My Blog List

Friday, April 11, 2014

নায়ক



স্টেশন থেকে চলে এসেছিলাম মেজাজ খারাপ করে। সুমাইয়া নামের চার-পাঁচ বছরের মেয়েটাকে আজ পাইনি (একে নিয়ে পরে কোনও একদিন লিখব)। এই মেয়েটিকে এন্টিবায়োটিক খাওয়াবার আজ শেষ দিন। বেছে বেছে আমি প্রতিদিন একটা করে ক্যাপসুল খাওয়াতে হয় এমনটাই পছন্দ করেছিলাম। কারণ দিনে দু-বেলা তিন বেলা নিয়ম করে একে ওষুধ খাওয়ানো আমার পক্ষে সম্ভব না। আর একে ওষুধ দিয়ে এলে এ যে নিয়ম করে খাবে না এটা জানার বাকী নেই।

অন্য এক কাজে ব্যস্ত এমন সময় একজন হন্তদন্ত হয়ে তাড়া দিলেন।  ট্রেন থেকে নাকি একজনকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাড়া দেওয়া মানুষটার উপর বিরক্ত হইনি এটা বুকে হাত দিয়ে অস্বীকার করতে পারি না। কেন রে বাপু, এর একটা গতি করলে তোমাদের আটকাচ্ছে কে! আমি গদাইলস্করি চালে হেলেদুলে হাঁটছি। হাঁটব না কোন দুঃখে? আমার ভেতরের পশুটা সব সময় ঘুমায় বুঝি? এ জেগে উঠবে না এমন দিব্যি কে দিয়েছে! সে মানে, আমি চাচ্ছি কেউ-না-কেউ এর একটা সুরাহা করুক আর এই জটিলতা থেকে আমি বেঁচে যাই।

স্টেশনে গিয়ে যেটা দেখলাম ওয়াল্লা, এখানে দেখি ইশকুল খুইলাছে রে মাওলা-ইশকুল খুইলাছে টাইপের অবস্থা। শত-শত মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে্ মানুষের মাথার জন্য পড়ে থাকা মানুষটাকে আমি ভাল করে দেখতে পাচ্ছি না। কেবল যেটা চোখে পড়ল রক্তে স্টেশেনর মেঝে ভেসে যাচ্ছে।
মাথা-মাথা একাকার। অবশ্য এটা আমাকে খুব একটা বিস্মিত করে না কারণ মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান, টু, থ্রি বললেই বিশ-পঞ্চাশ জন জমে যায় আর এখানে একজন জলজ্যান্ত মানুষ পড়ে আছে এমন তামাশা কী হররোজ দেখা মেলে?

যে মানুষটা আমাকে তাড়া দিয়েছিলেন তাকে আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, একে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা না-করে আমাকে খবর দিলা কোন বুদ্ধিতে?
সে বলল, পাবলিক কেউ তো আগায় না
আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি পুলিশের সহায়তা ব্যতীত এমন কারও জন্য কিছু করার চেষ্টা পরবর্তীতে অনেক জটিলতা দেখা দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
ওখানে অন্যদের সঙ্গে আনসাররাও (এরা রেলপুলিশের সঙ্গেই কাজ করেন) ছিলেন। এদের একজনকে বললাম, আমি একটা রিকশা প্ল্যাটফর্মের ভেতর নিয়ে আসছি আপিনি একে নিয়ে হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে যান
ওই আনসার বললেন, হাসপাতালে নিলে ভর্তি করবে তো?
আমি হড়বড় করে বললাম, আপনি একে নিয়ে কেবল হাসপাতালে পৌঁছে দেন বাকীটা আমি দেখছি
ওই আনসার এবং আরেকজন সদাশয় মানুষকে পাওয়া গেল যিনি মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটাকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে রিকশায় ওই আনসারের সঙ্গে হাসপাতালে গেলেন। পরে অবশ্য ওই সদাশয় মানুষটাকে পাইনি!

যাই হোক, হাসপাতারের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর মানুষটার চিকিসা শুরু হয়।
তাড়াহুড়োর মধ্যে মানুষটার ঘটনাটা শুনতে পারিনি এখন ছাড়া-ছাড়া ভাবে জানলাম। এই মানুষটা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করছিলেন। দিন-দুপুরে কয়েকজন এর মোবাইল ফোন কেড়ে একে ছাদ থেকে ফেলে দেয়।
আমি যেটা নিয়ে আতংকিত ছিলাম ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার কারণে এই‌ মানুষটার কোনও-না-কোনও হাড় ভেঙ্গেছে এতে কোনও সন্দেহ নেই। এটা নিশ্চিত হএয়ার জন্য একটা এক্স-রে করা আবশ্যক। এই হাসপাতালে বিগত বিশ বছর ধরে এক্স-রে মেশিন নষ্ট। এমন একজন মানুষকে নিয়ে বাইরে থেকে এক্স-রে করাটা যে কতটা কঠিন এটা ভুক্তভোগী ব্যতীত অন্য কেউ বুঝবে না। যাক গে, সেটাও হলো। আমার বিস্ময়ের শেষ নেই- মানুষটার অপার সৌভাগ্য হাড় ভাঙ্গা দুরের কথা একটু চিড়ও ধরেনি! খেটে খাওয়া মানুষের শক্তপোক্ত শরীর।

মোস্তফা নামের এই মানুষটার বাড়ি ঝিনাইদহ। এই মানুষটার ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে তবুও আমি আশাবাদী কোনও-না-কোনও সূত্র ধরে এই মানুষটার একটা গতি হবে। হতেই হবে। ফাজলামী নাকি! একটা মানুষ তো কেবল একটা সংখ্যা না- একজন মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার নামের অনেকগুলো মানুষ। নথ-নাড়া গ্রাম্য বধু, ছোট্ট-ছোট্ট রেশমি চুড়ি পরা বালিকা, দুরন্ত বালক, খকখক করে কাশতে থাকা বুড়া-বুড়ি নামের বাবা-মা।

পুরো সময়টা মোস্তাফিজ নামের এই আনসার সদস্য গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্বতঃস্ফুর্ত ভঙ্গিতে জড়িত ছিলেন যেটা আমাকে অভিভূত করেছে। আসলে আমাদের সবার মধ্যে ভাল হওয়ার ইচ্ছাটা প্রবল কেবল খানিকটা সুযোগের অপেক্ষা। আর এভাবেই সবাইকে ছাড়িয়ে একজন মোস্তাফিজ হযে যান নায়ক।    

No comments: