Wednesday, November 30, 2011

হাসপাতাল পর্ব: তিন

ডাঃ তৌহিদুল আলমের সঙ্গে আমার আলাপ, কথাবার্তা নিম্নরূপ:
ডাক্তার: ওয়েল, রেডি থাকেন, কালকে পেটটা কেটে ফেলি।
আমি: (অদম্য রাগ সামলে): উম-ম, কালকে-কালকে। আচ্ছা। তা খরচ-টরচ কেমন পড়বে?
ডাক্তার: খরচ বেশি না।
আমি: আমি তো ঢাকায় থাকি না, বিস্তারিত জেনে টাকাটা যোগাড় তো করতে হবে।
ডাক্তার: আমি নেব ত্রিশ। ওটি এবং ওষুধ আলাদা।
আমি: ওটির খরচ কত?

ডাক্তার: এটা আপনি ওদের সঙ্গে কথা বলে নেবেন। ওটির সময়টা ওরা ঘন্টা হিসাবে চার্জ করে।

আমি হতভম্ব, এই ডাক্তার নিজেই নেবে ত্রিশ হাজার!
আমি যথাসম্ভব বিনীত একটা ভঙ্গি করে বললাম, কিছু কমানো যায় না?
ডাক্তার: এটা তো দামাদামির জায়গা না।
আমি: না মানে-।
ডাক্তার: তাহলে পিজিতে চলে যান কমে করাতে পারবেন। তবে রোগি বারান্দায় পড়ে থাকবে কয়েকদিন। অপেক্ষা করতে পারবেন?
আমি (রাগ চেপে): এখন এই সব কথা কেন! আমি আপনার উপর সব ছেড়ে দিয়েছি কারণ একজন ডাক্তার আপনার কথা আমাকে জোর দিয়ে বলেছেন।

এই ডাক্তারের কথা বলার ভঙ্গি এই লেখায় নিয়ে আসার ক্ষমতা আমার কই! তাঁর বডি ল্যাংগুয়েজ মিলে যায় অনেকটা, অনেকটা...।
কতটা বছর হয়ে গেল বাজারে যাই না। খাওয়ার সময় খাওয়া পেলেই আমি বেজায় সুখি- বাজার নিয়ে মাথা ঘামাতে বড়ো আলস্য আমার! মেন্যুতে মাংস নাকি আলুভর্তা এতে আমার বয়েই গেছে। এই নিয়ে সংসারে কম অশান্তি হয়নি! আমাকে কখনও গা ঘিনঘিনে পোকার সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে। আমি গা করিনি। পোকার সঙ্গে তুলনা করলেই কেউ পোকা হয়ে যাব বুঝি! পাগল! কিন্তু অনেকটা বছর পর এখন বাজারে যাওয়ার আনন্দটা ফিরে পেলাম। মনে হচ্ছিল, কসাইয়ের সঙ্গে মাংস কেনা নিয়ে দরদাম করছি।

ডাঃ তৌহিদুল আলমের উপর ভরসার বিষয়টা বলি। আমার খুব কাছের একজন মানুষ তাঁর কথা খুব করে বলেছিলেন। ওই মানুষটাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করি, চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি। ওই মানুষটাও চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িত। এখন ঈদের ছুটিতে মানুষটা কোথায়-কোথায় যেন বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ফোনেও পাওয়া যাচ্ছিল না।
এই ভয়টাই শুরুতে আমি করেছিলাম। আমাদের দেশে ঈদের সময় আক্ষরিক অর্থেই দেশটা অচল হয়ে পড়ে! আমার এই দুঃসময়ে মানুষটার কোনো সহায়তা পাব না। কপাল!

যাই হোক, তৌহিদুল আলম নামের মানুষটাকে বিভিন্ন কারণে আমার পছন্দ হয়নি। বিশেষ করে তার মধ্যে অহেতুক একটা হড়বড়ে-ছটফটে ভাব। এটা এই পেশার জন্য বিপদজনক। এটা বোঝার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এটা আমার মত নির্বোধ মানুষেরও বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল না।
কোথাও পড়েছিলাম, "ক্ষুধার্ত সার্জনের ছুরির নীচে শুতে নাই"।
একজন সার্জনের মাথা থাকবে বরফঠান্ডা। কারণ তার ছুঁরির নীচে যে শুয়ে থাকে যে, সে কেবল একটা সাবজেক্ট না; ওই শুয়ে থাকা মানুষটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মুখ-মানুষ। এর সঙ্গে চলে আসে জড়াজড়ি করে থাকা অসংখ্য গল্প-আবেগ! সেইসব আবেগ যা আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে। 
আফসোস, এটা কোনো 'কুতুয়া' বুঝবে না।

নিয়ম করে চলে আসে রাত। কী সুদীর্ঘ এক রাত! কেবল আমার জন্য রাতের থেমে থাকার উপায় নেই। ভোর হয়। যথারীতি ভোরের হাত ধরে ধরে চলে আসে সকাল।
নীচে নেমেছিলাম কোনও একটা কাজে। বোনটার ফোন আসে, ক্রিসেন্টের কাউন্টার থেকে নাকি বলা হয়েছে, টাকা জমা দিতে এবং কাগজে সই করতে। অপারেশনের পূর্বে রোগীর কাছের লোকজনকে এই মর্মে সই করতে হয়, রোগীর মৃত্যুর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ি নয়, হেনতেন। উত্তম, ডাক্তার ভুলে ছুঁরি-গজ পেটের ভেতর রেখেই পেট সেলাই করে দিলেও সমস্যা নাই। তখন আমাদেরকে ভেবে নিতে হবে, ডাক্তার সাহেব ভুলোমনা। বা তিনি চিকিৎসা বিষয়ে গবেষণায় মগ্ন ছিলেন! নির্ঘাত তিনি টিস্যু পেপারে গবেষণার সারাংশ লিখে আন্তর্জাতিক বাজারে জমা দিয়ে হইচই ফেলে দেবেন। এই গ্রহ জুড়ে রব উঠবে, বেংলাদেশ-বেংলাদেশ!

টাকা জমা এবং সই করার জন্য ফিরে আসছিলাম। ঠিক তখনই একটা মিরাকল ঘটে...।

*হাসপাতাল পর্ব, দুই: http://www.ali-mahmed.com/2011/11/blog-post_28.html 

**সবগুলো পর্ব: http://tinyurl.com/boya6xk  

No comments: