Search

Sunday, August 30, 2026

আহারে জীবন, প্রবাস-জীবন!

লেখক: বিল্লাল হোসাইন (https://www.facebook.com/share/1BhrxyBktX/ ) 

"গত সপ্তাহের বুধবার রাতে টোকিওর 'ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটি' থেকে সেমিনার শেষ করে ডরমেটরিতে ফিরছি। সেমিনার শেষে ক্যাম্পাস দেখতে দেখতে একটু লেট হয়ে গেছে, আবার 'সেইবু লাইন-এর ট্রেন লেট করায় আরো লেট হয়ে গেছে। 'নাকানো' স্টেশনে ট্রেন চেঞ্জ করতে হবে। রাত প্রায় ১১টা বাজে, সকাল সাড়ে ১০টার পর আর কিছু খাওয়ার সুযোগ হয়নি!

তাই ট্রেন চেঞ্জ না-করে স্টেশন থেকে বের হলাম। স্টেশনের সামনেই একটা 'লসন কনভেনি' স্টোর আছে, উদ্দেশ্য হলো একটা 'টুনা অনিগিরি' আর একটা বাটারবন কিনে খেয়ে তারপর আবার স্টেশনে এসে 'জেআর চুও লাইন-এর ট্রেন ধরে 'কুনিতাচি' আসব। তাই স্টেশন থেকে বের হয়ে লসনে গেলাম। স্টেশনের সামনের রাস্তায় কাজ চলছে, ড্রিলিংয়ের কাজ। তাই অনেকটুকু জায়গা হলুদ ব্যারিকেড দেওয়া। একটু চেপে চুপে লসনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

কনভেনি স্টোরে ঢোকার আগে স্মোকিং জোন দেখে ভাবলাম একটা সিগারেট ধরাই, সারাদিন সিগারেটও খেতে পারিনি। ৩টা সেমিনার করতে হয়েছে! সিগারেট ধরাতেই দেখি আমাদের মতই গায়ের রঙের একজন এসে কনভেনি স্টোরের দেয়ালে হেলান দিয়ে মাটিতে বসে পড়েছেন। গায়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ইউনিফর্ম। দেখেই বুঝলাম ওই রাস্তায় যে কাজ হচ্ছে তিনি সেখানে কাজ করছেন। এখন ২০ মিনিটের 'কিউকেই' মানে বিশ্রাম দিয়েছে। তাই এখানে এসেছেন, আর হাতে একটা সাদা পলিথিন। আমি আর নজর দিইনি।

কিন্তু মিনিট দুই পরেই স্পষ্ট বাংলা কথা শুনতে পেলাম, আর বুঝলাম বাংলাদেশি। তারপর আবার ভাইকে বলতে শুনলাম,

তোমরা সন্ধ্যায় কী নাস্তা করছো? বাবুরে কী খাওয়াইছো?

অপর পাশ থেকে কী বলল তা তো শোনা যায় না, কিন্তু এই পাশ থেকে আবার শুনলাম,

পিজ্জা কোথা থেকে আনছো?

তার কথা শুনে বুঝলাম তার পরিবার সন্ধ্যার নাস্তায় পিজ্জা খেয়েছে। আর খাবেই বা না কেন? আহা, বাবুর বাবা যে জাপানে থাকে!

এরপর আরও মিনিট খানেক কথার শেষে সম্ভবত ভাইয়ের ওয়াইফ জিজ্ঞেস করছে, তুমি রাতে খেয়েছো কিনা বা কী খেয়েছো, বা এখন কী করো।

আমি তার বসার জায়গা থেকে ৩ ফুট দূরে হবো, কারণ এই কনভেনির সামনে সিগারেট খেলে আপনি হেটে হেটে খেতে পারবেন না, লম্বা গোলাকার সিগারেটের অ্যাশট্রে থাকে, ছাই সেখানেই ফেলতে হবে। তাই আমি বাধ্য হয়েই তার কথা শুনছি। যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো, তখন তিনি ঠিক এইভাবে উত্তর দিলেন,

হ্যা, রাতে খাসির গোশত দিয়ে ভাত খেয়ে অফিসে এসেছি। এখন ডিউটি শুরু হবে। আর কল দিবো না। রুমে গিয়ে আবার কল দিবো,

বলে কল কেটে দিয়েছেন।

আমি এই টোকিওর রাস্তায় কোনো বাংলাদেশি দেখলে বা বুঝতে পারলে আগ বাড়িয়ে কথা না-বললেও তাকে সালাম দিই। ঠিক একইভাবে সিগারেটের ফিল্টারটা অ্যাশট্রেতে রেখে ওনাকে ক্রস করে যাওয়ার সময় সুন্দর করে সালাম দিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তিনি যেতে দিলেন না, তিনিও সুন্দর করেই ডাক দিয়ে বললেন,

ভাইয়ের বাড়ি কোথায়?

এমন কিছু জিজ্ঞেস করলে থামতেই হয়! আমি দাড়িয়ে গেলাম দেখে তিনি মাটি থেকে উঠে দাড়াতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমি জানি যারা কনস্ট্রাকশনে কাজ করে তাদের কষ্ট কেমন, এই ২০ মিনিট ছাড়া সে আর বসতেই পারবে না। তাই দ্রুত তাকে দাড়াতে না-দিয়ে আমিই গোড়ালিতে ভর করে নিচে বসে বললাম,

ভাই, চাঁদপুর। তবে জন্মের পর থেকেই চিটাগং-এ ছিলাম। 

এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এদিকে কী করি, আমি বললাম, ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছি।

আর এটা বলতে গিয়েই ওনার হাতে যে সাদা পলিথিনটা ছিল, তার দিকে তাকিয়েই আগের ফোন কলে তিনি যে মিথ্যা কথা বলেছেন, তা ধরতে ১০ সেকেন্ডও লাগেনি। তার সাদা পলিথিনে দুইটা কলা, দুইটা বিস্কুট, আর দুইটা সিদ্ধ ডিম। তিনি এগুলো নিয়ে এদিকে নাইট ডিউটি করতে এসেছেন। আর তার ওয়াইফকে বলেছেন, খাসির গোশত দিয়ে ভাত খেয়ে এসেছেন!


আমি সাদা পলিথিন থেকে চোখ তুলে ওনার মুখের দিকে তাকাতেই তিনি কাতর হয়ে বললেন,

ভাই, কুলাতে পারি না। এই মাসে ঘরে সব মিলাই ৫০,০০০ ইয়েন দিছি। তাও হয় না। আর রাতে ভাত খেয়ে কাজে আসলে কাজ করা যায় না, শরীর ছেড়ে দেয়।

তার কথা শুনে আমি হাসি। আমি বলি, এভাবে দিতে-দিতে কলিজা বিক্রি করে দিয়ে দিলেও কারও কোনো চাহিদা মিটবে না। আমি যতটুকু জানি, আপনাদের এই কাজ সব দিন থাকে না, আবার যখন থাকে তখন টানা থাকে। আপনি কতক্ষণ ধরে করতেছেন?

তিনি মুখটা খুবই মলিন করে বললেন, গতকাল নাইট ৬ ঘণ্টা, আজকে সকালে ৮ ঘণ্টা আর এখন নাইট ৮ ঘণ্টা করে সকালে রুমে যাবো। তার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে বলি, 

মানে আপনি ২২ ঘণ্টা ধরে দাড়িয়ে! আপনি এতক্ষণ ভাতও খান নাই, আর কী সুন্দর ঘরে বলে দিলেন, খাসির গোশত দিয়ে ভাত খেয়েছেন! এমন করবেন না, দেশে যারা থাকে তারা ভুল ভাবে! অথচ ঘরেতো সন্ধ্যাতে হয় পিজ্জা হাট বা পিজ্জা বার্গ থেকে শত শত টাকা দিয়ে পিজ্জা খেয়েছে!

তিনি আর কিছুই বলেন না।

এরপর আমার কথা জিজ্ঞেস করলে আমি বলি, আমি যাবো কুনিতাচি, কিন্তু খিদা লাগায় এদিকে স্টেশন থেকে বের হয়েছি। এটা শোনার পর তিনি তার পলিথিন থেকে কলা আর ডিম বের করে আমাকে দেন। আমি তো তার এই খাবার খাবই না, কিন্তু তিনিও আমাকে না-খাইয়ে ছাড়বেন না। তখন বাজে মাত্র রাত ১১টা, ওনার ডিউটি চলবে সকাল ৬টা পর্যন্ত, তাই এই সামান্য খাবার থেকে খেতে চাইনি।

কিন্তু তিনি এমনভাবে চেপে ধরলেন, এমন মায়া দেখালেন, পরে মনে হলো না খেলে মনে কষ্ট পাবেন। তাই আমিও মাটিতে বসে কলা আর সিদ্ধ ডিম খেলাম। আর খাওয়ার আগে ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে একটা ছবি তুললাম। পাশের বোতলে এটা একটা গ্রিন টি। তিনি সেখান থেকেও আমাকে অর্ধেক দিয়েছেন।

এরপর ওনার থেকে যখন বিদায় নিই, তখন আমি আবার লসন কনভেনিতে ঢুকে ওনার জন্য দুইটা অনিগিরি (ভাতের বলের ভেতরে মাছ দেওয়া থাকে), একটা বড় সাইজের বাটারবন ও একটা পোকারি সুইট (গরমে স্যালাইনের মত খায়) কিনে জোর করে দিয়ে আসি আর পুরোটা পথ ভাবতে থাকি, আমরা ঘরের মানুষদের টেনশন ছাড়া রাখার জন্য কত কিছুই না মিথ্যা বলি। কোথায় রাস্তার ফুটপাতে বসে কলা, ডিম আর বিস্কুট খাওয়া আর কোথায় খাসির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া! মনটাই খারাপ হয়ে গেছিলো।

এই লেখা বিদেশে যারা থাকে তাদের কষ্ট বা স্ট্রাগল বোঝানোর জন্য না, এই লেখা আমাদের প্রতি দেশের মানুষের সিম্প্যাথি অর্জনের জন্যও না। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, এই ঘটনা নিয়ে এত বড় লেখা কেন?

উত্তর হলো, এই লেখা হলো তাদের জন্য, যারা নিজের ঘর, পরিবার, সমাজ, দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকেন। আপনারা অবশ্যই কষ্ট করবেন, পরিশ্রম করবেন, আয় করবেন, নিজের ঘরে টাকা পাঠাবেন। কিন্তু কখনোই এমন মিথ্যা বলবেন না। যদি শুকনা পাউরুটি খেয়ে থাকেন, তাহলে ঘরে তাই বলবেন। এতটুকু সত্য না বললে কী হয় জানেন?

ঘরে লোকজনের আপনার ওপর অন্যায় আবদার বাড়ে। বিদেশে কাজ করতে এসেছেন, পড়তে এসেছেন, তার মানে এটা না আপনি এদিকে কোটি-কোটি টাকা ইনকাম করেন। আপনি যদি এমন মিথ্যা বলতে থাকেন, তাহলে আপনি সেই প্রত্যাশার চাপ সামলাতে এমন রাতের বেলা শুকনা বিস্কুট, কলা আর সিদ্ধ ডিম খেয়ে থাকবেন।

মনে রাখবেন, মাস শেষে বেতন পেয়েই তা মুঠ করে দেশে পাঠিয়ে দিবেন না, নিজের ওপর জুলুম করবেন না। আগে নিজের পেটকে দেন, নিজের রুহকে দেন, ভালো খাবার খান। তাহলেই আপনি ভালো থাকবেন ও ভালো করে কাজ করে টাকা আয় করে অন্য সবার মুখে হাসি ফুটাতে পারবেন।

ভালো থাকুন, আপনারা। দুধে ভাতে থাকতে না পারলেও অন্তত ভরা পেটে থাকুন।"

লেখক: বিল্লাল হোসাইনটোকিও, জাপান২৯.৮.২৬

No comments:

WhatsApp