Search

Friday, December 13, 2013

হৃদয়...এক মুক্ত বিহঙ্গ!


হৃদয়কে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, ওহ, হৃদয় [১]ওখানে লিখেছিলাম, ...হৃদয়ের জন্য একটা হুইল-চেয়ারের প্রয়োজন, বড়ো প্রয়োজনলেখাটা দেয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ওর জন্য একটা হুই-চেয়ারের ব্যবস্থা হয়ে যায়@নাজমুল আলবাব একটা হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করে দেনমানুষটাকে একটা ধন্যবাদ দেয়ারই নিয়ম কিন্তু আমি তাঁকে ধন্যবাদ দেব নাকারণ মানুষটাকে তাহলে যে খাটো করা হয়...

ইনবক্সে আলাদা করে আরও অনেকে হুইল-চেয়ার দেয়ার জন্য তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, লোকজনসব পাগল (!) হয়ে গেল নাকি! আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম- , বাহে, এতো মায়া কেন গো তোমাদের মনে?
অবশেষে হৃদয় হুইল-চেয়ারে করেই স্কুলে গেলকেবল এই একটা বাক্য দিয়ে শেষ করে দিতে পারলে সুবিধে হতো কারণ আমি তো সত্যিকারের কোনো লেখক নই- লিখে বোঝাব সেই ্ষমতা আমার কই! আচ্ছা, আপনারা কেউ কী খাঁচায় আটকে থাকা কোনো পাখিকে মুক্ত করার পর সেই পাখিটির আচরণ লক্ষ করে দেখেছেন? বিশাল আকাশটা ফেরত পেয়ে তার মাথা কী এলোমেলো হয়ে যায়, তার অনুভূতিটা কেমন হয় আসলে, আমি জানি না-আমি জানি না!
হৃদয়, হৃদয়ের ক্লাশ ফোরে পড়ুয়া একমাত্র ভাইটা, হৃদয়ের মা- তখন এদের যে অন্য ভুবনের আনন্দ সেটাকে ধরে রাখার ক্ষমতা ক্যামেরা নামের ছোট্ট যন্ত্রটার কোথায়? আফসোস, বেচারা, @নাজমুল আলবাব এই দৃশ্য দেখা থেকে বঞ্ঝিত হলেন! কিন্তু আমাকে যে দৃশ্যটা দেখার সুযোগ করে দিলেন এর সঙ্গে আইফেল টাওয়ার দেখার আনন্দ কো ছার!

আমার স্বপ্নগুলো ছোটো-ছোটোআমি সুতীব্র ইচ্ছা, কোনো-একদিন @নাজমুল আলবাবের সঙ্গে রাস্তার কোনো এক দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিসেই ধোঁয়াওঠা চা- স্বাদ আমি চোখ বন্ধ করে কেবল কল্পনাই করতে পারিকারণ আমি জানি সেই চা- চা-পাতা সিলেট, দার্জিলিং-এর নাসেই চা-পাতাটা আসে...

. ওহ হৃদয়...: https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10151805576342335  




হৃদয়ের খোঁজ নেওয়া হয় না অনেক দিন। হুট করেই হাজির হয়ে যাই আজ (৪ ফেব্রয়ারি) হৃদয়ের বাড়িতে। হৃদয়ের মা কঠিন এক অভিযোগ করলেন। হৃদয় নাকি স্কুলের বাইরেও হুইল-চেয়ারটা নিয়ে বের হতে চায়। তিনি অতি কষ্টে তাকে নিবৃত করেন। কারণ, এটা ভেঙ্গে গেলে? আহারে-আহারে, কেন আরও আগে আসলাম না! আমি হৃদয়ের মাকে বললাম, হৃদয়ের যখনই মন খারাপ হবে বা বাইরে বেরুতে ইচ্ছা করবে হুইল-চেয়ার নিয়ে সে বেরিয়ে পড়বে, বাসার আশেপাশে, মাঠে চক্কর লাগাবে। কোনো সমস্যা নাই। আপনারা এটার যত্ন নেবেন কিন্তু কোনো কারণে ভেঙ্গে গেলে আরেকটার ব্যবস্থা হবে।


আমি হৃদয়ের সঙ্গে টুকটাক কথা বলি, হৃদয়, একটা বিষয় মাথায় গেঁথে রাখো, সবার সব কিছু থাকে না। এই দেখো না, তুমি কি আমাকে কখনও চশমা ছাড়া দেখেছো? দেখোনি। আমার কিন্ত সেই তোমার বয়স থেকেই চোখ খারাপ- চশমা ছাড়া আমি তেমন কিছুই দেখি না, প্রায় অন্ধ। আমার চোখ খারাপ, তোমার পা খারাপ- এই নিয়ে মন খারাপ করার কিছু নেই। মনখারাপ করবে না, একেবারে না, খবরদার। 
আমি হৃদয়কে জিজ্ঞেস করলাম, হৃদয় তুমি তো জানো, তোমার এই হুইল-চেয়ারটা আমার এক বন্ধু তোমাকে দিয়েছে। তুমি কি তার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাও? হৃদয় কোনো শব্দ করল না কিন্তু শারীরিকএকটা ভঙ্গি প্রকাশ করল। আমি এই ভাষা তেমন বুঝি না। ও কবি, দেখেন তো, আপনি বুঝতে পারেন কি না...।

Saturday, December 7, 2013

এ নিতল আনন্দ রাখি কোথায়!

সুরুযকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম [১]। ক্লাশ সিক্সে পড়ুয়া, যার হাঁটুর উপর থেকে দুইটিই পা-ই নেই! দরিদ্র বাবার সন্তান, যে সীমাহীন কষ্টে রেললাইন পার হয়ে নিয়মিত স্কুলে যায়।
তার প্রয়োজন কৃত্রিম পা। অন্তত হাঁটাচলা করতে পারবে। কিন্তু কৃত্রিম পা, কেমন করে? বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে যেটা জানা গেল ন্যূনতম ২২ হাজার টাকা করে হলেও দুইটা পা-র জন্য প্রয়োজন অন্তত ৪৪ হাজার টাকা। তার একজন অভিভাবক সহ বেশ কিছু দিন তাকে ওখানে থাকতে হবে। ৪৪ হাজার টাকার সঙ্গে আনুষাঙ্গিক সমস্ত খরচ মিলিয়ে সে যে বিশাল এক অংক!

আমি পূর্বের লেখায় বলেছিলাম, “...কৃত্রিম পা নিয়ে সুরুয নড়বড়ে করে হলেও হাঁটছে। আহ, এই দৃশ্য দেখার চেয়ে তাজমহল দেখাটা আমার কাছে তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ...”। কিন্তু এই তীব্র আনন্দের খোঁজ পাবো কোথায়?
একজন আমাকে জানালেন, তিনি যখন দেশে ফিরবেন তখন একটা ব্যবস্থা করবেন। সবিনয়ে বলি, আমার কাছে এটার খুব একটা গুরুত্ব নেই। কারণ আমার ভাবনা অনেকের চেয়ে ভিন্ন। আমি মোটা বুদ্ধির মানুষ, ভাবনাও তেমন। আমার সাফ কথা, কে দেখেছে নেক্সট সামার, নেক্সট উইন্টার? আমার কাছে তো মনে হয় প্রতিটা দিনই আমার শেষ দিন!

যাই হোক, প্রায় অসম্ভব এই কাজকে সম্ভব করে দেন, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী, @প্রদীপ সাহা। তিনি তাঁর বন্ধুদের কাছে ২০ ডলার করে আর্থিক সহায়তা চান। তাঁর এই আবেদনে সাড়া দেন অধিকাংশ সহৃদয় মানুষ। তাঁদের কল্যাণে সুরুযের কৃত্রিম দুইটা পা-র জন্য যাবতীয় খরচের ব্যবস্থা হয়েছে। আমার ক্ষমতায় কুলালে প্রত্যেকটা মানুষের গা ছুঁয়ে বলতাম, এতো মায়া কেন গো আপনাদের মনে!

এখন কেবল অপেক্ষা কারণ সুরুযের বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। সুরুযের বাবার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। পরীক্ষার শেষ হলেই তাদের যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হবে। অবশ্য দুজন ভদ্রমহিলা যদি তাদের যাওয়ার সুযোগ দেন তাহলে আর কী!

