল বিশ্বাস, আমার মৃত্যুর পূর্বে একটা ‘হোম’ করে যাব, যাবই। স্কুল চালু করার পূর্বে এটাই আমার স্বপ্ন ছিল; আমি সেই স্বপ্নটা লালন করি, আজও, এখনও।
আফসোস, ছোট্ট করে হলেও একটা হোম চালু করার জন্য নামকরা কত মানুষের হাতেপায়ে ধরেছি কিন্তু ফল 'আ বিগ জিরো'। এখন ঠিক করেছি এই বিষয়ে কক্ষণও কারও কাছে আর কোনও সহায়তা চাইব না। শোনেন, কেবল আপনাকে চুপিচুপি বলি একতাল মাটি বেচে দেওয়ার তালে আছি চালবাজ লোকজনেরা যার নাম দিয়েছে সম্পত্তি! কাজটা হয়ে গেলে ইয়ালি বলে লাফিয়ে পড়ব।
কেবল মনে হয় এটা এই স্কুলে যে বাচ্চারা পড়ে এদের দু-পাতা পড়িয়ে কী লাভ? যখন এই স্কুলেই পড়ে এমন একটা উঠতি বয়সের মেয়েকে স্টেশনে ঘুমাতে হয়, অরক্ষিত। বা যখন এই ‘রাজিব’ নামের ছেলেটি অবলীলায় বলে, ’মা একদিকে বাইর হয়া গেল আর আমি একদিকে...,’ তখন এই 'দু-পাতা পড়া' এদের কী কাজে লাগবে?
এদের জন্য একটা হোম নামের আশ্রয়স্থল না-করে আমার কোনও উপায় নেই, বাহে।

এই গ্রহের যেখানেই থাকুন না কেন এই শিশুগুলোর ব্লেসিংস আপনাকে তাড়া করবে...। ভাল থাকুন, অনেক।

Sunday, December 4, 2016

শান্তিদেবী কহিলেন, অবশেষে!

১৪ লাখ ২৪ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে মায়ানমারের আরাকান রাজ্যে (রাখাইন) আনুমানিক ৮ লাখ রোহিঙ্গার বাস। এরমধ্যে বাংলাদেশেই রোহিঙ্গাদের বসবাস ৩ লাখের উপর!

জাতিসংঘের সাফ কথা, রোহিঙ্গারা হচ্ছে এই গ্রহের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠি। ভূতপূর্ব রোসাং হালের মায়ানমার, যে জমিনে এদের হাজার বছরের বাস সেই জমিনের সরকার এদেরকে স্বীকার পর্যন্ত করে না। এর শুরুটা বৃটিশদের হাত ধরে। তৎকালীন শাসক বৃটিশরা মায়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠির তালিকায় রোহিঙ্গা শব্দটি বাদ দিয়েছিল।
রাজায় কইছে চু...ভাই আনন্দের আর সীম নাই- ব্যস, রাজায় কয়া গেছে আর ছাড়াছাড়ি নাই।

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের ফলে রোহিঙ্গারা ওই দেশের নাগরিক না। এমনকি তাঁরা ওই দেশের জমির মালিকও নন। সরকারের অনুমতি ব্যতীত তাঁদের বিদেশ ভ্রমণ করারও উপায় নেই। কেবল তাই না দুইটির বেশি সন্তান না-নেওয়ার অঙ্গিকারনামায়ও রোহিঙ্গাদেরকে সই করতে হয়। একটা সভ্য দেশে এমনটা সম্ভব এটা অকল্পনীয়!

অং সান সু চি প্রায় দুই দশক ধরে গৃহবন্দী ও কারাগারে ছিলেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য তিনি ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। শান্তিতে পুরস্কার- সামরিকজান্তার বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন করেছিলেন নাকি!
এমনিতে শান্তিদেব বারাক ওবামা [১] এবং আরেক শান্তিদেব প্রফেসর ইউনূস সাহেবও [২, ৩] শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন। হুদাহুদি!
ছবি ঋণ: প্রথম আলো ২৭ নভেম্বর ২০১৬
(ছবির রোহিঙ্গা নামের সাবজেক্টের নাম নুর বেগম। তাঁর স্বামী-সন্তান মারা গেছে। সন্তানের লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দাফনের জন্য...)

যাই হোক, ওই দেশের সেনাবাহিনী যখন রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের উপর এহেন কোনও অন্যায় নেই যেটা করছে না। বেসামরিক লোকজনের ওপর হত্যা, গণধর্ষণ এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে এদের বিরুদ্ধে অথচ সেই দেশের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টাপ্রধান সু চি মুখ সেলাই করে ফেললেন। আফসোস, খাওয়া ব্যতীত মুখই খোলেন না! অবশেষে শান্তিদেবী সু চি মুখ খুললেন। সিঙ্গাপুরে চ্যানেল নিউজএশিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, ”…আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি।…আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি সারাক্ষণ নেতিবাচক কথা না বলে…”। ব্লা, ব্লা, ব্লা।

