My Blog List

Sunday, June 19, 2011

ফিরে আসে বারবার!

­আমার সন্তানেরা তাদের হাতে বানানো জিনিসটা আমাকে ধরিয়ে দিলে আমি জানতে চাইলাম, বিষয় কী! এরা দাঁত বের করে জানান দেয়, আজ বাবা দিবস।

দিবস-টিবস নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষের আলোচনায় এখন আর যাই না কিন্তু এদের এই আচরণ দুম করে আমাকে অনেক ক-টা বছর পেছনে নিয়ে যায়! বিচিত্র এক কারণে বয়সটা আমার শৈশবেই থেমে থাকে। আচ্ছা, নিজের বাবার সঙ্গে
কি কখনও এমনটা করেছি?
পাগল!

বাবা এবং আমি, আমাদের সম্পর্কটা ছিল বড়ো সাদামাটা। আমার লেখায় এটা অনেকবার এসেছে, মানুষটা দুম করে মরে গিয়ে কাজটা ভাল করেননি। তখন আমার বয়সই বা কী, সতেরো! কেবল তাঁর কাছে শিখছিলাম। তখনই মানুষটা ফট করে চলে গেলেন। এ অন্যায়, বড়ো অন্যায়!
এই গ্রহের সমস্ত বাবার মত তাঁরও হয়তো তীব্র চাওয়া ছিল তাঁর ছেলে মানুষ হবে। তাঁর এই সন্তান মানুষ হবে দূরের কথা, কালে কালে হলাম গিয়ে কচু-ঘেঁচু! ইশ, কেউ আমার সঙ্গে এহেন অন্যায় করলে, দুম করে মরে গেলে আমার কী দায় পড়েছে মানুষ হওয়ার!
মানুষটা বুঝলই না, কি হতো মানুষটার কেবল বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাটালে?

আজ আর এই নিয়ে লিখতে ইচ্ছা করছে না। ঘুরেফিরে বারবার একই কথা চলে আসবে। নিরুপায় হয়ে হাত বাড়াই আমার নিজের পুরনো লেখায়। কোন-এক বাবা দিবসে লেখাটা লেখা হয়েছিল: 

"বাবা দিবসে তোমায় বলি, দুম করে চলে যাওয়া কোন কাজের কাজ না, বুঝলে!
"একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব
আবার কি ফিরে আসব না পৃথিবীতে?
আবার যেন ফিরে আসি
কোনো এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করূণ মাংস নিয়ে
কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।"
(জীবনানন্দ দাশ)
দেখলে, সবারই, গল্প-কবিতার লোকজনেরও কী ইচ্ছাই না করে ফিরে আসতে, করে না কেবল তোমার! কী, ঠিক বলিনি? কালেভদ্রেও ফিরে আসতে বড়ো বাঁধে বুঝি তোমার?
আচ্ছা ফাদার, কাজটা কী ঠিক হচ্ছে? সিগারেট ফুঁকে ফুঁকে তোমার সন্তানের বুকটা ঝাঁজরা হয়ে যাচ্ছে, তোমার কী উচিৎ না এসে কানটা আচ্ছা করে কষে মলে দেয়া? ছাতার লেখালেখির নাম করে সে যে উচ্ছন্নে গেল, এটা তুমি দেখবে না? আশ্চর্য, তুমি একটা কেমন মানুষ! তুমি একটা, তুমি একটা...একটা পাগলু! 

জানো ফাদার, আজ আমার কেবল মনে হয় একটা বটবৃক্ষের কথা। আমি এই অভাবটা বুঝতে পারি হাড়ে হাড়ে। কেবল মনে হয়, একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ, বিছানায় পড়ে থাকলেও আমার মতো নিরাশ্রয়ের ছাদের অভাব বোধ হতো না। জানো, জীবন যুদ্ধে পরাজিত একজন সৈনিকের মতো হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করে যখন, তখন আমার কাছে তোমার খানিকটা স্পর্শ কতটা জরুরী এটা তুমি কখনই বুঝবে না, কক্ষণই না। আসলে এটা বোঝার মতো ক্ষমতাই নাই তোমার!

তোমার আঙ্গুল ধরে ধরে কেবলি শিখছিলাম। আচ্ছা ফাদার, এরিমধ্যে আঙ্গুল ছেড়ে দেয়াটা কোন ধরনের বিচার হলো? টেল মি, টেল মি নাউ। বলো, তোমার কী মনে হয়? ইশ, বিরাট একটা কাজ হয়েছে তিনি! তিনি একটা বিরাট কাজের লোক হয়েছেন! ফট করে মরে গেছেন, এ্যাহ!

তবে বিশ্বাস করো, তোমার শেখাবার পদ্ধতি আমায় বড্ডো টানত। তোমাকে যতটা না বাবারূপে মনে রাখব তারচে’ অনেক বেশি মনে রাখব শিক্ষকরূপে। জীবনটাকে চেনাতে, বন্ধুর মতো! কী অপরূপ সব কর্মকান্ড তোমার!
তোমার কঠিন নির্দেশ, মুচির ছেলের সঙ্গে আমায় একসঙ্গে পড়তে হবে। বিশ্বাস করো, ওইসময়, প্রথমদিকে, এটা আমার একদম ভালো লাগত না। বাবা, একটা কথা তোমার কানে-কানে বলি, কাউকে বলবে না কিন্তু, ওসময় ক্ষেপে গিয়ে তোমায় গালিও দিতাম। দেব না কেন, বলো? কেন রে বাপু, এই অনাচার আমার উপর চাপিয়ে দেয়া? মুচির ছেলের সঙ্গে একসাথে কেন পড়তে হবে, তাও নিজের বাসায় প্রাইভেট টিউটরের কাছে! কিন্তু তখন তোমার সাত্বিক ইচ্ছাই ছিল প্রধান। আমার বন্ধুরা যে এ নিয়ে হাসাহাসি করত তাতে তোমার আসে যায়। তোমাকে তো আর আমার মত বন্ধুদের নিয়ে চলতে হয় না...।


অথচ দেখো দিকি কান্ড, আজ আমি কেমন সগর্বে বলতে পারি, আমার শৈশবের বন্ধু একজন মুচির সন্তান ছিল, একজন ধোপার। এতে আমার কোন লাজ নাই। আমার শৈশবের অনেকখানি আমার সেই বন্ধুদের কাছে ঋণী। কেমন করে আমি তাদের ঋণ শোধ করি? এইসব ঋণ শোধ করার ক্ষমতা কই আমার! আসলে এই সব ঋণ শোধ হয় না।

আজ আমায় অবিরাম যুঝতে হয় আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কু-সু, পশু এবং শিশুটির সঙ্গে। এই দেখ না, আমি যে কালেভদ্রে পশুটাকে পরাজিত করতে পারি এটা কিন্তু তোমারই অবদান!
কিন্তু এও সত্য কালে কালে আমার যে যন্ত্রমানব হওয়াটা অপরিহার্য ছিল, আজও আমি যে পুরাপুরি যন্ত্রমানব হতে পারিনি। এই একটা বিপুল ক্ষতি কিন্তু তুমি আমার করে দিয়েছ; যা হোক।
 
আহা, চলে গেলে, বেশ। কিন্তু তোমার বিদায় নেয়ার ভঙ্গিটা আমার পছন্দ হয়নি। এভাবে দুম করে কেউ চলে যায় বুঝি? দূর-দূর, ফালতু, স্রেফ ফালতু!

তুমি যখন মিডফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হলে তখন আমার বয়স কতো হবে আর, সতেরো। ওই দিন তোমার শরীর খানিকটা ভালো থাকায় তোমার শয্যাপাশে কেবল আমিই ছিলাম। রাত দুইটা দিকে তোমার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলো।
আহা, পৃথিবীতে এতো বাতাস অথচ তুমি একফোঁটা বাতাসের জন্যে কেমন নির্লজ্জের মত তোমার কিশোর সন্তানের হাত খামচে ধরে আছো! কী হাহাকার করা ভঙ্গিতেই না বলছিলে, 'খোকা, বড় কষ্ট! একটু অক্সিজেনের ব্যবস্থা কর'। এ্যাহ, বললেই হলো আর কী, যেন কিশোরটি অক্সিজেন বুকপকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়!

আমি পাগলের মতো হাসপাতালের এমাথা-ওমাথা ডাক্তার-নার্সের জন্যে ছুটাছুটি করছি। এ অভাগা দেশে যা হয়, প্রয়োজনে কাউকে কী খুঁজে পাওয়া যায় শালার! সরষে তেলের গন্ধমাখা মফস্বল থেকে আসা এই কিশোরটির কতটুকুই বা ক্ষমতা, চেনার শক্তি। এক সময় মনে হলো দেই লাফ চার তলা থেকে! আজও ভাবি ওদিন কেন লাফ দিলাম না? হায়রে মানুষ, প্রাণের কী মায়া! সাহস নাই, বুঝলে-
শ্লা, আমি একটা কাপুরুষ!

জন্ম এবং মৃত্যুর সময় নাকি ডাক্তার আমাদের স্পর্শ করেন! ডাক্তার একসময় তোমাকে বড়ো অবহেলাভরে ছুঁয়ে জানালেন, এই লাশটা সরাও এখান থেকে। বাহ, আজ থেকে তুমি একটা লাশ!
আমি এবং লাশ। আচ্ছা, লাশ আর মানুষ থাকে না, না? তাহলে লাশ এবং মানুষ। তবুও আমি একা! বরফঠান্ডা বাবা নামের লাশটার, তোমার হাতটা ধরে বসে আছি ভোরের অপেক্ষায়। ঢাকার সমস্ত মসজিদ থেকে একযোগে আজান ভেসে আসছে। অপার্থিব, অন্য ভুবনের এক অনুভূতি!
এরপর লাশ উঠাও, লাশ নামাও, এই লাশটাকে ধরো। এই-এই, এই লাশের সঙ্গে গার্জেন কে? এরপর কত্তো কাজ চাপাতা কিনতে হবে, কাঠের বাক্স বানাতে হবে, বরফ লাগবে...। 

কী রক্তশূণ্য-পান্ডুর তোমার মুখ। তোমার অতলস্পর্শী চোখটা কেমন স্থির! হায়, কী বোকাই না ছিলাম আমি! আমার বোকামী দেখে তুমি খুব হাসছিলে, না? তোমার ঠান্ডা, আড়ষ্ট হাতটা অহেতুক ঘষছিলাম এটা দেখে। আমি তো কেবল এই চেষ্টাই করছিলাম, অলৌকিক-বিচিত্র কোন উপায়ে যদি আমার শরীরের খানিকটা উত্তাপ তোমার শরীরে ছড়িয়ে দেয়া যায়। যদি যায়...। অজানা-অদেখা কোন এক উপায়ে তোমাকে আবার যদি বাঁচিয়ে তোলা যায়! যদি...। চিন্তা করো, কেমন বোকা আমি!

কী দীর্ঘ একটা রাত! প্রিয়মানুষের শব নিয়ে ভোরের অপেক্ষা। ভোর তো আর হয় না! আসলে ভোর হয়, ভোরকে কেউ আটকাতে পারে না। কেউ কেউ ভোরের অপেক্ষায় হাল ছেড়ে অন্য ভুবনে যাত্রা করে...।"

*সাদিক মোহাম্মদ আলমের ইংরাজি অনুবাদ:

4 comments:

মনসুর said...

বিদেশে পড়ে থাকা ছেলেপেলেদের না কাঁদালে কি চলত না আলি ভাই?

Emi said...

Amar kanna pacche

Omio Ujjal said...

এত তীব্র ভাবে আবেগের জায়গাটা নাড়িয়ে দিলেন ...!! অসম্ভব ভালো একটি লেখা......কাঁদালেন...

Anonymous said...

apnar baba sargobasi hoon......amar babar mokhe apnar babar chaya khoji.....