আমি অপেক্ষায় আছি, সুরুয হাঁটছে, নড়বড় করে হলেও! এমন একটা দৃশ্য না-দেখে মরে যাওয়াটা কোনো কাজের কাজ হবে না...।

* ১. সুরুয: https://www.facebook.com/photo.php?fbid=10151695707087335&set=a.10151298132117335.465193.723002334&type=1

Friday, December 6, 2013

ওহ হৃদয়...


আমাকে একজন বলেছিলেন, ক্লাস সিক্সে একটা ছেলে পড়ে- যার স্কুলে যেতে এক ঘন্টা লাগে! মা ধরে-ধরে স্কুলে দিয়ে আসেনহুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার যে বর্ণনা দিয়েছিলেন তা আমার কাছে অতিশয়োক্তি মনে হয়েছিলতাছাড়া যে দূরত্ব আমার তো মিনিটের বেশি লাগার কথা নাতাহলে?

হৃদয়ের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় হৃদয়ের মার সঙ্গেহৃদয়ের সমস্যা জন্মের পর থেকেইহৃদয়দের বাড়ির সামনের ফাঁকা সামান্য জায়গাটুকুও দেখলাম একা-একা হাঁটতে পারে না, ওল্টে পড়ে যায়- কিছু একটা ধরে ধরে অতি কষ্টে তাকে হাঁটতে হয়অধিকাংশ সময় ওর মা- হৃদয়কে স্কুলে নিয়ে যানকারণ হৃদয়ের বাবা বাড়িতে থাকেন নাযোগালির কাজ করেনএদের নিজেদের ভিটেমাটি ছিলকিন্তু হৃদয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ওই বাড়ি বিক্রি করে এরা এখন অন্যের দয়ায় মাটির একটা ঘর তুলে থাকেন

আমি বড়ো বিভ্রান্ত ছিলাম এটা শুনে যে হৃদয় নিয়মিত স্কুলে যায়ওর সুতীব্র ইচ্ছা, পড়ালেখা করে একটা চাকরি করবে
আমি খানিকটা অনুমান করতে পারছিলাম হৃদয়ের পায়ের চিকিৎসা করাটা এই পরিবারের জন্য অসাধ্য, অসম্ভব একটা ব্যাপারকিন্তু ওর স্কুল যাওয়াটা নিয়ে কি করা যায় এটাই ছিল আমার মূল চিন্তা
হৃদয়ের স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটা আমি হেঁটে আসিসম্ভব, এই রাস্তা দিয়ে হুইল-চেয়ার নিয়ে যাওয়া সম্ভবকিন্তু, স্কুলের সিঁড়ি? স্কুলের হেড টিচারের সঙ্গে কথা বললাম, আমরা যদি ওর জন্য একটা হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করে দেই তাহলে তিনি কি সিঁড়ির একটা অংশকে র‌্যাম্প বানিয়ে দিতে পারবেন?

এখানে আশার কথা শুনিহৃদয় এখন ক্লাশ সিক্সে- এখন ওর বার্ষিক পরীক্ষা চলছে-দিন পরই যখন ক্লাশ সেভেনে উঠবে তখন স্কুল নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হবেওই আধুনিক ভবনটা আমি ঘুরে দেখেছিএই ভবনে চমৎকার একটা র‌্যাম্প করে রাখা হয়েছেহৃদয় হুইল-চেয়ার নিয়ে সোজা ক্লাশে চলে যেতে পারবেওটায় বসেই তার পক্ষে ক্লাশ করা সম্ভবহৃদয়ের একটা হুইল চেয়ারের প্রয়োজন, বড়ো প্রয়োজন...
ওহ, হৃদয়, তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার নিজের পা দুটো আমাকে বড়ো অপরাধি করে দেয়...


ছবি : নিজের বাড়ির মাটির দেয়াল ধরে হাঁটার চেষ্টা
ছবি : হৃদয়ের মা তাকে ধরে ধরে হাঁটাবার চেষ্টা করছেন
ছবি : স্কুলে হৃদয় পরীক্ষা দিচ্ছে
ছবি : স্কুলের নতুন ভবনের র‌্যাম্প
WhatsApp