My Blog List

Wednesday, October 10, 2012

ছুক্কুর-ছুক্কুর মৈমনসিং, ঢাকা যাইতে কত দিন

­'ছুক্কুর-ছুক্কুর মৈমনসিং, ঢাকা যাইতে কত দিন'। বালকবেলায় কারও কারও মুখে এটা শুনতাম। কবে, কেন, কেমন করে এটা চালু হল বা কারা-কারা চালু করে এটাকে গড়িয়ে দেওয়ার পেছনে ছিল; জানি না। হয়তো তখন ময়মনসিং থেকে ঢাকা যাওয়াটা সময়সাপেক্ষ একটা ব্যাপার ছিল। আগে ট্রেনেরও কিছু নিয়মকানুন ছিল দেখতাম কোথায়-কোথায় কি কি ট্রেন যেন অদলবদল করার প্রয়োজন দেখা দিত। এটা আবার সব জায়গায় সম্ভব ছিল না, কেবল জংশন নামধারী স্টেশনেই। তাই জংশনের আলাদা একটা মর্যাদা ছিল। এই মর্যাদা ছিল আখাউড়া জংশন নামের স্টেশনটারও- কালে কালে আখাউড়া জং হয়ে গেল।
যাগ গে, ছুক্কুর-ছুক্কুর মৈমনসিং, ঢাকা যাইতে কত দিন? হয়তো কেউ তিতিবিরক্ত হয়েই এটা চালু করেছিল।


আচ্ছা এটা তো গেল ওকালের ঢাকা-ময়মনসিং-এর কাহিনি। একালের ঢাকা-রামুর কাহিনি কী! ঢাকা থেকে রামুতে যেতে কয়দিন লাগে? না-না, 'পায়দাল', হেঁটে না; হাওয়াই জাহাজ টাইপের কিছু একটাতে চড়ে গেলে? ধরুন, হেলিকপ্টারে?
আমি নিজে হেলিকপ্টারে কখনও উঠিনি তো তাই এই বিষয়ে খোলাসা করে বিস্তারিত বলতে পারছি না বলেই জনে জনে জিজ্ঞাসা করছি। আমি এটাও জানি না হেলিকপ্টারে সিট না পেলে কি ঢেড়িয়ে-ঢেড়িয়ে (দুঃখিত, গিলটি মিয়ার ভাষায় ঢেড়িয়ে ঢেড়িয়ে বলে ফেলেছি), দাঁড়িয়ে যাওয়ার নিয়ম আছে কি না। নিয়ম না-থাকলে তো সর্বনাশ! চালু অবস্থায় কে-না-কে কোথায়-না-কোথায় নাবিয়ে দেয় তাহলে তো মহা মুশকিল।

ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে রামু যেতে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নয় দিন সময় লেগেছে। ন-য় দি-ন! অথচ প্রবাস থেকে ফিরে, (প্রয়োজন হলে সফর সংক্ষিপ্ত করে) যত দ্রুত সম্ভব, সম্ভব হলে নয় ঘন্টার মধ্যেই তাঁর ওখানে যাওয়া সমীচীন ছিল। এ সত্য, এটা আমার জানার উপায় নেই, এরমধ্যে তাঁর কি কি অতি জরুরি কাজ ছিল যে তিনি নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। কিন্তু আমার মতে, এমতাবস্থায় ওখানে যাওয়ার চেয়ে জরুরি কাজ আর কিছু হতে পারে না, কিছুই না।
কারণ এদিকে আমরা ১৬ কোটি মানুষ যে নগ্ন হয়ে পড়েছি, স্রেফ উলঙ্গ। কী হাহাকার করা এক দৃশ্য! একচিলতে কাপড়ের জন্য আমরা এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। কোথায় কাপড় সবই তো আগুনের ছাই!

আহ, আর আমাদের বিরোধিদলের নেত্রী, প্রবল আশা, তিনি ৯০ দিনের ভেতরে যাবেন, ইনশাল্লাহ। শুনতে পাই তিনি নাকি কোথায় কোথায় আগুন বর্ষণ করছেন। এ আগুন কাউকে পোড়ায় না, এ কথার আগুন। (আজ পত্রিকায় দেখলাম চিনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তিনি নাকি 'সাপ-ব্যাঙ' খাচ্ছেন)

তারপরও আমি বলব, প্রধানমন্ত্রীর যাওয়াটা অসম্ভব এক ইতিবাচক দিক। অবশ্য প্রচুর সু-উদাহরণের পাশাপাশি কু-উদাহরণও আছে।
সু-উদাহরণ, ১: প্রধানমন্ত্রীর 'চামুচ বাহিনি' যখন শেখ হাসিনা এগিয়ে যাও...বলে শ্লোগান দেয়া শুরু করে তখন তিনি তাদের থামিয়ে দেন। আহা, সব ক্ষেত্রেই তিনি যদি তাঁর সোনার ছেলেদের থামিয়ে দিতেন! কারণ এই চামুচ বাহিনিই নেতাদের ডোবায়।
ইয়ে, রামুতে এরা যে বলছিল, শেখ হাসিনা এগিয়ে চল। আরে ব্যাটা চামুচ, চারদিকে পাহাড় এগুতে এগুতে অবশেষে এগিয়ে যাবেনটা কোথায়, শুনি? 

সু-উদাহরণ, ২: প্রধানমন্ত্রীকে যখন বক্তব্য রাখার জন্য বলা হলে তখন তিনি নিজে না-বলে সত্যপ্রিয় মহাথেরকে অনুরোধ করেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার জন্য। কেবল মুগ্ধতা! 

সু-উদাহরণ, ৩: সত্যপ্রিয় মহাথের এবং এরপর বক্তব্য রাখেন ইমাম সালাহউদ্দিন তারেক। এই দুইজন বক্তব্য রাখার সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের পাশে দাঁড়ানো ছিলেন। আবারও মুগ্ধতা! 
একটা শিক্ষিত জাতির নেতার তো এমনটাই হওয়া উচিত। আমরা সাধারণ মানুষেরা তো সব সময়ই চাইব নেতাদের কাছ থেকে শেখার জন্য। অনেকে বলবেন, আহা, প্রটোকলের একটা বিষয় আছে না। আরে রাখেন মিয়া প্রটোকল, প্রটোকল তো আর আসমানি কিতাব না। 

কু-উদাহরণ, ১: আগেই বলেছি। ঢাকা থেকে রামু হেঁটে গেলেও নয় দিন লাগার কথা না। 

কু-উদাহরণ, ২: অন্য একটি দলের সাংসদকে উদ্দেশ্য করে তিনি যে বক্তব্য রেখেছেন এর আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না, বাহুল্য মাত্র। এই সংসদ সদস্য জড়িত, কি জড়িত না এটা এখানে আলোচ্য বিষয় না। এটা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে এলেই হত।
এটা আমাদের অতি পুরনো অভ্যাস, তদন্তের পূর্বেই আমরা একগাদা কথা বলে দেই। কখনও এত দ্রুত বলি যা বাতাসকে হার মানিয়ে দেয়!

অবস্থাদৃষ্টে আমার তো মনে হচ্ছে ওখানে কে যে জড়িত ছিল না এটাই বলা মুশকিল। আমার এও মনে হচ্ছে, আমি নিজেই নিজের এলিবাই চেক করে দেখি। আমি এটাও বিশ্বাস করতে পারছি না আমি নিজেই ওখানে জড়িত ছিলাম না।
বাস্তবে দেখা যাবে আমরা এর ওর গায়ে নোংরা ছিটাচ্ছি অথচ এর যে আসল জনক তার ... কেশও স্পর্শ করা দূরে থাকুক, জনকের অবয়বটা আমাদের কল্পনাতেও নাই। দেখা গেল, আমরা কেবলই দাবার গুটি, আসল খেলাটা খেলছে তো কাসপারভ। ওই ব্যাটার মুখখানি এমনিতেই লাল, চটে আরও আগুন-লাল হয়ে আছে যে। রসো, এ তো খুব একটা জটিল কোনো আঁক না যে আমরা ভুলে বসে আছি কখন কোন সাহেবকে চটিয়েছি, কার টাই ধরে টেনেছি। 

কু-উদাহরণ, ৩: ক্ষীণ আশা নিয়ে ছিলাম। যাদের বেতন আসে আমাদের ট্যাক্সের টাকায়, এসি-ডিসি-ওসি-সরকারের অন্য সব বাহিনি; এদেরকে তোপের মুখে দাঁড় করানো হবে। কিসের কী! কেবল ওসিকে বদলি করা হয়েছে জানি। তা অন্যদের গতি কি? এই একটা দেশ এখানে রক্তের বন্যা বইয়ে দিলেও পুলিশ-টুলিশকে বদলি করে আচ্ছা করে শাস্তি দেয়া হয়। এরা পুলিশ লাইনে কিছুটা সময় ভুঁড়ি ভাসিয়ে ঘুষ-ঘাস দিয়ে আবারও কোথাও-না-কোথাও দায়িত্ব গ্রহন করে। প্রায়শ, পূর্বের চেয়ে ভাল পোস্টিং হয়! 'কলাগাছ কাটতে কাটতে ডাকাত' আর এরা 'বদলিগাছ' কাটতে কাটতে ভয়ংকার সরকারি ডাকাত হয়ে উঠে। 
আশ্চর্য, ওই ওসিকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি! ওখানকার পুলিশ সুপার-ডিসি সাহেব কি এখনও বহাল তবিয়তে? চার-পাঁচ ঘন্টা সময় পাওয়ার পরও এরা তখন কি করছিলেন? এই প্রশ্নের কাঠগড়ায় এদেরকে এখনও দাঁড় করানো হয়নি কেন? বেশ তো, ওই সময়টা এরা ঘুমিয়ে থাকলে, এদের চাকুরিচ্যুত করে আরাম করে ঘুমাবার সুযোগ করে না-দেয়াটাই হবে অসমীচীন।

ছবি ঋণ: coxsbazarnews
ছবি ঋণ: coxsbazarnews
ছবি ঋণ: coxsbazarnews
আচ্ছা, এরা কারা? ইসলামি জঙ্গি?
আমি আবারও উল্লেখ করতে চাই, কারা কারা ওখানে ছিল এটা জিগেস না-করে এটা জিগেস করলে ভাল হয় কারা কারা ওখানে ছিল না। নেমে এসেছিল পঙ্গপালের মত পিলপিল করে হাজার-হাজার মানুষ। নেমে এসেছিল এটা আসলে ভুল বললাম। আক্ষরিক অর্থে এরা তো আর পঙ্গপাল না যে আকাশ থেকে নেমে আসবে।
এরাই আমরা-আমরাই এরা। এটাই আমাদের প্রকৃত রূপ। ১৯৭১ সালে আমি আমার শিক্ষককে দেখেছি লুটপাট করতে- আমি তো তারই ছাত্র! আসলে আমাদের কাছে আছে হরেক রকমের মুখোশ- লাল মুখোশ, নীল মুখোশ, হরেক রঙের মুখোশ। ওদিন আমাদের মুখোশ সরে গিয়েছিল, এই যা।

এদেরকে আটকাবার জন্য কেবল পুলিশের উপর ভরসা করা, হাহ! পুলিশের অনেককে দেখেছি এখনও থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল (এই জিনিসগুলো আমার মত সংগ্রাহকদের কাছে কেজি দরে বিক্রি করে দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে) ব্যবহার করতে। এই পঙ্গপালের বিরুদ্ধে এদেরকে লড়াইয়ে নামাবার চিন্তাটা হচ্ছে গুলতি দিয়ে ডাইনোসরকে আটকাবার চেষ্টা করা। কিন্তু ওখানে সামরিক-আধা সামরিক বাহিনির যত লোকজন আছে এরা কী করছিল? এরা যদি একজন অন্যজনের গায়ে গা লাগিয়েও দাঁড়াত তাহলেও রামুকে ঘিরে ফেলা সম্ভব ছিল। বাড়িয়ে বলছি না, সত্যিই।

কি বললেন, কমান্ড? ওহো, এটা তো আমরা ট্যাক্সপেয়িদের জানার আগ্রই নেই কে কাকে কমান্ড করবে। আমরা তো বেতনভুক্ত কর্মচারি, চাকর না যে এই সব নিয়ে ভেবে ভেবে সারা হব। আমরা আমাদের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় এদের ভরণপোষণ করি কেবল যুদ্ধ করার জন্য? আরে না। ২০৯৯ সালে যুদ্ধ বাঁধার আগ-পর্যন্ত আমরা এদেরকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াব বুঝি! পাগল!
আমরা কেবল চাইব এরা কেবল যুদ্ধই করবে না, নগ্ন আমাদের গায়ের কাপড়টুকুও সমুন্নত রাখবে। কাপড়টা কোন বাজারে বিক্রি হয়, কোন দর্জি সেলাবে, কে ধৌত করবে এইসব তো আমাদের মাথাব্যথা না।

প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকেও সাধুবাদ। অনুদান হিসাবে আপাতত এখানে চার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। বিহার ও মন্দির নির্মাণের দায়িত্বে থাকবে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী থাকার বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন, সত্যপ্রিয় মহাথের।
সু-উদ্যোগ কিন্তু শত-শত কোটি টাকা খরচ করেই কি ৩০০ বছরের সভ্যতা ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব! হাজার কোটি টাকা খরচ করেও কি ফিরিয়ে দেয়া যাবে হারানো সেই বিশ্বাস?

আমি পূর্বের লেখায় উল্লেখ করেছিলাম, আমরা যারা পোড়া ত্রিপিটক দেখে উল্লাস করছি [১] ...। এই কারণে সম্ভবত, বৌদ্ধরা এই দেশের জনসংখ্যার এক শতাংশও না। আমরা কি ভুলে গেছি এই বৌদ্ধরাই এই বাংলা চারশ বছর শাসন করেছে।
"...প্রায় একশ বছরের অরাজকতার (যাকে মাৎসন্যায় পর্ব বলে অভিহিত করা হয়) শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশ বাংলার অধিকাংশের অধিকারী হয়, এবং চারশ বছর ধরে শাসন করে। [২]

আমরা একটু শেকড়ের কাছে ফিরে যাই। যে বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের গৌরবের শেষ নেই সেই ভাষার শেকড় কোথায়? আহমদ ছফার [৩] মুখ থেকে শুনি:
"...বাংলা সাহিত্যের বিপ্লব, গৌতম বুদ্ধের ভাষা বিপ্লব। গৌতম বুদ্ধকে আমি ভাষা বিপ্লবী বলি। তিনিই বাংলা ভাষার প্রথম ভাষা সৈনিক। পালি ভাষায় ত্রিপটক রচনা করে তিনি সংস্কৃত ভাষার গ্রাস হতে সদ্যজাত ভাষা বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন। নইলে বাংলা বলে কোন ভাষা আমরা পেতাম না। এরপর বায়ান্ন সাল আসল...।"

ভাল কথা, অহিংস বৌদ্ধদের সঙ্গে আমাদের সমস্যাটা কোথায়? আমরা কি চাচ্ছি এঁরাও আমাদের মত হয়ে যাক। নাকি অন্য দেশের বৌদ্ধরা ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠছে বলে আমাদের কাছে পাকা খবর আছে। তাই কি আমরাও চাচ্ছি এরা ওরকম না হলেও অন্তত আমাদের মত হোক। এই দেশে সবাই কি আমাদের মত হয়ে যাবে- সব কলাগাছ, অন্য গাছের বালাই নেই!
আসলে আমরা কি চাচ্ছি, এটা আমরা নিজেরাও জানি না। আপাতত ব্যস্ত। মুখে মুখোশ এবং নগ্নতা ঢাকার জন্য কাপড় খুঁজতেই ভারী ব্যস্ত...।

*ছবিগুলো নেয়া হয়েছে, http://coxsbazarnews.net/?p=12953 থেকে। তাঁদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
সহায়ক সূত্র:
১. রামু: http://www.ali-mahmed.com/2012/10/blog-post.html
২. উইকি: http://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6
৩. ছফা: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_25.html    

1 comment:

s m mursalin said...

পাঠক হিসেবে লেখাটা পড়ুন এবং দেখুন এতোদিন কিভাবে আমাদের বঞ্চিত করেছেন। ছোট হোক আরো ছোট দীর্ঘ দিনের শীত-নিদ্রা।