তবে জর্জ বুশ শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেলে আমি অন্তত অবাক হতাম না। বেচারা লোকটা নাকি রোগী মানুষ! রোগটার নামও লম্বা, 'অ্যাটেনশন ডেফেশিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার'। বুশকে যদি বলা হয় সারফেস উঁচু করার জন্য এ সমস্ত লোকজনকে মেরে কবর বানিয়ে সারফেস উঁচু করে ফেলবে।
আমাদের শান্তিদেবী অং সান সু চি-ও সম্ভবত সেই পথই ধরেছেন রোহিঙ্গাদের মেরে সাফ করে ফেললেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। ‘না রাহেঙ্গা বাস না রাহেঙ্গা রোহিঙ্গা…’। 

সহায়কসূত্র:
১. সাদা বাড়িতে...: http://www.ali-mahmed.com/2008/11/blog-post_06.html
১. লাইফ, এচিভমেন্ট, সেক্রিফাইস: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_3333.html
২. প্রফেসর ইউনূস, আপনার জন্য...: http://www.ali-mahmed.com/2011/03/blog-post_03.html 

Thursday, November 24, 2016

পাপ!

ছবি ঋণ: প্রথম আলো
রাষ্ট্রের কিছু পাপ থাকে । যেমন লিমন। লিমনকে অপরাধী প্রমাণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র তার অধিকাংশ শক্তি প্রয়োগ করেছিল। আবার দলেরও কিছু পাপ থাকে, বিশেষ করে ক্ষমতাশীন দলের। প্রত্যক্ষ না-হলেও পরোক্ষ এই দায় এড়াবার উপায় নেই। কারণ আমাদের মাঝে প্রবল আকারে এই বিশ্বাসটা জন্মায় যে দল করলে সাত খুন মাফ। ফাঁসির আসামীও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে যায়।

যেমন, সম্প্রতি যে নৃশংস ঘটনাটা ঘটে গেল ঝিনাইদহে। শাহানুর বিশ্বাসের মেয়েকে উত্যক্ত করা হচ্ছিল। তিনি এর প্রতিবাদ করায় তাকে এমন নৃশংস ভঙ্গিতে নির্যাতন করা হয়েছে যে তাঁর হাঁটুর উপর থেকে দুই পা কেটে ফেলতে হয়েছে। যথারীতি পুলিশ মামলা নিতে চায়নি। অনেক ঝামেলা করে শাহানুর মামলা করতে পেরেছেন বটে কিন্তু এক নাম্বার আসামীসহ অধিকাংশ আসামীকেই পুলিশ ধরতে পারেনি। কেন? কেন আবার! আহা, এক নাম্বার আসামী মো.কামাল হোসেন যে ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক গো। আজব একটা দেশ এটা এই দেশে পুলিশ-ডাক্তার-শিক্ষক সবারই দল আছে। লাল দল-নীল দল! [১]ফরেন অ্যাকসেন্ট সিনড্রোম’ নামের একটা রোগ আছে ওই রোগে লোকজনেরা বিচিত্র কারণে বিজাতীয় ভাষায় কথা বলে যেমনটা আমাদের দেশের প্রতিভাবান মানুষরাও নিজ-নিজ দলের পক্ষে বিচিত্র ভাষায় কথা বলে!

তো, ওখানকার ওসি মহোদয় মিডিয়ার কাছে বলেছেন, “…শাহানূর, কামাল দুজনের বিরুদ্ধেই অনেকগুলো মামলা আছে”। 
ব্যস, আর কী! শাহানূরের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা আছে এটা জানিয়ে প্রকারান্তরে তিনি বুঝিয়ে দিলেন ‘এই লুক অতিশয় খ্রাপ’ তাই এর দু-চারটা ঠ্যাং কেটে ফেললে কিচ্ছু যায় আসে না।
আচ্ছা, এই ওসিদের সমস্যা কী! এরা ‘বাইট্টারা’ টাইপের কথা কেন বলে? যেমন এক প্রসঙ্গে দাউদকান্দি থানার ওসি বলেন,বিষয়টি পুলিশের জানা ছিল না। কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে’। [২]

অন্য আরেক প্রসঙ্গে ওসি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বাদী মামলা করতে দেরী করায় আসামীরা গা ঢাকা দিয়েছে”[৩]

আবার হালের যে ঘটনাটা সাঁওতালদের সেখানকার ওসি সুব্রত সরকারও বলেন, ঘরে আগুন লুটপাটের ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। কারা আগুন দিয়েছে আমরা জানি না”। [৪] 

বেশ-বেশ, নদীতীরে বসে কবিতা লেখার কারণে পুলিশের চারপাশের সবই অজানা থেকে যায় এবং কেউ অভিযোগ না-করলে পুলিশের পক্ষ থেকে ‘লেগস আপ’ দূরের কথা ‘হ্যান্ডস আপ’ বলারও সুযোগ থাকে না। আচ্ছা, ধরুন আমি কোনো এতিমের কল্লা উড়িয়ে দিলাম। অবাক হবেন না এই খুনের জন্য পুলিশ আমাকে ধরবে না কারণ অভিযোগ করার জন্য কেউ তো আর বেঁচে নাই। কেবল জবাবদিহিতা করতে হবে নাপিতের কাছে কারণ কল্লার সঙ্গে এতিমের চুলও উড়ে গেছে বলে, বেচারা একটা খদ্দের হারালো কেবল এই কারণে।
আমি নিশ্চিত কামাল গংদের টিকির খোঁজও পুলিশ করত না যদি-না হাইকোর্ট ৭২ ঘন্টার মধ্যে এদেরকে আটক করার নির্দেশ দিতেন। কী আশ্চর্য, তাও পুলিশ আটক করতে পারেনি। কামাল হোসেন গংদের দয়ার শরীর, এরা মোট ১৩জন নিজেরাই আত্মসমর্পণ করেছে।

আফসোস, একটা রাষ্ট্রের স্তম্ভ কতটা নড়বড়ে হলে, কী পরিমাণ ফরমালিনে চুবানো থাকলে ক্ষণে ক্ষণে হাইকোর্টকে রুল জারি করতে হয়!

*এখানে এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি বাল্যবিবাহ নিয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রীর মহোদয়ের চুল যায়-যায় অবস্থা। জাতীয় দৈনিকের ফলাও করে একটা লেখা লিখেছেন যার শিরোনাম, "বাল্যবিবাহ নিয়ে খুবই চিন্তিত"।
অথচ আমরা শাহানূরের মেয়েদের কাতরতা জানছি যে এরা স্কুলে যেতে পারছে না। এমন পরিবারগুলোর সিদ্ধান্তের শেষ পরিণাম যে 'অকাল বিবাহ' এটা জানার জন্য মাথার চুল 'বিকল' করার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে বলে তো আমার মনে হয় না। 

সহায়ক সূত্র: 
১. হরেক রকম জামা: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_09.html
২. তালেবানদের কী দোষ: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_24.html
৩. বেচারা এতিমদের উপায় কি: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_11.html

৪. বেচারা বোংগা: http://www.ali-mahmed.com/2016/11/blog-post.html 

Saturday, November 19, 2016

বেচারা 'বোংগা'!

সাঁওতালরা তাদের ভাষায় দেবতাকে বলে 'বোংগা'। বেচারা বোংগা, এঁরা এদেরকে কেবল তির চালাবার বর-ই দিয়েছেন আমাদের মত আধুনিক মারণাস্ত্র চালাতে, কারও বসতভিটায় আগুন লাগাতে শেখাননি।
দেখো দিকি কান্ড, সাঁওতালরা আবার নিজেদেরকে একলব্যের বংশধর বলে দাবী করে থাকেন। একলব্যকে তাদের আদিপুরুষ, এই বিশ্বাসে (একলব্য গুরুদক্ষিণায় নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দান করেছিলেন বিধায়) সাঁওতালরা বৃদ্ধাঙ্গুলির ব্যবহার করেন না।
এমনিতে সাধু কানু, কানু মাঝি, মাতলা সাওতাল এঁদের নিয়ে গল্প করতে আমরা খুব পছন্দ করি কিন্তু তাঁদের সন্তানদেরকে একবিন্দু ছাড় দিতে আগ্রহ বোধ করি না।
ছবি ঋণ: বিবিসি, বাংলা
একটা সভ্য দেশে এভাবে শত-শত লোকজনকে উচ্ছেদ করা যায় আগুন লাগিয়ে দেয়া যায় এ কেবল অকল্পনীয়ই না, অভাবনীয়!
ওরে, কেউ দেখি কিসসু জানে না! ভাগ্যিস, দেশে সম্ভবত তখন শাহরিয়ার কবির ছিলেন না নইলে তিনি ঠিকই বের করে ফেলতেন যে এটায় একাত্তরের মৌলবাদী গোষ্ঠীর হাত আছে। সম্প্রতী নাসিরনগরের ঘটনায় তিনি এটা আবিষ্কার করেছেন যদিও মিডিয়া বলছিল এটা পরিষ্কার দৃশ্যমান যে এখানে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণেই এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটা ঘটেছে। তখন তিনি পাঞ্জাবীর পকেট থেকে কামানের গোলাটা ছুড়ে দেন এই বলে, "আওয়ামী লীগে ঢুকে (জামায়াত) নিজেদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে"।

যাই হোক, আমাদের মত সাঁওতালদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ লোকজন কোথায়? যেমন শিল্পসচিব মো. মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “৬ নভেম্বর চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গিয়েছিলেন পাশের একখন্ড জমিতে আখের বীজ কাটতে, উচ্ছেদ অভিযানে নয়। কিন্তু অবৈধ দখলদারেরা তাতে বাধা দেন। তির-ধনুক নিয়ে তারা আক্রমণ করেন”।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত সরকার বলেন, ”ঘরে আগুন লুটপাটের ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। কারা আগুন দিয়েছে আমরা জানি না”।
এই হচ্ছে আমাদের বেতনভুক্ত কর্মচারীদের কথার নমুনা। নমুনা এমনটা হবেই-বা না কেন কারণ এদের কখনই বেতন বন্ধ হবে না প্রকারান্তরে চাকরি যাবে না! এই দেশে এর তেমন চল নাই।

যে জমি নিয়ে এই হুজ্জত সেই জমি প্রসঙ্গে জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, ”১৯৪৮ সালের অধিগ্রহণ আইন অনুসারে যে চুক্তি হয় তাতে বলা হয়েছে, জমিতে আখ ছাড়া অন্য ফসলের চাষ হলে প্রকৃত মালিকদের জমি ফেরত দিতে হবে”।
এমনিতে অধ্যাপক বারাকাতের সংশয় যথার্থ বলে আমি মনে করি। অধিগ্রহনের সময় তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল এমন তথ্য তিনি এখনো কোনো কাগজে পাননি। আমার ধারণা ভুল হতে পারে কিন্তু পূর্বে এঁদের ক্ষতিপূরণ না-পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
সে প্রসঙ্গ থাকুক। এর সঙ্গে খানিকটা তথ্য যোগ করি। সর্বশেষ যে আইনটি অধিগ্রহণের, এখানেও ব্যত্যয় হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল অধ্যাদেশ, ১৯৮২ (১৯৮২ সালের ২নং অধ্যাদেশ)তাতে বলা হয়েছে, ধারা ১৭ (অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তির ব্যবহার):
১. এ অধ্যায়ের অধীন অধিগ্রহণকৃত কোনো সম্পত্তি, যে উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তা ভিন্ন অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতীত ব্যবহার করা যাবে না। 
২. যদি কোনো প্রত্যাশী সংস্থা (যাদের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে) অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি উপধারা (১) এর বিধান উপেক্ষা করে ব্যবহার করেন অথবা যে উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে সে উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করেন তাহলে তিনি জেলা প্রশাসকের নিকট তার নির্দেশে উক্ত সম্পত্তি সমর্পণ করতে দায়ী থাকবেন। 

আমি পূর্বের কোনো-এক লেখায় লিখেছিলাম দেশ হচ্ছে মা, রাষ্ট্র পিতা। একজন পিতা তার সব সন্তানের বেলায়ই সমান মমতা বোধ করবেন, এটা না-হওয়াটাই অসমীচীন, অন্যায়। পাশের রাষ্ট্র ভারত নিয়ে আমরা বিস্তর রসিকতা করি। এদের এতো শতাংশ লোকজনের টাট্টিখানা নেই এতো শতাংশ লোকজন খোলা আকাশের নীচে হাগে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্ত এঁদের রাষ্ট্র নামের পিতা তাঁর সন্তানদের বেলায় কোনো প্রকারের ছাড় দেয় না। উদাহরণ দেই?
আগরতলা-আখাউড়া ১৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশের মধ্যে ১০ কিলোমিটারের জন্য বাংলাদেশ নষ্ট করছে তার সন্তানদের বসতভিটা, ফসলি জমি, পানির আধার, পূর্বপুরুষের পুরনো হাড়! অন্যদিকে ভারত তার অংশের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৪ কিলোমিটারই করছে আকাশে- উড়ালরেল!

আপডেট:
* আজ মিডিয়ায় এটা পড়ছি, "ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, 'আমি সাঁওতালদের উচ্ছেদ চাই'। তাঁর কন্ঠে আইযুব খানের কন্ঠস্বর শুনছি। এটা সাম্প্রদায়িক দম্ভোক্তি।" (প্রথম আলো ২০ নভেম্বর ২০১৬, পৃষ্ঠা: ২)

Saturday, September 24, 2016

নেমন্তন্ন!

এখানকার থানাভবন উদ্বোধন হবে, পুলিশ সুপার মহোদয় এই কাজটা করলে সমস্যা ছিল না কিন্তু স্বয়ং আইজিপি মহোদয় তকলীফ করে চলে এসেছেন। উদ্বোধন বড়ো কঠিন জিনিস এই এলাকাতেই একবার ফায়ার ফাইটিং স্টেশন উদ্বোধন করার জন্য  নাসিম সাহেব হেলিকপ্টারে করে উড়ে চলে এসেছিলেন- তিনি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

যাই হোক, তিন টাকা দামের কলমবাজ আমি 'দাওয়াতিয়া' টাইপের মানুষ না যে ঘটা করে দাওয়াত দেওয়া হবে আর জেনে বসে থাকব। কিন্তু না-জেনে উপায় কী! জেলা শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গেছি জরুরি একটা কাজে। আমার নিজস্ব কোনও গাড়ি নাই পা-ই লোটাকম্বল, এই-ই সম্বল। যেখানে পা চলে না সেখানে ত্রিচক্রযানই ভরসা যার চালু নাম সিএনজি। ওয়াল্লা, আজ কোনও সিএনজি আখাউড়া পর্যন্ত যাচ্ছে না। কেন রে বাপু? তখন গিয়ে জানলুম ঘটনা! একজনকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বাপ, বিষয় কী? সে আবার পুলিশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানাল, হাইওয়েতে সিএনজি ওরফে স্কুটার চলাচল নিষেধ। বেশ-বেশ, জেনে ভাল লাগল কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাটা কেবল আজই জানা গেল, পালন করা হলো! তা ভালই, রাস্তা ফাঁকা!

