Thursday, December 1, 2011

হাসপাতাল পর্ব, চার: ভারহীন

আমি সাদিকের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সাদিক মোঃ আলম। আমি ঢাকা এসেছি এটা কাউকে জানাইনি, জানিয়েছিলাম কেবল সাদিককে। কারণ সাদিকের সঙ্গে আমার জরুরি প্রয়োজন ছিল। আমি সাদিকের কাছে কিছু টাকা পাই। এটা ঈদের পর আমাকে পাঠিয়ে দেয়ার কথা কিন্তু এটা এখন আমার জরুরি ভিক্তিতে প্রয়োজন, এখানেই, চিকিৎসার জন্য।

সাদিকের কাছে টাকা পাওয়ার গল্পটা বলি।
এটা হয়তো আর কখনো আলাদা করে বলা হয়ে উঠবে না। সাদিক হচ্ছে এক চলমান যন্ত্রণার (!) নাম- আনন্দময় যন্ত্রণা। এর মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় কেমন করে মানুষের কল্যাণ করা যায়। আমি কল্যাণ-ফল্যাণ বুঝি না কিন্তু এর সঙ্গে সানন্দে জড়িয়ে পড়ি। 'আমাদের ইশকুল'সহ অসংখ্য হাবিজাবি কাজে আমার যখনই টাকার প্রয়োজন হয় সাদিককে বলি। ও কোত্থেকে কোত্থেকে যেন টাকার যোগান দেয়। কে জানে, আধুনিক রবিনহুডের মত ডাকাতি-ফাকাতি করে কিনা।
যাই হোক, এবার কোরবানি ঈদের ঠিক দুই দিন আগে সাদিক জানায় ওর আমেরিকার কোন এক বন্ধু টাকা পাঠিয়েছে। এই টাকায় গরু কিনে মাংস বিলি করা সম্ভব কি না? টাকা ও পেয়ে গেছে কিন্তু যেহেতু ব্যাংক-ট্যাংক সব বন্ধ টাকাটা পাঠাবে ঈদের পর।

আমি ভেবে দেখলাম এই পদ্ধতি বড়ো সরল। আমি বললাম, "ঠিকাছে, তবে আমার নিজস্ব পদ্ধতিতে করব। রাজি থাকলে বলেন"।
বরাবরের মত সাদিক মাথা নাড়ে (ফোনে মাথা নাড়া দেখার ব্যবস্থা এখনও চালু হয়নি। এটা আমার অনুমান), বলে, "ঠিকাছে, আলহামদুলিল্লাহ। করেন"।
আমি ২০জন মানুষকে খুঁজে বের করলাম যারা কখনও কোরবানি দিতে পারেননি আবার এঁদের পক্ষে ঘুরে ঘুরে মানুষের বাসা থেকে মাংস যোগাড় করাও পক্ষে সম্ভব না। যেমন, এঁদের মধ্যে একজন আছেন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা (নামটা বলতে চাচ্ছি না)।
টাকা নিয়ে এঁরাই বাজারে গেছেন। পছন্দ করে গরু কিনেছেন। রাতে পাহারা দিয়ে দেখে রেখেছেন। গরুকে খাইয়েছেন। ইমাম সাহেব কোরবানি করার পর এঁরাই কেটেকুটে বিশ ভাগ করে যার যার বাসায় নিয়ে গেছেন।
ওখানে আমি ইচ্ছা করেই থাকিনি। ভীরু টাইপের মানুষ আমি- একে তো কাটাকাটি আমি দেখতে পারি না, তাছাড়া ওখানে আমার কী কাজ! স্মৃতিকাতর আমি কেবল গরুর দড়িটা নিয়ে এসেছিলাম।
সাদিক রসিক আছে। ও বলেছিল, "এই দড়ি দিয়া আপনে কী করবেন"!
আমি অম্লানবদনে বলেছিলাম, গলায় ফাঁস দেব।

মজা হয়েছিল তখন। গরুটার ছিল ওই মুক্তিযোদ্ধার বাসায়। আমি কেবল দেখতে গিয়েছিলাম। মানুষটার ছেলে-মেয়ের হইচই-এ কান পাতা দায়। "আব্বা গরু আনছে, আস্তা গরু, জেতা গরু, এইবার আমরা কোরবানি দিমু"।
আমি হাসি গোপন করে বলেছিলাম, "এই জন্য তো তোমাদের গরু দেখতে আসলাম"। আনন্দ সংক্রমিত হয় কিনা আমি জানি না কিন্তু আমি ওখানেই স্থির বিশ্বাসে বিড়বিড় করেছি, আগামি বছর বেঁচে থাকলে এই কাজটাই করব। পারলে অনেক বড়ো আকারে।

যেটা আমায় সবচেয়ে টেনেছিল। আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবকে এখানে আটকে ফেলেছিলাম। ইমাম সাহেবরা কেবল নামায পড়াবেন, কেন? এঁরা কী আর কোন কাজই করবেন না। এমনটা তো কথা ছিল না! আগের ইমামরা তো এমন ছিলেন না। মসজিদ কেবল নামায পড়ার জন্যই ব্যবহৃত হতো না। বিচার-আচার, সামাজিক দায়, যুদ্ধের পরিকল্পনা সবই এখানে হতো, ভাল সমস্ত কাজের কেন্দ্রস্থল ছিল মসজিদ।
ইমাম সাহেবদের মত মানুষেরা আমাকে পছন্দ করার কোনো কারণ নাই কিন্তু আমি হাল ছাড়ি না, লেগে থাকি। অবশেষে মানুষটাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছিলাম। এটাই আমার ভাললাগা। এই ইমাম সাহেব কেবল এই গরুটাই প্রথমে জবাই করেননি। কিনে এনেছেন তিনিই। ক্ষীণ হলেও ভয় তো ছিল, মারামারির সম্ভাবনা তো উড়িয়ে দেয়া যায় না। পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে তিনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। এই আনন্দ কাকে বলি।
সবাইকে কাজে লাগিয়ে আমি বাসায় ঘুমাই :), ফাঁকিবাজ মানুষের আর গতি কী!

মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে গেছি। তো, সাদিকের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ওই পাওনা টাকাটা এখন সাদিক নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি সাদিক অসম্ভব ভাল একটা খবর দিল। ওর পরিচিত একজন ডাক্তার ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইন্সটিটিউট হাসপাতালে আছেন। 'ওই ডাক্তার' ওখানকার একজন ডাক্তার, সার্জন রাজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি চাইলে ওখানে নাকি অপারেশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ভাল খবর কিন্তু আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। এখানে সমস্ত প্রস্তুতি শেষ কেবল টাকা জমা দেয়া এবং কাগজে সই করা বাকি। ডাক্তার-ওটি ঠিক করা হচ্ছে। কি করি-কি করি? এখন কী করি!

যে মিরাকলটার কথা বলছিলাম। ডাঃ গুলজার [১], মানুষটাকে নিয়ে এখানে আর বিস্তারিত বলি না। যে মানুষটা ঈদের ছুটিতে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ঠিক তখনই তিনিও এসে উপস্থিত। কী কাকতালীয়! পাঁচ-দশ মিনিট এদিক-সেদিক হলেই বিষয়টা দাঁড়াত অন্য রকম।
সাদিকের বক্তব্য শুনে তিনি আমাকে জোর দিয়ে বললেন, "আপনি এখান থেকে চলেন, এখনই। এটাই উত্তম। আপনি ন্যাশনালেই অপারেশনটা করেন- ওখানে 'ওই ডাক্তার' নামের সহৃদয় মানুষটা থাকছেন। এছাড়া খালাম্মার শরীরের যে অবস্থা, অপারেশনটা থেকে জরুরি হচ্ছে অপারেশন পরবর্তী যেসব জটিলতা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা আছে সেইসব সমস্যা সমাধান করার ব্যবস্থা। এই সুবিধা তো এখানে পাবেন না। তখন কী করবেন"?

আমি খানিক থমকে গেলাম। এটা সত্য, এই ক্রিসেন্ট গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল কিন্তু সব ব্যবস্থা তো এখানে নাই। আমি ভুলিনি, ডিজিটাল এক্স-রে করার জন্য আমাকে অন্যত্র যেতে হয়েছিল। তারচেয়ে জরুরি বিষয়, ডাঃ তৌহিদুল আলমের উপর আমি ভরসা করতে পারছিলাম না। এবার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয় আমার
কিন্তু...। এখান থেকে এখন সটকে পড়ে কেমন করে? এদের সঙ্গে না-একটা ঝামেলা হয়ে যায়। এখন অপারেশন করাব না এটা বললে ঝামেলা হবেই কারণ এরা সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
আমি জটিলতায় গেলাম না। অন্য পথ ধরলাম। আমার অবস্থা নি-মোরাদ টাইপের! ঘুম, খাওয়া-টাওয়ার ঠিক ঠিকানা ছিল না-বিধায় এমনিতেই আমার মুখ শুকিয়ে যা-তা অবস্থা। চেহারায় একটা কাক-কাক ভাব চলে এসেছে। আমি মুখটা আরও খানিক শুকিয়ে বললাম, "আমার যে টাকা আসার কথা ছিল এটা এখনও যোগাড় করা সম্ভব হয়নি। টাকাটা পরে দিলে হয় না"?
মনে মনে আমি হাসছিলাম, আমি জানতাম উত্তরটা কি হবে। ওই উত্তরটাই আমার প্রয়োজন ছিল।

তখন এরা আমাকে হাঁকিয়ে দিতে পারলে বেঁচে যান। আহা, আমিও যে এটাই চাই।
ঈদের ছুটি এখনও শেষ হয়নি। রাস্তা-ঘাট ফাঁকা-ফাঁকা! অ্যামবুলেন্স ছুটে চলেছে। আমি বসেছি সাদিক এবং ডাঃ গুলজারের সঙ্গে। নিজেকে অনেকখানি 'নির্ভার'-ভারহীন মনে হচ্ছে...।

হাসপাতাল পর্ব, তিন: http://www.ali-mahmed.com/2011/11/blog-post_30.html 

১. একজন ডাক্তার...: http://www.ali-mahmed.com/2011/05/blog-post.html 

3 comments:

রাহাত said...

শুভ ভাই, আপনার লেখা দিয়ে ডা.গুলজারকে চেনার চেষ্টা করছি। ওনার প্রতি আমার সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা। সাদিক ভাইকে অবশ্য আমি পূর্বেই চিনি।

রাহাত said...

আচ্ছা শুভ ভাই আপনার কি হীরক লস্করের কথা মনে আছে? ওরফে শমোচৌ?ডাক্তার আইজুকে কি চেনা মনে হচ্ছে?lolz

রুবাইয়্যাত said...

যে কয়দিন আপনি অনিয়মিত ছিলেন- মাঝে মাঝেই ঘুরে যেতাম আপনার ব্লগ। আজ আপনার ব্লগে ঢুকে ব্যানারটা দেখেই থমকে গেলাম।