Saturday, December 3, 2011

হাসপাতাল পর্ব, পাঁচ: অপেক্ষা!

আমার বড় ঘুম পাচ্ছিল। তীব্র দুশ্চিন্তা এখন আর তেমন কাবু করতে পারছে না। এদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে আমি হাত-পা ঝাড়া!
ঈদের ছুটি তখনও শেষ হয়নি। ঢাকার রাস্তা-ঘাট ফাঁকা-ফাঁকা। কুৎসিত ঢাকার মধ্যে এখন একটা আদর্শ শহর-শহর ভাব চলে এসেছে। একটা শহরেরও হয়তো আনন্দিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে- অনুমান করতে দোষ কোথায় ঢাকা এখন সুতীব্র আনন্দে ভাসছে। এ সত্য, ঢাকা শহর বুঝে গেছে এ ক্ষণিকের আনন্দ, তার সন্তানেরা তাকে আনন্দে থাকতে দেবে না। আবারও যেই কে সেই- স্বভাব যায় না মলে ইল্লত যায় না ধুলে।

ন্যাশনাল হাসপাতালে যখন পৌঁছলাম
তখন সম্ভবত সাড়ে বারো, একটা বাজে। এখানে আমার তেমন কোন কাজ নেই! সব এঁরাই করছে। 'ওই ডাক্তার' নামের মানুষটাকে দেখে আমার মায়াই লাগছিল। আহা, বেচারি এদিক-ওদিক কেমন ছুটে বেড়াচ্ছে। এতোটা কাল এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য অন্য রোগিদেরকে এখানে-ওখানে যাওয়ার জন্য উপদেশ দিয়েছে আজ সেই উপদেশই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন নিজেকে টেনিস বলের লাফাতে-গড়াতে হচ্ছে। একে ধরছে তো ওকে- এই ডাক্তারকে ধরছে তো ওই ডাক্তারকে।

এঁর সঙ্গে যোগ হয়েছেন ডাঃ গুলজার। এবং যথারীতি তাঁর ফোন। এই মানুষটা যেন কাকে কাকে অনবরত ফোন করেই যাচ্ছেন। এই মানুষটার এই দেশের কার কার সঙ্গে হৃদ্যতা নাই এটা একটা গবেষণার বিষয়! ফোনের পর ফোন করার কারণ আছে। ঈদের ছুটির কারণে হাসপাতাল ঝিমাচ্ছে। সবার মধ্যেই গা-ছাড়া ভাব। এমতাবস্থায় এমন এক জটিল রোগি নিয়ে এরা বিপাকে। হাসপাতালের বেচারারা, আমাদেরকে হাঁকিয়ে দেয়ার কোন উপায় আপাতত এদের নাই।
যিনি অপারেশ করবেন, ডাঃ রাজন তিনি সানন্দে রাজি। এই মানুষটা সম্বন্ধে আমি পরেও শুনেছি এমন কিছু ডাঃ দেশে থাকলে নাকি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাটাই পাল্টে যেত। কিন্তু অন্যরা ঝামেলা পাকাচ্ছেন।

এনেসথেটিস্ট ভদ্রলোক গড়িমসি করছেন। কারণ আছে এটা একটা জটিল অপারেশন তার উপর রোগির বয়স অপারেশনের অনুকূলে না। এনেসথেটিস্টের দায়িত্ব বিশাল, একটু এদিক-সেদিক হলে এই রোগীর হয়তো আর জ্ঞান ফিরবে না। পুরো চোটটা যাবে এঁর উপর। 'ওই ডাক্তার' এবং গুলজার মিলে ভদ্রলোক কাবু করার চেষ্টা করছেন। এঁরা আস্তিনে লুকানো অস্ত্র একের পর ছুঁড়ে দিচ্ছেন। শেষে এনেসথেটিস্ট ভদ্রলোক এই শর্তে রাজি হলেন রোগীর ইকোকার্ডিওগ্রাফি ভাল আসলে তাঁর আপত্তি নাই। তাঁর সম্ভবত ধারণা ছিল ইকোতে একটা ভজকট হবেই- বয়স বলে কথা। তাহলে তিনিও বেঁচে যান। আমাদেরও বলার আর যো থাকে না।

এইবার আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। এই-রে, এইবার সম্ভবত আটকে গেলাম কারণ ইকোকার্ডিওগ্রাফিটা ভাল না-আসলে তখন আর করার, বলার কিছুই থাকবে না। কিন্তু অপারেশনটা যে জরুরি, না-করে উপায় নাই!

আগের বেসরকারি হাসপাতাল ক্রিসেন্টে থাকলে এই ইকোকার্ডিওগ্রাফি করার জন্য আমাকে রোগী বাইরে নিয়ে যেতে হতো। এমন রোগীর পক্ষে যা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। অথচ এই হাসপাতালেই এটা পানির মত সহজ।

কিন্তু সমস্যা দাঁড়াল, ইকো যিনি করবেন, ডাঃ নাগ, তিনি লাঞ্চে চলে গেছেন। আজ যদি ইকো না-করা যায় তাহলে আজ অপারেশন হবে না। আমার বড়ো অস্থির লাগছিল কারণ একদিন অপেক্ষা করার মত সময় আমার নাই! যদিও এটা আমার জানতে বাকী নাই এটা একটা জুয়া। এই অবস্থার রোগির ওটিতে মৃত্যু হলে অবাক হওয়ার কিছু নাই। আমাকে আগেও বলা হয়েছিল, সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি! তবুও এই জুয়াটা আমাকে খেলতেই হবে। পাশা বিছানো হয়ে গেছে এখন দান নিয়ে ভাবার অবকাশ কই!

কিন্তু ইকোটা না-করলে যে এনেসথেটিস্টকে যে রাজী করানো যাবে না। এখানেও আবার ডাঃ সাদিয়া। তিনি কেমন কেমন করে এই অসাধ্য সাধন করলেন। ডাঃ নাগকে অনুরোধ করে আবারও হাসপাতালে নিয়ে আসলেন।
ইকো করা হলো। 'ইকো' করার পর দেখা গেল, রোগীর অবস্থা ভালই।

এ আরেক মিরাকল! আমার বিস্ময়ের সীমা নেই! মাত্র তিন ঘন্টায় একের পর এক অসাধ্য সাধন, চারটার দিকে অপারেশন শুরু হলো। সার্জন রাজনের সঙ্গে যোগ দিলেন 'ওই ডাক্তার', বিশেষ অনুমতিতে থাকলেন ডাঃ গুলজার। অপারেশন চলছে।
আধ ঘন্টা-এক ঘন্টা-দুই ঘন্টা- তিন ঘন্টা! বুকে হাত দিয়ে বলি, আমার মধ্যে মোটেও তীব্র ভয় কাজ করছিল না কারণ আমার কাছের অন্তত দু-জন মানুষ আমার মার পাশে আছেন যাদের কাছে এই রোগি কেবল একটা সাবজেক্ট না। কারও মা...।
আমার মার অসম্ভব ভাগ্য, তিনি কাছের দু-জন ডাক্তার পেয়েছিলেন যারা সার্বক্ষণিক তাঁর সাথে ছিলেন। এই পোড়া দেশে এমন ভাগ্য ক-জনের হয়! 

খানিক পর পর ডাঃ গুলজার এটা-সেটা জানিয়ে যাচ্ছেন। নইলে এই দীর্ঘ সময়ে উৎকন্ঠায় দমবন্ধ হয়ে আসত। আমার নিজেকে বড়ো নির্ভার-ভারহীন লাগছিল। মাত্রা কী ছাড়িয়ে গিয়েছিল? জানি না! একবার তো সাদিক আমাকে ধমক দিলেন, 'আশ্চর্য, আপনি বুঝতে পারছেন না অপারেশন চলছে'!
সাদিক কী আর বুঝবে যারা অসম্ভব প্রিয় মানুষকে নিয়ে জুয়া খেলে এদের কি আর ভয়ে কাবু হলে চলে?

চার ঘন্টা, ঝাড়া চার ঘন্টা ধরে অপারেশ চলছিল। সেসময়টায় আমার কিছুই করার ছিল না।
তবে কেবল মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল মার কাছ থেকে যে বিদায় নেয়া হয়নি, ইচ্ছা করেই। কারণ আমি কোন প্রকারেই চাচ্ছিলাম না তিনি আমার চোখের ভাষা পড়ে ফেলেন, এক আতংকিত জুয়াড়ির চোখ। তাঁর মধ্যে ভয়টা যেন সংক্রমিত না-হয়, কারণ এটাই আমার টেক্কা। এই একটাই তাশ।

পুরনো এক লেখায়, 'মার কাছে ফেরা' [১], "...যে মায়াভরা মুখটা কেবল অনর্থক বকেই মরত, খোকা এইটা খাস নে-ওইটা খাস নে। রোদে ঘুরতাছিস ক্যান রে, বান্দর"...! 
আহ, সেই মুখ! সেই মায়াভরা মুখটা আমি কি আবারও দেখব, নাকি নিথর? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

এখন কেবল অপেক্ষা...।

* হাসপাতাল পর্ব, চার: ভারহীন: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post.html

**সবগুলো পর্ব: http://tinyurl.com/boya6xk

সহায়ক সূত্র:
১. মার কাছে ফেরা: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_9329.html     

2 comments:

Anonymous said...

ali bhai,
my respect and salam for departed soul of your mother. dr Nag is my classmate.

।আলী মাহমেদ। ali mahmed । said...

ধন্যবাদ আপনাকে। আমার মার জন্য আপনার মত একজন ভাল মানুষের দোয়া বড়ো প্রয়োজন।

সবাই বলে আমি নাকি একজন 'হার্টলেস'! কোনো দিন আমার সমস্যা হলে সোজা আপনার টেবিলে শুয়ে পড়ব। তখন একটু খুঁজে দেখবেন তো এককিনি হার্টও খুঁজে পাওয়া যায় কি না @Anonymous ওরফে...