Monday, December 5, 2011

হাসপাতাল পর্ব, ছয়: রক্তের দাগ

জরুরি একটা বিষয় ভুলে গেছি। অপারেশনের জন্য রক্ত প্রয়োজন। আমার মার রক্তের গ্রুপ হচ্ছে 'বি পজেটিভ'।
আমি দিতে পারব না কারণ আমার 'এবি পজেটিভ।' বাঁচোয়া, আমার বোনের 'বি পজেটিভ'। কিন্তু আরও রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। আবার কোথায় কোথায় গিয়ে রক্ত খুঁজব। এখানেও মিরাকল। সিনেমার মত অনেকটা। সাদিক বাংলায় যা বলল বলিউডের ভাষায় অনুবাদ করলে দাঁড়াবে,
'ম্যায় হু না'। সাদিকের বি পজিটিভ।

রক্তের প্রুপ মিলে গেলেই হয় না একজনের সঙ্গে অন্যজনের ম্যাচ করার কিছু নিয়ম-কানুন আছে। বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নাই। সব ব্যবস্থাই আছে এখানে। সুবিধাগুলো দেখে আমি মুগ্ধ! কিন্তু ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি হলো। ঝড়-ঝাপটার অনেকটা যাচ্ছিল আমার বোনটার উপর দিয়ে, এ এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে হাসপাতালের লোকজনেরা সাফ না-করে দিল, এর রক্ত নেয়া যাবে না।
সাদিক ব্যতীত আর উপায় কী!
সাদিক যখন রক্ত দিচ্ছিল তাঁর বউ জবুথুবু হয়ে পাশে বসা। এরা জানেও না কখন আমি এদের ছবি তুলে ফেলেছি। কারণ আমি ছিলাম বাইরে। অনুমতি না-নিয়ে ছবি উঠানো, প্রকাশ করে দেয়াটা নৈতিকতার পর্যায়ে পড়ে না। তাতে আমার বয়েই গেছে!

কোন শ্লা বলে, আমি নৈতিকতা ধুয়ে খাওয়া একজন মানুষ!

কিছু বুরবাক বিষয়টা বুঝবেই না। অন্যদের কাছে বিষয়টা যতোটা সহজ, আমার কাছে না। আমার কাছে এর আবেদন অন্য রকম। এর রক্ত আমার মার শরীরে প্রবাহিত হবে। এক সময় এই রক্ত থাকবে না, হয়তো আমার মাও থাকবেন না কিন্তু রক্তের দাগটা থেকে যাবে!
ভাগ্যিস, ছবি উঠাবার সময় চোখ কোন কাজে লাগে না নইলে আমি নিশ্চিত ছবিটা ঘোলাটে আসত। অন্য রকম বলেই আমার মত কঠিন একজন মানুষের চোখে জল!

অভাগা আর কাকে বলে, আমরা ভাই-বোন কেউই আমাদের মাকে রক্ত দিতে পারলাম না। এই নিয়ে আমার বোনটার মন খারাপ, অসম্ভব খারাপ। আমি মানুষটা বড়ো বিচিত্র, অপদার্থ টাইপের মানুষ! আমি এই নিয়ে মোটেও কাতর হচ্ছি না, ভাবতে চাচ্ছি না। আমার কেবল মনে হচ্ছিল, পর্দার আড়াল থেকে কেউ আমার সঙ্গে একটা খেলা খেলছে। কোনো একটা রসিকতা করছে। আহা, খেলাটা একতরফা হলে তো মুশকিল।
ঠিক দু-দিন পর অন্য রকম এক শোধ নিয়েছিলাম। হাসপাতালেই একটা মেয়ের টিউমার অপারেশন হয়েছিল। ১১ কেজির টিউমার! অনার্স পড়ুয়া এই মেয়েটার পরিবারের লোকজনেরা এলাকায় মুখ দেখাতে পারছিলেন না। কারণ এলাকায় অযথা গুজব ছড়িয়ে গিয়েছিল, অবিবাহিত মেয়েটার বাচ্চা হবে। অপারেশনটা অতি জরুরি ছিল, এরা পাগলের মত এবি পজেটিভ রক্ত খুঁজছিলেন। কপাল, আমার আবার এবি পজিটিভ!

যাই হোক, আমার মার বেলায় আবারও তাহলে সমস্যা হয়ে গেল। অণ্তত আরেক ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা হাতে রাখতে হবে মানে হাতের নাগালে অন্তত আরেকজন ডোনার রাখতে হবে। কী করি? আবারও সিনেমা।
ঠিক ওই মুহূর্তে আমার একজন সুহৃদ, জাকির, ফোন করেন। তাঁর জানার কথা না আমি ঢাকায়। সব শুনে মানুষটা বললেন, আমার বি পজেটিভ। অপারেশন শুরু করতে বলেন, আমি চলে আসছি। মানুষটা ঝড়ের গতিতে চলে আসে।
আজিব, এ আরেক বিচিত্র চরিত্র। দেখা যাবে মাসের পর মাস খোঁজ নাই। হঠাৎ যোগাযোগ, ফোন। আগেও দেখেছি, আমার বিপদে কেমন করে ...-এর মত ঠিক শুঁকে শুঁকে চলে আসে।

জীবনটা সিনেমা না নইলে সিনেমার মত ঘটনাটা ঘটত। অপারেশন থিয়েটারের বাইরের লাল আলো নিভে যেত। ডাক্তার সাহেব হাসিমুখে বের হয়ে এসে বলতেন, অপারেশন সাকসেসফুল। এরকম কিছু ঘটল না কিন্তু আমরা জেনে গেলাম অপারেশ ভালভাবেই শেষ হয়েছে। আমার মাকে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। আমার বোনটা হাউমাউ করে কাঁদছে। আনন্দের কান্না।

আমি বিড়বিড় করি যা আমার নিজের কাছেই স্পষ্ট না। পর্দার আড়াল থেকে কেউ একজন আমাকে একের পর এক চমক দিয়ে যাচ্ছে। আমি পর্দা সরিয়ে দেখার চেষ্টা করি। কী দেখব, ওখানে যে নিকষ অন্ধকার- কে কবে দেখতে পেয়েছে...।

হাসপাতাল পর্ব, পাঁচ: অপেক্ষা: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_03.html 

**সবগুলো পর্ব: http://tinyurl.com/boya6xk       

No comments: