লেখক: Irfan sheikh
"বিকাশ আপনার কাছ থেকে তিন জায়গায় অর্থ উপার্জন করে।
১. আপনার আমানত অন্য কাউকে ঋণ দিয়ে সেই সুদ থেকে আয়।
২. ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে ১.৮৫% চার্জ কেটে নেয়।
৩. প্রতিবার সেন্ড মানি করলে সেখান থেকে চার্জ কেটে আয় করে।
এর বাইরে রেমিটেন্স, মুদ্রা বিনিময়, পেমেন্ট, ফোন রিচার্জ, ডোনেশন, রিটেইল ইত্যাদি ক্ষেত্র থেকে বিকাশের আয় হয়। তবে সে আলাপে আর না গেলাম।
প্রধান ৩ উপার্জন মাধ্যমের ৩ নম্বরটা খেয়াল করুন। একটা টাকা যতবার হাত বদল হবে, ততবার ১০ টাকা কেটে নিবে বিকাশ। ধরুন, ১০০ টাকা ক্যাশ ইন করে পরে আপনার মাকে পাঠালেন। সে পাবে ৯০ টাকা। আপনার মা সেই টাকা তার বুয়াকে পাঠালে, বুয়া পাবে ৮০ টাকা। বুয়া এটা ক্যাশ কাউট করলে ফাইনালি পাবে ৭৮.৫২ টাকা।
হাত বদল আরও বেশি হলে বুয়া ৫০-৬০ টাকা পেতো।
এখানে থিওরিটিকালি টাকাটা ৩ বার হাত বদল হয়েছে। কিন্তু প্র্যাকটিকালি টাকাটা হাত বদল হয়নি। বিকাশের সার্ভারের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে জাস্ট দুয়েকটা কোড এদিক সেদিক হয়েছে। আপনার একাউন্ট থেকে ইলেক্ট্রিক মানির কোড নিয়ে সে আপনার মায়ের একাউন্টে সমন্বয় করেছে। পরে বুয়ার একাউন্টে করেছে।
ক্যাশ আউট বাদে সেন্ড মানির যে লেনদেন, এটাকে বলে 'পিটুপি ট্রানজ্যাকশন'। ভারতে ১ লাখ রুপি পর্যন্ত এই পিটুপি লেনদেন ফ্রি। মিয়ানমারে পুরোপুরি ফ্রি। থাইল্যান্ডে ৫০০০ বাথ মানে ১৩০০০ টাকা পর্যন্ত ফ্রি। ভিয়েতনামে সম্পূর্ণ ফ্রি। বিকাশে ফ্রি না। প্রতিবারে ১০ টাকা।
ডাকাতিটা এখানেই শেষ হলে পারতো। হয়নি। এর চেয়ে ভয়াবহ একটা কাজ করেছে বিকাশ।
আগে পিটুপি লেনদেনে টাকার পরিমাণ কম হলে বিকাশ কম টাকা চার্জ করতো। টাকার পরিমাণ বেশি হলে, শতকরা হিসাব করে বেশি টাকা চার্জ করতো। অর্থাৎ ২০০ টাকায় চার্জ কম। ৫০০০ টাকায় চার্জ বেশি।
কিন্তু এখন আর সেটা করে না। সবার জন্য এক রেট। ১০০ টাকা লেনদেন করলেও ১০ টাকা। ৪০ হাজার টাকা লেনদেন করলেও ১০ টাকা। এর মাধ্যমে বিকাশ বলতে চাচ্ছে, দ্যাখেন আমরা শত-শত টাকা চার্জ করছি না। যত বড় এমাউন্টই পাঠান, মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে আপনার টাকা আমরা পৌঁছে দিবো।
কিন্তু আপনি শেষ কবে ৪০ হাজার টাকা বিকাশে লেনদেন করেছেন? ১০ হাজার টাকার উপরে বাঙলাদেশের সাধারণ মানুষ ও অফিসগুলো বিকাশে লেনদেন করে না, পলিসির কারণে করতে পারে না।
বিকাশ মূলত ছোট-ছোট লেনদেনের অ্যাপ। সাধারণ মানুষ, গার্মেন্টস কর্মী, ছাত্র, কৃষক একে অন্যকে ২০০ টাকা, ৪০০ টাকা এভাবে পাঠায়। রিকশায় ভাংতি না-থাকলে বিকাশে দেয়। রাইড শেয়ারিং অ্যাপে ভাড়া দেয়। সব রকম ভাংতির সংকটে বিকাশ ব্যবহার করে। সেলামি, বখশিশ, চটজলদি যে কোন ২০০-৫০০ টাকা পাঠাতে দেশের মানুষের একমাত্র একচেটিয়া সম্বল হলো বিকাশ। আর এই প্রতিটা ট্র্যানজেকশনে বিকাশ নেয় ১০ টাকা।
রিকশাওয়ালাকে ৭০ টাকা ভাড়া দিলেও ১০ টাকা। সেলামিতে ২০০ টাকা দিলেও ১০ টাকা। 'দোস্ত একটু আটকে গেছি, ২০০ টাকা সেন্ড মানি কর', এই ক্ষেত্রেও ১০ টাকা!
বিকাশের এই ইউনিভার্সাল রেইটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালনারেবল হলো গরীব মানুষ। যেহেতু প্রতিদিন ৪-৫টা লেনদেনে মাত্র ৫০ টাকা ব্যয় হচ্ছে, সে খেয়াল করে না। কিন্তু ক্যাশ আউট চার্জ বাদ দিয়েই সারা দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ৫ জনের একটি পরিবার মাসে ১৫০০ টাকা বিকাশকে দিচ্ছে। এটা সেই পরিবারের বিদ্যুৎ বিলের চেয়ে বেশি!
বাঙলাদেশে বহু প্রতিষ্ঠান আছে যারা মধ্যবিত্ত আর উচ্চ মধ্যবিত্তদের লুট করে। যেমন উবার অথবা লালা মুভ।
কিন্তু বিকাশের সিস্টেম তৈরিই হয়েছে ২০০-৪০০ লেনদেন করা গরীব মানুষকে নিপীড়ন করতে। একদম গরীব মানুষকে টার্গেট করে তারা এই সিস্টেম ডেভলপ করেছে। এই মুহূর্তে এর চাইতে গরীব বিধ্বংসী কোন ঐতিহাসিক পণ্য বা সেবা মনে পড়ছে না।
৩৫০ এমপির মধ্যে একটা প্রাণী নাই যে এটা নিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করবে। তাদের সবার রাজনীতি জনবিচ্ছিন্ন। তাদের রাজনীতি শুধু অর্থহীন জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় পরিচয় আর সংবিধান নিয়ে।
একদা ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে দেখেছিলাম, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার হবে নাকি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ আর ধর্মনিরপেক্ষতা হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কামড়াকামড়ি করছে।
আমি প্রচন্ড বিতৃষ্ণা নিয়ে বের হয়ে গেলাম। আমার বের হওয়াতে কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু এটলিস্ট আমি জেনে গেছিলাম, এরা আমাদের লোক না। এরা আমাদের রাজনীতিটা করে না।"
লেখক: Irfan sheikh
(https://www.facebook.com/share/1EHfX5nqXn/ )
সূত্র:
১. ব্র্যাক ব্যাংক, লাশ-বানিজ্য-পদক: https://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html?m=1

No comments:
Post a Comment