Wednesday, May 2, 2018

দানব এগুচ্ছে গুটিগুটি পায়ে।

(অসাধারণ এই লেখাটি যখন পড়ছিলাম, পড়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন এটা একটা কল্পকাহিনী! অন্য গ্রহের অতি তুচ্ছ প্রাণ-জীবাণু কেমন করে অসম্ভব বুদ্ধিমান পৃথিবীর মানুষদের সঙ্গে লড়াই করার পণ নিয়ে নেমেছে। এরা কেমন করে ক্রমশ অজর-দানব হয়ে উঠছে। এই পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে একে-একে মেরে ফেলার নোংরা শলা করছে। কিন্তু এটা আমাদের খুব কাছের গল্প, সত্য ঘটনা...।)

লিখেছেন:  Marufur Rahman Opu 
"বাচ্চাটির বয়স ৪ বছর। ও কি বাঁচবে? প্রশ্নটির উত্তর কারও জানা নেই। ওর কি হয়েছে জানেন? আক্ষরিক অর্থেই ওকে আমরা মেরে ফেলছি। হ্যাঁ, আমি আপনি আমাদের মত মানুষেরাই। আমাদের পাপ বহন করছে এই ৪ বছরের শিশুটি।

"বাচ্চাটি ‘ক্লেবশিয়েলা নিউমোনি’ নামের একটি গোবেচারা টাইপ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত। এর চিকিৎসা অতি সহজ কিন্ত তার প্রস্রাব পরীক্ষা করে দেখা গেলো জীবাণুটি আর গোবেচারা নেই। জীবাণুটি অজর-অক্ষয় হয়ে উঠেছে। পরিচিত সব ধরনের এন্টিবায়োটিক দিয়ে জীবাণুটিকে পরীক্ষাগারে মেরে ফেলার চেষ্টা করে দেখা গেলো জীবাণুটির কিছুই হয়নি- দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে! তাই রিপোর্টে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকগুলোর নামের পাশে R অর্থাৎ রেজিস্টেন্ট বসে গেলো।
এর মানে কি জানেন? এর মানে হচ্ছে এই এন্টিবায়োটিকগুলো দিয়ে বাচ্চাটিকে আর সুস্থ করা যাবে না অথচ এই এন্টিবায়োটিকগুলোর মাঝে ১০টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকা দামের এন্টিবায়োটিকও আছে।

আসলে আমাদের দোষটা কোথায় তাহলে? আমরাই দায়ী- আমরাই এই জীবাণুটি তৈরি করেছি, একে দানব বানিয়েছি। দেখা গেল এই বাচ্চাটি হয়তো এর আগে কোনদিনও কোন এন্টিবায়োটিক নেয়নি, সে সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে এই মাল্টি ড্রাগ রেজিস্টেন্ট জীবাণু দিয়ে। এই জীবানুটি কি করে মাল্টিড্রাগ রেজিস্টেন্ট হলো, শুনবেন?
এই ক্লেবসিয়েলা জীবানুটি কোন একসময় নিরীহ ছিলো। সে কোন-একজনকে আক্রান্ত করেছিলো। সেই বেকুব লোক তখন কোনও দোকান বা ফার্মেসিতে গিয়ে দুইটা ‘এমোক্সিসিলিন’ খেয়ে দেখলো আহা বেশ সুস্থ লাগছে তো, তাই ওই এমোক্সিসিলিন এন্টিবায়োটিক ওষুধটা খাওয়া বন্ধ করে দিলো।

অথচ দুইটা মাত্র ওষুধ খাবার কারণে অনেক ক্লেবশিয়েলার জীবাণু মারা গেলো কিন্তু কিছু বেঁচে রইলো যেহেতু সে পুরো ডোজ কমপ্লিট করে নাই। এরা (ক্লেবশিয়েলার জীবাণু) নিজেদের জেনেটিক মডিফিকেশন করলো যেন এমোক্সিসিলিন এদের মারতে না পারে যেহেতু এরা জানে এমোক্সিসিলিন দেখতে কেমন। ফলে তারা হয়ে গেলো ‘এমোক্স রেজিস্টেন্ট’। এদের বংশধর গিয়ে আরেক বেকুবকে আক্রান্ত করলো সে ‘সেফিক্সিম’ এন্টিবায়োটিক দু-চারটা খেয়ে বন্ধ করে দিলো ফলে বেঁচে যাওয়া ব্যাক্টেরিয়া হয়ে গেলো ‘সেফিক্সিম+এমোক্স রেজিস্টেন্ট’। এভাবে তারা অন্যদের আক্রান্ত করতে থাকলো এবং ভুলভাল ডোজের কারনে ক্রমান্বয়ে সব ড্রাগ এর বিরুদ্ধে রেজিস্টেন্ট হয়ে উঠলো। এটাই মূল প্রক্রিয়া।

ফলে দেখা যাচ্ছে এই জীবাণু তৈরিতে বাচ্চাটির হয়তো কোন ভূমিকা নেই। দোষ করেছে অন্য কেউ, শাস্তি পাচ্ছে বাচ্চাটি। সেই অন্য কেউ তার বাবা মা হতে পারে, নিকটাত্নীয় হতে পারে বা অপরিচিত কেউও হতে পারে। আমি, আপনিও হতে পারি। এই বাচ্চাটিকে এখন বাঁচানো কঠিন। যেহেতু সব এন্টিবায়োটিক অকার্যকরি প্রমাণিত তাই শেষ একটা ভরসার এন্টিবায়োটিক আছে যা হয়তো জীবাণুটিকে মারতে পারবে কিন্তু কিডনির ক্ষতি করে ফেলবে। কপাল খারাপ হলে এই শেষ ভরসা এন্টিবায়োটিকও হয়তো রেজিস্টেন্ট হতে পারে।
এসব রোগী সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা আর নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জোরে বাঁচলেও বাঁচতে পারে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাঁচানো কঠিন।

পাপ মোচনের এখনো সময় আছে। হয়তো সব জীবাণু রেজিস্টেন্ট হয়ে যায়নি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দোকান থেকে ইচ্ছামত এন্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া বন্ধ করুন। আপনার চিকিৎসক যে ডোজে যতদিন খেতে বলেছে ততদিন সেই ডোজেই খান, না কমলে আবারো সেই চিকিৎসকের কাছেই যান।

জীবাণুমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন, হাত ধুয়ে খাওয়া, মাস্ক ব্যবহার, হাঁচি-কাশির ভদ্রতা মেনে চলা এগুলো পালন করুন। শুধু নিজে করলেই হবে না অন্যকেও উৎসাহিত করুন, আপনি ফার্মেসি ব্যবসায়ী হলে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করুন, ফার্মেসিতে অন্য কাউকে এভাবে ওষুধ কিনতে দেখলে তাকে বোঝান। ভুয়া ডাক্তারদের চিহ্নিত করে ধরিয়ে দিন, চিকিৎসা পরামর্শ ফেসবুকে বা পাড়াপ্রতিবেশী থেকে নেবার প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান কারণ এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবেন আপনি, নবজাতকের কাছে এ আপনার দৃঢ় অংগীকার। Marufur Rahman Opu