আমার দাওয়াত না-পেয়ে মন খারাপ করার সুযোগ নেই কারণ স্কুলের ছেলেমেয়েরা তো নিমন্ত্রণ পেয়েছে। আজ স্কুল অলিখিত ছুটি- আনন্দই আনন্দ। আনন্দ ঝরনা!

আপডেট:
দু-দিন পরে ডা. সাইফুল ইসলাম আমাকে জানিয়েছিলেন এখানে উপস্থিত একজন ছাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারণে। 

Tuesday, August 30, 2016

ঠান্ডা মাথার খুনি!

স্কুলছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিসাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ওবায়দুল নামের এক দরজি ব্যাটার ছুরিকাঘাতে রিসার মৃত্যু হয়। ঘটনাটা সবার জানা। দরজি ব্যাটা রিসার ফোন নাম্বার পাওয়ার পর রিসাকে উত্ত্যক্ত করত। এই করে-করে রিসাকে এক সময় ছুরিই মেরে বসে।
এই খুনের জন্য আইনে তার যে শাস্তি পাওনা তা নিয়ে কোনও প্রকার দ্বিমত নাই। রাষ্ট্রকে কখনও কখনও নিষ্ঠুর হতে হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাউকে-কাউকে মেরে ফেলা ব্যতীত উপায় থাকে না।
এই দরজি ব্যাটার লেখাপড়ার দৌড় খুব একটা নাই এমনটাই প্রতীয়মান হয়। সিনেমায় যখন শিক্ষিত নায়িকাকে অশিক্ষিত নায়ক বা নায়িকাকে নায়ক উত্ত্যক্ত করে গায়ের জোরে উঠিয়ে নিয়ে আসে তখন আমরা যে বেদম হাততালি দিতে গিয়ে এমনই মশগুল থাকি যে পেছনে দাঁড়ানো ওবায়দুলকে লক্ষ করি না! বা ‘টিনের চালে ঢিল মারবেন কেন মিসকল দিন', বলে ফোন কোম্পানিগুলো ঘটা করে বিজ্ঞাপন দেয় তখন আমরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে বিমল আনন্দে আনন্দিত হই। ভ্যালুজের তো আর এখন কোনও বালাই-ই নেই…।

এমনিতে যখন কেউ এখানে-সেখানে রাস্তায় কোনও মেয়েকে উত্ত্যক্ত করে তখন আমরা না-দেখার ভান করে সরে পড়ি। বাই এনি চান্স,কেউ অভিযোগ করলেও আইনের লোকজনেরা খুব সূক্ষ ভাবে খেয়াল রাখেন সেই বীরপুঙ্গব ক্ষমতাশীন দলের পোলাপানরা কি না? ফল যা হওয়ার তাই হয় যে-কোনও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা রাজপথ বেছে নেই। রাজপথে না-গিয়ে আমরা খুব একটা আরাম পাই না। সেটা খুনের বিচার হউক বা হলের দাবী অথবা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন খুনের বিচার!

চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত লোকজনেরা জানেন রক্তক্ষরণে সময় কতটা মূল্যবান। সেখানে রিসার বেলায় আমি কেবল চোখ বন্ধ করে ভাবছি এখানে কত,কতটা অমূল্য সময়েরই না-অপচয় হয়েছে! বাংলা ট্রিবিউন নামের নিউজ পোর্টাল জানাচ্ছে:
…সেখানে উপস্থিত ছিলেন রিশার বাবা মো. রমজান হোসেন, মা তানিয়া হোসেনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। রিশার অভিভাবকরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রিশা ছুরিকাহত হয় স্কুলের সামনের ফুটওভার ব্রিজে। সেখান থেকে সে রক্তাক্ত অবস্থায় এসে দাঁড়ায় স্কুলের ভেতরে, তখন তার পেটের বাম দিক থেকে রক্ত পড়ছিল। কিন্তু তখন স্কুলের গাড়িটা পাশেই ছিল, কর্তৃপক্ষ তাকে গাড়িটা দেয়নি। কোনও শিক্ষক এগিয়ে আসেননি।
…স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল বলেছেন, মামলা হবে, ধরা যাবে না।’ রিশার মা বিলাপ করে বলেন, ‘আমার বাচ্চার রক্ত পড়তেছিল, কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালসহ কেউ এগিয়ে আসেননি। শিক্ষার্থীরা কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে, পেটের ভেতর থেকে নাড়ি বের হয়ে গিয়েছিল।’ এ সময় তিনি স্কুল কম্পাউন্ডে থাকা গাড়ি দেখিয়ে বলেন, ‘ওই যে কতগুলো গাড়ি, কিন্তু আমার বাচ্চাকে কেউ একটা গাড়ি দেননি। দিলে আমার বাচ্চা বাঁচতো, ওরে তাড়াতাড়ি নেওয়া যেত হাসপাতালে।’…” (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন: http://tinyurl.com/z9p3bfq)

বাবারা যখন মাঠে-ঘাটে-আপিসে থাকেন তখন তার সন্তান থাকে স্কুল নামের এমন-এক প্রতিষ্ঠানে যেখানে শিক্ষক নামের অন্য এক পিতা। যিনি হাত ধরে-ধরে শেখান…। নামকরা স্কুল যেহেতু তাই অনুমান করছি আমাদের এই ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল মহোদয়ের অফিসরুম ঠান্ডা-ঠান্ডা কুল-কুল। যথারীতি তার মাথাও ঠান্ডা থাকার কথা ওবায়দুলের মত গরম হওয়ার কথা না। রিসার পরিবারের অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে তিনি যে কাজটা করলেন এটাকে কেন ঠান্ডা মাথার খুন বলা হবে না?

Tuesday, August 9, 2016

তথ্যসেবা!

গুলশান হামলায় হাসনাত রেজা করিম এবং তাহমিদ হাসিব খান জড়িত থাকলে তাদের অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি হউক এতে কোনও দ্বিমত নাই। তবে হাসনাত অপরাধী চিহ্নিত হলে আমার চেয়ে হতবাক আর কেউ হবে না কারণ অতি নিকৃষ্ট কোনও অপরাধীও এমন নির্বোধ, কল্পনাতীত আচরণ করবে না।
আমার মত বোকাসোকা মানুষের মাথায় এটা আসে না যে এমন একটা দক্ষযজ্ঞে, এমন একটা ভয়ংকর কর্মকান্ডে হাসনাতের সশরীরে উপস্থিত থাকার আদৌ প্রয়োজন কী! তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম তার উপস্থিতি ব্যতীত উপায় ছিল না। বেশ, কিন্তু এমন একটা স্থান, যেখানে পুলিশ-আর্মি-জঙ্গির ফসকে যাওয়া গুলিতে যে-কারও মারা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল সেখানে প্রিয়মানুষকে, স্ত্রী-সন্তানকে রাখতে হবে কেন? এটা তো রগরগে কোনও থ্রিলারকেও হার মানায়। এই সব গুছিয়ে যদি হাসনাত এই প্ল্যানটা করে থাকে তাহলে বলতে হবে হাসনাতের মত মানুষ কেবল এই দেশেই না এই গ্রহেও বিরল! এমন একটা মানুষের পদোদক, পা চুবনেো পানি না-খেয়ে সকালে ব্রেকফাস্ট করাটা সমীচীন হবে না।

এমন একটা দেশে বসবাস করি যেখানে নিজের উপরই আস্থা হারিয়ে ফেলি সেখানে কার কথায় বিশ্বাস করব সেটাই তো বুঝে উঠতে পারি না! কী বিচিত্র এই দেশ! ৩২ দিন পর হাসনাত রেজা করিম এবং তাহমিদ হাসিব খানের খোঁজ পাওয়া গেল! কী খোঁজ, কেমনতরো খোঁজ? ৩২ দিন পর ফৌজদারি ৫৪ ধারায় পুলিশ তাদেরকে আটক করেছে। ৫৪ ধারা নামের কালো আইন নিয়ে এখানে আলোচনা করি না। তা এই ৩২ দিন ধরে এই দু-জন মানুষ কোথায় ছিলেন? এই নিয়ে ইঁদুর-বেড়াল টাইপের একটা খেলা চলছিল। পুলিশ বলে আসছিল গুলশান হামলার পর এদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের পর-পরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু এদের পরিবারের লোকজন ক্রমাগত বলে আসছিলেন যে এরা তাদের কাছে নাই।
প্রকারান্তরে বলা এরা পুলিশের কাছে বা সরকারের হেফাজতে আছেন। আমার মত কমবুদ্ধির লোকজনরা পড়লাম গিয়ে বিপদে- সোজা গাড্ডায়। কার কথা বিশ্বাস করব? আর সরকার তো এর দায় এড়াতে পারে না। এদের কার কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল? কোনও আইনজীবী, খুব কাছের কোনও স্বজনের কাছে তাহলে তো আর তাদের পরিবারের এই নিয়ে উচ্চবাচ্য করার সুযোগ থাকত না আমরাও দু-কথা শুনিয়ে দিতে পারতাম না।

তা ৩২ দিন ধরে এই মানুষগুলো ছিলেন কোথায়? পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন? না আকাশ পাড়ি দিয়েছিলেন নাকি পাতালে সেঁধিয়ে গিয়েছিলেন? সরকার ব্যতীত এই সমস্ত তথ্যসেবা পাওয়ার তো কোনও যো নাই। আহা, সরকার বেচারা কী করবে, কত করবে- আমাদের স্বল্প করের টাকায় কত আর তথ্যসেবা দেবে? এই তো সেদিন আমাদের অর্থমন্ত্রী মহোদয় বেসরকারি খাত প্রসঙ্গে বলছিলেন, “সরকারের সহায়তা পাওয়ার জন্য বেসরকারি খাতকে আরও রাজস্বের যোগান দিতে হবে, বর্তমান রাজস্ব দিয়ে হবে না।
এ-ই এলো বলে, সরকারের তথ্যসেবা পাওয়ার জন্য সাধারণ জনগণকে আরও করের টাকার যোগান দিতে হবে, বর্তমান করের টাকায় হবে না…।

Tuesday, August 2, 2016

ধারাবাহিক 'ফারাজকাহিনি' এবং মিথ্যাবাদি মিডিয়াবালক!

কিছু বিষয় নিয়ে লিখতে ভাল লাগে না যেমন শবের ব্যবচ্ছেদ! ফারাজের বিষয়টা নিয়েও লেখার ইচ্ছা ছিল না। মানুষের যেমন বয়স হলে পরিপক্কতা বাড়ে তেমনি পত্রিকারও বয়স হলে তার দায়িত্বশীলতা বাড়ে। কিন্তু প্রথম আলোর মত পত্রিকার সম্ভবত এই বোধের উন্নতি হবে না কখনও, আফসোস! এরা লেবু চিপে হালুয়া বানিয়ে ফেলে! কাউকে-কাউকে কোলে করে কেমন করে এভারেস্টে উঠাতে হয় এর নমুনা আমরা মুসা ইব্রাহিমের বেলায় দেখেছি [১]। যেমনটা এখন দেখছি ফারাজের বেলায়।

পত্রিকাটিতে এটা এখন সিরিজ আকারে ছাপা হচ্ছে, ক্রমশ মেগা-সিরিজে রূপ নেবে এতে কোনও সন্দেহ নেই। যথারীতি আনিস ভাইয়া লিখেছেন, হাত-পা খুলে! আনিসুল হকের লেখাটার কথা যদি উহ্যও রাখি (কেন?সেটা বিস্তারিত লিখে শব্দের অপচয় করতে চাচ্ছি না কারণ এই ভদ্রলোক ফারাজকে নিয়ে “পৃথিবী জেনে রাখো, ফারাজই বাংলাদেশ” শিরোনামে ৪ জুলাই, ২০১৬ লেখায় লিখেছেন,…"যে জিম্মিরা মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তারা বারবার বলছিলেন, ফারাজ, তুমি চলো, তুমি চলো। ফারাজ বলেন, বন্ধুদের ছেড়ে আমি যাব না"। 
লেখাটা পড়ে আমার মত নির্বোধ পাঠকের মনে হবে স্বয়ং আনিসুল হক ওখানে উপস্থিত ছিলেন যেমনটা মুসাকে নিয়ে লেখার সময়ও মনে হয়েছিল এভারেস্টের চুড়ায় লেখক মহোদয়ও উপস্থিত ছিলেন।)

যাই হোক, প্রথম আলো পত্রিকায় ৩০ জুলাই ছাপা হয়েছে, 'জঙ্গিবাদ নয়,‘ফারাজই বাংলাদেশ'; ৩১ জুলাই 'ফারাজের বন্ধুত্বই জঙ্গিবাদ হটাবে বিপথগামীদের ফিরিয়ে আনবে’। আজকের পত্রিকাতেও ফারাজকাহিনী। প্রবল আশা, আগামীকালও থাকবে। কারণটা আমাদের মত বুরবাকদেরও বোঝার বাকি নেই। টংকার ঝনঝনানি! প্রথম আলো-ডেইলি স্টার গং ফারাজদের পারিবারিক ব্যবসা...।

পূর্বে লিখতে ইচ্ছা হয়নি কিন্তু তখনও আমার মনে ছোট্ট একটা প্রশ্ন ছিল। সেটা হচ্ছে, আচ্ছা, ফারাজ যে আত্মদান বা বলিদান দিলেন এটার খবর কী কেবল 'নিউইয়র্ক টাইমস'-ই পেল! এই পত্রিকাটিই প্রথমে ছাপে এরপর অন্যরা এই পত্রিকার বারত নিয়ে ছাপতে থাকে-ছাপতে থাকে। এর শেষ যেন নেই! তা বেশ কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস এই তথ্যটা কোথায় পেল? ফারাজের চাচার কাছে! ফারাজের চাচা কোথায় পেলেন? ছাড়াপাওয়া জিম্মিদের কাছ থেকে? ছাড়া পাওয়া কোন জিম্মির কাছ থেকে তিনি তথ্যটা পেলেন তার আর কিন্তু হদিশ নেই! কিন্তু জানতে পারলে আমরা বেকুবরা খানিকটা আরাম পেতাম।

(নিউইয়র্ক টাইম যেটা লিখেছিল,“ফারাজ হোসেনকে ছেড়ে দিয়েছিল বলে জানান ফারাজের নিকটাত্মীয় হিশাম হোসেন। হিশাম ছাড়া পাওয়া এক জিম্মির কাছ থেকে ঘটনাটি শুনেছেন”।)
এরপর আমাদের অধিকাংশ মিডিয়া দায় সেরেছে এভাবে, “বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন ফারাজ। …ফারাজের স্বজনদের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে তৈরি করা মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এসব কথা উঠে এসেছে” (বাংলা ট্রিবিউন, ৩ জুলাই ২০১৬)
সে তো বুঝলুম রে বাপ কিন্তু ফারাজের স্বজনরা কোন দেশে থাকে যে বেচারা তুমি তাদের সঙ্গে দু-চারটা আলাপ করে আমরা বেকুবদের জানাতে পারলে না! দুম করে অন্যের খাবার চেয়ে নিয়ে জাবর কাটতে থাকলে! বাপু রে, নিজের খাবার নিজের মুখে খেলেই তো উত্তম!
 
“নিজের প্রাণ দিলেও বন্ধুদের সঙ্গ ছাড়েননি ফারাজ। …দুই বন্ধুকে জঙ্গিদের মাঝে ফেলে রেখে প্রাণ বাঁচানোর সযেোগ নেননি ফারাজ আইয়াজ হোসেন”। (ইত্তেফাক ৩ জুলাই ২০১৬)
এই তথ্য ইত্তেফাক কোথায় পেল এর কোনও সূত্রের উল্লেখ নেই! আচ্ছা, বাংলাদেশের মিডিয়া ভাত খায় কী ইয়র্কারদের হাত দিয়ে খায়? মানে নিউইয়র্ক টাইমসের চামুচ নামের হাতা দিয়ে!
অন্য আরও কিছু মিডিয়ার কথা এখানে উল্লেখ করি। সবার তথ্যের উৎস নিউইয়র্ক টাইমস! :

...

...

...

বেশ-বেশ! আচ্ছা, জিম্মিদের সঙ্গে ফারাজকে ছাড়তে চেয়েছিল সন্ত্রাসীরা, কখন? কমান্ডো অভিযান শুরু হওয়ার আগে সকাল ছয়টার দিকে সন্ত্রাসীরা তাদের টেবিলে থাকা আটজনকে ছেড়ে দেয়”। (প্রথম আলো ০৭ জুলাই, ২০১৬)
এর কাছাকাছি সময়ে তাহলে ফারাজকে এবং তার বন্ধুদেরকে হত্যা করা হয়? অথচ বিভিন্ন জায়গায় এটা উঠে এসেছে জিম্মি করার আধা ঘন্টার মধ্যেই দেশি-বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ২০ জনকে প্রথমে গুলি করে এরপর ছুরিকাঘাতে তাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত করে। তার মানে ফারাজের বন্ধুদেরকে এই সময়ই মেরে ফেলার কথা।
এমনিতে সকালে এরা ছিল ফুরফুরে মেজাজে। প্রথম আলোর ভাষ্যমতে, (আকাশ খানকে) "...এরপর হাসতে হাসতে জঙ্গিরা বলতে থাকে, আমরা যাই জান্নাতে দেখা হবে তোমাদের সঙ্গে। তুমি চলে যাও। কিছুক্ষণ পরে এখানে গুলি আসবে। সেই গুলি তোমাকেও লাগতে পারে। যাও যাও বলে আমাকে তাড়িয়ে দেয় তারা"... (প্রথম আলো ১ আগস্ট, ২০০৬)

তারপরও তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই ফারাজ তার বন্ধুদেরকে ফেলে আসবে না আর ওরাও তার বন্ধুদেরকে ছাড়বে না। বেশ, ফারাজের বন্ধুদেরকে নাহয় মেরে ফেলল কিন্তু ফারাজকে মারতে যাবে কেন?
                            ভিডিও সূত্র: ডি কে হং


সহায়ক সূত্র:

১. প্রথম সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী...: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_27.html
 
...
আপডেট ২৬.০১.২৩:
'ফারাজ' নামে একটা ভারতে একটা মুভি করা নিয়ে আবারও তর্কটা সামনে চলে এসেছে। যে সাংবাদিক খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ফারাজকে নিয়ে হিরোগিরির যে গাল-গল্প মিডিয়া ছড়াচ্ছে- বিশেষ করে প্রথম আলো গংরা বলছে তা মিথ্যা!

ফা
রাজ যে বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে তাদের মধ্যে একজন অবিন্তার মার-ও তীব্র বিশ্বাস এর কোনও ভিত্তি নেই।
আমার সাফ কথা, ফারাজের জন্য আমাদের আছে অন্য যারা মারা গেছেন তাদের মতই নিতল বেদনা কিন্তু সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে আমাদের মত সাধারণ মানুষের সঙ্গে চালবাজি করার কোন প্রয়োজন ছিল না। প্রথম আলো গংরা জেনেশুনে যে মিথ্যার ঝাঁপি খুলে বসেছেন এটা এক প্রকারের অপরাধ, কঠিন অপরাধ!